শুধু জীবিকা নয়; জীবনবোধের পেশা -রফিকুজ্জামান রুমান

জীবন ও জীবিকার সম্পর্কটি অনন্য। মহান সৃষ্টিকর্তা জীবন সৃষ্টি করে তার সঙ্গে জীবিকার বিষয়টি অপরিহার্য করে দিয়েছেন। পৃথিবীর প্রত্যেকটি সৃষ্টিকেই তাই জীবিকার প্রয়োজনকে স্বীকার করে নিতে হয় শুধু নয়; জীবিকার সংস্থানও করে নিতে হয় আপন আগ্রহে ও উদ্যোগে। দূর নীলাকাশে ছুটে চলা ছোট্ট পাখিটি কিংবা আটলান্টিক মহাসাগরের গভীর তলদেশে ভেসে বেড়ানো নাম-না-জানা প্রাণীটিকেও খাবারের সন্ধানে মনোযোগী হতে হয়। এবং সৃষ্টির সেরাজীব এই মানুষকেও! শুধু তাই নয়; মানুষকে নিয়ম করে তিনবেলা খেয়ে নিতে হয়! তাই তো জীবিকার জন্য আশরাফুল মাখলুকাতের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা।
একজন পরিপূর্ণ মানুষ মানে জীবিকার একটি উৎসকে আঁকড়ে ধরা। অর্থাৎ জীবন শেষ পর্যন্ত জীবিকামুখী-ই। কিন্তু জীবিকাই কি জীবনের সব? খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই কি জীবনের তাৎপর্যকে পরিপূর্ণ করে? বিশেষ করে মানুষের মতো এমন বিস্ময়কর সৃষ্টি তার সমস্ত সম্ভাবনা, যোগ্যতা আর দক্ষতাকে জীবিকার ভোগবাদী বৃত্তে বন্দী করে রাখবে?
সম্ভবত না। বিশেষ করে অধিকাংশ মানুষ যখন নিত্যনতুন জাগতিক চাহিদা সৃষ্টি এবং সেই চাহিদা পূরণের জন্যই জীবিকার মানসিকতায় অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন কিছু মানুষকে ঘুরে দাঁড়াতে হয় স্রােতের বিপরীতে। কিছু মানুষকে জীবিকা নয়; জীবনের বোধে উদ্বুদ্ধ হতে হয়। ভোগসর্বস্ব সমাজকে মেনে না নিয়ে কিছু মানুষকে নতুন সমাজ নির্মাণের কাণ্ডারি হতে হয়। কিছু মানুষকে এমন পেশায় নিয়োজিত হতে হয়, যেটি তাকে জীবিকা দিবে, তার চেয়েও বেশি দিবে সমাজ বদলের নেপথ্যে কাজ করার হাতিয়ার।
এমনই একটি পেশা সাংবাদিকতা। গণযোগাযোগের বৃহত্তম এই মাধ্যমটি সমাজ পরিবর্তনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। অধিকাংশ সময়ই আমরা তাই বিশ্বাস করি যা গণমাধ্যমে দেখি। গণমাধ্যমই শেষ পর্যন্ত একটি সমাজ এবং তার জনগোষ্ঠীর চিন্তা ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে। এজন্যই বলা হয়, Whoever controls the media, controls the mind. যার হাতে গণমাধ্যম, তার হাতেই মানুষের মনের নিয়ন্ত্রণ! এমন প্রভাবশালী গণমাধ্যম সঠিক পথে এবং সঠিক মানুষ দ্বারা পরিচালিত না হলে সমাজে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। গণমাধ্যমের সঙ্গে সমাজের মিথস্ক্রিয়ার জায়গাটি সমান্তরালভাবে একরৈখিক নয়। কিন্তু একথা খুবই সত্য, পরিচ্ছন্ন পরিশুদ্ধ না হলে গণমাধ্যম সমাজের প্রত্যাশিত অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে না। বরং তখন গণমাধ্যম বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে ‘তৈরি-করা-বাস্তবতার’ প্রচারমাধ্যমে পরিণত হয়। এ প্রসঙ্গেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়াত মানবাধিকারকর্মী ও মন্ত্রী ম্যালকম এক্স বলেছিলেন, “If you are not careful, the newspapers will have you hating the people who are being oppressed, and loving the people who are doing the oppression.” বাংলাদেশের সঙ্গে কী চমৎকারভাবেই না মিলে যায় এই চিত্রটি! আপনি যদি খুব সতর্ক না হন, দেখবেন- সংবাদপত্র (গণমাধ্যম) তাদেরকেই ঘৃণা করতে শেখাবে যারা নির্যাতনের/অত্যাচারের শিকার। আর তাদেরকেই ভালোবাসতে/সমর্থন করতে শেখাবে যারা নির্যাতনকারী।
সুতরাং পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা যতই মহৎ হোক; সেই মহত্ত্বের সত্যিকারের অনুবাদের জন্য গণমাধ্যমে শুদ্ধ মানুষের উপস্থিতি অপরিহার্য। গণমাধ্যমে শুদ্ধ মানুষের উপস্থিতি মানে শুদ্ধ সমাজ বিনির্মাণের প্রচেষ্টা। আর অবিশ্বাসী ভোগসর্বস্ব আদর্শহীন মানুষের উপস্থিতি মানে বিভ্রান্ত বিচ্যুত অমানবিক সমাজের নির্মমতা। বর্তমান বাংলাদেশের যে বহুমাত্রিক সঙ্কট এবং তার যে কারণ, তার অন্যতম একটি হলো আমাদের পথ-হারা গণমাধ্যম। গণমাধ্যম পথ হারালে কিংবা ‘ওয়াচডগ’ এর ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থায়। গণমাধ্যম ঠিকভাবে না চললে ঠিকভাবে চলে না কিছুই। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদপত্র দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট বছর চারেক আগে একটি স্লোগান নির্ধারণ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই দৈনিকটির ১৪৪ বছরের ইতিহাসে কোনো অফিসিয়াল স্লোগান ছিল না। ২০১৬ সালে পত্রিকাটির মালিকানার পরিবর্তন হলে নতুন স্লোগানটি সংযুক্ত করা হয়। স্লোগানটি হলো “অন্ধকারে মরে যায় গণতন্ত্র (Democracy dies in darkness)।” অর্থাৎ মানুষকে সঠিক তথ্য দিতে না পারলে তথ্যহীনতার একটি ‘অন্ধকার’ তৈরি হয়। এমন অন্ধকারে গণতন্ত্র বাঁচে না; বাঁচে না কিছুই। সুশাসন থাকে না, মানবাধিকার থাকে না, সুবিচার থাকে না, জবাবদিহিতা থাকে না, থাকে না এমন কিছুই যা একটি কার্যকর কল্যাণরাষ্ট্রের থাকা উচিত।
বিরাজমান এই অন্ধকার দূর করার জন্য প্রয়োজন আলো। অন্ধকার দিয়ে অন্ধকার দূর করা যায় না। এবং অন্ধকারকে ঘৃণা করার মধ্যেও কোনো সার্থকতা থাকে না। বরং সময়ের সাহসীরা, প্রকৃত স্বপ্নবাজরা নিজেরাই হয়ে ওঠে আলো। অন্ধকারের গভীর রাতে গেয়ে ওঠে সুবেহ সাদিকের অপরাজেয় গান। আজকের সত্যপন্থী, সাহসী, আদর্শের কাণ্ডারি তরুণ সমাজকে সুবহে সাদিকের গান গেয়ে উঠতে হবে, জীবনবোধের অনবদ্য আবেদনে আলোড়িত হতে হবে। জীবিকার পেছনে না ছুটে জীবনের অর্থময়তায় নিজেকে নতুন করে নিয়োজিত করতে হবে।

সাংবাদিকতা সেক্ষেত্রে একটি অনন্য পেশা। সবচেয়ে বেশি মানুষের কাছে সত্য ও সুন্দরের বাণী পৌঁছে দেয়ার এ এক অতুলনীয় মাধ্যম। তাই তো বলি, সাংবাদিকতা শুধু জীবিকা নয়; জীবনবোধের পেশা। এ পেশায় নিয়োজিত একজন কর্মী মাস শেষে বেতন পাবেন, কিন্তু দিন শেষে পাবেন তৃপ্তি! এ তৃপ্তি অতুলনীয়। শুদ্ধতার চাষ করার তৃপ্তি, অন্যের জন্য কিছু করতে পারার তৃপ্তি, কুরআনের “তোমরা জেনে শুনে কোনো সত্যকে গোপন করো না” নির্দেশ মানার তৃপ্তি। এবং সাংবাদিকতা তো নবীদেরও কাজ! ‘নবী’ শব্দের মানেই তো বার্তাবাহক।
তরুণরা আজ নানা পেশায় নিজেদেরকে নিয়োজিত করছে। সমাজ পরিবর্তনের জন্য সব পেশাতেই শুদ্ধ মানুষের প্রয়োজন রয়েছে। তবে সাংবাদিকতায় তরুণদের অংশগ্রহণ ভিন্নভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নিজের বিশ^াসের ভিত্তিতে সমাজ বিনির্মাণের দায়িত্ব পালন- দুই মিলে এ তরুণদেরই পেশা। সাংবাদিকতায় পড়াশুনার মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করতে পারলে, দক্ষতা ও সৃজনশীলতায় নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারলে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কাজ করার সুযোগ আছে অবারিত। তথ্য এবং তথ্য প্রবাহিত হওয়ার যে প্রযুক্তি- তাই এখন পুরো পৃথিবীর নিয়ন্ত্রক। একজন সাংবাদিক আসলে এই তথ্য-সা¤্রাজ্যেরই অধিকর্তা।
তাই বলছি, সাংবাদিকতায় পড়–ন। সাংবাদিকতা করুন। গণমাধ্যমে বাঁচুন। তথ্য-সা¤্রাজ্যের অধিকর্তা হয়ে নির্মাণ করুন নবুওয়াতের সমাজ, সোনালি সমাজ!

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

SHARE

Leave a Reply