শ্রমিক অধিকার ও বর্তমান প্রেক্ষাপট -মো: মনিরুজ্জামান

জীবিকার জন্য মানুষকে প্রতিনিয়ত কাজ করতে হয়। কেউ রোদে পুরে-বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে ফসল ফলায়, কেউ হাজার ফুট উঁচুতে উঠে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বড় বড় অট্টালিকা তৈরি করে আবার কেউ এসি রুমে বসে এইসব হতভাগা মানুষের ভাগ্য নিরূপণ করে। সবাই সবার কাজে সন্তুষ্ট; কিন্তু অসন্তুষ্টি তখন তৈরি হয় যখন মালিক ও শ্রমিক নামে শ্রেণি-বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। ইউরোপসহ সারা বিশ্বে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে শিল্পকারখানায় প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। কিন্তু শ্রমিকের প্রয়োজন সত্তে¡ও তাদের ছিল না কোনো অধিকার। তারা দৈনিক ১২-১৮ ঘণ্টা কাজ করতো বিনিময় পেত না ভালো মজুরি, ছিল না কাজের উন্নত পরিবেশ। শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে ছিল বিশাল ব্যবধান। এরপরও শ্রমিকরা চালিয়ে গেছে তাদের ন্যায্য অধিকারের আন্দোলন।
১৯৮৪ সালের ৭ই অক্টোবর প্রথমবারের মতো আমেরিকার ‘ফেডারেশন অব লেবার’ দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি তোলে। মালিকরা এ দাবি না মেনে শ্রমিকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ধীরে ধীরে ক্ষোভ জমতে থাকে শ্রমিকদের মনে। দৈনিক কাজের সময় ৮ ঘণ্টা নির্ধারণ, মজুরির পরিমাণ বৃদ্ধি ও কাজের উন্নত পরিবেশ তৈরি করাসহ শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১৮৮৬ সালের ১লা মে হে মার্কেটের শিল্পশ্রমিকরা ধর্মঘটের ডাক দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের সামনে একত্রিত হয় প্রায় ৩ লক্ষ শ্রমিক। বন্ধ হয়ে যায় সমস্ত কলকারখানা। শিকাগোর হে মার্কেটের সামনে বিশাল সমাবেশে মালিকপক্ষ ও পুলিশ একত্রিত হয়ে ঘিরে রাখে শ্রমিকদের। এ সময় তাদেরকে ঘিরে থাকা পুলিশের উপর অজ্ঞাতনামা কেউ বোমা নিক্ষেপ করলে পুলিশ শ্রকিদের ওপর গুলিবর্ষণ করতে শুরু করে। এতে প্রায় ১১ জন শ্রমিক-পুলিশ মারা যায়। এছাড়া শ্রমিক ধর্মঘট ডাকার অপরাধে শ্রমিক নেতা আগাস্ট স্পিজসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে এবং ১৯৮৭ সালে আগাস্ট স্পিজসহ ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করে।
এত অত্যাচারের পরেও শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন চলতে থাকে। মালিকরা বাধ্য হয়ে কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে শ্রমসময় ৮ ঘণ্টা নির্ধারণ করে। রক্তঝরা শ্রমিক আন্দোলনকে এক সফল ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে ৪ বছরের মাথায় এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ১৮৮৯ সালে শিকাগোর শ্রমিক আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও আন্তর্জাতিক সংহতি প্রকাশের জন্য ১লা মে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৮৯০ সাল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ১লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। পৃথিবীর প্রায় ৮০টি দেশে এ দিনটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়।
শ্রমিক আন্দোলনের এ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কারণে কাজের সময় দৈনিক ৮ ঘণ্টা নির্ধারিত হলেও মজুরি ও কাজের উন্নত পরিবেশ তৈরি হয়নি। প্রায় ১৫০ বছর আগের শ্রমিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও তৈরি আইন শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। এখনও রয়ে গেছে শ্রমিক ও মালিকের মাঝে বিশাল ব্যবধান। কলকারখানায় আগুন লেগে শেষ হয়ে যাচ্ছে হাজারও স্বপ্ন। ন্যায্য মজুরির জন্যে এখনও রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হচ্ছে শ্রমিকদের।
করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে বিস্তারের পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে যে প্রভাব ফেলেছে তা আমাদের জন্য খুবই উদ্বেগের বিষয়। দেশের শ্রমিক শ্রেণীর আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস গার্মেন্টস শিল্প। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৩ শতাংশ আসে গার্মেন্টস শিল্প থেকে। দেশে এই শিল্প টিকে আছে ইউরোপ এবং আমেরিকার বাজারের উপর নির্ভর করে। কিন্তু সেসব দেশে করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের ফলে বহু পশ্চিমা ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে তাদের অর্ডার বাতিল কিংবা স্থগিত করেছেন। এজন্য কারখানাগুলো তখনি বন্ধ হয়ে গেছে। আটকে গেছে শ্রমিকদের বেতন। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বা বিজিএমইএ-এর মতে এখন পর্যন্ত বিদেশী ক্রেতারা তিন বিলিয়ন ডলারের অর্ডার বাতিল করেছে যাতে প্রায় ২০ লাখের বেশি শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক প্রাইমার্ক-এর মতে ব্রিটেন, ইটালি, ফ্রান্স, স্পেন এবং অস্ট্রিয়াতে তাদের সব স্টোর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। শুধু ব্রিটেনজুড়ে তাদের প্রায় ২০০টি স্টোর রয়েছে। এছাড়া আরেকটি নামকরা ব্র্যান্ড ‘জারা’ বিশ্বজুড়ে তাদের প্রায় ৪০০০ স্টোর বন্ধ রেখেছে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে। আল্লাহ না করুন. করোনার কারণে সৃষ্ট এই সংকট ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে এক দুর্ভিক্ষের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সংকট যেভাবে গভীর থেকে গভীর হচ্ছে তা সামাল দেয়ার কোন চিন্তা-ভাবনা সরকারের কার্যকলাপে ফুটে উটছে না। দেশের জনগণের দ্বারা নির্বাচিত না হয়ে কোন অবৈধ সরকার যখন ক্ষমতায় থাকে তখন এমনটিই হয়। কারণ যুগে যুগে স্বৈরাচার শাসকরা নিজ দেশের জনগণ নিয়ে কখনো মাথা ঘামায় না; তারা শুধু নিজের গদিকে রক্ষা করার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই করে থাকে।
অথচ ১৫০০ বছর পূর্বে শ্রমিকের অধিকারের কথা বলা হয়েছে পবিত্র আল-কুরআনে। মানুষকে সমানভাবে কাজ করার জন্য পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনের সূরা বালাদে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি (আল্লাহ) মানুষকে সৃষ্টি করেছি পরিশ্রমী বা শ্রমজীবী করে।’
কাজের সময় ৮ ঘন্টা নির্ধারণ করে দিয়েছেন রাসূল (সা.)। তিনি দিনকে ৩ ভাগে ভাগ করে (৮+৮+৮=২৪) নেয়ার জন্য তালিম দিতেন। এর মধ্যে ১ ভাগ আল্লাহর ইবাদত এবং দীনের কাজের জন্য, এক ভাগ পরিবার-পরিজনের সাথে সময় দেয়ার জন্য এবং আরেক ভাগ ব্যক্তিগত কাজ ও নিজের শারীরিক সুস্থতার জন্য। (শামায়েলে তিরমিযী, পৃ-২২) অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল (সা.) একজন মানুষকে দিনের মধ্যে ৮ ঘণ্টা বাইরের কাজ (উপার্জন), ৮ ঘণ্টা পরিবার-পরিজনের সাথে সময় দান এবং বাকি ৮ ঘণ্টা আল্লাহর ইবাদাত বন্দেগি ও দ্বীনের কাজের জন্য।
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘তোমরা শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই শ্রমিকের মজুরি দিয়ে দাও। (ইবনে মাজাহ)
ইসলাম শ্রমিকের পূর্ণ মর্যাদা দিয়েছে। কাজের সময়, মজুরি এবং কাজের উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা ১৫০০ বছর পূর্বেই ইসলাম বলেছে।
লেখক : শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply