হযরত খাদিজা রা. : ইতিহাসের বিস্ময় -আলী আহমাদ মাবরুর

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী হওয়ার সৌভাগ্য কোনো পুরুষকে দেননি, দিয়েছিলেন একজন নারীকে। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সা.-এর সংগ্রামমুখর জীবনের সাথী, রাসূলুল্লাহ সা.-এর সুখ ও দুঃখের সাথী, শিয়াবে আবু তালিবে রাসূলুল্লাহ সা.-এর অন্তরীণ দুঃসহ জীবনের সঙ্গিনী, আরবের অন্যতম ধনী মহিলা যিনি শুধুমাত্র ইসলাম গ্রহণের কারণে অনাহারে-অর্ধাহারে ভরপুর কষ্টকর একটি জীবনকে বরণ করে নিয়েছিলেন। আর তিনি হলেন রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রথম স্ত্রী হজরত খাদিজাতুল কুবরা রা.। তার পিতার নাম ছিল খুয়াইলিদ। সেই হিসেবে তার প্রকৃত নাম ছিল খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রা.।

এই মহীয়সী নারী ছিলেন অনন্য উচ্চতায় আরোহিণী। উম্মুল মুমিনিন খাদিজা রা. আক্ষরিক অর্থেই তার বিকাশের পথে অদৃশ্য বাধার সব দেয়াল ভেঙে দিয়েছিলেন। তিনি ১৪০০ বছর আগে যা অর্জন করেছিলেন, তা আজকের দিনেও অনেক নারী কল্পনাও করতে পারে না। রাসূল সা. তাকে সর্বকালের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নারীদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং ঘোষণা দিয়ে গেছেন যে, হজরত খাদিজা রা. তার ঈমানকে পরিপূর্ণ করতে পেরেছেন।

আরবের সেই জাহেলি সমাজে তিনি ছিলেন একজন উদ্যোক্তা। যে সমাজে নারীদের জীবন্ত কবর দেয়া হতো, সেখানে দাঁড়িয়েই তিনি অসংখ্য পুরুষকে পেছনে ফেলে নারী ব্যবসায়ী হিসেবে আকাশছোঁয়া সাফল্য অর্জন করতে পেরেছিলেন। কিন্তু অর্থনৈতিক সাফল্যই তার জীবনের সবচেয়ে বড় দিক নয়। তার জীবনের প্রকৃত শক্তি আমরা অনুধাবন করতে পারবো তার ইসলাম গ্রহণ পরবর্তী জীবনকে পর্যালোচনা করার মাধ্যমে। স্বনামধন্য লেখিকা ফাতিমা বারাকাতউল্লাহ তার একটি কলামে হযরত খাদিজার রা. জীবনের ৫টি বিশেষ গুণকে শনাক্ত করেছেন, যা আমাদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে উঠতে পারে।

প্রথম শিক্ষা : পার্থিব জীবনের চেয়েও বড় স্বপ্নকে লালন করা
আমরা সকলেই জানি যে, হযরত খাদিজা রা. এমন একটি সময়ে মারা যান যখন সার্বিকভাবে মুসলিমরা খুবই কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতি অতিক্রম করছিল। তিনি মদিনায় হিজরত করার স্বস্তিদায়ক দৃশ্য দেখে যেতে পারেননি। বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয় দেখেননি। মক্কা থেকে বিতাড়িত মুসলিমরা আবার মাত্র ১০ বছরের মাথায় যেভাবে মক্কা বিজয় করেছিল, তাও তিনি অবলোকন করার সুযোগ পাননি। তিনি সবসময় মুসলিমদের কঠিন ও অসহনীয় অবস্থাই দেখে গেছেন। কারণ মুসলিমরা মদিনায় হিজরত করার আগেই তিনি ইন্তেকাল করেছিলেন। মক্কার নিকটে শিয়াবে আবু তালিবে মুশরিকরা মুসলিমদেরকে অবরুদ্ধ করে তিন বছরের জন্য সব কিছু থেকে বয়কট করেছিলো। এই বয়কট থেকে মুক্ত পাওয়ার কিছুদিন পরই মা খাদিজা রা. ইন্তেকাল করেন। মক্কার একজন ধনাঢ্য ও সম্ভ্রান্ত নারী হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র নবীজি সা.কে বিয়ে করায় এবং ইসলাম গ্রহণ করার দায়ে তাকে সব ধরনের আরাম আয়েশ ছেড়ে কষ্টকর ক্ষুধার্ত জীবন বেছে নিতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। অনেকেই মনে করেন, শিয়াবে আবু তালিবের উপবাস ও অনাহারই তার মৃত্যুর জন্য অনেকাংশে দায়ী।

যাই হোক, হযরত খাদিজা রা. সার্বিকভাবে সংগ্রাম করেছিলেন, পাহাড় সমান কষ্টকে মেনে নিয়েছিলেন এবং একজন মুমিন হিসেবে ধৈর্য ধারণ করেছিলেন কারণ তিনি দুনিয়া নয় বরং পরকালের পুরস্কারকেই সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছিলেন। তিনি তার জীবদ্দশায় ইসলামকে অর্ধপৃথিবী পর্যন্ত বিস্তৃত হতে দেখেননি। কোটি কোটি লোকের ইসলাম গ্রহণ করার দৃশ্যও তিনি প্রত্যক্ষ করেননি। অথচ তার উত্তরাধিকারী প্রজন্ম হিসেবে আমরা পৃথিবীর প্রতিটি কোনায় ইসলামের বিকাশ পর্যবেক্ষণ করছি। হযরত খাদিজার রা. জীবন থেকে এ বিষয়টি আমাদের সকলেরই অনুধাবন করা প্রয়োজন। আমরা এ জীবনে যা করি, তার সব ফলাফল হয়তো নিজেদের জীবদ্দশাতেই দেখে যেতে পারবো না। আমরা হয়তো এমন একটি উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে যাবো, এমন একটি জীবন ও সমাজ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে মেতে থাকবো, যা নিজেদের চোখ দিয়ে কখনো হয়তো দেখার সুযোগও হবে না। আর এমনটা না হলেও কোনো সমস্যা নেই। কারণ মুমিন হিসেবে পরকালীন পুরস্কার সর্বোপরি আল্লাহর সন্তুষ্টিকেই আমাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া জরুরি।

আর যদি সত্যিকারার্থেই পরকালীন সফলতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আমরা ভাবতে পারি, তাহলে দুনিয়ার ছোটখাটো বিষয়, পাওয়া বা না পাওয়া- আমাদেরকে হতাশ করবে না। দুনিয়াবি জীবনের এসব মূল্যায়ন আর অবমূল্যায়নের ভাবনা আমাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে এবং মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করে দেয়। মনে রাখতে হবে, ফলাফলের চেয়ে নিয়ত অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারো নিয়তে যদি খুলুসিয়াত থাকে এবং নিয়তকে বাস্তবায়ন করার জন্য যদি তিনি নিরন্তরভাবে পরিশ্রম করে যান, তাহলে আল্লাহ আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ। এমনকি লক্ষ্যে পৌঁছতে না পারলেও শুধুমাত্র নিয়তের বরকতেও আমরা আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার লাভ করতে পারি।

দ্বিতীয় শিক্ষা : শুধুমাত্র আল্লাহর কাছ থেকেই মূল্যায়ন প্রত্যাশা করা
হযরত খাদিজা রা. এমন একটি সময়ে এবং এমন একটি জাহেলি সমাজে জন্ম নিয়েছিলেন যেখানে পারিবারিক পরিচিতি ও বংশানুক্রমের ভিত্তিতে একজন মানুষের সম্মান ও মর্যাদা নির্ধারিত হতো। হযরত খাদিজা রা. যেদিন নবীজিকে সা. তার চাচাতো ভাই ওয়ারাকা বিন নওফেলের কাছে নিয়ে গেলেন, সেদিনই তিনি প্রথমবারের মতো জানতে পারলেন যে, এই মক্কার লোকেরাই একদিন তাদেরকে বয়কট করবে, এমনকি তার স্বামী তথা হযরত মুহাম্মাদ সা.কে শহর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করবে। নবুওয়াত পাওয়ার আগ পর্যন্ত নবীজি সা. এবং খাদিজা রা. সমাজে খুবই সম্মান পেয়েছেন। তাই তাদের জন্য এরকম একটি কঠিন পরিস্থিতির আশঙ্কা করাও বেশ দুঃসহ ছিল। আর এরকম একটি পরিস্থিতি হবে জেনেও নবীজির সা. পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়ার অর্থ হলো স্বেচ্ছায় দুঃখ কষ্টকে স্বীকার করে নেয়া।

পাশাপাশি, মা খাদিজা রা. এও জানতেন যে, ইসলামের পথ অনুসরণ করার কারণে সমাজে তার বিদ্যমান মর্যাদা ও সম্মানগুলোও নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু হযরত খাদিজা রা. ভালোমতোই জানতেন, দুনিয়ার সম্মান ও স্বস্তিকে কুরবানি করার বিনিময়ে তিনি আল্লাহর কাছে উচ্চ মর্যাদা লাভ করবেন। কারণ ইসলামের প্রাথমিক সময়ে যারা সাহসিকতা ও ঈমানী দৃঢ়তার কারণে ইসলামকে বরণ করবে, তাদের মর্যাদা পরবর্তী অনুকূল সময়ে আসা মুসলিমদের তুলনায় উচ্চতর হবে। প্রথম ইসলাম কবুলকারিণী হওয়া সহজ কোনো বিষয় নয়।
আমাদের এখানেও যারা ইসলামী আন্দোলনের ভিত গড়ে গেছেন, যারা প্রতিকূল অবস্থায় দেশের প্রতিটি প্রান্তরে ছুটে বেড়িয়েছেন, দ্বীনি কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন, তারা আমাদের জন্য ইসলাম নিয়ে কাজ করার পথটি অনেকটা সহজ করে দিয়েছেন। আমরা যারা নানা ধরনের প্রতিষ্ঠানের সান্নিধ্যে থেকে কাজ করছি, রুজি রোজগারের একাধিক সুযোগ পাচ্ছি, আমাদের তুলনায় পূর্ববর্তী মানুষজন অনেক বেশি সম্মানীয়। তারা হয়তো ঠিকমতো প্রতিদিন খেতেও পাননি। রিজিক নিয়ে বরাবরই অসম্ভব প্রতিকূলতায় আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটিয়েছেন। প্রথম কয়েক প্রজন্মের তুলনায় পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কাজ করা সহজ হয়। অবশ্যই প্রতিটি প্রজন্মের নিজস্ব কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কোনো প্রজন্মের চ্যালেঞ্জকেই হালকাভাবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই। তারপরও আমাদেরকে সবসময় পূর্ববর্তী মানুষের করে যাওয়া কাজ, তাদের ত্যাগ ও পরিশ্রমকে মূল্যায়ন করার মানসিকতা থাকা উচিত।

আমরা প্রতিনিয়ত অনাগত প্রজন্মের জন্য কাজ করতে চাইছি। তাদের জীবনকে আরো সহজতর করে তোলার লক্ষ্যে প্রয়াস চালাচ্ছি। তাদের জন্য ইসলামিক উপকরণগুলো সহজলভ্য করে তোলার চেষ্টা করছি। আমরা পরিণত বয়সে যা চোখে দেখিনি, আমাদের নবীন প্রজন্ম তা শৈশবেই দেখতে পাচ্ছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার চূড়ান্ত শিখরে তারা জীবন ধারণ করছে। কিন্তু এত কিছুর পর সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হচ্ছে তাহলো, তারা ইসলামের একটি সহজ সংস্করণে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। ইসলামের জন্য কুরবানি করার মানসিকতা তাদের মাঝে তৈরি হচ্ছে না। যারা তাদের জন্য পথ তৈরি করে দিয়ে গেলেন, তাদেরকে জানার এবং তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করার মানসিকতাও জন্ম নিচ্ছে না। গতানুগতিক ও আরামদায়ক জীবনের মোহ তাদেরকে সামষ্টিক ও সাংগঠনিক পন্থায় দ্বীন কায়েমের বিষয়েও অনাগ্রহী করে তুলেছে। আমরা পূর্ববর্তীদের অনেক সমালোচনা করলেও তাদের মতো করে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারছি না, নিজেরা ফিগার হয়ে উঠতে পারছি না। কিন্তু আমরা যেমন পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাজের ফায়দা পাচ্ছি, অনাগত প্রজন্ম তেমনি আমাদের কাজের বা অস্তিত্বের ফায়দা ততটা পাবে কিনা- তা নিয়েও আমাদের চিন্তা করা প্রয়োজন।

তৃতীয় শিক্ষা : ধৈর্যের সাথে জাহেলিয়াতকে মোকাবেলা করা
হযরত খাদিজার রা. মতো বিশ্ব মানবতার ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম নারীকেও ইসলামোফোবিয়ার নির্মম ভিকটিম হতে হয়েছে। হযরত খাদিজাকে রা. একটা সময়ে সবাই সম্মান করতো। মক্কার নামীদামি সকলেই তাকে বিয়ে করতেও আগ্রহী ছিল। অথচ ইসলাম কবুল করার পর তাকে সামাজিকভাবে প্রতিটি পদে পদে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছিল। তার বাসায় প্রতিনিয়ত আবু লাহাবের স্ত্রী পাথর ছুড়তো। ময়লা, আবর্জনা আর বর্জ্যকে তার ঘরের উঠোনে এসে রেখে যেতো। হযরত খাদিজা রা. গৃহকর্ত্রী হিসেবে তখন হয়তো রান্না করছিলেন, বাচ্চাদের খাবার তৈরি করছিলেন কিংবা ঘুম পাড়াচ্ছিলেন। একটু নিজেদের কথা ভাবুন। যদি আপনার ঘরের মানুষগুলো এভাবে সাংসারিক কাজে ব্যস্ত থাকে আর বাইরে থেকে কেউ এসে আপনার বাসার দরোজার সামনে নিয়মিত বর্জ্য, ময়লা রেখে যায়, তাহলে আপনি কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতেন?

মা খাদিজার রা. ছেলে একদম শিশু অবস্থাতেই মারা যায়। মক্কার লোকেরা তখন তাকে সহানুভূতি দেখানো তো দূরের কথা, বরং তাকে যা তা বলে গালিগালাজ করে। তাকে ও তার পরিবারকে নির্বংশ বলে আখ্যায়িত করে। পুত্রসন্তান না থাকলে তার কোনো উত্তরাধিকারীও থাকবে না- মর্মে অপপ্রচার করে। সন্তান মারা যাওয়ার পর মায়ের বুকটা যখন ভেঙে যায়, তখন যদি সমাজ ও আত্মীয়স্বজন এসে সেই কষ্টকাতর মাকে ভর্ৎসনা করে তাহলে তার কেমন অনুভূতি হতে পারে?

অথচ হযরত খাদিজা রা. ছিলেন শান্ত, নিরুত্তাপ ও প্রতিক্রিয়াহীন। জটিল পরিস্থিতিতে, অন্যের তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের মুখেও কিভাবে ধৈর্য ধারণ করে সংযত থাকতে হয়, মা খাদিজা রা. ছিলেন তার জ্বলন্ত উদাহরণ। তার অসাধারণ ধৈর্য আমাদেরকে শিক্ষা দেয় যে, যে যত কথাই বলুক, আমাদেরকে নিজেদের ভিশনের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতেই হবে। নিজেদের কাজগুলো করে যেতে হবে। আল্লাহর আনুগত্য করতে হবে। আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা থেকে দূরে থাকতে হবে। যেকোনো পরিস্থিতি, তা অনুকূল হোক বা প্রতিকূল- সবার আগে আমাদের ভাবতে হবে, এ মুহূর্তে কী করলে আল্লাহ আমাদের ওপর সন্তুষ্ট থাকবেন? একজন মুমিনকে সবসময় আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিয়েই প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে, নিজের কাজগুলো করতে হবে।

চতুর্থ শিক্ষা : আল্লাহর জন্য নিজেকে উজাড় করার মানসিকতা লালন করা
হযরত খাদিজা রা. ছিলেন তৎকালীন মক্কার অন্যতম ধনী নারী। কিন্তু এই ধনাঢ্যতা তার কাছে আহামরি কিছু বলে বিবেচিত হয়নি কখনোই। বরং তার একমাত্র কামনা ও বাসনা ছিল, আল্লাহ তাকে যে অর্থ সম্পদ দিয়েছেন, তার সবটাই আবারও আল্লাহর পথে ব্যয় করা। হযরত খাদিজার রা. এ গুণটির কথা বলতে গিয়ে পরবর্তী সময়েও নবীজি সা. নিজে বেশ কয়েকবার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন। হযরত খাদিজা রা. তার ওপর যেভাবে আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছিলেন এবং যেভাবে ইসলামের জন্য, সাহাবিদের ভালো রাখার জন্য তিনি নিজের সবটুকু বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন, হযরত খাদিজা রা.-এর ইন্তেকালের পরও নবীজি সা. তা বারবার স্মরণ করেছেন।

রাসূলকে সা. একবার মা খাদিজা রা. সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। নবীজি সা. বলেন, “খাদিজা এমন একটি সময়ে আমার কথায় আস্থা রেখেছিল যখন অন্য সবাই আমাকে অবিশ্বাস করে প্রত্যাখ্যান করেছিল। সে আমাকে বিশ্বাস করেছিল এমন একটি সময়ে যখন অন্য কেউ আমায় বিশ্বাস করেনি। লোকজন যখন আমাকে অবজ্ঞাভরে অগ্রাহ্য করলো, তখন সে-ই তার সম্পদ দিয়ে আমাকে আগলে রেখেছিল। আর আল্লাহ পাক শুধুমাত্র তার গর্ভেই আমার সন্তান দিয়েছেন আর কারো গর্ভেই তিনি আমার সন্তান দান করেননি।” (মুসনাদে আহমাদ)
এভাবেই মা খাদিজা রা. নিজেকে আল্লাহর দ্বীনের পথে একটি সহায়ক উপকরণ হিসেবেই সবসময় উপস্থাপন করে গেছেন। আমরা অবশ্যই আমাদের অর্থসম্পদ বৃদ্ধি ও রিজিকের সংস্থানে সময় ও শ্রম ব্যয় করবো। কিন্তু এর উদ্দেশ্য যেন উপভোগ না হয়। বরং এর উদ্দেশ্য যেন হয় আল্লাহর দ্বীনকে সহায়তা করা। আল্লাহ পাক কম-বেশি আমাদের সবাইকেই জাগতিক সম্পদ দান করেছেন। টাকা পয়সা, ঘরবাড়ি, সন্তান, সময়, মেধা, যোগ্যতা ও কায়িক শ্রম করার ক্ষমতা দিয়েছেন। আমরা এই নিয়ামতগুলোর কতটুকু আল্লাহর পথে ব্যয় করি- সেই প্রশ্ন বারবার নিজেদেরই করা উচিত।

পঞ্চম শিক্ষা : পরিবারের মূল ভিত্তি হওয়ার চেষ্টা করা
হযরত খাদিজা রা. তার স্বামীর জন্য স্বস্তি ও শান্তির উৎস হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। হযরত খাদিজা রা. ছিলেন এমনই এক আশ্রয় যার সান্নিধ্যে এসে নবীজি সা. সাহস ও শক্তি পেতেন। জিহাদ করার প্রেরণা পেতেন। আল্লাহ নবীজিকে সা. যে ধরনের কঠিন দায়িত্ব দিয়েছিলেন তার বাস্তবায়নে খাদিজার রা. মতো একজন সহায়ক জীবনসঙ্গী তার খুবই প্রয়োজন ছিল। হযরত খাদিজার রা. মতো একজন মানুষ নবীজির সা. প্রয়োজন ছিল যিনি তার পাশে থাকবেন, সাহস জোগাবেন, বিপদে আশ্বাস দিবেন, সমর্থন করবেন, অব্যক্ত কথাগুলো শুনবেন এবং প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করবেন।

রাসূল সা. যখন নবুওয়াত লাভ করেন, তখন খাদিজা রা. মাঝবয়স্কা একজন নারী। অথচ সেই বয়সেই তিনি পাহাড়ে আরোহণ করে হেরাগুহায় গিয়ে নবীজিকে সা. খাবার দিয়ে আসতেন। যারা মক্কায় হেরাগুহা ভ্রমণ করেছেন তারা জানেন, একজন পুরুষের জন্যও এ পাহাড়ে ওঠা কতটা কষ্টকর। অথচ খাদিজা রা. এ কাজটিই নিয়মিত করে এসেছেন। রাসূল সা. যখন হেরাগুহায় ধ্যানে মগ্ন হতেন, ইবাদত করতেন, মা খাদিজা রা. তাকে বাসায় ফেরার জন্য তাগাদা দিতেন না। বরং রাসূলকে সা. তিনি স্বাধীনতা দিয়েছেন, তার মনের ক্ষুধা মেটানোর সুযোগ করে দিয়েছেন। রাসূলের সা. হেরাগুহায় অবস্থানরত অবস্থায় তিনিই পুরো সংসার সামাল দিয়েছেন।

ফেরেশতা জিবরাইলের আ. সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার পর নবীজি সা. যখন বুকভরা ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে ঘরে ফিরে আসেন, তখন মা খাদিজা রা. তাকে আশ্বস্ত করেন, সাহস দেন। তাকে সত্যপন্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। নবীজির সা. কথায় ভরসা রাখেন, ইসলাম কবুল করেন। শুধু তাই নয়, রাসূল সা. দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার পর যখন কাফেররা নবীজিকে সা. এবং তার সাহাবাগণের ওপর অত্যাচার শুরু করেন, হযরত খাদিজা রা. তখন তাদের পাশে অবস্থান নেন। হযরত খাদিজার রা. এ ধরনের অসাধারণ ভূমিকার কারণেই তিনি ইতিহাসে এমন একটি জায়গা করে নিয়েছিলেন যা আর কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। মা খাদিজার রা. মতো প্রভাববিস্তারকারী এবং প্রেরণাদায়ক জীবন সকলেই যাপন করতে পারেন না। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তোষ অর্জন করতে পেরেছিলেন। স্বয়ং আল্লাহ জিবরাইল আ.-এর মাধ্যমে তাকে সালামও পাঠিয়েছিলেন।

প্রতিটি পরিবারের উত্থান ও সত্য পথে টিকে থাকার জন্য এরকম একটি মজবুত ভিত্তির প্রয়োজন হয়। একথা ঠিক যে, প্রতিটি দাম্পত্য সম্পর্কেই স্বামী ও স্ত্রীকে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও সমর্থন দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু খাদিজা রা. ভালোবাসা ও সমর্থন করার পাশাপাশি তার স্বামীকে যে নিরাপত্তা দিয়েছিলেন, যে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন তা নজিরবিহীন। আমাদের সবারই দায়িত্ব হলো নিজেদের ঘর ও সংসারকে সকলের জন্য স্বস্তিদায়ক করে তোলা। ঘর যেন হয় সকলের নিরাপদ আশ্রয়। ঘরে যদি শান্তি না থাকে তাহলে পরিবারের কেউ বড় কোনো কাজে সফল হতে পারে না। আমরা যদি ঘরকে উপভোগ্য ও প্রশান্তির স্থান বানাতে পারি, তাহলে আমরাও ঘর থেকেই প্রেরণা পাবো এবং অন্যদের মাঝেও সেই ইতিবাচক প্রেরণা বিস্তার লাভ করবে।

উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজার রা. সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তিনি দ্বীন ইসলামের মহত্ত্ব অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। শুধু তাই নয়, এ দ্বীন কায়েমকে তিনি নিজের জীবনের ব্রত বানিয়ে নিয়েছিলেন। তাই তার স্বামী ও তার সহকর্মীরা দ্বীন কায়েমের পথে যে বন্ধুর পথ বেছে নিয়েছিল, তিনি সেখানে তাদের সহায়তা করেছিলেন। একজন নারী হয়েও সেই পথের সহযাত্রী হতে পেরেছিলেন।

আমরা সবাই হযরত খাদিজার রা. জীবনের এ বৈশিষ্ট্যগুলোকে জীবন চলারপথে অনুসরণ করতে পারি। তাহলে আমরা নিজেদের সংসার, পরিবার ও সমাজকে দ্বীন ইসলামের আলোয় আলোকিত করতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে অটল থাকার তাওফিক দিন। আমিন।
লেখক : সাংবাদিক, অনুবাদক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply