সমাজ বিনির্মাণে কোরবানির অবদান । সাকী মাহবুব

সমাজ বিনির্মাণে কোরবানির অবদান । সাকী মাহবুবহযরত ইব্রাহিম (আ) প্রিয়পুত্র ইসমাইলকে কোরবানির উদ্দেশ্যে আরাফাতের ময়দানের দিকে যাত্রা করেন। অতঃপর আরাফাত পর্বতের ওপর তাঁকে কোরবানি দেয়ার জন্য গলদেশে ছুরি চালানোর চেষ্টা করলে বিস্মিত হয়ে দেখেন যে তাঁর পরিবর্তে একটি প্রাণী কোরবানি হয়েছে এবং তাঁর কোনো ক্ষতি হয়নি। এই ঘটনাকে স্মরণ করে সারা বিশ্বের মুসলিমরা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রতি বছর এই দিবসটি ঈদুল আজহা হিসেবে উদযাপন করে।
কুরআনের ভাষায় ঘটনাটি হচ্ছে-
“হে আমার পরওয়ারদেগার! আমাকে এক সৎপুত্র দান কর। সুতরাং আমি তাঁকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম। অতঃপর সে যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইবরাহিম তাকে বলল, বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে জবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কী দেখ। সে বলল, পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহিম তাকে জবেহ করার জন্য শায়িত করল। তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইবরাহিম, তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে! আমি এভাবেই সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে দিলাম জবেহ করার জন্য এক জন্তু। আমি তার জন্য এ বিষয়টি পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিয়েছি যে, ইবরাহিমের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক। এমনিভাবে আমি সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। সে ছিল আমার বিশ্বাসী বান্দাদের একজন।” (সূরা সাফফাত : ১০০-১১১)

যুগে যুগে কোরবানি
‘কুরবান’ মানে sacrificeউৎসর্গ। হিব্রুতে শব্দটিকে ‘কারব’ বলা হয়েছে। এর অর্থ ‘নৈকট্য অর্জন’, কারণ হিব্রু ‘কারব’ মানে ‘নিকট’। যুগে যুগে কোরবানির প্রথা ছিল বিভিন্ন রকম। বাইবেল বা তাওরাতের মতো ধর্মগ্রন্থ আর ইবনে কাসিরের মতো তাফসিরগুলো আমাদের জানায়, আগেকার যুগে কার কোরবানি আল্লাহর কাছে গ্রহণ হলো, কারটা হলো না, সেটা সহজেই বোঝা যেত। তখন যা কোরবানি করা হচ্ছে সেটা খাওয়া নিষিদ্ধ ছিল, যেটা এখন নয়। সেটা শস্য হোক আর প্রাণীই হোক, খাওয়া যেত না। কোরবানির বেদিতে রেখে কুরবানদাতা দূরে সরে আসতেন। আকাশ থেকে তখন একটা আগুন এসে পুড়িয়ে দিয়ে যেত সেই উৎসর্গ, ইহুদিদের তাওরাতে সেটাই জানা যায়। পুড়ে গেলে বোঝা যেত, আল্লাহ কবুল করেছেন কোরবানি। যদি আগুন না আসে, তাহলে কবুল হয়নি।
খ্রিস্টানদের বিশ্বাস, হযরত আদম (আ) যে ‘পাপ’ করে মানবজাতির পতন ঘটান বেহেশত থেকে, সেই পাপের জন্য ‘কুরবান’ হচ্ছিলেন হযরত ইবরাহিম (আ) এর পুত্র, যদি আসলেই সেই কোরবানিটা পুরোপুরি সম্পন্ন হতো, তাহলে মানবজাতি পাপমুক্ত হতো। কিন্তু সেটা তখন হয়নি। বরং খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে, ঈশ্বর নিজ পুত্র দ্বারাই মানুষকে পাপমুক্ত করবেন। তাই ঈশ্বরপুত্র যিশু এলেন ও মানুষের জন্য ক্রুশে ‘কুরবান’ হলেন; ফলে পাপের প্রায়শ্চিত্ত হলো। যিশুকে এ জন্য তারা ‘দ্বিতীয় আদম’ও বলে থাকে।
হযরত আদম (আ) এর দুই পুত্র হাবিল (Abel) আর কাবিল (Cain) এর মর্মান্তিক ঘটনা এই কোরবানি নিয়েই হয়েছিল। কাবিল ছিল সঙ্কীর্ণ মনের মানুষ। কোনো একটি কারণে হাবিল আর কাবিল দু’জনেই কোরবানি দিলেন। কিন্তু দূরে সরে আসতেই হাবিলের কোরবানি আকাশ থেকে আগুন এসে পুড়িয়ে দিল অর্থাৎ তাঁর কোরবানি কবুল হলো। কিন্তু কাবিলের কোরবানির কিছুই হলো না। কাবিল ক্রোধোন্মত্ত হয়ে খুন করল তার ভাই হাবিলকে। মানবজাতির প্রথম খুনি কাবিল আর প্রথম নিহত হন হাবিল। এই ঘটনা ও কোরবানির সামগ্রিক দিকগুলো পর্যালোচনা করলে সমাজ বিনির্মাণে কোরবানির যে বহুমুখী অবদান আছে তা অকপটেই বুঝা যায়।

সমাজ বিনির্মাণে কোরবানির অবদান । সাকী মাহবুবসুষ্ঠু সমাজ
ইসলামের প্রত্যেকটি কথা ও কাজ মানবজীবনের জন্য অপরিহার্য। উত্তম চরিত্র, উত্তম আদর্শ ও সুষ্ঠু সমাজগঠনের ক্ষেত্রে ইসলামী নীতিমালা অনুসরণের বিকল্প নেই। অহেতুক ও অনর্থক কোনো কাজের অবকাশ নেই ইসলামে। উৎসবাদি পালনের ক্ষেত্রেও এ নীতির অনুসরণ অপরিহার্য। কোরবানিতে যেমন আনন্দের একটি দিক রয়েছে তেমনিভাবে রয়েছে অসংখ্য শিক্ষণীয় ও সংস্কারমূলক বিষয়। এতে নিহিত রয়েছে একটি সুষ্ঠু ও আদর্শ সমাজগঠনের অসংখ্য দিকনির্দেশনার সুন্দর বিধান। আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজের অর্থ জাতি, সঙ্ঘ, সম্প্রদায় ইত্যাদি বোঝালেও সমাজ বলতে এখানে মানবসমাজই বোঝানো হচ্ছে। অর্থাৎ পরস্পরের সহযোগিতায় অবস্থানককারী মনুষ্য সঙ্ঘ। আর সুষ্ঠু অর্থ অতি সুন্দর, শ্রেষ্ঠ, সত্য, নিখুঁত ইত্যাদি বুঝায়।
সমাজবিজ্ঞানের জনক বিশ্ববিখ্যাত মনীষী আল্লামা ইবনে খালদুন বলেন, স্বভাবগতভাবে মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। অর্থাৎ মানুষের জন্য একটি একটি নগর বা জনবসতি দরকার, যেখানে সে অন্যের সাথে মিলে মিশে বাস করতে পারে। সুতরাং সুষ্ঠু সমাজ বলতে আমরা বুঝি এমন মানুষের সমাজ যাদের মন হবে শুচি-শুভ্র ও সুন্দর, কাজ হবে সত্যাশ্রিত এবং ভাবনা ও পরিকল্পনাগুলো হবে সত্য ন্যায়ের আলোকদীপ্ত। প্রকারান্তরে সুষ্ঠু সমাজ হচ্ছে এমন সমাজ যাতে থাকবে না চুরি রাহাজানি, থাকবে না নিরাপত্তার অভাব, যেখানে থাকবে, সুকুমার বৃত্তির চর্চা, যেখান মানুষ মিলে মিশে সদ্ভাব ও সম্প্রীতির সাথে বসবাস করবে। সত্যের প্রতি অবিচলতা আর অসত্যের প্রতি কঠোর মনোভাব হচ্ছে সুষ্ঠু সমাজের সদস্যদের অপরিহার্য গুণাবলি এবং সৎ কাজের আদেশ এ অসৎ কাজের নিষেধ হচ্ছে তাদের নিত্যদিনের কর্মসূচি। যে সমাজের নিজস্ব ঐতিহ্য থাকবে, নিজস্ব সংস্কৃতি থাকবে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কোনো ক্ষেত্রেই সুষ্ঠু পরনির্ভরশীল হবে না। বরং স্বকীয়তা নিয়ে আলো ছড়াবে।

সমাজ বিনির্মাণে কোরবানি
কোরবানি শব্দের অর্থ হল নৈকট্য অর্জন করা। কাছাকাছি যাওয়া। কোন জন্তু জবেহ করার মাধ্যমে, কোন কিছু আল্লাহর রাস্তায় সদকা করার মাধ্যমে, নিজের প্রিয়বস্তুকে আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা। কোরবানি হলো আত্মোৎসর্গের একটি কঠিনতম ও শ্রেষ্ঠতর ইতিহাস। এটা হলো হযরত ইবরাহিম (আ)-এর আত্মত্যাগের চির অনুসরণীয় ইতিহাস। যুগে যুগে, দেশে দেশে, কালে কালে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ পৃথিবীতে অসংখ্য ও অগণিত নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। যারা এই দ্বীন ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে কঠিন পরিশ্রম ও সীমাহীন কোরবানি স্বীকার করেছেন। এ ক্ষেত্রে সাইয়্যেদেনা হযরত ইবরাহিম (আ)ও হাজেরা (আ)-এর আদরের দুলাল, দুরন্ত, দুর্বার কিশোর ইসমাইল (আ)-এর মহান কোরবানির কথা চির স্মরণীয়। তিনি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবনের শুরু হতে শেষ পর্যন্ত স্বীয় অস্তিত্ব বিলীন করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেননি। অবশেষে মহান প্রভুর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে, প্রাণের চেয়ে প্রিয় পুত্র কিশোর ইসমাইল (আ)কে দ্বীধাহীনচিত্তে কোরবান করে দিতেও প্রস্তুত হলেন। এই মহান কোরবানি হযরত ইবরাহিম (আ)-এর মহান সুন্নাত এবং এটা উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য শুধু ওয়াজিবই নয়, বরং গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করলে বুঝা যায় যে, এই মহান কোরবানি নিরন্ন, বিবস্ত্র, নগ্ন-অর্ধনগ্ন ও দুস্থ মানবতার সেবায় রাখতে পারে এক বিশেষ অবদান। এভাবে ইসলাম বণ্টনের যে নীতিমালা নির্ধারণ করেছে, সেই ভিত্তিতে কোরবানির গোশতের একভাগ গরিব, অসহায়ের জন্য। যারা সারা বছর এক টুকরা গোশত খেতে পারে না, সেই গোশতকে সুষ্ঠুভাবে বণ্টনের মাধ্যমে পুনরায় ফিরে আসতে পারে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ববোধ, মমত্ববোধ, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, সন্ত্রাসমুক্ত শান্তিময় সুখী সমাজ। কারণ তারা একদিন হলেও গোশত দিয়ে দু’মুঠো ভাত খেয়ে ভুলে যেতে পারে, সারা বছরের অসহনীয় দুঃখের গ্লানি।
কোরবানির চামড়ার একমাত্র অধিকারী হলো গরিব লোকজন। এর উসিলায় ও সমৃদ্ধশালী সমাজ গড়ে উঠতে পারে। এমনিভাবে হাদিয়া দেয়া ও গ্রহণ করা বৈধ ব্যাপার। তাই কোরবানির গোশতের হকদার আত্মীয় স্বজনদের মাঝে গোশতের আদান প্রদানে ফিরে আসতে পারে পরস্পরের সৌহার্দ্য সম্প্রীতি। কেননা কয়েকটি পরিবার নিয়ে গড়ে ওঠে একটি সমাজ। আর যদি পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মাঝে স্নেহ মায়া, মমতা, ভালোবাসা বিরাজ করে তাহলে গোটা সমাজের মধ্যে বিরাজ করে অনাবিল শান্তির অপূর্ব পরিবেশ। পরস্পরে সৃষ্টি হবে সাম্য মৈত্রী। আর কোরবানির মাধ্যমে লোভ লালসা, স্বার্থপরতা তথা মানুষের পশুপ্রবৃত্তি নিধনের দৃঢ়প্রত্যয় ঘোষিত হয়। ইরশাদ হয়েছে ‘হে নবী আপনি বলুন, নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মরণ সবকিছু বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।” (সূরা আনআম : ১৬২)
কোরবানি দ্বারা তাকওয়া অর্জিত হয়। আর এই কোরবানি ধনসম্পদের অপবিত্র লিপ্সা ও দুনিয়ার প্রতি গভীর আকর্ষণ দমনের এক অভিন্ন মাধ্যম। এই কোরবানির মাধ্যমে প্রত্যেকটি মুমিন মুসলমান তাকওয়া তথা খোদাভীতির এক অনুপম আদর্শে উজ্জীবিত হয়। যদি সমাজের প্রত্যেকটি সদস্য মুত্তাকি ও পরহেজগার হয়ে যায় তাহলে সেই সমাজে থাকবে না কোন মজলুম, মানবতার প্রতি প্রহসন, সন্ত্রাস, গুম, খুন, হাইজ্যাক, রাহাজানি, কাটাকাটি, ইভটিজিং, মারামারি, আর সভ্যতার নিকৃষ্ট কাজ যেনা ব্যভিচারের সয়লাভ। তাই আমাদের এই মহান কোরবানির মর্মবাণী উপলব্ধি করতে হবে এবং এর যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, তরুণসমাজ, আলেমসমাজ, সুশীলসমাজসহ সর্বস্তরের বুদ্ধিজীবীদের এগিয়ে আসতে হবে। হাতে হাত রেখে, কাঁধে কাঁধ রেখে গড়ে তুলতে হবে ইসলামী নীতিমালার আলোকে ঐতিহ্য ও প্রগতির সমন্বয়ে একটি আদর্শ সুষ্ঠু ও মডেল সমাজ।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply