সমকালীন শিক্ষাসঙ্কট -আবুল কালাম আজাদ

[২য় কিস্তি ]

বিদেশী শিক্ষাব্যবস্থার অনুসরণ

আফ্রিকাতে ঘানার বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী এবং পণ্ডিত যিনি এক সময় ঘানার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, সেই ডক্টর ‘কুফি বুসিয়া’ আফ্রিকান দেশসমূহের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন- “বিদেশী শিক্ষাব্যবস্থা অনুসরণ করে স্বাধীন অবস্থায় আমরা অগ্রসর হই, তাহলে আমাদের সমূহ ক্ষতিই হবে। এই কারণে ক্ষতি হবে যে আমরা স্বাধীনতার তাৎপর্য অনুভব করতে পারবো না, এবং পূর্বতন শিক্ষাব্যবস্থার অনুসরণে আমরা জীবন নিয়ন্ত্রিত করতে পারবো। তার ফলে জীবনের যথার্থ পরিস্ফুটন ঘটবে না।” তিনি সে জন্য চেয়েছিলেন যে, আফ্রিকার জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে অর্থাৎ আফ্রিকার মানুষের প্রয়োজনের ভিত্তিতে তাদের ইচ্ছার ভিত্তিতে এবং তাদের ঐতিহ্যের ভিত্তিতে তাদের শিক্ষাব্যবস্থাগুলো গড়ে উঠুক। তিনি এজন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি সফল হতে পেরেছিলেন, এটা বলা যায় না। ‘কুফি বুসিয়া’র এই মন্তব্যটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিদেশীরা বিশেষ করে ইংরেজরা পৃথিবীর যে সমস্ত দেশ অধিকার করেছিলেন, সে সমস্ত দেশে তারা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে এবং শাসনতান্ত্রিক প্রয়োজনে নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। ভারতবর্ষেও তেমনি ব্রিটিশ আমলে ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল। সেখানে কতকগুলো প্রয়োজন ছিল।

একটি হচ্ছে প্রশাসনের জন্য কর্মচারী তৈরি করা, দ্বিতীয়ত হচ্ছে দেশের জন্য পুলিশ ব্যবস্থাকে একটি ধারায় গতিমান করার জন্য পুলিশি প্রশিক্ষণের একটি বিশেষ ব্যবস্থা করা। যেটি এ দেশে ছিল না। তেমনি আবার সাধারণভাবে কতকগুলো নৈতিক শিক্ষা এবং বিশ^াসের প্রতিফলন তারা তাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে আরোপ করেছিলেন। এভাবে স্কুল শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে ইংল্যান্ড ভারতের জন্য কি করেছে, সেই রকম একটা গ্রন্থ ছিল স্কুলের পাঠ্যসূচিতে। ব্রিটিশ ভারতে ইংরেজরা এ দেশের শিক্ষার ঘটিয়েছিল নিজেদের প্রয়োজনে। কেরানি ও অনুগত শ্রেণী তৈরির মানসে। তখন ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রণীত হল, যাবে এদেশের ছাত্ররা তাদের বিশ^াসে, চিন্তায়, বাস্তব কর্মকাণ্ডে ও চরিত্রে ব্রিটিশের ব্রেইন চাইল্ডে পরিণত হয়। মুসলমানদের সমর্থন লাভের আশায় মাদরাসার নামে যে ইসলামী শিক্ষা চালু হল, তার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মোল্লা-মৌলভী নামে কেবলমাত্র কিছু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, খুঁটিনাটি মাসায়ালা-মাসায়েল ও আরবী ব্যাকরণের ধাঁধা জানার সুযোগ লাভ করেছিল। মূলত নিজেদের শাসনের ভিত্তিমূল মজবুত করার লক্ষ্যে ইংরেজ এদেশে মাঝে-মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থার বিন্যাস করেছিল। এক্ষেত্রে তৎকালীন সময়ে ‘লর্ড ম্যাকলে’ তার চিন্তা ও ইংরেজদের উদ্দেশ্যে বলেন। ১৮৩৫ সালের শিক্ষা পরিকল্পনার প্রধান দিকনির্দেশনাকারী ‘লর্ড ম্যাকলে’ ঐ বছরের ফেব্রুয়ারিতে তার দেয়া পরামর্শের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নির্দেশনায় অংশবিশেষ উল্লেখ-
We must of present do our best to form a class who may be interpretes between us and the millions in blood and colour but English in teste in opinions in morals and in intellect
ভাবানুবাদ : “বর্তমানে আমাদেরকে অবশ্যই যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে যাতে এমন একটি গোষ্ঠী সৃষ্টি করা যায়, যারা আমাদের ও লক্ষ লক্ষ মানুষ যাদের আমরা শাসন করছি, তাদের মধ্যে দূতের কাজ করতে পারে। এরা এমন এক ধরনের মানুষ হবে যার রক্তে ও গায়ের রঙে হবে ভারতীয়, কিন্তু মেজাজ চিন্তা-ভাবনায় নৈতিকতায় ও বুদ্ধিবৃত্তিতে হবে ইংরেজ।”

ম্যাকলের এ মন্তব্য ও চিন্তা প্রসূতি পরবর্তীতে মুসলমানদের উপর বিদেশী শিক্ষার খড়গকৃপাণ শানিত হয়। এদেশের মানুষ অত্যন্ত সহজ সরল যার ফলে বাধ্যগতভাবে ইংরেজদের চাপানো শিক্ষা এমনভাবে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম অধ্যুষিত মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়া হলো। সাধারণ মানুষ নিজেদের কর্মসংস্থানের কারণে হোক বা কৌশলের শিকার হয়ে হোক, এক পর্যায়ে তারা ইংরেজদের দেয়া শিক্ষার ধারায় অভ্যস্ত হতে থাকে। এ ব্যাপারে সৈয়দ আলী আহসান বলেছেন, “পাকিস্তান আমলে কর্মসংস্থানগত শিক্ষাধারা প্রবর্তন করতে গিয়ে ধর্মহীন এক প্রকার শিক্ষাধারা গড়ে ওঠে এবং মূল শিক্ষার মধ্যে একটি নতুন সংযোজন হিসাবে এই শিক্ষাটা উপস্থিত হয়। এই শিক্ষাটা আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত নয়। লক্ষ্য করা প্রয়োজন যে, সে সময় একটি বিশেষ উদ্দেশ্য হচ্ছে আধুুনিক জগতে আধুনিক মানুষের সমতুল্য মানুুষ আমরা আমাদের দেশে তৈরি করবো। সুতরাং ইউরোপের আধুনিক শিক্ষা বিজ্ঞানের সঙ্গে আমাদের দেশের শিক্ষাকে সমন্বিত করে গড়ে তুলতে হবে। তার ফলে বিদেশী ধারাক্রম এখানে এসে উপস্থিত হয় আরও প্রবল পরিমাণে। অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে যে বিদেশী শিক্ষার ধারণা আমাদের ছিল, এই শিক্ষায় একটু নতুন করে নতুন পটভূমিতে নতুন প্রয়োজন সিদ্ধ করার জন্য ব্যবহৃত হতে লাগলো। পাকিস্তান আমলে একটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। শিক্ষা কমিশনের মধ্যেই শিক্ষার ভিত্তি হিসেবে কোন আদর্শের কথা বলা হয়নি।

এভাবে ইংরেজ-পরবর্তী উপমহাদেশে শিক্ষা নিয়ে হাজারো রকমের ধারা বারবার বিবর্তন হয়েছে। শিক্ষা উন্নয়নের নামে রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং নিজেদের বিতর্কিত আদর্শ বারবার সংযোজন করা হয়েছে। কিন্তু সময়ের গতিধারায় তেমন কোনো নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন ও যুগ উপযোগী শিক্ষার নীতিগত স্বাক্ষর রাখা সম্ভব হয়নি। যেমন সরকার আসে সরকার যায়, নতুন নতুন শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে, জারি করার প্রচেষ্টাও হয়েছে। তবে সৃষ্ট শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবি দীর্ঘদিনের। ১৯৫৭, ৩রা জানুয়ারি প্রাদেশিক সরকার কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা সংস্কার কমিটি গঠিত হয়। সম্ভবত প্রথম ১৯৫২ সালের পূর্ববঙ্গ শিক্ষা কমিটি নামে একটি কমিশন গঠিত হয়েছিল। এরপর আইয়ুব শাসন আমল থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৫৯ সাল থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে মোট চারটি বহুল আলোচিত শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছিল। যা ১৯৫৯ সালের এস এস শরিফ কমিশন, ১৯৬৩ সালের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি (ড. সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন) শিক্ষা কমিশন, ১৯৬৪ সালের এয়ার মার্শাল নুর খান শিক্ষা কমিশন নামে পরিচিত। বাংলাদেশ আমলে ১৯৭২ সালে গঠিত হয় ‘কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন’। ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর শিক্ষামন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ একটি শিক্ষা উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন। ১৯৮২ সালের সামরিক শাসনের পর ১৯৮৩ সালে শিক্ষামন্ত্রী ড. আবদুল মজিদের নেতৃত্বেও আরো একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। এ মফিজ উদ্দিন আহমদ শিক্ষা কমিশন ১৯৮৭, সামছুল হক শিক্ষা কমিশন ১৯৯৭, এম.এ বারি শিক্ষা কমিশন ২০০১, মো. মনিরুজ্জামান শিক্ষা কমিশন ২০০৩, কবির চৌধুরী শিক্ষা কমিশন ২০০৯, সর্বশেষ নাহিদ শিক্ষা কমিশন ২০১০। শিক্ষা কমিশন তাদের প্রাপ্ত দায়িত্ব কর্তব্য বিভিন্ন সময় সম্পাদন করেছেন ঠিকই কিন্তু দেশ-জাতি ও আমাদের মেধাবী তরুণদের মেধা বিকাশ কি সেভাবে হয়েছে! এ কথাটি সাংঘাতিক রকম প্রশ্নবিদ্ধ। বলাবাহুল্য এ কথাটি বলা দরকার যে, কমিশন সাধারণত হয় দেশের ক্ষমতাসীন সরকারের মতাদর্শ ও মর্জির উপর। অথচ শিক্ষা হলো স্বতন্ত্র বোধের উন্মেষ। তাহলে বিষয়টি আপেক্ষিক ও সাংঘর্ষিক। কারণ আজ ও শিক্ষা কমিশনের সদস্যরা স্বাচ্ছন্দ্যে বলতে পারেননি যে তাদের উপর অর্পিত কাজ সত্যিকারে শিক্ষার আদলে সময়ের অনিবার্য ভাবনায় যথাযথভাবে আঞ্জাম দেওয়া হয়েছে।

বস্তুতপক্ষে ইংরেজ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান সর্বশেষ বাংলার যে কয়টি শিক্ষা কমিশন ঐতিহাসিকভাবে কাজ করেছে। তাদের উপরে যখনই দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, তারা নিজেরা কিছু চিন্তা না করে, দেশের পারিপাশির্^ক অবস্থা না বুঝে বিদেশ যাওয়া ও বাইরের দেশের শিক্ষাপদ্ধতি সিলেবাস কারিকুলাম নিয়ে টানাটানি করার মতো অবস্থা প্রতীয়মান হয়েছে। বলা দরকার যে বর্তমান যে জেনারেল বা স্কুল পর্যায়ে যে শিক্ষাপদ্ধতি অব্যাহত আছে, তার সবটাই বিদেশী নীতি ও কারিকুলাম এবং পরীক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। বলা যায় সৃজনশীল পদ্ধতি ও জি.পি.এ ইত্যাদি। আগে ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়া করে, জেনে বুঝে শিখে পরীক্ষায় অংশ নিতো। বর্তমান কিন্তু সে নিয়মনীতি না থাকায়, স্কুল পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীরা অর্জন করে না। পাসের জন্য যতটুকু দরকার অর্জন করে। সৃজনশীল পর্যায়ে তেমন অধ্যায় প্রয়োজনও হয় না। বিধায় অধ্যয়ন যখনই কম হবে, তখন শিক্ষণও শূন্য হয়ে যায়। বিধায় অর্জন যা মৌলিক শিক্ষা থেকে কোমলমতি ছাত্ররা একদম দূরে চলে যায়। এখন জিপিএ ৫ পেয়েছে কিনা দেখা হয় কিন্তু আসলে কি আমাদের শিক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছে কিনা দেখা হয়; কিন্তু আসলে কি আমাদের শিক্ষায় জিপিএ ৫ দরকার না মৌলিক জ্ঞান অর্জন দরকার? ব্যাপারটি লক্ষ্য করা দরকার। এখন আর আগের মতো পরীক্ষা হয় না। যে পরিমাণ ছেলে-মেয়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, কিন্তু সে ভাবেতো বিশ^বিদ্যালয়ে ভালো করতে পারছে না। বর্তমান স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষায়, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে যে সিলেবাস কারিকুলামে রয়েছে, তা কোনটিই পরিপূর্ণ নয়। এদেশের সামাজিক, ভৌগোলিক জাতি আদর্শে নির্বিশেষে সিলেবাস যথাযথ নয়। এর মূল কারণ হল শিক্ষা কমিশনের সদস্যরা কোনোদিন আপামর জনতার কাছে যাননি। দেশের অবস্থা, দেশের ধর্মীয় অবস্থান, মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার বিষয়ে তারা কারণ ও চিন্তা করতে পারেনি। এদেশের মানুষের কর্মমুখী শিক্ষার কথা শিক্ষাবিদগণ ভাবেননি। যার ফলে বিদেশী অনুসৃত এ শিক্ষাপদ্ধতি কোনো পাস ও ফেলের কথা ভাবে, কিন্তু দেশ জাতির অনাগত দিনের ব্যাপারে একদম ভাবা হয় না। যার ফলে শুধুই বেশি পাস দেখায়। জি.পি.এ ৫ দেখা যায়, কিন্তু অন্তঃসারশূন্যই মেলে বাস্তবে।

এ ব্যাপারে অধ্যাপক সৈয়দ আলি আহসান তার ‘শিক্ষার আদর্শ’ প্রবন্ধে বলেছেন, “যখনই কোনো শিক্ষা কমিশন হয়েছে, দেখা গেছে শিক্ষা কমিশনের সদস্যরা বিদেশে যাওয়ার জন্য আগ্রহী ব্যাকুল হয়ে যান। একজন জাপানে যান, একজন রাশিয়া যান; এবং পাঁচ-পনেরো দিন থেকে এসে তারা শিক্ষাব্যবস্থার একটা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু এ কথাও কখনো শুনিনি যে শিক্ষা কমিশনের সদস্যরা গ্রামের ভেতর গিয়ে গ্রামের মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরেছেন, তাদের পরিকল্পিত অবস্থার কথা জিজ্ঞাসা করেছেন, তারা কিভাবে গড়ে উঠেছেন সেটা চিন্তা করেছেন, তা তো করেননি চীন দেশে যে ব্যবস্থা রয়েছে, সে শিক্ষাব্যবস্থা তাদের শিক্ষাব্যবস্থা মানসিকতার সাথে নিগড়ভাবে যুক্ত। সে শিক্ষাব্যবস্থা এককভাবে চীনদেশের জন্য। সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতান্ত্রিক দেশ, তাদের শিক্ষাব্যবস্থাটা তাদের যে শ্রেণি চৈতন্য, সেই শ্রেণি চৈতন্যের সাথে সম্পর্কিত হয়ে গড়ে উঠেছে। সুতরাং এই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ঠিক আমাদের বিশ^াসের। আমাদের জীবন যাপনে আমাদের ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করেনি। এই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি আমাদের দেশের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

আসলে শিক্ষাব্যবস্থা নতুনভাবে সাজাতে যে শিক্ষা কমিশন যুগে যুগে হয়েছে, সৈয়দ আলী আহসান তার চিন্তা ও মন্তব্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। স্বাধীনতা-উত্তর যে সব কমিশন কাজ করেছে তা একান্ত রাজনৈতিক। শিক্ষার মাঝে যদি রাজনৈতিক নোংরা চিন্তার প্রভাব থাকে, তখন আর শিক্ষার মান থাকে না। যেমন প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক কবির চৌধুরীর নেতৃত্বে ১৮ সদস্যের কমিটি এই শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন। এরপর ২০১১ সালের জুনের দিকে এ সরকার শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে আহবান করে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির অধীনে দেশে কয়েকটি উপ-কমিটি করা হয়েছিল, সেগুলো তখন কার্যকর হয়নি। আর শিক্ষানীতি ফাইলটি বস্তুত ফাইলবন্দি। কি ছিল শিক্ষানীতিতে। কথা ছিল ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রাথমিক শিক্ষাকে ৮ম শ্রেণিতে উন্নীত করার পদক্ষেপ নেয়া হবে, এবং ২০১৮ সালের মধ্যে তা বাস্তবায়িত করা হবে। বলা হয়েছিল চার বছরের ¯œাতক সম্মানকে সমাপনী ডিগ্রি হিসেবে ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষকতা ও গবেষণা ছাড়া সব কর্মক্ষেত্রে যোগদানের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। এমন আরো অনেক উদাহরণ থেকে পরিষ্কার যে শিক্ষানীতি সেই অর্থে বাস্তবায়ন হয়নি। শিক্ষানীতিতে নেই অথচ ৫ম ও ৮ম শ্রেণি শেষে দুটি সমাপনী পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে।

শিক্ষানীতি প্রণয়নের এক দশকেও একটি শিক্ষা আইন করতে পারেনি মন্ত্রণালয়। কেবলই খসড়া হয়, আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে আবার স্তিমিত হয়ে যায়। এভাবে ৭-৮ বছর পেরিয়ে গেল। প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনে অনেক বিষয় থাকলেও বারবার সামনে চলে আসে কোচিং সেন্টার ও মোটা গাইড বা ইংরেজি মাধ্যম স্কুল।
শিক্ষানীতি ছাড়াই চলছে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষার্থীরা ক্লাস করেছে, পরীক্ষা দিয়েছে, ফল প্রকাশ হয়েছে। শ্রেণিকক্ষের অনেকটাই কেটেছে কোচিং সেন্টারে, নোট গাইড বইয়ে। নিবন্ধ ছাড়াই চলছে নানা কিসিমের বিদ্যালয়। এভাবে খেয়াল খুশি মতো শিক্ষাব্যবস্থা চলতে পারে না।
এদিকে সবার বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের জন্য ২০১০ সালের আইনটি সংশোধন করতে বিশ^বিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের কাজী শহিদুল্লাহকে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করেছে। ১ মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এসব লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পাদিত স্থায়ী কমিটির নেতৃত্বে একটি উপকমিটি এবং ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান আর ম্যানেজারের নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি কাজ শুরু করেছিল। প্রায় ৪ বছর আবার শোনা গেল বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় আইন সংশোধিত হবে। বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়-এর নিজস্ব ক্যাম্পাসে ব্যাপারটি ঐ রকম। শুধু হবে, হচ্ছে আর কমিটি গঠন পর্যন্তই। শিক্ষানীতি নিয়ে অনেক বিতর্ক ও আপেক্ষিক গতি তাদের। নিজস্ব চিন্তা- চেতনা, ভূমিকা নেই। অনুসরণ অনুকরণ আর অন্যের প্রতি লালসার মাত্রা খুব বেশি। যার ফলে শিক্ষার ক্ষেত্রে কোন নীতিগত ধারা না থাকার প্রতি নিয়ত মান কমছে শিক্ষার। যার ফলে মেধা মননের বিকাশ হচ্ছে না। সর্বোপরি নোংরা রাজনীতির কালো ছায়া প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আমাদের কর্মরত শিক্ষাবিদদের এ ব্যাপারে সকল পর্যায় সমষ্টিতে এগিয়ে আসতে হবে।

সমকালীন সাধারণ সঙ্কট

শিক্ষক নিয়োগ ও পরিবেশ : দেশে শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনা আরেক আপেক্ষিক সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ সামাজিক নোংরা ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতার আশীর্বাদ নিয়ে টাকার অংক হাটবিক্রির মতো ডাকা হয়, কে কত লাখ দিতে পারবে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সে ব্যক্তি কতটুকু যোগ্য, বা আদৌ পড়াতে পারবে কিনা সে ব্যাপারে কারো কোন চিন্তা ভাবনা থাকে না। থাকে সবচেয়ে বেশি টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও স্থানীয় নেতার পছন্দের ব্যক্তিকে নেয়া হল কিনা। অর্থাৎ যোগ্যতার ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন থাকে না। শুধু দলীয় কিনা এবং বেশি টাকার খামটা দিতে পারছে কিনা। এটাই হল বর্তমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমবেশি সংস্কৃতি বা অপসংস্কৃতি রূপে দেখা দিয়েছে। যার ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভালো শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে না। ফলে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একসময় শিক্ষার পরিবেশ ও মারাত্মক খারাপের দিকে যায়। এ ধরনের অবস্থা সারাদেশে সাধারণ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা সমভাবে ক্যানসারের ন্যায় রোগ বিস্তার করেছে। অর্থের মাধ্যমে যারা নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তারা নিশ্চয়ই অযোগ্য। আর অযোগ্যদের স্থান সবচেয়ে খারাপ জায়গায়। যখন মানুষ যোগ্যতার পরিচয়ে ব্যর্থ হন, তখন শুরু হয় দুর্নীতি ও মিথ্যার জাল ফেলানো। এ ধরনের কালচার কোনোদিন সুফল বয়ে আনে না।

বিজ্ঞান ও ইংরেজি শিক্ষার বেহালদশা : শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়ার যে নোংরা কালচার আমাদের সমাজ তথ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিরাজমান রয়েছে, তাতে এটাই প্রমাণিত হয় যে, কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান, গণিত ও ইংরেজি শিক্ষক বাস্তবে নেই। যারা এ সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক হয়, তারা তো আর ভালো পড়ানোর মতো শিক্ষক হতে পারে না। বিশেষ করে মফস্বল শহর বা গ্রামের কোন স্কুল বা মাদ্রাসার বিজ্ঞান-গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে ভাল শিক্ষক আশা করা যায় না। দিন দিন অত্যন্ত মৌলিক বিষয়ের ভালো শিক্ষক কমে যাচ্ছে এরপর নিয়োগও হচ্ছে টাকা পয়সার বিনিময়ে অযোগ্যদের। এমনও দেখা গেছে ইংরেজিতে শুধুই পাস করেছে, যদি বলা হয় ইংরেজিতে চাকরির দরখাস্ত করতে, তাহলে তো কলম ভাঙার মতো ব্যাপার হয়ে যায়। বর্তমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন দুর্দশা দুর্দিন যদি থাকে, তাহলে অনাগত দিনে শিক্ষার মান কোথায় গিয়ে থামবে বলা কঠিন। এ জন্য এখনই সময় এ ব্যাপারে প্রতিকার ও প্রতিরোধ করা এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া।

নোট গাইড ও কোচিং কালচার : নোটবই নিষিদ্ধ করে আইনত করা হয়েছিল করা হয়েছিল ১৯৮০ সালে। আসলে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্য বইয়ের নোট মুদ্রণ, ছাপা, বাঁধাই, প্রকাশনা, আমদানি বিতরণ ও বিক্রয় নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রথম থেকেই আইনটি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। মাঝে মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) আইনটির কথা মনে করিয়ে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি দেয়। এ বছর আগে এ ধরনের একটি বিজ্ঞপ্তির পরিপ্রেক্ষিতেই প্রকাশকেরা আশ্রয় নেয়। পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীরা একাধিক বই পড়লে তো আরও শিখতে পারার কথা। কিন্তু নোট বা গাইড নামের এসব প্রশ্ন ও উত্তর লেখা থাকে। ছাত্রছাত্রীরা তা মুখস্থ করে। তাই কেবলমাত্র শিশু-কিশোরদের যথার্থভাবে বিকাশ হয় না। তাছাড়া নোট গাইড মান ও পেশা দরকার থাকে না। কোন বয়সের শিশুকে কতটা জটিল শব্দ বা বাক্য শেখানো যাবে এসব বইয়ে সেই ক্রমবিন্যাস অনুসরণ করা হয়না। তাই কোমলমতি শিশুদের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে সবচেয়ে বেশি। নোট ও গাইডের ওপর এই নির্ভরশীলতা সাম্প্রতিক চিত্র নয়।
এ কথা জানিয়ে শিক্ষাবিদ আব্দুল্লাহ আবু সায়িদ বলেছেন, “মূলত শিক্ষাব্যবস্থাটাই এজন্য দায়ী। মুখস্থ নির্ভরতার কারণেই নোট গাইডের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। কেননা ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকেরা পাস এর নিশ্চয়তা চান। মেধার বিকাশের চেয়ে ফলাফলটি তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
শুধু ছাত্রছাত্রীদেরই নয়। অনেক শিক্ষক ও গাইডের ওপর নির্ভরশীল হতে দেখা দেখা যায়। এক বিষয়ের শিক্ষক অন্য বিষয় পড়াতে গিয়ে অনেকেই এ সহায়তা নেন। ভয়ানক দিকটি হল অনেক শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের নির্দিষ্ট প্রকাশনীর নোট গাইড পরামর্শ দেন। নোট গাইড ও কোচিং এ ছাত্রছাত্রীরা হয়তো ভালো নম্বর বাড়াতে পারে, কিন্তু বাস্তবে শেখা বা ব্যবহারিকে হাতপাকা করা অথবা মৌলিকভাবে অর্জন করার পরিবর্তে হতাশাই বেশি দেখা যায়। কোচিং বাণিজ্যে শিক্ষার্থীরা একটু ধারণা নিয়ে নিতে পারে। তবে কোচিং এর শিক্ষাটা গতানুগতিক অর্জন নয়। বরং পাসের ব্যাপারে অন্তত নিশ্চিত হওয়া যায়। বিশেষ কয়েকটি দিক কোচিং এ পাওয়া যায়। যা কোন সচেতন, বিবেকবান ও শিক্ষিত ব্যক্তি কামনা করে না।
ষ কোচিংয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক পরীক্ষার প্রশ্ন আগেই দিতে পারেন।
ষ পরীক্ষার খাতায় আশাতীত পর্যাপ্ত নম্বর পাওয়া যায়।
ষ পরীক্ষার উপযোগী যথার্থ সাজেশন পাওয়া যায়।
ষ নির্দিষ্ট ভাবে একজন ছাত্রের চাওয়া পাওয়া সব বিষয়ই কোচিং দিতে পারেন।
মূল কথা কিছু শেখা যায়, এবং অনৈতিকভাবে শিক্ষার বিভিন্ন শিক্ষার বিভিন্ন সোপান পার হওয়ার অবৈধ পথ জেনে নেওয়া যায়। তবে কিছু কিছু কোচিং আছে, তারা প্রকৃত অর্থে ভালো কিছু মৌলিক শিখার সুযোগ ও প্রচেষ্টা করে তাতে সন্দেহ নেই। পাশাপাশি নোট গাইড সহযোগী হতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ের মত এত নির্ভরশীলতা থাকা ঠিক নয়।

অনিয়মই যেখানে নিয়ম

মাধ্যমিক শিক্ষার আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে ২০০৫ সালের মধ্যভাগে প্রচলিত বিভিন্ন ধারার মাধ্যমিক শিক্ষা বিলুপ্ত করে ২০০৬ সাল থেকে নবম শ্রেণিতে কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত হয়। তখন দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাগুলোতে যেসব সঙ্কট ছিল সেসব সমস্যা এখনো রয়ে গিয়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষা ও ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষা প্রশাসনের প্রশাসন ক্যাডার ও সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রাধান্য রয়েছে। শিক্ষায় নিয়োগ, বদলি, নতুন পদ্ধতির প্রবর্তন, বিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত বিদেশে প্রশিক্ষণ ও সেমিনারে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা আমলাতন্ত্রের মারপ্যাঁচ ছিনিয়ে নেয়া থেকে শুরু করে সর্বত্রই দুই ক্যাডারের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার দাপটে চলে। এর দ্বারা রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রশাসনের বড় পদে চাকরি করা শিক্ষা ও প্রশাসন ক্যাডারের কয়েকজন কর্মকর্তা বর্তমান প্রকল্প নির্ভর মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার অনেকটাই এখন দাতা সংস্থার ঋণ ও ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী পরিচালিত হয়। বর্তমান বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা পরিচালনা, শিক্ষক নিবন্ধন, পরীক্ষা, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, শিক্ষার্থী ভর্তি, বিদ্যালয় পরিদর্শন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ছুটি পদোন্নতি, শাস্তি ও পুরস্কার, অবসর সুবিধা হিসেবে এককালীন কিছু টাকা প্রদান, সর্বক্ষেত্রে রয়েছে অনিয়ম। আর এসবের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর উপর। সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতি আর অনিয়মে ভরা।

২০০১ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুক মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক অধিদপ্তরের বিকেন্দ্রীকরণ সংক্রান্ত এক আলোচনা সভায় বলেছিলেন “দুর্নীতি আর অনিয়মের একটা বাক্স আছে। শিক্ষা অধিদপ্তর ছয় বিভাগে বিকেন্দ্রীকরণ করা হলে দুর্নীতির বক্স আরো ছয়টি বাড়বে কিনা, এটা বড় প্রশ্ন।” প্রথম পাঁচ বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা ঐ মন্ত্রী মনে করেন কর্মকর্তাদের সততা, দেশপ্রেম, নৈতিকতাই দুর্নীতি কমানোর উপায়।
বর্তমান সরকার প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি ২০০৯ এ মাধ্যমিকের জন্য বেশ কিছু ভালো সুপারিশ করেছে। ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত যতগুলো শিক্ষা কমিশন বা কমিটি কাজ করেছে, সব কমিটির প্রতিবেদন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে মৌলিক সিদ্ধান্তগুলো ছিল কাছাকাছি। অভিজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদদের মতে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা আরো স্বচ্ছ, আধুনিক, সর্বোপরি দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। ঢেলে সাজাতে হবে শিক্ষা প্রশাসনকে। রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও পাঠ্যবই তৈরির অপচেষ্টা থেকে শিক্ষার এই স্তরটি রক্ষা করতে হবে। এ ছাড়া জোড়াতালি দিয়ে প্রকল্প চালু এবং বিদেশিদের চাপিয়ে দেয় ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেয়া বন্ধ করে সর্বাঙ্গে ক্ষত সৃষ্টি হওয়া শিক্ষা প্রশাসনকে বাঁচাতে হবে।

করোনাকালে পিছিয়ে পড়া শিক্ষা

বৈশি^ক মহামারী করোনার থাবায় তছনছ হয়ে দেশের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, ও বিশ^বিদ্যালয় সম্পূর্ণ বন্ধ। জুমের মাধ্যমে ক্লাস শুধুই ফরমালিটিস। এছাড়া কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের গতি প্রকৃতি ধরে রাখার ব্যাপারে তেমন কোন উদ্যোগ সবাই নিতে পারেনি। কখন কোন সিদ্ধান্ত হয়, বা কোনটি আমাদের সন্তানদের জন্য মঙ্গল হবে সে ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তেমন কোনো বাস্তব নির্দেশনা এখনো আসেনি। পরীক্ষা নেয়া, না নেয়ার ব্যাপারে বারবার তারিখ পরিবর্তন, আর পরীক্ষা আদৌ হবে কিনা, সেই সিদ্ধান্তই দিতে সময় লাগল অনেক। একদিকে যেমন করোনা, তারপর প্রকৃতির উপর আম্পানের সয়লাব এরপর আবার বন্যার পানিতে সব ভাসিয়ে নিয়ে গেল। মানুষের আশ্রয়স্থল রইল না। আর শিক্ষার এ দুর্দশার ব্যাপারে ক্ষমতাসীন সরকার অথবা দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সম্প্রতি তেমন কোনো গরজ দেখা যাচ্ছে না। করোনার আঘাত ও বন্যার সয়লাব কোন স্কুল কলেজ বিশ^বিদ্যালয় যেন যুগ যুগ ধরে বন্ধ রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অধ্যাপক ‘ক্রিস হুইটি’ বিবিসিকে বলেছেন, “শিশু স্কুলে গেলে যতটা ক্ষতির মুখে পড়বে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হবে স্কুলে না গিয়ে বাড়িতে থাকলে।” তিনি বলেন “যুক্তরাজ্য ও বিশে^র অন্যান্য দেশের তথ্যপ্রমাণ বলছে শিশুরা সাধারণত গুরুতর অসুস্থ হয় না এবং কোভিডের উপসর্গ দেখা গেলে বড়জোর হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে হয়েছে।”

যাহোক আমাদের দেশের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে প্রথম থেকে সবকিছুই কমবেশি অব্যাহত থাকলো কিন্তু শুধু শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ অচল। যার বাস্তব পরিণতি আমরা পাচ্ছি।
তবে একথা ভাবা দরকার যে মিল কারখানায় কাজ না হলেও দেখা যায় এবং তার ক্ষতি পরিমাপ করা যায়। ফসলের মাঠ পানিতে তলিয়ে গেলে কৃষকের ক্ষতিটা চোখে পড়ে। দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে শিশু-কিশোরদের যে অপূরণীয় ক্ষতি, তা চোখে দেখা যায় না। আজ যারা প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে তাদের ভেতর থেকেই মেধাবীরা ১৫-১৬ বছর পর শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, রাজনীতিবিদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা হবে তাদের ভিত্তি যদি দুর্বল থাকে, জাতির ভিত্তি শক্ত হতে পারবে না।

শিক্ষাক্ষেত্রে গত এক দশকে যেসব খামখেয়ালিমূলক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, তাতে খুব বড় রকমের ক্ষতি হয়েছে শিক্ষার্থীদের। বিদ্যাশিক্ষার চেয়ে পরীক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া হয়। অথচ পরীক্ষা কাকে বলে, সে যে সম্পর্কে কর্তাদের বিশেষ ধারণা আছে, সে পরিচয় পাওয়া যায়নি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে পরীক্ষা গ্রহণ অপরিহার্য, শিক্ষা ও পরীক্ষা-সম্পর্ক নিয়ে এবং কিভাবে পরীক্ষা গ্রহণ করা উচিত সে সম্পর্কে প্রথম গবেষণা করেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ‘স্যার ফিলিপ জে হার্টগ’। ত্রিশের দশকে তিনি বাংলাদেশসহ সারা ভারতবর্ষ ঘুরে ছাত্র-শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে যে গবেষণাপত্র তৈরি করেন, তা সব কমনওয়েলথ দেশে উচ্চ প্রশংসনীয় হয়েছিল।

করোনার কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করছে ইউনেস্কো। সম্প্রতি এক পলিসি ব্রিফের মাধ্যমে সংস্থাটি জানিয়েছে করোনার কারণে বাংলাদেশে ৩ কোটি ৯৯ লাখ ৩৬ হাজার ৮৪৩ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত। এ ছাড়া ২ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থী ঝরে পড়তে পারে বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে। (বণিক বার্তা, ২৪ আগস্ট)
এছাড়া সারাদেশে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ^বিদ্যালয়ের কয়েক লক্ষ শিক্ষক কর্মকর্তা অবহেলিত ও মানবেতর জীবনযাপন করছে। এসব ছাত্রছাত্রী নির্ভর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকগণ পেশা পরিবর্তনসহ নানান সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। বিশেষ করে বেসরকারি পলিটেকনিক ও প্রাইভেট বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মকর্তাদের ব্যাপারে ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষ থেকে নীতিবাচক কোনো সহযোগিতার সাড়া মেলেনি। যার ফলে আশাহত হয়ে মেধাবী শিক্ষক কর্মকর্তাদের একটি অংশ পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছে।
দেশের এই ক্রান্তিকালে শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নীতিগতভাবে পাশে দাঁড়ানো দরকার। সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার ব্যাপারে যৌথ চিন্তার সমন্বয় করে আগামী দিনের জন্য যথার্থ ভূমিকা ও যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া সময়ের অনিবার্য দাবি।

লেখক : কলেজ অধ্যক্ষ, গবেষক ও প্রবন্ধকার

SHARE

Leave a Reply