শেখ আবুল কাসেম মিঠুন ছিলেন সংস্কৃতি অঙ্গনের একজন সিপাহসালার -তৌহিদুর রহমান

পলাশীর বিপর্যয়ের পর ভারত উপমহাদেশে মুসলমান জাতির ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণরূপে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। মুসলমানদের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্দিন। উপমহাদেশের শাসনব্যবস্থায় দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। বিশেষ করে ঘোর অমানিশায় ঢেকে যায় মুসলমানদের রাজনৈতিক জীবন। অর্থনৈতিকভাবেও মুসলমানরা হয়ে যায় দেউলিয়া। তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ধর্মীয় জীবন ক্রমান্বয়ে তলিয়ে যায় অতল গহব্বরে। প্রচলিত পৌত্তলিক সংস্কৃতির সাথে খুব সহজেই তা আবার একাকার হতে শুরু করে। নিজস্ব নৈতিক কাঠামো ও শিক্ষা ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে অপসংস্কৃতি ও পৌত্তলিকতার মাঝে। তাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধে প্রবেশ করে নানা কুসংস্কার। তাদের জীবন হয়ে পড়ে অতীব সঙ্গিন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তারা কুলি, মজুর ও বিত্তহীন কৃষক সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। এরপর খুব দ্রুতই তারা হিন্দু জমিদার ও ইংরেজ নীলকরদের অত্যাচারে একেবারে নিঃস্ব- সহজ কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, পথের ফকিরে পরিণত হয়। যে মুসলমানরা সম্পূর্ণ নির্মোহ ও নিরপেক্ষতার সাথে প্রায় আটশো বছর এই উপমহাদেশ শাসন করেছে, নতুন সভ্যতায় আলোকিত করে তুলেছে অসংখ্য অচ্ছ্যুৎ দলিত মথিত মানবসন্তানকে, যারা উঁচু-নিচু ভেদাভেদ ভুলিয়ে মানুষকে মানুষের কাতারে দাঁড় করিয়েছে- কালের পরিক্রমায় তারাই পরিণত হয় নির্মমতার সহজ শিকারে। কদিন আগেও যারা ছিল রাজা, বাদশা, উজির, নাজির, আমির, ওমরা- সময়ের ব্যবধানে তারাই আজ পথে পথে ভিখ মাগে। আর্থিক এই অসচ্ছলতার দরুন মুসলমান জাতি এই উপমহাদেশে যে প্রকট শিক্ষা সংকটে পড়ে মূলত তারই ফলশ্রুতিতে তাদের সমাজজীবনে ও ধর্মীয়জীবনে দেখা দেয় বিভিন্ন কুসংস্কার ও অনৈসলামিক রীতিনীতি। কবরপূজা, পীরপূজা, দরগাপূজা, ওরস ইত্যাদি রসম রেওয়াজ মুসলিম সমাজে প্রবেশ করে। মূলত দরিদ্রতার চরম জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়ে তারা ভিক্ষাবৃত্তির এসব নব কৌশল আবিষ্কার করে। এভাবেই মুসলমানদের ধর্মীয়, আদর্শিক, নৈতিক এবং সর্বোপরি সামাজিক জীবনের প্রথা বৈশিষ্ট্যসমূহ ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে থাকে। বলাবাহুল্য এই উপমহাদেশে মুসলমানরা সেই দৈনতা আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ইংরেজদের শেখানো ডিভাইড অ্যান্ড রুল অর্থাৎ ভাগ কর এবং শাসন কর- হিংস্র এই নীতি বলা যায় মুসলমানদের রক্তের সাথেও যেন মিশে গেছে। এর ফলে মুসলমানরা তাদের নিজস্ব মৌলিক নীতি আদর্শে আর ফিরে যেতে পারছে না। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না, যে মুসলমান জাতি দুনিয়ায় সর্বশ্রেষ্ঠ একটি আদর্শের ধারক, বাহক- কিন্তু এই উপমহাদেশে এটা তারা তাদের অভিধান থেকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলেছে। মাত্র দুইশো বছরের ইংরেজ শাসনেই তাদের এই বিভ্রম ঘটেছে। এখন অবস্থা এতটাই সঙ্গিন যে মুসলমানদের সেই মহান আদর্শ তারা নিজেরাই ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছে। উল্টো কবরপূজা, পীরপূজা, দরগাপূজা, ওরস ইত্যাদি রসম-রেওয়াজকেই আজ মুসলমানদের প্রকৃতধর্ম হিসাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার বহুবিধ প্রচেষ্টা নিরন্তর চলছে। এ সবের কারণে খুব সহজেই মুসলমানদের সোনালি ইতিহাস আজ চাপা পড়তে বসেছে। যদিও প্রায় একশো বছর হতে চলল মুষ্টিমেয় কিছু মুসলমান ইসলামী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ইসলামী আদর্শকে একমাত্র জীবনবিধান হিসাবে গ্রহণ করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে- তবুও এ কথা বলতেই হয়, সেই ধারা এখনো খুবই ক্ষীণ।
শেখ আবুল কাসেম মিঠুন এই ধারারই একজন সাহসী সিপাহসালার হিসেবে সংস্কৃতি অঙ্গনে প্রবেশ করেছিলেন। জীবনের কিছু ঋণ পরিশোধের ব্রত নিয়ে তিনি এগিয়ে এসেছিলেন নিজের অতীত জীবনকে বিচক্ষণতার সাথে পেছনে ফেলে ‘হেরার রাজতোরণ’-এর পথে। যদিও সে পথটা ছিল না মসৃণ, কোমল, ছায়া সুশীতল।
আবুল কাসেম মিঠুনের চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করাটা ছিল চরম কঠিন একটা কাজ। সমাজ সংসার, মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনের প্রবল আপত্তি ও বাধার মুখে তিনি পা রেখেছিলেন চলচ্চিত্র অঙ্গনে। এখানে তিনি অত্যন্ত দৃঢ় ও শক্ত করে পা রেখেছিলেন একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে। এখানে যারা পা রাখে তাদের পা ফসকাতে বেশি একটা সময় লাগে না। রূপালি পর্দার আড়ালে যে রূপের আগুন থাকে তা যেকোনো ঈমানদারকে অতি সহজে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারে নিমেষে। কিন্তু আবুল কাসেম মিঠুনের ঈমানের জোর ছিল অনেক অনেক বেশি। তাই তিনি নিজের ঈমানকে বাঁচিয়ে চলচ্চিত্র অঙ্গনের পরিবেশকে সুস্থ সুন্দর ও মননশীল করার ব্রত নিয়ে কাজ করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমার চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করাটা গ্রামের প্রায় কেউই ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। বাপ-মা’র প্রচণ্ড বিরোধিতার মুখে পড়ি। চলচ্চিত্রের ওপর তাদের খারাপ ধারণাটা আমি দূর করবোই, প্রতিজ্ঞা করলাম। নৈতিক চরিত্র ঠিক রেখে সকল প্রলোভনকে জয় করবো। পিতা-মাতা, শিক্ষকবৃন্দ ও গ্রামের সকল মুরব্বির সম্মান রক্ষার জন্য আমার আচার-ব্যবহার ও কাজকর্মে উন্নতভাব ফুটিয়ে তুলবো। সে তৌফিক আল্লাহ দিয়েছেন। কোনো প্রলোভন আমাকে ভ্রান্ত পথে নিতে পারেনি। কখনো জুয়া-মদের আসরে বসিনি, কখনো অবৈধ নারী সংসর্গে যাইনি। কাজ শেষে ঘরে ফিরে নামাজ পড়েছি। আব্বা-মা প্রদত্ত একটিমাত্র স্মৃতি বা নিদর্শন পবিত্র কোরআন শরিফ যা এখনো আমার কাছে রক্ষিত আছে, সেটা পড়েছি। আল্লাহর কাছে সবার জন্য দোয়া চেয়েছি।
অনেক পরিচালক-প্রযোজক বলেছেন জুয়া-মদের আসরে না বসলে হিরো হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে না। মৃদু হাসি দিয়ে জবাব দিয়েছি। প্রবল শক্তি জুগিয়েছে মুরব্বিদের উন্নত বৈশিষ্ট্য ও দোয়া। পুরো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আমার নৈতিক চরিত্র ও অন্যান্য গুণের জন্য সবার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও প্রশংসা পেয়েছি। এমনও ঘটেছে, ঢাকার দূরে শুটিংয়ে দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষার জন্য নতুন নায়িকা সসম্মানে আমার রুমে আশ্রয় নিয়েছে। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কতটুকু বিশ্বাস উৎপাদনে এটা সম্ভব! মুরব্বিরাই এই কৃতিত্বের দাবিদার। আমার সৌভাগ্য এ গ্রামে জন্মগ্রহণ করতে পেরে। আল্লাহর দরবারে হাজার শুকরিয়া।’ (পল্লীকথা, পৃ: ২১)
সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে পথ চলা সম্পর্কে আবুল কাসেম মিঠুন বলেন, ‘১৯৬৯-এ খুলনা সিটি কলেজে ভর্তি হয়েই দেয়াল পত্রিকা ‘সঙ্গোপন’-এর সম্পাদক হই। সাহিত্যে হাতেখড়ি তখন। ছাত্র অবস্থাতেই সাপ্তাহিক কালান্তরে সাংবাদিকতা, পরে কালান্তরের সাপ্তাহিক ও দৈনিকের নির্বাহী সম্পাদক। খুলনার জন্মভূমি, পূর্বাঞ্চল, প্রবাসী ইত্যাদি পত্রিকায় আমার লেখা অসংখ্য গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। সাপ্তাহিক প্রবাসীর বার্তা সম্পাদক ছিলাম দীর্ঘদিন। ’৭৩ ’৭৪-এ খুলনাসহ দেশের সব বেতার কেন্দ্রের গীতিকার ও নাট্যকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হই। এ কাজে তেমন অর্থ না থাকলেও সম্মান ছিল। বাস্তবে হারমোনিয়াম দেখিনি। তা সত্ত্বেও আমার সুরের গান জনপ্রিয় হয়। আমার লেখা ও সুরে গান গেয়ে শাম্মী আখতার, প্রণব ঘোষ, মলিনা দাস, শেখ আব্দুস সালাম প্রমুখ শিল্পী জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। গানের কথা ও সুর শুনে সঙ্গীতবোদ্ধারা অবাক ও বিস্মিত হতেন। ঢাকা থেকে আগত ‘সিনেপল ফিল্ম সোসাইটি’ আয়োজিত চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনার কোর্স করি।’ (পল্লীকথা, পৃ: ২৪)
এ সবই ছিল তার প্রবল আগ্রহ ও একনিষ্ঠতার প্রমাণ। একাগ্রতা থাকলে মানুষ অনেক কিছুই করতে পারে আবুল কাসেম মিঠুন তার বাস্তব উদাহরণ। কাজ করেছেন প্রচুর কিন্তু শিকড়কে কখনো ভুলে জাননি। আদর্শিক চেতনা সব সময় তাকে সতর্ক করেছে।
তিনি তৈরি করেছেন বেশ কয়েকটি টেলিফিল্ম, নাটক ও গানের ভিসিডি। প্রচুর লিখেছেন চলচ্চিত্র, নাটক, সংস্কৃতি, মিডিয়াসহ বহুবিধ বিষয়ে। অর্থাৎ তিনি ছিলেন সকল সময় কর্মব্যস্ত একজন মানুষ। কাজই ছিলো তাঁর নেশা। এত কাজের মধ্যে তাঁর মূল আকর্ষণ ছিলো চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা করা। তিনি অসম্ভব সংগ্রাম করে চলচ্চিত্র জগতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। অসংখ্য ছবির চিত্রনাট্য বা স্ক্রিপ্ট তিনি রচনা করেছেন অথচ লেখক হিসেবে তার নাম ব্যবহার করা হয়নি। এমনকি তাকে উপযুক্ত পারিশ্রমিকও দেয়া হয়নি। এ সম্পর্কে তিনি তার একটি স্মৃতিচারণে লিখেছেন, ‘তরুলতা মুক্তির পর ‘৮১-র মাঝামাঝি আর কোনো অফার আসেনি। প্রতিদিনই যাই বেঙ্গল স্টুডিও, এফডিসিতে। প্র্যাকটিস করি শরীরর্চ্চা, আবৃত্তি, অভিনয়। অন্যদিকে বেকার জীবন, প্রচণ্ড অর্থাভাব। হঠাৎ বিখ্যাত পরিচালক শেখ নজরুল ইসলাম থেকে অফার এলো, অভিনয়ের জন্য নয়, স্ক্রিপ্ট লেখার। খুলনার কোর্সটি কাজে লাগলো। লিখলাম ‘আশা’ ছবিটি। আমার আইডেন্টটিটি কী হবে? নায়ক, না লেখক? ঘনিষ্ঠজনদের সাথে পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত হলো লেখক হিসেবে পর্দায় আমার নাম থাকবে না। শুধু লেখার সম্মানীটা পাবো। অনেক কাহিনী চিত্রনাট্য সংলাপ রচনা করলাম। ছবিগুলো সুপার হিট হলো। পর্দায় আমার নাম না থাকলেও ফিল্মের লোক জেনে যায় ছবিটি কার লেখা। অলিখিত চিত্রনাট্যকার হিসেবে স্বীকৃতি পেলাম। প্রশংসা ছড়িয়ে পড়লো। এরপর বিখ্যাত প্রডাকশন হাউজ ও মধুমিতা সিনেমা হলের মালিকদের ছবি ‘মাসুম’ লিখলাম। ‘ঈদ মোবারক’ লিখলাম। লেখক হিসেবে ভীষণ প্রশংসা পেলাম। সাথে তারা আমাকে সে ছবির নায়কও করলেন। ‘৮২-তে মুক্তি পেল। সুটিংয়ে আমার অভিনয় দেখে বিখ্যাত পরিচালক কামাল আহমেদ তার ‘গৃহলক্ষ্মী’ এবং জনপ্রিয় পরিচালক এফ কবির চৌধুরী ‘নরম-গরম’ ছবিতে আমাকে কাস্ট করেন। সবগুলো ছবিই সুপার হিট হলো।’
একটি আদর্শিক দলের পতনের কারণ সম্পর্কে তার একটি মূল্যবান আলোচনা শুনে একদা তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। সেই থেকে মনের মণিকোঠায় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাকে ঠাঁই দিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘অভিনয় করবেন নৈতিক চরিত্র ধ্বংস করে নয়। ব্যবসা করতে গিয়ে নিজের ঈমান বিক্রি করে যেন মুনাফা করতে না হয়। কাদায় নামবেন কিন্তু ভাবতে হবে বাইম মাছের মতো গায়ে যেন কাদা না লাগে। যেখানেই আপনি কাজ করেন না কেন আল্লাহর রজ্জুটা যেন গলায় থাকে। সবদিকে খেয়াল রাখতে হবে যেন সাদা কাপড়ে দাগ না লাগে।’
আবুল কাসেম মিঠুনের এই আলোচনা সেদিন মন্ত্রমুগ্ধের মতো গোগ্রাসে গিলেছিলাম। তিনি এত ভালোভাবে এটা বুঝিয়েছিলেন যা কল্পনারও অতীত।
তিনি ছিলেন একটা আদর্শিক পরিবারের সন্তান। সেই কারণেই তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্র জগতের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার পরেও নিজের চরিত্র কালিমা মুক্ত রাখা। কাদায় নামার পরেও তিনি কখনো গায়ে কাদা লাগতে দেননি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেছিলেন, ‘একটা আদর্শের পতন তখন হয় যখন তার নৈতিক পরাজয় হয়। বিপরীত আদর্শের সাথে ক্ষমতার অংশীদারিত্বে যাওয়াটা সঠিক বা বেঠিক সময়ই তা নির্ধারণ করবে। মনে রাখতে হবে, যখন আপনি বৃহৎ শক্তির সাথে সমঝোতা করবেন তখন তার কর্মের কিছু না কিছু আপনার মাধ্যমে প্রতিফলিত হবে। পানিতে ডুব দিয়ে চুল না ভেজানো অসম্ভব একটি কাজ!’
আসলে হত্যা, নির্যাতন, গুম করে কখনো আদর্শকে খতম করা যায় না। আদর্শ শেষ হয়ে যায় তার জনশক্তির নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে। প্রখ্যাত দার্শনিক ও লেখক বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, ‘আদর্শপরায়ণতার নামে যা চলছে তার বেশিরভাগই হয় ছদ্মাবরণে ঘৃণা আর না হয় ছদ্মাবরণে ক্ষমতানুরাগ। বিপুল জনসাধারণকে যখন আপনারা কোনো মহৎ অনুপ্রেরণার নামে আন্দোলিত হতে দেখেন, তখন আপনাদের কর্তব্য হবে একটু গভীরে দৃষ্টি দিয়ে নিজ নিজ অন্তরকে জিজ্ঞেস করা- এই অনুপ্রেরণার পেছনে আসল কারণটা কী? মহত্ত্বের এতই আকর্ষণ যে, তার মুখোশ দেখলেই জনগণ তার দিকে ধাবিত হয়।’
আবুল কাসেম মিঠুন মানুষের মুখোশকে খুবই ভয় করতেন। তিনি মুখোশধারী মানুষকে মোটেই সহ্য করতে পারতেন না।
আবুল কাসেম মিঠুন ছিলেন একজন নির্লোভ মানুষ। চলচ্চিত্র জগতের একজন প্রভাবশালী অভিনেতা ও নেতা ছিলেন আবুল কাশেম মিঠুন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তিনি চলচ্চিত্র অঙ্গনের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বৃহৎ পরিবারের সন্তান হিসাবে তিনি ছিলেন অসচ্ছল। তবুও টাকা-পয়সা কখনো তার কাছে মুখ্য ছিল না। তারপরও খুবই সাধারণ জীবনযাপন করতেন আবুল কাসেম মিঠুন। এত বড় একজন নায়ক বা অভিনেতা অথচ সামান্য অহংকার তার মধ্যে দেখিনি। এমন অমায়িক ভালো মানুষ চলচ্চিত্র অঙ্গনে খুব কমই দেখা যায়।
শেষ দিকে এসে হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আমার আর তার অসুস্থতা ছিল প্রায় একই ধরনের। সে জন্য প্রতিদিনই শারীরিক সমস্যা নিয়ে আলাপ হতো। তিনিই ফোন দিতেন। শেষ দেখার সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে অসুস্থতা নিয়ে প্রায় আরো আধা ঘণ্টা কথা হলো। বললেন, আম্মা অসুস্থ কাল বাড়ি যাবো। দোয়া চাই। ক’দিনের মধ্যে আমার সাথে এত আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তা এখন ভাবতে বসে কষ্ট পাই। সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গনের যাদের সাথে আমার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে তারা আমার জন্য হৃদয়ের গভীরে দরদ অনুভব করেন। ড. এস এম লুৎফর রহমান স্যার এখনো আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করেন। শাহ আবদুল হান্নান প্রতিবার বিদায়ের সময় আমার কপালে চুমু দিয়ে বিদায় দেন। প্রখ্যাত নজরুল গবেষক শাহাবুদ্দীন আহমদের সহধর্মিণী নূরজাহান ভাবী প্রায়ই বলেন, আমার সন্তানদের পাশে আর একটি নাম তিনি লিখে রেখে গেছেন, তা হলো তৌহিদ। দশ দিন দেখা না হলেই কবি আল মাহমুদ ভাই অস্থির হয়ে যান। একই সাথে কথাশিল্পী মাহবুবুল হক, কবি সোলায়মান আহসান, ড. হুমায়ূন কবীর, কবি মোশাররফ হোসেন খান, ড. মুহাম্মদ সিদ্দিক, লেখক বদরে আলম প্রমুখ।
আবুল কাসেম মিঠুনের ব্যক্তিগত তথ্য সম্পর্কে যা জানা গেছে তা হচ্ছে এরকম। সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার দরগাহপুর গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শেখ আবুল কাসেম মিঠুন ১৯৫১ সালের ১৮ এপ্রিল। তার পিতার নাম শেখ আবুল হোসেন এবং মায়ের নাম হাফিজা খাতুন। এই বংশের অধিকাংশ সদস্যই জ্ঞানী-গুণী, সংস্কৃতিবান ও ঐতিহ্য সচেতন ব্যক্তি ছিলেন। সেই আমলে বুখারি শরিফের বাংলা অনুবাদ করেন শেখ বজলুর রহমান দরগাহপুরী। প্রখ্যাত পণ্ডিত শেখ বজলুর রহমান দরগাহপুরী এই বংশেরই লোক। শেখ বজলুর রহমান শুধুমাত্র একজন জ্ঞানী ব্যক্তিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন পশ্চিম বাংলার বিধানসভার নির্বাচিত একজন সদস্য। কিছুকাল আগে লুপ্ত শিশু-কিশোর পত্রিকা ‘গুলবাগিচা’র সম্পাদক ছিলেন এই বংশের আরেক উজ্জ্বল নক্ষত্র মাওলানা আবদুল ওহাব সিদ্দিকী। এ ছাড়া কারী শেখ মাহমুদ আলী, ঔপন্যাসিক আনিস সিদ্দিকী, মনোয়ারা বেগম, নিগার সুলতানা নার্গিসÑ এই পরিবারের এক একজন অলোকবর্তিকা! তাঁরা সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে রেখে গেছেন অনেক অবদান। ইতিহাস ঐতিহ্য সচেতন এই পরিবারের প্রত্যেক সদস্যই কাজ করে গেছেন মানবকল্যাণে।
স্বনামখ্যাত এই পরিবারেরই অধস্তন সন্তান শেখ আবুল কাসেম মিঠুন। তিনি ছোটকাল থেকেই ছিলেন খুবই নম্র, ভদ্র এবং শান্ত স্বভাবের। তার ফলে সবাই তাঁকে যথেষ্ট আদর ও সোহাগ করতেন। তাই পারিবারিক সূত্রে তিনি গড়ে ওঠেন একজন উদার মনের মানুষ হিসেবে। সদা হাস্যোজ্জ্বল, মিষ্টভাষী, কোমল স্বভাবের এই মানুষটি পক্ষ বিপক্ষ সবার কাছেই ছিলেন গ্রহণীয়।
শেখ আবুল কাসেম মিঠুনের পড়ালেখা শুরু নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি রাড়–লি হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯৬৯ সালে দরগাহপুর হাইস্কুল থেকে তিনি এসএসসি পাস করে খুলনা সিটি কলেজে ভর্তি হন। পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
রক্তের ধারা অনুসারে ছোটকাল থেকেই তিনি মানবকল্যাণের স্বপ্ন দেখতেন। কিভাবে অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানো যায়, সেবা করা যায় তা নিয়ে ভাবতেন। তা ছাড়া কিশোর বয়স থেকেই তার লেখালেখির প্রতি ঝোঁক, প্রবণতা ছিল। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার নিয়েই তিনি একসময় এগিয়ে আসেন সাংবাদিকতায়। মূলত সাংবাদিকতা ছিল তাঁর পূর্ব পুরুষের ধারা। সেই ধারাকে অব্যাহত রাখার জন্যই তিনি কর্মক্ষেত্রের শুরুতেই প্রবেশ করেন সাংবাদিকতার অঙ্গনে। বলা যায় সাংবাদিকতা ছিল তার নেশা। একপর্যায়ে তা হয়ে দাঁড়ায় তার পেশা। তিনি জীবনের সর্বপর্যায়েই পেশার প্রতি ছিলেন অসম্ভব আন্তরিক। কোনো কাজকেই তিনি ছোট মনে করতেন না। তাই সাংবাদিকতা পেশাকেও তিনি কখনো হালকাভাবে নেননি। এই পেশার তাকিদে তাকে চলে আসতে হয় সাতক্ষীরার আশাশুনি থেকে খুলনায়। খুলনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক কালান্তর পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা ও লেখালেখি কাজ শুরু করেন শেখ আবুল কাসেম মিঠুন। নিজস্ব গতিতে চলতে থাকে তাঁর লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সব ধরনের কাজ। একসময় পত্রিকার সকল কাজই তাকে দেখাশোনা করতে হতো। তখন থেকেই তিনি একজন বড় সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। পেশার প্রতি আন্তরিক ও দায়িত্ববোধের কারণে নিজেকে একজন সফল সাংবাদিক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। সাংবাদিকতায় তিনি যথেষ্ট সফলতা লাভ করেছিলেন। সাংবাদিকতার পথ ধরেই তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন সামনে। দেশের একজন বড় সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন তিনি মনের মধ্যে সব সময় লালন করতেন। তার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। আন্তরিক হলে মানুষের প্রতি সবকিছুই করা সম্ভব। শেখ আবুল কাসেম মিঠুন ১৯৭৮ সাল থেকে খুলনার আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকা কালান্তরে কাজ করেছেন। এরপর কালান্তর ছেড়ে দিয়ে সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। তারপর দৈনিক আবর্তন পত্রিকার সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আরো বড় সাংবাদিক হওয়ার আশায় একসময় তিনি খুলনা ছেড়ে চলে আসেন ঢাকায়।
বাংলাসাহিত্যের অন্যতম কবি, কথাশিল্পী, সাংবাদিক মোশাররফ হোসেন খান তার সম্পর্কে লিখেছেন, ‘শেখ আবুল কাসেম মিঠুন ছিলেন ব্যক্তিগতভাবে যেমন নম্র, ভদ্র এবং সৎ মানুষ, তেমনি চেহারায়ও ছিলেন অনেকটা রাজপুত্রের মতো। যেমন স্বাস্থ্য তেমন উচ্চতা আর তেমনি ছিলো তাঁর চেহারার উজ্জ্বলতা। সব মিলে এক দশাসই সুন্দর ব্যক্তি ছিলেন তিনি। ঢাকায় এসে শেখ আবুল কাসেম মিঠুন বিনোদন সাংবাদিক হিসেবে এফডিসিতে সংবাদ সংগ্রহ করতে যান। সেই সময় তাঁর সুদর্শন চেহারা দেখে মুগ্ধ হন চিত্রপরিচালক হাফিজ উদ্দিন ও আলমগীর কুমকুম। তাঁদের আমন্ত্রণে শেষ পর্যন্ত অভিনয়ে প্রবেশ করেন শেখ আবুল কাসেম মিঠুন। শুরু হয় শেখ আবুল কাসেম মিঠুনের অন্য এক বিচিত্র জীবনপ্রবাহ।
সাংবাদিক থেকে নায়ক! সে কী কম কথা! তাও আবার রূপ কথার রূপালি পর্দার! ১৯৮০ সালে বজলুর রহমান পরিচালিত ‘তরুলতা’ নামক চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম অভিনয় করেন। এরপর তিনি অভিনয় করেন বহু সুপারহিট চলচ্চিত্রে। ১৯৮২ সালে শেখ নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘ঈদ মোবারক’ চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন। পরে ‘ভেজা চোখ’, ‘গৃহলক্ষ্মী’, ‘নরম-গরম’, ‘সারেন্ডার’, ‘নিঃস্বার্থ’, ‘বারা কেন চাকর’, ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’, ‘নিকাহ’, ‘গাড়িয়াল ভাই’, ‘রঙ্গিলা’, ‘ভাগ্যবতী’, ‘ধনবান’, ‘কুসুম কলি’, ‘অর্জন’, ‘ত্যাগ’, ‘বাদশাহ ভাই’, ‘জেলহাজত’, ‘ত্যাজ্যপুত্র’ ইত্যাদি।
শুধু অভিনয় নয়, অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি গানও লিখতেন। একজন ভালো গীতিকার হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। ‘তরুলতা’ নামক চলচ্চিত্রে তিনি গীতিকার হিসেবে গান রচনা করেন। তা ছাড়া তিনি খুলনায় থাকতেই খুলনা বেতারে নিয়মিত গীতিকার হিসেবে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেন।’ (সংস্কৃতির তিন নকীব, পৃ: ৪০)
‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ- সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-
করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।

যাদের গভীরে আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা,
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।’

আজ থেকে প্রায় পঁচাশি বছর আগে জীবনানন্দ দাস লিখেছেন এই অসম্ভব রকমের বাস্তব কবিতাটা। চারদিকে চোখ মেলে তাকালে দেখা যায় সত্যিই তো যারা আজ অন্ধ, চোখে দেখে না মোটেই তারাই আজ সবচেয়ে বেশি চোখে দেখছে। অন্ধদের একচোখা নীতি আজ পৃথিবীকে চষছে শাসন-ত্রাসনে। যাদের অভিধানে কোনো দয়ামায়া নেই, ভালোবাসা নেই, মানবাধিকারের লেশমাত্র নেই, তাদের ছাড়া পৃথিবী আজ অচল। অথচ একদিন যারা পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য করে তুলেছিল, বিশ্বকে মানবাধিকার শিখিয়ে ছিল, যুদ্ধের ময়দানেও যারা মানবিকতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে ছিল, তাদের দেহ আজ শেয়াল শকুনে ছিঁড়ে খুঁড়ে খুবলে খুবলে খাচ্ছে। আসলেই শয়তানি শক্তির দাপটে আজ সারা দুনিয়ার মানুষের বিবেক স্তব্ধ। শয়তান, দাগাবাজ, ক্ষমতাবাজদের উৎপীড়নে আজ মানবতা ভূলুণ্ঠিত। তাবৎ অপশক্তি অপকৌশলে আজ মুসলিম জনপদকে বানিয়েছে যুদ্ধক্ষেত্র। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে দুনিয়াতে যে যত মুসলিম নির্যাতন করতে পারবে, শান্তিতে নোবেল পাওয়ার সম্ভাবনা তার তত প্রবল হবে।
বর্তমান ঠাণ্ডাযুদ্ধের বাজারে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার ক্ষোভ রাশিয়ার ওপর, একইভাবে রাশিয়ার আক্রোশ আমেরিকার ওপর, অথচ একে অন্যের ওপর কখনো হামলা করে না তারা। তারা এবং তাদের মিত্রশক্তি উভয়ে হামলা করছে সিরিয়ায়, হত্যা করছে নিরীহ মুসলমানকে। যত কথায় বলুক, তারা কখনো হামলা করবে না মিয়ানমার, ইসরাইল, উত্তর কোরিয়া, চীন কিংবা ভারতে। কাশ্মিরে মানবাধিকারের চরম অবমাননাকর পরিস্থিতির পরেও তাদের কানে পানি ঢুকছে না ষাট বছর ধরে। অথচ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট অজুহাতে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাকসহ পৃথিবীর প্রায় ডজনখানেক মুসলিম দেশে। মানবিকতার বুলি তাদের একটা মুখোশ। মুখোশের আড়ালে মূলত পশ্চিমা বিশ্ব, ন্যাটো, রাশিয়া, আমেরিকা, চীন, ভারত মুসলমানদের হত্যাকারী ও সহযোগী। আইএস, দায়েস, তালেবান, জঙ্গি সবই তাদের সৃষ্টি। মুসলমানদের হত্যা করার জন্য তারা কৌশলে প্রতিপক্ষ তৈরি করে নিচ্ছে। তাদের প্রশিক্ষিত কিছু লোক মুসলমান নাম ধারণ করে এই অশুভ কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে। কিছু অশিক্ষিত নিডি মুসলমান টাকার লোভে তাদের ফাঁদে পা দিচ্ছে। মুসলিম বিদ্বেষী পরাশক্তি, তাদের দোসর এবং তাদের পাতানো ফাঁদে পা দেয়া কিছু কুলাঙ্গার মিলে শুধুমাত্র মুসলমানদেরই হত্যা করছে।
আমরা বলতে চাই, ‘Fight me logically with your pen, I can’t fight you physically against your strength.’ অর্থাৎ আমার সঙ্গে যুক্তিসঙ্গতভাবে লেখনীর যুদ্ধে এসো। আমি তোমার শক্তির বিরুদ্ধে শারীরিকভাবে যুদ্ধ করে পারব না।
আবুল কাসেম মিঠুন এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক লড়াই চালিয়ে গেছেন আমৃত্যু। তিনি অশুভ শক্তির মোকাবেলায় লিখেছেন, অভিনয় করেছেন, সংগঠন করেছেন। চিন্তা-চেতনায়, মগজে-মননে তিনি লড়ে গেছেন প্রাণপণ অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে।
আবুল কাসেম মিঠুনের সংস্কৃতির সকল অঙ্গনের প্রায় সবার সাথে মধুর সম্পর্ক ছিল। মিষ্টভাষী এই মধুর মানুষটি অতিসহজেই মানুষের মনের মাঝে জায়গা করে নিতে পারতেন। সেঁধিয়ে যেতে পারতেন একদম হৃদয়ের গভীরে। মানুষের সাথে কাজ করতে করতে তিনি মানুষের মনের অলিগলি খুব সহজেই চিনতে পারতেন। তার মধ্যে ছিল না কোনো প্রকার কৃত্রিমতা।
আবুল কাসেম মিঠুনের ব্যক্তিত্ব অনেক প্রকার গুণে পরিবেষ্টিত ছিল। তিনি ছিলেন নায়ক তথা বড় মাপের একজন অভিনেতা। ছিলেন গায়ক, গীতিকার, লেখক, সাংবাদিক। ছিলেন সুদক্ষ সংগঠক। ছিলেন মিষ্টভাষী একজন কথক। সর্বোপরি তিনি ছিলেন একজন বড় মনের মানুষ।
‘ইসলামী চলচ্চিত্র ও নাটক’ প্রসঙ্গে একটি প্রবন্ধে আবুল কাসেম মিঠুন লিখেছেন, ‘কোন বিষয়ে ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে চর্চা করলে সেই বিষয়টি যখন সাংস্কৃতিক বিষয় হয় তখন তা বিকৃত হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রে কোনোভাবেই আপস করা চলবে না। জাতে ওঠার নামে জাহেলিয়াতির চাকচিক্যতায় কোনোভাবেই নিজের চোখ ঝলসানো উচিত নয়। অথবা জাহেলিয়াতের কোন নামকরা লোককে কাছে এনে নিজেকে সম্মানিত করে তোলার মিথ্যা ভণ্ডামিতেও যেন নিজেকে নিমগ্ন না করি। রাসূল সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোন বিদায়াতপন্থী ব্যক্তিকে কোনো সম্মান ও মর্যাদা দান করে সে আসলে ইসলামেরই প্রাসাদ চূর্ণ করে দেবার কাজে সাহায্য করে।’ তাই জাহেলিয়াতের সিঁড়িতে পা রেখে নিজেকে ভাগ্যবানের বদলে গোনাহগার যে ভাবতে পারে সেই তো ইসলামের প্রাসাদ সুদৃঢ় করে। তাবুক যুদ্ধে হজরত কাযাব ইবনে মালিক রা.-এর মত। গাসসান বাদশা রেশমি কাপড়ে মোড়া চিঠিতে লিখেছিল, ‘তোমাদের মনিব তোমার ওপর জুলুম করছে, আমার কাছে চলে এসো, তোমাকে উপযুক্ত মর্যাদা দেবো।’ কাযাব রা. চিঠিখানি আগুনে পুড়িয়ে সিজদায় পড়ে গেলেন। ‘ইয়া আল্লাহ আমি কত বড় গোনাহগার, এ কত বড় মুসিবত যে আজ কাফেররা আমাকে সম্মান দেয়ার জন্য ডাকছে।’ আমরা জানি সূর্যের দিকে পিঠ ফিরিয়ে আমরা ছায়াকে অনুসরণ করি। কিন্তু বিষয়টা যদি এমন দৃষ্টিতে আমরা দেখি যে, আমরা ছায়াকে ধরতে চাচ্ছি কিন্তু সে পালিয়ে পালিয়ে আমাদেরকে তার পিছনে ছুটতে বাধ্য করছে। জাহেলিয়াতও তেমনি, একজন মুমিনের কাছে সে ছায়া সমতুল্য। জীবনপাত হয়ে যাবে, ছায়ার পিছনে দৌড়ানোর নেশা ফুরাবে না। তাই খাঁটি মুমিন জাহেলিয়াত নামক ছায়ার পিছনে দৌড়ায় না।’
তার এই বোধ ও উপলব্ধি কতটা স্বচ্ছ, কতটা নির্মোহ ছিল এই উদাহরণ থেকেই তা পরিষ্কার বুঝা যায়। আসলে একজন অতি প্রতিভাধরের পক্ষেই এটা সম্ভব।
আবুল কাসেম মিঠুন ছিলেন অনন্য সাধারণ এক প্রতিভা। তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ মানবতাবাদী সংস্কৃতিসেবী। তার ইন্তেকালে সংস্কৃতি অঙ্গনে এক বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি শুধু অভিনেতা, লেখক, সাংবাদিক, শিল্পী ও সংগঠক হিসেবেই বড় মাপের ছিলেন না, ব্যক্তি হিসেবেও ছিলেন অত্যন্ত উঁচুস্তরের। তার আজন্ম স্বপ্ন ছিল এদেশে আল্লাহপ্রদত্ত জীবনবিধান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবতার মুক্তি। বলা যায়, তিনি ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক সংস্কৃতিকর্মী।
লেখক: কবি ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply