হেরেমের মর্যাদার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট -এম মুহাম্মদ আব্দুল গাফ্ফার

বিশ্বের প্রথম নগরীদ্বয় পবিত্র মক্কা ও মদীনা-ই হলো অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্মানের অধিকারী। আর এ সম্মান সে এমনিতেই পায়নি। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মক্কার হেরেম শরিফকে সম্মানিত তথা মর্যাদাবান ঘোষণা করেছেন বলেই মক্কার হেরেমের এ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মক্কার এ অবস্থান সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন, ‘এ কথা নিঃসন্দেহ যে, মক্কায় অবস্থিত ঘরখানাকেই মানুষের ইবাদতের ঘর হিসেবে সর্বপ্রথম তৈরি করা হয়েছে।’ (সূরা আলে ইমরান : ৯৬)
মহান রাব্বুল আলামিনের এ ঘোষণা থেকে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে মক্কায় অবস্থিত মানুষের প্রথম ইবাদতখানা হওয়ার কারণেই তার এত মর্যাদা। এ ঘরের মর্যাদা ও গুরুত্ব বর্ণনা করে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আরো ঘোষণা করেন, ‘উহাকে কল্যাণ ও মঙ্গলময় করে দেয়া হয়েছিল এবং সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য হেদায়াত লাভের কেন্দ্র বানানো হয়েছিল উহাতে সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ রয়েছে।’ (সূরা আলে ইমরান : ৯৭)

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মানুষকে পৃথিবীর খলিফা বা প্রতিনিধি করে সৃষ্টি করেছেন। এ মানুষ আল্লাহর দাসত্ব মেনে তাঁর দেয়া বিধান বাস্তবায়ন করবে এটাই হলো আল্লাহর ইবাদত বা দাসত্ব। আল্লাহর ইবাদতের কর্মকেন্দ্র হলো কাবাগৃহ বা বায়তুল হারাম। যেখানে এ বায়তুল হারামের অবস্থান সেটাই হেরেম শরিফ যার মর্যাদার কথা স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালাই ঘোষণা করেছেন। মক্কার হেরেমের মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মহানবী সা. এর উদ্দেশে ঘোষণা করেন, ‘হে রাসূল তুমি তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, আমাকে এ নির্দেশই দেয়া হয়েছে যে, এ শহরের রবের দাসত্ব করবো যিনি একে হেরেম বা মহিমান্বিত করেছেন, তিনি সব জিনিসের মালিকও বটে, আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন আমি মুসলমান হয়ে জীবন যাপন করি।’ (সূরা নমল : ৯১)
এ মক্কা ভূমির হেরেমকে সেখানকার লোকদের জন্য শান্তিময় ও নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন। একমাত্র হেরেমের অধিবাসীর অধিকারের জন্য সারা বিশ্বে তাদের মান মর্যাদা ছিল অজস্র। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন, ‘তারা (কাফিররা) বলে, আমরা যদি তোমাদের সাথে এ হেদায়াতের আনুগত্য স্বীকার করে নিই তাহলে স্বদেশভূমি থেকে অকস্মাৎ বহিষ্কৃত হবো, কিন্তু এটা কি বাস্তব ঘটনা নয় যে, আমি একটি নিরাপদ ও শান্তিময় হেরেমকে তাদের অবস্থানস্থল করেছি যেখানে সব রকমের ফলফলাদি আমার পক্ষ থেকে রিজিক হিসেবে প্রতিনিয়ত এসে জমা হচ্ছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোক এটা অবহিত নয়।’ (সূরা কাসাস : ৫৭)

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মক্কার ঊষর মরু অঞ্চলে বিচিত্রময় রিজিকের চিত্র উত্থাপন করেছেন। যেখানে পাহাড় পর্বত বেষ্টিত মরুময় অত্যন্ত রুক্ষ একটি জনপদের অবস্থান সেখানে বিভিন্ন রকমের খাদ্যসামগ্রী, ফল-ফলাদি ও জীবন যাপনের প্রয়োজনীয় দ্রব্যসম্ভারের এমন সমারোহের কথা কল্পনাও করা যায় না অথচ মহান রাব্বুল আলামিনের অশেষ রহমত বরকতে সেখানে অব্যাহতভাবে এসব নেয়ামতের পর্যাপ্ত আমদানি হয়ে থাকে। মক্কার হেরেমের এটাও যে একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নিজেই বর্ণনা করেছেন।

এ হেরেম বা বায়তুল্লাহ শরিফে আল্লাহর বান্দাহ পৃথিবীর সকল মুসলমানের সমানভাবে প্রবেশাধিকার রয়েছে। এখানে ধনী-গরিব, কালো-সাদা, উঁচু-নিচু, ফকির-বাদশা, মালিক-শ্রমিক, পুরুষ ও নারীর প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো ভেদাভেদ নেই। যারা এ হেরেমে প্রবেশে বাধার সৃষ্টি করে মূলত তারাই যে বিশ্বে শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গকারী, মানবতাবিরোধী ও সন্ত্রাসী জনসমষ্টি তাতে আর সন্দেহের কী থাকতে পারে? যে ব্যক্তি আল্লাহকে একমাত্র রব ও মহানবীকে তাঁর রাসূল হিসেবে মেনে নেবে তিনিই হেরেমে প্রবেশের অধিকার লাভ করবেন। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন, ‘যারা কুফরি করেছে এবং আল্লাহর পথে চলতে বাধা দিচ্ছে এবং মসজিদে হারামে যাবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যে মসজিদে হারামকে আমি সকল মানুষের জন্য তৈরি করছি এবং যেখানে স্থানীয় ও বহিরাগত লোকের অধিকার সমান, তাদের আচরণ নিশ্চিতভাবেই শাস্তি প্রদানের মত আচরণ, এতে (মসজিদে হারামে) সেই সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে জুলুমের পথ ধরবে, আমি তাকে কঠিন শাস্তির আস্বাদ গ্রহণ করাবো।’ (সূরা হজ : ২৫)

মক্কা তথা পবিত্র হেরেম শুধু মানুষের জন্য নিরাপদ নয় এটা প্রতিটি প্রাণীর জন্যই নিরাপদ কেবলমাত্র মানুষকে কষ্ট দেয় এমন পাঁচটি জীব ব্যতিরেকে। এ প্রসঙ্গে একাধিক হাদীস বর্ণিত আছে। একটি হাদীস এ রকম: ‘হযরত হাফসা রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন (হেরেমে) কাক, চিল, ইঁদুর, বিচ্ছু ও ক্ষেপা কুকুর এ পাঁচ প্রকারের জন্তুকে কেউ হত্যা করলে কোনো দোষ নেই। (বুখারী-১৬৯৬, কিতাবুল উমরা)
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মক্কা তথা হেরেমকে এমনই সম্মানিত করেছেন সেখানে উপর্যুক্ত পাঁচ প্রকারের জীব ব্যতীত শুধু মানুষ নয় সকল জীব এমনকি অনেক উদ্ভিদের জন্যও নিরাপদ করেছেন। এ মর্মে একটি হাদীস এভাবে বর্ণিত হয়েছে, ‘ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বর্ণনা করেছেন রাসূলুল্লাহ সা. মক্কা বিজয়ের দিন বলেছিলেন এ শহরকে আল্লাহ মহিমান্বিত ও মর্যাদাসম্পন্ন করেছেন। এর কাঁটা (গাছকে)ও কাটা যাবে না, শিকার তাড়া করা যাবে না, রাস্তায় পড়ে থাকা জিনিসকে যে ব্যক্তি তার বলে প্রচার করবে সে ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ কুড়িয়ে নিতে পারবে না। (বুখারী-১৪৮৩)

পবিত্র মক্কার এ মর্যাদা আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার দান, তাঁরই বিশেষ অনুগ্রহ ও পরিকল্পনায় জাতির পিতা হযরত ইবরাহিম (আ) এর দোয়ার কারণেই। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন ‘ঐ সময়ের কথা স্মরণ কর যখন ইবরাহিম এ বলে দোয়া করেছিল, হে আমার রব! এ শহরকে (মক্কা) তুমি নিরাপত্তার শহর বানাও আর আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখ। হে প্রভু! ঐ সব মূর্তি বহু লোককে পথভ্রষ্ট করেছে। সুতরাং তাদের মধ্যে যে আমার প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করবে সে আমার পথ অনুসরণকারী হবে। যদি কেউ অমান্য করে তাহলে তুমি তো ক্ষমাশীল ও মেহেরবান। প্রভু হে! আমি একটি ঊষর মরু প্রান্তরে আমার সন্তানদের এক অংশকে তোমার মহিমান্বিত ঘরের পাশে এনে রেখে যাচ্ছি। হে রব! যাতে তারা এখানে সালাত কায়েম করে, সুতরাং ওদের প্রতি মানুষের মন আকৃষ্ট করে দাও এবং তাদেরকে ফলমূলের খাদ্য দান করো তারা তোমার শোকরগোজার বান্দাহ হতে পারে।’ (সূরা ইবরাহিম : ২৪-২৭)

পবিত্র কুরআনুল কারীমের এ বর্ণনা থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা গেল যে, মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার ইচ্ছায় একটি জনমানবহীন মরুময় এলাকায় মানববসতির সূচনাসহ আল্লাহর ঘরের পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের কর্মকেন্দ্র চালু করাই জাতির পিতার ছিল মূল লক্ষ্য, যার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে বহুবিধ কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়েছে।
জাতির পিতা হযরত ইবরাহিম (আ) ও তাঁর বংশধরদের অনুকরণ ও অনুসরণের ধারাবাহিকতায় মক্কায় কাবাগৃহ ও তৎসন্নিহিত অঞ্চল হেরেম বা সংরক্ষিত সম্মানিত এলাকা হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। এটা আল্লাহর নির্দেশক্রমে হযরত ইবরাহিমই (আ) করেছিলেন যা অদ্যাবধি বলবত রয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। এ হেরেমের সম্মানিত হবার মূল টার্গেট হলো আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার ঘর যেখানে অবস্থিত সেখানে তাঁর হুকুম বাস্তবায়নের কেন্দ্র হবে এবং সেখানে যেমন যাবতীয় অবৈধ কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে তেমনি এখান থেকে একমাত্র আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নের প্রশিক্ষণ ও দীক্ষা তাঁর বান্দাগণ লাভ করে তা বিশ্বময় প্রচার প্রসারের ব্রত গ্রহণ করবে।

আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মদ সা. আল্লাহর দেয়া সে দায়িত্বেরই পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে গিয়ে অবর্ণনীয় জুলুম নির্যাতন সহ্য করেও শেষ পর্যন্ত জন্মভূমি ত্যাগ করে মদীনায় স্বীয় কর্মকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব সুসম্পন্ন করেন। যে জায়গাটি আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের কর্মকেন্দ্র হয় তার মর্যাদা যে পৃথিবীর সকল স্থানের চেয়ে অনেক বেশি হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। এ দিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যায় মদীনাতুল মানাওয়ারার মর্যাদাকে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ মর্মে মহানবী সা.-এর একটি হাদীস এভাবে এসেছে ‘আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ রা. থেকে বর্ণিত, নবী সা. বলেছেন, ইবরাহিম (আ) মক্কাকে সম্মানিত ঘোষণা করেছিলেন এবং এর জন্য দোয়া করেছিলেন, সুতরাং ইবরাহিম (আ) যেমন মক্কাকে সম্মানিত ঘোষণা করেছিলেন আমিও অনুরূপ মদীনাকে সম্মানিত ঘোষণা করলাম এবং মুদ ও সায়ের জন্য দোয়া করলাম যেমন ইবরাহিম (আ) মক্কার জন্য করেছিলেন।’ (বুখারী-১৯৮১)

পবিত্র কুরআন হাদীস থেকে জানা গেল যে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কর্মকেন্দ্র হওয়ার কারণেই বিশ্বের এ দুটো নগরীর এ মর্যাদা আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা অতুলনীয় করে দিয়েছেন। নির্ভরযোগ্য হাদীসের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, দজ্জালের ফেতনা থেকেও এ দু’নগরী মুক্ত থাকবে কারণ ঐ সময় ফেরেশতাগণ উক্ত নগরীদ্বয়ের পাহারায় নিয়োজিত থাকবেন ফলে দজ্জাল তথায় প্রবেশ করতে পারবে না।
যে কারণে ঐ দুটি মহানগরীকে আল্লাহ সম্মানিত করেছেন তার যথাযথ গুরুত্ব উপলব্ধি করে মুসলমানদের সে দায়িত্ব আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পালনের তাওফিক দান করুন, এ প্রার্থনাই তাঁর দরবারে করি। আমিন।
লেখক: সদস্য, দারুল ইসলাম ট্রাস্ট, দরগাহ রোড, সিরাজগঞ্জ

SHARE

Leave a Reply