post

ওর শূন্যতা মাঝে মাঝে বড়ো বেশি কাঁদায়

মাহমুদা দেলোয়ার (মুন্নী)

১৯ অক্টোবর ২০২২

রক্তঝরা ঐতিহাসিক ২৮ অক্টোবরের আওয়ামী সন্ত্রাসের ভয়াবহ নৃশংসতার কথা মনে হলেই সমগ্র বাংলাদেশ ভয়ে বিহ্বল হয়ে যায়। মনুষ্যত্ব, মানবতা ও বিবেক সেই অপশক্তির প্রতি নিক্ষিপ্ত তীব্র ঘৃণা ও লানতের কথা পুনর্ব্যক্ত করে। আওয়ামী সন্ত্রাস ও রক্তপাতের ধারাবাহিকতায় সমগ্র জাতি ও বিশ্বজগৎ জানতে পেরেছে যে, ২০০৭ সালের নির্বাচন বানচালের মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রহীনতা কায়েমের টার্গেটে ২৮ অক্টোবর ঢাকার পল্টনে সংঘটিত নৈরাজ্য, রক্তপাত ও হত্যাযজ্ঞ ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। সেদিন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য ও স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিবিএ অনার্স তৃতীয় বর্ষের মেধাবী ছাত্র শহীদ মুজাহিদুল ইসলাম ভাই শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন। বায়তুল মোকাররমের উত্তর সড়কে ১৪ দলের হামলায় আহত হয়ে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে শহীদ হন তিনি। শহীদের বাড়ি নোয়াখালী জেলার চাটখিল উপজেলায়। শহীদ মুজাহিদুল ইসলাম ভাইয়ের মা ছাত্রসংবাদকে এবার এই সাক্ষাৎকারটি দিয়েছেন। 


ছাত্রসংবাদ : আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ- আপনি কেমন আছেন?

শহীদ মুজাহিদ ভাইয়ের মা : ওয়াআলাইকুম আসসালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ- ভালো আছি আলহামদুলিল্লাহ। 


ছাত্রসংবাদ : প্রিয় সন্তানের শাহাদাতের প্রায় ১৬ বছর অতিবাহিত হলো। সেদিনের ঘটনাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? 

শহীদ মুজাহিদ ভাইয়ের মা : প্রিয় সন্তানের শাহাদাতের ১৬ বছর অতিবাহিত হলো সেদিনের সে ঘটনা কিভাবে ভাষায় ব্যাখ্যা করে বুঝাতে পারবো কি না জানি না। কারণ আমার দিনগুলো এখন প্রায়ই সুস্থতা ও অসুস্থতার মাঝ দিয়ে যায়। তাই সবার কাছে সেদিনের ঘটনা ১৬ বছর পার হলেও মায়ের কাছের মনে হয় মাত্র কদিন আগের ঘটনা। সু-সন্তান হয় বাবা-মা উভয়ের দু’নয়নের মণি। তেমনি আমার মুজাহিদও। পুরো আত্মাজুড়ে আজো তাই অম্লান। মায়ের পক্ষে সন্তানকে ভুলে থাকা সম্ভব নয়। মনে হয় এই তো সেদিন মুজাহিদের জন্ম হলো, দেখতে দেখতে চোখের পলকে কিভাবে বড়ো হয়ে গেলো। আর আল্লাহর হুকুমে আমাদের ফেলে চলে গেল মায়ের কলিজা না ফেরার দেশে। ওর শূন্যতা মাঝে মাঝে বড়ো বেশি কাঁদায়। তারপরও সবর করে আছি আর আল্লাহকে বলি, পরকালে যেন ওর দেখা পাই।

মুজাহিদ যেমন ছিল শান্ত তেমনি ছিল ন¤্র স্বভাবের। কাউকে তো দূরে থাক, নিজের ছোট ভাই-বোনকে চড়ও মারেনি কখনো। এমনি ভালো নিরপরাধ ছেলেকে কত দুঃসহ নির্মম আঘাতে আঘাতে শেষ বিদায় নিতে হয়েছে দুনিয়া থেকে। মা হিসেবে এই প্রার্থনা করি- সেদিন মুজাহিদের সাথে আরো যারা চলে গেছে না ফেরার দেশে মহান আল্লাহ তাদের প্রত্যেককে শহীদ হিসাবে কবুল করেন ও শহীদি মর্যাদা দান করেন। 

ছাত্রসংবাদ : জনসভায় যাওয়ার জন্য সেদিন আপনার সন্তানের প্রস্তুতি কেমন ছিল?

শহীদ মুজাহিদ ভাইয়ের মা : সেদিন জনসভায় ওর যাওয়ার কথা ছিল না। ওর পঞ্চম না ষষ্ঠ সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল। জনসভার পরের দিন ওর পরীক্ষা ছিল। তাই ও ছুটিতে ছিল। কিন্তু জনসভায় যারা যাবে তাদের তাগিদ দেওয়ার কাজ করছিল ও। সেদিন ফজর নামাজ পড়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাইদের সাথে কথা বলছিল। পরে এসে বাসায় ভাত খেতে চায় ডিম ভাজি দিয়ে অর্ধেক ভাত খেয়ে অর্ধেক খাবার রেখে ভাইদের বাসে তুলে দিয়ে আসবে বলে চলে যায়। কিন্তু বাসে তুলে দেওয়ার সময় ওর মোবাইলে ফোন আসে দায়িত্বশীলের, বলে নাকি মুজাহিদ তুমিও চলে আস তোমার ভাইদের সাথে। তাই মুজাহিদ আর ঘুরে না এসে মাকে না বলে চলে গেলো জনসভার ডাকে। 


ছাত্রসংবাদ : শাহাদাতের সংবাদ কিভাবে জানতে পেরেছিলেন? 

শহীদ মুজাহিদ ভাইয়ের মা : ওর শাহাদাতের সময় তখন আমি বাসায় ছিলাম না, ছিলাম হাসপাতালে। আমার দেবরের স্ত্রী (আমার জায়ের) প্রসব বেদনা শুরু হলে তাকে নিয়ে হাসপাতালে সকাল ৮টার দিকে যাই। ওইদিন আমার দেবর একটি কন্যাসন্তানের পিতা হয় আর আমি হই সন্তানহারা মা। মুজাহিদ শহীদ হওয়ার খবর জেনে বাসার লোকজন আমাকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে আসে। বাসায় এসে শহীদ হওয়ার খবর জানতে পারি আমি দুঃখিনী মা। 


ছাত্রসংবাদ : এতদিনেও বিচার হয়নি, মামলাও বাতিল করেছে খুনিদের বিচার হবে বলে মনে করেন কি? 

শহীদ মুজাহিদ ভাইয়ের মা : এতে মনে করার কী আছে বিচারের মালিক হলেন মহান আল্লাহ। আমরা তার আদালতে বিচার চেয়েছি। ইনশাআল্লাহ তিনি নিরাশ করবেন না। আমি কখনো সেসব খুনিদের জন্য বদদোয়া করিনি বরং দোয়া করেছি তাদের কল্যাণে অনেক। কারণ তারা সকলে ছিল হেদায়েতের আলোবিহীন। তাই তাদের হেদায়েত কামনা করতাম ও তারা যেন তাদের মায়েদের জীবন আলোকিত করে থাকে। তাদের মায়েদের যেন সন্তান হারা হতে না হয়। 


ছাত্রসংবাদ : শহীদ মুজাহিদ ভাইয়ের বিশেষ কোন স্মৃতি বেশি মনে পড়ে?

শহীদ মুজাহিদ ভাইয়ের মা : শহীদ মুজাহিদ আগাগোড়া পুরোটাই তো মায়ের জন্য স্মৃতিময়। তাই কোনটা স্পেসিফিক বলবো বুঝতে পারছি না, তবে বেশি মনে পড়ে সংসার জীবনে যখন আমি মা দুঃখ কষ্ট ফিল করতাম তখন সে সন্তান হয়েও আমার বাবার মতো মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত¡না দিত; দিত সবরের উপদেশ। যার অভাব বোধ করি এখন ভীষণভাবে। আর ছোট ছোট ভাইবোনদের দিত কেবল নামাজের তাগিদ, যা আজো নাড়া দিয়ে যায় মায়ের হৃদয়কে। 


ছাত্রসংবাদ : শহীদ মুজাহিদ ভাইয়ের কোন গুণটি ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য অনুসরণীয় মনে করেন? 

শহীদ মুজাহিদ ভাইয়ের মা : মুজাহিদের ছিল সংগঠনের প্রতি একনিষ্ঠতা ও একাগ্রতা। সেই সাথে আরো ছিল মনের উদারতা। অন্যের দোষকে বড়ো করে না দেখা। নিজেই নিজের সমালোচনা করা। কেউ ভুল করলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার মানসিকতা কাজ করত ওর মাঝে। এবং ক্ষমাও করে বিলম্ব না করে। 


ছাত্রসংবাদ : ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য শহীদের গর্বিত মাতা হিসেবে আপনার উপদেশ কী?

শহীদ মুজাহিদ ভাইয়ের মা : আল্লাহর বান্দা হিসেবে সকলের উচিত জীবনের শেষ নিঃশ্বাস অবধি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। রাসূলের উম্মত হিসেবে তার দেখানো পথের অনুসরণ করার জন্য যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করা। আর বাবা-মায়ের সন্তান হিসেবে প্রত্যেক সন্তানের উচিত তাদের বাবা ও মা জীবিত থাকলে তাদের যথাসাধ্য পরিমাণ যত্ন নেওয়া।

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির