post

প্রাণে প্রাণে লাগুক আবার নতুন ভোরের আলো

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

কেটে গেলো আরো একটি বছর। সময় যেনো জীবনের ঝরা পাতা। দেখতে দেখতেই চলে যায়। পেরিয়ে যায় বছর। উল্টে যায় ক্যালেন্ডারের দৃশ্যপট। শিশুবয়স পেরিয়ে কৈশোরীয় উল্লাস। তারুণ্যের উদ্দীপনা, নতুন স্বপ্ন। এর মাঝেও স্কুলজীবনে ডিসেম্বর মানেই পরীক্ষার টেনশন। বিজয় দিবসের উচ্ছ্বাসের মধ্যেও ফলাফলের উৎকণ্ঠা। জানুয়ারি মানেই নতুন বছর। নতুন বই। কোমল শীতে নতুন স্বপ্নের উচ্ছ্বাস। স্বপ্নের উল্লাসিত দুয়ার পেরিয়ে সময়গুলো হয়ে ওঠে বারোমাসি। বারোমাসি মানে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাজীবনে বারো মাসেই ক্লাস, বারো মাসেই পরীক্ষা। একাডেমিক পড়াশুনা শেষ হলেও চাকরির পরীক্ষার জন্য নতুন করে বিনয়ী ছাত্র হওয়া। জীবন মানেই তো এমন একটি চরকা চাকা। আবারো নতুন বছর এলো। এলোমেলো বৈরী বাতাসে ঝড়েও আভাস। গত বছরের তুলনায় নতুন বছরে আরো বেশি। ‘প্রলয় ধ্বংস নয়, নতুন সৃষ্টির বেদনা মাত্র’ কথাটিকে স্বপ্নের সাথে মিলিয়ে নতুন পৃথিবী দেখার প্রত্যাশায় বলছি ‘প্রাণে প্রাণে লাগুক আবার নতুন ভোরের আলো’। 

জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকে স্বপ্ন। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে জীবন যেমন রঙ বদলায় তেমনি রঙ বদলায় স্বপ্নও। দুই হৃদয়ের মেলবন্ধনে হাজার স্বপ্নের মাঝে নতুন প্রজন্ম গড়ার স্বপ্ন চোখের কোনায় খেলা করে দিনের আলোর মতোই। কুসুমিত হৃদয়ের সন্তানটি দুনিয়ায় আসার পূর্বেই বাবা-মায়ের স্বপ্নগুলো রঙিন হতে শুরু করে। পৃথিবীর আলোতে চোখ রাখার সাথে সাথেই তাকে ঘিরে তৈরি হয় নতুন স্বপ্নজগৎ। কলিজার টুকরো সন্তানটি হয়ে ওঠে স্বপ্নরাজা কিংবা স্বপ্নরানি। কল্পনার রঙে সাজিয়ে তাকে বড় করতে থাকে ভালোবাসার চাদরে ঢেকে। কোন অভিভাবকই সন্তানের প্রশংসা ছাড়া নেতিবাচক কথা শুনতে চায় না। সন্তান ভালো করুক, আরো ভালো- এটাই প্রত্যেক অভিভাবকের প্রত্যাশা। তাইতো কথা ফোটার আগেই রঙিন ছবির বইপত্র, ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খোঁজ। ক্লাসে একশোতে একশো পাওয়ার প্রাণান্তকর প্রয়াস। সমাপনী, জেএসসি-জেডিসি, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সকল পর্বেই স্বর্ণালি সফলতা চাই। ফলাফলে গোল্ডেন না জুটলেই যেন আকাশ ভেঙে সকলের মাথায় পড়ে। পৃথিবীর তাবৎ কষ্ট এসে জমা হয় বুকে। সেটাকে আরো বেশি ভারী করে ফেলে অভিভাবকগণ। সফল বন্ধুর বাবা-মা কিংবা প্রতিবেশীরাও এ নিয়ে মাতামাতি করেন দারুণভাবে। ফলে গোল্ডেন না পাওয়া হতাশ ছেলেটি নিজেকে লুকানোর মতো আর জায়গা খুঁজে পায় না। ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে জীবনের অধ্যায়কে সাজিয়ে ফেলে হতাশায়। নেশায় জড়িয়ে যায়, বাউণ্ডুলেদের দলে যোগ দেয় নতুবা বেছে নেয় আত্মহত্যার মতো জঘন্য পথ।


সফলতা-ব্যর্থতার আলো-আঁধার

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, পারিবারিক-সামাজিক ও পারিপাশির্^ক প্রত্যাশা এবং মূল্যবোধের গোড়ায় ব্যাপক গলদ। বিবেকের বধিরতা, অন্ধত্ব, ভোগবাদিতা এবং আমিত্ব ফলানোর প্রদর্শনেচ্ছা থেকে আমরা সফলতার এক আশ্চর্য সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছি। সেই মানদণ্ড আমাদের আবহমান বাংলার মূল্যবোধের কবর দিয়ে দিয়েছে। বিশ্বায়ন এবং অবাধ ইন্টারনেটে ভোগবাদিতা, সুখ-সম্পদের প্রচার প্রচারণা ও আকাশ সংস্কৃতির কারণে সম্পদ গড়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের অনুপ্রবেশ ঘটেছে ব্যাপকভাবে। এই সমাজ আমাদের মনে সফল লোকদের একটি চিত্র এঁকে দিয়েছে। সেই চিত্র ধরে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। ভালো স্কুল-কলেজ বা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া, ভালো চাকরি বা ব্যবসা করা, তারপর ভালো টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়ি করাই এখন সফল ব্যক্তির সংজ্ঞা। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার, বড় চাকরিজীবী-বিসিএস ক্যাডার কিংবা বড় উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী হলে আমরা অবলীলায় তাকে সফল বলছি। ফ্ল্যাট, বাড়ি-গাড়িসহ অঢেল টাকা থাকলেই তিনি সফল।

সফলতাকে কেবলমাত্র বস্তুগত অর্জন দ্বারা পরিমাপ করা যায় না। বড় চাকরি বা ব্যবসা, গচ্ছিত সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি দ্বারা সফলতাকে যাচাই করাটা সবচেয়ে বড় ভুল। অর্জনটাকে প্রাধান্য দেওয়ার চাইতে অর্জনের পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেওয়াই প্রকৃত মানুষের কাজ। একই কথা শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নকল করে গোল্ডেন জিপিএ পেলে লাভ কী? ফলাফল ওরিয়েন্টেড না হয়ে, জ্ঞান ওরিয়েন্টেড হওয়াটাই জরুরি নয় কি? রেজাল্ট সাময়িক আনন্দ বা সাফল্যের অস্থায়ী সুখ দিতে পারে। কিন্তু মূল্যবোধসম্পন্ন জ্ঞান সীমাহীন আনন্দ ও স্থায়ী সাফল্য দিবে। আর এই কথাটা যদি আমাদের ছাত্র-ছাত্রী কিংবা অভিভাবকগণ উপলব্ধি করতে পারেন তবে শপথ করে বলতে পারব রেজাল্ট খারাপ হওয়ার কারণে কোনোদিন কেউ আত্মহত্যা করবে না। সার্টিফিকেটধারী হওয়ার চাইতে সৎ গুণের অধিকারী হওয়াটাই জীবনের মুখ্য হওয়া উচিত।

সৎভাবে, নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের সাথে বৈধ পথে যা-ই ফলাফল আসুক, সেটাই সাফল্য। নকল করে কিংবা প্রশ্নপত্র পেয়ে পরীক্ষায় গোল্ডেন পাওয়া শিক্ষার্থী সাময়িকভাবে বাহবা পেতে পারে কিন্তু জীবন চলার পথে সে কোথাও না কোথাও ব্যর্থ হবেই। নিজের কাজে সে আজীবন সফল হিসেবে মাথা উঁচু করে থাকতে পারবে না। ‘চোরের মন পুলিশ পুলিশ’ ভাব নিয়েই বেঁচে থাকবে। এটা শুধু শিক্ষাজীবনে নয়, কর্মজীবন, পারিবারিক জীবনেও সত্য। ঘুষ খাওয়া বড় সরকারি চাকরিজীবী, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ঔষুধ কোম্পানির নিকট হতে কমিশন খাওয়া বেশরম ডাক্তার, আদর্শ বিবর্জিত ধান্দাবাজ নামী শিক্ষক, শ্রমিকের বেতন আর ব্যাংকঋণের টাকা মারা ব্যবসায়ী কিংবা লোকচক্ষুর আড়ালে অবৈধ কারবার করে রাতারাতি ধনী হওয়া ছদ্মবেশীদের সফল মানুষ বলা যাবে না। ওরা চোর। ওদের সফল চোর বলা যেতে পারে।

বিশ্ব মানবতার অগ্রদূত মহানবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সা.,  খোলাফায়ে রাশেদার চার খলিফা, আসহাবে রাসূল সা., হযরত ঈসা (আ), গৌতম বুদ্ধ, স্বামী বিবেকানন্দ, অথবা কনফুসিয়াস প্লেটো, নিউটন, এরিস্টটল, আইনস্টাইন, লুই পাস্তুর, গ্যালিলিও, জেমস ওয়াট, মাইকেল ফ্যারাডে, টমাস আলভা এডিসন কিংবা জর্জ ওয়াশিংটন, মার্টিন লুথার কিং, সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদী, হাসান আল বান্না, ইমাম খোমেনী, নেলসন মেন্ডেলা, মাদার তেরেসা, হেনরি ডুনান্টসহ হাজারো সফল মানুষের কথা আমরা জানি। তারা বিখ্যাত হয়েছেন শুধু মানুষ আর সৃষ্টির কল্যাণে আমৃত্য সংগ্রাম করে, অবৈধভাবে টাকা-পয়সা জমিয়ে নয়। সফলতার জন্য আত্মবিশ্বাস, দৃঢ় মনোবাল, কঠোর পরিশ্রম, কর্মতৎপরতাই ছিলো তাঁদের মূল কারিশমা। সফল তো সেই ব্যক্তি, মৃত্যুর পর যার শূন্যতায় মানুষের মন কেঁদে উঠে। চোখের কোণে নোনাজল জমে অজান্তে বলে উঠবে ‘আহ্, লোকটা বড় ভালো ছিল’। এটাই তো সাফল্য। সত্যিকারের সফল মানুষেরাই সুখী। সকল সুখী মানুষই সফল। সুখের জন্য খুব বেশি কিছু দরকার নেই। প্রয়োজন একটি পরোপকারী, নির্লোভ নিঃস্বার্থ সৎ জীবন।

আমাদের এই সফল মানুষ হওয়ার সংজ্ঞা থেকে ভালো মানুষ হওয়ার স্বপ্নটা কেমন জানি ফিকে হয়ে আসছে। বস্তুত অর্জনই মুখ্য, অর্জনের পদ্ধতিটা একেবারে গৌণ হয়ে পড়েছে। তাইতো প্রথম শ্রেণি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা, বার্ষিক পরীক্ষা, বোর্ড পরীক্ষাসহ ছোটবড় সকল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। আর এসবের ক্রেতা শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকগণও। সামাজিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে চোরাকারবারি, ঘুষখোর, চাঁদাবাজ, কালোবাজারি, মুনাফাখোর এবং সম্পদবাজদের। সৎ কিন্তু দরিদ্র, এমন লোকের মূল্যায়ন নেই। এই যে অসুস্থতা, অসুস্থ সফলতা এবং তা অর্জনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা এসব মানুষকে বিকারগ্রস্ত করে তুলেছে। তাইতো, বোর্ড পরীক্ষায় ফেল করেই আত্মহননের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে সম্পদের লড়াইয়ে খুনের ঘটনাও।


ছাত্র-ছাত্রীদের বলছি

তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে বেড়ে ওঠা সন্তানটিও বুঝতে পারে না যে, সাফল্য এবং ব্যর্থতা একটি আপেক্ষিক বিষয়। অথচ তাকে বিশ্বাস করা উচিত যে, প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি ক্ষণ এবং প্রতিটি দিনই নতুন। একটা মানুষ মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তেও বুঝতে পারে না যে, সে সফল নাকি ব্যর্থ। নিজের আত্মবিশ্বাস হারানো কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বাহ্যিক দু-একটা ফলাফল দিয়ে নিজেকে বিচার করা যায় না। বিশ্বাস করতে হবে যে কম মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীও গোল্ডেন পেয়ে যাচ্ছে। অথচ যে কোনো কারণে আমি মিস করেছি। পৃথিবীতে সফল লোকগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যর্থতার ইতিহাস গড়েছে। যে নিজেকে উপদেশ দিতে পারে না, সে কারো উপদেশ গ্রহণ করতেও পারে না। তাই নিজের মনের কথাটা শুনে তার ডাকে সাড়া দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। অযথা টেনশন করে লাভ নেই। ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে ইতিবাচক দিকগুলো সামনে আনতে হবে। তাওয়াক্কুল বাড়াতে হবে মহান প্রভুর প্রতি। কান্নার চেয়ে একটু হাসির চেষ্টা করা উচিত। নিজেকে প্রফুল্ল রাখার জন্য কিছু মজার কারণ খুঁজে নিতে হবে। জীবনের স্বাদ উপভোগ করার সুযোগ খোঁজা দরকার। বাকিটা আপনা-আপনি চলে আসবে। বিপদে মহান প্রভুর সহায়তা চাইতে হবে। নিজেকে বুঝাতে হবে যে, গতকাল যা হবার হয়েছে, আজ ভালো কিছু করতেই হবে। আমি সফল। আমিই শ্রেষ্ঠ। আমি পরিপূর্ণ মানুষ হতে চাই। পরিশ্রম সাফল্য আর ব্যর্থতার মাঝে একটা সেতুমাত্র। পরিশ্রম যত বেশি, সেতুটি ততো বেশি মজবুত আর কার্যকর। সাফল্যের গল্পগুলো একদিনে তৈরি হয় না। অনেক দিনের পরিশ্রমের যুক্ত ফলাফল। আমি পারবোই, পারতেই হবে আমাকে।

বছরের পর বছর পরীক্ষা দিয়ে কেউ কেউ পাসই করতে পারেনি। আমি গোল্ডেন কিংবা পর্যাপ্ত নাম্বার না পেয়ে লজ্জায় মুখ লুকাচ্ছি! এ প্লাস না পেয়ে হাহুতাশ করছি। অথচ অনেকে ফর্ম ফিলাপটাও করতে পারেনি। কেবল পরীক্ষার ফি না দিতে পারার কারণে টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও কেউ কেউ পরীক্ষাই দিতে পারেনি! এই সব বিবেচনায় আমি কি সফল এবং সৌভাগ্যবান নই? লক্ষ্য অর্জনে আমি কতটা উপযুক্ত তা বুঝার চেষ্টা করতে হবে। নিজের সক্ষমতাকে সামনে রেখে ভবিষ্যতে নির্ধারিত উপযোগী লক্ষ্য তৈরি করতে হবে। আত্মবিশ্বাস খুব বড় বিষয়। যাদের নিজের উপর বিশ্বাস কম, তারা জীবনে বড় হতে পারে না। নিজেকে বিশ্বাস করতে হবে। নিজেকে গড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এসএসসি, দাখিল ও সমমান পরীক্ষায় এ প্লাসের ছড়াছড়ি। এ প্লাস বন্যা বলছেন অনেকেই। নাম্বারও পর্যাপ্ত। পরীক্ষাথীসহ কোনো কোন অভিভাবকও নাম্বার দেখে বিস্মিত। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস ক্যাডার নাকি এনজিও অফিসার হবে, তা এসএসসি ও সমমান কিংবা এইচএসসির রেজাল্টই মাপকাঠি নয়। উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে কিছুটা সহায়ক হলেও পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। জীবনের সফলতা-ব্যর্থতার পাঁচ পার্সেন্টও এই গোল্ডেন রেজাল্টের উপর নির্ভর করবে না। গোল্ডেন ফাইভ পেলেই সে কি ভালো ভার্সিটিতে বা মেডিক্যালে চান্স পাবে? ভালো সাবজেক্ট কনফার্ম হয়ে গেলো? জীবনে সফল হয়ে গেলো? মোটেও না। বরং ভালো রেজাল্ট হলে সমস্যা বেশি। আমি অনেককেই দেখেছি- এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো রেজাল্ট করে ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে সিরিয়াসনেস কমিয়ে দিয়েছে। নরমাল কনফিডেন্সকে ওভার কনফিডেন্স বানিয়ে হাওয়া খেয়ে সবকিছু এলোমেলো করে ফেলে। এমনও দেখেছি যে, বোর্ডের ফার্স্ট স্ট্যান্ড করা ছাত্রও বুয়েটে চান্স পায়নি। অথচ নরমাল ফার্স্ট ডিভিশনে পাস করা ছেলেটি, কোনো উপায়ান্তর না দেখে টানা দুই মাস দরজা বন্ধ করে পাগলের মত পড়ালেখা করে ঠিকই চান্স পেয়েছিলো। 

যে কোনো ভার্সিটি কিংবা কলেজে সাধারণ কোনো সাবজেক্টে পড়েও, ভালো ভার্সিটির ভালো ছাত্র-ছাত্রীদের চেয়ে অনেক বেশি সফল হওয়া যায়, এমন শত শত নজির আছে। জনৈক মনীষী বলেছেন- ‘সামনের দরজা বন্ধ হয়ে গেলে পিছনের দরজা খুঁজতে হবে। দরজা না পেলে জানালা, চিপা-চাপা, কোনা-কানি খুঁজতে হবে। একবার দুইবার চেষ্টা করে খুলতে না পারলে, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত সাধনা করে লাথি-গুঁতা দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করেই যাবে। হাতুড়ি-বাটাল খুঁজে না পেলে খালি হাত পা দিয়েই ভাঙার চেষ্টা করতে হবে। চেষ্টা করতে করতে হাতে-পায়ে ফোস্কা পড়ে গেলেও মলম লাগিয়ে, ক্ষতের মধ্যে মাটি লাগিয়ে আবার চেষ্টা করতে হবে। সফলতা আসবেই।’ একদিন না একদিন জয় ঠিকই দরোজায় এসে দাঁড়াবে। 

মহান আল্লাহ তায়ালা পরিশ্রমের যথাযথ পুরস্কার দিবেনই। জীবনের ভবিষ্যতে কী লেখা আছে তা তিনিই ভালো জানেন। হয়তো কোনো কারণে আজকে ফলাফল খারাপ হয়েছে তাতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। গত বছরটি খুব খারাপ গেছে তাতে বিষণœতায় ডুবে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রথমে কান্না আসবে, কান্না আসলে ভালো করে কাঁদতে হবে। তবে হাউমাউ করে কাঁদার কোনো দরকার নাই। একটা রেজাল্ট কিংবা ব্যর্থতম একটা সময় গোটা জীবনকে শতভাগ বদলে দিতে পারে না। হয়তো বন্ধুদের রেজাল্ট দেখে কষ্ট লাগতে পারে তবে সেটাকে বেশি পাত্তা দেওয়ার কোনো দরকার নেই। কারণ বহু ছাত্র ভালো রেজাল্ট করেও ভালো কোথাও চান্স পায় না। জীবনের স্রােত বহমান। এই স্রােতে সবমসময় সকলেই সফল হবে তা কিন্তু নয়। সফল হওয়ার জন্য গোল্ডেন রেজাল্ট যতটা লাগে তার চেয়ে প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তি, প্রতিজ্ঞা, কর্মপ্রচেষ্টা এবং আল্লাহর সাহায্য। কারো হয়তো কোনো কারণে এক বছর নষ্ট হয়ে গেলো। এতে মহাচিন্তার কোন কারণ নেই। আল্লাহ চাইলে সফল বন্ধুটির এক বছর আগেই চাকরি জুটতে পারে। জীবনের ব্যর্থতাগুলোকে চিনে রাখতে হবে। তাহলে একসময় দেখা যাবে যে এইগুলোই সফলতার কারণ হয়ে ফিরে এসেছে। 


অভিভাবকদের বলছি

রেজাল্ট খারাপ হলে বাবা-মা, অভিভাবক, আত্মীয়, প্রতিবেশী অনেকেই সন্তানটিকে আগামী দিনের জন্য উৎসাহ না দিয়ে গালমন্দ করে থাকেন। এই গালমন্দে ছাত্র-ছাত্রীদের ভালো হওয়ার চেয়ে খারাপটাই হয় বেশি। তারা হতাশ হয়ে পড়েন। একটা দেশের সবচেয়ে বড় সর্বনাশ করা সম্ভব সেই দেশের তরুণ সমাজকে হতাশার মাঝে ঠেলে দিয়ে। জেনে হোক না জেনে হোক, আমাদের সমাজব্যবস্থা এ খারাপ কাজটিই করে থাকে। স্বপ্ন যার আছে তার রেজাল্ট খারাপ হলেও সে সবার চেয়ে এগিয়ে যাবে। পরিবারের বোঝা উচিত, একজন মানুষ পরীক্ষায় খারাপ করলেই তার জীবন ধ্বংস হয়ে যায় না। ইতিহাসে বহু গুণীজন পরীক্ষায় খারাপ করেও বড় হয়েছেন। তা ছাড়া একটি-দুটি পরীক্ষায় খারাপ করলেই যে জীবন বিনাশ হয়ে যাবে, সেটা ভুল ধারণা। পৃথিবীর অসংখ্য ছেলেমেয়ে পরীক্ষায় খারাপ করে। তারা আবার ঘুরে দাঁড়ায়। শিক্ষাজীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর এই চিত্র খুবই সাধারণ। ছেলেমেয়েদের ওপর প্রত্যাশার চাপ না দিয়ে তাদের সম্ভাবনাকে বের করার চেষ্টা করতে হবে। সন্তানের পাশে থেকে সাহস দিতে হবে। কোনো কারণে হয়তো আজ পরীক্ষায় খারাপ করেছে কিন্তু সামনের পরীক্ষায় সে ভালো করতেই পারে, এটাই স্বাভাবিক। কেননা ভালো রেজাল্ট জীবনের মাত্র কয়েকটি জায়গায় কাজে লাগে। উচ্চশিক্ষায় ভর্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া, বিদেশে স্কলারশিপ পাওয়া এমন কিছু বিষয় বাদ দিলে বাস্তব জীবনে বা প্রফেশনাল জীবনে ভালো রেজাল্টের দরকার হয় খুব কম। বরং ভালো রেজাল্টের চেয়ে দক্ষতার প্রয়োজন বেশি। এসএসসি, এইচএসসিতে অনেক খারাপ রেজাল্ট করেও পরবর্তী জীবনে অনেকেই সফল হয়েছে। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডমিশন টেস্টে ফার্স্ট হয়েও গ্র্যাজুয়েট হতে পারেনি। বছরের পর বছর পড়ে থেকেছে এমন রেকর্ডও আছে। পড়াশুনার মূল উদ্দেশ্য ভালো মানুষ হওয়া। স্বদেশ থেকে বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানাবিধ বিষয় আত্মস্থ করা। সর্বোপরি নিজেকে মানবিক ও সফল মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। এ বিষয়টি অভিভাবকদের মাথাতেও থাকতে হবে। 

পরিশেষে বলা যায়, এ পরীক্ষার রেজাল্ট যাই হোক না কেন, ফলাফলের আলোকে জায়গা মতো ভর্তির প্রস্তুতি গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। নতুন জীবনের স্বপ্ন আঁকতে হলে সাফল্য-ব্যর্থতার আলোকে নতুন পরিকল্পনা আর নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করতে হবে। সুস্থ না থাকলে ভালো কিছু করাটা কঠিন। তাই শরীরের যত্ন নিতে হবে। চমৎকার প্রস্তুতির পরও কেবল অসুস্থতার কারণে স্বপ্ন ভেঙে গেছে অনেকের। তাই সুস্থ এবং নিরোগ থাকার চেষ্টা করা জরুরি। হাসি-খুশি থাকা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর খারাপ রেজাল্টের পিছনে কাজ করে মনঃকষ্ট। অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অর্থাৎ রাস্তার খাবার, অতিরিক্ত ভাজা-পোড়া, মাত্রাতিরিক্ত কোল্ডড্রিংকস ও ফাস্টফুড বর্জন  করে বেশি বেশি ফল ও সবজি খাওয়ার মাধ্যমে শরীর সুস্থ রাখতে হবে। অজুহাত দেখানোর মানসিকতা ত্যাগ করে গুরুত্বপূর্ণ সিলেবাসের পড়ালেখা সবার আগে করার চেষ্টা করতে হবে। ব্যর্থতার ভয় দূর করে সাহসের সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জের মোকাবেলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। অনুরোধে ঢেঁকি না গিলে বখাটে এবং আপন বন্ধুদের আড্ডাকেও না বলতে হবে। অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার এবং সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষ করে ফেসবুক আসক্তি কমিয়ে আপাতত ফেসবুককে না বলতে হবে। সবজান্তা সাজতে বহুমুখী প্রতিভার বিকাশ ঘটানোর মানসিকতায় অন্যান্য ব্যস্ততাগুলোকে আপাতত গুডবাই জানাতে হবে। এই মুহূর্তে নতুন উদ্যমে নিজেকে সাজিয়ে নেওয়া যেহেতু জীবনের অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাই বড় ধরনের সফলতা পেতে হলে ছোট ছোট স্বপ্নগুলোকে পিছনে ফেলে রেখে আল্লাহর সাহায্য কামনা করে সময়কে পুরোপুরি কাজে লাগানোই এখন সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। ভালো বন্ধু বানাও। সৎসাহস ও চরিত্রগঠনে সহায়শক্তি হবে। ভালো সঙ্গীর সঙ্গ নাও, আলোর পথে এগিয়ে যাবে। দেখবে সফলতা তোমার দুয়ারেই তাজা গোলাপের মতো সুবাসিত ঘ্রাণে হাসছে।

লেখক : প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির