শিক্ষা ও সাক্ষরতা -মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান

শিক্ষা মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। বেঁচে থাকার সংগ্রামে দেখে শিখে এবং পড়ার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করতে হয়- যা অতি আবশ্যক। জীবনের প্রতিটি প্রয়োজনে শিক্ষা ব্যতীত মানুষের পক্ষে সামনে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। বিশ্বে প্রতি বছর ৮ সেপ্টেম্বর পালিত হয় আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। মানুষকে অক্ষর এবং সাক্ষর জ্ঞান করাই যার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। এক সময় কোনো রকম নিজের নাম লিখতে পারলে এবং স্বাক্ষর করতে পারলে তাকে সাক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ মনে করা হতো। কিন্তু শুধুমাত্র কিছু অক্ষর চেনা এবং স্বাক্ষর করতে পারার মাধ্যমে সাক্ষরতার পুরো অর্থ প্রকাশ করে না। চিন্তা এবং ধারণার পরিবর্তনে এর সংজ্ঞায়ও পরিবর্তন এসেছে। জীবন ধারণ, যোগাযোগ দক্ষতা ও ক্ষমতায়নের দক্ষতাও এতে যুক্ত হয়েছে। যিনি নিজ ভাষায় ছোট ও সহজ বাক্য পড়তে পারবে, সহজ ও ছোট বাক্য লিখতে পারবে এবং দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ হিসাব-নিকাশ করতে পারবে তাকে সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন বলা হবে। পুরনো সংজ্ঞার পরিবর্তে ১৯৯৩ সালে ইউনেস্কো একে পুনঃসংজ্ঞায়িত করেছে। ১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে পৃথিবীর সব দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূর করতে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এক প্রস্তাবের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৬৬ সালে ইউনেস্কো প্রথম এ দিবসটি পালন করে। তখন থেকে পৃথিবীর দেশে দেশে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশে ১৯৭২ সাল থেকে এ দিবসটি পালন করা হচ্ছে। শুধুমাত্র দিবস পালনের মাধ্যমে শিক্ষা এবং সাক্ষরতা বৃদ্ধি পায় না। তবে এ দিবসকে ঘিরে অনেক সিদ্ধান্ত হয়। জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা হয়। প্রতি বছর নতুন নতুন স্লোগানে দিবসটি পালিত হয়। এতে করে প্রতি বছর নতুনভাবে নেয়া পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে দেশের সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি সংস্থাসমূহ এবং জনগণ কাজ করার জন্য এগিয়ে আসে।

সাক্ষরতা বা শিক্ষার সাথে মানবজীবনের সামিগ্রক দিক ও বিভাগগুলো অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। শুধু জীবনমানই নয়, একটি সমাজ কাঠামোর গড়ে ওঠা, তার স্থিতি, স্থায়িত্ব সে সমাজের সামগ্রিক উন্নতি সমাজের মানুষগুলোর শিক্ষা এবং সাক্ষরতার ওপর নির্ভর করে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর উন্নয়নের সাথে শিক্ষার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭৩.৯ শতাংশ (২০২০)। এটি ২০২১ সালে ৭৪ শতাংশে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আমরা যদি ৭৪ শতাংশও ধরে নেই, তবে দেখা যায় এখনো ২৬ শতাংশ মানুষ শিক্ষার আলো হতে বঞ্চিত। একটি জাতির উন্নয়ন অগ্রগতি তো মূলত নির্ভর করে শিক্ষার ওপর। সেই শিক্ষার আলো হতে যখন এই আধুনিক সভ্যতার যুগে এখনো ২৬ শতাংশ লোক দূরে আছে, তা সত্যিই ভাবনার বিষয়। আমরা মিলেনিয়াম গোল বা সহস্রাব্দ উন্নয়নের গল্প শুনি। মহাকাশে আমাদের স্যাটেলাইট ঘুরছে। অর্থনীতিতে আমরা রাইজিং টাইগার হওয়ার প্রত্যাশা করছি। উন্নয়নশীল দেশের তালিকা হতে আমরা উন্নত দেশের তালিকায় নিজেদের নাম লেখানোর স্বপ্ন দেখছি। তথ্য প্রযুক্তিতে বিশ্বকে চমকে দেয়ার ঘোষণা দিচ্ছি। স্বপ্ন দেখা ভালো এবং স্বপ্ন দেখা ব্যতীত কোনো ব্যক্তি কিংবা কোনো জাতি সামনে অগ্রসর হতে পারে না। স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়ণের জন্য কার্যকর যে পদক্ষেপগুলো জরুরি তার মধ্যে শিক্ষার উন্নয়ন অন্যতম। আমরা ৭৩.৯ শতাংশ বা ৭৪ শতাংশ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর যে তথ্য পেয়েছি তাও কিন্তু সকল অঞ্চলে সমান নয়। অর্থনৈতিক সমস্যা, যোগাযোগব্যবস্থার অনুন্নয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকা সকল পর্যায়ে জনসচেতনতা কার্যক্রম না থাকা এ জন্য কম দায়ী নয়।

মানুষ যে পেশায়ই কাজ করুক না কেন শিক্ষা ব্যতীত তার পক্ষে সেই পেশায় ভালোভাবে কাজ করা সম্ভব নয়। মৎস্য চাষ এবং আহরণের সাথে যে সকল শ্রমিক জড়িত, তারা যদি শিক্ষিত না হয় তবে অনেক তথ্য সম্পর্কে তারা জানতে এবং বুঝতে পারবে না। কোন পানিতে কোন মাছ চাষ করলে ভালো হবে। কোন সিজনে কোন মাছ চাষ করতে হবে। কোন মাছের জন্য কেমন খাবার উপযোগী? মাছ কখন ডিম ছাড়ে, এ সময় করণীয় কী? আবার যারা নদী এবং সাগরে মাছ আহরণ করে, তাদের জন্য নদী এবং সাগরে মাছ আহরণের নিয়ম-কানুন জানা অতি আবশ্যক। পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এ খাতে যারা শ্রমিক তারা তো লেখাপড়া জানা ব্যতীত কাজই করতে পারবে না। পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে যারা কোনোই লেখাপড়া জানে না, তারা এ পেশায় কখনো ভালো করতে পারে না। পরিবহন সেক্টরে যে সকল শ্রমিক কাজ করে তাদের অবশ্যই লিখতে-পড়তে জানা, পরিবহন সম্পর্কিত আদেশ নিষেধ নিজ ভাষায় পড়তে পারা, সিগন্যাল বা সঙ্কেতগুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা অতি জরুরি। কোনো কারণ ব্যতীত হর্ন বাজানো, হাইড্রোলিক হর্ন না বাজানো, কোথায় কোথায় হর্ন একেবারেই বাজানো যাবে না ইত্যাদি বিষয় বিভিন্ন সঙ্কেতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। কোথায় হাসপতাল, মসজিদ, স্কুল ইত্যাদি জানা এ সম্পর্কিত বিষয়গুলো জানা মানেই একজন পরিবহন শ্রমিক শিক্ষিত। এভাবে দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির জন্য সকল পেশা এবং শ্রেণির মানুষকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলা অতীব জরুরি।

আমাদের দেশে ফরমাল এবং নন-ফরমাল নানান ধরনের প্রাথমিক এবং প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি চালু আছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগও আমাদের চোখে পড়ে। ফরমাল এবং নন ফরমাল সব মিলিয়ে যে প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে তা হচ্ছে : ১. সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২. রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩. ইবতেদায়ি মাদরাসা ৪. কিন্ডারগার্টেন ৫. স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসমূহ কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন স্কুল ৬. মিশনারি স্কুল ৭. মক্তব ৮. সরকারি উদ্যোগে প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় ৯. বেসরকারি সংস্থাসমূহ কর্তৃক পরিচালিত প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় ১০. পথশিশুদের জন্য ভ্রাম্যমাণ স্কুল ১১. নৈশ বিদ্যালয় ১২. বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র ১৩. কওমি মাদরাসার প্রাথমিক স্তর ১৪. কিন্ডারগার্টেন মাদরাসা ১৫. ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ইত্যাদি। এর বাইরে আরো নন-ফরমাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে যারা প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার কাজ করে থাকে।
আমাদের দেশে শিক্ষার বিভিন্ন ধারা আবহমান ধরে চলে আসছে। সময়ের স্রােতে এ ধারা অসংখ্য শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত হয়েছে। এক সময়ে মক্তবভিত্তিক শিক্ষাই ছিল মূল প্রাথমিক শিক্ষা। মক্তবগুলো পরিচালিত হতো ইসলামী আদর্শের ভাবধারায়। একইভাবে হিন্দু পণ্ডিতদের দ্বারা পরিচালিত হতো টোল শিক্ষা। টোল শিক্ষা সাধারণত মন্দির কিংবা কোনো বাড়ির সামনের উঠোনে পরিচালিত হতো। মক্তবগুলো সাধারণত মসজিদ কিংবা কোনো বাড়ির কাচারিঘরে পরিচালিত হতো। সময়ের ব্যবধানে মক্তবগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মক্তবভিত্তিক শিক্ষার বৈশিষ্ট্য ছিলো, এ প্রতিষ্ঠানে একইসাথে বাংলা, গণিত ইংরেজির পাশাপাশি ধর্মীয় ও নৈতিকি শিক্ষা প্রদান করা হতো। বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে মসজিদভিত্তিক যে মক্তব চালু আছে তাতে শুধুমাত্র সহিহ কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। তবে এ মক্তবগুলোর ব্যাপারে আছে নানা অভিযোগ। ঠিকমতো পাঠদান না করা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক নিয়োগকৃত সুপারভাইজারদের স্বেচ্ছাচারিতা, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ এবং সমস্যাগুলো সমাধান করে মসজিদভিত্তিক মক্তবগুলোকে প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রূপ দেয়া যায় অনায়াসে।

এ উপমহাদেশে মক্তবভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস হাজার বছরের। এ শিক্ষাপদ্ধতির হাত ধরেই পরবর্তীতে অন্যান্য শিক্ষাপদ্ধতির ধারা-উপধারা সৃষ্টি হয়েছে। কর্মজীবী এবং বয়স্কদের জন্য ১৯১৮ সালে আমাদের দেশে নৈশবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পদ্ধতি চালু করা হয়। শিক্ষার প্রতি আগ্রহের ফলস্বরূপ খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ ও নবাব আবদুল লতিফসহ নবাব পরিবার ও শিক্ষানুরাগী ও দানশীল ব্যক্তিদের উদ্যোগে ১৯৩৪ সালে গড়ে ওঠে বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র। এটিকে আরো সফলভাবে পরিচালনার জন্য ১৯৬০ সালে ভি-এইড কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ব্যুরো অব নন-ফরমাল এডুকেশন’। ১৯৯১ সালে আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু বাধ্যতামূলক করার পরও সকল শিশুকে শিক্ষাকার্যক্রমের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। সরকারিভাবে প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক হলেও সমভাবে সকল স্থানে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। সরকারি এবং রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর স্বল্পতার স্থান পূরণ করেছে বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেনগুলো। কিন্ডারগার্টেনগুলোর আবার নানাবিধ সমস্যা আছে। কোনো স্কুলে মানসম্মত শিক্ষক নেই। কোনো স্কুলের স্থানস্বল্পতা। আবার যারা এ সকল চাহিদা পূরণ করে পাঠ দানের ব্যবস্থা করে সে সকল স্কুলগুলোতে ভর্তি ফি এবং বেতন অনেক বেশি। আমি আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি রাজধানী শহরের উপকণ্ঠে নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস যে অঞ্চলে বেশি সে সকল স্থানে জনসংখ্যার তুলনায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা কম। রাজধানীর আশপাশে নতুনভাবে গড়ে ওঠা বসতি অঞ্চলে অসংখ্য কিন্ডারগার্টেন থাকলেও অনেক দরিদ্র অভিভাবকরা সেখানে তাদের সন্তানদের ভর্তি করাতে সাহস করেন না। এ সমস্যা দেশের জেলা-উপজেলাগুলোতেও সমভাবে আছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো অনেক এলাকা আছে যেখানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই।

আন্তর্জাতিক মানব-উন্নয়ন সূচকে আমাদের অবস্থান ১৩৩তম। ইউএনডিপি প্রকাশিত ২০২০ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী দু’ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ, যা পূর্বের বছরে ছিল ১৩৫তম। ১৮৯টি দেশের মধ্যে আমরা এখনো ১০০ এর ঘরে প্রবেশ করতে পারিনি। অনেকগুলো মানের মধ্যে সাক্ষরতাও এর মধ্যে যে অন্যতম তা বোঝাই যাচ্ছে। সাক্ষরতাকে ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং মানব-উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ধরা হয়। অত্র নিবন্ধে মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষাকে সন্নিবেশিত করিনি। শিক্ষার প্রাথমিক ভিত মজবুত হলে অন্যান্য ধারা এবং শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হওয়া স্বাভাবিক। প্রাথমিক ভিত্তি যদি দুর্বল হয় তবে সেখানে উচ্চশিক্ষা নিয়ে আলোকপাত করার সুযোগ কোথায়? যে দেশে এখনো ২৬ শতাংশ মানুষ শিক্ষার গণ্ডিতেই প্রবেশ করেনি। তাই এ বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা সময়ের অনিবার্য দাবি। মানুষকে তার স্বকীয় মর্যাদা, সমাজে তার অবস্থান, পরিবারে তার দায়িত্ব, রাষ্ট্রে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হলে শিক্ষা ব্যতীত এগুলো বোঝা এবং ধারণ করা সম্ভব নয়। সামাজিক, মানবিক, রাজনৈতিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি জরুরি। সাক্ষরতার পরিবর্তিত সংজ্ঞা অনুযায়ী আমাদের অবস্থান পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের তুলনায় অনেক পেছনে। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে জাপান, জার্মানি, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড উত্তর কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশের শিক্ষার হার ১০০%। ৯৫-৯৯% শিক্ষার হার রয়েছে প্রায় ৭৮টি দেশে। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের শিক্ষার হার ৯৮ শতাংশ। অবশ্য ফিলিস্তিনের গাজা ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হামাসের তথ্যমতে তাদের দেশের শিক্ষার হার ১০০ ভাগ। যা আরব বিশ্বের আর কোনো দেশে নেই। আন্তর্জাতিক মানব উন্নয়ন সূচকে অগ্রগতির জন্য এ সকল রাষ্ট্রের শিক্ষার হারের দিকেও আমাদের একটু নজর দেয়া দরকার।

সাক্ষরতার বর্তমান হার প্রমাণ করে যে শিক্ষা খাতে সরকারের কথা ও কাজে অনেক তফাৎ আছে। সেই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি হিসাবের গরমিলের বিষয়টিও উপেক্ষা করার মতো নয়। সরকারি এই তথ্যও কিভাবে পরিমাপ করা হয়েছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। শুধুমাত্র অক্ষরজ্ঞান এবং স্বাক্ষর করতে পারলেই যদি সাক্ষর জ্ঞান বা শিক্ষিত ধরা হয় তবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সাথে তাল মেলানো মুশকিল হবে। ইউনেস্কোর সংজ্ঞায় তো বলা হয়েছে, সাক্ষরতা হলো পড়ার পাশাপাশি অনুধাবন করা, মৌখিকভাবে ও লেখার বিভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করা, যোগাযোগ স্থাপন করা এবং হিসাব করার সক্ষমতা অর্জন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেউ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করলে সাক্ষরতাসম্পন্ন ধরা হয়। আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে পঞ্চম শ্রেণি পাস অনেককে দেখা গেছে শুদ্ধভাবে বাংলা পড়তে পারে না। আমরা যদি ব্রিটিশ আমলের কথা চিন্তা করি, সেই সময়ে জি.টি পাস (গুরু ট্রেনিং) করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। তারা বাংলা, গণিত, ইংরেজিতে সমান দক্ষ ছিলেন। জি.টি পাস মানে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা। এখন তো এমনও দেখা যায় পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর ভালোভাবে বাংলা পড়তে ও লিখতে পারে না। পাকিস্তান আমলেও মেট্রিকুলেশন পাস করে হাইস্কুলে দক্ষতার সাথে শিক্ষকতা করতো। বর্তমান সময়ে এমন অনেক শিক্ষার্থী পাওয়া যায় যারা এসএসসি পাস করার পর ভালোভাবে ইংরেজিতে দু’টি বাক্য বলতে পারে না। সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির সাথে মানের বিষয়টি নিশ্চিত করতে না পারলে তাকে তো শিক্ষা বলা যায় না।

সাক্ষরতা অর্জনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে, এটা খারাপ নয়, তবে আশানুরূপ নয়। কিন্তু মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা যায়নি। ১৯৯১ সালের পর দেশে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। মেয়েদের জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থা চালু করা হয়। তখন আমাদের দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ৩৫.৩ শতাংশ। তখন ‘সমন্বিত উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বিস্তার কার্যক্রম (ইনফেপ)’ নামে একটি বড় প্রজেক্ট হাতে নেয়া হয়। এরপর ২০১০ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী দেশে সাক্ষরতার হার দাঁড়ায় ৫৯.৮২ শতাংশ। তার মানে এ প্রজেক্ট হাতে নেয়ার পর ২০ বছরে শিক্ষার হার বেড়েছে ২৪.৬ শতাংশ। ২০১০ সালের পর পরবর্তী ১০ বছরে শিক্ষার হার বেড়েছে ১৪.০৮ শতাংশ। পরিসংখ্যান ব্যুরো যদিও বলছে শিক্ষার হার ৭৩.৯ (২০২০ সাল) কিন্তু বেসরকারি সংস্থাগুলো তাদের নিজস্ব গবেষণা অনুযায়ী যে রিপোর্ট দিয়েছে সে অনুযায়ী সাক্ষরতার হার ৫৭ শতাংশ। বছরে সাক্ষরতার হার বাড়ছে ১ শতাংশ কিংবা তারও কম। বাংলাদেশে যতগুলো সরকার ক্ষমতায় এসেছে সবার সময়ই নিরক্ষরতা দূরীকরণের উদ্যোগ এবং পরিকল্পনা আমরা দেখেছি। কিন্তু এ পরিকল্পনাগুলো কখনোই শতভাগ বাস্তবায়ন হয়নি। সরকার অনেক ক্ষেত্রেই সফলতার গল্প আমাদের শোনায়। সফলতার সাথে ব্যর্থতা কিংবা অসফলতার চিত্র সামনে থাকলে একটি দেশ এবং জাতির এগিয়ে যাওয়া সহজ হয়। আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, কর্মপন্থা গ্রহণও সহজ হয়। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী এজেন্ডার অন্যতম হচ্ছে শতভাগ জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করা বা শিক্ষার হার শতভাগ নিশ্চিত করা। এটা কতদিনে সম্ভব হবে তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল।

শিক্ষার সাথে আর্থসামাজিক অবস্থার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর এবং নিবিড়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২৬ শতাংশ মানুষ এখনো নিরক্ষর। সরকারি হিসাব মতেই দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে ২২ শতাংশ মানুষ। যে দেশে এখনো ফুটপাথে রাত কাটে লাখো বনি আদমের। দিনশেষে দুই বেলা অন্ন সংস্থান করা যাদের জন্য কষ্টসাধ্য। তারা কিভাবে ভাবতে পারে তার সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাবে? কবির ভাষায় বলতে হয় পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি। এটি যখন কোটি মানুষের জীবনের রুঢ় বাস্তবতা সেখানে শিক্ষার হার শতভাগ করার জন্য আর্থ-সামাজিক অবস্থারও উন্নয়ন ঘটাতে হবে। যে বাবা সারাদিন রোদে পুড়ে রিকশা-ভ্যান চালিয়ে মুটের কাজ করে দিন শেষে দুমুঠো ভাত আর মাস শেষে বাসা ভাড়া জোগাড় করতে পারেন না তিনি কিভাবে স্বপ্ন দেখবেন সন্তানকে শিক্ষিত করার? কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবশ্য ব্যতিক্রম আছে কিন্তু ব্যতিক্রম কখনো উদাহরণ হতে পারে না। সাক্ষরতার হার বাড়ানোর জন্য সকল সরকার বহু প্রকল্প হাতে নিয়েছে। কিন্তু সেসব প্রকল্প যে খুব বেশি সফল হয়েছে বলে মনে হয় না।

২০১৯ সালের শেষার্ধে এসে নীতিনির্ধারকেরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের পাঠকক্ষে ধরে রাখতে দুপুরের খাবার ও পোশাক দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। কয়েকটি এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রকল্প চালুও হয়েছে। কিন্তু করোনার ধাক্কা শিক্ষার হার এবং গতিকে কোথায় নিয়ে যাবে বলা মুশকিল। করোনা মহামারীর কারণে সকল পর্যায়ের বিদ্যালয় থেকে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়বে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। সরকার অবশ্য বিদ্যালয়গুলোতে অনলাইন ক্লাস চালু করেছে। যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় তারা কোথায় পাবে অ্যান্ড্রয়েড ফোন আর টেলিভিশন? করোনা পরবর্তী সময়ে যাতে সকল শিশুকে বিদ্যালয়মুখী করা যায় ব্যবস্থাপনা জরুরি। একই সাথে আবহমান কাল থেকে আমাদের এ জনপদে মক্তবভিত্তিক শিক্ষাকার্যক্রমকে উৎসাহিত করে তা আবার চালু করা অতীব জরুরি। ২০২১ সাল থেকে সরকার প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এ কার্যক্রমকে বিনা খরচে বিনা অবকাঠামো ব্যয়ে মসজিদভিত্তিক মক্তব কার্যক্রমের মাধ্যমে আরো বেশি সম্প্রসারিত করা যায়। যেখানে শিক্ষার্থীরা অন্তত দুটি শ্রেণির পাঠ শেষ করে এসে বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারবে। সরকারি-বেসরকারি সকল উদ্যোগকে একটি সমম্বিত রূপ দেয়া এবং আনুষ্ঠানিক-উপানুষ্ঠানিক সকল পর্যায়ের শিক্ষাকার্যক্রমকে আরো গতিশীল করাসহ সরকারের পরিকল্পনা এবং বাজেটের অর্থ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশও নিরক্ষরতামুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক : প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply