সমকালীন শিক্ষাসঙ্কট -আবুল কালাম আজাদ

[১ম কিস্তি]

শিক্ষা হচ্ছে এমন একটি সামাজিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে জাতির ভবিষ্যৎ নাগরিকদের গড়ে তোলা হয়। এর মাধ্যমেই জাতির মূল্যবোধ ও জ্ঞানভাণ্ডার যুবশক্তির মধ্যে সঞ্চারিত হয়। শিক্ষাই ভরসা সমাজকে জীবন সংগ্রামে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মোকাবেলা করার জন্য তৈরি করে। শিক্ষা তাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি, আচার আচরণ পরিচালিত ও পরিমার্জিত করে এবং সামাজিক জীবনে ভূমিকা পালনের জন্য প্রস্তুত করে। বস্তুত শিক্ষাব্যবস্থা একটি জাতির আশা-আকাক্সক্ষা রূপায়ণের ও ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণের হাতিয়ার। শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য মূলত সুন্দর সুখী সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা, নৈতিক ধর্মীয় ও আত্মিক মূল্যবোধ সৃষ্টি, মানবীয় গুণাবলি সাধন করা এবং চরিত্রবান ও আদর্শ মানুষ তৈরি। আদর্শ মানুষ তৈরির পূর্বশর্ত আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা। একটি শিক্ষাব্যবস্থা তখনই শুধু আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা বলে বিবেচিত হতে পারে, যখন ঐ ব্যবস্থায় শিক্ষা লাভ করে একজন শিক্ষার্থীও ঈমান হবে সুদৃঢ়, চরিত্র হবে সুন্দর, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তার ধারণা হবে স্বচ্ছ, ব্যক্তি সত্তার বিকাশের পথ হবে উন্মুক্ত, সমাজের দায় দায়িত্বের অনুভূতি হবে তীব্র এবং আপন দায়িত্ব পালনের বিষয়ে পরকালে জবাবদিহিতার ভয় থাকবে অন্তরে সদা জাগ্রত, আপন সত্তা, ঐতিহ্য ও ইতিহাস সম্পর্কে থাকবে সচেতন এবং সর্বোপরি নিজের অর্জিত জ্ঞান ও লঘু অভিজ্ঞতার ফসল পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়ার অনুপ্রেরণা হবে সর্বদা বিচলিত। যে শিক্ষাব্যবস্থায় এর এক বা একাধিক দিক অপূর্ণ থাকবে, তা নিঃসন্দেহে তত অপূর্ণাঙ্গ ও অকল্যাণকর বলে চিহ্নিত হবে।

একটি আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হওয়া উচিত তা হলো লক্ষ্যেও সুস্পষ্টতা। আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে কোন আদর্শে অনুপ্রাণিত করতে চায়, কোন চিন্তা চেতনায় সমৃদ্ধ করার ইচ্ছা এবং দেশ ও জাতির জন্য কেন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন নাগরিক তৈরি করা প্রয়োজন সে সব বিষয় সামনে রেখে তার অবকাঠামো তৈরি হওয়া উচিত। সেহেতু শিক্ষা হচ্ছে লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার মাধ্যম। আদর্শ শিক্ষা এমন একটি ব্যবস্থার নাম, যা তরুণ সমাজকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর প্রতিনিধি বা আল্লাহর খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালনে, দুনিয়ার সাফল্য ও কল্যাণ এবং আখিরাতের মুক্তিপথ ও জবাবদিহির অনুভূতির এবং চেতনা সঞ্চারিত করে। আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা এমন একটি সামগ্রিক ও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা যা মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং আধ্যাত্মিকতা থেকে মানুষের পার্থিব জীবনকে আলাদা করে দেখে না। এ শিক্ষাব্যবস্থা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার নাম, যা কৃষ্টি-সংস্কৃতি মূল্যবোধ শিক্ষা দেয়ার সাথে সাথে আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তি এবং কারিগরি প্রশিক্ষণে সর্বোত্তম শ্রেণীর লোক তৈরিতে সক্ষম হন। সেই সাথে জাতি গঠন ও সমাজ বিনির্মাণেও কার্যকর ভূমিকা পালনে সমর্থ একদল যোগ্যতাসম্পন্ন লোক উপহার দিতে পারে। আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বোচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন একদল চরিত্রবান নিবেদিতপ্রাণ কর্মী গড়ে তুলতে সক্ষম। এ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই মানুষের প্রতিভা বিকাশ ও কাক্সিক্ষত নেতৃত্ব সৃষ্টি সম্ভব।

এ কথা অনস্বীকার্য যে গোটা মুসলিম বিশ^ শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক ত্রুটির কারণে মুসলিম সমাজ আজ এক দারুণ সঙ্কটের মধ্যে নিমজ্জিত। ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হলেও একটি স্বাধীন জাতির ইতিহাস ও মর্যাদা নিয়ে টিকে থাকার উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা আদৌ আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি। জোড়া তালি দেয়া এক অভিনব শিক্ষাপদ্ধতি আজ আমাদের ওপর চেপে আছে। আমাদের দেশে বর্তমানে যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে, তা পাশ্চাত্য শিক্ষা ও কিছুটা ধর্মীয় শিক্ষার অসামঞ্জস্যপূর্ণ মিশ্রণছাড়া আর কিছুই নয়। ফলে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা জাতির বস্তুগত ও নৈতিক উভয়বিধ চাহিদা প্রেরণে আজ চরমভাবে ব্যর্থ। বস্তুত যারা ইসলামী মূল্যমান ও মূল্যবোধে শ্রদ্ধা করেন এবং ভবিষ্যৎ বংশধর গণকে দুনিয়া ও আখিরাতে সফল দেখতে চান, তারা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার কোনটাকেই আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা বলে স্বীকার করতে পারে না। যারা মাদ্রাসায় শিক্ষা লাভ করেন; তারা কুরআন, হাদিস, ফিকাহ ইত্যাদি অধ্যয়ন করেন বটে কিন্তু আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সুযোগ যথাযথভাবে পাচ্ছে না। ফলে মানবজীবনের বিভিন্ন দিক বিকাশে বিভিন্ন দিক ও বিভাগে যত ধরনের সমস্যা আছে, তার আধুনিক রূপ ও গতি প্রকৃতি সম্পর্কে তারা কোন ধারণাই লাভ করেন না। ফলে মানব সমাজের ও মানব জীবনের সকল সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের সা. হাদিসে দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার কোনো দৃষ্টিভঙ্গিই তারা লাভ করতে পারে না। দেশে বর্তমান প্রচলিত ৪টি শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে।
ষ সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা
ষ মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা (সাধারণ)
ষ মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা (কওমি)
ষ কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা

বাস্তবিক পক্ষে বর্তমান প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার কোনোটিই তার অবস্থান থেকে পূর্ণাঙ্গতা লাভ করতে পারেনি। সাধারণ শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা পাশাপাশি একই জায়গাতে পাঠদানের সুযোগ থাকলেও তার সফলতা আশানুরূপ আসছে না। অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা এখন দু’ধরনের- আধুনিক ও কওমি। এখানেও মারাত্মক সমস্যা রয়েছে, এখানে হাদীস, কুরআন অধ্যয়ন করলেও আদর্শিক দ্বন্দ্ব ও পূর্ণাঙ্গ ধারণার বিরাট অভাব। কারিগরি শিক্ষায় কারিগরি কাজ উল্লেখ থাকলেও সিলেবাসে ও পাঠ্যক্রম কারিগরির বিভিন্ন বিষয়ে সংযোজন করলেও আধুনিক বিশে^ কারিগরি বলতে যা বোঝায়, সে অর্থে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা অনেক পিছিয়ে। একদিকে যেমন সিলেবাস, কারিকুলাম ও পাঠ্যক্রম ত্রুটি, অন্যদিকে আদর্শিক সঙ্কট তার চেয়ে বেশি। মূল্যবোধে আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থার প্রক্রিয়া না থাকলে মূলত কোন দিক দিয়ে শিক্ষার মূল্যায়ন ও বিকাশ সম্ভব নয়।
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলাদেশে তিন ধরনের সমস্যা প্রতীয়মান হচ্ছে। যেমন-
ষ প্রচলিত আদর্শিক সঙ্কট
ষ বিদেশী শিক্ষাব্যবস্থার অনুসরণ
ষ সমকালীন সাধারণ সঙ্কট

প্রচলিত আদর্শিক সঙ্কট
আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সঙ্কট তার আদর্শহীনতা ও ধর্মবিমুখতা। শিক্ষাব্যবস্থার দুটো ধারা সামনে আনা দরকার।
এক. নৈতিক নির্দেশনা সম্পন্ন শিক্ষা
দুই. নৈতিক নির্দেশনাহীন শিক্ষা
বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থা দ্বিতীয় ধারার অনুসারী। আমাদের সঙ্কট এখানেই। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ধর্ম ও নৈতিকতাহীন একটি কারখানায় পরিণত হয়েছে। ফলে শিক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হিদায়াত তথা আল্লাহকে পাওয়ার সঠিক পথের অনুসন্ধান লাভ এ কথাকে সত্য বলে ধরে নিলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় মানসিকভাবে আল্লাহর পথ থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এ শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষা ও ডিগ্রিপ্রাপ্ত মানুষ এক ধরনের অহংবোধ ও আত্মপ্রসাদে তৃপ্ত হতে থাকে যা তাকে ¯্রষ্টার প্রতি বিনয়ী হতে দেয় না, বরং এ ব্যাপারে উদাসীন করে তোলে।

প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় দ্বিতীয় সঙ্কট
এটি ধর্ম ও বিজ্ঞানকে পরস্পরের দুশমন হিসেবে পেশ করেছে। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত হয়ে বোঝার কোনো সুযোগ নেই। যে রসায়ন শাস্ত্রেও জনক জাবির ইবনে হাইয়ান, আল জেবরার জনক আল জাবির চিকিৎসাশাস্ত্রের পথিকৃৎ ইবনে সিনা, কিংবা আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম রচয়িতা ইবনে খালদুন ইসলামের সুমহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই জ্ঞান বিজ্ঞানের এসব শাখায় অতুলনীয় অবদান রাখতে সক্ষম হন।

প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় তৃতীয় সঙ্কট
শিক্ষার্থীদেরকে মানুষ ও সৃষ্টি জগতের সঠিক পরিচয় থেকে বঞ্চিত রাখা। মানুষ প্রথম থেকেই যে আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা হিসেবে দুনিয়াতে এসেছে এ শিক্ষা না দিয়ে এই ব্যবস্থায় শেখানো হয়। মানুষ একটি বিবর্তনের ফল। অন্য কোন প্রাণী হিসেবে তার পূর্ব পুরুষ দুনিয়াতে এসেছিল। একসময় তার লেজ ছিল, পরবর্তীতে আস্তে আস্তে সে মানুষে পরিণত হয়েছে। এই যদি হয় মানুষের ইতিহাস, তখন স্বাভাবিক ভাবেই মানুষ মানবিকতা ও উন্নত গুণাবলী সিক্ত মানুষের ব্যক্তি ও সামষ্টিক জীবনের ভিত্তি হয়ে পড়ে দুর্বল। মানব সৃষ্টির সম্পূর্ণ বিষয়টি হয়ে পড়ে অর্থহীন। অনুরূপ ভাবে পারলৌকিক জীবনের গুরুত্ব মানব জীবনের জবাবদিহিমূলক অবস্থান ও ¯্রষ্টার কাছে ফিরে যাওয়ার চিন্তা ইত্যাদি সম্পর্কে কোনো ধারণাই এই শিক্ষাব্যবস্থা দেয় না। বরং জীবনের সৃষ্টি স্থিতি ও ধ্বংস সবকিছু ইহলৌকিক জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে মানব সৃষ্টির মাহাত্ম্যকে ছোট করে দেয়। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কোন নৈতিক বন্ধন মানুষকে শেখায় না, বরং অনৈতিকতার বল্গাহীন শিক্ষার দ্রুতগামী ঘোড়ার সওয়ার করে দেয়। গল্প বদলে একটি শিশুকে শেখানো হয় কি করে দাওয়াত দিয়ে লুকিয়ে থেকে প্রতারণা করতে হয়, সুদ ব্যবসার মতো অঙ্কের মাধ্যমে শোষণের হাতিয়ার সুদের প্রতি আকৃষ্ট করা হয় কিশোর মনকে। লাভ-ক্ষতির অংকের নামে দেয়া হয় ভেজাল দেয়ার তালিম। এভাবেই এদেশ ও জাতির জন্য উপযুক্ত লোক তৈরির পরিবর্তে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করে একদল ভোগবাদী, স্বার্থপর ও অবিবেচক লোক যা কিনা সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্কটময় অবস্থার চিত্র।

ধর্মনিরপেক্ষ ধর্মবিদ্বেষ ও ধর্মহীনতা বর্তমানে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে জঘন্য সঙ্কট। মূলত যেখানে ধর্ম উপেক্ষিত সেখানে সকল মহৎচিন্তা, সৎচিন্তা, সৎকর্ম, কল্যাণকামিতা ও কল্যাণধারা অনুপস্থিত। ধর্মবোধ তথা স্রষ্টার প্রতি আনুগত্যই মানুষকে দায়িত্ববোধ সম্পন্ন কর্তব্যনিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণ এবং সৎকর্মশীল ও বিনয়ী হতে শেখায়। পারিপাশির্^ক সকল দিক ও আন্তরিকতার সাথে বিবেচনা করতে। আমাদের এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকা দরকার, যা সকল শ্রেণি ও বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য সার্বিকভাবে কল্যাণকর হয়, এবং সেখান থেকে আমরা দেশ ও জাতিকে উপহার দিতে পারি ইসলামী জ্ঞানবিশারদ, আলিম, অভিজ্ঞ ফকিহ, সুদক্ষ মুহাদ্দিস, কুরআন বিশারদ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, খোদাভীরু ন্যায়বিচারক, দক্ষ প্রশাসক, আদর্শ শিক্ষাবিদ ও প্রশাসনিক ময়দানের জন্য চত্রিবান ও সুদক্ষ নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন জ্ঞানশক্তি, কুরআন হাদিসের আলোকে জ্ঞানপরিপূর্ণ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি।

আমরা বিশ^াস করি যে, যেহেতু ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান, তাই মানব জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে ইসলামের প্রভাব কার্যকরী নয়। মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং শিক্ষা ও সভ্যতা ও সংস্কৃতির সকল ক্ষেত্রে ও দিকে ইসলামের বিশেষ দিকনির্দেশনা রয়েছে। আর তা মেনে চলার মধ্যেই একটি মুসলিম জাতির সার্বিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এটি একটি সৌভাগ্যের বিষয় যে আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাটি চরিত্রগত ইসলামী। আমাদের বিশ^াস, ব্যবস্থাটিকে প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনের মাধ্যমে বিভিন্ন ময়দানে যথাযোগ্য লোক তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে আদর্শ ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা রূপে রূপদানের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে, যা অদূর ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থার মর্যাদা লাভ করতে পারে।
প্রফেসর মুহাম্মদ কুতুব তার ‘The Concept of Islamic Education’ বক্তব্যে এই মূল কথাটিকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন- “শিক্ষার ক্ষেত্রে ইসলামের কাজ হল পরিপূর্ণ মানবসত্তাকে সালাম করা, গড়ে তোলা এমন একটি লালন কর্মসূচি যা মানুষের দেহ তার বুদ্ধিবৃত্তি এবং আত্মা তার বস্তুগত ও আত্মিক জীবনের প্রতিটি কার্যকলাপের কোন একটিকেও পরিত্যাগ করে না আর একটির প্রতি অবহেলা ও প্রদর্শন করে না।”

মাওলানা মওদূদী তার সুদীর্ঘ লেখনীতে বলেছেন- “শিক্ষার ইসলামী আদর্শ মানুষের আত্মিক, ইসলামিক ও পারজাগতিক জীবনের সকল দিকের ভারসাম্য বিধানকারী শক্তি। ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে প্রণীত শিক্ষা মানুষের দৈহিক, আত্মিক, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্কের মধ্যে, মানুষের বস্তুতাত্ত্বিক ও অবস্তুতাত্ত্বিক বিষয়ের মধ্যে মানুষের চহিদা ও আয়ের মধ্যে মানুষের বাস্তব ও কাল্পনিক জীবনের মধ্যে দৃশ্য বাস্তবতা ও অদৃশ্য বাস্তবতার মধ্যে রাজনৈতিক এবং সামাজিক এবং নৈতিক অবস্থাসমূহের মধ্যে এবং জীবনের সাথে সম্পর্কিত অন্যসব বিষয়ের মধ্যে সমতা বিধানকারী শক্তি হিসেবে কাজ করে থাকে এই ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গঠনের জন্য আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, মানুষের খিলাফত এবং পরকালীন জবাবদিহির মৌল নীতিকে সামনে রেখে ইসলাম আমাদেরকে শিক্ষার যে আদর্শিক ভিত্তি দান করে তাকে আমরা তিন ভাগে তুলে ধরতে পারি।

এক. শিক্ষাব্যবস্থায় মানুষের সঠিক ও স্বাভাবিক পরিচয় স্থান পাবে। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের মনে শুরু থেকেই এ কথাটি বদ্ধমূল করে দিতে হবে যে, এই দুনিয়াটা আল্লাহর সা¤্রাজ্য এবং তারই কুদরত ও শক্তিমত্তার বহিঃপ্রকাশ। এখানে মানব জাতি আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োজিত। এখানে মানুষের কাছে যা কিছু আছে, তা সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে। একদিন মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে। অতএব মহাপরাক্রান্ত আল্লাহর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধীনে তারই আদেশ ও নিষেধ মোতাবেক সকলকে জীবন পরিচালনা করতে হবে।

দুই. শিক্ষাব্যবস্থা দ্বীন ও দুনিয়ার উভয় প্রয়োজন পূরণ করবে। এই নীতির ভিত্তিতে প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ধর্মীয় জীবন ও দুনিয়াবি জীবনের মধ্যে গড়ে তোলা সব পার্থক্যের অবসান ঘটাতে হবে। ধর্ম ও দুনিয়াদারীর পার্থক্য একটা খ্রিষ্টানি সংস্কার। বৌদ্ধধর্ম, হিন্দুধর্ম এবং যোগী-ঋষীদের ধর্মমতেও এই কুসংস্কার পরিলক্ষিত হয়। ইসলামের ধারণা বিশ^াস এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা একই সাথে ধর্মীয় ও দুনিয়াবি একই সাথে দুই-ই চাওয়া চাই। এই শিক্ষা গ্রহণ করে মানুষ দুনিয়াকে বুঝবে, দুনিয়ার জ্ঞান-বিজ্ঞানে দক্ষ হবে এবং দুনিয়ার কায় কারবার চালানের যোগ্য হবে। এই সাথে তারা দুনিয়াকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকেই বুঝবে এবং ইসলামী বিধান অনুসারে দুনিয়ার যাবতীয় কাজকর্ম সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে।

তিন. শিক্ষা ক্ষেত্রে চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব গঠন পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। শুধুমাত্র বই পুস্তক পড়ানো এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান শেখার মধ্য দিয়ে জাতির লক্ষ্য অর্জিত হবে না। আমাদের শিক্ষার্থীরা ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, বৈজ্ঞানিক, সামরিক এবং বেসামরিক কর্মকর্তা হওয়ার সাথে সাথে তাদেরকে ইসলামী চরিত্র, ইসলামী চিন্তা পদ্ধতি এবং ইসলামী মানসিকতায় গড়ে উঠতে হবে। যে ব্যক্তির ইসলামী চরিত্র নেই, সে আর যাই হোক, জাতির জন্য কোনো কাজের নয়।
আদর্শিক এই তিনটি মৌল ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাই হবে পূর্ণাঙ্গ। এই শিক্ষাই দেহ, মন, জগৎ, জীবন এবং ইহকাল, পরকালের সাথে সংশ্লিষ্ট সর্বদিকের প্রয়োজন পূরণে সক্ষম।”
(লাখনৌর এক ছাত্র সমাবেশে ১৯৪১ মাওলানা মওদূদীর ভাষণ। শিক্ষাব্যবস্থা : ইসলামী দৃষ্টিকোণ)
অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান তার ‘শিক্ষার আদর্শ’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছেন, “একটি ইংরেজ শিশু যখন বড় হয়, সে কিন্তু তার ধর্মীয় শিক্ষা ধরেই উদ্বুদ্ধ হয়। সে বাইবেলের সঙ্গে ক্রমশ পরিচিত হয়, বাইবেলের গল্প-কাহিনীর সাথে পরিচিত হয় এবং খিষ্টান ধর্মের বিভিন্ন সংগ্রাম, ইতিহাস, ঘটনার সঙ্গে পরিচিত হয়। অর্থাৎ ইংল্যান্ডের একটি ছেলে মূলত খ্রিষ্টান হিসেবে গড়ে ওঠে। খ্রিষ্টান হিসেবে গড়ে ওঠে তার অর্থ ধর্মান্ধ হয়ে গড়ে ওঠে না, বরং তার উপলব্ধির মধ্যে ধর্মীয় একটা চেতনা সব সময় কাজ করে। কিন্তু আমাদের সেই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে সে ধর্মীয় চিন্তা চেতনাকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হল।”
অধ্যাপক মুহাম্মদ কুতুব তার ‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মের ভূমিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছেন, “ইসলাম ফিরাউনী, গ্রিক, রোমান, ব্যবিলনীয় ও অ্যাসিরীয় সভ্যতার মতো প্রাচীন সভ্যতাকে জাহেলিয়াত বা অজ্ঞতা বলে বিবেচনা করে। ইসলামের দৃষ্টিতে রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাহাবিদের সময়কালেই বিশ^ সভ্যতার ইতিহাসে সর্বোত্তম যুগ। অন্যদিকে বিরাট বস্তুগত সভ্যতা এবং ব্যাপক বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সত্ত্বেও বর্তমান যুগের জাহেলিয়াতের অন্ধকারাচ্ছন্নতার তুলনায় পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অধঃপতন এখন ভয়াবহ আকারে সর্বত্র সর্বনাশের যে কালো ছায়া বিস্তার করেছে, অতীতে আর কখনো তা ঘটেনি।” তিনি আরও বলেন, “শিক্ষাই শুধুমাত্র মানুষের বস্তুগত সাফল্য বিবেচনা করলেই চলবে না। বস্তুগত সাফল্য তো প্রকৃত সাফল্যের ভিত্তি রূপে কাজ করে মাত্র। এক্ষেত্রে বিচারের প্রধান মাপকাঠি হলো, বস্তুগত সাফল্য আল্লাহর নির্দেশের ভিত্তিতেই অর্জিত কিনা। ঈমান দ্বারা ও অবিশ^াসী নির্বিশেষে যে কেউ পৃথিবীতে বস্তুতান্ত্রিক সভ্যতা গড়ে তুলতে সক্ষম। কিন্তু দুইয়ের মাঝে পার্থক্য হল, ঈমানদার বান্দাই সভ্যতাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের কাজে ব্যবহার করে। অপরদিকে অবিশ^াসীরা তা ব্যবহার করে শয়তানের নিকটবর্তী হওয়ার উদ্দেশ্যে। আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের দিকটি উপেক্ষা করা হয়।”
প্রফেসর মুহাম্মদ কুতুব আরও বলেন, “ইসলামী শিক্ষা মানুষকে আপতন সূত্র ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি সম্পর্কে অন্ধ করে দেয় না। বরং ইসলামী শিক্ষা এ সম্পর্কে পুঙ্খানুপঙ্খ অধ্যয়ন করে এবং এই সূত্রের যিনি ¯্রষ্টা সেই আল্লাহর দিকেই মানুষকে চালিত করে। আল্লাহর সৃজনশীল ক্ষমতা সম্পর্কে যতই আমরা অধ্যয়ন করবো, ততই আমাদের মন তারই দিকে ধাবিত হবে। আল্লাহর ভাষায় এটাই সত্য: “প্রকৃত কথা এই যে আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানসম্পন্ন লোকেরাই তাকে ভয় করে।” (সূরা ফাতির : ২৮)
আমরা আমাদের শিক্ষা কারিকুলাম ও শিক্ষাদান পদ্ধতি ধর্মীয় চেতনার উজ্জীবন ও বিকাশের কাজে যদি নিয়োজিত করতে পারি, আর আমাদের ইসলামী আদর্শের মতো মজবুত ভিত্তির উপর স্থাপন করি, তাহলে ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠায় আমরা সফলতা অর্জন করব এবং তা আমাদের সার্বিক জীবনের জন্য আনবে বিরাট, সীমাহীন সাফল্য, সা¤্রাজ্যবাদ অধিকাংশে মুসলিম দেশের স্কুল শিক্ষার কারিকুলামে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির অনুসরণের পথ রুদ্ধ করেছে। সে অবস্থায় থেকে আমাদের নিজেদের ব্যবস্থার মধ্যে প্রত্যাবর্তন এবং আমাদের নিজস্ব আধ্যাত্মিক সত্তার পরিচয় উদঘাটনের এখনই চূড়ান্ত এবং উপযুক্ত সময়।
এ ব্যাপারে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ একটি সুন্দর কথা বলেছিলেন, “যে কুরআন মাজিদের সূরা আল ফাতিহা ভালোভাবে পাঠ করবে, সে খ্রিষ্টান হোক, মুসলিম হোক, বৌদ্ধ হোক, জৈন হোক অথবা যে কোন ধর্মাবলম্বী সে ন্যায়বান, আদর্শবান, প্রভাবান, যথার্থ কুশলী মানুষ হতে বাধ্য। তার কারণ এই সূরা আল-ফাতেহার মধ্যে সকল বিশ^াসের অন্তঃসার আছে। সৎ পথে যাবার জন্য প্রার্থনা আছে, অসৎ পথগামী যারা, তাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাবার আকাক্সক্ষা আছে এবং বিশ^াসের অনুকূলে সত্যকে আবিষ্কার করার একটা প্রবল আকাক্সক্ষা বিদ্যমান।” তিনি আরও বলেছেন, এভাবে পৃথিবীর সকল মানুষের জন্যে সূরা আল ফাতিহা হচ্ছে একটি আদর্শ ভাষণ। এর ভিত্তি করেই সাহিত্য ও শিক্ষাকে নির্মাণ করতে হবে। অর্থাৎ সাহিত্যের মূল আদর্শ হবে ন্যায় পথে চলা। শিক্ষার মূল আদর্শ হবে মানুষকে ন্যায়ের পথে প্ররোচিত করা, অন্যায় পথ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে নিয়ে আসা এবং পৃথিবীতে যারা অধঃগামী, যারা অন্যায় পথচারী তাদের সাহচর্য থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে আসা। যারা ন্যায়পরায়ণ, সদাচারী তাদের সঙ্গে মানুষকে একত্রিত করা, এটাই হচ্ছে বিশ^াসের ভিত্তি।
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্ত)
লেখক : কলেজ অধ্যক্ষ, গবেষক ও প্রবন্ধকার

SHARE

Leave a Reply