সর্বশেষঃ
post

শিরকের ভয়াবহ পরিণতি এবং শয়তানের ষড়যন্ত্র

ড. মো. শফিকুল ইসলাম

২৯ অক্টোবর ২০২১

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَکَ بِہٖ وَ یَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ مَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا. اِنۡ یَّدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِہٖۤ اِلَّاۤ اِنٰثًا ۚ وَ اِنۡ یَّدۡعُوۡنَ اِلَّا شَیۡطٰنًا مَّرِیۡدًا. لَّعَنَہُ اللّٰہُ ۘ وَ قَالَ لَاَتَّخِذَنَّ مِنۡ عِبَادِکَ نَصِیۡبًا مَّفۡرُوۡضًا. ১১৬. যারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করে, নিশ্চয়ই তিনি তাদেরকে ক্ষমা করবেন না। তবে এ ছাড়া যাকে চান ক্ষমা করেন। আর যে আল্লাহর সাথে শরিক করে নিঃসন্দেহে সে গভীর পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত হয়েছে। ১১৭. আল্লাহ ছাড়া তারা শুধু নারীমূর্তি এবং অবাধ্য শয়তানকে ডাকে (উপাসনা করে)। ১১৮. আল্লাহ তাকে (শয়তানকে) লানত করেছেন আর সে বলেছে, আমি অবশ্যই আপনার বান্দাদের এক নির্দিষ্ট অংশকে অনুসারী হিসেবে গ্রহণ করব। (সূরা নিসা : ১১৬-১১৮)

সূরা পরিচিতি ও নামকরণ সূরা নিসা মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের একটি বৃহৎ সূরা। ‘আন-নিসাউন’ (النِّسَاء) অর্থ নারীগণ। পবিত্র কুরআন যখন নাজিল হয় তখন আরবসহ সারা বিশ্বের বিভিন্ন সমাজ, সভ্যতা ও ধর্মে নারীরা ছিল অবহেলিত, উপেক্ষিত ও বঞ্চিত। তাদের মর্যাদা ও অধিকার বলতে কিছুই ছিল না। ইসলাম নারীর ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা দান করেছে। এ সূরায় নারীদের অধিকার সম্পর্কে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। মহান আল্লাহ ‘আন-নিসাউন’ (النِّسَاء) বা ‘নারীগণ’ নামে এ সূরাটি নাজিল করে নারীদের বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। ‘আন-নিসাউন’ শব্দটি এ সূরায় ১৬ বার উল্লেখ রয়েছে।

সূরা নিসা নাজিলের সময়কাল সূরাতুন নিসা মদিনায় অবতীর্ণ হয়। অধিকাংশ মুফাস্সিরের মতে, সূরাটির অংশবিশেষ মক্কায় এবং অধিকাংশ অংশই মদিনায় অবতীর্ণ হয়েছে। সূরাটির বিষয়বস্তু ও ঘটনাবলির দিকে লক্ষ করলে বুঝা যায় উহুদ যুদ্ধের পর অর্থাৎ তৃতীয় হিজরির শেষ ভাগ হতে পঞ্চম হিজরির প্রথম ভাগ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে কয়েক পর্যায়ে এ সূরাটি নাজিল হয়।

সূরা নিসার আলোচ্য বিষয় সূরা নিসায় মৌলিকভাবে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়েছে। যথা- এক. আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় বিধি-বিধান ও নিয়ম-কানুন। দুই. ইসলাম বিরোধীদের মুকাবিলায় তাওহিদের ভিত্তিকে দৃঢ়করণের পদক্ষেপ। তিন. ইসলামের বিজয়ের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা।

নির্বাচিত আয়াতসমূহের আলোচ্য বিষয় সূরাতুন নিসার ১১৬-১১৮তম আয়াতে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষভাবে দু’টি বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। যথা- শিরকের ভয়াবহ পরিণাম এবং মানবজাতির ক্ষতিসাধনে শয়তানের ষড়যন্ত্রবিষয়ক আলোচনা।

নির্বাচিত আয়াতসমূহের ব্যাখ্যা ১১৬তম আয়াত : শিরক ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَکَ بِہٖ وَ یَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ مَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا “যারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করে, নিশ্চয়ই তিনি তাদেরকে ক্ষমা করবেন না। তবে এ ছাড়া যাকে চান ক্ষমা করেন। আর যে আল্লাহর সাথে শরিক করে নিঃসন্দেহে সে গভীর পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত হয়েছে।” ¬¬ অত্র আয়াতে আল্লাহর সাথে শিরক করাকে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আয়াতের ব্যাখ্যার জন্য শিরকের পরিচয়, প্রকারভেদ, উদাহরণ এবং এর ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

শিরকের পরিচয় আল্লাহ এক অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো শরিক নেই। এ পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল আগমন করেছেন, সকলেরই আহ্বান ছিল তাওহিদ বা একত্ববাদের প্রতি। তাওহিদ বা একত্ববাদের বিপরীত শিরক। আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদত বা আল্লাহর সঙ্গে অন্যের ইবাদত করাই শিরক বলে গণ্য। যখনই কোনো জাতি একত্ববাদ ছেড়ে দিয়ে শিরকে লিপ্ত হয়েছে, তখনই নেমে এসেছে গজব। শিরকের আভিধানিক অর্থ, অংশ বা অংশীদারিত্ব স্থাপন, সংযুক্তি ইত্যাদি। (to share, participant, be partner, associate)। অর্থাৎ আল্লাহর সঙ্গে তাঁর সত্তা এবং গুণাবলিতে অন্য কাউকে অংশীদার স্থাপন করা। ইবাদত ও বিশ^াসে আল্লাহর সাথে সঙ্গী জুড়িয়ে দেয়া। পারিভাষিক অর্থে, মহান ও পবিত্রতম ¯্রষ্টার বৈশিষ্ট্যাবলির সাথে সৃষ্টির সাদৃশ্য করা। আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক মনে করা, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ইবাদতের যোগ্য মনে করা, আল্লাহর মতোই অন্যকে ডাকা, তার কাছে কোনো কিছু প্রাপ্তির আশা করা, আল্লাহর কাছ থেকে সাহায্য প্রাপ্তির জন্য মাধ্যম অবলম্বন করা এগুলো সবই শিরক। মহান আল্লাহ মানুষ ও জিন জাতিকে একমাত্র তাঁরই ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। সকল প্রকার ইবাদত বা দাসত্ব একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই নিবেদিত হবে। আকিদা ও ইবাদতে কোনো প্রকার শরিক করা যাবে না। মাওলানা আব্দুর রহীম এ প্রসঙ্গে বলেন, “বিশ^¯্রষ্টাকে এক ও ‘লা-শরিক’ বিশ্বাস করেও কোনো না কোনো কারণ দেখিয়ে অন্যের ইবাদত করার নাম শিরক। যারা শিরক করে তাদেরকে মুশরিক বলা হয়। ইবন আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “যখন তুমি কিছু প্রার্থনা কর, তখন শুধু আল্লাহর নিকটেই কর; আর যখন তুমি কোনো সাহায্য প্রার্থনা কর, তখন একমাত্র আল্লাহর নিকটেই কর।” (তিরমিজি-২৫১৬)

শিরকের প্রকারভেদ শিরক প্রধানত দুই প্রকার। ১. শিরকে জলি (شرك جلى) বা প্রকাশ্য শিরক। ২. শিরকে খফি (شرك خفى) বা অপ্রকাশ্য শিরক। ১. শিরকে জলি (شرك جلى) বা প্রকাশ্য শিরক : ‘জলি’ (جلى) অর্থ প্রকাশ্য। কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে যেমন- চন্দ্র, সূর্য, আগুন, গাছ-পালা, দেব-দেবী ইত্যাদিকে প্রতিপালন, ইবাদত, আনুগত্য অথবা অন্য কোন বিশেষ গুণে মহান আল্লাহর সমতুল্য বা তাঁর অংশীদার সাব্যস্ত করা অথবা আল্লাহর কাছে কিছু পাওয়ার জন্য মধ্যস্থতা অবলম্বন করাকে ‘শিরকে জলি’ (شرك جلى) বা প্রকাশ্য শিরক বলে। এ ধরনের অপরাধকে ‘শিরকে আকবার’ এবং ‘শিরকে আযিম’ও বলা হয়। যেমন- সিজদা হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য। কিন্তু মানুষ যখন আল্লাহকে সিজদা না করে, মূর্তি-প্রতিমা তৈরি করে তাতে সিজদা দেয়, পীরের মাজারে বা কবরে গিয়ে সিজদা দেয়, তখন ইবাদতের মাধ্যমেই আল্লাহর সঙ্গে শিরক সাব্যস্ত করা হয়। অনুরূপভাবে বলা যায়, আল্লাহ জীবন-মৃত্যু দান করেন, তিনি রোগ দেন আবার তিনিই আরোগ্য দান করেন। তিনি আসমান-জমিনের সব কিছুর প্রতিপালক এবং তিনিই রিযিকের একমাত্র মালিক। এখন কোনো মানুষ যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে এসব গুণাবলির অধিকারী মনে করে, সমকক্ষ মনে করে বা কোনো কিছু পাওয়ার জন্য মধ্যস্থতা অবলম্বন করে, তা হলে এটা আল্লাহর পবিত্র গুণাবলির সঙ্গে শিরক সাব্যস্ত করা হবে। এসবই শিরকে আকবার তথা বড় শিরক। ২. শিরকে খফি (شرك خفى) বা অপ্রকাশ্য শিরক : ‘খফি’ (خفى) শব্দের অর্থ অপ্রকাশ্য, গুপ্ত বা গোপন ইত্যাদি। লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে ইবাদত করা, ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তের সাথে সাথে অন্য কোন উদ্দেশ্য শামিল রাখা, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে শপথ করা, মানত করা ইত্যাদি কার‌্যাবলিকে ‘শিরকে খফি’ (شرك خفى) বা অপ্রকাশ্য শিরক বলে। মনের অজান্তেই ঈমানদার ব্যক্তিরা এ প্রকার শিরকে জড়িয়ে পড়ে। এ প্রকার শিরককে ‘শিরকে আসগর’ও বলা হয়। যেমন- লোকদেখানোর জন্য ‘ইবাদত করা, সুনাম অর্জনের জন্য দান-সাদকা করা, পার্থিব কোনো সুবিধা প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে নেক কাজ করা ইত্যাদি। মাহমুদ ইবন লাবিদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, আমি তোমাদের ব্যাপারে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ভয় পাই তা হলো, ‘শিরক আসগার’ (ছোট শিরক)। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! ‘শিরক আসগার’ কী? রাসূল সা. বললেন, ‘রিয়া’ (লোকদেখানো বা প্রদর্শনেচ্ছা)। (মুসনাদ আহমদ--২৩৬৩০) ‘রিয়া’ বা লোকদেখানোর অভিপ্রায় বিষয়টি খুবই গোপনীয়। এটির আগমন ঘটে মানুষের অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে। বিষয়টি অত্যন্ত গোপনীয় হওয়ার কারণে অন্যদের মতো একজন প্রকৃত মুমিনের পক্ষে এতে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকট। ‘রিয়া’ মুমিনের নেক আমল ধ্বংস করে ফেলে। আয়িশা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “শিরক হচ্ছে গভীর অন্ধকার রাতে কালো পাথরের উপর বেয়ে ওঠা একটা কালো পিঁপড়ার চাইতেও গোপনীয়।” মহান আল্লাহ বলেন, “যারা আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তারা অধিকাংশই মুশরিক।” (সূরা ইউসুফ : ১০৬) অর্থাৎ তারা একমাত্র আল্লাহকে মাবুদ বলে বিশ^াস করে, কিন্তু মনের অজান্তে, ইচ্ছা ব্যতিরেকে গুপ্ত ও সূক্ষ্মভাবে অন্য কাউকে আল্লাহর গুণাবলির মত গুণসম্পন্ন বলে বিশ^াসের মাধ্যমে শিরকে জড়িয়ে পড়ে। আলিমগণের দৃষ্টিতে শিরক তিনভাবে সংঘটিত হয়। যথা- এক. ‘আশ-শিরক বিয যাত’ তথা সত্তার সাথে শিরক : কাউকে আল্লাহর সমসত্তা ও আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা। যেমন- পাথর, বৃক্ষ-লতা, গ্রহ-নক্ষত্র, চন্দ্র, সূর্য, ফিরিশতা, নবী, অলি, জিন, দেবতা প্রভৃতিকে আল্লাহর সমতুল্য ধারণা করা এবং তার পূজা-উপাসনা করা। এটি প্রকাশ্য বা আকবার (সবচেয়ে বড়) শিরক। খ্রিষ্টানরা ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করে। ইয়াহুদিরা হযরত উযাইরকে (আ) আল্লাহর পুত্র বলে বিশ^াস করে। তারা দ্বিত্ববাদে বিশ^াসী। ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মবিশ^াস মৌলিকভাবে ত্রিত্ববাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ক. ব্রহ্মাকে সৃষ্টিকর্তা ও অস্তিত্বদানকারী মনে করে। খ. বিষ্ণুকে বিপদাপদ থেকে রক্ষাকারী মনে করে গ. শিবকে ধ্বংসকারী মনে করে। আরবের পৌত্তিলিকরা আল্লাহর ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা বলে বিশ্বাস করত। দুই. ‘আশ-শিরক বিস সিফাত’ তথা আল্লাহর গুণাবলির সাথে শিরক : মহান আল্লাহর অসংখ্য গুণবাচক নাম রয়েছে। মহান আল্লাহর সে সকল গুণের সাথে অন্যকে শরিক করা তথা অন্যের মধ্যে এ সকল গুণের উপস্থিতি স্বীকার করাকে ‘আশ-শিরক বিস সিফাত’ বা গুণাবলির সাথে শিরক বলে। (ইসলামের পূর্ণাঙ্গ রূপ, পৃ. ৩১) তিন. গুণাবলির অপরিহার্য চাহিদার সাথে শিরক : জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রকৃত আনুগত্য ও প্রেম-ভালোবাসা পাওয়ার একমাত্র অধিকারী হলেন আল্লাহ। সুতরাং যদি কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো প্রতি এরূপ ভালোবাসা অন্তরে লালন করে অথবা আল্লাহর আনুগত্যের পরিবর্তে অন্যকে সত্যিকার আনুগত্য পাওয়ার যোগ্য মনে করে, তবে সে আল্লাহর গুণাবলির চাহিদার সাথে অন্যকে শরিক করল।

সমাজে প্রচলিত শিরকসমূহ ১. একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকা, ফরিয়াদ করা, সাহায্য চাওয়া, আশ্রয় প্রার্থনা করা, সিজদা করা, মানত করা, আশা ও বাসনা পোষণ করা, একচ্ছত্র আনুগত্য করা, এককভাবে ভালোবাসা, ভয় করা, তাওয়াক্কুল বা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করা ইত্যাদি সবই শিরক। অনুরূপভাবে আল্লাহ ছাড়া কোনো মানুষকে চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী, জীবন-মৃত্যুদানকারী, ধনী বা গরিব বানানোর মালিক, গায়েব বা অদৃশ্য জগতের মালিক, অন্তর্যামী, জনগণকে ক্ষমতার মালিক, সন্তান দানের মালিক, সুস্থতা দানকারী, কল্যাণ-অকল্যাণদানকারী মনে করা ইত্যাদি শিরক। ২. কোনো প্রাণী বা ব্যক্তির ছবি, প্রতিকৃতি, মূর্তি ভাস্কর্য ইত্যাদি তৈরি করা। পথে-ঘাটে, অফিস-আদালতে ও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এগুলো স্থাপন করা। এগুলোকে সম্মান করা, পু®পস্তবক অর্পণ করা, সিজদা করা ইত্যাদি। ৩. অগ্নিপূজা, শিখা চিরন্তন, শিখা অনির্বাণ, মঙ্গল প্রদীপ জ¦ালানো ও ভক্তি শ্রদ্ধা জানানো। ৪. নবী-রাসূল, ওলি-আউলিয়া, পীর-বুজুর্গের আত্মাসমূহ তাদের মৃত্যুর পরেও জাগতিক ঘটনাবলিতে প্রভাব ফেলতে সক্ষম মনে করা। তাঁদের নিকটে সাহায্যের প্রার্থনা করা বা তাঁদের মাধ্যমে আল্লাহর নিকটে সাহায্য প্রার্থনা করা বা তাঁদের কবরে বা মাজারে সিজদা। ৫. আল্লাহর জিকিরের ন্যায় কোন নবী-রাসূল, অলি-আউলিয়া, পীর, বুযুর্গ, আলিমের নাম জপ করা, বিপদে পড়লে তাদের নামের অজিফা পড়া শিরক। যেমন- ইয়া রাহমাতুল্লিল আলামিন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, নূরে রাসূল, নূরে খোদা, হক বাবা, খাজা বাবা, ইয়া বড়-পীর আব্দুল কাদির জিলানী, ইয়া গাউছুল আযম ইত্যাদি। ৬. পীর, বুযুর্গ বা কোনো আলিমকে এমন কোনো উপাধিতে সম্বোধন করা, যা অর্থগত দিক দিয়ে মহান আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য। যেমন- গাউছুল আযম (সর্বশ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী বা মুক্তির সর্বশ্রেষ্ঠ উৎস), গরিবে নেওয়াজ (গরিবেরা যার মুখাপেক্ষী), মুশকিল কোশা (যার মাধ্যমে বিপদাপদ দূর হয়), কাইয়ুমে যামান (যামানা কায়েম করেছেন যিনি) ইত্যাদি। ৭. আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদের বান্দাহ হওয়ার অর্থ প্রকাশকারী নাম রাখা। যেমন- গোলাম রাসূল (রাসূলের গোলাম), আব্দুন্নবী/আব্দুর রাসূল (নবী/রাসূলের দাস), গোলাম মুস্তফা (মুস্তফার গোলাম), আলী বখশ (আলী রা.-এর দান), আব্দুল হাসান (হাসানের গোলাম), আব্দুল হুসাইন (হুসাইনের গোলাম), হুসাইন বখশ (হুসাইন রা.-এর দান), পীর বখশ (পীরের দান) ইত্যাদি নাম রাখা। ৮. রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে জনগণকে সকল ক্ষমতার মালিক বলে বিশ^াস করা। ৯. একমাত্র মহান আল্লাহই মানবজাতির সার্বিক উন্নতির জন্য আইন রচনা করার অধিকার রাখেন। এ কাজের যোগ্য তিনি ছাড়া আর কেউ নন। আল্লাহ প্রদত্ত বিধান বা ইসলামী শরিয়াতকে আইনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ না করে মানবরচিত বিধান ও আইন-কানুন দ্বারা দেশ শাসন এবং বিচারকার্য পরিচালনা করা। ১০. বিপদ বা দুর্ভাগ্য থেকে মুক্তি এবং সৌভাগ্য লাভের জন্য তাবিজ ব্যবহার করা, মাজারে বা পীরের নামে মানত করা, আংটি, রিং, সুতা পরা, শিরক মিশ্রিত মন্ত্র বা ঝাড়-ফুঁক দেয়া, ভাগ্য গণনা করা, ছোট বাচ্চার কপালে কালো টিপ দেয়া ইত্যাদি। ১১. বিপদ কালে বা বিপদ থেকে উদ্ধার লাভের পর বিভিন্ন কথাবার্তা বলার মাধ্যমে শিরক। যেমন- ড্রাইভার ভালো বলে দুর্ঘটনা ঘটলো না। আপনি ছিলেন বলেই আজকে রক্ষা পেলাম। মাঝি ভালো বলে নৌকা ডুবল না। উপরে আল্লাহ আর নিচে আপনিই আমার ‘হিল্লা’ বা আপনিই আমার সব, আপনিই শুধু আমার একমাত্র ভরসা। আল্লাহ এবং আপনি না চাইলে কাজটা হতো না, আপনি ছাড়া আর কে আমায় সাহায্য করবে এমন বলা। দয়াল বাবা, পীর বাবা, দয়ার নবী আমায় রক্ষা কর। তুমিই শুধু আমাকে বাঁচাতে পার। ১২. আল্লাহর গুণবাচক নামে অন্য কাউকে ডাকা শিরক। যেমন কুদ্দুস, রাহমান, রহীম, জাব্বার, সালাম, মুমিন ইত্যাদি। এইসব নাম রাখতে অথবা ডাকতে হলে অবশ্যই এর আগে ‘আবদ্’ শব্দ যোগ দিতে হবে। যেমন- আব্দুর রহীম, আব্দুল খালেক, আব্দুল মালেক ইত্যাদি। ১৩. আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর কসম করা শিরক। যেমন- রাসূলুল্লাহর কসম, কাবা ঘরের কসম, কুরআনের কসম, মাটির কসম, নিজ চোখের কসম, বাবা-মায়ের কসম, আমার ছেলের কসম, বিদ্যা বা বই এর কসম ইত্যাদি। আব্দুল্লাহ ইবন ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর নামে কসম করল, সে কুফরি করল অথবা শিরক করল। ১৪. কোন ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর যদি এমন করতাম তা হলে এমন হতো না বলা বা বিশ^াস করা। ১৫. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর সন্তুষ্টির জন্য বা লোকদেখানোর জন্য বা দুনিয়া কামানোর উদ্দেশ্যে কোনো ইবাদত বা নেক আমল করা। ১৬. শুভ-অশুভ আলামতে বিশ^াস করা। যেমন- যাত্রা শুরুর সময় পায়ে হোঁচট খেলে বা পেছন থেকে ডাকলে যাত্রা অশুভ বলে ধারণা করা। কোনো প্রাণীর বিশেষ কোনো আচরণে অমঙ্গলের আশঙ্কা রয়েছে এমন মনে করা ইত্যাদি। ১৭. যে কোনো জড় বস্তুকে সম্মান দেখানো তথা তাজিম করা বা তার সামনে নীরবতা পালন করা শিরক। ১৮. দোকানের প্রথম কাস্টমার ফেরত দিলে অমঙ্গল হয় বা আর কাস্টমার হবে না অথবা প্রথম কাস্টমারকে বাকিতে দিলে পরে সব বাকি যাবে এমন মনে করলে বা বিশ্বাস করলে শিরক হয়। ১৯. টিকটিকিতে টিক টিক করা মানে সে অবস্থায় নেয়া সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে ধারণা করা শিরক।

শিরকের নিষিদ্ধতা ও ভয়াবহতা শিরক হচ্ছে সকল পাপের চাইতে বড় পাপ, যা তাওবা ছাড়া আল্লাহ কক্ষনো ক্ষমা করবেন না। এটি মানুষের নেক ‘আমলসমূহ বিনষ্ট করে দেয়। শিরকের ভয়াবহতা এত বেশি যে, যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করে মারা যায় তাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকতে হবে। তাই এটি জঘন্যতম অপরাধ। শিরকের পরিণতি সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসে খুব কঠিন কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, اِنَّہٗ مَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدۡ حَرَّمَ اللّٰہُ عَلَیۡہِ الۡجَنَّۃَ وَ مَاۡوٰىہُ النَّارُ ؕ وَ مَا لِلظّٰلِمِیۡنَ مِنۡ اَنۡصَار “নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করবেন, আর তার পরিণতি হবে জাহান্নাম এবং এ রকম জালিমের কোনো সাহায্যকারী নেই।” (সূরা মায়িদাহ : ৭২) আল-কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে শিরকের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। যেমন- সূরা বাকারাহ : ২১-২২, ৫১, ৫৪, ৫৭, ৫৯, ৯২, ১৬৫; সূরা নিসা : ৪৮, ১১৬; সূরা মায়িদাহ : ১৭, ৭২, ৭৩; সূরা আন‘আম : ১৯, ৪৫,৮২, ৮৮, ১৩৬, ১৩৭-১৪০, ১৫০-১৫১; সূরা আ‘রাফ : ৫, ৩৩,৩৭; সূরা তাওবাহ : ৩, ২৮, ১১৩; সূরা ইউনুস : ১০৬-১০৭; সূরা ইউসুফ : ৩৮, ৪০; সূরা হিজর : ৯৬; সূরা হাজ্জ : ৩১; সূরা ফুরক্বান : ৬৮; সূরা শু‘আরা : ৭১, ৭৪; সূরা লুকমান : ১৩; সূরা মুহাম্মাদ : ১৯। মহান আল্লাহ আল-কুরআনে শিরককে অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন এবং মানুষকে তা হতে নিবৃত্ত থাকার নির্দেশ দিয়ে বলেন, “সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎ কর্ম করে ও প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।” (সূরা কাহাফ : ১১০) “তুমি আল্লাহর সাথে অন্যকে ইলাহ রূপে ডেকো না। তিনি ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই। আল্লাহর সত্তা ব্যতীত সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল।” (সূরা কাসাস : ৮৮) শিরকের গুনাহ কতটা ভয়াবহ তা হজরত মুয়াজ বিন জাবাল রা.-কে দেওয়া রাসূল সা.-এর উপদেশ থেকে ধারণা করা যায়, তিনি মুয়াজ রা.-কে বলেছিলেন, হে মুয়াজ! তুমি কখনও এক আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না, যদিও তোমাকে হত্যা করা হয় এবং যদিও তোমাকে জ্বলন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। (মুসনাদু আহমাদ-২২০৭৪) এক. শিরকের মাধ্যমে ঈমান ও নেক আমল নিষ্ফল হয় : শিরক এত বড় একটি মারাত্মক গুনাহ যে, ঈমান আনার পরে কেউ শিরক করলে ভেতরের সুপ্ত ঈমান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বান্দার পেছনের সব নেক আমল বরবাদ হয়ে যায়। এ স¤পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, “হে রাসূল! আপনি যদি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক সাব্যস্ত করেন, তা হলে অবশ্যই আপনার সব নেক আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে। আর আপনি অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।” (সূরা যুমার : ৬৫) দুই. শিরক ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ : মহান আল্লাহ বান্দার সব গুনাহ ক্ষমা করলেও শিরকের গুনাহ তওবা ব্যতীত কখনও ক্ষমা করবেন না। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করা ক্ষমা করেন না। এটি ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন আর যে কেউ আল্লাহর শরিক করে সে এক মহাপাপ করে।” (সূরা নিসা : ৪৮।) তিন. শিরককারীর জন্য জান্নাত চিরতরে হারাম : শিরক কত বড় জুলুম যে, শিরকের কারণে চিরস্থায়ী সুখময় জান্নাত বান্দার জন্য চিরতরে হারাম হয়ে যায়। (সূরা মায়িদাহ : ৭২) চার. কিয়ামতের দিন নিরুপায় হয়ে যাবে : শিরককারীরা কিয়ামতের দিন নিরুপায় হয়ে তাদের কৃতকর্মের জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করতে থাকবে। কিন্তু সেদিন দোষারোপ করেও কোনো কাজে আসবে না।

১১৭-১২১তম আয়াত : মানবজাতির ক্ষতিসাধনে শয়তানের ষড়যন্ত্র اِنۡ یَّدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِہٖۤ اِلَّاۤ اِنٰثًا ۚ وَ اِنۡ یَّدۡعُوۡنَ اِلَّا شَیۡطٰنًا مَّرِیۡدًا . لَّعَنَہُ اللّٰہُ ۘ وَ قَالَ لَاَتَّخِذَنَّ مِنۡ عِبَادِکَ نَصِیۡبًا مَّفۡرُوۡضًا. ১১৭. আল্লাহ ছাড়া তারা শুধু নারীমূর্তি এবং অবাধ্য শয়তানকে ডাকে (উপাসনা করে)। ১১৮. আল্লাহ তাকে (শয়তানকে) লানত করেছেন আর সে বলেছে, আমি অবশ্যই আপনার বান্দাদের এক নির্দিষ্ট অংশকে অনুসারী হিসেবে গ্রহণ করব। অত্র আয়াতদ্বয়ে ইবলিসের অবাধ্যতা ও অভিশপ্ত হওয়া এবং বনি আদমকে জাহান্নামি বানানোর জন্য তার প্রতিজ্ঞা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

ইবলিস জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে ফেরেশতাদের সরদার ছিল। মহান আল্লাহ প্রথম মানব আদম (আ)-কে সৃষ্টির পর ফেরেশতাদেরকে আদমের প্রতি সম্মানসূচক সিজদার নির্দেশ দিলে ইবলিস নিজেকে তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে সে নির্দেশ পালন করা থেকে বিরত থাকে। তখন আল্লাহ তাকে অভিশপ্ত করে দেন এবং তার প্রতি লানত ঘোষণা করেন। শয়তান মানুষের চিরন্তন শত্রু। ইবলিস যখন আদম (আ)-কে সিজদা না করার কারণে বিতাড়িত শয়তানে পরিণত হয়ে গেল তখন সে বলল, “আমাকে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন। আল্লাহ বললেন, তোমাকে অবকাশ দেওয়া হলো। সে বলল, যে আদমের প্রতি অহঙ্কারের কারণে আপনি আমার মধ্যে পথভ্রষ্টতার সঞ্চার করেছেন, সেই আদম সন্তানদের পথভ্রষ্ট করার জন্য আমি অবশ্যই আপনার সরল পথের ওপর বসে থাকব। অতঃপর আমি অবশ্যই তাদের কাছে আসব তাদের সামনে, পিছনে, ডানে, বামে সবদিক থেকে। আর তখন আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।” (সূরা আরাফ : ১৪-১৭।) অবশেষে শয়তানকে এমন ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যে, সে বনি আদমের শিরায় প্রবেশ করতে পারে। শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। সে মানুষের ভিতরে-বাইরে, শয়নে-স্বপনে, দিবা-নিশি সর্বাবস্থায় পথভ্রষ্ট করার সকল প্রকার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

মানুষের বিরুদ্ধে শয়তানের চক্রান্ত ও শত্রুতা কুরআনের ভাষ্যমতে শয়তান আমাদের প্রকাশ্য শত্রু। সে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সদা-সর্বদা টিম ওয়ার্ক করে চলেছে। সে মানুষের হৃদয়ে ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা দেয়। অর্থাৎ মানুষের অন্তরে খারাপ, অন্যায় ও অশ্লীল কাজের চেতনাবোধ ও চিন্তা জাগ্রত করে। সে অতি সূক্ষ্মভাবে মানুষকে ছোট ছোট অন্যায় কাজ করানোর পর ক্রমান্বয়ে বড় পাপাচার ও অন্যায় কর্মের দিকে টেনে নিয়ে যায়। সে মানুষকে ভয় দেখায়, প্রতারিত করে, অন্যায়কে সুশোভিত করে তুলে ধরে। ইসলামের সত্যতায় ও আল্লাহর অস্তিত্বের ব্যাপারে মনের মধ্যে সন্দেহের বীজ বপন করে দেয়। এভাবে সে ধীরে ধীরে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে তার পথে নিয়ে যায়। এক. ছলনা, কৌশল, ধোঁকা ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি প্রদান : শয়তান বিভিন্ন কায়দা-কৌশল, ছলনা, কুমন্ত্রণা, প্ররোচনা, সংশয়-সংন্দেহ, অবিশ্বাস মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করে। আদম ও হাওয়া (আ) স্বয়ং এমন ধোঁকা ও প্রতারণার শিকার হন। দুই. পারস্পরিক শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি : শয়তান মানুষের মাঝে শত্রুতা ও ঘৃণা সৃষ্টি করে। মহান আল্লাহ বলেন, “শয়তান তো কেবল চায় তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে।” (সূরা মায়িদাহ : ৯১) তিন. অশ্লীলতাকে সুসজ্জিতকরণ : শয়তান মানুষের সামনে পাপ, অশালীন ও অশ্লীল কাজকর্মকে সুন্দর ও সুসজ্জিত করে উপস্থাপন করে। ফলে তাকে ভালো কাজ মনে করে মানুষ আমল করে জাহান্নামি হয়ে যায়। শয়তানের এই ভাষাকে মহান আল্লাহ উল্লেখ করে বলেন, “শয়তান বলল, হে আমার পালনকর্তা। যেহেতু তুমি আমাকে বিপথগামী করলে, সেহেতু আমিও পৃথিবীতে তাদের নিকট পাপকর্মকে শোভনীয় করব এবং তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করব। তবে তাদের মধ্য থেকে তোমার নির্বাচিত বান্দারা ব্যতীত।” (সূরা হিজর ৩৯-৪০; নাহল ৬৩; আন‘আম ৪৩, ৪৮; নামল ২৪)

চার. সালাতে অন্যমনস্ক ও উদাসীনতা : শয়তানের কাজ হলো আল্লাহর স্মরণ বা জিকির ভুলিয়ে দিয়ে বিপথগামী করা। আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, তোমাদের কারো কারো সালাত আদায়কালে শয়তান আসে এবং সালাতের বিষয়ে সন্দেহে ফেলে দেয়। ফলে সে বুঝতে পারে না কত রাকাত আদায় করল। (তিরমিজি) পাঁচ. কল্যাণমূলক কাজে বাধা সৃষ্টি এবং অশ্লীল কর্মের আদেশ প্রদান : শয়তার সবসময় মানুষকে অন্যায়, অপকর্ম ও অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। যে ব্যক্তি শয়তানের অনুসরণ করে, সে তো তাকে নির্লজ্জতা ও মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়।” (সূরা নূর : ২১)

শয়তানের প্রতারণা থেকে বাঁচার উপায় শয়তানের প্রতারণা থেকে বাঁচার জন্য আমরা কয়েকটি কাজ করতে পারি। এক. ‘তাউজ’ পাঠ : শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয়ের জন্য তথা ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ-শায়তানির রাজিম’ ‘আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি) পাঠ করা। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, “আর যদি শয়তানের পক্ষ হতে কোন প্ররোচনা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে তুমি আল্লাহর আশ্রয় চাও; নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী।” (সূরা আরাফ : ২০০) মহান আল্লাহ শয়তানের হাত থেকে রক্ষার দোয়া শিক্ষা দিয়ে বলেন, وَ قُلۡ رَّبِّ اَعُوۡذُ بِکَ مِنۡ ہَمَزٰتِ الشَّیٰطِیۡنِ . وَ اَعُوۡذُ بِکَ رَبِّ اَنۡ یَّحۡضُرُوۡنِ “বলুন, হে আমার রব! শয়তানের প্ররোচনা হতে আমি আপনার কাছে পানাহ চাই। আর হে আমার রব! আমি আপনার কাছে পানাহ চাই, ওদের (শয়তানদের) উপস্থিতি হতে।” (সূরা মুমিনুন : ৯৭-৯৮)

দুই. তাওবাহ, দোয়া ও ইসতেগফার পাঠ : মনে জাগ্রত হওয়া কুচিন্তার দিকে ধ্যান বা খেয়াল না দিয়ে বেশি বেশি তাওবা ও ইসতেগফার পড়া। নিয়মিত সূরা ফালাক ও নাস পাঠ করা। এ ছাড়া বিশেষভাবে এ দু‘আগুলো পাঠ করা। اَللَّهُمَّ مُصَرِّفَّ الْقُلُوْبِ، صَرِّفْ قُلُوْبَنَا عَلَى طَاعَتِكَ (আল্লাহুম্মা মুসাররিফাল কুলুব, র্সারিফ কুলুবানা আলা ত্বাআতিক।) “হে মানুষের অন্তর পরিবর্তনকারী আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে তোমার আনুগত্যের দিকে পরিবর্তন কর।” (মুসলিম-২৬৫৪) يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوْبِ، ثَبِّتْ قَلْبِيَ عَلَى دِيْنِكَ (ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব, সাব্বিত কালবি ‘আলা দিনিক।) “হে মানুষের অন্তর পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে তোমার দ্বীনের ওপর দৃঢ় রাখ।” (আদাবুল মুফরাদ-৬৮৪; তিরমিজি-২১৪০) رَبِّ اغْفِرْ لِي، وَتُبْ عَلَيَّ، إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ (রাব্বিগফিরলি ওয়া তুব আলাইয়্যা, ইন্নাকা আংতাত তাওয়াবুর রাহিম।) “হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন। আমার তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি তাওবা কবুলকারী, দয়াময়।” (আবু দাউদ-১৫১৬) তিন. ইসলাম স¤পর্কে জ্ঞানার্জন করা : কুরআন ও হাদিস অধ্যয়নের মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানার্জন করতে হবে।

আয়াতসমূহের শিক্ষা ১. জীবন বিপন্ন হলেও শিরক করা যাবে না। শিরকের পাপের কোনো ক্ষমা নেই। শিরকের পরিণতি ধ্বংস। শিরক সমস্ত নেক আমলকে বিফল করে দেয়। মুশরিকরা চিরস্থায়ী জাহান্নামি। মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নিষেধ। ২. শিরক মিশ্রিত ঈমান কখনোই ঈমান হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়। ৩. শিরক ও শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচতে হলে কুরআন ও হাদিসের সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং তাওহিদ বিষয়ক ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ সা. এবং সাহাবীগণ কিভাবে শিরকমুক্ত জীবন যাপন করেছেন তার সঠিক ইতিহাস জেনে সে অনুযায়ী আমল করতে হবে। ৪. শিরক ও শয়তান থেকে বেঁচে থাকার জন্য সবসময় আল্লাহর নিকটে প্রাণ খুলে দোয়া করা ও সাহায্য প্রার্থনা করা কর্তব্য। রাসূল সা. শিরক থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহর নিকট এই বলে দোয়া করতেন, اللَّهُمَّ إِنَّا نَعُوْذُ بِكَ مِنْ أَنْ نُشْرِكَ بِكَ شَيْئًا نَعْلَمُهُ، وَنَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا نَعْلَمُ (আল্লাহুম্মা ইন্না নাউযুবিকা মিন আন-নুশরিকা বিকা শাইআন নালামুহ, ওয়া নাসতাগফিরুকা লিমা লা নালামু।) “হে আল্লাহ, জেনে বুঝে শিরক করা থেকে আমরা আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং আমাদের অজ্ঞাত শিরক থেকে আপনার নিকটে ক্ষমা চাচ্ছি।” (মুসনাদু আহমাদ-১৯৬০৬)

আল্লাহ আমাদেরকে শিরক ও শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হিফাজত করুন। আমিন!

লেখক : প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির