post

ঈদ সংস্কৃতি মুসলিম উম্মাহর আন্তর্জাতিক ঐক্য

মুহাদ্দিস ডক্টর এনামুল হক

০৭ এপ্রিল ২০২৩

পূর্ণ একমাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ উৎসব মুসলিম জাতির প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে সত্যিই এক বিরাট নিয়ামত ও অনুগ্রহ। মুসলিম উম্মার প্রত্যেক সদস্যের আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা, মায়া-মমতা ঈদের এ পবিত্র ও অনাবিল আনন্দ উৎসবে একাকার হয়ে যায়। আল্লাহর বাণী, “নিশ্চয়ই তোমাদের এ জাতি একক একটি জাতি।’’ (সূরা আম্বিয়া : ৯২, সূরা মু’মিনুন : ৫২) মহান আল্লাহর এ ঘোষণার বাস্তব রূপটি চরমভাবে উদ্ভাসিত হয় বিশ্ববাসীর সামনে। ‘ঈদ মুসলমানদের জীবনে শুধুমাত্র আনন্দ-উৎসবই নয়, বরং এটি একটি মহান ইবাদাত যার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ আন্তর্জাতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা খুঁজে পায়, ধনী-গরিব, কালো-সাদা, ছোট-বড়, দেশী-বিদেশী, আরব-আজম সকল ভেদাভেদ ভুলে যায় এবং সর্বশ্রেণি ও সকল বয়সের নারী-পুরুষ ঈদের জামায়াতে শামিল হয়ে মহান প্রভুর শোকর আদায়ে নুয়ে পড়ে। ঈদের এ মহান উপলক্ষকে সামনে রেখে আমাদের এ আত্মজিজ্ঞাসা উত্থাপিত হওয়া প্রয়োজন যে, সত্যিই আমাদের ঈদ মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ হবার কারণ যেন হয়। দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনা, নেক আমল করার প্রতিযোগিতা ও পাপের কাজ হতে পরহেজ থাকার অভ্যাস অব্যাহত রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে। যে রাসূলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাত হিসাবে ঈদ পালন করা হচ্ছে, সে রাসূলুল্লাহ সা.-এর সকল সুন্নাতের অনুসরণ করার শপথবদ্ধ হতে হবে। তাহলে ঈদের যথার্থ কামিয়াবি হাসিল করা যাবে।

ঈদ অর্থ

ঈদ শব্দের অর্থ ফিরে আসা। প্রতি বছর দু’বার এ উৎসব কল্যাণ ও আনন্দের বার্তা নিয়ে ফিরে আসে বলে এ নামে অভিহিত করা হয়। আবার ঈদ আদত থেকে এর অর্থ আদত-অভ্যাস। তখন ঈদ অর্থ আল্লাহ প্রতি বছর ঈদের মাধ্যমে বান্দাকে তাঁর দয়া, ইহসান ও করুণা ভোগে অভ্যস্ত করে তুলেছেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে ঈদ হচ্ছে বান্দার জন্য বিরাট আতিথেয়তা। তাই ঈদের দিন সাওম রাখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ জন্য ঈদকে আল্লাহর নিয়ামত ও জিয়াফত ভোগ করার চিরন্তন অভ্যাস বা আচার-অনুষ্ঠান বলা হয়। ঈদুল ফিতর মানে সওম ভাঙার ঈদ। ঈদের দিন সওম ভাঙা প্রথম ও প্রধান কাজ। তাই মহানবী সা. মিষ্টি খেজুর খেয়ে ঈদের সূচনা করতেন। 

ঈদের প্রবর্তন

ঈদ উৎসবের সূচনা হয় হিজরি দ্বিতীয় সন মুতাবিক ৬২৩ খ্রিস্টাব্দে মহানবী মুহাম্মদ সা.-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছর থেকে। জাহেলিয়া যুগে আরবের মক্কার উকাজ মেলা এবং মদিনায় শরতের পূর্ণিমায় নওরোজ ও বসন্তের পূর্ণিমায় মিহিরজান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। (আউনুল মা’বুদ শরহি সুনানু আবু দাউদ, ৩য় খণ্ড, পৃ: ৮৮) আর সে সব অনুষ্ঠানে লোকজন অশ্লীল আনন্দ-উল্লাস করতো। মদিনায় আগমনের পর মহানবী সা. এসব ক্ষতিকর ও অশ্লীল বিনোদনমুক্ত মুসলমানদের জন্য আলাদা আনন্দ-উৎসবের প্রয়োজন মনে করেন। এ জন্য তিনি মুসলমানদের নির্মল আনন্দ উৎসব করতে মহান আল্লাহর নির্দেশিত বিধানে বছরে দু’টি ঈদ উৎসবের প্রবর্তন করেন। সহিহ হাদিসে এসেছে, “আনাস ইবন মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী সা. মদিনায় আগমন করলেন, তখন তাদের দু’টি দিন ছিল যাতে তারা খেলাধুলা ও আনন্দ-উৎসব করতো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ দু’টি কিসের দিন? তারা বললো, আমরা জাহিলি যুগে এ দু’দিন খেলাধুলা ও অন্যান্য উৎসব পালন করতাম। এ ভাবধারাই চলে আসছে। রাসূলুল্লাহ সা.  বললেন, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য এ দু’দিনের পরিবর্তে এর চেয়েও উত্তম দু’টি দিন দান করেছেন। তা হলো, ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর।” (সুনানু আবি দাউদ-১১৩৬; মুসনাদু আহমাদ-১২০০৬, ১২৮২৭, ১৩৪৭০, ১৩৬২২; সুনানুল বাইহাকি-৫৯১৮; মিশকাতুল মাসাবিহ-১৪৩৯। হাদিসের মান : সহিহ)

ঈদ প্রতিদান প্রদানের দিন

ঈদের দিন মুসলিম উম্মাহর প্রতিদান প্রদানের দিন। হাদিসে এসেছে, “আনাস ইবন মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ঈদুল ফিতরের দিন আল্লাহ তায়ালা ফিরিশতাদের সামনে গর্ব করতে থাকেন, অতঃপর বলেন, হে আমার ফিরিশতাগণ! মজদুরের পুরস্কার কী, যে তার কাজ পুরোপুরি করেছে? তখন ফিরিশতাগণ বলে, হে আমাদের রব! তার পুরস্কার তাকে পুরোপরি এর প্রতিদান দেওয়া। আল্লাহ বলেন, হে আমার ফিরিশতাগণ! আমার বান্দা ও বান্দীরা তাদের উপর চাপানো কর্তব্য পালন করেছে। তারপর তারা উচ্চঃস্বরে তাকবির ধ্বনি দিতে দিতে দোয়ার জন্য ঈদগাহে রওয়ানা হয়েছে। আমার সম্মান ও গাম্ভীর্যের শপথ এবং আমার উদারতা ও উচ্চ মর্যাদার শপথ! আমি তাদের ডাকে অবশ্যই অবশ্যই সাড়া দিবো। অতঃপর তিনি বলেন, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিলাম এবং মন্দগুলোকে ভালো দ্বারা পরিবর্তন করে দিলাম। মহানবী সা. বলেন, ফলে তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে ফিরতে থাকে।” (শুয়াবুল ঈমান লিল বাইহাকি-৩৭১৭; মিশকাতুল মাসাবিহ-২০৯৬। হাদিসের মান: সহিহ)


ঈদে সুস্থ ধারার আনন্দ-উৎসব

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “বল, আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমাতে। সুতরাং এ নিয়েই যেন তারা খুশি হয়। এটি যা তারা জমা করে তা থেকে উত্তম।” (সূরা ইউনূস : ৫৮)। ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা যেখানে সুস্থ বিনোদনের সুযোগ রয়েছে। ঈদের দিনে সুস্থ বিনোদনের প্রসঙ্গে সহিহ হাদিসে এসেছে, “আয়িশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু বকর রা. আমাদের ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন আমার কাছে আনছারী সম্প্রদায়ের দু’জন বালিকা কবিতা আবৃত্তি করছিল, যা আনছারগণ বু’আছ দিবসে (জাহিলি যুগে আওস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে সংঘটিত একটি বিশেষ যুদ্ধের দিন) আবৃত্তি করতো। তিনি বলেন, অথচ তারা দু’জন গায়িকা ছিলো না। আবু বকর রা. বললেন, রাসূলুল্লাহ সা.-এর ঘরে শয়তানের বাঁশি? ঘটনাটি ছিলো ঈদের দিনের। তখন রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, হে আবু বকর! প্রত্যেক জাতির একটা আনন্দের দিন আছে। আর এটা আমাদের আনন্দের দিন।” (বুখারি-৯০৯, ৩৭১৬; মুসলিম-২০৯৮; ইবনে হিব্বান-৫৮৭৭ হাদিসের মান : সহিহ)

আমাদের ঈদের দিন শুধুমাত্র আনন্দ-উৎসব সর্বস্ব নয়। বরং ইবাদত সহ আনন্দ উপভোগ করা। যেমন হাদিসে এসেছে, “আনাস ইবন মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ঈদুল ফিতর হলো, ঈদের সালাত আদায় করা ও সদাকাতুল ফিতর আদায় করা এবং ঈদুল আজহা হলো ঈদের সালাত আদায় করা ও কুরবানী করা।” (কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল-২৪১০৬; শুয়াবুল ঈমান-৩৭১০। হাদিসের মান: হাসান)

মু’মিন ব্যক্তির প্রতিটি কাজই ইবাদত। আল্লাহ তায়ালা সে জন্যই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ বলেন, আমি জিন ও মানুষকে শুধুমাত্র আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। (সূরা যারিয়্যাত, আয়াত : ৫৬)


ঈদের রাতের মর্তবা

ঈদের রাতের মর্তবা প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে, “আব্দুল্লাহ ইবন উমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, পাঁচটি রাত এমন আছে যেগুলোতে দোয়া করলে ফিরে দেওয়া হয় না। অর্থাৎ কবুল করা হয়। ১. জুমার রাত, ২. রজব মাসের প্রথম রাত, ৩. শাবান মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত রাত, ৪. ঈদুল ফিতরের রাত ও ৫. ঈদুল আজহার রাত।” (মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক-৭৯২৭; শুয়াবুল ঈমান-৩৭১১, ৩৭১৩। হাদিসের মান: হাসান)


ঈদের দিনে করণীয় 

ঈদ আমাদের জন্য এক বিরাট নিয়ামত। কিন্তু আমরা এ দিনকে নিয়ামত হিসাবে গ্রহণ করি না। এ দিনে অনেক কাজ আছে যার মাধ্যমে আমরা আল্লাহ তায়ালার নিকটবর্তী হতে পারি এবং ঈদ উদযাপনও একটি ইবাদতে পরিণত হতে পারে। এদিনের করণীয় কাজগুলো হতে পারে;


ফজরের সালাত জামায়াতে আদায় 

দীর্ঘ এক মাসব্যাপী যারা সওমের পাশাপাশি ফরজ সালাত ও তারাবিহ সালাত জামায়াতে আদায় করে, তাদের অনেকেই ঈদের দিনের ফজরের সালাত আদায় করে না। ঈদের জন্য ফজরের সালাত জামায়াতে পড়ার গুরুত্বও দেয় না। অথচ ফজরের সালাতের গুরুত্ব অপরিসীম। উবাই ইবন কা’ব, আবু হুরাইরা ও আয়িশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘যদি তারা ইশা ও ফজর সালাতের মধ্যে কী আছে তা জানতে পারতো তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও এ দু’টি সালাতের জামায়াতে শামিল হতো।’ (বুখারি-৬২৪, ৬২৪; মুসলিম-১০০৯, ১৫১৪; মুসনাদু আহমাদ-৭২২৬, ৭৭৩৮, ৮০২২, ৮৮৭২, ২১২৭২, ২৪৫০৬)


ঈদে তাকবির বলা

ঈদের আগের দিন সূর্যাস্ত থেকে শুরু করে ঈদের সালাত আদায় করা পর্যন্ত তাকবির তথা ‘আল্লাহু আকবার’ বলতে থাকা। এ হচ্ছে বিশ্ববাসীর সামনে মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘‘আর যাতে তোমরা সংখ্যাপূর্ণ কর এবং তিনি যে তোমাদেরকে হিদায়াত দিয়েছেন তার জন্য ‘আল্লাহ মহান’ বলে ঘোষণা দাও এবং যাতে তোমরা শোকর কর।’’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)। ঈদের তাকবিরের শব্দগুলো হল, ‘‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’’ (সুনানু দারি কুতনী-২৯; আল মু’জামুল কবীর-৯৫৩৮; মুসান্নাফ ইবন আবি শায়বা-৫৬৩৩, ৫৬৫০, ৫৬৫১, ৫৬৫৩। হাদিসের মান: হাসান) পুরুষরা মাসজিদে, বাজারে ও ঘরে এ তাকবির ধ্বনি জোরে দিতে থাকবে। আর মহিলারা তাকবির বলবে আস্তে।


ঈদের দিন খাওয়ার দিন

এ ব্যাপারে হাদিসে এসেছে, “নুবাইশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, মনে রেখো, এ দিনগুলো হলো পানাহারের দিন এবং মহামহিম আল্লাহর জিকর করার দিন।” (সুনানু আবি দাউদ-২৮১৫; মুসনাদু আহমাদ-২০৭২৩, ২০৭২৮, ২০৭২৯; সুনানুন নাসাঈ-৪২৩০। হাদিসের মান: সহিহ)


ঈদের দিন ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে খেজুর খাওয়া

মুসলিম উম্মাহ আরব-অনারব নির্বিশেষে ঈদুল ফিতরের দিন সকালে খেজুর সহ খাবার খেয়ে ঈদগাহে যান। সহিহ সনদে হাদিসে এসেছে, ‘‘বুরাইদা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. ঈদুল ফিতরের দিন কিছু না খেয়ে বের হতেন না। আর ঈদুল আজহার দিন সালাত আদায় না করা পর্যন্ত খেতেন না। অন্য বর্ণনায় আনাস ইবন মালিক রা. মহানবী সা. থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেতেন।” (তিরমিজি-৫৪২; ইবনে হিব্বান-২৮১২; ইবনে খুযাইমা-১৪২৬। হাদিসের মান: সহিহ)


ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া

তামাম পৃথিবীর মুসলিম উম্মাহর এক সুন্দর ও সাবলীল আমল হলো ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া। ঈদগাহে যাতায়াতে পায়ে হেঁটে যাওয়া প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে, “আলী ইবন আবি তালিব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, সুন্নাহ হলো ঈদগাহের দিকে হেঁটে যাওয়া এবং ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে কিছু খাওয়া। আব্দুল্লাহ ইবন উমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. ঈদগাহের দিকে হেঁটে যেতেন এবং পায়ে হেঁটে ফিরে আসতেন।” (তিরমিজি-৫৩০; সুনানু ইবন মাজাহ-১২৯৪, ১২৯৫, ১২৯৭, ১৩০০; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক-৫৬৬৭। হাদিসের মান : সহিহ অন্য তাহকিকে হাসান)


ঈদুল ফিতরে তিনটি সুন্নাহ

মুসলিম উম্মাহর এক আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য হলো ঈদুল ফিতরের ৩টি সুন্নাহ। এ ব্যাপারে হাদিসে এসেছে, “সাঈদ ইবন মুসাইয়্যাব (রহ.) হতে বর্ণিত, ঈদুল ফিতরের সুন্নাহ ৩টি। ১) পায়ে হেঁটে ঈদগাহে চলা, ২) ঈদগাহে বের হবার পূর্বে খাওয়া, ৩) এবং গোসল করা।” (ইরওয়াউল গলিল-৬৩৬: হাদিসের মান : সহিহ)


ঈদগাহে যাতায়াতের রাস্তা পরিবর্তন ও বিশেষ পোশাক পরিধান করা

ঈদের সালাত আদায়ে ঈদগাহে যাতায়াতের পথ পরিবর্তন করা প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে, “জাবির রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. ঈদগাহে যাতায়াতে রাস্তা পরিবর্তন করতেন।” (বুখারি-৯৪৩; বুলুগুল মারাম মিন আদিল্লাতিল আহকাম-৪৯৭; মিশকাতুল মাসাবিহ-১৪৩৪। হাদিসের মান : সহিহ)

অন্যত্র এসেছে, “আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রা, হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী সা. ঈদের দিন বিশেষ লাল রঙের চাদর পরিধান করতেন।” (সিলসিলাতুল আহাদিসিসি সহিহা-১২৭৯; আল মু’জামুল আওসাত-৭৬০৯। হাদিসের মান : সনদ সহিহ)


ঈদের সম্ভাষণ

ঈদের দিনের পারস্পরিক সম্ভাষণ বিষয়ে হাদিসে এসেছে, “ওয়াসিলা ইবনুল আসকা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ঈদের দিন রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করে বললাম, “তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম” অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা আমাদের ও আপনার পক্ষ থেকে কবুল করুন”। তিনি বলেন, হ্যাঁ, আল্লাহ তায়ালা আমাদের ও আপনার পক্ষ থেকে কবুল করুন। উবাদা ইবনুস সামিত রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.কে জিজ্ঞেস করলাম, ঈদের দিন মানুষ এ কথা বলে যে, “আল্লাহ তায়ালা আমাদের ও আপনার পক্ষ থেকে কবুল করুন।” তিনি বলেন, এটি আহলে কিতাবদের সম্ভাষণ। উমর ইবন আব্দুল আযীয (রহ.)-এর মুক্ত করা দাস আদহাম (রহ.) বলেন, আমরা উমর ইবন আব্দুল আযীয (রহ.)কে উভয় ঈদে বলতাম, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’ হে আমিরুল মুমিনুন! তিনি আমাদেরকে অনুরূপ বলে জবাব দিতেন এবং আমাদেরকে এরূপ বলায় কোনো প্রকার অস্বীকৃতি জানাতেন না।” (সুনানুল বাইহাকি আল কুবরা-৬০৮৮, ৬০৮৯, ৬০৯০, ৬০৯১; শুয়াবুল ঈমান-৩৭২০; কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফয়াল-২৫৭৩৮। হাদিসের মান : সহিহ অন্য তাহকিকে হাসান)


সাদাকাতুল ফিতর আদায়

রোজাদারের যে ভুল-বিভ্রান্তি ও পাপ হয়েছে তা মোচন করার জন্য এবং মিসকিনদের খাদ্য জোগানের উদ্দেশ্যে জাকাতুল ফিতর দেওয়ার বিধান দেওয়া হয়েছে। সহিহ সনদে এসেছে, “আব্দুল্লাহ ইবন উমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. যাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন এবং মুসলিম স্বাধীন ও গোলাম, পুরুষ ও নারী, ছোট ও বড় সকলের জন্য ফিতরা হিসেবে এক সা খেজুর অথবা যব আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং ঈদের সালাতের পূর্বে তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।” (বুখারি-১৪৩২, ১৪৩৩, ১৪৩৬, ১৪৩৮, ১৪৪০, ১৪৪১; মুসলিম-২৩২৫, ২৩২৬, ২৩২৭, ২৩২৯; মুয়াত্বা ইমাম মালিক-৯৮৯; মুসনাদু আহমাদ-৫১৭৪, ৫৩০৩, ৫৩৩৯, ৫৭৮১, ৬২১৪; তিরমিজি-৬৭৫, ৬৭৬) অন্য সনদে এসেছে, “আব্দুল্লাহ ইবন উমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. স্বাধীন ও দাস, পুরুষ ও নারীর ওপর এক সা খেজুর বা এক সা যব সাদাকাতুল ফিতর আবশ্যক করেছেন। অতঃপর লোকজন অর্ধ সা গমের দিকে ফিরে এসেছে।” (বুখারি-১৪৪০; মুসলিম-২৩২৭; সুনানু আবি দাউদ-১৬১৭) 

উপর্যুক্ত হাদিসদ্বয়ের প্রেক্ষিতে মুহাদ্দিসিনের অভিমত হচ্ছে, সাদাকাতুল ফিতর খেজুর, যব ও কিশমিশের হিসেবে এক সা, আর গমের হিসেবে অর্ধ সা পরিমাণ আদায় করতে হবে। তবে সতর্কতামূলক বেশিটির হিসেব করে আদায় করা উচিত। উল্লেখ যে, অর্ধ সা পরিমাণ ১ কেজি ৬৩৬ অথবা ৬৫০ গ্রাম, আর এক সা ৩ কেজি ২৭১ অথবা ৩০০ গ্রাম।  

জাকাতুল ফিতর ঈদের একদিন বা দুইদিন আগেও দেওয়া যায়। তবে সালাতুল ঈদের পর পর্যন্ত বিলম্ব করা যাবে না, আগেই আদায় করতে হবে। হাদিসে এসেছে, “আব্দুল্লাহ ইবন উমর রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. লোকদের ঈদের সালাতে বের হবার পূর্বে ফিতরা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। আর আব্দুল্লাহ ইবন উমর রা. তা ঈদের একদিন বা দু’দিন পূর্বে আদায় করতেন।” (বুখারি-১৪৪০; সুনানুল বাইহাকি আল কুবরা-৭৫২৭; ইবনে খুযাইমা-২৪২১; ইবনে হিব্বান-৩২৯৯। হাদিসের মান : সহিহ)

অন্য হাদিসে এসেছে, “আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. জাকাতুল ফিতকে রোজাদারের বেহুদা কথা ও কাজ এবং গুনাহ থেকে পবিত্র করা এবং নিঃস্ব-অসহায় মিসকিনদের খাবার উদ্দেশ্যে ফরজ করেছেন। যে ব্যক্তি ঈদের সালাতের পূর্বে তা আদায় করে, সেটি আল্লাহর কাছে কবুল হবে। আর যে ব্যক্তি তা ঈদের সালাতের পরে আদায় করে তা অন্যান্য সাধারণ দান-সদাকার মতো বিবেচিত হবে।” (সুনানু আবি দাউদ-১৬১১; সুনানু ইবনে মাজাহ-১৮২৭; সুনানু দারি কুতনী-১। হাদিসের মান : সহিহ ও হাসান) 


ঈদের সালাত ও খুতবা

সহিহ সুন্নাহ মুতাবিক ঈদের সালাতের পরে খুতবা। সহিহ হাদিসে এসেছে, “জাবির ইবন আব্দুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. আজান ও ইক্বামাত ছাড়াই দুই ঈদের সালাত খুতবার পূর্বেই শুরু করতেন।” (মুসলিম-২০৮৫; মুসনাদু আহমাদ-১৪৩৬৯; তিরমিজি-৫৩২। হাদিসের মান : সনদ সহিহ)

অন্যত্র এসেছে, “আবু সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন ঈদগাহের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যে জিনিস দিয়ে প্রথম কাজ শুরু করতেন, তা হলো সালাত আদায় করা।” (বুখারি-৯১৩; মিশকাতুল মাসাবিহ-১৪২৬। হাদিসের মান : সহিহ)


অপসংস্কৃতি ও জাহেলি কর্মকাণ্ড বর্জন

অধুনা আমাদের সমাজে দৃশ্যমান যে বিষয়টি অত্যন্ত পরিতাপের সেটি হচ্ছে, আমাদের ছেলে-সন্তান, ভাতিজা, নাতি পর্যায়ের যুবসমাজ যারা পুরো মাস সিয়াম সাধনা, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও তারাবিহর সালাত জামায়াতসহ আদায় করে শরয়ি হুকুম আহকাম মানার লাগাতর প্রশিক্ষণের মাঝে ছিলো, এমন যুবসমাজ ঈদের দিন সালাত আদায়ের পরপরই রঙ-তামাশা, মাইক্রো, পিক-আপ, সিএনজি ও ভটভটি সম যানবাহনে মাইক-সাউন্ডবকস ও লাউড কণ্ঠে গান-বাজনা, অশ্লীল অঙ্গিভঙ্গি করে নেচে-গেয়ে রাস্তা-ঘাটে ও বিনোদন পার্কে ঘুরে ফিরে জাহিলি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। আবার পুরো মাস সিয়াম পালন করা মেয়েরাও ঈদের দিন বিকেল-সন্ধ্যায় অশালীন পোশাক পরে শহরের রাস্তায় ও বিনোদন পার্কে ঘুরে বেড়ায় এবং আড্ডা দেয়। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এক্ষেত্রে প্রত্যেকটা সচেতন গার্ডিয়ান ও এলাকাবাসীকে কার্যকর ভূমিকা রাখা সময়ের অনিবার্য দাবি। 


কুরআনের সাথে নিবিড় সম্পর্ক

যে কুরআন নাজিলের কারণে রমাদানের ফজিলত, মর্তবা ও নেক আমলের সাওয়াব। কুরআনের কারণেই রমাদানের মহাসম্মান। তাই রমাদানের মাহাত্ম্য অর্জনে কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। সে জন্য কুরআন চর্চা ও তিলাওয়াতের সাথে এ মাস এবং সারাজীবন গভীর সখ্য ও ভালোবাসার বন্ধন রচনা করা সময়ের অনিবার্য দাবি। তামাম পৃথিবীর সকল আলিম-উলামা, মুফাসসির, মুহাদ্দিসগণের ঐকমত্যে রমাদান মাসের মর্যাদা ও ফজিলতের মূল কারণ এ মাসে আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল করীম নাজিল করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, রমদান মাস, যে মাসে কুরআন নাজিল করা হয়েছে, আর এটি মানবজাতির জন্য হিদায়াত বা পথের দিশা, হিদায়াতের সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসটি পাবে, তার উচিত এ মাসের সিয়াম রাখা। (সূরা বাকারা : ১৮৫) সে কারণে আমরা রমাদান মাসে কুরআনের তাফসীর স্টাডি, তরজমা অধ্যয়ন, তিলাওয়াত, খতমে কুরআন, গুরুত্বপূর্ণ আয়াত ও সূরা মুখস্থ করার চেষ্টা করি। যেহেতু কুরআনুল করীম বান্দার জন্য জান্নাতের সুপারিশ করবে এবং হুজ্জাত বা দলিল হিসেবে আল্লাহর দরবারে উপস্থাপিত হবে। সেহেতু আমাদের নিরন্তর সে প্রচেষ্টা। হাদিসে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবন আমর রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, সিয়াম ও কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। সিয়াম বলবে, আয় রব! আমি তাকে খাদ্য ও যৌন সম্ভোগ হতে বিরত রেখেছি, অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কুরআন বলবে, আয় রব! আমি তাকে রাতের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি (সে আমাকে তিলাওয়াত করেছে)। অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। রাসূল সা. বলেন, অতঃপর তাদের উভয়ের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। (মুসনাদু আহমাদ- ৬৬২৬, শুয়াবুল ঈমান-১৯৯৪, সহিহুত তারগীব ওয়াত তারহীব-৯৮৪, ১৪২৯; মিশকাতুল মাসাবিহ-১৯৬৩)

রমাদানে রাসূলুল্লাহ সা. ও জিবরাঈল (আ) প্রত্যেক রাতে কুরআনের অনুশীলন করতেন। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সা. ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল রমাদানে তিনি আরো অধিক দানশীল হতেন, যখন জিবরিল (আ) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। আর রমযানের প্রতি রাতেই জিবরাঈল (আ) তাঁর সাথে দেখা করতেন এবং তাঁরা একে অপরকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল সা. রহমাতের বায়ু অপেক্ষাও অধিক দানশীল ছিলেন।” (বুখারি-৬, ১৯০২, ৩০৪৮, ৩৩৬১; মুসলিম-৬১৪৯, মুসনাদু আহমাদ-২৬১৬, ৩৪২৫, ৩৫৩৯)

অন্য হাদিসে এসেছে, আবু মালিক আল আশয়ারী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, পবিত্রতা ঈমানে অংশ ----আল কুরআন তোমার পক্ষে দলিল অথবা বিপক্ষে নালিশ করবে। (মুসলিম-৫৫৬; ইবনে হিব্বান-৮৪৪; মুসনাদু আহমাদ-২২৯০৮; তিরমিজি-৩৫১৭) 

যে কুরআন সুপারিশ করে জান্নাতে যাওয়ার সহায়ক হবে, যে কুরআন আমাদের পক্ষে দলিল হিসেবে উপস্থাপিত হবে, সে কুরআনের সাথে আজীবন সম্পর্ক রাখতে হবে। নিয়মিত ও আজীবন কুরআনুল কারীম তিলাওয়াত, অর্থ-মর্ম বুঝে অধ্যয়ন, তাফসির অধ্যয়ন এবং কুরআনের সমাজ কায়েমে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। 


তাকওয়ার জীবন যাপন

রমাদানে সাওমরত অবস্থায় সার্বক্ষণিক আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করা, আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবকিছু দেখছেন, অবগত থাকছেন এ উপলব্ধি আজীবন ধারণ করা হয়। শুধুমাত্র আল্লাহর সার্বক্ষণিক হাজির-নাজির জানাই বান্দা মুত্তাকির গুণে গুণান্বিত হয়ে যাবে। তাকওয়ার কারণে রমাদানে হালাল ও সুস্বাদু খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকি, রমাদানের পারে আজীবন হারাম হতে পরহেজ থাকতে হবে। হাদিসে এসেছে, আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, তাকওয়া এই জায়গা হতে, এরপর তিনি বুকের দিকে ইশারা করেন।” (মুসলিম-৬৭০৬; সহিহুত তারগীব ওয়াত তারহীব-২২৩২, ২৮৮৫, ২৯৫৮; বুলুগুল মারাম মিন আদিল্লাতিল আহকাম-১৪৯৬; তিরমিজি-১৯২৭। হাদিসের মান : সহিহ)

অর্থাৎ বুকের দিকে ইশারা বলতে অন্তর থেকে সার্বক্ষণিক আল্লাহকে ভয় করা, তাঁকে উপস্থিত জানা, তিনি আমার সব কর্মকাণ্ড দেখছেন ও অবগত আছেন, সে জ্ঞান অন্তরে জাগরূক রাখাই তাক্বওয়া। রমাদানের এ অনুশীলন সারা জীবনের জন্য অর্জনীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল।

সিয়ামরত অবস্থায় সারা মাসে আল্লাহ তায়ালাকে বান্দা সার্বক্ষণিক ভয় পায় এবং হাজির নাজির জেনে থাকে। আমাদের ছোট্ট সন্তানরা সিয়াম রেখে বারবার থুতু নিক্ষেপ করে থাকে। তারা গোপনে এক লোকমা খাবার অথবা গোসলে কিংবা অজু করতে গিয়ে একটু পানি গিলে খেতে পারে। তাদের পিতা, মাতা ও খেলার সাথীরা কেউ না দেখলেও তাদের মাঝে এ বুঝ পয়দা হয় যে, আল্লাহ তায়ালা সব দেখছেন। এটিই হলো তাক্বওয়ার পরিচায়ক ও প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তাক্বওয়ার দৃশ্যমান পরাকাষ্ঠা বিষয়ে হাদিসে এসেছে, উমর ইবনুল খাত্তাব রা. হতে বর্ণিত, তিনি উবাই ইবন কা’ব রা. কে তাক্বওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তখন তিনি বলেন, আপনি কী কখনো কাঁটাযুক্ত পথে হেঁটেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি বলেন, তখন তুমি কিভাবে চলাচল করেছেন? তিনি বলেন, জড়সড়ো ও সতর্কতার সাথে নিজের কাপড় গুটিয়ে চলাচল করে থাকি, যেন কাঁটার আঘাতে কাপড় ছিঁড়ে না যায় অথবা শরীরে না বিঁধে। তিনি বলেন, এটাই তাক্বওয়া। (তাফসিরুল কুরআনিল আজীম, ইবন কাছীর, ১ম খণ্ড, পৃ: ১৬৪; তাফসীরুল কুরতুবী, ১ম খণ্ড, পৃ: ১৬১, ২০ খণ্ড, পৃ: ৩২; জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম, ১ম খণ্ড, পৃ: ১৬০)


ইসলামের বিজয় ও মক্কা বিজয় রমাদানে

সালাত ও সাওমসহ ইসলামের মৌলিক ফরজ বিধি-বিধানের পাশাপাশি আল্লাহর জমিনে তাঁরই দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে সক্রিয় ভূমিকা রাখার গুরুত্ব অপরিসীম। মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ সা. রমাদান মাসে সিয়াম ভেঙে ইক্বামাতে দ্বীনের জন্য জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ তথা ইসলামী আন্দোলনের প্রয়োজনে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন। সাহাবায়ি আজমাঈন মহানবী সা.-এর সাথে সওম ভেঙে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সহিহ হাদিসে এসেছে, “উমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল সা.-এর সাথে দুটো সশস্ত্র যুদ্ধে অর্থাৎ বদর ও মক্কা বিজয়ে অংশগ্রহণ করি এবং আমরা উক্ত দুই গাযওয়ায় সওম ভেঙে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।’’ (তিরমিজি-৭১৪, ১৬৮৪, মুসনাদু আহমাদ-১৪০, ১৪২, ১১২৪২, কানযুল উম্মাল-২৪৩৬৮, মুসনাদুল বাযযার-২৯৬। হাদিসের মান : হাসান ও সহিহ)

সহিহ মুসলিমের অন্য রিওয়ায়াতে এসেছে, “আবু সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সা. এর সাথে রমাদানে মক্কা বিজয়ের অভিযানে রওয়ানা হলাম, রাসূল সা. বলেন, নিশ্চয়ই আগামীকাল ভোরবেলায় তোমরা শত্রুর মুখোমুখি হতে যাচ্ছ, সুতরাং সওম ভঙ্গ করাই শ্রেয়। অতএব তোমরা তোমাদের সওম ভেঙে ফেল।” )মুসলিম-২৬৮০, সুনানু আবি দাউদ-২৪০৮, মুসনাদু আহমাদ-১১৩০৭, মুছান্নাফ ইবনে আবি শায়বা-৩২৯২৬। হাদিসের মান : সহিহ)

গাযওয়ায়ে বদর ও ফতহে মাক্কার প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে আল্লাহর জমিনে তাঁরই বিধান কায়েমে শপথ নিতে হবে।

রাত্রি জেগে ক্বিয়ামুল লাইল-সালাত আদায় 

রমাদানে দুটো কিয়ামুল লাইল। একটি তাবারিহ, অন্যটি তাহাজ্জুদ। রমাদান যেহেতু জীবনের মহাসুযোগ। তাই তারাবিহের পাশাপাশি খাঁটি মু’মিনরা তাহাজ্জুদও পড়েন অত্যন্ত যত্নশীলতার সাথে। এ অভ্যাস মু’মিনের পার্থিব জীবনে জান্নাতের পরশ বুলিয়ে দেয়। রচনা করে তার সামনে সাফল্যের এক মহাসড়ক। এ ধারাবাহিকতা সারা বছর শেষ রাতে তাহাজ্জুদ সালাতে অভ্যস্ত হতে শেখায়। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের রব পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে বলেন, কে আছো! আমাকে ডাকো, আমি তার ডাকে সাড়া দিবো। কে আছো! আমার কাছে ফরিয়াদ করো, আমি তার ফরিয়াদ মঞ্জুর করবো। কে আছো! আমার কাছে মাগফিরাত চাও! আমি তাকে মাফ করে দেবো।” (মুসলিম-১৮০৮; সুনানু আবি দাউদ-১৩১৭, ৪৭৩৫; মুসনাদু আহমাদ-৭৫৯২, ৭৬২২, ৭৭৯২, ১০৩০৩; মুয়াত্তা মালিক-৭২৪; তিরমিজি-৩৪৯৮) 

অন্যত্র এসেছে, “বিলাল রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, তোমরা ক্বিয়ামূল লাইল কর। কারণ এটি তোমাদের পূর্ববর্তী পুণ্যবানদের অভ্যাস। আল্লাহর সান্নিধ্য। অপরাধ থেকে নিবৃত্তি। গুনাহের জন্য কাফফারাহ। দেহ থেকে রোগ অপসারণকারী।” (তিরমিজি-৩৫৪৯; আল মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন-১১৫৬; সহিহ ইবনে খুযাইমা-১১৩৫। হাদিসের মান : সহিহ)

আরজুল কুরআন মক্কার মাসজিদুল হারাম ও মদিনার মাসজিদুন নববীতে ইশার সালাতের পরে কুড়ি রাকাআত তারাবিহ এবং রাতের শেষাংশে সাহরির পূর্বে দীর্ঘ ক্বিরাত, দীর্ঘ রুকু ও দীর্ঘ সাজদাসহ তাহাজ্জুদ সালাত জামায়াতে আদায় এক অভূতপূর্ব ঈমানী চেতনা সৃষ্টি করে। 


পরিমাণে কম হলেও নেক আমল অব্যাহত রাখা

রমাদানে টানা এক মাসের প্রশিক্ষণের ও নেক আমলের ধারাবাহিকতা আজীবন অব্যাহত রাখতে সচেষ্ট হতে হবে। সহিহ সনদে এসেছে, “আয়িশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, আল্লাহ তায়ালার নিকট অধিক প্রিয় আমল সেটি যে আমল দীর্ঘায়িত হয়ে অব্যাহত থাকে, তা পরিমাণে কম হলেও।” (বুখারি-৬১০০; মুসলিম-১৮৬৬; মুসনাদু আহমাদ-২৪৩২২, ২৫৩১৭, ২৬৩০৭, ২৬৩৪৩) 


প্রকৃতার্থে মুসলিম উম্মাহর ঈদ

মিশকাত শরিফের তরজমা ও ব্যাখ্যা সম্বলিত ‘মোজাহেরে হক’ গ্রন্থ থেকে একটা আরব কবির কাব্যে সে মহাসত্য প্রতিফলিত-

১. লাইছাল্ ঈদু লিমান লাবিছাল্ জাদিদ ইন্নামাল্ ঈদু লিমান আমিনা মিনাল্ ওয়িদ।

২. লাইছাল্ ঈদু লিমান তাবাখ্খরা বিল্উদ ইন্নামাল্ ঈদু লিত্-তায়িবিল্লাজি লাইয়াউদ।

৩. লাইছাল্ ঈদু লিমান তাজাইয়ানা বিজিনাতিদ্ দুন্ইয়া ইন্নামাল্ ঈদু লিমান তাজাও ওয়াদা বিজাদিত্ তাকওয়া।

৪. লাইছাল্ ঈদু লিমান রাকিবাল মাত্বায়া ইন্নামাল্ ঈদু লিমান তারাক্াল খাত্বায়া।

৫. লাইছাল্ ঈদু লিমান বাছাতাল্ বিছাত্ ইন্নামাল ঈদু লিমান জাওয়াজাস্ সিরাত।

অর্থাৎ

১. ‘‘যে ব্যক্তি নতুন পোশাক পরিধান করেছে তার জন্য ঈদ নয়, ঈদ সে ব্যক্তির জন্য যে আল্লাহর আজাবকে ভয় করে।

২. যে ব্যক্তি ঈদের সাথে সুগন্ধি ব্যবহার করে তার জন্য ঈদ নয়, ঈদ সেই তাওবাকারী ব্যক্তির জন্য, যে পুনরায় পাপাচারে লিপ্ত না হয়।

৩. দুনিয়ার সাজ সজ্জায় যে ব্যক্তি সজ্জিত হয় ঈদ সেই ব্যক্তির জন্য নয়, ঈদ সেই ব্যক্তির জন্য যে, আখিরাতের সম্বল তাক্বওয়া সঞ্চয় করেছে।

৪. ঈদ সেই ব্যক্তির জন্য নয় যে সওয়ারিতে আরোহণ করে, বরং ঈদ সেই ব্যক্তির জন্য যে গুনাহের কাজ ত্যাগ করে।

৫. যার জন্য বিছানা পাতানো হয়েছে, তার জন্য ঈদ নয়, ঈদ সেই ব্যক্তির জন্য যে পুলসিরাত অতিক্রম করেছে।


মুসলিম উম্মাহর প্রশিক্ষণ কোর্স

ঈদ রুচিশীল ও মননশীল সংস্কৃতির অনুপম শিক্ষা দেয়। রমাদান ও ঈদ উৎসব সময়ানুবর্তিতা ও নিয়মানুবর্তিতা শেখায়। চাঁদ দেখে সওম শুরু করা ও শেষ করার মধ্য দিয়ে যেমন সময়ানুবির্ততা শেখায় তেমনি ইফতার, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, তারাবিহ, সাহরি ও ঈদগাহের সালাত আদায়ের মধ্য দিয়েও সময়ানুবর্তিতার শিক্ষা পাওয়া যায়। এভাবে মুসলমানদের জীবনে ঈদ এক উজ্জ্বল ও সুন্দর শৃঙ্খলাবোধের সম্মিলন ঘটায়। মূলত রমাদান এক মাসের একটি প্রশিক্ষণ কোর্স। এ কোর্সের প্রশিক্ষক স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা এবং শিক্ষার্থী হল মুসলিম উম্মাহ। এর সিলেবাস রমাদানের নিয়ম-কানুন ও নম্বরপত্র হচ্ছে তাক্বওয়া অর্জন, আর এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল হচ্ছে বাস্তব জীবনের প্রতিটি ধাপে ধাপে প্রতিটি পদে পদে তাক্বওয়ার বাস্তব শিক্ষা। 


মুসলিম উম্মাহর বহুমুখী আন্তঃরাষ্ট্রীয় ঐক্য

বিশ্ব মুসলিমের ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্য সুসংহত করা আন্তর্জাতিক ঈদ উৎসবের প্রধান দীক্ষা। ভেদাভেদ ভুলে এক মুসলিম অন্য মুসলিমকে বুকে টেনে নেয় আন্তর্জাতিক এ আনন্দের দিনে। পারস্পরিক উপহার-শুভেচ্ছা বিনিময় ঈদ উৎসবকে প্রীতিময় করে তোলে। ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র-সরকার প্রধান, রাজনীতিবিদ, কূটনীতিকদের শুভেচ্ছা বিনিময় আন্তঃরাষ্ট্রীয় যোগাযোগ-সম্পর্ক স্থাপনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এতে বৈশ্বিক শান্তি-সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে ওঠে এবং মুসলিম দেশসমূহের ঐক্য-সংহতি বাড়ে। এছাড়া বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও ঈদ উৎসবের প্রভাব পড়ে। কারণ মুসলিম অধ্যুষিত দেশসমূহে ঈদ উপলক্ষে ক্রয়-বিক্রয় ও লেন-দেন বেশি হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক ঈদ মৌসুমে মুসলিম দেশসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটন-পরিবহন শিল্প চাঙ্গা হয়ে ওঠে। তাছাড়াও ঈদ উৎসবে মুসলিম বিশ্বের শিল্প-সাহিত্য ক্ষেত্রে নতুনমাত্রা যোগ হয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে ঈদ মুসলিম ঐক্য-সংহতির এক বৈশ্বিক উৎসব।


বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর ঐক্য

সারা পৃথিবীতে এক মাস সিয়াম সাধনার পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিবসে ঈদুল ফিতর পালনে আন্তর্জাতিকভাবে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ও ভালোবাসার ঐক্যের চেতনায় একীভূত হয়। ঈদ মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও অভিন্ন ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত করে। এই উৎসবে খুশির বন্যায় ভাসে বিশ্ব মুসলিম। এ যেন এক নতুন পৃথিবী। এ দিনে ধনী-গরিবের মধ্যে থাকে না কোনো ভেদাভেদ। এ দিনটিতে বিশ্বের ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই এক কাতারে দাঁড়ানোর শিক্ষা পায়। এ দিনটি কেবল আনন্দের বার্তাই বয়ে আনে না বরং এর মধ্য দিয়ে প্রসারিত হয় ইসলামে বর্ণিত বিশ্বব্যাপী ঐক্য ও সাম্যের জয়গান। দীর্ঘ এক মাস সংযমী থেকে পরিশুদ্ধ হৃদয়ে কলুষমুক্ত জীবন, পরিবার ও সমাজ গঠনের অঙ্গীকারে সারা বিশ্বের মুসলমানেরা একে অপরের ভাই ভাইয়ে পরিণত হয়। ঈদ শান্তি, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের অনুপম শিক্ষা দেয়। মানুষের আনন্দময় সত্তার জাগরণ ঘটায়। মুসলিম উম্মাহকে সাম্য, মৈত্রী, ঐক্য ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে। ব্যক্তি, সমাজ ও জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে ন্যায় ও ইনসাফের শিক্ষা দেয়।


মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি

ঈদ উৎসব মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ সংস্কৃতি ও সংহতির প্রতীক। মুসলিম উম্মাহর বিশ^জনীন ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, সাম্য, সংহতি, সহমর্মিতার জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ঈদ।  সুস্থ বিনোদন ও আনন্দ উপভোগ ঈদ উৎসবের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। তাই ঈদের উৎসবে আনন্দ-খুশিতে মেতে ওঠে গোটা মুসলিম বিশ্ব। এ উৎসব উদযাপনে নেই কোনো শ্রেণী-বৈষম্য। কৃষক-শ্রমিক, জেলে-তাঁতী, কামার-কুমার, ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা ঈদ উৎসবে অভিন্ন। সৌহার্দ্য-সদ্ভাব এ উৎসবের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। সহমর্মিতা-ভ্রাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় করা ঈদ উৎসবের উদ্দেশ্য। সম্মিলিতভাবে মহান আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ ও তার সন্তুষ্টি অর্জন এ উৎসবের লক্ষ্য। তাই সক্ষম ও বিবেকসম্পন্ন বিশ্বের সকল মুসলিমের এ উৎসবে অংশগ্রহণ অপরিহার্য। 


মুসলিম উম্মাহর সাংস্কৃতিক উৎসব

ঈদ আন্তর্জাতিক উৎসব হলেও এতে স্থানীয় সংস্কৃতির গুরুত্ব আছে। ঈদের মূল চেতনা ও মৌলিক বিধানাবলি অপরিবর্তিত রেখে স্থানীয় সংস্কৃতিতে উৎসব করা হয়। তাই দেখা যায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঈদ উদযাপিত হয় বিভিন্ন সংস্কৃতিতে। বাঙালি মুসলমানরা সকালে সেমাই-পায়েস ও অন্যান্য মিষ্টান্ন জাতীয় খাবার খেয়ে ঈদগাহে যান। আর দুপুরে বা রাতে গোশত-খিচুড়ি, পোলাও-কোরমা ইত্যাদি মুখরোচক খাবার খান। ঈদের দিন সাধারণত বাঙালি পুরুষ ও ছেলেরা পায়জামা-পাঞ্জাবি এবং নারীরা শাড়ি, স্যালোয়ার-কামিস পরেন। অর্থাৎ বাংলাদেশে ঈদ উদযাপিত হয় বাঙালি সংস্কৃতিতে। এমনিভাবে সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ, ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুসলমানরা ঈদ উদযাপন করেন তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও তাহযিব-তমদ্দুনে। 


মুসলিম উম্মাহর ঐক্য সময়ের অনিবার্য দাবি

প্রতিবারের ‘ঈদ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডে মুসলমানদের রক্ত নিয়ে ইসলামী বিরোধী শক্তি হোলি খেলে। ইসলামের আন্তর্জাতিক বৈরী শক্তি চায় ইসলাম ও মুসলিম চেতনা বিশ্বাসকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলতে। ইসলামের দেশী-বিদেশী শত্রুদের হাত থেকে ইসলাম, মুসলমান, ইসলামী মূল্যবোধ ও ইসলামী আন্দোলন এমনকি মুসলমানদের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ আবশ্যক। একমাত্র ইসলামী ঐক্যশক্তি দ্বারাই এটা সম্ভব। তাই এই ঈদ উপলক্ষে গোটা মুসলিম উম্মাহকে ইসলাম ও নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে আল কুরআনের আহ্বানের ভিত্তিতেই সকলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া ও নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করার নিজ নিজ পরিমণ্ডলে সচেষ্ট হওয়া সময়ের প্রধান ও অনিবার্য দাবি।


ঈদের প্রকৃত শিক্ষা হচ্ছে, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল ক্ষেত্রেই ধর্মীয় কৃষ্টি-কালচার থেকে বিচ্যুত না হয়ে আদর্শিক মূল্যবোধের চর্চা, মার্জিত রুচিবোধ ও শালীনতার মাধ্যমে কর্মসম্পাদন করে ইহ-পারলৌকিক সফলতার পথকে উন্মোচন করা। প্রতি বছর দু’টি ঈদের মাধ্যমে মহান আল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ দান করেছেন। আমরা আমাদের সমূহকর্তব্য কাজে তৎপর হতে পারলেই সারা বিশে^র মুসলিম উম্মাহর ঈদুল ফিতরের এ উৎসব-আনন্দ অর্থবহ ও সার্থক হবে। মুসলিম উম্মাহর মাঝে সিসাঢালা প্রাচীরের মতো আন্তর্জাতিক ঐক্য নিশ্চিত হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন। 


লেখক : প্রধান মুহাদ্দিস (সহকারী অধ্যাপক), বিজুল দারুল হুদা কামিল মাদরাসা, বিরামপুর, দিনাজপুর

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির