১১ মে কুরআন দিবস বাংলাদেশের সবুজ ভূখণ্ডে শাহাদাতের দীপ্ত মিছিল -রাশেদুল ইসলাম

আল্লাহর দেওয়া বিধানের আলোকে মানুষের জীবন পরিচালনার বিরোধিতা করার জন্যই শয়তানের সকল তৎপরতা। এই তৎপরতার মূল ক্রীড়নক মানুষ নিজেই। অনেকের ধারণা, মহাগ্রন্থ আল কুরআনের বিরোধিতা শুধুমাত্র কুরআন না জানার কারণে। এটা একদিক থেকে ঠিক আছে। তবে এর উল্টোপাশে বিশাল জায়গাজুড়ে যে বিষয়টি রয়েছে, তা হলো মহান আল্লাহর সাথে মানুষের সরাসরি বিরোধিতায় লিপ্ত হওয়া। যারা এই বিরোধিতায় লিপ্ত হয়, তারা পৃথিবীর তাবৎ সত্য-ফিতরাত উপেক্ষা করেই তাদের কর্মসূচি নির্ধারণ করে থাকে। ১৯৮৫ সালের ১১ মে কুরআনপ্রেমীদের উপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণে বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৮ জন ভাইয়ের শাহাদাতের ঘটনা সেরকম আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশবিশেষ।

মহা পবিত্র জীবনবিধান আল কুরআনের হেফাজতে জীবন দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। এই আত্মত্যাগের বিষয়টিকে সামান্য একটি দুর্ঘটনা হিসেবে মূল্যায়ন করার সুযোগ নেই। আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগ থেকে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে আবু জেহেলের সঙ্গী-সাথীদের ষড়যন্ত্রের রূপরেখার সাথে ব্যাপক মিল রয়েছে। আল কুরআনের কিছু আয়াত তথা ইসলামের কিছু কিছু বিষয় মানবিকতার বিরোধী- এই বক্তব্য তখনকার কাফিরদের শক্ত বক্তব্য ছিলো। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় সেই সকল ঠুনকো বক্তব্য উপেক্ষা করে মরু দুলাল রাহমাতুল্লিল আলামিন নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের নেতৃত্বে কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত প্রতিটি বিধান প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যার প্রতিষ্ঠায় জীবনোৎসর্গকারী হিসেবে রাসূলের অনেক সঙ্গী-সাথীকে চূড়ান্ত পর্যায়ে শাহাদাতের পেয়ালা পান করতে হয়েছে। “এসব কাফের বলে, এ কুরআন তোমরা কখনো শুনবে না। আর যখন তা শুনানো হবে তখন হট্টগোল বাধিয়ে দেবে। হয়তো এভাবে তোমরা বিজয়ী হবে।” (সূরা হামিম সাজদাহ : ২৬) মূলত কুচক্রী মহলের কুরআন অবমাননা ও ইসলামের মুজাহিদদের কুরআনের মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন পৃথিবীর একটি বহমান প্রক্রিয়া। ইতিহাস সাক্ষী যে অসত্যের প্রবল আক্রমণে সত্য কখনো পরাজয় বরণ করে না। বরং সমস্ত প্রতিবন্ধকতাকে দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করাই সত্যের সৈনিকদের কাজ। কুরআন নিজেই ঘোষণা দিয়েছে- “আর জানিয়ে দাও, সত্য এসে গেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, মিথ্যা তো বিলুপ্ত হবার জন্যই।” (সূরা বনি ইসরাইল : ৮১)

ঘটনাপ্রবাহ
ঘটনাটি ১৯৮৫ সালের ১২ এপ্রিলের। পদ্মপল চোপরা ও শীতল সিং নামের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দু’জন মুসলিমবিদ্বেষী ব্যক্তি কুরআনের সকল আরবি কপি ও অনুবাদ বাজেয়াপ্ত করার জন্য কলকাতা হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে। রিটের বিবৃতিটি ছিলো, “কুরআনে এমন কিছু আয়াত আছে যেখানে কাফির ও মুশরিকদের হত্যা এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রেরণা দেয়া হয়েছে, তাই এই গ্রন্থ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্ম দিতে পারে।” বিচারক মিসেস পদ্মা খাস্তগীর এই মামলা গ্রহণ করেন এবং এ বিষয়ে তিন সপ্তাহের মধ্যে অ্যাফিডেভিট প্রদানের জন্য রাজ্য সরকারের প্রতি নির্দেশ দেয়। এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সারাবিশ্বে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

১০ মে জুমার নামাজ শেষে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ থেকে ছাত্র-জনতার মিছিল বের হয়। যাতে বাংলাদেশ পুলিশ সরকারি নির্দেশ মোতাবেক লাঠিচার্জ করে। এই বাধার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১১ মে রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ ঈদগাহ ময়দানে তৌহিদি জনতা সমাবেশ আয়োজন করেন। পুলিশ সমাবেশে ১৪৪ ধারা জারি করে। উপস্থিত জনতা শুধুমাত্র দু’আ করার অনুমতি চাইলে তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াহিদুজ্জামান মোল্লা তা না দিয়ে পুলিশকে গুলি করার নির্দেশ দেয়। মুহুর্মুহু গুলিতে তাৎক্ষণিক মাটিতে লুটিয়ে পড়ে দশম শ্রেণীর ছাত্র শিবিরকর্মী আব্দুল মতিন। হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় শীষ মোহাম্মদ, রশিদুল হক, ৮ম শ্রেণীর ছাত্র সেলিম, সাহাবুদ্দীন, কৃষক আলতাফুর রহমান সবুর, রিকশাচালক মোক্তার হোসেন ও রেলশ্রমিক নজরুল ইসলাম শহীদ হন। আহত হয় অর্ধ শতাধিক মানুষ। এই ঘটনা ইসলামপ্রিয় জনতাকে হতবিহবল করে তোলে। যার প্রেক্ষিতে ১১ মে কুরআন দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়
মহান আল্লাহ প্রেরিত বিশ্ব মানবতার মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ আল কুরআন পুরোটা কিংবা আংশিক বাজেয়াপ্ত করার দাবি বিশ্বে বিভিন্ন সময় উঠেছে। বিশেষ করে ভারতে এর পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখি আমরা। গত বছর এপ্রিলে আল কুরআনের ২৬টি আয়াত নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবি তোলে সৈয়দ ওয়াসিম রিজভি নামের ভারতের উত্তরপ্রদেশের শিয়া ওয়াকফ বোর্ডের একজন সাবেক চেয়ারম্যান এবং দেশের শিয়া মুসলিম সমাজের একজন প্রভাবশালী নেতা। তার যুক্তি ছিল, এই আয়াতগুলো মুসলিমদের তরুণ প্রজন্মকে শিখিয়ে বিধর্মীদের, বিশেষত মূর্তিপূজায় বিশ্বাসীদের হত্যা করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
ওয়াসিম রিজভির করা এই জনস্বার্থ পিটিশন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে এবং এরকম একটি ‘সম্পূর্ণ অর্থহীন’ পিটিশন দাখিল করার জন্য আবেদনকারী সৈয়দ ওয়াসিম রিজভিকে ৫০,০০০ রুপি জরিমানাও করা হয়েছে। এই ঘটনার বিরোধিতা করে ভারত-বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বে মুসলিমরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে।

যে ২৬ আয়াত নিষিদ্ধের দাবি তোলা হয়
সূরা নিসা, আয়াত ৫৬, ৮৯, ১০১। সূরা মায়িদাহ, আয়াত ১৪, ৩৩, ৫১, ৫৭। সূরা আনফাল, আয়াত ১২, ৬৫, ৬৯। সূরা তাওবাহ, আয়াত ৫, ১৪, ২৩, ২৮-২৯, ৩৭, ৫৮, ১১১, ১২৩। সূরা আম্বিয়া, আয়াত ৯৮। সূরা সাজদাহ, আয়াত ২২। সূরা আহজাব, আয়াত ৬১। সূরা হামিম সাজদাহ, আয়াত ২৭-২৮। সূরা ফাতহ, আয়াত ২০। সূরা তহারিম, আয়াত ৯।

কুরআনের বিরোধিতাকারীরা সবসময় সোচ্চার
আমাদের দেশে কুরআন বিরোধিতাকারীরা সবসময় সোচ্চার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় একটি বিষয় হচ্ছে, কুরআন সম্পর্কে আগামী প্রজন্ম যেন একেবারেই উদাসীন হয়, এজন্য পাঠ্য তালিকায় থাকা ইসলাম শিক্ষা তথা কুরআন শিক্ষা সম্পর্কিত বইটি অতিরিক্ত করেছে। এমনকি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই উদ্যোগ নেওয়ার পরও জাতির মধ্যে আপাত কোনো মৌলিক প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে না।

বস্তুত যখন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে কুরআন বিরোধিতায় কোনো সফলতা দেখা যাচ্ছে না, তখন শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণরূপে কুরআন বাজেয়াপ্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারা মুখের মিষ্টি কথা দিয়ে মানুষকে বুঝাতে চাচ্ছে ইসলামের অনেক উপকার করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে প্রাথমিক সমাপনীর পর থেকেই বিদ্যালয়ের সিলেবাসে ইসলাম শিক্ষাবিষয়ক সাবজেক্টকে ঐচ্ছিক করে তথাকথিত ভূতুড়ে বিজ্ঞান পড়িয়ে ইসলামের নামে বিষবাষ্প ছড়িয়ে জাতিকে নাস্তিক বানানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ধর্মনিরপেক্ষতার আড়ালে এ কাজ অতি সূক্ষ্মভাবে তারা করেই যাচ্ছে। এ বিষয়ে নিশ্চুপ বসে থাকলে ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কি পরিণতি অপেক্ষা করছে তা বলার প্রয়োজন নেই। তাই কুরআনপ্রেমিক জনতাকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কুরআনবিরোধী সমস্ত অপকর্ম রুখে দিতে হবে।
লেখক : সাবেক সম্পাদক, ছাত্র সংবাদ

SHARE

Leave a Reply