সর্বকালের সফল অর্থনীতিবিদ মুহাম্মাদ সা. জাফর আহমাদ

মানুষ মাত্রই আরাম-আয়েশের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত ও কালাতিপাত করতে চায়। তাই ‘মানব জীবনে অর্থনীতির গুরুত্ব অপরিসীম’ এ কথাটি পৃথিবীর কোন ধর্মই অস্বীকার করতে পারেনি। এ কারণেই অতি প্রাচীনকাল থেকে প্রত্যেকটি সভ্যতা-সংস্কৃতিই নিজের অনুসারীদের একটি অর্থনৈতিক মতাদর্শ দেয়ার চেষ্টা করেছে। তবে ইসলাম অর্থনীতির গুরুত্ব নির্ণয়ের ক্ষেত্রে অন্যান্য সবার চেয়ে এগিয়ে। কারণ অন্যান্য মতাদর্শগুলো অনেকটা একপেশে, প্রান্তিক ও চরমপন্থার নীতি সংবলিত। বর্তমান পৃথিবীর পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কিন্তু ইসলাম চরমপন্থার এ দুটি মতবাদের মাঝে মধ্যমপন্থার এক নির্ভুল সুষম অর্থনীতির উপহার দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মানবজীবনের অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় অর্থনীতির ক্ষেত্রেও ইসলামের এ মধ্যমপন্থা সার্বিক শান্তি ও সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি। আজ থেকে পনেরোশত বছর পূর্বেও ঠিক এমনিভাবে ‘মুযদাক’-এর সমাজতন্ত্রবাদ এবং তৎকালীন ইহুদিদের সুদি সমাজ ও প্রভাবশালীদের পুঁজিবাদ সমাজে এক মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। সেই পরিস্থিতিতে একমাত্র মুহাম্মাদ সা. মানুষের প্রকৃত মুক্তির জন্য সফল ও সুষম অর্থনীতির বিপ্লবী পথ দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন। রাসূলের সা. কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক বিপ্লব এবং অর্থনৈতিক মুক্তির পথ বুঝাতে হলে প্রথমে আমাদেরকে রাসূল সা.-এর আগমনপূর্ব ও তাঁর সময়কালীন ‘জাযিরাতুল আরব’ আরব উপদ্বীপ বা হিযায প্রদেশটির অর্থনৈতিক অবস্থার ইতিহাস জানতে হবে।

জাযিরাতুল আরবের অর্থনৈতিক অবস্থা
ভূ-গোলকের ওপর নজর বুলালে আমরা দেখতে পাবো, আরব উপদ্বীপ প্রাচীন বিশ্বের ঠিক কেন্দ্রস্থলে উপস্থিত। হিযায প্রদেশ লোহিত সাগরের উপকূল ধরে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃৃত। হিযাযের তিনটি নগরী মক্কা, মদিনা ও তায়েফ বহু যুগ পূর্ব হতেই বিশ্ববাসীর কাছে অত্যন্ত সুপরিচিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য পথ ছিল এ তিনটি নগরীর বুক দিয়ে। নি¤েœ তিনটি নগরীর অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরা হলো-
মক্কা : ভৌগোলিক অবস্থানের দরুন আদি যুগ থেকে মক্কা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। মরু বাণিজ্য-পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন বিধায় ইহা ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল। কিন্তু মক্কার আশপাশে জমি ছিল চাষাবাদের পক্ষে সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। বন-জঙ্গল এবং খনিজ-সম্পদও না থাকায় সেখানে সব সময় কাঁচামালের অভাব লেগে থাকতো। ঐ একই কারণে সেখানকার শিল্প বাণিজ্যেও উন্নতি হয়নি। মদিনার ন্যায় মক্কাতেও সুদি কারবারের প্রচলন ছিল। সিরিয়ার দিকে বাণিজ্য কাফেলা রওয়ানা হওয়ার সময় মক্কায় দিনারের চাহিদা বেড়ে যেত। মহাজনরা তাদেরকে সুদে ঋণ দিতো। মক্কার কন্যাসন্তানদের হত্যার বিভিন্ন কারণের মধ্যে অভাব-অনটনও একটি কারণ হিসাবে গণ্য হতো। বসতি সমস্যা, জান-মালের নিরাপত্তা, দাসপ্রথা, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ইত্যাদির সাথে অর্থনৈতিক দুরবস্থার একটি সম্পর্ক ছিল। মক্কার বাইরে এখানে সেখানে ছোট ছোট যাযাবর লোকেরা বসবাস করতো। তারা নিজেদের উট, ছাগল পালের চারণভূমির সন্ধানে বার মাসই একস্থান থেকে অন্যস্থানে ঘুরে বেড়াত। তাদের আহার্য ও পানীয় ছিল টিড্ডি বা পঙ্গপাল এবং মধু। (মক্কা শরীফের ইতিহাস) তারা অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে নিজেদের মধ্যে হরহামেশা মারামারি-কাটাকাটিতে লিপ্ত থাকত।
মদিনা: হিযাযের অপর নগরী মদিনার ঐতিহাসিক গুরুত্বও কম নয়। মদিনা ছিল কিষাণদের বসতি। এ কিষাণরা সাধারণত অভাব-অনটনের মধ্যেই দিনাতিপাত করতো। ইহুদি পুঁজিপতিরা মদিনায় বসবাস করতো। তারা অগাধ সম্পত্তির মালিক ছিল এবং সেখানকার চাষিদেরকে সুদি ঋণ দিতো। মদিনার সুদের প্রচলন ছিল মক্কা ও তায়েফের তুলনায় আরো ব্যাপক ও অত্যন্ত মারাত্মক। ঐতিহাসিকদের ভাষ্যমতে সেখানে একটি জঘন্য পেশার প্রচলন ছিল এবং তাহলো দাসীদের দ্বারা অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন। অর্থাৎ দাসীদের দিয়ে পতিতাবৃত্তির (চৎড়ংঃরঃঁঃরড়হ) ব্যবসা চালানো হতো। লোকেরা তাদের যুবতী সুন্দরী দাসীদেরকে গলিতে বসিয়ে দিতো এবং তাদের উপার্জন ভক্ষণ করতো। (ইবনে জরীর তাবারী, তাফসীরে ইবনে কাসীর) এ জন্য আল্লাহ তায়ালা এ জঘন্য প্রথা উচ্ছেদের জন্য আয়াত নাযিল করলেন, “বৈষয়িক স্বার্থে নিজেদের দাসীদেরকে বেশ্যাবৃত্তির জন্যে বাধ্য করোনা, যখন তারা নিজেরা এরূপ কাজ থেকে আত্মরক্ষা করতে চায়।” (সূরা নূর : ৩৩)
তায়েফ: তায়েফ মক্কা নগরী থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রায় পঁচাত্তর মাইল দূরে অবস্থিত। তায়েফের জমি সাধারণত উর্বরা ও সুফলা। তায়েফবাসীদের অর্থনৈতিক জীবনে দুটি জিনিস ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথা (১) জমিদার ও কৃষকদের মধ্যে মারামারি এবং (২) বিত্তশালী ও বিত্তহীনদের মধ্যে মতবিরোধ। ঐতিহাসিক বালাযুরীর মতে তায়েফের লোক ছিল অতিমাত্রায় সুদখোর। তাদের এ সুদি ব্যবসা শুধুমাত্র তায়েফে সীমাবদ্ধ ছিল না, মক্কাবাসীদেরকেও তারা সুদি ঋণ দিতো। সাকিফ সম্প্রদায়ের চার সহোদর ভ্রাতা-মাসউদ, আবদে ইয়ালীল, হাবীব এবং সাকাফী ভ্রাতারাই বনু মুগীরা সম্প্রদায়কে ঋণ দিতো। এদের সুদি কারবারের একটি মোকদ্দমা এতটাই দীর্ঘায়িত ছিল যে, শেষ পর্যন্ত এটাকে উপলক্ষ করে ‘ওয়া যারু মা বাকিয়া মিনার রিবা’ আয়াত নাযিল হয়।
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে সাধারণ আরবদের অর্থনৈতিক অবস্থা অধঃপতনের অতল গহব্বরে নিমজ্জিত হয়েছিল। ইবনে খালদুনের মতে, “আরবদের দোহীতারা শুশুক, ফড়িং প্রভৃতি খেতো। এমনকি ক্ষুধায় অস্থির হয়ে তারা উটের লোম রক্তের সাথে মিশিয়ে গিলে ফেলত। কুরাইশদের অবস্থাও মোটামুটি একই ধরনের ছিল।” এমনকি রাসূল সা.-এর সমসাময়িক মুসলমানদের অবস্থাও একই ধরনের ছিল। সাহাবায়ে কেরামের অর্থনৈতিক দুরবস্থার ইতিহাস মোটামুটি আমাদের নখদর্পণেই আছে।
রাসূল সা.-এর অর্থনৈতিক বিপ্লব
কিন্তু ইসলামের আবির্ভাবের পর আরবদের অবস্থা সচ্ছল হয়ে উঠল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটালেন। ইসলামের এই অর্থনৈতিক বিপ্লবের মধ্যে রাজনৈতিক বিজয়ের অবদান ছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু এটাই একমাত্র কারণ নয়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর রাসূলের মাধ্যমে আরবদের যে পথ দেখিয়েছেন, তাতে শুধু ধর্মীয় নয়, অর্থনৈতিক সাফল্যও নিহিত ছিল। আমাদের সকলেরই জানা আছে যে, অন্যান্য নবীয়ে আকরামগণ তাঁদের উম্মতদের মাগফিরাত ও হিদায়াত কামনা করেছেন, আর মানবতার মুক্তির দিশারি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. এগুলোর সাথে সাথে এ দোয়াও করেছেন, “হে পরোয়ারদিগার! এরা পায়ে হেঁটে চলে এদের সওয়ার দাও। হে পরোয়ারদিগার! এরা উলঙ্গ, এদের কাপড়ের ব্যবস্থা করো। হে প্রভু! এরা ভুখা, এদের পেটভরে খাবার দাও।” (সুনানে আবু দাউদ) হুযুর সা. আরবদের চারিত্রিক অধঃপতন দেখে যতটুকু কষ্ট পেতেন, অর্থনৈতিক দুরবস্থা দেখেও ততটুক কষ্ট পেতেন। সহিহ মুসলিম শরীফে হযরত জরীর বিন আবদুল্লাহ রা. বর্ণিত দীর্ঘ রেওয়াতের কিয়দংশ হলো: “আমরা একদিন রাসূলল্লাহর সা.-এর সাথে ছিলাম। হঠাৎ একটি সম্প্রদায়ের লোক কম্বল উড়িয়ে, তরবারি ঝুলিয়ে, খালি পায়ে রাসূলের খেদমতে এসে হাযির হলো, ওদের দুরবস্থা দেখে রাসূলল্লাহ সা.-এর চেহারার রং বদলে গেল। তাঁর কাছে ঐ অবস্থা এতই অসহনীয় ছিল যে, তিনি প্রথমে ঘরের ভেতরে চলে যান। কিন্তু সেখানে এই দুস্থদের সাহায্য করার মতো কোন জিনিস না পেয়ে ব্যথিত অবস্থায় ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন। তখন তিনি বেলালকে ডেকে পাঠিয়ে আযান দিতে বললেন। যদিও সেটি জুমাবার ছিল না তবু তিনি মিম্বরে আরোহণ করে কুরআনের নি¤েœাক্ত আয়াতটি পড়লেন: “হে লোক সকল, তোমরা তোমাদের প্রভুকে ভয় করে চলো, যিনি তোমাদেরকে একই প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা নিসা : ১) এভাবে তিনি আরো কয়েকটি আয়াত তেলাওয়াত করলেন। দেখতে দেখতে দানের বারিবর্ষণ শুরু হলো। রাসূলুল্লাহ সা.-এর চেহারার ফিকে রং আবার ঝলমলিয়ে উঠলো।”
একজন পূর্ণাঙ্গ মহামানব হিসাবে তাঁকে শুধুমাত্র কোন একটি বিশেষ দিকে নিয়ে গিয়ে মূল্যায়ন করা হলে তাঁর প্রতি, মানবতার প্রতি, সর্বোপরি ইসলামের প্রতি জুলুম করা হবে। মানবতার মুক্তির দূত মুহাম্মাদ সা. দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের দিশারি ছিলেন। তিনি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে পৃথক করে মানুষের আত্মার উন্নয়নের চেষ্টা করেননি। বরং সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ঘিরেই মানুষের আত্মার পরিশুদ্ধির চেষ্টা করেছেন। এবং সকল ক্ষেত্রেই তিনি সফল হয়েছেন। ইসলামের সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক বিবেচনায় আনলে আমাদের মানসপটে যেমন একজন সফল ও পূর্ণাঙ্গ সমাজসংস্কারক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের চেহারা ভেসে আসে, তেমনি ইসলামের অর্থনৈতিক দিক পর্যালোচনা করলে আমরা একজন সফল ও কল্যাণমুখী অর্থব্যবস্থাপকের চেহারাই দেখতে পাবো। তিনি সম্পদের সুষম ও ইনসাফপূর্ণ বণ্টন ও বিকেন্দ্রীকরণের জন্য নৈতিক মানে উন্নীতকরণের সাথে সাথে কতগুলো মূলনীতি ও নৈতিক পন্থা (ঞড়ড়ষং) চালু করেন যা নি¤েœ আলোচনা করা হলো।
সম্পদ বিকেন্দ্রীয়করণের ইসলামী
অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যসমূহ
নৈতিক শিক্ষা : আয়-উপার্জন মানুষের জীবনের বিশাল অংশকে নিয়ন্ত্রণ করে বিধায় ইসলাম আয়-উপার্জনকে কখনো নিরুৎসাহিত করেনি। বরং রাসূল সা.-এর অসংখ্য বাণীতে রুজি-রোজগারের ব্যাপারে উৎসাহ দানের পাশাপাশি হালাল-হারামের সীমারেখাও জানিয়ে দিয়েছেন। অর্থ-সম্পদের মোহ শ্বাসত। কিন্তু অতিরিক্ত মোহ মানুষকে দুর্নীতির দিকে ঠেলে দেয়। তাই রাসূল সা. বলেছেন, ধনী হওয়া সম্পদের প্রাচুর্যের নাম নয় বরং প্রকৃত সম্পদশালী সেই, যার অন্তর সম্পদশালী। অবৈধভাবে আহরিত সম্পদ অপবিত্র। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ পবিত্র। পবিত্র জিনিস ব্যতীত তিনি অন্য কিছু গ্রহণ করেন না।’ বৈধভাবে যতটুকু সম্পদ অর্জন করা হয়, ততটুকুতেই আল্লাহর অবারিত বরকত নিহিত থাকে। অবৈধ বা হারামভাবে আহরিত সম্পদে আল্লাহ বরকত দান করেন না। তিনি মানুষকে তাওহিদ, রেসালাত, আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন এবং আল কুরআনের অঙ্কিত আখিরাতের ভয়াবহ দৃশ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে ধন-সম্পদের প্রতি মোহকে সীমিত করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল আত্মার পবিত্রতা সাধন, মন মানসে মলিনতা, শোষণ এবং জৈবিক ও পাশবিক পঙ্কিলতা প্রক্ষালন করে মানুষের নৈতিক চরিত্রকে উজ্জীবিত করা। তিনি অর্থপূজা, বৈষয়িক অর্থসম্পদের প্রতি আসক্তি এবং প্রাচুর্যের অহমিকাকে এমনভাবে নিরুৎসাহিত করেছেন যে, প্রতিটি নাগরিক তাদের প্রয়োজন পূরণ ব্যতীত অতিরিক্ত সম্পদের প্রতি লোভ-লালসার দুষ্ট চিন্তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন। এমনকি অতিরিক্ত সম্পদ কোনক্রমে এসে গেলেও রাসূল সা.-এর: নৈতিক শিক্ষার প্রভাবে তাঁরা অন্য অভাবীদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। অভাবীরাও নৈতিক শিক্ষার প্রভাবে এতটুকুই সংযম ও ধৈর্য অবলম্বল করেছিলেন যে, চরম ক্ষুধার্থ অবস্থায়ও তাঁরা তাঁদের অভাব প্রকাশ করতেন না। এভাবে তিনি নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের মাঝে মধ্যমপন্থার এক অর্থ ব্যবস্থা কায়েম করেন।
মধ্যমপন্থার অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা : রাসূল সা. প্রথমত মানুষকে মধ্যমপন্থার জীবন-যাপনে অভ্যস্ত করে গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালান। তিনি বলেছেন, “দারিদ্র্য ও প্রাচুর্য উভয় অবস্থায়ই অর্থব্যয় করার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে হবে।” একদিকে অর্থ-সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যমনীতি ও মিতব্যয়িতা, অন্যদিকে সঙ্কীর্ণতা-কৃপণতা বর্জনের নির্দেশ দেন। একটি ভারসাম্যপূর্ণ জাতির নেতা হিসাবে আল্লাহ তায়ালাও তাঁর রাসূলকে এ ধরনের নসিহতই করেছেন: “তোমার হাত গলার সাথে বেঁধে রেখো না, আর একেবারে খোলা ছেড়েও দিও না-অন্যথায় তুমি তিরস্কৃত ও অক্ষম হয়ে যাবে।” (সূরা বনি ইসরাইল : ২৯) এর অর্থ হলো লোকদের মধ্যে এতটুকু ভারসাম্যতা থাকতে হবে যাতে তারা কৃপণ হয়ে অর্থের আবর্তন রুখে না দেয় এবং অপব্যয়ী হয়ে নিজের অর্থনৈতিক শক্তি ধ্বংস না করে ফেলে। এর বিপরীত পক্ষে তাদের মধ্যে ভারসাম্যের এমন সঠিক অনুভূতি থাকতে হবে যার ফলে তারা যথার্থ ব্যয় থেকে বিরত হবে না। আবার অযথা ব্যয়জনিত ক্ষতিরও শিকার হবে না। এ ভারসাম্য শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, মুসলমানদের জীবনের সামগ্রিক ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য। রাসূল সা.-এর শিক্ষা হচ্ছে প্রত্যেক ব্যক্তি যেন নিজের আর্থিক সঙ্গতির মধ্যে থেকেই অর্থ ব্যয় করে। আবার সে যেন নিজের অর্থনৈতিক সামর্থ্যরে তুলনায় অনেক কম খরচ করার মতো কার্পণ্যও না দেখায়। একদিকে খরচ করতে করতে নিজের আয়ের অংককে ছাড়িয়ে যায় এবং নিজের আজেবাজে খরচের জন্য ঋণ করতে বাধ্য হয়। অবশেষে ঋণ পরিশোধ করার সঙ্গতি না থাকায় নিজের শেষ সম্বল হাতছাড়া হয় এবং তাকে ফকির-মিসকিনের খাতায় নাম লিখাতে হয়। যাকে অপব্যয়ী পরিণাম বলতে পারি। অন্যদিকে নিজের আয় ও অর্থনৈতিক উপায় উপকরণের সীমার মধ্যে থেকে ব্যয় করার অর্থ এ নয় যে, সে ভালো আয় উপার্জন করলে নিজের সব টাকা পয়সা কেবলমাত্র ব্যক্তিগত আয়েশ আরাম ও ভোগ বিলাসিতায় উড়িয়ে দেবে, আর অন্যদিকে তার আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীরা চরম সংকটের মধ্যে দিন যাপন করবে। এ উভয় ধরনের বাহুল্য ও স্বার্থান্ধকে রাসূল সা. দূর করেন। শুধু নৈতিক শিক্ষা দিয়ে ক্ষান্ত হননি বরং কার্পণ্য ও অমিতব্যয়িতার চূড়ান্ত অবস্থা প্রতিরোধের জন্য আইন প্রণয়ন করেন। মোট কথা নৈতিক শিক্ষা ও আইন কানুনের মাধ্যমে মানুষকে মধ্যপন্থা তথা সহজ-সরল-অনাড়ম্বর জীবন যাপনের নির্দেশ দেন এবং উপার্জিত সম্পদ নিজের অপারগ ভাইদের সাহায্য করার নির্দেশ দেন। এ মধ্যমপন্থাকে কার্যকর করার জন্য আল্লাহর নির্দেশে তিনি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কতগুলো পন্থা (ঞড়ড়ষং) কায়েম করেন। যার মধ্যে যাকাত, উশর, মিরাস, খারাজ ও সাধারণ কর ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
যাকাতভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা : সম্পদ যাতে শুধু ধনীদের মাঝে আবর্তিত না হয়, সে জন্য যাকাতভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা ধ্বংস করে একটি ন্যায়নীতির অর্থব্যবস্থা কায়েমের জন্য যাকাত সর্বপ্রধান হাতিয়ার। ইসলামী অর্থনীতিতে যাকাত যদিও ধনী ব্যক্তির প্রতি ফরয করা হয়েছে, কিন্তু মূলত এটি একটি সামাজিক ও জাতীয় কল্যাণ ব্যবস্থা। জাবির বিন আব্দুল্লাহ রা. বলেন, আমি নবী সা.-এর কাছে বাই’আত গ্রহণ করেছি নামায কায়েম করার জন্য, যাকাত দেয়ার জন্য এবং প্রতিটি মুসলমানের কল্যাণ কামনার জন্য। (বুখারী-মুসলিম) রাসূল সা. যাকাতের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বের কথা এত বলিষ্ঠভাবে বলে দিয়েছেন যে, ইহা আদায় না করলে সম্পদ বেড়ে তা ধ্বংসে পরিণত হবে। হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.কে বলতে শুনেছি, যে সম্পদের সাথে যাকাতের সংমিশ্রণ ঘটে তা সম্পদকে ধ্বংস করে দেয়। (বুখারী) যাকাত কল্যাণ ফান্ডের প্রধান উৎস। যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে যাকাত আদায়ের নির্দেশ এলো তখন রাসূল সা. বিভিন্ন প্রকার সম্পদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত নিসাব (যে সর্বনিম্ন পরিমাণের ঊর্ধ্বে যাকাত অপরিহার্য) পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন। অতঃপর নিসাব পরিমাণ বা তদূর্ধ্ব বিভিন্ন প্রকার সম্পদের ওপর যাকাতের বিভিন্ন হার নির্ধারণ করেছেন। সোনা, রূপা ও নগদ টাকা পয়সার ওপর শতকরা আড়াইভাগ এবং কৃষি উৎপাদনের ওপর সেচব্যবস্থার আওতাধীন জমি হলে শতকরা ৫ ভাগ ও সেচ ব্যবস্থার আওতাবহির্ভূত জমি হলে শতকরা ১০ ভাগ ব্যবসায়িক পণ্যের ওপর শতকরা আড়াই ভাগ, খনিজ দ্রব্যাদি (নিজস্ব মালিকানাধীন) ও গুপ্তধনের ওপর শতকরা বিশভাগ যাকাত ধার্য করেছেন। এভাবে তিনি ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত গবাদিপশু প্রভৃতি চতুষ্পদ প্রাণীর ওপর বিভিন্ন হারে যাকাত ধার্য করেছেন।
দান খয়রাতে উদ্বুদ্ধকরণ : ইসলামী সমাজব্যবস্থায় পেশাদার ভিক্ষুকের কোন স্থান নেই। তবে কোন ব্যক্তি হয়তো ঘটনাচক্রে বিপদগ্রস্ত হয়ে সওয়াল করতে পারে, তার জন্য ইসলাম সুপারিশ করেছে যে, ‘আর প্রার্থীকে তুমি ফিরিয়ে দেবে না।” (সূরা দোহা) সমাজে এমন লোক আছে যারা বাহ্যত সুখী সচ্ছল বলে মনে হয়। প্রকৃতপক্ষে তারা সচ্ছল নয়; আত্মমর্যাদাবোধ তাদেরকে অন্যের নিকট হাত পাততে মানা করে। ইসলাম এ সমস্ত জনগোষ্ঠীর সাহায্যার্থে বিত্তশালীদেরকে নির্দেশ দিয়েছে। রাসূলল্লাহ সা. বলেছেন, তোমার ওপরে সায়েলের অধিকার আছে-চাই সে ঘোড়ার ওপর সওয়ার হয়েই আসুক।” (আবু দাউদ)
সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা : সুদ অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি সর্বোপরি মানব সভ্যতার জন্য জঘন্য একটি প্রথা। প্রাক-হিজরি যুগে ইহুদিদের আর্থিক শোষণের শিকার ছিল দরিদ্র আনসারগণ। সুদ পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থারও শোষণের এক কার্যকরী হাতিয়ার। সুদ অর্থের আবর্তন ও ঘূর্ণায়মানকে বন্ধ করে দেয় বিধায় আওয়াম মানুষের হাত থেকে অর্থ গুটিকয় মানুষের হাতে গিয়ে পুঞ্জীভূত হয়। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। নতুন নতুন শিল্প-কলকারখানা প্রতিষ্ঠার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ফলে প্রোডাকশন বন্ধ হয়ে কর্মসংস্থানের সৃষ্টির পথও বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে সুদ অর্থনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে। সম্পদ শুধু একদিকে চলে এবং সমাজে বিনিয়োগের প্রবাহ কমে যায়। সম্পদ বৃদ্ধির পরিবর্তে কমে যেতে থাকে। সুদি সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ বলতে কিছুই থাকে না। যে সমাজে এ মরণব্যাধি সুদ প্রচলিত, সে সমাজের বাহ্যিক রূপ দেখে যতই সুস্থ-সবল ও সুন্দর মনে হোক না কেন, ভেতরে ভেতরে কাঠকীট কুরে কুরে সে সমাজটিকে তোষ করে দেয়। বর্তমান বিশ্বের আধুনিক রাষ্ট্রগুলো তার সাক্ষী। সে সব সমাজের মানুষগুলোর সামাজিক বন্ধন খুব নড়বড়ে। এর প্রধান কারণ হলো সুদ। সুদখোর ব্যক্তি টাকার পিছনে পাগলের মতো ছুটে ভারসাম্যহীন ব্যক্তিতে পরিণত হয়। নিজের স্বার্থপরতার মাত্রা এতটুকু বৃদ্ধি পায় যে, সে তখন পৃথিবীর কোন কিছুই পরোয়া করে না। তার সুদখোরির কারণে এক পর্যায়ে মানবিক প্রেম-প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব ও সহানুভূতির মাত্রা শূন্যের কোটায় নেমে আসে। তখন সে তার নিজের লোককেও চরম বিপদের সময়ে বিনা সুদে ধার দিতে কুণ্ঠাবোধ করে। সুদ তাকে এতটুকু অন্ধ করে তুলে যে, জাতীয় সামষ্টিক কল্যাণের ওপর কোন ধ্বংসকর প্রভাব পড়লো এবং কত লোক দুরবস্থার শিকার হলো এসব বিষয়ে তার কোন মাথা ব্যথাই থাকে না। রাসূল সা. বলেছেন, “সুদ যাই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তার পরিমাণ কম হতে বাধ্য।” (ইবনে মাযাহ, আহমাদ) তাই সুদমুক্ত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য রাসূল সা.-এর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত জোরালো। সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত এক হাদীসে তিনি সুদদাতা, সুদগ্রহীতা, সুদের লেখক এবং সুদি লেনদেনের সাক্ষীদ্বয়ের প্রতি লানত করেছেন। তিনি বলেছেন, তারা সকলেই সমান অপরাধী। তিনি আরো বলেছেন, সুদের সত্তর প্রকার গুনাহ রয়েছে। এর সর্বনিম্ন গুনাহ হলো নিজের মায়ের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হবার সমতুল্য। (ইবনে মাযাহ) বিদায় হজের ভাষণে তিনি বলেছেন, “জাহিলি যুগের সমস্ত সুদও বাতিল করা হলো (এখন আর কেউ কারো কাছে সুদ দাবি করতে পারবে না) সর্বপ্রথম আমি নিজ খান্দানের সুদ-আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিবের সুদ বাতিল করে দিলাম।” এভাবে তিনি সুদি ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়ে অর্থের আবহ চালু করে দেন। কায়েম হলো সুদমুক্ত অর্থনীতি। কায়েম হলো ভ্রাতৃত্বমূলক দরদি সমাজ। ফলে মানুষ সকল স্বার্থপরতাকে ভুলে গিয়ে পারস্পরিক পরম বন্ধু ও কল্যাণকামী মানুষে পরিণত হলো। আমরা আনসার ও মোহাজিরদের হিজরত পরবর্তী দুরবস্থার সময় তাদের পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা থেকে এর বাস্তব উদাহরণ দেখতে পাই। যেই সমাজ ছিল মানুষের জান-সম্পদের চরম শত্রু, রাসূল সা.-এর নৈতিক শিক্ষা ও সুষম অর্থনীতি চালুর বদৌলতে তারা হয়ে গেলো পারস্পরিক জান-সম্পদের পরম বিশ্বস্ত বন্ধু ও পাহারাদার।
সম্পদ উৎপাদনে উৎসাহ দান : ইসলাম মানুষকে অর্থোপার্জনের পুরোপুরি স্বাধীনতা দিয়েছে এবং তাদের জন্য সম্পদ উৎপাদনের বিভিন্ন পথ নির্দেশ করেছে, যাতে তারা সম্পদ উৎপাদন করে নিজেদের কাজে লাগায় এবং অন্যদেরকেও তা থেকে উপকৃত হওয়ার সুযোগ দেয়। রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর অনুসারীদেরকে শিক্ষা দিতেন যেন তারা আল্লাহর সম্পদ থেকে উপকৃত হয়। এ ক্ষেত্রে অতি সামান্য বিষয়েও তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। “রাসূলুল্লাহ সা. একবার একটি মৃত বকরি দেখতে পেলেন, যা মায়মুনার কোন দাসকে দেয়া হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, তোমরা এর চামড়া থেকে ফায়দা নিচ্ছ না কেন? লোকেরা বলল, এটি তো মৃত। তিনি বললেন, কেবলমাত্র এটি ভক্ষণ করাই তো হারাম।” (সহীহ বুখারী, মুসলিম, মুয়াত্তা)
বেকার সমস্যা দূরীকরণ : রাসূল সা.-এর জীবন চরিত অধ্যয়ন করলে দেখা যায় যে, তিনি মানুষের কর্মসংস্থানের বিভিন্ন পদ্ধতি বলে দিতেন। তাঁর কার্যধারা থেকে এ ধরনের অসংখ্য নজির আমরা দেখতে পাই। বুখারী, মুসলিম ও আবু দাউদের বর্ণিত জনৈক বেকার আনসারীর হাদীসটি উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে আজো আমাদের প্রেরণা জোগায়। একমাত্র সহায় তার কম্বলখানি বিক্রি করে একটি কুঠার খরিদ করে দেন এবং নিজের হাতে একটুকরা কাঠের হাতল লাগিয়ে দিয়ে জঙ্গলে কাঠ খেটে জীবন নির্বাহের আদেশ দেন। আবু হোরায়রা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “তোমাদের যে কোন লোকের জন্য মানুষের নিকট হাত পাতার চাইতে রশি নিয়ে জংগলে গিয়ে কাঠ সংগ্রহ করে জীবিকা অর্জন করা অনেক ভাল।” (বুখারী) আবু হোরায়রা রাঃ নবী সা. থেকে বর্ণনা করেছেন “আল্লাহর নবী দাউদ (আ) নিজের হাতে কাজ করে উপার্জিত খাদ্য গ্রহণ করে জীবন ধারণ করতেন। (বুখারী) এভাবে তিনি মানুষকে কাজের জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। যার কারণে মানুষ রুজি- রোজগারে দৈহিক পরিশ্রম লেগে গিয়েছিল। আয়েশা রা. বর্ণনা করেছেন, “রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাহাবীগণ রুজি উপার্জনের জন্য নিজেরাই দৈহিক পরিশ্রম করতেন। এ কারণে তাদের শরীর থেকে ঘামের গন্ধ আসত। তাই তাদেরকে বলা হয়েছিল, তোমরা গোসল করলে ভালো হতো।” (বুখারী)
দারিদ্র্য বিমোচন : নবী সা. ব্যক্তি তথা গোটা সমাজব্যবস্থার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে সাথে ব্যক্তিকে নৈতিক বলে বলীয়ান করেন। নৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় বান্দাহ হিসেবে পরবর্তী জীবনে গৌরবের সাথে কাল কাটাবার বন্দোবস্ত করেন। এটিই ইসলামী অর্থনীতির মূলনীতি। নবী সা. এ নীতির ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। নৈতিক এ বলের মাধ্যমে ব্যক্তি সমাজের অংশ হিসাবে অন্য ব্যক্তির সুখ-দুঃখ ও সুবিধা-অসুবিধায় সহযোগিতা করা নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে গোটা সমাজ থেকে দারিদ্র্য বিতাড়িত হয় এবং দৈনন্দিন জীবনে সুঃখ স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি পায়। এ জন্য তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে জনগণের অতিরিক্ত আয় থেকে যাকাত, সাদকা, ট্যাক্স ইত্যাদি আদায়ের ব্যবস্থা করেন।
ভিক্ষাবৃত্তির উচ্ছেদ : ভিক্ষাবৃত্তিকে রাসূল সা. পছন্দ করতেন না বিধায় তিনি তা উচ্ছেদে যথাযথ ভূমিকা রাখেন। তিনি বলেছেন, “সেই আল্লাহর কসম, যার মুঠোয় আমার প্রাণ, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ, যে জঙ্গলে যায় এবং কাঠ কেটে তা পিঠের ওপর বয়ে নিয়ে বিক্রি করে ঐ ব্যক্তি হতে, যে অন্যের কাছে গিয়ে সওয়াল করে এমতাবস্থায় যে, সে তাকে কিছু দিতেও পারে কিংবা নাও দিতে পারে।” ইসলামী সমাজব্যবস্থায় বৈরাগ্যবাদকে যেমন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে তেমনি ভিক্ষাবৃত্তিকেও একটি জঘন্যতম পেশা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রাসূল সা. ভিক্ষা দ্বারা অর্জিত সম্পদকে ‘জাহান্নামের উত্তপ্ত পাথর’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।” তারা (ভিক্ষুুক) জাহান্নামের অগ্নি দ্বারা উত্তপ্ত পাথর চিবাবে।” (বুখারী) “তোমাদের মধ্যে যে ভিক্ষা করে সে যখন আল্লাহর সামনে যাবে তখন তার চেহারায় মাংসের একটি টুকরাও থাকবে না। (বুখারী, মুসলিম) এভাবে তিনি ভিক্ষাবৃত্তিকে কঠোর হস্তে দমন করে কর্মঠ স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ফলে হাজরা থেকে সানায়া মাউত পর্যন্ত একজন ভিক্ষুক খোঁজে পাওয়া যেত না। এমনকি মানুষ যাকাতের টাকা নিয়ে মানুষের দ্বারে ঘুরে বেড়াত কিন্তু কোন যাকাত গ্রহণকারী খোঁজে পাওয়া যেত না।
শোষণমুক্ত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা : হযরত মুহাম্মাদ সা. বিবদমান, বিভক্ত উপজাতি, শহরবাসী ও দূরবর্তী অঞ্চলের বেদুঈনদের নিয়ে এমন এক সমাজ (উম্মাহ) প্রতিষ্ঠা করলেন যার ভিত্তি ‘ঈমান’। দূর হলো দ্বন্দ্ব ও কলহ। গোষ্ঠীগত আভিজাত্য, বংশগৌরব, ধন ও ঐশ্বর্যের প্রাধান্য বিলীন করে দিয়ে তিনি ঘোষণা করলেন ‘এক ভাই অপর ভাইকে শোষণ করতে পারে না; একজন অপরজনকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না।” এ জন্য তিনি শোষণের কার্যকরী হাতিয়ার সুদকে সমাজ থেকে সমূলে উচ্ছেদ করেন।
ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ : রাসূল সা. নিজে একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে তিনি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। তিনি মুদারাবা (শরিকানা) বিনিয়োগের আওতায় হযরত খাদিজা রা.-এর সাথে ব্যবসা করেছেন। এ ব্যবসায় এক পক্ষের থাকবে পুঁজি যাকে সাহিবুল মাল বা পুঁজি বিনিয়োগকারী বলে অপর পক্ষ তার বিশ্বস্ততা, মেধা, শ্রম ও সময় দান করে ব্যবসা পরিচালনা করবে যাকে মুদারিব বা ব্যবসা পরিচালনাকারী বলে। উভয়পক্ষ পূর্বচুক্তি অনুযায়ী লাভ-লোকসান ভাগ করে নিবে। এ ব্যবসায় রাসূলে করীম সা. ছিলেন মুদারিব তথা ব্যবসা পরিচালনাকারী এবং খাদিজা রা.- ছিলেন সাহিবুল মাল বা পুঁজি দাতা। রাসূলে আকরাম সা. তাঁর বিশ্বস্ততা, সততা, শ্রম, মেধা ও সময় দান করে ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। হযরত খাদিজাকে রা. প্রচুর লাভ দিয়েছেন। তাঁর ব্যবসায়িক বিশ্বস্ততা ও সততার কারণেই ধনাট্য মহিলা তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব প্রদান করেন। ব্যবসা করার জন্য তিনি জনগণকে অনেক উৎসাহ ও উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি বলেছেন, “বিশ্বস্ত সত্যাশ্রয়ী ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন শহীদদের সাথে অবস্থান করবে।” (ইবনে মাযাহ)
রাসূল সা. ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সকল প্রকার অন্যায় আচরণ দূর করেছিলেন। তিনি ব্যবসা বাণিজ্যে থেকে বিভিন্ন অন্যায় কাজ তথা খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্য জিনিসে ভেজাল মেশানো, মজুদদারির মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ফায়েদা লুটা, প্রতারণাপূর্ণ দালালির মাধ্যমে উচ্চ দাম হাঁকানো, মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের নিমিত্তে লোভনীয় কৃত্রিম কোন উপায় অবলম্বন করা, মিথ্যা শপথের মাধ্যমে বিক্রয় করা, বিক্রীত মালামালের দোষ ত্রুটি গোপণ করা, চোরাই ব্যবসা করা, মাপে বা ওজনে কমবেশি করা ইত্যাদি সকল প্রকার কাজ ও কর্ম উচ্ছেদ করেছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত। “এক ব্যক্তি নবী সা.-এর নিকট বলল যে, ক্রয় বিক্রয়ে সে প্রতারিত হয়। তিনি বললেন, যখন তুমি খরিদ করবে তখন বলবে, যেন ধোঁকা না দেওয়া হয়।” (বুখারী) আবু হোরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.কে বলতে শুনেছি : “মিথ্যা শপথের দ্বারা পণ্যসামগ্রী বিক্রি হয়ে যায় বটে কিন্তু এতে বরকত বা কল্যাণ ধ্বংস হয়ে যায়।” (বুখারী) আব্দুল্লাহ ইবনে আবু আওফা রা. হতে বর্ণিত। “এক ব্যক্তি তার পণ্যদ্রব্য বিক্রির জন্য বাজারে নিয়ে মুসলমানদের কাউকে ফাঁদে ফেলার জন্য আল্লাহর নামে শপথ করে-ঐ মাল সে যত দামে কিনেছে তা এখনও কেউ বলেনি। তখন এ আয়াত নাযিল হয়: “যারা আল্লাহর সাথে কৃত চুক্তি ও নিজেদের শপথ তুচ্ছ মূল্যে বিক্রয় করে।” (বুখারী) হযরত উমার রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, “নবী সা. প্রতারণাপূর্ণ দালালি করতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী) হাকিম ইবনে হিযাম রা. থেকে বর্ণিত নবী সা. বলেছেন, “ক্রেতা এবং বিক্রেতা ক্রয়-বিক্রয় শেষে পরস্পর বিচ্ছিন্ন না হওয়া ক্রয়-বিক্রয় বাতিল করার এখতিয়ার থাকে। যদি তারা উভয় সত্য কথা বলে এবং দোষ বর্ণনা করে, তাহলে এ ক্রয়-বিক্রয়ে উভয়কেই বরকত দান করা হয়ে থাকে। কিন্তু যদি মিথ্যা কথা বলে ও দোষ গোপন করে, তাহলে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের বরকত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।” (বুখারী) আবু হোরায়রা রা. হতে বর্ণিত। নবী সা. বলেছেন, “তোমরা (বিক্রয়ের পূর্বে) উষ্ট্রী ও বকরির বাঁটে দুধ জমিয়ে রেখো না।” (বুখারী)
এভাবে তিনি ব্যবসায় জুলুম, ধোঁকাবাজি, প্রতারণা, ঠগবাজি, মুনাখোরি, কালোবাজারি এবং হারাম জিনিস যেমন- মাদকদ্রব্য, শূকর, মূর্তি, প্রতিকৃতি ব্যবসা করা হারাম বলেছেন। নবী সা. একদিন সালাতের জন্য বের হয়ে দেখতে পেলেন লোকজন কেনাবেচা করছে, তখন তিনি তাদেরকে ডেকে বলেন, ‘হে ব্যবসায়ী লোকেরা! কিয়ামতের দিন ব্যবসায়ীরা মহা-পাপীরূপে উঠবে; তবে তারা নয়, যারা আল্লাহকে ভয় করবে, সততা ও বিশ্বস্তা সহকারে ব্যবসা করবে। (তিরমিযি, ইবনে মাযাহ) রাসূল সা. আরো বলেছেন, হে ব্যবসায়ীরা! তোমরা মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কারবার থেকে অবশ্যই দূরে থাকবে।’ (তিবরানী)
ইসলামে ব্যবসার নীতির মূল কথা হলো সামষ্টিক কল্যাণ। রাসূল সা. ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা এবং দীনি দাওয়াত ও মসজিদ নির্মাণ করেছেন, তেমনি তিনি মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য মদিনাতে একটি ইসলামী বাজার বানিয়েছিলেন। বনু কাইনুকার এ বাজারটির দায়িত্বও তিনি নিয়েছিলেন।
উপসংহার
সর্বকালের সফল একজন অর্থনীতিবিদ হিসাবে রাসূল সা.কে জানতে হলে তাঁর জন্মের সমসাময়িক যাযিরাতুল আরবের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার কথা আমাদের সর্বাগ্রে জানতে হবে। একটি সুস্থ অর্থনীতির জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থীতিশীলতা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু রাসূল সা.-এর জন্মের সময় মক্কা ও তার আশপাশের সার্বিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক ও ভয়াবহ। জন্মের পরপরই তিনি দেখতে পেলেন বংশ পরস্পরায় দীর্ঘমেয়াদি অন্যায় যুদ্ধ, সন্ত্রাস, কাটাকাটি, মারামারি, খুনখারাবি ও রাহাজানি। একটি সুস্থ ও গতিশীল অর্থনীতির জন্য এ সবগুলোই অন্তরায়। যদিও এ অবস্থার জন্য তৎকালীন মানুষের অর্থনৈতিক দুরবস্থা কোন অংশে কম দায়ী ছিল না তথাপি এগুলোর জন্য অর্থনীতিকে সামনে দিকে এগিয়ে নেয়া খুবই দুরূহ ব্যাপার ছিল। হযরত মুহাম্মাদ সা. মানবতার মুক্তির দূত হিসাবে আবির্ভূত হলেন। ফলে মানুষের সার্বিক অবস্থার সাথে সাথে বদলে গেল অর্থনৈতিক অবস্থাও।
এ মহামানবের অর্থনৈতিক আদর্শ ছাড়া আজো মানুষের মুক্তির চিন্তা করা মানে একটি পরীক্ষিত জলজ্যান্ত বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই নয়। বর্তমানের অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত এ পৃথিবীটাই প্রধান সাক্ষী। খুব নিকট ইতিহাসে ঘটে যাওয়া দুটি পচাবস্তা অর্থনৈতিক মতবাদ (অর্ধেক অর্ধেক পৃথিবী ভাগ করে) মানুষের ওপর প্রয়োগ করে পরীক্ষা বা এক্সপেরিমেন্টাল করা হয়েছে। মানুষের জীবনে শান্তি তো আসে-ইনি বরং উল্টো মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। এর একটি হলো সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা, যা মানুষের সকল যোগ্যতাকে মই দিয়ে সমান করে গরুর খোঁয়াড়ের ন্যায় একই খাদ্য পরিবেশন করা হলো, তখন মানুষ চটকদারি মতবাদের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মুক্তির জন্য নাড়া দিয়ে উঠলো। ফলে মতবাদটি নিজ দেশেই আত্মহনন করতে বাধ্য হলো। বর্তমান পৃথিবীর এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত দাবড়িয়ে চলেছে আরেক মতবাদ পুঁজিবাদ/মুক্তবাজার। রাক্ষুসে ঘোড়া নামক এ মতবাদটিও মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। পুঁজিবাদ নামক এ শোষণ নীতিরই ফল হলো বর্তমান পৃথিবীর অন্যায় ও আমানবিক যুদ্ধগুলো। অন্যের সম্পদ লুট করার জন্য পৃথিবীর সার্বভৌমত্বের সকল নিয়ম-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে অন্যের সীমার মধ্যে অন্যায়ভাবে প্রবেশ করা হচ্ছে। জনপদের পর জনপদ ধ্বংস করা হচ্ছে। এসবগুলোই পুঁজিবাদের ফল।
এভাবে মানবরচিত বা মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত বিভিন্ন আইন ও কানুন দিয়ে পৃথিবী নামক ছোট্ট গ্রহটিতে শান্তি আনয়নের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে-সাধনা করা হচ্ছে। কিন্তু শান্তি তো দূরের কথা বরং মানুষ এসব মতবাদের চাপায় পড়ে শুধু শুধুই পিষ্ট হচ্ছে। কিন্তু রাসূল সা.-এর অর্থনৈতিক চিন্তা-চেতনার দিকে নজর দেয়া হচ্ছে না। আমরা কুরআন ও রাসূলের চরিত অনুযায়ী নামায, রোযা, হজ পালন করছি কিন্তু আল কুরআন ও রাসূলের সুন্নাহ অনুযায়ী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করছি না। ফলে মানুষের মস্তিষ্ক তৈরি অর্থনৈতিক মতবাদ ও কর্মকাণ্ড বিশ্বব্যাপী সামাজিক বিদ্বেষ, হানাহানি ও বিভেদের বিষবৃক্ষ বপন করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো রাসূলের জীবনচরিতের কাছে ফিরে আসা। সর্বকালের সফল অর্থনীতিবিদ মুহাম্মাদ সা.-এর অর্থব্যবস্থার প্রচলন করা।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও ইসলামী চিন্তাবিদ

SHARE

Leave a Reply