post

পিতা, নেতা ও দা’ঈ ইলাল্লাহ হিসেবে আল্লামা সাঈদী রাহিমাহুল্লাহ যেমন ছিলেন

মাসুদ সাঈদী

২০ আগস্ট ২০২৩

(গত সংখ্যার পর)

নেতা এবং দা’ঈ ইলাল্লাহ হিসেবে আল্লামা সাঈদী

নেতা এবং দা’ঈ ইলাল্লাহ; এই দু’টি শব্দের ওজন এবং ব্যাপকতা এতটাই বেশি যে, একজন ব্যক্তির পক্ষে এ দু’টি শব্দের ওজন একসাথে বহন করা এবং হক্ব আদায় করা খুব কঠিন ব্যাপার। কিন্তু আল্লাহর বিশেষ দয়া ছিল হয়তো আব্বার প্রতি। তিনি একাধারে যেমন একজন যোগ্য নেতা হয়ে উঠেছিলেন, তেমনি একজন প্রাজ্ঞ দা’ঈ ইলাল্লাহ হিসেবেও আল্লাহ তাঁকে কবুল করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে একটা বিশেষ বিষয় আমরা লক্ষ্য করেছি। বায়েজিদ বোস্তামি রাহিমাহুল্লাহ ‘বায়েজিদ বোস্তামি’ হয়ে ওঠার পেছনে যেমন তাঁর মায়ের হৃদয়ভরা দোয়া ছিল, আব্বার এত সম্মানিত হবার পেছনেও এক বিশাল নিয়ামক শক্তি ছিল আমার দাদা-দাদির দোয়া। তিনি নিজের আমল, ইখলাস ও বিনয়ের পাশাপাশি প্রাণভরে বাবা-মায়ের দোয়া কামিয়েছেন।

আমরা আব্বাকে দাদির প্রতি এতটাই যত্নবান দেখেছি যে, দাদি প্রতি মুনাজাতে তাঁর সন্তান ‘সাঈদীর’ জন্য আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে দোয়া করতেন। আব্বা ‘আল্লামা’ হয়ে ওঠার পেছনে আমার দাদির চোখ ভেজানো দোয়াই যে এক বিশাল নিয়ামক ছিল, সেই গল্প হয়তো অনেকেরই অজানা। আব্বা বাইরে থেকে ফিরেই প্রথমে দাদির রুমে ঢুকতেন। তাঁকে কখনো দাদির মাথার কাছে বসতে দেখিনি। সবসময় পায়ের কাছে বসতেন তিনি। বসেই পা দুটোকে জাড়িয়ে ধরে কোলে নিয়ে চুমু খেতেন। বিনয়ের সাথে খোঁজ-খবর নিতেন দাদির। তাঁর প্রয়োজন পূরণ ছিল আব্বার কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে।

কোনো সমস্যা কিংবা বিপদের মুখোমুখি হলেই আব্বা দাদিকে ফোন করে বলতেন, ‘মা! আমার যে আপনার দোয়া লাগবে।’ ওই অবস্থায় দাদি অজু করে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। আল্লাহর কাছে তাঁর কলিজার টুকরো ছেলে ‘সাঈদীর’ জন্য কেঁদে কেঁদে দোয়া শুরু করে দিতেন আর বলতেন, ‘ইনশাআল্লাহ আমার সাঈদীর কিছুই হবে না।’ আল্লাহ দাদির দোয়া এত দ্রুত কবুল করতেন যে, আব্বা নিজেই অবাক হয়ে যেতেন। বিরোধীদের বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, ফাঁদ থেকে আব্বাকে মহান আল্লাহ এভাবেই উদ্ধার করেছেন। 

দাদা বেঁচে থাকাকালীন আব্বা ছিলেন তাঁর চোখের মণি। ছেলের জন্য দাদাকে আমরা যতটা পেরেশান দেখেছি, তা ছিল এক বিরল দৃশ্য। আব্বাকেও তাঁর পিতা-মাতার প্রতি যেভাবে যত্নবান এবং সতর্ক দেখেছি, তা দেখে আমাদের মনে হতো- কুরআনে পিতা-মাতার হক্বের ব্যাপারে সূরা বনি ইসরাইলের ২২ এবং ২৩ নাম্বার আয়াত যেন মাত্রই নাযিল হলো! আব্বা যেন সেগুলো দেখে দেখে সেই নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁর বাবা-মায়ের সাথে আচরণ করছেন। আয়াতে বর্ণিত বাবা-মায়ের হক্বের ব্যাপারে নির্দেশনাগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নে আব্বা এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ ছিলেন। তাঁর একাধারে এত বিভাগে সফলভাবে পদচারণার মূলে যে আমার দাদা-দাদির দোয়াটাই নিয়ামক শক্তি ছিল। আল্লাহ এই দোয়ার বরকতেই তাঁকে একজন গ্রহণযোগ্য নেতা ও দা’ঈ ইলাল্লাহ হিসেবে কবুল করেছিলেন।

একজন দা’ঈ ইলাল্লাহ হলেন আল্লাহর পথের একজন আহ্বানকারী। আল্লাহর পথে আহ্বানকারীদের বিশেষ কিছু গুণ থাকে। এই ময়দানে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি প্রয়োজন হয়, সেটি হলো ব্যক্তির কথা এবং আহ্বানের সাথে তার নিজের জীবনের সামঞ্জস্যতা। অর্থাৎ যিনি আল্লাহর পথে আহ্বান করছেন, দ্বীনের দাওয়াত দিচ্ছেন, দা’ঈ ইলাল্লাহর ভূমিকা পালন করছেন, সেই দাওয়াত তার নিজের ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক জীবনে কতটুকু প্রতিফলিত হচ্ছে; সেটি একটি ভাইটাল পয়েন্ট। যারা আল্লাহ পথের দা’ঈ হন, তাদের ব্যাপারে কুরআন-হাদিসে বারবার সতর্কবাণী এসেছে। যে বিষয় নিয়ে তারা দাওয়াতের ময়দানে জনসাধারণের উদ্দেশ্যে কথা বলেন, তার কতটুকু প্রতিফলন নিজের জীবন এবং পারিবারিক জীবনে ঘটাতে পেরেছেন; সেটি একটি মৌলিক প্রশ্ন।

যারা ময়দানে মানুষের উদ্দেশ্যে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত প্রদান করে থাকেন, সর্বপ্রথম তাদেরকে সেই দাওয়াতের বাস্তব উদাহরণ হতে হয়। এটাকে বাস্তব সাক্ষ্যও বলা হয়। কেউ যদি দাওয়াতকৃত বিষয়ের ওপর বাস্তব সাক্ষ্য না হতে পারেন, তাকে মূলত দা’ঈ ইলাল্লাহ বলারও সুযোগ নেই। একজন দা’ঈ ইলাল্লাহ হিসেবে আব্বার সবচেয়ে বড়ো যে গুণটি আমরা লক্ষ করেছি, সেটি হলো- তিনি দাওয়াতের ময়দানে যা পেশ করতেন, তাঁর নিজের জীবনে তা অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হতো। তিনি মাহফিলের মঞ্চে বসে এক কানাকড়িও বেশি বলতেন না, যা তিনি নিজে করতে পারতেন না।

যখন আব্বার মাহফিল থাকত, তার অনেক আগে থেকেই তিনি আলোচনার বিষয়বস্তুর ওপর বিশদ প্রস্তুতি নিতেন। তিনি সবসময় ভয়ে থাকতেন এ কারণে যে- লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে আল্লাহর দ্বীনকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন কিনা, কথার মধ্যে কোনো ভুল হয়ে যায় কিনা, মুখ দিয়ে কুরআন-হাদিসের বিপরীত কোনো শব্দ বের হয়ে যায় কিনা! মাহফিলে যাওয়ার আগে দীর্ঘ সময় ধরে আল্লাহর কাছে মুনাজাত করে এ সকল বিষয়ে সাহায্য চাইতেন।

ব্যাপক অধ্যয়ন করতেন তিনি। মাহফিলে আলোচনার জন্য যেভাবে প্রস্তুতি নিতেন, মনে হতো তাঁর খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো পরীক্ষা আছে। বহু মাহফিলে আব্বার সাথে সফরসঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। তাঁর জন্য মাহফিল কর্তৃপক্ষ উত্তম মেহমানদারির ব্যবস্থা রাখতেন। যত লোকই আব্বার সাথে সাক্ষাতে আসতো, তিনি দাঁড়িয়ে সবার সাথে মুসাফাহা মুয়ানাকা করতেন। কোনো বিরক্তি কিংবা ক্লান্তিভাব দেখতাম না। শুরু থেকে শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত আব্বার মুখে একই ধরনের হাসি ফুটে থাকত। স্টেজে ওঠার আগে তিনি আবারও দুই রাকাত নামাজ আদায় করে আল্লাহর দরবারে সাহায্য চাইতেন।

আব্বার বয়ানের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল- তিনি কখনো রাষ্ট্রশক্তিকে ভয় করে কথা বলতেন না। এ ব্যাপারে তিনি এতটাই কঠোর ছিলেন যে, ঠিক কুরআনুল কারিমের সূরা ফাতহ-এর ২৯ নাম্বার আয়াত ‘মুহাম্মদ এবং তাঁর সাথিরা কাফিরদের ব্যাপারে ছিলেন অত্যাধিক কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে ছিলেন একেবারেই রহমদিল।’-এর প্রতিচ্ছবিই মনে হতো! আব্বা নিজের পরিবেশে এতটাই নমনীয় থাকতেন যে, বোঝাই যেত না- ইসলাম বিদ্বেষীদের ব্যাপারে এই কণ্ঠই একটু পরে বজ্রকণ্ঠ হয়ে প্রতিধ্বনিত হবে। তাঁর মাহফিলের ব্যাঘ্রকণ্ঠ আর স্বাভাবিক অবস্থার নমনীয় কণ্ঠ মেলানো কঠিন হতো। তাঁর স্বাভাবিক নমনীয় কণ্ঠ শুনে বোঝাই যেতনা- এই কণ্ঠ থেকেই ইসলাম বিদ্বেষীদের বিরুদ্ধে আগুন ঝরে।

যে সকল আলিম আব্বার মাহফিলে বক্তা হিসেবে আসতেন, তিনি তাঁদের প্রতি এতটাই সম্মান দেখাতেন যে, আমরা মুগ্ধ হয়ে শুধু তা দেখতাম। আব্বাকে আমি মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতাম, ‘আব্বা! আপনার জন্য মানুষ এত পেরেশান, আপনাকে একনজর দেখার জন্য মানুষ এতটা ব্যাকুল থাকে, আপনি এত জনপ্রিয়; এ বিষয়গুলো নিয়ে আপনার অনুভূতি কেমন?’ আব্বা চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলতেন, ‘আমি ভয় করি কেয়ামতের দিন আল্লাহ যদি আমাকে ডেকে বলেন, “হে সাঈদী! আমি যা দেওয়ার, তা তোমাকে দুনিয়াতেই দিয়ে দিয়েছি। ইজ্জত-সম্মান সবইতো তোমাকে দুনিয়াতে দিয়ে দিয়েছি। আখেরাতে আর কী চাও তুমি আমার কাছে!”

এ কথা বলেই তিনি অঝোর ধারায় কাঁদতেন আর বলতেন, ‘তোমরা আমার যে খ্যাতি, ইজ্জত-সম্মান আর জনপ্রিয়তা দেখ, আমি তার উলটো দিকে রবের জবাবদিহিতা আর জিজ্ঞাসার ভয়ে তটস্থ থাকি।’ আল্লাহু আকবার! এত যশ-খ্যাতিসম্মান কোনো কিছুই আব্বাকে মোহিত করতো না। এসব কিছুই অহংকারী করতো না তাঁকে। আব্বা লক্ষ লক্ষ মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে নিজ গৃহে ঢুকে সেজদায় পড়ে যেতেন। এত যশ-খ্যাতি তাঁর ভেতরে কখনো বিন্দুবিসর্গ পরিমাণ অহংকার ঢোকাতে পারেনি।

আব্বার জীবনধারণের মান ছিল একেবারেই সাধারণ। তিনি দুনিয়ার এই সময়গুলোকে একজন মুসাফিরের সফরকালীন সময়ের সাথে তুলনা করেই জীবনধারণ করতেন। সুযোগ পেলেই আলিমদের সেবা করতেন তিনি। আলিমদের দোয়া নেওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় থাকতেন। মাহফিলকে পরিপূর্ণ ইখলাসের সাথে দাওয়াতের মিশন হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন তিনি। নিজেকে একজন পরিপূর্ণ দা’ঈ ইলাল্লাহ হিসেবে পেশ করতে চেয়েছিলেন আল্লাহর দরবারে। মাহফিলের জনসমুদ্রকে তিনি আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। 

দা’ঈ ইলাল্লাহ যারা হন, তাদের বিনিময় বা পুরস্কার তো একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই দিয়ে থাকেন। আব্বাকে মাহফিল কর্তৃপক্ষ সামান্য কিছু হাদিয়া দিত। এমন অসংখ্য মাহফিলের হাদিয়া তিনি ওই এলাকার বঞ্চিত মানুষের কল্যাণে দান করে এসেছেন। আব্বাকে কখনো মাহফিলের হাদিয়া নিয়ে কিঞ্চিৎ পরিমাণ উৎসাহিত হতে দেখিনি। মনে হতো যেন হাদিয়া মাহফিলের সাথে সম্পর্কিত কোনো বিষয়ই নয়! আব্বা হাদিয়া গ্রহণ করতেন এবং হাদিয়ার সেই অর্থ আবার দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণে ব্যয় করতেন। তাফসির মাহফিল করা তাঁর পেশা ছিল না, বরং এটাকে তিনি মহান রবের পক্ষ থেকে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব মনে করতেন। 

পরকালে আল্লাহর দেওয়া পুরস্কারের আশায় তৃষ্ণার্ত থাকতেন তিনি, আর নবী-রাসূলগণের দাওয়াত দেওয়ার সময়কালীন দুর্দশা ও দারিদ্রগ্রস্ত অবস্থার কথা স্মরণ করতেন। নবীজি সারাদিন দাওয়াত দিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘরে এসে ক্ষুধার্ত অবস্থায় আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে কিছু খাবার চেয়েছিলেন। জবাবে উম্মুল মু’মিনীন বলেছেন, ‘আমার ঘরে মশকের তলায় এক মগ পানি ছাড়া যে আর কিছু নেই!’ নবীজি এই দাওয়াতের ময়দানে কাজ করতে গিয়ে ক্ষুধার যন্ত্রণায় পেটে পাথর পর্যন্ত বেঁধেছিলেন। 

একদিন নবীজি সাহাবি ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুসহ হাঁটছিলেন। পথিমধ্যে একটি খেজুর বাগান পড়ল। বাগানের নিচে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল কিছু খেজুর। খেজুরগুলো এমনভাবে ধুলোয় আচ্ছাদিত অবস্থায় ছিল যে, খেজুর বাগানের মালিক সেই খেজুরগুলো গ্রহণ করেননি। নবীজি সেখান থেকে কিছু পচা খেজুর উঠিয়ে হাতের তালুতে রেখে ধুলো পরিষ্কার করলেন এবং একটি খেজুর মুখে দিলেন। তারপর ইবনে মাসউদকে বললেন, ‘মাসউদ! তুমিও খেজুর নাও।’ ইবনে মাসউদ জবাবে বললেন, ‘আমার চাহিদা নেই ইয়া রাসূলাল্লাহ।’ প্রতি-উত্তরে নবীজি বললেন, ‘আমার চাহিদা আছে মাসউদ। তুমি জানো না- গত চারদিন ধরে আমার পেটে কোনো দানাপানি পড়েনি।’

আব্বা এই ইতিহাসগুলো স্মরণ করতেন আর কেঁদে কেঁদে বলতেন, ‘আমার নবীজি দাওয়াতের এই উত্তপ্ত ময়দানে এত কষ্ট করেছিলেন। আমরা সেই ময়দানে কী ভূমিকা রাখছি? নবীজির রেখে যাওয়া দাওয়াতের এই মিশন মানে তো শুধু উষ্ণ আতিথেয়তা আর হাদিয়া নয়; দুঃখ, কষ্ট, নির্যাতন ছাড়া এই দাওয়াতের হক আদায় করা কীভাবে সম্ভব?’ আলহামদুলিল্লাহ, এই ময়দানে হাদিয়া আব্বার কাছে একটা নগণ্য ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

তিনি ইসলামী সমাজকল্যাণ পরিষদ, চট্টগ্রাম কর্তৃক আয়োজিত মাহফিলে তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘যারা ইসলামী শাসন চান, দ্বীনের বিজয় চান, তাদের অসংখ্য মানুষকে পোড়া ইটের মতো জেলখানায় পুড়ে পুড়ে মরতে হবে। ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হবে। গায়ের রক্ত দিতে হবে। শহীদ হতে হবে। তারপরই ইসলামের ইমারতটা কায়েম হয়ে যাবে।’ আব্বা মনের গভীর থেকে দ্বীনের বিজয় আর ইসলামী শাসন চেয়েছিলেন বলেই আজ তিনি নিজেই নিজের বক্তব্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণে পরিণত হয়ে গেছেন।

ইসলামী সমাজকল্যাণ পরিষদ আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সংবর্ধিত অতিথি হিসেবে তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘আমি যে পথে এসেছি, সে পথ তো সংবর্ধনা পাওয়ার পথ নয়! এ পথ তো ফুল বিছানো নয়! এ পথ আরাম আয়েশের পথ নয়!’ সেদিন এ পথের যে ধরন এবং প্রকৃতি আব্বা তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেছিলেন, আজ তিনি নিজেই সে পথের পথিকদের জন্য এক বাস্তব উদাহরণে পরিণত হয়েছেন, এঁকে দিয়ে গেছেন এক অনন্য নজির। একজন প্রকৃত দা’ঈ ইলাল্লাহ যে কথা মানুষকে শোনান, সে কথার প্রতিফলন নিজের জীবনে ঘটাতে পারাই তো সার্থকতা! আল্লাহ তাআলা আব্বাকে হয়তোবা তাঁর কথা অনুযায়ী কবুল করেও নিয়েছেন।

একজন দা’ঈ ইলাল্লাহর পাশাপাশি আব্বা একাধারে সংসদীয় আসন, সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ জিম্মাদারি পালন করেছেন। তাঁর নেতৃত্ব দেওয়ার ধরন আমাদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এক বর্ণনায় বলেন, ‘আমি দশ বছর নবীজির খেদমত করার সুযোগ পেয়েছি। এই দশ বছরে নবীজি আমার সাথে কখনো মন খারাপ করে কথা বলেননি।’ (সহিহ বুখারি : ৬০৩৮) অর্থাৎ নবীজির খাদেম হিসেবে তাঁর খেদমতকালীন সময়ে নবীজি তাঁর সাথে কখনো ধমক দিয়ে কথা বলাতো দূরের কথা, মুখ অন্ধকার করে পর্যন্ত কথা বলেননি। আল্লাহর রাসূলের নেতৃত্বে অধীনস্থদের প্রতি কোমলতার যে নীতি ছিল, আব্বা তাঁর অধস্তনদের প্রতি একই নীতি অবলম্বন করার চেষ্টা করতেন। 

তাঁর গাড়ির ড্রাইভার যে হতো, নিতান্তই বাধ্য না হলে তথা তাঁর পারিবারিক বা অন্য কোনো সমস্যা না হলে সে আর চাকরি ছাড়তো না। ১৯৮৩ সালে আব্বা প্রথম গাড়ি কিনেছিলেন। সেই থেকে গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত এই দীর্ঘ ২৭ বছরে সব মিলিয়ে তাঁর গাড়ির ড্রাইভার হিসেবে কাজ করেছেন হয়তো ৪ বা ৫ জন; যারা তাদের একান্ত ব্যক্তিগত প্রয়োজনে চাকরি ছেড়ে গেছেন। তাঁরা যাবার সময় চোখের পানি ফেলে হাহাকার করতে করতে গেছেন। কোনো উত্তম নেতৃত্বের মূল খুঁটিই হলো অধীনস্থদের সাথে নেতার উত্তম ব্যবহার, কোমল আচরণ।

যিনি নেতা হন, কর্মীরা তার আনুগত্য করবে এটাই নীতি। কিন্তু নেতার ধরন ভেদে আনুগত্যের ধরনেরও ভিন্নতা থাকে। অন্তর থেকে ভালোবেসে আনুগত্য আর বাধ্য হয়ে গতানুগতিক আনুগত্য; নেতাভেদে এই দুই ধরনের আনুগত্য করে থাকে অধীনস্থরা। নবীজি অধীনস্থদের সাথে ব্যবহারে কোমল না হলে পরিণতি কি হতো, সে ব্যাপারে মহান রাব্বুল আলামিন সূরা আলে-ইমরানের ১৫৯ নাম্বার আয়াতে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, ‘হে নবী! আপনি অধীনস্থদের প্রতি বড়োই কোমল। যদি অধস্তনদের প্রতি আপনি কোমল না হয়ে কঠোর হতেন, তাহলে দেখতেন- আপনার চারপাশ থেকে সবাই সরে যেত।’ প্রকৃত নেতা বা দায়িত্বশীলের ধরন এবং আচরণ কেমন হওয়া দরকার, সে ব্যাপারে কুরআন ও হাদিসের বহু জায়গায় নির্দেশনা এসেছে। একজন নেতা হিসেবে আব্বার নেতৃত্বে কুরআন-হাদিসের সেই নির্দেশনার যথাযথ প্রতিফলনটাই আমরা লক্ষ্য করেছি।

তাঁর যেমন অধস্তন আনুগত্যকারী ছিল, তেমনি ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীল এবং কর্তৃপক্ষও ছিল। দ্বীনি আন্দোলনে এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠনে অধস্তনদের ব্যাপারে আব্বা যতটা কোমল ছিলেন, ঊর্ধ্বতনদের ব্যাপারে ততটাই আনুগত্যশীল ছিলেন। দ্বীনি আন্দোলনে তিনি এমন কতিপয় জিন্দাদিল মুজাহিদের অধস্তন এবং সহকর্মী ছিলেন, যাঁরা দ্বীনের ঝাণ্ডা আঁকড়ে ধরে শহীদ হিসেবে মহান আল্লাহর দরবারে হাজির হয়ে গেছেন। আব্বা এমন কতিপয় সোনার মানুষের অধীনস্থ এবং সহকর্মী ছিলেন বলে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতেন। তাঁর প্রতি যেমন লক্ষ-কোটি মানুষের নিখাদ ভালোবাসা আর শর্তহীন আনুগত্য ছিল, তেমনিভাবে তিনি তাঁর দায়িত্বশীলদের প্রতিও এতটা শ্রদ্ধাশীল আর আনুগত্যশীল ছিলেন যে, সেই চিত্র বর্ণনা করার উপযুক্ত ভাষা আমার জানা নেই।

সংগঠনের দায়িত্বশীলদের প্রতি আনুগত্য, শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা আব্বার মধ্যে এত গভীর ছিল,  যেমন ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং আনুগত্য ছিল প্রিয় নবীজি এবং সাহাবিদের মধ্যে। মাঝে মাঝে মনে হতো- মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে বর্ণিত ‘বুনয়ানুম মারসুস’-এর উপযুক্ত উদাহরণ আব্বা এবং তাঁর দায়িত্বশীলদের মধ্যে প্রতিফলন ঘটেছে যেন! নবীজি হাদিসে বলেছেন, ‘কেয়ামতের দ্বীন এমন এক শ্রেণির মানুষের মর্যাদা দেখে স্বয়ং নবীরা পর্যন্ত ঈর্ষা করবে; অথচ তারা নবীও নন, শহীদও নন। তারা এমন একদল মানুষ, যারা শুধু দ্বীনের খাতিরে একে অপরকে নিখাদ ভালোবাসায় আবদ্ধ করেছিল। অথচ তারা মায়ের পেটের ভাইও নয়, পরস্পর কোনো আত্মীয়-স্বজনও নয়। তাদের ভালোবাসা এবং বন্ধনের মূলে ছিল শুধু আল্লাহর দ্বীন।’ (আবু দাউদ : ৩৫২৯)

আল্লাহর এই দ্বীনের খাতিরে আব্বা এবং তাঁর শহীদ দায়িত্বশীলরা এমন এক অনন্য বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন, যার নজির আমাদের সামনে আর আসবে কিনা আমরা জানি না। আব্বাসহ আমাদের সকল শহীদ নেতৃবৃন্দের এক মোহনীয় হৃদয়কাড়া বন্ধন আজও চোখের কোণে পানি এনে দেয়। নীরবে নিভৃতে সেই স্মৃতিগুলো এখনো কাঁদিয়ে যায়। আমীরে জামায়াত, সেক্রেটারি জেনারেলসহ দায়িত্বশীল সহকর্মীবৃন্দের প্রতি আব্বা খুব উঁচুমানের আনুগত্যের মানসিকতা পোষণ করতেন। আল্লাহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরে উলিল আমর হিসেবে সংগঠন এবং দায়িত্বশীলদের প্রতি তিনি নিজেকে পরিপূর্ণভাবে সঁপে দিয়েছিলেন।

তাঁর মাহফিলের ময়দান এবং জনপ্রিয়তার আলাদা বিশ্বজোড়া এক বিশাল জগৎ থাকলেও কখনো এ অর্জনকে নিজের ভাবতেন না তিনি। কিংবা এত বিশাল জগৎজোড়া খ্যাতির অধিকারী হয়েও নিজেকে কখনো আলাদা মনে করতেন না। তিনি সবসময় বলতেন, ‘সংগঠন বাদ দিলে আমার তো আর কিছুই থাকে না!’ এত উঁচুমাপের একজন বিশ্বনন্দিত ব্যক্তি হয়েও তিনি সর্বাবস্থায় নিজেকে দ্বীনি আন্দোলনের একজন ক্ষুদ্র কর্মীই ভাবতেন। আব্বা সংগঠনের আনুগত্যের বাইরে নিজের সিদ্ধান্তে বিন্দুবিসর্গ কিছু করেছেন, এমন কিছু আমরা দেখিনি কোনোদিন। তাঁর সুযোগ ছিল নিজের তৈরীকৃত ময়দান এবং অবস্থান দিয়ে নিজ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার কিংবা নিজের ইচ্ছায় পরিচালিত হওয়ার। তাঁর সামনে এমন লোভনীয় অফারও কম ছিল না।

তাঁকে ঘিরে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম গড়ার বহু চাকচিক্যময় আয়োজনও হয়েছিল। তাঁকে নিজেদের করে পাওয়ার জন্য বহু আয়োজনও হয়েছিল বহুদিক থেকে। আব্বার জন্য বিভিন্ন দিক বিভিন্ন ঘরানা থেকে এই আগ্রহে সবার প্রতি বিনয়ের সাথে কৃতজ্ঞতা পোষণ করতেন তিনি। কিন্তু সংগঠন এবং দায়িত্বশীলদের সিদ্ধান্তের বাইরে নিজের মতো করে একটি সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেননি কখনো। আব্বা দ্বীনি আন্দোলনের একজন নেতা হিসেবে নিজেকে সংগঠনের এতটাই আনুগত্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে দিয়েছিলেন যে, তাঁর নিজের বলতে কিছুই ছিল না। তিনি নিজেকে পুরোটাই সংগঠনের কাছে সোপর্দ করে দিয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালে বাইয়াত গ্রহণের পর থেকে সূরা তাওবার ১১১ নাম্বার আয়াতে বর্ণিত আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা অনুযায়ী জান-মাল কোনোকিছুই আর নিজের মনে করেননি। সবকিছুই তিনি দ্বীনি সংগঠনের মাধ্যমে দয়াময় আল্লাহর কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। আব্বার শাহাদাতের গভীর তামান্নার মূল উৎস ছিল এই জায়গাটাই।

সাবেক আমীরে জামায়াত শহীদ অধ্যাপক গোলাম আযম, আব্বাস আলী খান, শহীদ মতিউর রহমান নিজামী, শহীদ সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, শহীদ কামারুজ্জামান, শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা, শহীদ মীর কাসেম আলীসহ শহীদ নেতৃবৃন্দ এবং কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে আমাদের শহীদবাগের বাসায় বহুসংখ্যকবার মেহমানদারি করার সুযোগ হয়েছে আমাদের। দায়িত্বশীলরা যেদিন বাসায় আসতেন, আব্বা তাঁদের উত্তম মেহমানদারির জন্য পেরেশান থাকতেন। নিজে ৫ম তলা থেকে নিচে নেমে দায়িত্বশীলদেরকে রিসিভ করে আনতেন। নিজের বসা চেয়ারটা ছেড়ে দিতেন দায়িত্বশীলদের জন্য। যতক্ষণ দায়িত্বশীলগণ থাকতেন, আব্বা ততক্ষণ তাঁদের একজন খাদেমের মতোই থাকতেন।

দায়িত্বশীলগণ আব্বাকে বলতেন, ‘আপনি আমাদের জন্য যে পেরেশান হয়ে যান! মর্যাদার দিক থেকে আল্লাহ তো আপনাকে আমাদের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে রেখেছেন।’ আব্বা জবাবে বলতেন, ‘নবী-রাসূলগণের পরে আমি আমার দায়িত্বশীলদের প্রতি আনুগত্যের ব্যাপারে নির্দেশিত হয়েছি। আমি ভয় করি- আমার দায়িত্বশীলদের আনুগত্য কিংবা শ্রদ্ধা-সম্মানের কোনো বরখেলাফ আমার দ্বারা হয়ে যায় কিনা।’ এমনই এক মধুর, কোমল এবং শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছিল তাঁর সাথে দায়িত্বশীলদের। সংগঠনের কোনো সিদ্ধান্ত বা আদেশ তিনি নিজের জন্য শিরোধার্য করে নিতেন।

জালিম সরকার আব্বাকে গ্রেফতার করার পর সরাসরি প্রস্তাব করেছিল জামায়াতকে অস্বীকার করে তিনি তাঁর লাখো-কোটি ভক্তকুল নিয়ে আলাদা আরেকটি ইসলামী দল গঠন করার জন্য। বিনিময়ে তাঁকে মুক্ত করে দেওয়া হবে, যুদ্ধাপরাধ মামলা হবে না এবং তাঁর ইচ্ছেমতো পুরো বিশ্বে বিচরণের সুযোগ করে দেওয়া হবে। আর তাদের প্রস্তাব মেনে না দিলে জেল, জুলুম, জরিমানা, কারাদণ্ড এমনকি ফাঁসিও হতে পারে।

সরকারের এসব প্রস্তাব মেনে নিলে আব্বা হয়তো জেলজীবন থেকে মুক্ত হয়ে দুনিয়ার আয়েশি জীবন পেতেন। কিন্তু সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে হুজায়ফা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে রোম সম্রাট সাম্রাজ্যের ভাগ দেওয়ার লোভ দেখিয়ে কি দ্বীন থেকে একচুল পরিমাণ দূরে সরাতে পেরেছিল? খাদ্য-পানীয় না দিয়ে উপোস অবস্থায় দিনের পর দিন কারাগারে আটকে রেখেও কি টলানো সম্ভব হয়েছিল তাঁকে? জ্বলন্ত টগবগে ফুটন্ত তেলের ওপর নিক্ষেপের ভয়ও তাঁকে দ্বীন থেকে একচুল পরিমাণ সরাতে পারেনি। আল্লামা সাঈদীরা তো সেই হুজায়ফাদেরই উত্তরসূরি! সেই একই দ্বীনের ঝাণ্ডাবাহী। তাঁদের কীভাবে চাকচিক্যময় প্রস্তাব দিয়ে টলানো যাবে!

আমার সম্মানিত পিতা কুরআনের পাখি আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সেদিন বলেছিলেন, ‘আমাকে ভয় দেখাও! আমি তো নমরুদের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত ইবরাহিমের সাহসী সন্তান। ছুরির নিচে শায়িত আল্লাহর প্রেমের নজরানায় উৎসর্গ হওয়া ইসমাইলের উত্তরসূরি। আমাকে ভয় দেখিয়ে কি লাভ?’ সেদিন তিনি ব্যাঘ্রকণ্ঠে তাদের জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘তোমাদের প্রস্তাব মেনে নেওয়ার চেয়ে কারাগারের ছোটো আয়তনের চার দেওয়ালের জীবন আমার জন্য অনেক শ্রেয়। আমি আমার সংগঠন এবং দায়িত্বশীলদের সাথে গাদ্দারি করে মুনাফিক হয়ে দুনিয়ার আয়েশি জীবন বেছে নিয়ে মহামূল্যবান আখেরাত হারাতে চাই না।’ একজন নেতা হিসেবে আব্বা সেদিন সংগঠনের প্রতি তাঁর সর্বশেষ হক¦টাও সম্ভবত আদায় করে গিয়েছিলেন।

তিনি ছিলেন দ্বীনি আন্দোলনের একজন নেতা। একই সাথে তিনি দুই দুইবারের নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যও ছিলেন। বিশাল এলাকার জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার সার্বিক মান উন্নয়নসহ লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। আব্বার মুখে সবসময় একটি কথা আমরা শুনতাম। তিনি বলতেন, ‘আমার এ এলাকার প্রত্যেক নাগরিকের ব্যাপারে কাল কেয়ামতে আল্লাহর দরবারে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে।’ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সংসদীয় এলাকার নাগরিকদের প্রতি আব্বার দায়বোধ ছিল অনেক বেশি। তাঁকে এলাকার আপামর জনসাধারণ শুধু তাদের এমপি-ই মনে করতেন না, বরং তারা তাদের আধ্যাত্মিক নেতাও মনে করতেন। তিনি এলাকায় গেলে সাধারণ মানুষ পঙ্গপালের মতো ছুটে আসতো তাঁর দোয়া নেওয়ার জন্য।

কারো অসুস্থতায় আব্বার দোয়া ছিল সকলের বহুল আরাধ্যের। এলাকার আপামর জনসাধারণের নিকট এটা প্রসিদ্ধ ছিল যে, হুজুর কারো সুস্থতার জন্য দোয়া করলে আল্লাহ দয়া করে তাকে সুস্থ করে দেবেন। আব্বা নবীজির শেখানো পদ্ধতিতে রুকিয়া করতেন। আল্লাহর নামে দোয়া করে দিতেন তিনি। আল্লাহ সুস্থ করে দিতেন রোগীকে। এটা তাঁর প্রতি আল্লাহ তাআলার বিরাট এক দয়া ছিল। তাঁর প্রতি মানুষের এই গভীর বিশ্বাস এবং ভালোবাসা ছিল এক অনন্যমাত্রার। তিনি এলাকায় গেলে রাতদিন মানুষের সাথে কাটাতেন, সবার সমস্যা শুনতেন। এক এক করে শুনতেন সবার কথা। সমাধান করার চেষ্টা করতেন।

আব্বা যতদিন এলাকায় থাকতেন, হেঁটে হেঁটে একেবারে খেটে খাওয়া মানুষের বাড়ি বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করতেন। মানুষজন কী অবস্থায় জীবন পার করছে, তিনি তা স্বচক্ষে দেখার জন্য বের হয়ে যেতেন এবং সমাধানের চেষ্টা করতেন। আমি প্রায়শই আব্বার সঙ্গী হতাম। নদীর চরের মানুষের অবস্থা দেখার জন্য আব্বা ছোটো নৌকায় করে নদী পার হতেন আর অপর পাড়ে চরের হাজার হাজার মানুষ তাঁকে রিসিভ করার জন্য দাঁড়িয়ে থাকত। সে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য! জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করে পিরোজপুরের একটি চর উদ্ধার করার পর আব্বা সেখানে প্রায় তিন হাজার লোকের আবাসন গড়ে দিয়েছিলেন। এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে অবিরত পরিশ্রম করে গেছেন তিনি। কাদামাটি মেশানো বাতাসে এখনো আব্বার ঘ্রাণ খুঁজে বেড়োায় চরের লোকজন। এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের নিরাপদ এক আশার জায়গা ছিল ‘আল্লামা সাঈদী।’

মাঝে মাঝে তিনি প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ভালো খাবারের আয়োজন করতেন। যাদের জীবনযাত্রায় সচরাচর ভালো আহার জুটতো না, তিনি তাদের জন্য উত্তম মেহমানদারির ব্যবস্থা করতেন। আমাদের বাড়ির উঠোনেই এ আয়োজন হতো। সারিবদ্ধভাবে বসে মানুষগুলো তৃপ্তি সহকারে খাবার খেত আর আব্বা হেঁটে হেঁটে তাদের তৃপ্তির ঢেকুর দেখে আনন্দে চোখের পানি ফেলতেন। তিনি বাড়িতে থাকাকালীন পুরোটা সময় এলাকাজুড়ে একটা উৎসবের আমেজ বয়ে যেত। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন সকলেই একসাথে হয়ে এই আনন্দগুলো উপভোগ করতো তাঁর সাথে। আহা! কী মধুর সময় আল্লাহ তাআলা আমাদের দিয়েছিলেন!

আব্বা এলাকায় সফরকালীন সময়ে সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ তাঁর জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় উন্নতমানের সব আয়োজন করতে চাইতেন। কিন্তু তিনি কখনো তাদের এ আপ্যায়ন গ্রহণ করতে চাইতেন না। তাদেরকে নিষেধ করতেন- এ ধরনের আয়োজন করে যেন সরকারি কোষাগারের অপচয় না করেন। তিনি সরকারি ভিআইপি আয়োজন প্রত্যাখ্যান করে তাঁর নিজ এলাকার মানুষদের সাথে বসে কাঁচাঘরে খেতে পছন্দ করতেন। তাঁর সিকিউরিটির কাজে নিয়োজিত পুলিশ এবং আনসার সদস্যদের কখনো সাথে সাথে নিয়ে ঘুরতেন না। তাদেরকে রিলাক্স করে দিতেন। তারা কাচারি (গ্রামের ড্রইং রুম) ঘরে গিয়ে রিলাক্স করতো, ঘুমাতো।

আব্বা আত্মীয়-স্বজনদের হকের ব্যাপারেও ছিলেন খুব সচেতন। তাঁর চিন্তা কোনোদিন আমাদের পারিবারিক ধন-সম্পদ অর্জন কিংবা জীবনে জৌলুস কেন্দ্রিক ছিল না। তিনি বলতেন, ‘আমি যতটুকু এলাকা, প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য করতে পেরেছি, মূলত ওইটুকুই আমার নিজের জন্য করা।’ একজন নেতা হিসেবে সংগঠন, সমাজ, এলাকা ও সংসদীয় আসনের প্রতি আব্বার মধ্যে আমরা যে দায়িত্ববোধ এবং জবাবদিহিতার গভীর চেতনা দেখেছি, তাতে মনে হতো- খেলাফতে রাশেদার শাসনামলের সময়ের কিছুটা আমেজ আমরা উপভোগ করছি। একজন শাসক হিসেবে দরিদ্র মহিলার প্রতি ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু যে দায়িত্ববোধ এবং আল্লাহর দরবারের জবাবদিহিতার ভয় মনে লালন করতেন, একজন নেতা হিসেবে আব্বার মধ্যে আমরা তার কিছুটা হলেও প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছি।

খেলাফতে রাশেদার শাসনামলকে নবীজি সবচেয়ে উত্তম যুগ হিসেবে ঘোষণা করে গিয়েছিলেন। সেই আমলের মতো উঁচুমানের শাসক দুনিয়াতে আর তৈরি হবে না। কিন্তু নবীজির প্রকৃত ওয়ারিশদের মধ্য থেকে আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে কিছু ন্যায়পরায়ণ নেতা তৈরি করে দিয়ে এ দুনিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখবেন। সেই ন্যায়পরায়ণ নেতাদেরকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন কঠিন তাপদাহের মধ্যে নিজ অনুগ্রহে তাঁর আরশের ছায়ার নিচে জায়গা করে দেবেন বলে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন। (সহিহ বুখারি : ৬৬০) একজন নেতা হিসেবে আমার পরম শ্রদ্ধেয় আব্বা আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী রাহিমাহুল্লাহর জন্য আমরা আল্লাহর কাছে সেই কামনাই করি।

আব্বা আজ আর দুনিয়াতে নেই। তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে এক জঘন্য জুলুমের শিকার হয়ে মজলুম অবস্থায় দুনিয়ার সংক্ষিপ্ত সফর শেষ করে গত ১৪ আগস্ট ২০২৩ শহীদ হিসেবে (আল্লাহ কবুল করুন) পরকালীন সফরের যাত্রা শুরু করেছেন। একজন বাবা, নেতা ও দা’ঈ ইলাল্লাহ হিসেবে সকল ক্ষেত্রেই তিনি আমাদের জন্য যে আদর্শ তৈরি করে  গেছেন, তা যুগ যুগ ধরে অনুকরণীয়-অনুসরণীয় হয়ে থাকবে ইনশাআল্লাহ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম এবং নবীজির সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে আল্লাহর জমিনে তাঁর রুবুবিয়াত উলুহিয়াত প্রতিষ্ঠার যে বজ্রধ্বনি তিনি উঠিয়েছিলেন, যুগ যুগ ধরে দ্বীনের ঝাণ্ডাবাহীদের কণ্ঠে এবং কাজে সে ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতেই থাকবে ইনশাআল্লাহ।

আল্লামা সাঈদী রাহিমাহুল্লাহ; ইতিহাসের ক্ষণজন্মা এক মহান ব্যক্তিত্ব, আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতা, আমার পরম প্রিয় নেতা, দ্বীনের যুগশ্রেষ্ঠ দা’ঈ ইলাল্লাহ। আপনি আল্লাহর ক্ষমা লাভ করুন, আল্লাহ আপনাকে শহীদ হিসেবে কবুল করুন; কোটি কোটি মানুষ এই কামনায় আপনার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে প্রতিনিয়তই অশ্রু ঝরাচ্ছে। আর সন্তান হিসেবে আমি আমার হৃদয়ের সকল আকুতি দিয়ে মহান রবের কাছে আর্তনাদ করছি, ‘হে আরশের মালিক! তুমি আমার সম্মানিত পিতা আল্লামা সাঈদীকে এই দুনিয়ায় কুরআনের পাখি বানিয়েছিলে। এবার তুমি তাঁকে দয়া করে জান্নাতের পাখি বানিয়ে নাও। আমিন, আমিন ইয়া রব।’ (সমাপ্ত)

লেখক : আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর তৃতীয় পুত্র

আপনার মন্তব্য লিখুন

MD ARFANUL KARIM

- 8 months ago

Excellent mashaallah

Nur Muhammed

- 7 months ago

চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না।

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির