সমস্ত অপকর্মের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়তে হবে -ডা. শফিকুর রহমান

[বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলন ও রাজনীতিতে এক অনন্য নাম ডা. শফিকুর রহমান। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় আমিরের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি পেশাগত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সততা, যোগ্যতা, মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। পেশাগত জীবনে তিনি একজন চিকিৎসক ও সমাজসেবক। তিনি ১৯৫৮ সালের ৩১ অক্টোবর মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মো. আবরু মিয়া ও মাতা খাতিবুন নেছার ৪ সন্তানের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ১৯৭৪ সালে স্থানীয় বরামচল উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাসের পর ১৯৭৬ সালে সিলেটের এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৮৩ সালে সিলেট মেডিক্যাল কলেজ (বর্তমান এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ) থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রাবস্থায় জাসদ ছাত্রলীগের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন এবং ১৯৭৩ সালে ছাত্রলীগে যোগদান করেন। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠিত হলে ঐ বছরই তিনি শিবিরে যোগদান করেন। সিলেট মেডিক্যালে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি উক্ত মেডিক্যালের ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও পরবর্তীতে সিলেট শাখার সভাপতি হন। ১৯৮৪ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করে তিনি সিলেটের আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ সালে কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০১১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর প্রথমে ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল পরবর্তীতে ২০১৬ সালে সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৬ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত হয়ে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর জামায়াতে ইসলামীর রুকনগণের (সদস্য) প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে আমির নির্বাচিত হন এবং ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর ২০২০-২০২২ কার্যকালের জন্য তিনি আমিরে জামায়াত হিসেবে শপথ নেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অবস্থা ও দেশের বর্তমান-ভবিষ্যৎ পর্যালোচনার জন্য মাসিক প্রেরণা তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। প্রেরণা পাঠকদের উদ্দেশে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হলো।]

ছাত্রসংবাদ : আসসালামু আলাইকুম- মুহতারাম আমিরে জামায়াত, আপনি কেমন আছেন?
ডা. শফিকুর রহমান : ওয়াআলাইকুমুস সালাম। আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর রহমতে ভালোই আছি।

ছাত্রসংবাদ : আপনি সম্মতি দিলে ছাত্রসমাজের মুখপত্র মাসিক ছাত্রসংবাদ (বাংলাদেশের আপামর জনতার এক প্রিয় ম্যাগাজিন) আপনার কাছে কিছু প্রশ্ন রাখতে চায়।

ডা. শফিকুর রহমান : আলহামদুলিল্লাহ- আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করছি যে, তোমরা আমার সাক্ষাৎকার নেয়ার প্রয়োজন অনুভব করেছো। প্রেরণা পরিবারকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তোমাদের প্রশ্নগুলো রাখতে পারো।

ছাত্রসংবাদ : বর্তমান বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির জন্য জনগণের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে, এই ধরনের পরিস্থিতিকে আপনি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন?

ডা. শফিকুর রহমান : দেশবাসীর সামনে এখন একটি কঠিন সময় এসে দাঁড়িয়েছে। সত্যিকারার্থে দেশবাসী একটি সঙ্কটকাল অতিক্রম করছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সীমিত আয়ের মানুষদের জন্য এখন এতটাই অস্বস্তির সৃষ্টি করেছে যে, আমরা যদি মাঝে মধ্যে টিসিবির গাড়িগুলোর দিকে লক্ষ করি সেখানে দেখবো যে- লোকজন শুধু লাইনে এসে দাঁড়াচ্ছেনই না; তারা সামান্য একটু খাবার পয়সা দিয়ে কেনার জন্য কাড়াকাড়ি এবং ধস্তাধস্তি করছেন। তাদের যদি খোলাবাজার থেকে এই সমস্ত পণ্য কেনার সামর্থ্য থাকতো তাহলে সম্ভ্রান্ত এই মানুষগুলো কখনো এইভাবে লাইনে এসে দাঁড়াতেন না। আজকে মানুষের জন্য পরিস্থিতিটা একটা কঠিন অবস্থায় চলে গেছে। আফসোসের বিষয় যে, ক্ষমতায় যারা আছেন; তারা বৈধভাবে নেই বলে আপামর জনতার এই কষ্টটা বুঝার মতো একটা হৃদয়ও তাদের নাই। তাদের এই অনুভূতি নেই যে, মানুষগুলো কেমন কষ্টে আছে। মাঝে মাঝে তাদের বক্তব্য-বিবৃতি মানুষজনকে নিয়ে উপহাস করার শামিল। তাদের কোনো এক মন্ত্রী একদিন বলেই ফেললেন যে, আসলেই আমরা অসহায়; আমাদের কিছু করার নাই। তো আপনি যদি অসহায় হয়ে থাকেন তাহলে এই মন্ত্রণালয়ে আছেন কেন? তাহলে তো আপনার এখান থেকে পদত্যাগ করে সরে যাওয়া উচিত। যে পারবে সে চালাবে এই মন্ত্রণালয়। আপনার সরকারই যদি এতোটা অসহায় তো আপনাদের দরকারই বা কি এদেশের জনগণের জন্য? এটা তো সরকারেরই দায়িত্ব যে, সরকার একটা দেশের জনগণের মৌলিক চাহিদাগুলো নিশ্চিত করবে। এর মাঝে খাদ্যদ্রব্য পণ্যের চাহিদা তো সবার আগে; বেঁচে থাকলে অন্যান্য অধিকার। এটা নিয়ে তো জনগণ আসলে জটিল ও করুণ অবস্থায় আছে। আর একজন বলে ফেললেন, ‘মানুষের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে তাই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি হয়েছে- এটা নিয়ে জনগণ চিন্তিত না।’ এটা মানবতার প্রতি একটি উপহাস, উদাসীনতা। কার্যত এগুলো তাদের ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি নয়। বরঞ্চ কলাকৌশল করে বাজারের একটি অবৈধ সিন্ডিকেটকে বৈধতা দেয়া। তাদের এই বক্তব্যগুলো সিন্ডিকেটদের উৎসাহিত করে যে- ‘সরকার তো তাহলে আমাদের বিরুদ্ধে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করবে না।’ এর মধ্যে জনগণ যদি ধরে নেয়, এ সমস্ত অবৈধ দুষ্ট সিন্ডিকেটের সাথে সরকারের যারা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল আছেন তারা সরাসরি জড়িত- তাহলে এটা মোটেও ভুল হবে না। তারা জড়িত না থাকলে অবশ্যই সরকার ব্যবস্থা নিতো। কিন্তু তারা সেই ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জনগণের সামনে কোনো প্রমাণ নেই। তারা জনগণকে নিয়ে উপহাস করছে- অবশ্য এ কথাও ঠিক যে, সরকার জনগণের দ্বারা নির্বাচিত নয় এবং জনগণের ভোটের তোয়াক্কা করে না; পরোয়া করে না। সেই জনগণের কাছে সরকারের কোনো দায়বদ্ধতা থাকার কথা না। এই পরিস্থিতিকে শুধু আমরা বেদনাদায়কভাবে দেখছি না। আমরা রাস্তায় নেমে সঙ্গত অবস্থান থেকে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করেছি। আমরা প্রতিবাদ অব্যাহত রাখব। প্রতিবাদের আলোকে জনগণকে স্বস্তি দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। আর সরকার দিতে পারলে ভালো, যদি না দিতে পারে তাহলে জনগণ তাদের বিচার করবে। আমরা জনগণকে সাথে নিয়ে জনগণের বৈধ দাবির পক্ষে অবস্থান নিয়েছি। আমাদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে।

ছাত্রসংবাদ : বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি অ্যালকোহল নীতিমালা-২০২২ এর গেজেট প্রকাশ করেছে। সমাজে এর কেমন প্রভাব পড়বে বলে আপনি মনে করছেন?

ডা. শফিকুর রহমান : আমাদের প্রিয় এই দেশটিতে ৯০ শতাংশ মুসলিমের বসবাস। এখানে অসংখ্য মসজিদ মাদরাসা রয়েছে, আলেম-ওলামা আছেন, ধর্মপ্রাণ মুসলমান বসবাস করছে। বড় দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে- এমনি সমাজ এখন মাদকের যন্ত্রণায় জর্জরিত। এমতাবস্থায় সরকার প্রকাশ্যে নীতিমালা ঘোষণা করে দিয়েছে যে, বয়স ২১ বছর হলে অ্যালকোহল খাওয়া অপরাধ না। ১০০ জন যদি কোথাও মাদকসেবী থাকে তাহলে মদের লাইসেন্স দেওয়া যাবে। কার্যত মদকে ওপেন করে দেয়া হয়েছে। অথচ আল্লাহ তায়ালা মাদক সেবনকারীদের ওপর লানত করেছেন; কঠোরভাবে কুরআনুল কারিমে এটাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালার হারাম করা একটা পদার্থকে বৈধতা দেয়া তথা কোনো সরকার হালাল সার্টিফিকেট দেয়ার অধিকার রাখে না। আর এই সরকার তো দাবি করে- তারা ধর্মপ্রাণ, তারা তাহাজ্জুদগুজারি। তাদের কাছে জনগণ এমন আচরণ কল্পনাই করে না। এখন তাদের তাহাজ্জুদগুজার বা ধর্মপ্রাণের সাথে মদের সম্পর্ক কী? জনগণই এটা বিচার করবে। তবে আমরা মনে করি যে, মারাত্মক কুপ্রভাব সমাজের ওপর প্রতিফলিত হবে; সমাজকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। শুধু মাদক না ইদানীং ওটিটি নীতিমালা যা ঘোষণা করতে যাচ্ছে; ফ্রেম করতে যাচ্ছে- এটাতো আরো মারাত্মক। এটা আরেকটার পরিপূরক, যা নির্লজ্জতাকেই উসকানি দেবে। আর এটা মাদকতাকেও উসকানি দেবে। এই দুই উসকানি যে সমাজে এক জায়গায় হয়েছে; সে সমাজে ধ্বংস ছাড়া কিছুই হয়নি। আজকে তথাকথিত উন্নত বিশ্ব বলে যারা দাবি করেন- তারা এই মাদকের ছোবলে জর্জরিত। তারা অসহায়; তাদের সন্তানকে তারা মানুষ করতে পারছেন না। বহু মানুষ এই যন্ত্রণায় পড়ে আত্মহত্যা করছে। আমাদের সমাজটাকে পরিকল্পিতভাবে সেই দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আসলে একটি বিশৃঙ্খল সমাজের নাগরিক হিসেবে এদেশের মানুষদের গড়ে তোলা হচ্ছে। এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক; সুস্পষ্ট অপকর্ম কোনো দায়িত্বশীল সরকার এমনটা করতে পারে না। এটা জনগণের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করার শামিল। আমরা অন্যায় কাজ থেকে ফিরে আসার জন্য সরকারকে আহ্বান জানাই।

ছাত্রসংবাদ : সম্প্রতি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। তারা দাবি করছে যে, এতে কিছু নতুনত্ব নিয়ে আসবে। সত্যিকারার্থে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনের ওপর কতটুকু আস্থা রাখা যায় বলে আপনি মনে করছেন?

ডা. শফিকুর রহমান : অতীতের ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং এর আগে-পরে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন দেখার পরে এই ধরনের নির্বাচন কমিশন একটি স্বৈরতান্ত্রিক সমাজে কী করতে পারবে এটা নতুন করে বলার কিছু নাই। কার্যত এরা কিছুই করতে পারবে না। এজন্য দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দেশপ্রেমিক দল যারা আছেন এবার কিন্তু তারা সার্চ কমিটির ডাকে কেউ সাড়া দেয়নি- তারা এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের সকলের এখন একটাই দাবি যে, নির্বাচনকালীন একটা দল-নিরপেক্ষ সরকার অবশ্যই দিতে হবে। আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে যে, জনগণের ভোটের প্রতি তাদের কোনো সম্মানবোধ নাই। তারা পরের দিনের ভোট আগের রাতে শেষ করেছে- কারণ জনগণের প্রতি তাদের কোনো আস্থা নাই। এই যে সরকার জনগণের ওপর এতো জোর-জুলুম অত্যাচার করার কারণে পাপের পাহাড় তাদের এতো বিশাল হয়েছে- তারা কিভাবে তাদের অধীনে একটা নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিবে? এটাতো প্রশ্নই ওঠে না। আর যারা নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ পেয়েছে তাদের পরিচয় একেবারে পরিষ্কার। সুতরাং তাদের কাছে সামান্য কোনো আশা করা যায় না- তারা জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার আলোকে কোনো নির্বাচনে সক্ষম হবে! আমরা এটা মনে করি না এক্ষেত্রে আমাদের এবং এদেশের ভোটহারা জনগণের দাবি একটাই যে- আমরা এমন একটা সরকার চাই, যে সরকারের সময় আমরা ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে পারবো। আর বাংলাদেশের নির্বাচন ইতিহাসে এটাই ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে যে, কোনো দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এজন্য অবশ্যই দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনের কোনো বিকল্প নাই।

ছাত্রসংবাদ : সম্প্রতি ইউক্রেন রাশিয়া সংঘাত চলমান রয়েছে। বিশ্ব রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এই সংঘাত কী ধরনের প্রভাব ফেলবে?

ডা. শফিকুর রহমান : আসলে এটি একটি কমপ্লেক্স ম্যাটার। এই যুদ্ধ এখনও তার কোনো পরিণতিতে পৌঁছায়নি। তবে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, ক্ষুদ্র প্রতিবেশীও বৃহত্তর প্রতিবেশীর কাছে অত্যন্ত অসহায় এবং অনিরাপদ। আমরা ইউক্রেনের সরকারের সকল প্রকার দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করি না। কারণ তারা ফিলিস্তিনের মজলুম মুসলমানদের কষ্ট বুঝেননি। যার কারণে কর্তৃত্ববাদী ইসরাইল সরকারকে তারা অন্ধভাবে সমর্থন দিয়েছিল- কিন্তু আজকে তারা মজলুম। বিশে^র যেখানেই যে জনগোষ্ঠী মজলুম হবে সে কোন ধর্মের আর কোন ভাষার এটা আমাদের দেখার বিষয় না- মজলুমদের প্রতি আমাদের সহজাত সহানুভূতি থাকবে, সেই হিসেবে তাদের প্রতিও আমাদের সহজাত সহানুভূতি আছে। কিন্তু তারা যেন অনুভব করে যে, তারাই একমাত্র মজলুম নয় দুনিয়ায় আরো বহু মজলুম আছে। তাদের এই কষ্ট থেকে তারা যেন এটা বুঝতে পারে যে, কোনো মজলুমের বিপক্ষে কোনো রাষ্ট্র বা সরকারের অবস্থান নেয়া সঠিক নয়। দ্বিতীয়ত রাশিয়া যেটা করছে সেটা অনেকটাই গায়ের জোরে করছে। তারা বৃহৎশক্তি হয়ে তাদের ক্ষুদ্র প্রতিবেশীকে একেবারে অযৌক্তিকভাবে আক্রমণ করে বসেছে। এই আক্রমণের ফলে ইতোমধ্যে ইউরোপ আমেরিকার মতো প্রভাবশালী দেশগুলো বেশকিছু বিষয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার অর্থনীতিতে মারাত্মক একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে- এটা অনিবার্য। অন্যদিকে তাদের তেল ও গ্যাস রফতানির ওপরেও একটা দেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এটি যদি কার্যকর হয় তাহলে ইউরোপের অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। তখন ইউরোপকে বাধ্য হয়ে ভিন্ন সোর্সের দিকে দৌড়াতে হবে। এতে করে বিশ^বাজারে একটি অস্থিরতা দেখা দিবে। একদিকে করোনা সংক্রমণের কারণে বিশ্বরাজনীতিতে একটি নেতিবাচক প্রভাব আছে। আবার অনাহত যুদ্ধের কারণে এই বিষয়গুলো অবশ্যই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর সবচাইতে বড় ভোগান্তিতে পড়বে যারা উন্নয়নশীল দেশ এবং অনুন্নত দেশ তারা। উন্নত দেশগুলো সামাল দিতে পারবে- কারণ তাদের রিজার্ভ থাকে স্ট্রং। সেইদিক থেকে তারা তাদের জনগণকে সামাল দিতে পারবে। যেমন কোভিডের সময় আমরা দেখেছি উন্নতবিশ্বের দেশগুলো তাদের নাগরিককে বিভিন্ন দিক থেকে সহায়তা দিয়েছে। যেটা আমাদের দেশসহ অনেক দেশ পারেনি। কারণ তাদের সঙ্গতির অভাব। ফলে এই দেশগুলোর জনগণ বেশি নেতিবাচক প্রভাব ভোগ করবে। বিশ্বে এদেরই জনগণ বেশি। এই দিক থেকে বলা যায় যে, নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কৌশলগত দিক থেকে বিশ্বের যেসকল ছোট ছোট রাষ্ট্র আছে বা তুলনামূলকভাবে সামরিক শক্তির দিক থেকে যে দেশসমূহ পিছনে পড়ে আছে তাদেরকে এখন থেকে নতুন করে ভাবতে হবে- নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে তারা কী করবে? তারা কি দায়িত্ব নেবে এবং তারা কি কৌশল অবলম্বন করবে? এখানে অবশ্যই জাতিসংঘকে কিছু দায়দায়িত্ব নিতে হবে। নাহলে জাতিসংঘ কেন? জাতিসংঘ যদি তার সদস্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিধানে কোনো ভূমিকা না রাখতে পারে এই জাতিসংঘের কোনো প্রয়োজন নাই। জাতিসংঘ তো এই কারণেই। অতএব জাতিসংঘকে এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে এবং সেই সাথে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রকেও তাদের স্বার্থ নিয়ে ভাবতে হবে। এটি আমাদের মতো দেশ যারা আছে তাদের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য। এজন্য আমরা মনে করি এর একটা ব্যাপক বহুমুখী প্রভাব এই যুদ্ধে বিশ্বের অর্থনীতিতে পড়বে এবং পড়েছে।

ছাত্রসংবাদ : বাংলাদেশের রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস, কিন্তু দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিতে সাধারণ কিংবা ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য বা সম্মিলিত প্রচেষ্টার ঘাটতি এখনও দৃশ্যমান। এই ক্ষেত্রে সাধারণ রাজনৈতিক দল ও ইসলামী দলগুলোর সম্মিলিত ঐক্যের জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে কী ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে?

ডা. শফিকুর রহমান : গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করার জন্য ধন্যবাদ। এইটা ঠিক যে, আমাদের দেশে গৌরবজনক একটি ইতিহাস রয়েছে। এদেশের মানুষ ব্রিটিশ দখলদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করে একসময় স্বাধীনতা হাসিল করেছে। দ্বিতীয়বার পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আবার স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এই দুই দফা স্বাধীনতা অর্জন করার পরও ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জন হলেও মানুষের সত্যিকারের মুক্তি কিন্তু অর্জিত হয়নি। এবং স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জন হয়নি। বরঞ্চ জাতি একটি সর্বহারা জাতিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের শাসনের সময় মানুষ তার সকল অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। আজকে আদালতকে এক্কেবারে শেষ করে ফেলা হয়েছে। যে সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে নির্বাচন কমিশনসহ সবগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছে। দুদক কার্যত একটি তল্পিবাহক দন্তনখরহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিরোধীদল দমনে এটিকে অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মেধাবী ছাত্ররা তাদের মেধা বিকাশের সুযোগ পাচ্ছে না। নিজেরা যুদ্ধ করে মেধার বিকাশ ঘটিয়েছে তাদেরকে তাদের মেধার মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। বরঞ্চ দলীয় আনুগত্য কার কত বেশি, কে কত বড় ক্যাডার সেটার ভিত্তিতে কর্মক্ষেত্রে তাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে গোটা প্রশাসনব্যবস্থা একটা মেধাহীন প্রশাসনে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে মেধাবীরা তাদের মেধার মূল্যায়ন না পেয়ে কেউ হতাশ হয়ে ভেঙে পড়ছে, আবার কেউ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এই দেশ ছেড়ে চলে যাওয়াটা জাতির জন্য কোনো সুখকর বিষয় না। এটা কার্যত মেধাপাচারের শামিল। এখানে যদি মেধার লালন করা না হয়; মেধার সম্মান করা না হয়; যদি মেধাকে বিকশিত করা না হয়। জাতি আস্তে আস্তে দুর্ভাগা জাতিতে পরিণত হবে। এবং এটা সাম্রাজ্যবাদীদের সুবিধা এনে দিবে। এজন্য আমরা মনে করি এই ক্ষেত্রে সত্যিকারার্থে যারা মানুষকে ভালোবাসে; মানুষকে নিয়ে রাজনীতি ও দেশপ্রেম যাদের মধ্যে আছে; তারা ইসলামিক দল হোক আর অন্য কোনো দল হোক তাদের সকলেরই জাতীয় সমস্যাগুলোর ব্যাপারে ঐকমত্যে আসতে হবে। এক প্ল্যাটফর্মে আসা জরুরি নয় কিন্তু একমতের ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলনই অতীতে বহু স্বৈরাচার সরকারকে সমুচিত জবাব দিয়ে ক্ষমতা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা মনে করি এখনও এটা সম্ভব; এজন্য আমাদের চিন্তা ও কর্মসূচির ঐক্য হওয়াটা খুব জরুরি। আমরা অনবরত এই চেষ্টা করে যাচ্ছি; আশা করছি যে- এই চেষ্টায় আমরা সফল হবো ইনশাআল্লাহ।

ছাত্রসংবাদ : ছাত্রসমাজ বাংলাদেশ গড়ার কারিগর। মেধা ও নৈতিকতার সমন্বয়ে সমৃদ্ধ দেশগঠনে ছাত্রসমাজের প্রতি আপনার কী আহ্বান থাকবে?

ডা. শফিকুর রহমান : এটিও এই সময়ের একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শিক্ষা হচ্ছে জাতির মেরুদণ্ড আর ছাত্ররা হচ্ছে আগামীদিনের দেশগড়ার কারিগর। এখন মেরুদণ্ড আমাদের ভাঙা; আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন শিক্ষার কোনো সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। সেখানে মাস্তানতন্ত্র কায়েম হয়ে আছে। বুয়েটে আমরা আবরারের ঘটনা দেখেছি; গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. সেলিম হোসেনের ঘটনা দেখেছি; প্রতিনিয়ত আবু বকরের ঘটনা দেখছি। এ ধরনের অগণিত-অসংখ্য ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটেই চলছে। এবং একদল ছাত্র সেখানে মাস্তান হয়ে বসে আছে। আমাদের লজ্জা লাগে আমাদের মেয়েরা পর্যন্ত এখন কেউ কেউ মাস্তানি করছে। মেধাবী মেয়েরা এখন হলগুলোতে থাকতে পারে না। ঐ হলগুলোতে থাকতে নির্দিষ্ট একটা দলের হয়ে মিছিল করতে হবে; স্লোগান দিতে হবে- তাদের ক্লাসে যাওয়া জরুরি নয়। অন্যদিকে বিশ^বিদ্যালয়ে উন্নয়নের নামে এখন কিছুসংখ্যক অসৎ কর্মকর্তা কিছুসংখ্যক বিপথগামী লোক যারা শিক্ষকতার চেয়ারে বসে আছেন। এদের সবাই খারাপ না, শিক্ষকদের মধ্যে অনেক ভালো লোক আছেন কিন্তু তাদের মধ্যেও কিছু বিপথগামী আছে যারা সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দেয়; টেন্ডারবাজ-লুটেরাদের প্রশ্রয় দেয়। ছাত্র অবস্থায় মাস্তানি করে এখন সত্যিকারের উন্নয়নের ভাগাভাগিতে তারা ভাগ বসিয়ে দিচ্ছে- উন্নয়নের নামে। এই যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থা- মেধাবীরা যেখানে যেতে পারে না; থাকতে পারেন না; ক্লাস করতে পারে না; লেখাপড়া করতে পারে না। কোনো গবেষণা নাই; নিয়মিত কোনো ক্লাস নাই; সুন্দরভাবে পরীক্ষা নাই- অটোপাসের একটা মহড়া চলছে এখন চতুর্দিকে। আমরা মনে করি এর মাধ্যমে জাতির মেরুদণ্ড ধ্বংস করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। এবং আমরা মনে করি এটা শুধু শুধু ভিতর থেকে নাও হতে পারে; ভিতরে-বাইরে সব জায়গায় একাকার হয়ে যেতে পারে। জাতিকে ধ্বংস করার জন্য এরকম একটা বিষয় হয়েও যেতে পারে। কিন্তু হ্যাঁ, এটাও ঠিক আমাদের দেশের যুবসমাজ ও ছাত্রসমাজ বরাবরই প্রতিবাদী- আমরা ছাত্রসমাজকে বলবো দেশের সামগ্রিক স্বার্থ দেখবে রাজনৈতিক দলগুলো কিন্তু জাতির মেরুদণ্ড ঠিক করার দিকটা ছাত্রসমাজকে দেখতে হবে। তারা যেন এই সমস্ত অপকর্মের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য ইতিবাচক আন্দোলনের জন্য করণীয় সবটুকুই যেন তারা করে। ইতঃপূর্বে প্রমাণিত হয়েছে এই ছাত্ররা রোডস-৬০ মুভমেন্ট এবং এবং একটা অসম কোটা দিয়ে তাদের মেধাবীদের যেভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করে তারা তাদের ন্যায্য দাবি আদায় করতে সক্ষম হয়েছে বলে আমরা মনে করি। ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ হলে এর কাছে যেকোনো স্বৈরাচার মাথা নত করতে বাধ্য। এজন্য আমরা ছাত্রসমাজের প্রতি আহ্বান জানাবো তারা যেন মেধা বিকাশের চেষ্টা করে। দ্বিতীয়ত পরিকল্পিতভাবে শিক্ষা থেকে নৈতিকতাকে বাদ দিয়ে বিশেষ করে ইসলামিক শিক্ষাব্যবস্থাকে দেশের নাগরিকদের মন থেকে মুছে ফেলার জন্য ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কোনো নাগরিকের অন্তরে যদি সমাজ এবং আল্লাহ সম্পর্কে দায়বদ্ধতা না থাকে তাহলে সে নাগরিক যতবড় শিক্ষিত হবে তত বেশি জাতির জন্য ভয়ঙ্কর ব্যক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ এই ব্যক্তিটি হবে আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর। এই ব্যক্তি কখনো জাতীয় স্বার্থ দেখবে না আল্লাহকে ভয় করবে না। অতএব কোনো অপরাধ তার কাছে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে না। আবু জেহেল উচ্চ শিক্ষিত মানুষ ছিল কিন্তু তার শিক্ষা ছিল নৈতিকতাবিহীন; আল্লাহর ভয়-ডর তার অন্তরে ছিল না। তার নাম আবু জেহেলও ছিল না, আবুল হিকামও ছিল না। তার নাম ছিল আমর বিন হিশাম, তার উপাধি ছিল আবুল হিকাম। হিকমাত ওয়ালার বন্ধু; সে বিজ্ঞ প্রকৌশলী। তাকে সমাজ সেইভাবে উপাধি দিয়েছিল। যেহেতু তার শিক্ষাটা মানবকল্যাণে ছিল না; সে আল্লাহর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত ছিল না। এজন্য তার উপাধি পাল্টে আবুল হিকাম থাকলো না; সে হয়ে গেল আবু জেহেল। যে শিক্ষা নৈতিকতাবিহীন- এই শিক্ষা আসলে কোনো শিক্ষা না; এটা কু-শিক্ষা। শিক্ষার জায়গায় কু-এর কোনো জায়গা নাই- শিক্ষা হবে সুশিক্ষা। শিক্ষা মানুষকে পরিশোধিত করবে; বিনয়ী-দায়িত্ববোধসম্পন্ন নাগরিক গড়বে। যার অভাব আমরা তীব্রভাবে অনুভব করছি। এর মধ্যে পাঠ্যপুস্তক থেকে ইসলাম শিক্ষাকে সংকুচিত করা হয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষাকে সরকার কী বানাতে চায় তার জবাব সরকারকেই দিতে হবে। কিন্তু এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন হতে দেয়া যাবে না। এর বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমরা ছাত্রসমাজকে আহ্বান জানাবো ছাত্রসমাজের ন্যায্য অধিকার আদায়ের ব্যাপারে তারা যেন আন্দোলন গড়ে তোলে এবং আমরা আশাবাদী যে, ছাত্রসমাজ এটা করবে। ইতোমধ্যে আমরা বহু সফল আন্দোলন দেখেছি। এখন একটা সামগ্রিক আন্দোলন সময়ের দাবি। এতে আমাদের দল নৈতিকভাবে পাশে থাকবে।

ছাত্রসংবাদ : আপনাকে ধন্যবাদ।
ডা. শফিকুর রহমান : তোমাদেরকে ধন্যবাদ। ছাত্রসংবাদের পাঠকদেরকেও আন্তরিক মোবারকবাদ।

SHARE

Leave a Reply