‘হাড় নেই, চাপ দিবেন না’ ধারাবাহিক ছাত্র নির্যাতনের করুণ প্রতিধ্বনি -সালাহউদ্দিন আইউবী

গত ৩০ অক্টেবর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক)-এর প্রধান ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে মাহাদি আকিব নামের এক শিক্ষার্থী আহত হলে ঐ কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতেই মুমূর্ষু অবস্থায় ভর্তি করানো হয় তাকে। তার মাথায় সাদা ব্যান্ডেজের উপর লেখা- ‘হাড় নেই, চাপ দিবেন না’। কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হয় ছবি ও ঘটনাটি নিয়ে। এই একটি বাক্য ভাইরাল হয়ে যাওয়ার কারণে ছাত্ররাজনীতির নষ্ট রূপ আবারও প্রত্যক্ষ করে বাংলাদেশ। এতে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। কিন্তু একজন আকিব শুধু নয়, অসংখ্য আকিবের নির্যাতনের করুণ প্রতিধ্বনি এই বাংলার আকাশে বাতাসে মিলিয়ে গেছে। বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের মতো অসংখ্য বাবা-মার বুক খালি হয়ে যাওয়া ঘটনাগুলো ভুলতে বসেছে জাতি। এর মধ্যে কেউ ন্যায়ের পথে আবার কেউ ন্যায়বিরুদ্ধ পথে পরিচালনা করছে নিজেদের জীবনকে।

হাসান আল-বাসরী (রহ) বলেছেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দাকে যখন খুশি অনুগ্রহ দান করতে থাকেন। কিন্তু যদি বান্দা এর জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে, তাহলে সেই অনুগ্রহকেই আল্লাহ শাস্তিতে পরিণত করে দেন।’ তিনি আরো বলেছেন- ‘শান্তি ও স্বস্তির সময় মানুষ একই রকম থাকে। কিন্তু যখন তার কাছে কঠিন পরিস্থিতি এসে উপস্থিত হয়, তখন তার প্রকৃত চেহারা বের হয়ে আসে।’ হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন- ‘মানুষ তার বন্ধুর ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। কাজেই বন্ধু নির্বাচনের ব্যাপারে সতর্ক থাকো।’ পরিবারের স্বপ্নগুলো জমা হতে থাকে তুলনামূলক যে সন্তানটি পড়ালেখায় ভালো তাকে নিয়ে। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে, কষ্ট সহ্য করে পরিবারের এই আকাক্সক্ষা পূরণের জন্য সেও উপনীত হয় জীবনযুদ্ধে। নির্ঘুম রাত কাটিয়ে, উপোস থেকে, জীবন সংগ্রামে সাঁতার কাটতে থাকে সে। এই সংগ্রামে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন স্বপ্ন যুক্ত হয়। সকল স্বপ্ন বাস্তবায়নের তাড়নায় সে ছুটতে থাকে তীব্র বেগে। ছুটতে ছুটতে পথে-পথে ধরা দেয় স্বপ্ন বাস্তবায়নের ছোট ছোট সফলতা। এসএসসিতে জিপিএ ফাইভ, এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ আরও কত গল্প কথা। কিন্তু সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হয় ভর্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধে জয়ী হওয়া সৈনিকরাই দেখা পায় বিশ্ববিদ্যালয় নামক সোনার হরিণের।

বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে পা রাখার সাথে সাথে সোনালি স্বপ্নগুলো রঙিন হতে থাকে। মলিন চেহারায় হাসির চমক দেখা যায়। পরিশ্রান্ত বাবা-মায়ের চোখেমুখে ফুটে ওঠে প্রশান্তির অনুভূতি। প্রিয় সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা গল্প লিখতে থাকেন পিতা-মাতা। যুগের পর যুগ কষ্টে থাকা দিনগুলো সুখের ছোঁয়ায় ভরিয়ে দেবে সন্তান এই কামনায় ঢোক গিলতে থাকেন বাবা-মা। সন্তানও আশ্বাসে ভরে দেয় মায়ের মন। আশ্বাসে বিশ্বাস করে মায়ের যেন সুখের সীমা হয় না।
দীর্ঘদিনের লালিত এই স্বপ্ন হঠাৎ এক দুঃস্বপ্নে হারিয়ে যায়। মায়ের কাছে সংবাদ আসে আপনার সন্তান আর নেই। গতকালও যে সন্তানের সাথে কথা হয়েছে মায়ের। যে মা নিজ হাতে পিঠা বানিয়ে সন্তানকে বাসে তুলে দিয়ে গিয়েছেন। কি হলো সে সন্তানের? কেন, কিভাবে সে মায়ের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে চলে গেলো দুনিয়া থেকে?
খবর নিয়ে জানা গেলো তারই এক বন্ধু, তারই এক বড় ভাই নিজ হাতে তার সন্তানকে নির্যাতন করে হত্যা করেছে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় মায়ের। মেধাবীদের চারণক্ষেত্র, প্রিয় মাতৃভূমির সবচেয়ে গৌরবান্বিত প্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্র কি আরেক জনকে এতটা নির্মমভাবে নির্যাতন করতে পারে? পশুত্বের কোন পর্যায়ে পৌঁছালে, কতটা লোভাতুর আর নেশাগ্রস্ত হলে এমনটা হতে পারে তা ভাবতেই কষ্ট হয় মায়ের।

এমন নির্মমতা শুধুমাত্র একজন মায়ের ভাগ্যেই জোটেনি। বরং প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের জন্ম থেকেই একদল নরপশু শত শত মায়ের কলিজার টুকরাকে ছিনিয়ে নিয়েছে। এসকল হায়েনার ছোবলে পঙ্গু হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে অনেক মেধাবী বন্ধু। হাসপাতালের বিছানায় বছরের পর বছর ধরে মুমূর্ষু অবস্থায় জীবনযুদ্ধে উপনীত অনেক স্বপ্নের ফেরিওয়ালা।
জীবনযুদ্ধে উপনীত সকল ছাত্র বন্ধুর অনেকেই এই নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অকালেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তেমনই কিছু ঘটনা তুলে ধরার চেষ্টা করব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ একক আধিপত্য বিস্তার করে আছে। শিক্ষার্থীদের জোর করে নিজ দলের মিছিলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ছাত্রলীগের পুরাতন নীতি। যেতে অস্বীকৃতি জানালে সাধারণ ছাত্রদের গেস্টরুমে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভয় দেখিয়ে রাজনীতি করা তাদের নতুন কিছু নয়। গত ৮ নভেম্বর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ না নেয়ায় আরিফুল ইসলাম ও তরিকুল ইসলাম নামের দুই শিক্ষার্থীকে মাস্টারদা সূর্যসেন হলে রাত পৌনে ৩টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত ৩৫১ নম্বর কক্ষে মারধর ও মানসিক নির্যাতন চালায় ছাত্রলীগ। ১ ফেব্রুয়ারি জিয়াউর রহমান হলে স্ট্যাম্প দিয়ে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের মারধর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্স। ২ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে অংশ না নেয়ায় কবি জসীমউদদীন হলের সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীরা প্রথম বর্ষের এক ছাত্রকে অপারেশনের জায়গায় লাথি মারে। ঐ দিনই ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক উৎপল বিশ্বাসের অনুসারীদের হাতে মারধরের শিকার হন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের পাঁচ শিক্ষার্থী। ২ জানুয়ারি বিজয় একাত্তর হলে গ্রুপ পরিবর্তন করতে চাওয়ায় পদ্মা ১০০০১ নম্বর রুমে এক কর্মীকে মারধর করে সভাপতি ফকির রাসেলের অনুসারীরা। এভাবে রুম দখল, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিরোধী ছাত্রসংগঠনের ওপর হামলা, চাঁদাবাজিসহ অসংখ্য নির্যাতন ঢাবি ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে।

২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান হলে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নির্মমভাবে খুন হন মেধাবী ছাত্র আবু বকর। এ হত্যা মামলায় সব আসামি ছিলেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। কোনো এক সাংবাদিক আবু বকরের হত্যা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘তেমন কিছুই ঘটেনি, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা মাত্র।’ রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ একজন দায়িত্বশীলের মুখ থেকে কেউ এমন বক্তব্য আশা করেনি। কিন্তু তাই হয়েছে। এভাবে গত একাত্তর বছরে শহীদ আবদুল মালেকসহ শতাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কোনো হত্যাকাণ্ডেরই রহস্য সঠিকভাবে নিরূপণ হয়নি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় : ২০২১ সাল তথা এ বছরের গত ৪ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগের ২০১৯-২০ সেশনের সামি এম সাজিদ নামে এক নতুন শিক্ষার্থী শহীদ সামসুজ্জোহা হলে রাতভর র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়। একই বিভাগের আব্দুল্লাহ্ আল মাসুদ (কিবরিয়া), তপু, রুবেলসহ সিনিয়র ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থী তাকে রাতভর হলের ছাদে লাথি-ঘুষি ও মারধর করেছে বলে সে তাদের ব্যাচের মেসেঞ্জার গ্রুপে জানিয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সবকটি হলেই ছাত্রলীগের আলাদাভাবে রয়েছে ‘পলিটিক্যাল ব্লক’। বেশ কয়েকটি কক্ষ দখল করে তারা বিরোধী রাজনৈতিক মতের অনুসারীদের নির্যাতন করে। বিভিন্ন সময়ে হলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিবির সন্দেহ বা অভিযোগে ডেকে এনে নির্যাতন করা হয়। এছাড়া ক্যাম্পাসের বাইরে অগণিত ছাত্র এখনো নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ২০১৮ সালের ২ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনে বিশ^বিদ্যালয়ের মেইন গেটের সামনে হাতুড়ি, স্টাম্প, লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারধর করে তরিকুল ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থীর পা ও মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে দেয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। ২০১৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে শহীদ মিনার থেকে ৯ জনকে শিবির সন্দেহে বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু হলে নিয়ে পেটানো হয়। পরে রাতে রক্তাক্ত অবস্থায় তাদের পুলিশে দেয়া হয়। একই বছর ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হল এলাকা (পশ্চিম পাড়া) থেকে ১৪ শিক্ষার্থীকে ধরে বঙ্গবন্ধু হলে নিয়ে যায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। সেখানে তাদের আটকে রেখে মারধর ও জিজ্ঞাসাবাদের পর ৪ জনকে পুলিশে দেয়া হয়। ২০১৭ সালের ৯ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হল থেকে শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মারাত্মক জখম করে মৃতপ্রায় অবস্থায় ১৩ জনকে পুলিশে দেয় ছাত্রলীগ।

২০০৯ সালের ১৩ মার্চ ছাত্রলীগের হামলায় শাহাদত বরণ করেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারি শহীদ শরীফুজ্জামান নোমানী। ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে প্রাণ হারায় গণিত বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী ফারুক হোসেন। একই বছর ১৫ আগস্ট শোক দিবসে টোকেন ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে শাহ মখদুম হলের দোতলার ছাদ থেকে ছাত্রলীগ কর্মী নাসিরুল্লাহ নাসিমকে ফেলে হত্যা করে ছাত্রলীগ সভাপতি গ্রুপের কর্মীরা। ২০১২ সালের ১৫ জুলাই রাতে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের নেতাকর্মীদের মাঝে গোলাগুলির ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী আবদুল্লাহ আল হাসান ওরফে সোহেল। পদ্মা সেতুর চাঁদা তোলাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল লাগে বলে রিপোর্টে বলা হয়। ২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের নিজ কক্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় ঐ হলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী আকন্দ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় : ২০১০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারির রাতে চট্টগ্রামের ষোল শহর রেলস্টেশনে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র মহিউদ্দিন কায়সারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ১২ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবিরের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে শাহ আমানত হল ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মামুন হোসেন নিহত হন। ২৮ মার্চ রাতে শাটল ট্রেনে করে চট্টগ্রাম শহর হতে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে চবি মার্কেটিং বিভাগের ছাত্র হারুন অর রশীদকে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ১৫ এপ্রিল চবি ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন জোবরা গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষে অ্যাকাউন্টিং দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী আসাদুজ্জামান নিহত হন। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ছাত্রলীগ কর্মী তাপস। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর রাতে চবির ২ নম্বর গেটসংলগ্ন নিজ বাসায় খুন হন ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ। এ হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত আসামিরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক ১০ নেতাকর্মী।

ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় : ২০১৩ সালের ১৯ জানুয়ারি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গোলাগুলিতে নিহত হয় ১০ বছরের শিশু রাব্বি। ২০১৪ সালের ৩১ মার্চ নিজ দলের নেতাকর্মীর হাতেই প্রাণ হারান আশরাফুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী সায়াদ ইবনে মমাজ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় : ২০১২ সালের ৮ জানুয়ারি ছাত্রলীগের মধ্যে অন্তর্কলহের জেরে এক হামলায় গুরুতর আহত হন জাবির ইংরেজি বিভাগের ছাত্র জুবায়ের আহমেদ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ৫০ বছরে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাত সাতটি হত্যাকাণ্ড হয়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় : ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর ১৮ দলের অবরোধ কর্মসূচির দিনে শিবির সন্দেহে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ দাসকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : ২০১২ সালের ৯ জুন প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ সহ-সভাপতি ফাহিম মাহফুজ বিপুল। ২০১৫ সালের ১৬ এপ্রিল স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একাংশের সঙ্গে সংঘর্ষে মারা যায় হাবিপ্রবির বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র জাকারিয়া ও কৃষি বিভাগের ছাত্র মাহমুদুল হাসান মিল্টন।

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : ২০১২ সালের ১২ মার্চ অভ্যন্তরীণ কোন্দলে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবদুল আজিজ খান সজীব ও রিয়াদ খুন হয়।

শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ হারান ছাত্রলীগ কর্মী ও সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী সুমন দাস।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে প্রকাশ্যে খুন হন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র নাইমুল ইসলাম রিয়াদ।

দেশে গণতন্ত্র হত্যা ও রাতের ভোটে নির্বাচিত হওয়া সংস্কৃতি চালু হওয়ার ফলে এই বর্বরতা অনেক গুণে বেড়ে গেছে। কেউ জানে না কত দিনে এই জাহেলিয়াত দূর হবে। ধারাবাহিক অসভ্যতার এই কুপ্রভাব সমাজের সর্বত্রই আজ বিরাজমান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও খেলাধুলাও আজ রাজনৈতিক কোন্দলের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ও পাকিস্তান টি-টুয়েন্টি সিরিজকে কেন্দ্র করে জার্সি পতাকা নিয়ে যে অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে এটি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রতিহিংসা পরায়ণতার নতুন এক উদাহরণ। ভিন্নমত ও ভিন্ন দলের ব্যক্তিরা সব প্রতিষ্ঠানে এখন অবাঞ্ছিত অথবা কোণঠাসা হয়ে গেছে। এটি সমাজের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথ রুদ্ধ হওয়ার অন্যতম কারণ। রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভিন্ন মত থাকবে এটিই স্বাভাবিক কিন্তু অন্তর্দলীয় হিংসা-প্রতিহিংসা ও কোন্দলের কদর্যতা একটি সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলা নষ্ট করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে কারো ক্ষুদ্র স্বার্থে শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ নষ্ট করতে দেয়া যাবে না। বারবার ক্ষমতাসীনদের চেহারা ফুটে উঠায় আজ এ কথা পরিষ্কার যে, সবসময় তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে ছাত্র নির্যাতন করেছে। এই বিষয়ে আমাদের সচেতন ভূমিকাই হতে পারে এর সমাধানের কারণ। ছাত্রদের কল্যাণে তাই সকল ছাত্র নেতৃত্বের যথাযথ অধিকার চর্চা করা দরকার। শিক্ষার মান উন্নত করতে ও পড়াশোনার পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে পারলে ছাত্ররা দক্ষ ও উন্নত মানবসম্পদে রূপান্তরিত হবে। অন্যদিকে ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গ বাস….’ নীতির কথা মনে থাকলে কারো বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আর যারা কথায় কথায় ছাত্র নির্যাতন করে, অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিজের বন্ধুদের হত্যা করে তারা কখনো ছাত্রসমাজের আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারবে না। তাই আপনার সন্তানকে সঠিক সঙ্গ বাছাই নিশ্চিত করুন, কল্যাণের পথে চলতে শিক্ষা দিন।

লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply