সম্পদকীয়-ডিসেম্বর ২০১৮

বিজয়ের স্বপ্নকে ধারণ করে এগিয়ে চলা মজলুম জনপদের নাম বাংলাদেশ। পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য জন্মলগ্ন থেকেই এর অধিবাসীদের করতে হয়েছে সংগ্রাম; দিতে হয়েছে জীবন; ঝরাতে হয়েছে রক্ত ও ঘাম। ১৯৭২ সাল থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশে বিজয় দিবস পালন করা হচ্ছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিজয়ের প্রকৃত স্বাদ ও আনন্দ ভোগ করতে পারছে না এদেশের সর্বস্তরের জনগণ। শোষিত, বঞ্চিত, অপমানিত হয়ে ক্ষুধিত, পীড়িত জীবন যাপন করছে বাংলার জনগণ। তারা ন্যায়বিচার, মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে আজো মাহরুম। কেউ নেই তাদের পাশে দাঁড়াবার। আজ পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ফরাসি, ইংরেজ, বর্গি, পাকিস্তানিরা কেউ নেই; কিন্তু ইতিহাসের সেই নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি পায়নি বাংলার অধিবাসী। দলীয় কোন্দল, ক্ষমতার অপব্যবহার আর বাকশালের জাঁতাকলে পুরো জাতি আজ নিষ্পেষিত। রক্ত দিয়ে ছিনিয়ে আনা এই বিজয় একদিন স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদের তসবিহ সবক হয়ে নিরপরাধ নির্দোষ মানুষকে কলঙ্কিত করবে এ কথা জানা ছিল না কারো। দেশের জন্য জীবন বিসর্জনকারী শহীদি আত্মাকে কষ্ট দিয়ে, জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করে, আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, রাষ্ট্রীয় ও বিশ্বস্বীকৃত সমস্ত নীতিমালাকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের মনের খায়েস অবিরত পূরণ করে চলছে এই সরকার। ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে শুধু ক্ষমতায় থাকার মোহ ত্যাগ করতে পারে না ওরা। বাকশালী বংশের এই সরকারের আমলে বিজয়ের প্রকৃত আনন্দ ভোগ করা জাতির পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব।
সামনে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের ডঙ্কা বেজে উঠেছে। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে এখন শঙ্কা ও উচ্ছ্বাসের মিশ্রণে তৈরি হয়েছে এক থমথমে অবস্থা। অধিকাংশ জনতার মনে অজানা আশঙ্কা। কারণ, এই সরকারের অধীনে কোন সুষ্ঠু নির্বাচন দেখেনি এ জাতি। দেখেছে শুধু হাঙ্গামা চালিয়ে, প্রশাসনকে দলের হাতিয়ার বানিয়ে, বিরোধী দলের রক্তের দাগ পেরিয়ে কেন্দ্র দখল করা, ব্যালট ছিনতাই করা, বিরোধী এজেন্ট-প্রিজাইডিং অফিসারকে বের করে দিয়ে একতরফা নিজেদের প্রতীকে সিল মারার মহা উল্লাস। জনগণ আরো দেখেছে প্রশাসনকে মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকতে। শুধু তা-ই নয়, বাকশালীদের বিরুদ্ধে অবস্থানকারীদের জন্য প্রশাসনের নির্লজ্জ ব্যবহার নিত্যদিন দেখে আসতে হচ্ছে। দেশের খেয়ে পরে এই প্রশাসন বাকশালীদের গোলামি করে অশুভ শক্তির বিজয় নিশ্চিত করে প্রতিবার।
গিরি সংকট, ভীরু যাত্রীরা গুরু গরজায় বাজ,
পশ্চাৎ-পথ-যাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ!
কান্ডারী! তুমি ভুলিবে কি পথ? ত্যাজিবে কি পথ-মাঝ?
করে হানাহানি, তবু চলো টানি, নিয়াছ যে মহাভার!

কান্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,
বাঙালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর!
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।

ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান,
আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন্ বলিদান
আজি পরীক্ষা, জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ?
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কান্ডারী হুঁশিয়ার!
(কাজী নজরুল ইসলাম)

স্বপ্নজয়ী প্রজন্মকে সোচ্চার হতে হবে। আর কোন দুঃশাসন নয়, আর কোন নির্যাতন নয়, আমরা একটি শান্তির সোনালি স্বদেশ ফিরিয়ে দিতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করি। আগামীর বাংলাদেশ তাকিয়ে আছে সাহসীদের দিকে। সম্ভাবনাময় এ জনপদকে আর বাকশালী হায়েনার কব্জাগত হতে দেয়া যায় না। ভারতের গোলামি থেকে মুক্ত হয়ে, দিল্লির আধিপত্য থেকে দেশকে বাঁচাতে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা। বিদেশী শক্তির দীর্ঘদিনের আগ্রাসন রুখে দিতে হবে আমাদেরই। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ভরা সোনার স্বদেশ গড়তে আগামীর প্রজন্ম আরো শক্তিশালী ও জ্ঞানী হোকÑ এই প্রত্যাশায় আমাদের মাসিক প্রেরণা অন্তরে আলোড়ন সৃষ্টি করতে জোগায় অনুপ্রেরণা। জ্ঞানকে করে সমৃদ্ধ এবং বাস্তবমুখী প্রয়োজনের চাহিদা মেটানোর মন্ত্রণা। লাল-সবুজের বাংলাদেশ কত যে সম্মোহনী ইতিহাসে ভরপুর তা আমাদের জানতে হবে আদি থেকে। একাত্তরের আগে-পরের সব ইতিহাস যদি বিশ্লেষণ করা না হয় তবে বাংলার সৌন্দর্য যে অধরাই থেকে যাবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও বিজয় জাতির জন্য একটি গুরুত্বপর্ণ ঘটনা। এ দেশের গানে গানে, কবিতা-ছড়ায়, গল্পমালায়, চলচ্চিত্রে, প্রবন্ধ-নিবন্ধে, গণমাধ্যমে বিভিন্নভাবে এই বিষয়গুলো ফুটিয়ে তোলা হয়। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন বিজয় ও স্বাধীনতার কথা আলোচিত হবেই। এ জন্য দল মত নির্বিশেষে সকল লেখকের বইগুলো পড়তে হবে এবং নির্ণয় করতে হবে প্রকৃত ইতিহাস। বিশ্বাসের ভাণ্ডার থেকে মুক্তির মশাল জ্বালার অনুপ্রেরণা হোক আমাদের বিজয়ের মাস।

SHARE

Leave a Reply