post

ব্যক্তিত্ব গঠনে সুন্নাহর নির্দেশনা

আলী আহমাদ মাবরুর

২৭ অক্টোবর ২০২২

[ শেষ পর্ব ]

মুমিনরা নিয়মিত আত্মসমালোচনা করে

হানজালা আল-উসাইদি রা. থেকে বর্ণিত। একবার তিনি কাঁদতে কাঁদতে আবু বকর রা.-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আবু বকর রা. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে হানজালা, তোমার কী হয়েছে?’ তিনি বললেন, হে আবু বকর, আপনাদের প্রিয় হানাজালা তো মুনাফিক হয়ে গেছে। আমরা যখন রাসূল সা.-এর দরবারে অবস্থান করি এবং তিনি আমাদের জান্নাত-জাহান্নাম স্মরণে নসিহত করেন, তখন মনে হয় যেন আমরা সেগুলো প্রত্যক্ষভাবে দেখছি। কিন্তু বাড়ি ফিরে আসার পর স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজন ও সহায়-সম্পদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি এবং অনেক কিছুই ভুলে যাই। আবু বকর রা. বলেন, আল্লাহর কসম! আমাদেরও তো একই অবস্থা! চলো আমরা রাসূল সা.-এর নিকটে যাই। অতঃপর আমরা সেদিকে রওনা হলাম। রাসূল সা. তাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, হানজালা, কী খবর? তখন উত্তরে তিনি আগের কথাগুলোর পুনরাবৃত্তিই করলেন। রাসূল সা. বললেন, “আমার কাছ থেকে তোমরা যে অবস্থায় প্রস্থান করো, সবসময় যদি সেই অবস্থায় থাকতে তাহলে ফেরেশতারা অবশ্যই তোমাদের মজলিসে, বিছানায় এবং পথে-ঘাটে তোমাদের সঙ্গে মুসাফাহা করত। হে হানজালা, মানুষের অবস্থা তো পরিস্থিতির আলোকে বদলে যেতেই থাকে। (মুসলিম-২৭৫০)

অর্থাৎ আল্লাহই মানুষকে এমনভাবে তৈরি করেছেন যে, তার মধ্যে সুচিন্তাগুলো বেশিক্ষণ থাকে না। আমরা যখন ভালো কোনো আলোচনায় বসি, ভালো কোনো বক্তার কথা শুনি কিংবা দ্বীনি বই পড়ি- তখন আমাদের মন যতটুকু নরম হয়, তারপর আবার যখন সেই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে দুনিয়াবি কাজে লিপ্ত হয়ে যাই, তখন আমাদের মানসিকতাও পাল্টে যায়। কিন্তু একজন মুমিন বান্দার বৈশিষ্ট্য হলো তিনি তার এই বিচ্যুতি নিয়ে পেরেশান থাকবেন। নিজের অবস্থানগুলো নিয়মিত মূল্যায়ন করবেন। যতটুকু মানের অধঃপতন হয়, তা আবার কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করবেন।

মুমিন ব্যক্তি কখনোই পাপকে হালকাভাবে নেয় না

হজরত সাহল বিন সাদ রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেছেন, “তোমরা ছোট ছোট পাপের বিষয়ে সতর্ক হও। কেননা, একজন ব্যক্তি যখন নির্জন এক উপত্যকায় একাকী অবস্থান করে, তখন কেউ হয়তো তাকে এক টুকরো জ্বালানি কাঠ এনে দেয়। আরেকজন হয়তো আরেক টুকরো জ্বালানি কাঠ নিয়ে এগিয়ে আসে। এভাবে একটি একটি করে কাঠ জ্বালাতেই হয় যতক্ষণ না সে রুটিটি সম্পূর্ণরূপে সিদ্ধ করতে পারে। তেমনিভাবে যে পাপগুলোকে তোমরা ছোট বলে মনে করো, সেগুলো জমতে জমতে অনেক হয়ে যায়। এই সব ছোটখাটো পাপের প্রতিটির জন্য মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে আর প্রতিটি ক্ষুদ্র পাপই তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে।” (আহমাদ-৫/৩৩১)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেছেন, “ঈমানদার লোক তার পাপকে এমনভাবে ভয় করে যেন সে পাহাড়ের গোড়ায় অবস্থান করছে, আর ভয় করছে যে, পাহাড় ভেঙে তার উপর পড়বে। আর অসৎ লোক তার পাপকে নাকের ডগায় বসা একটি মাছির মতো মনে করে, যেন সে হাত নাড়ালো আর ওমনি তা উড়ে গেল।” (তিরমিজি-২৪৯৭)

একজন ঈমানদার বান্দা তার পাপকে ছোট বলে কখনোই অবজ্ঞা করতে পারে না। বরং সে প্রতিটি পাপকেই আল্লাহর অবাধ্যতা হিসেবেই গণ্য করে। যে পাপগুলোকে ছোট মনে করে আমরা কম পাত্তা দেই, সেগুলোই ধীরে ধীরে আমাদের ঈমানকে ধ্বংস করে ফেলে। ফলে, অন্তরে খোদাভীতির পরিমাণও কমে যায়। একজন মানুষ যখন আল্লাহর অবাধ্যতাকেও গুরুত্ব দেয় না, সে মূলত নিজের ওপরই জুলুম করে।

মুমিন বান্দা কখনোই জুলুম করবে না:

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেছেন, “তোমরা জুলুমের বিষয়ে সতর্ক হও। কেননা শেষ বিচারের দিনে জুলুমগুলো সব অন্ধকার হয়ে দেখা দেবে। তোমরা লোভ ও লালসার বিষয়ে সতর্ক হও। কেননা, লোভ তোমাদের আগে বহু জাতিকেই ধ্বংস করে দিয়েছে। লোভকে কেন্দ্র করেই পূর্ববর্তী জাতি ও সম্প্রদায়গুলো রক্তপাত ও সহিংসতায় লিপ্ত হয়েছে এবং হারাম জিনিসকে হালাল বানিয়ে নিয়েছে।” (মুসলিম-৬২৪৮)

এখানে বলা প্রয়োজন যে, জুলুম দু’ ধরনের হয়। প্রথমত, একজন মানুষ তার নিজের ওপর, নিজের রুহের ওপর জুলুম করতে পারে। আর দ্বিতীয়ত, সে অন্যের ওপর জুলুম করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা এ দুই ধরনের জুলুমকেই নিষিদ্ধ করেছেন। জুলুম মানুষকে আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে সরিয়ে নেয়।

একজন মুমিনের ক্ষতিকর সংবাদের ধারক ও বাহক হবে না

আনাস বিন মালিক রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেন, “তোমরা কি জানো আল আয বা অপবাদ কী? সাহাবারা বললেন, আল্লাহর রাসূলই সবচেয়ে ভালো জানেন।” রাসূল সা. বললেন, “আল আয হলো অপর মানুষকে এমন কোনো সংবাদ বা তথ্য পৌঁছে দেওয়া যাতে করে একাধিক মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ও দূরত্ব তৈরি হয়।” (বুখারি, বায়হাকি) 

একজনের কেচ্ছা কাহিনী গিয়ে আরেকজনকে বলা এক ধরনের রোগ। কোনো অন্তরে এই রোগ প্রবেশ করলে কলবটি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে যায়। ধীরে ধীরে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো দূষিত হয়ে যায়। সেই অন্তর বা কলবগুলো এ ধরনের দূষণের আওতায় পড়ে যেগুলো জাগতিক লোভ লালসায় পরিপূর্ণ এবং যেখানে ধর্মীয় আবেগ অনুভূতি নি¤œপর্যায়ে চলে আসে। আমরা আল্লাহর কাছে এই ধরনের অন্তরের ব্যাধি থেকে পানাহ চাই।

মুমিন পার্থিব জীবনের সাথে ঘনিষ্ঠ হয় না

সাহল ইবনে আদ রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেছেন, “জিবরাইল আ. আমার কাছে এসেছিলেন। তিনি বলে গেলেন, মানুষ বেঁচে থাকার জন্য কত কিছুই না করে অথচ তাকে মরতেই হবে। এমন একজনকে সে ভালোবাসে, যে তাকে ছেড়ে যাবেই। তাই এমন আমল করুন যাতে আপনার পুরস্কার প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়। একজন ঈমানদারের উৎকর্ষতা নির্ধারিত হয় তার নামাজে- যা সে গভীর রাতে ঘুম কামাই দিয়ে আদায় করে। আর ঈমানদারের প্রকৃত মর্যাদা হলো তার স্বাবলম্বিতার ওপর, যখন সে অন্য কারো ওপর নির্ভর করে না।” (আল হাকিম-৩/৩২৪)

যে মানুষটি এই দুনিয়া ও দুনিয়াবি জীবনের সাথে সংযুক্ত থাকে, দ্বীন ও বুদ্ধিমত্তার সাথে তার বিচ্ছিন্নতা ঘটে যায়। অথচ যদি সঙ্গে দুনিয়া থাকে কিন্তু দ্বীন-ধর্ম না থাকে তাহলে মানুষ অধঃপতনের দিকে চলে যায়। দুর্নীতি ও অপকর্মের দিকে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। যে মুসলিম রবের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে, নিজের আত্মা ও দ্বীনি সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে আন্তরিক সে দুনিয়ার প্রতি লালসা এবং সামান্য কয়েক টাকার চাহিদার তুলনায় অনেক উৎকৃষ্ট অবস্থান ধারণ করেন। তিনি অন্য সবার জন্যও উত্তম দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবেন এবং প্রমাণ করবেন যে, শুধুমাত্র দুনিয়াকে চর্চা করার মাঝে কোনো কল্যাণ নেই। কল্যাণ হবে তখনই যখন দুনিয়াকে কেউ দ্বীনি মর্যাদা পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারে কিংবা জাগতিক সময়টিকে অন্তরের পরিশুদ্ধতার কাজে ব্যবহার করতে পারে।

দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া

জুহুদ অর্থ হলো দুনিয়ার প্রতি আসক্ত না হওয়া। সকল প্রয়োজনীয়তা ও চাহিদাকে আল্লাহর জন্যই প্রকাশ করা। আল্লাহর বান্দাদের সাথে মার্জিত ও ভদ্র ব্যবহার করা, জামা কাপড় বা পোশাকাদি, খাবার বা পানীয়ের বিষয়ে বিলাসিতা না করা এবং খ্যাতি ও পরিচিতি এড়িয়ে যাওয়া। জুহুদ মানে আল্লাহর নেয়ামত অস্বীকার করা নয়। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ) বলেন, “জুহুদ হলো যা কিছু কল্যাণকর নয় তা এড়িয়ে চলা। বরং কল্যাণকর কিছুর দিকে দৌড়ে যাওয়া। প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তি এমন কিছু করবে না যার ফলে উপকারের চেয়ে বরং ক্ষতির মাত্রা বেশি হয়ে যায়। অন্য দিকে, উপকারী বিষয়কে এড়িয়ে যাওয়া বোকামি।” 

নিয়মিত নেক আমল করা

হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেছেন, “প্রত্যেক দিন যখন সূর্য উঠে মানুষের শরীরের প্রতিটি অঙ্গের গ্রন্থির জন্য সাদাকাহ দেওয়া অবশ্য কর্তব্য। এক্ষেত্রে দু’জন মানুষের মাঝে ইনসাফ করা হচ্ছে সাদাকাহ, কোনো আরোহীকে তার বাহনের উপর আরোহণ করতে বা তার উপর বোঝা উঠাতে সাহায্য করা হচ্ছে সাদাকাহ, ভালো কথা হচ্ছে সাদাকাহ, সালাতের জন্য প্রতিটি পদক্ষেপ হচ্ছে সাদাকাহ এবং কষ্টদায়ক জিনিস রাস্তা থেকে সরানো হচ্ছে সাদাকাহ।” (বুখারি-২৯৮৯, মুসলিম-১০০৯)

তাই একজন বান্দা যদি তার পুরোটা দিন ও রাত আল্লাহর আনুগত্যের মাঝে পার করে, সকল কাজ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে তাহলে তাকে তা করতে দেওয়া উচিত। একজন মানুষ যদি জুহুদে থাকে তাহলে যিনি অর্থশালী তার উচিত জুহুদরত ব্যক্তির প্রচেষ্টাকে সম্মান করা। আর একজন দরিদ্র মানুষের কোনো অবস্থাতেই অলসতার পক্ষে থাকা উচিত নয়। আমরা প্রত্যেকে যে অবস্থায় আছি, সেই অবস্থায় থেকেই কিভাবে ভালো কাজ করা যায়, কল্যাণের পথে হাঁটা যায়- সেই পথেই সবার অগ্রসর হওয়া কাম্য।

মুসলিমরা যা পান তাতেই সন্তুষ্ট থাকেন

হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেছেন, “শুধু সম্পদ থাকলেই ধনী হওয়া যায় না। প্রকৃত ধন ও আভিজাত্য হলো আত্মার সমৃদ্ধি (সন্তুষ্টি)।” (মুসলিম ২২৮৭) 

এই কারণে মানুষ হিসেবে সবচেয়ে বড়ো যে সম্পদের অধিকারী আমরা হতে পারি তাহলো আত্মার সন্তুষ্টি ও প্রশান্তি। আর আল্লাহর কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ না করলে প্রশান্ত হৃদয়ের অধিকারী হওয়া যায় না। প্রতিনিয়ত আমাদের আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত এবং তাঁর ওপরই শতভাগ নির্ভর করা উচিত। তাহলেই সন্তুষ্টি ও স্বস্তি মিলবে। জাগতিক সম্পদের চাহিদাও যেমন কখনো শেষ হয় না। তেমনি তাতে সুখের সন্ধানও পাওয়া যায় না।

দ্বীনের ব্যাপারে পরিপূর্ণ একনিষ্ঠতা

কা’ব ইবনু মালিক আল-আনসারি রা. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: দু’টি ক্ষুধার্ত নেকড়েকে ছাগলের পালে ছেড়ে দেওয়ার পর তা যতটুকু না ক্ষতিসাধন করে, কারো সম্পদ ও খ্যাতিমান হওয়ার আকাক্সক্ষা ধর্মের ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি ক্ষতিসাধন করে। (তিরমিজি-২৭৩৬)

নেকড়ে হলো এমন একটি প্রাণী যা যতটুকু না খায় তার চেয়ে বরং বেশি ধ্বংস করে। ইবনে রজব (রহ) বলেছেন, যদি কেউ দুনিয়াবি জীবনে হালাল আয় করে এবং হালাল পথেই ব্যয় করে। তারপরও যদি সে তার সময়ের অধিকাংশই আরো আরো বেশি হালাল উপার্জনের জন্য ব্যয় করে, তাহলে প্রকারান্তরে সে দুটো লোভই করলো। কারণ, সে আয় বাড়াতে ব্যস্ত হয়েছিল আর তেমনটা হয়েছিল সম্পদ বাড়ানোর মোহ থেকেই।

আমরা দুনিয়াতে লোভ লালসার পেছনে যে সময়টুকু ব্যয় করি, তা সামান্য মনে হলেও পরকালে এ অপব্যয়টাই আমাদের জন্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে যাবে। আমরা দুনিয়াতে যাই উপার্জন করি না কেন, তা আমাদের খাবারের মতো। যত দামি খাবারই খাই না কেন, তা যেমন বেশিক্ষণ পেটে থাকে না। দুনিয়ার কাজকর্মও তাই। আমাদের এমন কিছুর দিকে বরং মনোনিবেশ করা প্রয়োজন, যার প্রতিদান আখেরাতে আমরা পাবো।

যে ব্যক্তি মুক্তি চায়, জাহান্নামের শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পেতে চায় তার উচিত ধর্মীয় দিকনির্দেশনাগুলোকেই একমাত্র নীতিমালা হিসেবে অনুসরণ করা। তাহলে আল্লাহ তার ওপর খুশি হয়ে যাবেন। তাকে হেফাজত করবেন এবং  তার ভেতর দ্বীনি চেতনাকেও সমুন্নত রাখবেন।

একজন মুসলিম অন্যের সাথে কখনো দুর্ব্যবহার করতে পারে না

হজরত আয়িশা রা. হতে এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী করিম সা.-এর নিকট আসার জন্য অনুমতি চাইলে তিনি বললেন, ‘সে গোত্রের কতই না খারাপ লোক।’ অতঃপর তিনি বললেন, তাকে আসতে দাও। যখন সে ভেতরে এলো তখন তার সঙ্গে তিনি নম্রভাবে কথা বললেন। সে চলে গেলে হজরত আয়িশা রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এ ব্যক্তির সঙ্গে নম্রভাবে কথা বললেন, অথচ ইতঃপূর্বে আপনি তার সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বললেন, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট ওই ব্যক্তিই সবচেয়ে খারাপ, যাকে মানুষ তার অশালীন কথার ভয়ে ত্যাগ করেছে।’ (আবু দাউদ-৪৭৯১)

এই কারণে অপর মানুষটি যদি খারাপও হয়, তারপরও একজন মুসলিম কখনোই তার সাথে দুর্ব্যবহার বা বাজে ব্যবহার করতে পারে না। কেননা, প্রতিটি মুসলিমের সম্পর্ক ভাঙায় নয়, বরং সম্পর্ক গড়ায় ও উন্নতকরণেই বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত।

একজন মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টির দ্বীনি ভাই ও বোনের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করেন

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী সা. বলেন, এক ব্যক্তি অন্য গ্রামে বসবাসকারী তার এক ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে বের হন। পথিমধ্যে একজন ফেরেশতা আসেন এবং বলেন, কোথায় যাচ্ছেন? তিনি উত্তর দেন, এই গ্রামে বসবাসকারী ভাইয়ের কাছে। ফেরেশতা বললেন, আপনি কি তার প্রতি কোনো কারণে কৃতজ্ঞ? সেই দায় পূরণেই কি আপনি যাচ্ছেন? সেই ব্যক্তি বলেন, না, তবে আমি তাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি। তখন ফেরেশতা বলেন, আল্লাহ আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসেন, যেমন আপনি তাঁকে ভালোবাসেন। (মুসলিম-২৫৬৭) 

সম্পর্ক রক্ষা না করলে, একে অপরকে দেখতে না গেলে কোনো ব্যক্তিই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে না। তাই একজন মুমিন বান্দা সবসময়ই অপরের সাথে সম্পর্ক সুরক্ষায় তৎপর থাকেন।

মুসলিমের চরিত্র

হজরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা.কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন কাজ অধিকাংশ লোককে জান্নাতে প্রবেশ করাবে? তিনি উত্তরে বলেছেন, কিয়ামতের দিন যে জিনিসটি মুমিনের পাল্লায় সবচেয়ে ভারী হবে তা হলো- ‘তাকওয়া ও উত্তম চরিত্র।’ (তিরমিজি-২০০৪)

রাসূলুল্লাহ সা. আরও বলেছেন, কিয়ামতের দিন যে জিনিসটি মুমিনের পাল্লায় সবচেয়ে ভারী হবে তা হলো- উত্তম চরিত্র। (আবু দাউদ-৪৮০১)

একজন মুমিন শুধুমাত্র উত্তম চরিত্রের শক্তিতে একজন শত্রুকেও বন্ধু বানিয়ে ফেলতে পারে। প্রতিপক্ষকে সহচরে পরিণত করতে পারে। কর্কশ একজন ব্যক্তিকেও নমনীয় করে ফেলতে পারে। বর্তমানে মানুষের যে অধঃপতন ঘটেছে তার নেপথ্যে মূল কারণ হলো মানুষের চরিত্র আগের তুলনায় অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। যারা একান্তে ও গোপনে আল্লাহর কাছে সাহায্য চায়, আল্লাহর ইবাদত করে- তারাই কেবল চরিত্রের সৌন্দর্য কিছুটা ধরে রাখতে পেরেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উত্থানের পর মানুষের চারিত্রিক সঙ্কটটা আরো প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। মানুষের অনলাইন ও অফলাইন চরিত্রের ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে গেছে। আল্লাহ পাক প্রতিটি মুসলিমকে উত্তম চরিত্রের শক্তিতে সমৃদ্ধ হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।

একজন মুসলিম তার অবস্থান ও যোগ্যতা সম্পর্কে সচেতন থাকবেন

হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “মানুষের মাঝে অচিরেই এমন একটা সময় আসবে যখন ধোঁকাবাজি বাড়বে। তখন মিথ্যাবাদীকে সত্যবাদী মনে করা হবে, আর সত্যবাদীকেই মিথ্যাবাদী মনে করা হবে। আমানতদারকে খিয়ানতকারী মনে করা হবে, আর খিয়ানতকারীকেই আমানতদার মনে করা হবে। আর তখন রুয়াইবিদারা কথা বলবে।” 

আল্লাহর রাসূলকে জিজ্ঞাসা করা হলো: রুয়াইবিদা কারা? তিনি বললেন, সাধারণ মানুষের কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করে এবং সকল বিষয়ে কথা বলে এমন ব্যক্তি।; (ত্বাবারানি, কিতাবুল ফিতান, বাব সিদ্দাতুয যামান-২/৩২৬১)। হাদিসের অন্য বর্ণনায় রয়েছে, জিজ্ঞাসা করা হলো, রুয়াইবিদা কে? রাসূল সা. বললেন, ‘অপদার্থ ব্যক্তি।’ (আহমাদ)

প্রকৃতই যিনি মুসলিম তিনি সব বিষয়ে সরব হবেন না। অন্যের বিষয়ে নাক গলাবেন না। যতটুকু জানেন, তার বাইরে কথা বলবেন না। সকল বিষয়ে পাণ্ডিত্য দেখানোর চেষ্টা করবেন না। তিনি তার অবস্থান, যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে সচেতন থাকবেন।

একজন মুসলিম নিজের জন্য এবং অপরের জন্য আশা ছাড়বেন না

জুন্দুব ইবনে আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, একজন বলল, আল্লাহর কসম! আল্লাহ অমুককে ক্ষমা করবেন না।’ আল্লাহ তায়ালা এর প্রতিক্রিয়ায় বললেন,  ‘কে সে যে আমার উপর কসম খায় এ মর্মে যে, আমি অমুককে ক্ষমা করব না। আমি বরং তাকেই ক্ষমা করলাম এবং ঐ কসমকারীর কৃতকর্ম নষ্ট করে দিলাম!’ (মুসলিম-৬৮৪৭)

একজন মুমিনের নিজের জন্য যেমন নিরাশ হওয়া উচিত নয়। তেমনি অপরের ক্ষমাপ্রাপ্তির বিষয়েও হতাশ হওয়া কাম্য নয়। অপরের জন্য নেতিবাচক চিন্তা করারও দরকার নেই। প্রকৃত মুমিন সবসময়ই আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রাখবে এবং আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে কখনোই নিরাশ হবে না।

ভালো কাজের আদেশ করা এবং মন্দকে নিষেধ করা

আবু সাইদ আল খুদরি রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. একদিন ভাষণ দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। ভাষণে তিনি বললেন, “খুব শিগগিরই এমন হবে যে, আমাকে ডাকা হবে আর আমি তাতে সাড়া দেবো। আমার পর যে শাসকরা তোমাদের ওপর আসবে, তারা এমন কথা বলবে যে বিষয়ে তাদের জ্ঞান রয়েছে, এমন আমল করবে যা তারা জানে। তাদের আনুগত্য করা আমার আনুগত্য করার সমতুল্য। এই সময়টি কিছুদিন থাকবে। এরপর যে শাসক আসবে, তারা এমন সব বিষয়ে কথা বলবে যে সম্বন্ধে তাদের জ্ঞান নেই। এমন আমল করে যেগুলো সম্বন্ধেও তাদের স্পষ্ট জ্ঞান নেই। তাই যারা তাদেরকে একনিষ্ঠভাবে সাহায্য করবে, শক্তিশালী করবে, তারা নিজেরাও ধ্বংস হবে আর অন্যের জন্যও ধ্বংসের কারণ হবে। তাদের মাঝে শারীরিকভাবে যদি থাকতেও হয়, তারপরও আমল ও কার্যক্রম দিয়ে তাদের সাথে দ্বিমত করো। তাদের মাঝে যারা ভালো কাজ করেন তাদের বিষয়ে সাক্ষ্য দিও যে তারা উত্তম আমলকারী। আর যারা মন্দ কাজ করছেন তাদের অনিষ্টতার ব্যাপারেও সাক্ষ্য দিও।” (বায়হাকি-১৯১)

শত্রুতা ও ঘৃণার বিস্তারে সতর্ক থাকা

হজরত জাবির বিন আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেছেন, নিশ্চয়ই আরব উপদ্বীপের মানুষজন আল্লাহর ইবাদতে সম্পৃক্ত হওয়ায় শয়তান নিরাশ হয়ে পড়েছে তবে এই ইবাদতকারীদের মধ্যে বিভাজন ও শত্রুতা উসকে দেয়ার বিষয়ে সে এখনো হতাশ হয়নি। (মুসলিম-৬৭৫২)

এ কারণেই মানুষকে জিহবার ব্যবহারে মাত্রাতিরিক্ত সতর্ক হতে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কেননা, জিহবার অপব্যবহারের কারণে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কগুলোতে রীতিমতো আগুন লেগে যায়। শয়তান অবশ্য এমনটাই চায়। দু’জন মুসলিম যখন পরস্পরের সমালোচনায় মত্ত হয়, একে অপরের সাথে ঝগড়া করে, কিংবা তাদের মধ্যে যখন বিভাজন তৈরি হয়- তা দেখে শয়তান স্বস্তি পায়, আনন্দিত হয়। একজন মুসলিমের এমন কাজ করা উচিত নয় যাতে অনিষ্টতা ও বিপদের মাত্রা বেড়ে যায়।

মুমিন বান্দা ফিতনা থেকে দূরে থাকবেন

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেছেন, তোমরা তখন কী করবে যখন ফিতনা তোমাদেরকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরবে? যখন যুবকেরা শক্তিশালী হবে আর বৃদ্ধরা নাজুক অবস্থানে চলে যাবে। এমনটা তখনই হবে যখন তোমরা সুন্নাহ ত্যাগ করবে। প্রশ্ন করা হলো, হে রাসূল! এমনটা কখন ঘটবে?’ তিনি বললেন, “যখন তোমাদের মধ্য থেকে আলেমরা চলে যাবেন, অজ্ঞের সংখ্যা বেড়ে যাবে। তিলাওয়াতকারীর সংখ্যাও অনেক বাড়বে তবে দ্বীনের সঠিক বুঝদার লোক কমে যাবে। যখন তোমাদের নেতা হবে অনেক, তবে তার মধ্যে আস্থাভাজনের সংখ্যা হবে নেহাতই কম। এবং যখন পরকালীন কর্মকাণ্ডকে ব্যবহার করে জাগতিক ফায়দা অন্বেষণ করা হবে এবং দ্বীন ছাড়া অন্য কিছুর জন্য জ্ঞান অন্বেষণ করা হবে।” (আল হাকিম-৪/৫১৪)

এই হাদিসটি থেকে বোঝা যাচ্ছে, ফিতনা থেকে দূরে থাকার সর্বোত্তম উপায় বা কৌশল হলো রাসূল সা.-এর সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে রাখা। একজন মুসলিম তাই সবসময় আল্লাহর দেওয়া বিধান ও রাসূলের সা. রেখে যাওয়া সুন্নাতকে অনুসরণ করার চেষ্টা করে। একইসাথে, ফিতনা থেকে হেফাজতে থাকার জন্যও নিয়মিতভাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।

ইসলামিক ব্যক্তিত্ব মানেই পরিচ্ছন্ন ও স্বতন্ত্র এক ব্যক্তিত্ব। কুরআন ও সুন্নাহর আদলেই এই ব্যক্তিত্ব সঠিক রূপ লাভ করে। ইসলামী ব্যক্তিত্ব মানেই একনিষ্ঠ ও দৃঢ়চেতা ব্যক্তি যিনি উত্তম শিক্ষায় শিক্ষিত, ইসলামী শিষ্টাচারের মাধ্যমে সংশোধিত। তার মধ্যে দ্বীন অনুশলীনে দুর্বলতা থাকতে পারে তবে ন্যূনতম অনাগ্রহ থাকবে না। থাকার সুযোগই নেই। আলোচিত হাদিসগুলোকে যথাযথভাবে অনুসরণ করার মাধ্যমে আমাদের প্রকৃত ইসলামী ব্যক্তিত্ব হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই প্রচেষ্টায় সফলতা দান করুন। আমিন। 

(শায়খ হাসান আলী আবদুল হামিদের ‘হাদিস অন পার্সোনালিটি’ প্রবন্ধ থেকে অনুপ্রাণিত)

লেখক : সাংবাদিক, অনুবাদক ও কলামিস্ট

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির