সর্বশেষঃ
post

স্বাধীনতা ও আমরা

গাজী নজরুল ইসলাম

২৯ জুন ২০২২

স্বাধীনতা একটি শর্ত। যেখানে একটি জাতি, দেশ, রাষ্ট্র বা নির্দিষ্ট জায়গা থাকবে, থাকবে নিজস্ব শাসনব্যবস্থা এবং সার্বভৌমত্ব। স্বাধীনতার বিপরীত হচ্ছে পরাধীনতা, অপরের অধীন। স্বাধীনতা মানে যা খুশি তা করা নয়। (উইকিপিডিয়া)

স্বাধীনতা বলতে অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন অর্থ প্রকাশ পায়। যেমন, এক. সামগ্রিকভাবে একটি জাতির স্বাধীনতা। দুই. ঐ জাতির মধ্য থেকে একটি বিশেষ ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর স্বাধীনতা। তিন. বিদেশী শক্তির ক্রীড়নক হয়ে আজীবন ক্ষমতায় থেকে শুধু কেবল ঐ ক্ষমতাসীনদেরই স্বাধীনতা।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ঐ তিন প্রকারের ভিন্নধর্মী অর্থে স্বাধীনতার ধারক হিসেবে বর্তমান বিশ্বে দেখা যায়- প্রথম অর্থে আমেরিকা, কানাডা, গ্রেট ব্রিটেন ইত্যাদি দেশ। এসব দেশ তাদের জাতির স্বার্থে একপ্রকার সকলেই স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে থাকে। এরা জাতির মধ্যে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয়। আবার এরা বিদেশী কোনো শক্তির ক্রীড়নকও হতে চায় না। 

দ্বিতীয়ত- ভারত। এরা তাদের জাতিসমূহের মধ্যে একটি বিশেষ গোষ্ঠী বা দলের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। 

তৃতীয়ত- নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার এরা বিদেশী পরাশক্তির ক্রীড়নক হয়ে যতক্ষণ পারা যায় ক্ষমতায় থাকতে প্রাণান্ত চেষ্টা চালায়। 

আমরা বাংলাদেশী জাতিগোষ্ঠী উক্ত বিভাজনের কোন ধারায় অবস্থান করছি তা বিবেচনার বিষয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় একদা এক দুঃসাহসী সিপাহসালার মালিক ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির রক্তপাতহীন বিদ্যুৎগতির বজ্রচমকানো অভিযানে বাংলা অধিকারের (১২০৩ খ্রি:) পর থেকে আমরা দূর অতীতে খিলজিদের শাসনামলে ছিলাম ১২০৩ খ্রি: থেকে ১২২৭ খ্রি: পর্যন্ত। দিল্লির অধীনে ছিলাম ১২২৭-১৩৪১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। ইলিয়াস শাহি বংশের অধীনে ছিলাম ১৩৪২-১৪১৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। গনেশ জালালুদ্দিন শাহের অধীনে ১৪১৪ থেকে ১৪৪১ খ্রি: পর্যন্ত। এরপর পর্যায়ক্রমে পুনরায় ইলিয়াস শাহি বংশের দ্বিতীয় ধারার অধীনে ছিলাম ১৪৪২-১৪৮৭ খ্রি: পর্যন্ত। হাবশি শাসনাধীনে ১৪৮৭-১৪৯৩ খ্রি: পর্যন্ত, হুসেন শাহি বংশের অধীনে ১৪৯৩ থেকে ১৫৩৮ খ্রি: পর্যন্ত, এরপর পাঠানদের অধীনে (শের শাহ ও সূরবংশ) ১৫৩৮-১৫৬৪ খ্রি: পর্যন্ত। কররানী বংশের অধীনে ১৫৬৫-১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। এরপর সুদীর্ঘ ১৫৭৬ থেকে ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মোগল শাসনাধীনে আমাদের জাতি-গোষ্ঠীর পূর্বপুরুষেরা পরাধীন জীবনযাপন করেছেন। (বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, আব্বাস আলী খান)

উপরোক্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী পাঁচশত বছরাধিককাল সমগ্র ভারতবর্ষ মুসলিম শাসনাধীনে থাকা অবস্থায় যারা বাংলার মসনদে ছিলেন, তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক নৃপতি এমন ছিলেন যারা আপন বাহুবলে বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করে তৎকালীন দিল্লির সম্রাটদের আনুগত্য করে অনুমোদন ও নিয়োগপত্র লাভ করে গভর্নর অথবা নাজেম হিসেবে বাংলা শাসন করতেন, আবার কিছু সংখ্যক শাসক ছিলেন সম্পূর্ণ স্বাধীন। যেমন সমগ্র বাংলার স্বাধীন সুলতান ছিলেন শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ। এরপর ১৩৫৮-১৩৯১ খ্রি: পর্যন্ত তদীয় পুত্র সেকেন্দার শাহ, অতঃপর গিয়াস উদ্দীন আযম শাহ ১৩৯১-১৩৯৬ খ্রি:, সাইফুদ্দীন হামজা শাহ ১৩৯৬-১৪০৬ খ্রি: এবং শামসুদ্দীন ১৪০৬ থেকে ১৪০৯ খ্রি: পর্যন্ত বাংলার স্বাধীন সুলতান হিসেবে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ঐ সময় অর্থাৎ ১৩৯১ খ্রি: থেকে ১৪০৯ খ্রি: পর্যন্ত প্রায় ৫১ বছর আমাদের পূর্ব জাতিগোষ্ঠী স্বাধীন সুলতানদের অধীনে স্বাধীন জাতি হিসেবে বসাবস করেছেন এবং বলা যায় ঐ শাসনকালটি ছিল বাংলায় বিজয়ী মুসলিম শাসন অধ্যুষিত সময়। 

মুসলিম শাসকগণ বিজয়ী বেশে এদেশে আগমন করার পর এদেশকে তারা মনেপ্রাণে ভালোবাসে এবং বাংলাকে স্থায়ী আবাসভূমি হিসেবে গ্রহণ করেন। এখানকার অধিবাসীদের সাথে সুখে দুঃখে মিলেমিশে বাস করতে থাকেন। ইতিহাস সাক্ষী, মুসলিম শাসক হিসেবে তারা শাসিতের উপর কোনো অন্যায় অত্যাচার কিংবা জুলুম করেননি। জনসাধারণও তাদের শাসনকার্যকে মনেপ্রাণে মেনে নেন। মুহাম্মাদ বখতিয়ারের বাংলা বিজয়ের পর তিনি অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করেন। মুসলমানদের জন্য বিভিন্ন স্থানে মসজিদ, মাদ্রাসা স্থাপন করেন ও অমুসলিমদের প্রতি উদার নীতি গ্রহণ করেন। তাদের ধর্মীয় উপাসনালয়েরও উন্নতি সাধনে সচেষ্ট থাকেন। তিনি ইচ্ছা করলে পলাতক লক্ষণ সেনের পশ্চাদানুসরণ করে তাকে পরাজিত ও হত্যা করতে পারতেন। কিন্তু সে চিন্তা তিনি আদৌ মনে স্থান দেন নাই। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার তার ‘বাংলার ইতিহাস’ গ্রন্থে বলেন, “........কিন্তু তিনি রক্তপিপাসু ছিলেন না। নরহত্যা ও প্রজাপীড়ন তিনি পছন্দ করতেন না। দেশে একধরনের জায়গির প্রথা বা সামন্ততান্ত্রিক সরকার কায়েমের দ্বারা অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ও সামরিক প্রধানদের সন্তুষ্টি সাধন করতেন।” (History of Bengal vol. II. Muslim period, P.9)

এর পরের ইতিহাস স্বাধীনতার চরম বিপর্যয়ের ইতিহাস। ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ খ্রি: পর্যন্ত ইংরেজদের ব্যবসায়ী সনদপ্রাপ্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এদেশে বাণিজ্যের সুবাদে প্রায় দুইশত বছরের স্থায়ী পরাধীনতার রাজত্ব কায়েমের করুণ ইতিহাস। এ ইতিহাস সমগ্র ভারতবর্ষের তথা সেই সাথে বাঙালি- বাংলাদেশীদের পরাধীনতার ইতিহাস।

প্রায় দুশো বছরের ব্রিটিশ বেনিয়াদের নিষ্ঠুর কলোনি শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ব্রিটিশ ভারতে মূলত মুসলমানরাই সর্বপ্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ এর পাক-ভারত স্বাধীনতার বিজয় না হওয়া পর্যন্ত ঐ আন্দোলনে মূলত মুসলমানরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। 

কিন্তু এখানে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হলো, একদিকে ভারতবর্ষের সংখ্যালঘু মুসলমানদের দেশমাতৃকার অঙ্গসৌষ্ঠবে বিদেশী উপনিবেশবাদের পরাধীনতার কৃষ্ণচাদর সরাতে যেয়ে নিজেদের যেমন রাজপথে রক্তাক্ত, জেলখানার কয়েদি, মামলা-হামলার শ্যেন টার্গেট এমনকি সদাসর্বদা দাঙ্গা- সংঘাতের সম্মুখীন হতে হয়েছে, অপরদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায় স্বাধীনতাকামী মুসলিমদেরকে ব্রিটিশ রাজনীতির টানাপড়েনের মধ্যে ফেলে ব্রিটিশ তোষণে নিজেদের নিয়োজিত রেখে মুসলমানদেরকে বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে ব্রিটিশদের পদলেহনে জি হুজুরের ভূমিকায় কার্যক্রম চালিয়ে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা তাদের কথিত মহারাজন-মহাভাগ্য বিধাতার আকণ্ঠ জয়গানে মত্ত থেকে নিজেরা বেশুমার ফায়দা লুটার কোশেশ করেছে। একদকে মুসলিম নিপীড়নে কূটকৌশলী রসদ জুগিয়ে তাদেরকে হেনস্তা শুধু নয় মাতৃভূমি থেকে ম্লেচ্ছ, যবন, নিড়ি আখ্যা দিয়ে বিতাড়নের কসরত করেছে, অপরদিকে এক হিন্দু এক রাজ্যে সমগ্র ভারতবাসীকে লীন হয়ে যাওয়ার গীতও মঞ্চস্থ’ করেছে। তারা স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ স্বপ্নিল ডানায় ভর করে ভারতের রাজনৈতিক মঞ্চে মাঝে মাঝে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনও করেছেন, আবার কোন কোন সময়ে বেনিয়াদের জয়গান গেয়ে তাদের স্বার্থ সারথী হওয়ার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়েছে। সংখ্যালঘু মুসলমানদের কোণঠাসা করে ব্রিটিশদের অনুুকম্পায় প্রাপ্ত জায়গিরদারি, জমিদারি, মোসাহেবি, কোম্পানির পদস্থ পদে জি হুজুরের ভূমিকায় কেরানির কলম পেশার চাকরি বাগিয়ে সম্মানী পাওয়া, উপাধি নেয়া ইত্যাদিতে প্রকৃত দালালির ভূমিকা পালন করেছে। অন্যদিকে স্বাধীনতাকামী সংখ্যালঘু মুসলমানদেরকে ব্রিটিশদের কোপানলে পড়ে জেল জুলুম হুলিয়া মাথায় নিয়ে দেশ মুক্তির রক্তঝরা সংগ্রামে নির্যাতনের বলি হতে হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুসমাজ ব্রিটিশ বন্দনায় মাতোয়ারা হয়ে সিংহাসনে সমাসীন মহারথী-মহারাজা এবং তাদের সনদপ্রাপ্ত দখলদার বড়লাট, ছোটলাট, ভাইসরয়, প্রধানমন্ত্রীদের বন্দনা-সংবর্ধনায় উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় দিগ্বিদিক জ্ঞানহারা হয়ে দেবতা তোষণে পাগলপারা হয়েছে। এটা তাদের অতীতে শত শত বছরের মুসলিম নেতৃত্বে থেকে মুসলমানদের শৌর্যবৃত্তের অধীনে জীবনযাপন করে, কোনো কোনো সময় মুসলিম বিজেতাদের কাছে রাষ্ট্রীয় নেতেৃত্বে পর্যুদস্ত হয়ে পরাধীন এবং আনুগত্যের যুপকাষ্ঠে অপমানিত, ক্ষুব্ধ এবং হিংসাত্মক মানসিকতার বিদ্বেষমূলক বহিঃপ্রকাশ। 

হিন্দু কবি হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় মুসলিম নেতৃত্বের পরিবর্তে নিজেদেন কর্তৃত্বে অপারগ হয়ে ইংরেজ প্রভুদের জয়গানে পয়ার কাটলেন...

“না থাকিলে এ ইংরেজ 

ভারত অরণ্য আজ- কে শেখাতো কে দেখাতো

কেবা পথে লয়ে যেত

সে পথ অনেকদিন করেছ বর্জন।”-

কবি রবি ঠাকুর ব্রিটিশ স্তুতিতে গেয়ে উঠলেন:

“জনগণ মনো অধিনায়ক জয়ো হে

ভারত ভাগ্য বিধাতা-”

তারা অন্ধভাবে ভারতের ভাগ্যবিধাতা বিদেশী উপনিবেশবাদ, কলোনিয়ান দখলদার বেনিয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং তাদের প্রভুদের পদপ্রান্তে কপাল ঠেকিয়ে প্রশংসার প্রচ্ছন্ন প্রাণাতিপাত করে বুঁদ হয়ে ভারত মাতাকে ভবিষ্যতে একক হিন্দু রাজ্যে পরিণত করার স্বপ্নে বিভোর থেকেছেন।

কবি রবীন্দ্রনাথের ‘শিবাজী উৎসবে’ তার প্রচ্ছন্ন ঘোষণা মিলে যায়। তিনি ‘শুভশঙ্খ নাদে’ ‘জয়তু শিবাজী’ উচ্চারণে ভারতবাসীকে এ ধ্যানমন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণে গেয়ে উঠলেন-

“ধ্বজাধারী উড়াইব, বৈরাগীর উত্তরী বসন 

দরিদ্রের বল

‘এক ধর্ম রাজ্য হবে এ ভারতে’- এ মহা বচন 

করিব সম্বল।”

এখানে মুসলমান নেতৃত্বের উপর সেই সাথে মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর উপর রাগ এবং প্রতিশোধের এক মহা সহিংস বাণীর সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার আনন্দমঠে বন্দে মাতরম মন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে মুসলমানদের ম্লেচ্ছ যবন বলে নিধন যজ্ঞে মেতে উঠার আহবান জানান-আর হিন্দু অস্ত্রধারীরা মুসলিম নিধন করে অট্টহাস্যে ভারতকে একরাজ্যে একদেশ একধর্ম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাতো, সাথে সাথে নিজেদের অপকর্ম জায়েজ করার জন্য আধিপত্যবাদী ব্রিটিশরাজের জয়গানে মুখর থাকতো। ভারত দখলদার ইংরেজদের সাথে হিন্দু লেখক, কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ এবং উচ্চ পর্যায়ের শিক্ষিত ও সুশীল ব্যক্তিদের এতটা সম্পর্ক ছিল যে, তারা ব্রিটিশ ভারতে একদিকে হাজার বছরের শাসকগোষ্ঠীর জাত মুসলমানদের নিধন যজ্ঞে মেতে উঠত অপরদিকে ব্রিটিশ তোষণে সর্বদা পরিব্যাপ্ত থাকত। ১৯৮৩ সালে জন ব্রাইট নামে এক ইংরেজ ভদ্রলোকের নেতৃত্বে লন্ডনে ‘ইন্ডিয়ান কমিটি’ নামে সমিতি গঠিত হয়। ৫০ জন ইংরেজ এমপি এর সদস্য হন। তাদের কাজ ছিল ভারতে হিন্দুরা দাঙ্গা বাধালে ঐ কমিটি স্পষ্ট বিবৃতি দিত ‘ভারতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন আছে।’

আগেই বলা হয়েছে ব্রিটিশ ভারতে উপনিবেশবাদীদের পরাধীনতার করাল থাবা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মূলত সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমানরাই সর্বপ্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু করেন। যেমন ব্রিটিশ-ভারতে মুসলমানদের ফরায়েজি আন্দোলন, শহীদ তিতুমীরের মুক্তি সংগ্রাম, সাইয়্যেদ আহম্মাদ শহীদের জিহাদী আন্দোলন এবং বালাকোটের রক্তাক্ত যুদ্ধ, খেলাফত আন্দোলন, হিযরত আন্দোলন, মেপলা বিদ্রোহ, ইত্যাদি। ১৮৫৭ সালে ভারতবর্ষে সিপাহি-জনতা- মুজাহেদীন মিলে যে প্রচণ্ড স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তাতে ক্ষমতাসীন দখলদার ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিমূল প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। ক্ষমতাসীন স্বৈরাচারী, দখলদার শাসকদের দৃষ্টিতে এসব মুক্তি আন্দোলন-সংগ্রামকে তারা বিদ্রোহী কিংবা রাষ্ট্রদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করেছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ আন্দোলন-সংগ্রাম ছিল চেপে বসা শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে সত্যিকারের আযাদি কিংবা স্বাধীনতা সংগ্রাম। তবে ইতিহাসে সূর্যসেন, প্রীতিলতা ও ক্ষুদিরাম প্রমুখদের মতো কিছু বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিচয় পাওয়া যায়।

ভারতবর্ষের বিগত দুই শতকের মধ্যে তিনটি ঐতিহাসিক ঘটনা বিশেষ করে স্মরণীয়। এ তিনটি ঘটনা সংঘটিত হয় ১৭৫৭, ১৮৫৭ এবং ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে। ১৭৫৭ সনে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হওয়ার কাল-সন্ধিক্ষণে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক পলাশীর যুদ্ধ। ১৮৫৭ সনে সংঘটিত হয় ব্রিটিশদের সিংহাসনের ভিত কাঁপানো আন্দোলন সিপাহি জনতার সম্মিলিত সংগ্রাম “সিপাহি আন্দোলন”, আর ১৯৪৭ সালে ভারতীয় মুসলমানদের সংগ্রাম ছিল ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশদের বিতাড়িত করে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু শাসনের অধীনে পুনরায় পরাধীন না হয়ে মুসলমানদের একটি আলাদা নিজস্ব আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। আর এ সংগ্রাম সফল হয়েছিল মুসলমান নেতৃবৃন্দের চিন্তা প্রসূত ঐতিহাসিক ‘দ্বি-জাতি তত্ত্বের’ ফর্মুলা বাস্তবায়নের মাধ্যমে যে তত্ত্বটি শেষ পর্যন্ত হিন্দু মাড়োয়ারি নেতারাও ব্রিটিশ থেকে স্বাধীন হওয়ার স্বার্থে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। সর্বশেষ এ সংগ্রামে মুুসলমানদেরই ঐতিহাসিক বিজয় হয়েছিল ১৯৪৭-এ পাক-ভারত পার্টিশানের মাধ্যমে যার ধারাবাহিকতায় পেয়েছি আজকে আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। দ্বিজাতি তত্ত্বের মুসলিম চেতনার অভ্যুদয় না হলে আজ আমরা এ প্রিয় স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ পেতাম না। যেমন পারছে না স্বাধীন হতে আসাম, পশ্চিম বাংলা, হায়দরাবাদের মুসলমানরা।

কিন্তু এ বাংলাদেশ পেতে আমাদেরকে আরেকটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়। ব্রিটিশ-ভারত এবং হিন্দু মাড়োয়ারিদের করাল থাবা থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৪৭ সালে একটি স্বাধীন আবাসভূমি তৎকালীন পাকিস্তান নামক ভূখণ্ড পেলেও পূর্বাংশের জনগোষ্ঠী আবারো একটি দ্বিতীয় উপনিবেশবাদের শোষণের শিকারে পরিণত হলো। তৎকালীন পাকিস্তানি অবাঙালি শাসকগোষ্ঠী ব্রিটিশদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ‘ভাগ করো শাসন করো নীতি’ আর মুুখে শেখ ফরিদ আর বোগলে ইট রেখে মুসলমান আর ইসলামের দোহাই দিয়ে সুদীর্ঘ ২৪টি বছর পূর্বাঞ্চলকে একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সকল ক্ষেত্রে বঞ্চিত রেখে নব্য ব্রিটিশ ধ্বজাধারী তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শাসন ও শোষণের নীতি গ্রহণ করে।

ব্রিটিশদের কাছ থেকে রাজনৈতিকভাবে এবং ব্রিটিশ-ভারতে হিন্দুদের কবল থেকে ধর্মীয়ভাবে মুক্তির যে ঐতিহাসিক থিওরি স্যার আল্লামা ইকবাল ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ পেশ করেছিলেন এবং যে ‘টু ন্যাশন থিওরি’-এর আলোকে ভারত ভাগ হলো- পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী স্বাধীনতা পেয়েও ঐ দ্বিজাতিতত্ত্বের একটি অংশ ‘মুসলমানগণ আলাদা একটি স্বতন্ত্র জাতি’- এ জাতিতত্ত্ব ইসলামে কুরআন-হাদিসে সঠিক থাকলেও বাস্তবে তারা আমল দিলো না। তারা সঙ্কটে-সংঘাতে ইসলাম গেল, মুসলমানিত্ব গেল বোল বলে গলাফাটা চিৎকার করে ভূ-খণ্ডের দুই অংশকে এক রেখে মনের গহিনে লুকিয়ে থাকা শাসন-শোষণের নীতিকে ঠিক রেখেই চলতে থাকলো। রাষ্ট্র পরিচালনার সকল ক্ষেত্রে বঞ্চিত হলো পূর্বাঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী। কী নেতৃত্বে, কী প্রশাসনে, কী ব্যবসায়-বাণিজ্যে, কী চাকরি-বাকরিতে, কী উন্নয়নে, কী শিক্ষায়-দীক্ষায় সকল ক্ষেত্রে পূর্বাঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী তৎকালীন পাকিস্তানে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হলো। পশ্চিমাংশের ভেতর থেকে ধনাঢ্য পুঁজিপতি বাইশ পরিবার তৈরি হলো, আর পূর্বাঞ্চলের লোকেরা গরিব, দ্বীনহীন জীবনযাপনে কঙ্কালসার হতে লাগলো। পাকিস্তানের পিন্ডি, করাচি, লাহোর চোখধাঁধানো আধুনিক রুপালি নগরীতে পরিণত হতে লাগলো, আর ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ভাঙাচোরা রাস্তার অলিগলিতে কুপির বাতির মতো অন্ধকারাচ্ছন্ন গঞ্জে পরিণত হলো। পূর্বাঞ্চলের কৃষকদের ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের সোনালি ফসল তৎকালীন পাকিস্তানের একমাত্র বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পাট শিল্পের সমুদয় অর্জিত অর্থের শতকরা পঁচাত্তর ভাগই ব্যয়িত হতো পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নে। এ অঞ্চলের শ্রমিকের ঘামে উৎপাদিত দাদা ম্যাচ পূর্বাংশের জনগণের পকেটের টাকা খরচ করে ট্যাক্স দিয়ে কিনে নিয়ে চাহিদা মেটাতে হতো দুর্ভাগ্যজনকভাবে। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে টারবেলা বাঁধ দিয়ে পশ্চিমাঞ্চলের শুষ্ক মরুভূমিকে সজীব-সুফলা করা হলো। আর পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোতে প্রয়োজনীয় বাঁধ-ড্যাম তৈরিতে অনীহা, টেকনিক্যাল প্রবলেম দেখিয়ে এ অঞ্চলের নাব্য সচল জলধি অঞ্চলকে শুষ্ক মরুভূমিতে রূপান্তরিত করার আত্মঘাতী প্রক্রিয়া চলতে লাগলো।

সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মায়ের ভাষা বাংলাকে জাতীয় মর্যাদা না দিয়ে সংখ্যালঘিষ্ঠের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হলো। দিনে দিনে জনগণ ফুঁসে উঠতে লাগলো। শুরু হলো ৫২ এর ভাষা আন্দোলন। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিল এ অঞ্চলের তরুণ-যুবক, শহীদ সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার। আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগলো- সাথে সাথে যোগ হলো স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের কর্মসূচি। শুরু হলো ’৬২, ’৬৮, ’৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান। তৎকালীন সরকার কঠোর হাতে এসব আন্দোলন-অভ্যুত্থান দমন করার কঠিন চেষ্টা করলে রক্তে রঞ্জিত হলো ঢাকার রাজপথ। জনগণ এবার ফুঁসে উঠল বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো। সারা পূর্বাঞ্চলে রেড অ্যালার্ট জারি হলো। মামলা হামলা, ধর-পাকড়, জেল-জুলুমে ভরে গেল ভূ-খণ্ড। বাঙালি অধ্যুষিত পূর্বাঞ্চলে স্বাধীনতাকামী জনগণ কোনো বাঁধ মানতে রাজি নয়- শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন- প্রতিবাদ থেকে প্রতিরোধের কর্মসূচি- শেষ পর্যন্ত শুরু হলো স্বাধীনতাযুদ্ধ। 

কচি-কিশোর-যুব-পৌঢ়, নর-নারী, ছাত্র-ছাত্রী, গাঁয়ের বধূ থেকে শহরের মায়েরা-বোনেরা সকলেই ঝাঁপিয়ে পড়লো স্বাধীনতা সংগ্রামে। নয় মাস অসম যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পশ্চিমাদের কবল থেকে মুক্ত করা হলো পূর্বাঞ্চল। দুনিয়ার বুকে সৃষ্টি হলো একটি অধ্যায়, নতুন ইতিহাস, নতুন সোনার দেশ- আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। 

১৯৭১ এর ২৬ মার্চ আমাদের স্বপ্নের স্বাধীনতা দিবস। আর ১৬ ডিসেম্বর আমাদের হৃদয় উদ্বেলিত চির আকাঙ্ক্ষিত বিজয় দিবস। ১৯৭১ থেকে ২০২২। স্বাধীনতা আর বিজয়ের একান্ন বছর। স্বাধীনতার জন্মের সময়কালে সাড়ে সাত কোটি থেকে এখন সাড়ে সতেরো কোটি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের চোখে-সুদূর সম্মুখে আকাঙ্ক্ষার দৃষ্টি, শান্তি আর সুখের আবাস গড়ার প্রত্যয়। আত্মমর্যাদাবোধ, সম্মান আর ভালোবাসার দৃঢ় সঙ্কল্প। বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াবার অঙ্গীকার। 

বেঁচে থাকো বাংলাদেশ। বেঁচে থাকো শান্তির নিবাসে কোটি প্রাণ বাংলাদেশী প্রজন্ম। বেঁচে থাক আমাদের পরম প্রাপ্ত স্বাধীনতা। 

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা ও 

সাবেক সংসদ সদস্য, সাতক্ষীরা-৪

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির