সিরাতুন্নবী সা. অধ্যয়ন, গুরুত্ব ও পদ্ধতি -আবু জাফর মুহাম্মাদ ওবায়েদুল্লাহ

অধুনা বিশ্বব্যাপী ইসলামবিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে ইসলাম, মুসলিম এবং শরিয়াহ সম্পর্কে সত্য-মিথ্যা মিশ্রিত ব্যাপক প্রচারণার শিকার করা হচ্ছে। ইসলামকে অন্যান্য ধর্মের ন্যায় বিবেচনা করে ঢালাওভাবে ‘Religion is opium to people’ এবং ধর্ম অবৈজ্ঞানিক, অযৌক্তিক ও বাস্তবতা বিবর্জিত বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। এমনকি ইসলামের পরিপূর্ণতা যার মাধ্যমে হয়েছে সে নবী, হযরত মুহাম্মাদ সা.-এর পবিত্র চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ‘তথ্যযুদ্ধ’ শুরু করা হয়েছে। নিকট অতীতে আমরা দেখেছি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মনীষীগণ হযরত মুহাম্মাদ সা. সম্পর্কে তাঁদের বই, প্রবন্ধ, ইতিহাসগ্রন্থে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কিন্তু, অতি সম্প্রতি ধর্মবিমুখ নাস্তিকদের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের নিষ্ঠাবান অনেক অনুসারীও এসব কদর্যতার মাঝে নিমজ্জিত হচ্ছেন। এই প্রেক্ষাপটে সিরাতুন্নবী সা. অধ্যয়ন: গুরুত্ব ও পদ্ধতি শীর্ষক একটি ছোট্ট লেখার তাকিদ অনুভব করছি।

সিরাত ও তারিখ

আরবি ক্রিয়া ‘সিরা’ হয়েছে সিরাতের শব্দমূল। এর অর্থ হলো- ১. যাওয়া, রওয়ানা হওয়া, চলা। ২. তরিকা বা মাযহাব ৩. সুন্নাহ ৪. আকৃতি ৫. অবস্থা ৬. কীর্তি ৭. কাহিনী, প্রাচীনকালের লোকদের ঘটনার বিবরণ ৮. বিশেষভাবে রাসূল সা.-এর যুদ্ধসমূহের বিবরণ এবং পরবর্তীতে ৯. রাসূলুল্লাহ সা.-এর অমুসলিমদের সাথে যুদ্ধ ও সন্ধি বিষয়ে কৃত আচার-আচরণের বিবরণ। অধিকতর গ্রহণযোগ্য সর্বশেষ অর্থ হচ্ছে তাঁর সকল অবস্থার বর্ণনা অর্থাৎ জীবনচরিত (Biography).
বিস্তৃতভাবে সিরাত বলতে গেলে ড. আবদুস সামীর ‘সিরাতুন্নবী’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলতে হয়; “এটি হচ্ছে রাসূল সা.-এর জন্ম থেকে শেষ পর্যন্ত জীবনকথা, তাঁর পরিবার, সমাজ, বংশের ইতিকথা, তাঁর জীবন বিকাশের ঘটনাপ্রবাহ, তাঁর দাওয়াত, তাঁর প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, সমসাময়িক মুসলমানদের বর্ণনা ও ইতিহাস, তাঁর সাথে বিভিন্ন মানুষের দেখা সাক্ষাৎ, রাসূল সা.-এর হিযরত, মক্কা হতে মদিনায় গমন, আল্লাহর পথে জিহাদের বর্ণনা, যুদ্ধসমূহের বর্ণনা, এ সমস্ত জিহাদে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের বর্ণনা এবং রাসূল সা.-এর ওফাতকালীন বর্ণনা”- এসব কিছুই হচ্ছে সিরাতুন্নবী সা.।
‘সিরাত’ আরবদের একটি পুরনো শাস্ত্র। ইবনে ইসহাকের সিরাতে ইবনে ইসহাক, একটি আদর্শ সিরাতগ্রন্থ, বলা যায় হযরত মুহাম্মাদ সা.-এর এটিই প্রথম আদর্শ জীবনীগ্রন্থ। সিরাতের পাশাপাশি ঘটনাপ্রবাহের জন্য আমরা তারিখ, বা ইতিহাসগ্রন্থ অধ্যয়ন করে থাকি। ইতিহাসগ্রন্থে একজন ঐতিহাসিক সৃষ্টির শুরু থেকে তার সময় পর্যন্ত সংস্কৃতির অনুপুঙ্খ বর্ণনা প্রদান করেন। ইতিহাস এবং সিরাতের মূল পার্থক্য এর বিশুদ্ধতা, নিরপেক্ষতা ও সত্যতা বিষয়ে।

সিরাতুন্নবী সা. কিভাবে গড়ে উঠলো?

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনে কারীমে বলেছেন, “তোমাদেরকে উত্তম জাতি হিসেবে বের করে আনা হয়েছে, মানবকুলের জন্য। তোমরা সৎকাজের আদেশ দেবে, অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকবে। আর আল্লার ওপর ঈমান পোষণ করবে।” (সূরা আলে ইমরান : ১১০)। শ্রেষ্ঠ উম্মতের জন্য আল্লাহ তায়ালা প্রেরণ করেন নবী শ্রেষ্ঠ, সাইয়্যেদুল মুরসালিন, খাতামুন নাবিয়্যিন হযরত মুহাম্মাদ সা.কে। আর নবীর ওপর অবতীর্ণ হয় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ হিদায়াতের গ্রন্থ “আল কুরআন”। এই কুরআন ‘লাওহে মাহফুজে’ সংরক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি নবীজীবনে প্রতিবিম্বিত হয়েছে প্রমিত ও প্রকৃষ্টভাবে।
তিনটি প্রধান উৎস থেকে আমরা সিরাতুন্নবী সা. পেয়ে থাকি।

আল কুরআন : প্রধান উৎস
কুরআন হচ্ছে মানবতার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত ‘মাস্টারপ্ল্যান’ আর হযরত মুহাম্মাদ সা. হচ্ছেন এর ‘প্রধান প্রকৌশলী’। তাঁর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ কুরআনের আদেশ নিষেধে ভরা।
“কুরআনের আয়াতসমূহ পাঁচ ভাগে অবতীর্ণ হয়। হালাল, হারাম, আদেশ-নিষেধ, মুতাশাবিহাত ও উদাহরণ (আমসাল) সমূহ। ‘তোমরা হালালকে হালাল, হারামকে হারাম মানো’ আহকামসমূহ অনুযায়ী আমল কর, আমসালসমূহ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো ও মুতাশাবিহাতের ওপর ঈমান পোষণ কর।”
মা আয়েশা রা.কে সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন- আপনি আমাদেরকে রাসূল সা.-এর চরিত্র সম্পর্কে বলুন। তিনি বললেন, “তোমরা কি কুরআন পড়োনি? রাসূল সা.-এর চরিত্র হচ্ছে কুরআনের প্রতিচ্ছবি।” আল কুরআন সেজন্যই বলেছে “নিশ্চয়ই রাসূল সা.-এর মাঝেই রয়েছে তোমাদের জন্য শ্রেষ্ঠতম আদর্শ।” পবিত্র কুরআনের ছত্রে ছত্রে নবী করিম সা.-এর জীবন ও তাঁর প্রদর্শিত পথ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। “আর আমরা উম্মিদের (নিরক্ষর) মধ্য থেকে একজনকে তাদের জন্য নবী করে পাঠালাম, যিনি তাদেরকে তাঁর (আল্লাহর) আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে শোনান, আত্মশুদ্ধির জন্য তাকিদ করেন, আর কিতাব ও হিকমাত শেখান।”
আল্লাহর রাসূল, তাঁর অনুসারীদের জন্য আল কুরআন অনুসরণের তাকিদ দিয়েছেন নানাভাবে। “তোমাদের মাঝে তারাই শ্রেষ্ঠ যারা কুরআন শেখে এবং শেখায়।”
রাসূল সা.-এর জীবনকে জানার জন্য প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ উৎস আল কুরআন। কুরআনের একটি সূরার নাম ‘সূরা মুহাম্মাদ’। এছাড়া কুরআনের ছত্রে ছত্রে রাসূল, তাঁর অনন্য সুন্দর গুণাবলি, তাঁর প্রতি ঈমান আনার গুরুত্ব, তাঁর পূতপবিত্র জীবন মেনে চলার তাকিদ উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে কুরআনের রেফারেন্সসমূহ মূলত নিম্নরূপ:
কুরআনুল কারীম রাসূল সা.-এর মুহাম্মাদ নামটি চারবার এবং ‘আহমদ’ নামটি একবার উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনের ২: ১০১, ২: ১৪৩, ২:১৫১, ৩:৩২, ৩:৮১, ৩:১৪৪, ৩:১৬৪, ৪:৭৯-৮০, ৫:১৫, ৫:৪১, ৭:১৫৭, ৮:০১, ৯: ৩, ৩৩-৪০, ৪৮:২৯ এবং ৬৬:০৯ আয়াতে তাঁর কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে সূরা আহযাব (৩৩ নম্বর সূরার ৪০ নম্বর আয়াতে এ নামটি পরিষ্কার করে বলা হয়েছে যে তিনি শেষ নবী ও আল্লাহর রাসূল। এ সমস্ত আয়াতে মুহাম্মাদ সা.-এর আকর্ষণীয় চরিত্র ও মানবতার বিকাশে তাঁর অবদান উল্লিখিত আছে। কুরআন যেহেতু জ্ঞানের বিশুদ্ধতম উৎস সে কারণে রাসূল সা.-এর কোনো জীবনীরচয়িতা বা তাঁর কোনো সাহাবী তাঁর জীবনকে ঘিরে এমন কোনো ঘটনা বর্ণনা করতে পারেন না যা কুরআনের শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক। কোনো সিরাত রচয়িতাই এই মৌল উৎসকে বাদ দিয়ে সিরাতের কিতাব রচনা করতে পারেন না। কুরআনের শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক কোনো ঘটনা সিরাতের অংশ হতে পারে না।

দ্বিতীয় উৎস : আল হাদিস

রাসূল সা.-এর কথা, কাজ ও অনুমোদনকে এক কথায় সুন্নাহ বা হাদিস বলা হয়।
হযরত উসমান রা.-এর সময়ে কুরআনকে একটি গ্রন্থাকারে সর্বসম্মতভাবে সঙ্কলিত করা হয় এবং তা হয় রাসূল সা.-এর নির্দেশনার আলোকেই।
রাসূল সা.-এর কোনো কথাই তাঁর কথা মাত্র নয়। কথাগুলো আল্লাহর, ভাষা নবীজি সা.-এর। আজ দীর্ঘদিন পরে হাদিসশাস্ত্র একটি পরিপূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক শাস্ত্র হিসেবে আমাদের কাছে পরিচিত। হাদিসসমূহ বর্ণনা করেছেন প্রত্যক্ষদর্শী সাহাবী, তাদের কাছ থেকে শোনা তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীগণ। সর্বাধিক পরিমাণ হাদিস বর্ণনা করেছেন হযরত আবু হুরাইরা রা.। প্রায় ষোলশত হাদিস বর্ণনাকারীর ইতিহাস লিপিবদ্ধ রয়েছে।
এসব বর্ণনাকারীকে নিয়ে রচিত হয়েছে- ‘আল আসমাউর রিজাল’ গ্রন্থ।
হাদিসসমূহ যাচাই বাছাই করে জাল, মউজু বা দুর্বল হাদিসসমূহ চিহ্নিত করার একটি অসাধারণ সুন্দর শাস্ত্র বিকশিত হয়েছে। ফলে এখন আর যেমন তেমন ভাবে, যে কোনো কথাকেই হাদিস হিসাবে গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই। এভাবে হাদিসে রাসূল সা. রাসূলের সিরাতের এক অনন্য দলিল।
“নবী জীবনের এটিও একটি মোজেজা যে, তাঁর জন্মের আগ থেকে ওফাতের পর পর্যন্ত হেন কোনো ঘটনা নেই, তা যত ছোটই হোক না কেন, যে এটি হাদিসে লিপিবদ্ধ নেই।” এত বড় Written documents আর কোনো বিশ্বব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রেই নেই।
হাদিস বর্ণনাকারীগণ সংখ্যায় অনেক। উম্মাহাতুল মুমিনিন ও জলিলক্বদর সাহাবীগণ আল্লাহর রাসূলের কথা, কাজ ও সম্মতি বিষয়গুলোকে বুকে ধারণ করেন। ধীরে ধীরে মুখে মুখে হাদিসশাস্ত্রের বিকাশ হতে থাকে। মানুষ হওয়ার কারণে বর্ণনাকারীদের কারো কারো বর্ণনায় শব্দ বা বিষয় বদলে যেতে থাকে। ফলে গড়ে উঠে হাদিসশাস্ত্র। বর্ণনাকারীদের পরস্পরা ঠিক থাকা, তাদের বর্ণনার সত্যতা যাচাই ও বাছাই করার একটি গ্রহণযোগ্য পন্থা গড়ে উঠে। হাদিস সঙ্কলনের এই বিশেষ শাস্ত্রটি সর্বজনগ্রাহ্য।
অবাক হওয়ার মতো বিষয় হচ্ছে- রাসূল সা. ছিলেন একটি খোলা বই, Open book. তিনি নিজ থেকেই বলেছেন- “আমার কাছ থেকে পাওয়া একটি কথা হলেও তা অন্যদের পৌঁছে দাও।” পৃথিবীর ইতিহাসে এমন মানব, আর কে যিনি এভাবে নিজের সব কিছু অন্যদের কাছে ব্যক্ত করতে চান?

তৃতীয় উৎস : ইসলামের ইতিহাস
বলা হয়ে থাকে History is written by the victors. মুসলিমগণ দীর্ঘদিন বিশ^ শাসন করেছেন। ফলে শিক্ষার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে ইসলামের সঠিক ইতিহাসও তৈরি হয়েছে। যদিও ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে প্রায় বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত দীর্ঘ একটি সময় মুসলিম দুনিয়া পশ্চিমাদের উপনিবেশে পরিণত হয়, সে সময় তারা পশ্চিমা বিশ^বিদ্যালয়ে ‘অরিয়েন্টাল স্কুল’ এর জন্ম দেয়, মুসলমানদের সমস্ত অর্জনকে করতলগত করে নিজেদের বলে চালিয়ে দেয় এবং নতুন ইতিহাস রচনার অপপ্রয়াস চালায়। বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে মুসলিমদের নতুন উন্মেষ হয়। ইতোমধ্যে ৫৭টি মুসলিম দেশ স্বাধীন হয়েছে। নতুন মুসলিম মনীষা সত্য-মিথ্যার আবর্জনা ঘেঁটে ইসলাম ও মুসলিমদের সত্য ইতিহাস খুঁজে বের করে আনছে এবং অনিবার্যভাবে তার বড় অংশ নবী মুহাম্মাদ সা.-এর জীবন ইতিহাস।
পশ্চিমাদের তৈরি করা বড় বড় ইতিহাসের বই ঠেলে বেরিয়ে এসেছে মুসলিম মনীষীদের তৈরি ইতিহাস গ্রন্থসমূহ।
ইসলামের সোনালি যুগের ঐতিহাসিকগণ সত্যনিষ্ঠা, নিরপেক্ষতার সাথে তারিখ এর গ্রন্থসমূহ লিখেছেন। সেখানে তারা ইতিহাসের ঘটে যাওয়া সত্যগুলোকে কোন রকম পক্ষপাতিত্ব ছাড়া সংরক্ষণ করেছেন। এমনকি, নবী করিম সা.-এর ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে এমন কোনও ইতিহাসও গোপন করেননি।
পরবর্তীকালে ইতিহাস বিকৃতি হয়েছে দেদার। বিশেষ করে পাশ্চাত্য লেখক বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় যে (Distorted) বিকৃত ইতিহাস রচনা করেছেন তা আমাদের নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করছে।

এরপরও ইতিহাসের সত্য উৎসগুলোকে রাসূলের সিরাতের একটি অন্যতম দলিল হিসেবে গণ্য করা যায়।
মূলত রাসূলের জীবনের সাথে নিজেদের নাম জড়িয়ে জগৎখ্যাত হওয়া ও অবিস্মরণীয় হয়ে থাকার প্রচেষ্টা বলেই অনেকে মনে করেন। অনেকের ধারণা বিশ্বখ্যাত এসব লোকগণ মুহাম্মাদ সা.-এর মতো সুনাম করলে, তাঁকে এতো মর্যাদা দিলেন, তো ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হলেন না কেন? এ বিতর্কের অবশ্য শেষ নেই।
প্রথম সিরাতগ্রন্থ হিসেবে আমরা পাই সিরাতে ইবনে হিশামকে। পরবর্তীকালে আরবি, ফার্সি, উর্দু, বাংলা, ইংরেজিসহ পৃথিবীর প্রায় সকল প্রধান ভাষাতেই সিরাতের গ্রন্থ রচিত হয়েছে। মুসলিম লেখকগণের পাশাপাশি অমুসলিম লেখকগণও রাসূলে আকরাম সা.-এর জীবনী লিখতে প্রয়াস পান।
বাংলাভাষায় নবীজীবনী বা সিরাতগ্রন্থ হিসেবে প্রথম বড় আকারে প্রকাশিত হয় গোলাম মোস্তফা রচিত ‘বিশ্বনবী’। ‘বিশ্বনবী’ ভাবাবেগে তাড়িত, সেখানে বর্ণনার আতিশয্য ও অতিমানব হিসেবে রাসূল সা.কে উপস্থাপনের প্রয়াস রয়েছে। আবেগমুক্ত, গবেষণাধর্মী সিরাতগ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা যায় আকরম খাঁ রচিত ‘মোস্তফা চরিত’কে।
বর্তমানে বাংলাভাষায় অনেক সিরাতগ্রন্থ পাওয়া যায়। এর অনেকগুলোই অন্যভাষায় রচিত সিরাত গ্রন্থসমূহের অনুবাদ। সিরাতুন্নবী সা.-এর মর্যাদাকে মাথায় রেখে বর্ণনার আতিশয্য, অলৌকিকত্ব আরোপ এবং অতিরঞ্জনমুক্ত ‘সিরাতগ্রন্থ’ রচনা এখনও অপরিহার্য।

সিরাতের গুরুত্ব কেন?
শুরুতেই বলেছি, সিরাত ও রাসূল সা. সম্পর্কে পশ্চিমা প্রোপাগান্ডায় পড়ে অনেক মুসলমান আজ বিভ্রান্ত হচ্ছে। আগে মক্তবে গেলে ছেলেমেয়েরা কুরআন শিখার পাশাপাশি দোয়া, দরুদ, রাসূলের জীবনী ইত্যাদি বিষয়েও মোটামুটি অবহিত হতো। সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে-
১. অধিকাংশ ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার পরও সিরাত সা. সম্পর্কে হয় সম্পূর্ণ অজ্ঞ। আর না হয় ভাসা ভাসা জ্ঞান রাখে যা মূলত ভুলে শুদ্ধে একাকার অবস্থায় সে কারও কাছ থেকে শুনেছে। মুসলিম হিসেবে তার যে নবীজীবন সম্যকভাবে জানা অপরিহার্য এ বিষয়টি সে নিজে যেমন বুঝতে পারেনি, তেমনি তাকে কেউ এ ব্যাপারে বিশেষ তাকিদ দেয়নি।
২. ফলে, যখন সে বর্তমানে ওঞ’র সুবাদে অন্যদের ব্যাপারে অবহিত হয় তখন তাদের চমকদার কথা, ঢঙ ইত্যাদি দ্বারা প্রভাবিত হয়। উপরন্তু, পশ্চিমা ইসলামবিদ্বেষী পণ্ডিত, নেট সংগঠনসমূহ, সোশ্যাল সাইটগুলোতে অহর্নিশ প্রচারিত, প্রকাশিত, প্রদর্শিত মর্যাদা হানিকর, মিথ্যানির্ভর কার্টুন, প্রবন্ধ ও প্রচারণা দ্বারা তারা বিভ্রান্ত হয়। তারা এসবের মোকাবেলায় কোনো মুক্তিই দিতে পারে না, তখন বরং আত্মসমর্পণ করে চলে আসে।
৩. এমনকি দুঃখের বিষয় হলো, রাসূল সা. ইসলাম, রাসূলের চরিত্র, তার রাজনীতি, তার জীবনদর্শন, আমল আখলাক সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর প্রশ্নসমূহ এসব তরুণ-তরুণীকে সম্পূর্ণ বস্তুতান্ত্রিক, ধর্মবিদ্বেষী ও রাসূল সা.-এর ব্যাপারে নির্লিপ্ত একটি সত্তায় পরিণত করে।
৪. ইমাম ইবনে তাইমিয়া একবার এক সত্যসন্ধানী দার্শনিককে বলেছিলেন, “এ বিশেষ মুতাকাল্লিমিন ও দার্শনিকদের চাইতে বিচলিত, বঞ্চিত এবং হৃদয়ের স্বস্তি ও রূহের আনন্দের স্বাদ থেকে অজ্ঞ আর কোনো দল নেই।”
“সব কিছু ছেড়ে শুধুমাত্র সিরাতুন্নবী সা. অধ্যয়ন কর এবং এর উপর চিন্তা-গবেষণাকে নিজের উপর অপরিহার্য করে নাও। ঈমান-বিশ্বাসের যাবতীয় ব্যাধি থেকে নিরাময় লাভের একটাই হচ্ছে মোক্ষম ব্যবস্থাপত্র।”
আজ দিকভ্রান্ত তরুণদের হৃদয়ের চিকিৎসা, তাদের মনের প্রশান্তি এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সিরাত এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

সিরাত অধ্যায়ন কিভাবে?

১. শিশুদের জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রত্যেক শিশুর মাঝে রাসূল সা.-এর প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করতে হবে। তাদের কাছে প্রিয় নবীর মুহাম্মাদ নামটি পরিচিত করে তুলতে হবে।
নবীজি, রাসূল সা., নূর নবী ইত্যাদি নামে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। তাদের কাছে নবীজীবনের ছোট ছোট ঘটনাগুলো গল্পচ্ছলে বলতে হবে। একটু বড় হলে, পড়তে শিখলে সহজ, সরল ভাষায় লেখা শিশুতোষ নবীকাহিনী পড়তে দিতে হবে। সিরাতের মাসে নবীজীবনের উপর রচনা ও কুইজ প্রতিযোগিতা হতে পারে। বাংলাভাষায় নবীজীবনী নূর নবী, নবীকাহিনী, ছোটদের হযরত মুহাম্মাদ সা., শাশ্বত নবী, মরু দুলালের গল্প শোন, সোনালী শাহজাদা জনপ্রিয়। এছাড়া কয়েকটি অনুবাদ রয়েছে। ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় শিশুদের জন্য চমৎকার সিরিজ বই রয়েছে। এখনকার দিনে ছোটদের জন্য নবীজীবনীকেন্দ্রিক গান, কবিতা, নাটক, জীবনী বর্ণনা ইত্যাদির অডিও-ভিডিও প্রোডাক্ট তৈরি করা হচ্ছে। বাংলাতেও এসব ডাবিং করে কিংবা নতুনভাবে তৈরি করা যায়।
২. কিশোর ও যুবকদের জন্য সিরাত বই তৈরি হওয়া দরকার। নবীজীবনের বিভিন্ন দিক ও বিভাগ নিয়ে সমৃদ্ধ ‘সিরাত’ গ্রন্থ রচিত হওয়ার অবকাশ রয়েছে। স্কুল, কলেজের সিলেবাসে নবীজীবনী অন্তর্ভুক্ত হওয়া দরকার।
মহামানবের জীবনকে জানার পাশাপাশি তা মেনে চলার জন্য তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা দরকার। এ সময়ে সিরাতের মূল উৎস কুরআন, হাদিস ও ইতিহাসের সাথে তাদের সরাসরি পরিচয় থাকা দরকার।
কিশোর, যুবক ও পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে রাসূল সা.-এর আদর্শসমূহ সম্পর্কে তাদের ধারণা যেমন স্বচ্ছ হওয়া দরকার তেমনি দরকার অনুসরণে অভ্যস্ত হওয়া।
স্কুল-কলেজ সিরাতুন্নবী সা. উপলক্ষে যেসব প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় সেখানে পুরস্কার হিসেবে অনেক দুর্বোধ্য ও জটিল বই প্রদান করা হয়। বইগুলো আকর্ষণীয়, সুখপাঠ্য ও তথ্যবহুল হওয়া দরকার।
৩. প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া ও বয়স্ক মানুষ যারা পরিবার ও সমাজের কর্তা তাদের জন্য দু’ধরনের সিরাত গ্রন্থ হতে পারে। যে সমস্ত বিখ্যাত সিরাতগ্রন্থ রাসূলে আকরাম সা.-এর পরিপূর্ণ জীবনালেখ্য তুলে ধরে সেসব তারা অধ্যয়ন করতে পারেন। সেক্ষেত্রে যারা স্বল্পশিক্ষিত তাদের জন্য সহজ ভাষায় বই হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাভাষায় বেশ কিছু সিরাতগ্রন্থ অনূদিত ও রচিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বেশ কিছু সিরাতগ্রন্থ প্রকাশ করেছে। ‘সিরাত ইবনে হিশাম’, গোলাম মোস্তফার ‘বিশ্বনবী’, আকরম খাঁর ‘মোস্তফা চরিত’, মাওলানা আবুল কালাম আযাদের রাসূলে রহমত, মাওলানা সফিউর রহমান মোবারকপুরীর ‘আর রাহীকুল মাখতুম’, নঈম সিদ্দিকীর ‘মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ’সহ অনেক বিখ্যাত সিরাতগ্রন্থ, আল্লামা শিবলী নোমানীর ‘সিরাতুন্নবী সা.’, জায়নুল আবেদিন রাহনামোর ‘মুহাম্মাদ’ যার ফার্সি নাম ‘পয়গম্বর’, মাওলানা মওদূদী রচিত ‘সিরাতে সরওয়ারে আলম’ শহীদ মুরতাজা মোতাহায়ীর ‘অঃঃরঃঁফব ধহফ ঈড়হফঁপঃ ড়ভ গড়যধসসধফ’ও একটি ছোট্ট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিরাতের বই। ইদানীং আরবি ও ইংরেজিতে রচিত অনেক সিরাত গ্রন্থ নতুনভাবে আকর্ষণীয় মুদ্রণে সহজলভ্য হিসেবে এখন বাজারে পাওয়া যায়।
৪. প্রতি বছর কমপক্ষে একবার যে কোনো একটি সিরাতগ্রন্থ পরিপূর্ণভাবে অধ্যয়ন করার পরিকল্পনা করলে ভালো হয়। একমাসে এক একটি অধ্যায় করে অধ্যয়ন করা যায়। কোনো বিষয়ে প্রশ্ন উদয় হলে একজন সিরাত বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলে জেনে নেয়া যায়।
৫. ব্যাপকভাবে সিরাতের আলোচনা সিরাতগ্রন্থ পাঠ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যায়। এসব প্রতিযোগিতায় মেধাবী ও ভালো ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য আকর্ষণীয় পুরস্কার থাকা উচিত।
৬. ছোট-বড় সকলেরই রাসূলে আকরাম সা.-এর শিখিয়ে দেয়া দোয়াসমূহ মুখস্থ করা ও বিভিন্ন কাজে দোয়াগুলো পড়া দরকার। এক্ষেত্রে মা-বাবা শিক্ষক-শিক্ষিকা ও বড় ভাই-বোনেরা তাদের সহযোগিতা করতে পারেন। ডঅগণ বাংলাদেশ অফিস ‘ছোটদের দোয়ার বই’ নামে একটি চমৎকার ত্রিভাষিক বই প্রকাশ করেছে।

সিরাত অধ্যয়ন ও চর্চাই আমাদের বাঁচাতে পারে

রাসূল সা.-এর ভালোবাসা, তাঁর পরিপূর্ণ অনুসরণ ও তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের সামষ্টিক উদ্যোগই কেবল গাফিল ও ষড়যন্ত্রের কবলে পতিত মুসলিম জাতিকে রক্ষা করতে পারে।
রাসূল প্রেম আমাদের মাঝে তখনই অগ্রাধিকার পাবে যখন আমরা তাঁর জীবন, কর্ম ও আদর্শকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারবো।
‘অরিয়েন্টাল স্কুল’ সমূহের পণ্ডিতগণ রাসূল করিম সা. সম্পর্কে যে সমস্ত মিথ্যাচার, অপপ্রচার ও বিদ্বেষ অব্যাহত রেখেছে সেসব অতি অল্পতেই আমাদের আধুনিক ছেলেমেয়েদের বিভ্রান্ত করে তুলছে। জীবনের জন্য সর্বোত্তম আদর্শের সন্ধানে ব্যাপৃত হওয়া আজ সময়ের দাবি। আসুন সিরাত অধ্যয়ন ও চর্চার মধ্য দিয়ে ব্যক্তি, সমাজ ও উম্মাহকে হেফাজত করি।

পর্বভিত্তিক অধ্যয়ন

সিরাত নবী কারিম সা.-এর সামগ্রিক জীবনের সমষ্টি। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর জীবনের ৬৩ বছর হায়াতকে যদি জন্ম, বংশ পরিচয়, শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ এভাবে ভাগ করি তা হবে এক ধরনের অধ্যয়ন। আবার তাঁর পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক জীবন বিবেচনায় এক ধরনের পড়াশোনা অপরিহার্য। একইভাবে সন্তান, ভাই, বন্ধু, স্বামী, বাবা, দাদা, নানা, সমাজপতি, যোদ্ধা, সেনাপতি, বিচারক, শাসক এরকম নানা বিবেচনায় তাঁর জীবনকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অধ্যয়ন করার বিষয় রয়েছে।
এক্ষেত্রে একজন রাসূলপ্রেমিক হিসেবে তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক ও বিভাগ নিয়ে আলাদা আলাদা পড়া, জানা ও মানার গুরুত্ব সমধিক। আমাদের সকলের জন্য উচিত হবে এক এক বছর এক এক দিক থেকে রাসূল সা.-এর জীবন নিয়ে অধ্যয়ন করা। এ অধ্যয়নের ব্যাপারে গবেষণা করে একটি গাইডলাইন তৈরি করা যায়। আগামী প্রজন্ম এক্ষেত্রে এগিয়ে আসবেন সেটিই প্রত্যাশা করছি।
লেখক : শিক্ষাবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply