post

অর্থনীতি বনাম ইসলামী অর্থনীতি একটি সুরভিত পাঠ

হামিদুর রশিদ জামিল

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

মানবজীবন অর্থব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত বিধায় এ নিয়েই গুরুত্বপূর্ণ সবকিছু আবর্তিত হয়। এ জন্য যুগে যুগে অর্থব্যবস্থা আলোচনার ধারা চলে আসছে। অর্থের উপর ভিত্তি করে সেকাল থেকে একাল পর্যন্ত বিশ্ব শাসনের মহড়া দিতে দেখা যায়। একমাত্র ইসলামী শাসন ছাড়া অন্য সবক্ষেত্রে এ অর্থব্যবস্থা মানুষের উপর ছড়ি ঘুরানোর কাজে ব্যবহৃত হয়েছে ও তাদের দর্শনই ছিল ভোগ ও দখল। প্রচলিত অর্থব্যবস্থায় অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আকাক্সক্ষা ক্রেতাদের ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং কিছু লোকের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত করে সমাজে আয় বৈষম্য (Income inequality) সৃষ্টি করে, যা ইসলামী অর্থনীতি সমর্থন করে না। ইসলামী অর্থনীতির মূল থিম হচ্ছে, ইসতিহসান তথা জনকল্যাণ। যে সমাজে মানুষ একে অপরের কল্যাণ কামনা করবে ও সকলের সমান অধিকার থাকবে। এ অর্থব্যবস্থায় সম্পদ উপার্জন, উৎপাদন ও ভোগের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু কোনো বিধি-বিধান না থাকায় সমাজে আর্থিক সমতার স্থলে হত-দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং ধনী ইত্যাদি বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি করেছে। যা কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে অক্ষম। সকল অর্থব্যবস্থার একমাত্র লক্ষ্য হলো সমাজের দারিদ্র্য বিমোচন করা। এ লক্ষ্য নিশ্চিত করার জন্য প্রচলিত অর্থব্যবস্থা সর্বদাই দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে (Vicious Circle of Poverty) বদ্ধাবস্থায় থাকে। ইসলাম সমষ্টিগত কল্যাণ চায়, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি-গোষ্ঠীর নয়। আধুনিক অর্থনীতির দর্শনে মূল্যবোধ বিবেচিত হয় না এবং ইহজগৎ ও পরজগতের দৃষ্টিকোণ থেকে সামগ্রিক কল্যাণের মূল লক্ষ্যও বিবেচিত হয় না। ইসলাম সমষ্টিগত কল্যাণ চায়, কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি-গোষ্ঠীর নয়। আধুনিক অর্থনীতির দর্শনে মূল্যবোধ বিবেচিত হয় না এবং ইহজগৎ ও পরজগতের দৃষ্টিকোণ থেকে সামগ্রিক কল্যাণের মূল লক্ষ্যও বিবেচিত হয় না।

আলফ্রেড মার্শাল তার বই Principles of Economics (1890)-এ অর্থনীতির সবচেয়ে জনপ্রিয় সংজ্ঞা দিয়েছেন। তার মতে, ‘অর্থনীতি মানুষের জীবনের সাধারণ ঘটনাবলি নিয়ে আলোচনা করে। এটা সম্পদ আহরণ এবং এর ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করে। সুতরাং একদিক দিয়ে এটা মানুষের সম্পদ নিয়ে আলোচনা করে অন্য দিকে এর গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটা মানুষের জীবনের একটি অংশ নিয়ে আলোচনা করে।’

অ্যাডাম স্মিথ ১৭৭৬ সালে ‘An Inquiry into the Nature and Causes of the Wealth of Nations’ নামক গ্রন্থ লিখে অর্থনীতির মূল বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা দেন- অ্যাডাম স্মিথ বলেন, ‘অর্থনীতি হচ্ছে এমন এক বিজ্ঞান যা জাতিসমূহের সম্পদের প্রকৃতি এবং তার কারণ অনুসন্ধান করে।’

ইসলামী অর্থনীতি হলো কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক অর্থনৈতিক লেনদেন ব্যবস্থা। ইসলামি কৃষ্টি ও তমদ্দুন সমৃদ্ধ যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে তাই ইসলামি অর্থনীতি। 

প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন বলেন- ইসলামী অর্থনীতি হলো জনসাধারণের সাথে সম্পর্কিত বিজ্ঞান।

‘আল্লাহর বিশ্ব-প্রতিপালন নীতির অনুসরণে সৃষ্টির লালন-পালনের জন্য সমুদয় জাগতিক সম্পদের সামগ্রিক এবং কল্যাণধর্মী ব্যবস্থাপনাই ইসলামী অর্থনীতি। সৃষ্টজীবের কল্যাণের জন্য সম্পদের সর্বাধিক উৎপাদন, সুষ্ঠু বণ্টন, ন্যায়সঙ্গত ভোগ বিশ্লেষণই হলো ইসলামী অর্থনীতি।’

“Islamic economics is the knowledge and application of injunctions and rules of the Shariah that prevent injustice in the acquisition and disposal of material resources in order to provide satisfaction to human beings and enable them to perform their obligations to Allah and the society.“

বর্তমান বিশ্বে যেসব অর্থব্যবস্থা চালু রয়েছে, তার ছোট-খাটো পার্থক্য বাদ দিলে বলা চলে, মোট তিন প্রকার অর্থব্যবস্থা বিশ্বে চালু আছে। আর তা হলো- (১) ইসলামী অর্থব্যবস্থা (২) ধনতান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা (৩) সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (BDRI) তথ্য অনুযায়ী দেশের ৫০ শতাংশ পরিবার বছরের কোন না কোন সময় খাদ্যসঙ্কটে থাকে, ২৫ শতাংশ নিয়মিতভাবে সারা বছর খাদ্য পায় না, ১৫ শতাংশ পরিবার সবসময় পরবর্তী খাবার নিয়ে চিন্তিত থাকে এবং ৭ শতাংশ মানুষ কখনোই তিন বেলা খেতে পায় না। বর্তমানে দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ অতিদরিদ্র। প্রায় ২৮ শতাংশ মানুষ এক ডলারের কম আয়ে জীবনযাপন করছে। বিশ্বে প্রতিদিন না খেয়ে থাকে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ। অথচ উন্নত বিশ্বে প্রতি বছর খাদ্য অপচয় হয় ২২ কোটি টন।

“I originated during the Golden Age of Islam, 622-661 CE, when the Prophet Muhammad and the Rashidun practiced Òbrotherly cooperation”

ইসলামী স্বর্ণযুগে ৬২২-৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে ইসলামী অর্থনীতির সূচনা হয়েছিল, যখন মহানবী সা. এবং খোলাফায়ে রাশেদীন অর্থনীতিতে ‘ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সহযোগিতা’ চর্চা করেছিলেন।

ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের ফলে আধুনিক পুঁজিবাদী বা ধনতন্ত্রবাদের (Capitalism) উৎপত্তি হয়। যে বিরাট সম্পদের ও মূলধনের সৃষ্টি হয়, তা মুষ্টিমেয় মালিক শ্রেণির হাতে থাকার ফলেই ধনতন্ত্রের উৎপত্তি হয়। ইংল্যান্ডে ১৭৬০-১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ শিল্প বিপ্লবের বিকাশ হলেও ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দের পর এর ফ্রান্স ও জার্মানি প্রভৃতি দেশে দ্রুত বিকাশ ঘটে। শিল্প বিপ্লবের ফলে কল-কারখানা স্থাপিত হলে কুটিরশিল্প ধ্বংস হয়। এভাবে এক পুঁজিবাদী শ্রেণির উদ্ভব হয়। একই সময়ে অর্থনীতির জনক অ্যাডাম স্মিথ ও তার অনুসারীরা এ অর্থনীতির দৃঢ় প্রবক্তা ও সমর্থক হিসাবে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন। যেমন: যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি, ডেনমার্ক, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, ফ্রান্স ইত্যাদি।

Capitalism is an economic system where private entities own the factors of production.

১৭৬০ সাল থেকে ১৮৮০ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডে সংঘটিত শিল্প-বিপ্লবই আধুনিক ধনতান্ত্রিক ধারণার জননী। ব্রিটেনের শিল্প বিপ্লবের পূর্বে ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার তেমন পরিচিতি ছিল না। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে শিল্প কারখানার মালিক সর্বাধিক মুনাফা লাভের আশায় তার প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে থাকে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় জনসাধারণের কল্যাণ ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রশ্নই ছিল না। এ জন্য মিল-কারখানায় যেসব পণ্য উৎপাদিত হতো সেগুলো ন্যূনতম মজুরিতে সর্বাধিক উৎপাদন এবং ব্যক্তিস্বার্থের নীতিতে উৎপাদন করা হতো। ফলে উৎপাদিত পণ্য দ্বারা গুদামগুলো ভরে গেল। অপর দিকে রফতানির পথ সীমিত হওয়ায় এসব পণ্য গুদামে নষ্ট হতে লাগল। কিন্তু পণ্যের এরূপ প্রাচুর্য হওয়া সত্ত্বেও শ্রমিক ও গরিবরা এসব দ্বারা কোনো প্রকার উপকৃত হলো না। পণ্য উৎপাদনের প্রাথমিক যুগে যেমন তারা নিজেদের প্রয়োজনে এসব পণ্য কিনতে পারত না, তেমনি প্রাচুর্যের সময়েও তারা এসব কেনার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত রইল। পুঁজিবাদের উদ্ভাবিত সর্বশেষ কৌশল হলো বিশ্বায়ন (Globalization) ও উদারীকরণ (Liberalization)।

অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে ইউরোপীয়দের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার পালা আরম্ভ হয়। অবশেষে ভারতের মতো বিরাট দেশও তাদের উপনিবেশে পরিণত হয়। অল্পদিনের মধ্যে সারা পৃথিবী ব্রিটিশ ও অন্যান্য পুঁজিবাদী শক্তির বাণিজ্যিক বাজারে রূপান্তরিত হয়।

অর্থনীতিবিদ জে. এফ. র‌্যা গান ও এল. বি. থমাস বলেন, ‘Pure Capitalism is characterized by Private ownership of resources and by reliance on market, in which buyers and sellers come together and determine what quantities of goods and resources are sold and at what price’. 

পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার প্রধান  বৈশিষ্ট্য হলো- ১. জড়বাদী দৃষ্টিভঙ্গি ২. ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রদর্শন ৩. অবাধ ব্যক্তি স্বাধীনতা ৪. উন্মুক্ত ও অবাধ অর্থনীতি ৫. ব্যক্তির নিরঙ্কুশ মালিকানা ৬. লাগামহীন চিন্তার স্বাধীনতা ৭. গণতন্ত্রের নামে বুর্জোয়া শ্রেণির শাসন ৮. পুরোপুরি সাম্রাজ্যবাদী।

‘সোস্যলিজম’ তথা ‘সমাজতন্ত্রবাদ’ শব্দটি ১৮২৭ সালে ইংল্যান্ডে রবার্ট ওয়েন (১৭৭১-১৮৫৮) কো-অপারেটিভ ম্যাগাজিনে প্রথম ব্যবহার করেন। কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলস্-এর যুগান্তকারী লেখা ‘কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো’ ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমাজতন্ত্রের বিপ্লব জেগে উঠতে শুরু করে। এরই ফলে বিশ্বে সর্বপ্রথম রাশিয়ায় ১৯১৭ সালে জারতন্ত্রের পতন ও লেনিনের নেতৃত্বে সমাজতন্ত্রের উত্থান হয়। পরবর্তীতে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদ ‘মাও-সে-তুং’ এর নেতৃত্বে চীনেও এ অর্থব্যবস্থার প্রয়োগ ঘটে। এতে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষ (Central Planning Authority) কর্তৃক দেশের উৎপাদন, বিনিময়, বণ্টন, ভোগ প্রভৃতি সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পদিত হয়।

পল এ. স্যামুয়েলসনের মতে, ‘Socialism refers to the government ownership of the means of production, planning by the government and income distribution.

অতএব যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সম্পদের রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠিত এবং কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন। 

সমাজতন্ত্র : চারটি সময়কাল

১. (১৭৮০-১৮৫০): ইউরোপীয় দর্শন

২. (১৮৩০-১৯১৬): কমিউনিস্ট আন্দোলনের উত্থান

৩. (১৯১৬-১৯৮৯): সমাজতান্ত্রিক নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে এর প্রতিক্রিয়া

৪. (১৯৯০-): নয়া-উদার যুগে সমাজতন্ত্রের প্রতিক্রিয়া

কার্ল মার্কস-এর Das Kapital (Capital) এর Surplus Value তত্ত্বের আলোকে ১৯১৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সারা বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক মতবাদ ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। যথা: রাশিয়া, চীন, কিউবা, জার্মানি, পোল্যান্ড ইত্যাদি। 

উইঘুরদের (চীনে মুসলমানদের উইঘুর ও হুই বলা হয়) নাম-নিশানা মুছে ফেলার সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়া হয়। সমাজতন্ত্রের ইতিহাস সীমাহীন রক্তপাত, ধ্বংসযজ্ঞ, নির্যাতন, প্রতারণা ও ছলনার ইতিহাস। চীন তার ব্যতিক্রম হবে কি?

সমাজতন্ত্রের  বৈশিষ্ট্যাবলি : ১. দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ ২. ধর্মের উৎখাত ৩. ব্যক্তি স্বাধীনতার উচ্ছেদ ৪. নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি ৫. রাষ্ট্রীয় নিরঙ্কুশ মালিকানা ৬. চিন্তার পরাধীনতা ৭. সর্বহারার নামে একদলীয় শাসন ৮. তাত্ত্বিকভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী হলেও বাস্তবে সাম্রাজ্যবাদী।

- পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা ব্যক্তিমালিকানায় সীমাহীন অধিকারের ভিত্তিতে অবাধ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ইচ্ছামত সম্পদ উপার্জন ও ভোগের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

- সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার লক্ষ্য পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার তুলনায় অধিকতর সুষ্ঠু উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ জনগণের যথাযথ আনুগত্যের উপর ভিত্তি করে পলিসি অবলম্বন করে।

- আর ইসলামী অর্থব্যবস্থা এমন একটি সামাজিক বিজ্ঞান যা পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে শুধু মানুষের বস্তুগত জীবনের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণজনিত ইতিবাচক অর্থনীতিকে (চড়ংরঃরাব ঊপড়হড়সরপং) ব্যাখ্যা করে না, বরং ইহকাল ও পরকালের সমন্বিত কল্যাণ লাভের জন্যই মানবিক ন্যায়নীতিকেও বিশ্লেষণ করে।

- ইসলামী অর্থনীতি এই দুই মেরুর অর্থব্যবস্থার মাঝে সমন্বয় সাধন করে সমৃদ্ধশালী, সার্বজনীন কল্যাণকামী সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা পালন করে।

- প্রচলিত অর্থব্যবস্থা (পুঁজিবাদী ও সমাজতন্ত্র) মানবসৃষ্ট ও সময়ের সাথে সাথে সংশোধন ও পরিমার্জনযোগ্য। নয়া ক্লাসিক্যাল (Neo-Classical) অর্থনীতিবিদের জনক অ্যাডাম স্মিথ (Adam Smith) বলেন, ‘Economic laws are to be compared with the laws of tides rather than with the simple and exact laws of gravitation. কিন্তু ইসলামী অর্থব্যবস্থার নিয়ম-কানূন চিরন্তন সত্য এবং স্থির, যা স্বয়ং আল্লাহ্ কর্তৃক প্রদত্ত।

- পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় ধনীরা আরো ধনী হয় এবং গরিবেরা আরো গরিব হয়। সমাজতন্ত্রে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অর্থনৈতিক সব সিদ্ধান্তের কার্যক্রম গৃহীত হয়। ইসলামের এই নীতি বাস্তবায়ন হলে সম্পদের সুষম ও সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হবে। আল্লাহ্ বলেন, ‘নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে, সবই আল্লাহর।’ (সূরা বাকারাহ ২/২৮৪)

- পুঁজিবাদী ও সমাজতন্ত্রে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী হওয়ায় সমাজে শ্রেণী সংঘাত উপস্থিত হয়। ধনী-গরিবের ব্যবধান ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। অন্য দিকে ইসলামী অর্থব্যবস্থায় মানুষ শুধু সম্পদের আমানতদার হিসেবে সর্বক্ষেত্রে মানবিক সৎ গুণাবলির চর্চা করে।

- পুঁজিবাদী ও সমাজতন্ত্রে উৎপাদনের লক্ষ্য থাকে মুনাফা অর্জন ও রাষ্ট্রীয় অগ্রগতি সাধন করা। কিন্তু ইসলামী অর্থনীতিতে উৎপাদন করা হয় সমস্ত মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রেখে।

- পুঁজিবাদে জনগণের জন্য ক্ষতিকর যেমন: মদ, গাঁজা, আফিম,  হেরোইন, ইয়াবা প্রভৃতি উৎপাদন হতে পারে। আর ইসলামী অর্থনীতিতে কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে উৎপাদন পরিচালিত হয়।

- প্রচলিত অর্থব্যবস্থা সুদের লেনদেনকে বৈধ বিবেচনা করে আর এটি সমাজে ধন  বৈষম্যের জন্ম দেয়, উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে না। ১৯৩০ সালের মহামন্দার মূল কারণও ছিল সুদের হার।  জাবির রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল সা. সুদদাতা, গ্রহীতা এবং এর লেখক ও সাক্ষীদ্বয়কে অভিশাপ দিয়েছেন।’

- পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় মালিকের হাতে সম্পূর্ণভাবে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকায় শ্রমিক তার পরিশ্রমের তুলনায় মজুরি পায় না। ইসলামী শ্রমনীতিতে মালিক, ব্যবস্থাপক ও শ্রমিক পরস্পর ভাই হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন ‘শ্রমিকের দেহের ঘাম শুকানোর পূর্বে তোমরা তার মজুরি দিয়ে দাও।’ 

- ইসলামী অর্থনীতি জাকাতভিত্তিক। জাকাতের অর্থ গরিব, অসহায়, ফকির, দরিদ্র ও নিঃস্ব লোকের মধ্যে বণ্টন করলে ধনী-গরিবেব মধ্যে সম্পদের বৈষম্য থাকে না।

প্রচলিত অর্থনীতি মানবসৃষ্ট; যার উপর ভিত্তি করে কোন দেশের অর্থনীতি সামগ্রিক কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না ও দারিদ্র্যের সংখ্যা দিনে দিনে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কুফল হিসাবে বিশ্বব্যাপী মহামন্দা শুরু হয় ১৯২৯ সালে এবং শেষ হয় ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে। এটা বিংশ শতাব্দীর দীর্ঘ সময়ব্যাপী ও ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী মন্দা। একবিংশ শতাব্দীতে মহামন্দাকে বিশ্ব অর্থনীতির পতনের উদাহরণ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সা. প্রবর্তিত ইনসাফভিত্তিক অর্থব্যবস্থা অনুসরণ করে আব্বাসীয় যুগে ইসলামী সাম্রাজ্য প্রভূত আর্থিক উন্নতি সাধন করেছিল, এ কথা ঐতিহাসিক সত্য। সে যুগে যে শান্তি ও প্রগতি স্থাপিত হয়েছিল তাতেই প্রমাণিত হয়, ইসলামী অর্থনীতি ব্যবস্থা আধুনিক অর্থনীতির চেয়ে অনেক বেশি সমাজকল্যাণমূলক। বর্তমানে বিজ্ঞানের যুগে ইসলামী অর্থনীতির সুফল আরো ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম। প্রচলিত অর্থব্যবস্থায় আধুনিক করব্যবস্থা যেরূপ কর ফাঁকি ও অসম বণ্টনের সম্মুখীন হচ্ছে তা ইসলামী ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। কারণ এটা আল্লাহর সৃষ্ট অর্থনীতি হওয়ার কারণে এটা নির্ভুল, নিরপেক্ষ ও সর্বোৎকৃষ্ট। Dennis Sarant তাঁর ‘History of Religion’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘ইসলাম আধুনিক বিশ্বে টিকে থাকতে সম্পূর্ণ সক্ষম। এর মহান নীতিসমূহ সহজ ও যুক্তিপূর্ণ’। 

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাবি

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির