post

ইসলামে শ্রমিকের অধিকার

এম মুহাম্মদ আব্দুল গাফ্ফার

০৯ মে ২০২৩

ইংরেজি বর্ষপঞ্জির ১লা মে হলো আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। এ দিবসের ঐতিহাসিক পটভূমিকা হলো ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার শিকাগো শহরের ‘হে’ মার্কেটে শ্রমিকেরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি এবং বিভিন্ন  সুযোগ সুবিধার দাবিতে মালিকদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণ করে। কারণ শ্রমিকদের ছিল না সাপ্তাহিক কোনো ছুটি। ছিল না চাকুরির স্থায়িত্ব ও ন্যায়সঙ্গত মজুরীর নিশ্চয়তা। মালিকরা তাদের ইচ্ছামত শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিত। এমনকি দৈনিক ১৮-২০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতেও বাধ্য করত শ্রমিকদের। এ অন্যায়, বঞ্চনা ও জুলুমের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকরা পর্যায়ক্রমে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। এ আন্দোলনের অংশ হিসাবে ‘আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার’-এর ১৮৮৫ সালের সম্মেলন থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৮৮৬ সালের ১লা মে আমেরিকা ও কানাডার প্রায় তিন লক্ষাধিক শ্রমিক শিকাগোর ‘হে মার্কেটে’ ঢালাই শ্রমিক, তরুণ নেতা এইচ সিলভিসের নেতৃত্বে এক বিক্ষোভ সমাবেশের মাধ্যমে সর্বপ্রথম সর্বাত্মক শ্রমিক ধর্মঘট পালন করে। শ্রমিকদের সমাবেশ চলাকালে মালিকদের স্বার্থ রক্ষাকারী পুলিশ ও কতিপয় ভাড়াটিয়া গুন্ডা সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে অতর্কিতভাবে গুলি করে ৬ জন শ্রমিককে নৃশংসভাবে হত্যা ও শতাধিক শ্রমিককে আহত করে। কিন্তু  কোনোভাবেই শ্রমিকরা দমে যায়নি। তাদের ইস্পাতকঠিন ঐ সফল ধর্মঘটের কারণে কোনো কোনো মালিক ৮ ঘণ্টা কর্ম সময়ের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। ফলে শ্রমিকরা আরো উৎসাহী ও আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠে এবং সর্বস্তরে ৮ ঘণ্টা কর্ম সময়ের দাবী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২রা মে রবিবারের সাপ্তাহিক বন্ধের পর ৩ তারিখেও ধর্মঘট অব্যাহত রাখে। পরদিন ১লা মে-র নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আয়োজিত ৪ঠা মে শিকাগো শহরের ‘হে’ মার্কেটের বিশাল শ্রমিক সমাবেশে আবারো মালিকগোষ্ঠীর গুন্ডা ও পুলিশ বাহিনী বেপরোয়াভাবে গুলি বর্ষণ করে। এতে ৪ জন শ্রমিক নিহত ও বিপুল সংখ্যক আহত হয়। রক্তে রঞ্জিত হয় ‘হে’ মার্কেট চত্বর। গ্রেফতার করা হয় শ্রমিক নেতা স্পাইজ ও ফিলডেনকে। ঘটনার এখানেই শেষ নয়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে রীতিমত ‘চিরুনী অভিযান’ চালিয়ে শিকাগো শহর ও এর আশপাশের এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী ফিশার, লুইস, জর্জ এঞ্জেল, মাইকেল স্কোয়ার ও নীবেসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ শ্রমিক নেতাকে। পরবর্তীতে শ্রমিকদের এই ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনের বিরোধিতাকারী মালিকপক্ষের ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ‘জুরি’ গঠন করে ১৮৮৬ সালের ২১ জুন শুরু করা হয় বিচারের নামে প্রহসন। একতরফা বিচারের মাধ্যমে ১৮৮৬ সালের ৯ অক্টোবর ঘোষিত হয় বিচারের রায়। রায়ে বিশ্বজনমতকে উপেক্ষা করে শ্রমিক নেতা পার্সন্স, ফিলডেন, স্পাইজ, লুইস, স্কোয়ার, এঞ্জেল ও ফিশারের বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ প্রদান করা হয় এবং ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর সে আদেশ কার্যকর করা হয়। শ্রমিক নেতা ও কর্মী হত্যার এ দিবসটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে প্রতিবছর ১লা মে ‘শ্রমিক হত্যা দিবস’ ও ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’ হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। দৈনিক ৮ ঘণ্টা কার্য সময় ও সপ্তাহে একদিন সাধারণ ছুটি প্রদানের ব্যবস্থা করে প্রথম শ্রম আইন প্রণীত হয়। অন্যদিকে নারকীয় এ হত্যাযজ্ঞ গোটা বিশ্বের শ্রমিকদের অধিকারে এনে দেয় নতুন গতি। শিকাগো শহরে সৃষ্ট এ আন্দোলন ক্রমশ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। পৃথিবীর সকল শ্রমজীবী মানুষ এ আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয় ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ শ্লোগানটি। সেই সাথে ১৩৬ বছর আগে ঘটে যাওয়া সে ঘটনাটির কথা এখন প্রতিবছর বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণ করা হয়ে থাকে ‘বিশ্ব শ্রমিক দিবস’ বা ‘মে দিবস’ হিসাবে। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের এ সংগ্রাম বিশ্বব্যাপী যে আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল তার কারণেই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ওই তারিখটাকে শ্রমিক দিবসের মর্যাদা দান করেছে।

শ্রমিকের এ ন্যায্য অধিকারের বিষয় যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাবো যে, মূলত ইসলামেই শ্রমিকদের যথাযথ পাওনা পরিশোধ পূর্বক তাদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিতের ঘোষণা দিয়েছে। শ্রমিকদের মর্যাদা প্রসঙ্গে মহানবী সা. ঘোষণা করেন ‘আল কাসিবু হাবিবুল্লাহ’ অর্থাৎ শ্রমিক হলো আল্লাহর বন্ধু। আল্লাহর রাসূল সা. দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন- শ্রমিককে তার শরীরের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তাকে ন্যায্য পারিশ্রমিক দিয়ে দাও। এ কথা হাদিসগ্রন্থসমূহে পরিষ্কারভাবে এসেছে যে, মানুষ হিসেবে আল্লাহর রাসূল সা. পারিবারিক কাজ কর্মসমূহ সম্পাদনে রত থাকতেন। যখন আজান হতো তখন তিনি সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যেতেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে যদি আমরা বিচার করি তাহলে দেখতে পাবো যে, আল্লাহর রাসূল সা.ও একজন শ্রমিক ছিলেন।

মহানবী সা.-এর সাহাবিগণও আল্লাহর রাসূল সা.-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলতেন। মহানবী সা.-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরামগণ প্রশাসনের সর্বোচ্চ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত থেকেও সাধারণ শ্রমিকের ন্যায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। 

আল্লাহর রাসূল সা. বিদায় হজের দিন আরাফাতের মাঠে দাঁড়িয়ে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন ‘তোমরা যা খাবে ও পরবে তোমাদের অধীনস্থ চাকর চাকরানীদেরকেও তা খেতে ও পরতে দেবে। তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো কাজ তাদের ওপর চাপানো যাবে না।’

এ সম্পর্কিত একটি বিখ্যাত হাদিস এ রকম হজরত আবু হুরাইরা রা. নবী করীম সা. থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী করীম সা. বলেছেন- আল্লাহ তায়ালা বলেন: কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফরিয়াদি হবো। ১. যে ব্যক্তি আমার নামে দান করার ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করেছে, ২. যে ব্যক্তি কোনো স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করেছে, ৩. আর যে ব্যক্তি কোনো শ্রমিককে কাজে নিযুক্ত করে তার কাছ থেকে পুরোপুরি কাজ আদায় করেছে, আর তার মজুরি পরিশোধ করেনি।’ (বুখারি-২২২৭)।

মহানবী সা. শ্রমিক, খাদিম ও চাকর-চাকরানীদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে সবাইকে কঠোরভাবে নির্দেশ দান করতেন। এ মর্মে আরেকটা হাদিস এভাবে এসেছে ‘আবু আলী সুয়াইদ ইবনে মুকরিন রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- আমি বনি মুকরিন গোত্রের সাত ব্যক্তির মধ্যে সপ্তম ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে দেখেছি। আমাদের সবার একটিমাত্র খাদিম (সেবাকারী) ছিল। আমাদের মধ্যে ছোট ব্যক্তি যে ছিল সে খাদিমকে থাপ্পড় দিয়েছিল, তাই রাসূল সা. খাদিমটাকে মুক্ত করে দেওয়ার জন্য আমাদেরকে নির্দেশ দিলেন।’ (মুসলিম)।

মহানবী সা.-এর আরেকটি হাদিসের বর্ণনায় এসেছে আবু মাসউদ বদরী থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন- আমি আমার এক গোলামকে (দোষের কারণে) চাবুক দিয়ে মারছিলাম, হঠাৎ পেছন থেকে শব্দ শুনতে পেলাম- সাবধান; আবু মাসউদ! রাগে উত্তেজিত থাকার কারণে আমি শব্দটা বুঝতে পারলাম না। নিকটে আসতে আমি বুঝলাম তিনি আল্লাহর রাসূল সা.। তিনি বলছেন তুমি তোমার ক্রীতদাসের ওপর যতটুকু ক্ষমতার অধিকারী, তোমার ওপর আল্লাহ তা অপেক্ষাও অধিক ক্ষমতার অধিকারী। অন্য বর্ণনামতে রাসূল সা.-এর ভয়ে আমার হাত থেকে চাবুকটি পড়ে গেল। আমি বললাম- হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একে আমি দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে দিলাম। রাসূল সা. বললেন- যদি তুমি এটা না করতে, জাহান্নামের আগুন তোমাকে বেষ্টন করে নিতো।’ (মুসলিম-১৬৫৯)।

মহানবী সা.-এর সাথে যারা আল্লাহর দ্বীন কায়েমের সুমহান দায়িত্ব পালন করেছেন তারাও শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিরামহীন চেষ্টার ত্রুটি করেননি। বিশ্বনবী সা.-এর সকল সাহাবায়ে আজমাঈনগণ এ বিষয়ে খুবই সচেতন ছিলেন। প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু যর গিফারী রা. তিনি নিজে যে ধরনের কাপড় পরিধান করতে তাঁর চাকরকেও সে ধরনের কাপড় ব্যবহার করতে দিতেন। খাদ্য, পানীয়সহ যাবতীয় অন্ন বস্ত্রের ক্ষেত্রে সাহাবিগণের রা. নিয়মনীতি ছিল অনন্য দৃষ্টান্ত।

সহীহ আল বুখারিতে এসেছে মহানবী সা.-এর বিখ্যাত সাহাবি হজরত মুয়ায ইবনে জাবাল রা. ইশার নামাজের ইমামতির সময় সূরা বাকারার মত দীর্ঘ সূরা তিলাওয়াত করতেন। এক্ষেত্রে একজন শ্রমিক সাহাবি জামায়াত থেকে আলাদা হয়ে একাকী নামাজ আদায় করলে তার বিরুদ্ধে মহানবী সা.-এর নিকট অভিযোগ দায়ের হলো। আল্লাহর রাসূল সা. উক্ত শ্রমিক সাহাবিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে শ্রমিক সাহাবি শারীরিক পরিশ্রমের কারণে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার অপারগতার কথা আল্লাহর রাসূল সা.-কে অবহিত করেন। মহানবী সা. হজরত মুয়ায ইবনে জাবাল রা.-কে ডেকে এ মর্মে সতর্ক করে দেন যে, জামায়াতে ইমামতির সময় দীর্ঘ সূরা তিলাওয়াত না করতে। কারণ জামায়াতে শ্রমিক, বৃদ্ধ, অসুস্থ ও অন্যান্য অসুবিধায় জর্জরিত মুসল্লিগণ থাকতে পারে। তাদের কথা বিবেচনায় রেখে ইমামতি করতে হবে।

এ হাদিসের মর্মার্থটা উল্লেখ করার উদ্দেশ্যটা হলো- একজন শ্রমিক আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা.-এর নিকট কত প্রিয় সে বিষয়টা হৃদয়ঙ্গম করার জন্য। আমরা পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে যদি আমাদের জীবনের সার্বিক সমস্যার সমাধান করি তাহলেই মানবসমাজ সুখী ও সুন্দরের পথ খুঁজে পাবে।

লেখক : সদস্য, দারুল ইসলাম ট্রাস্ট, দরগাহ রোড, সিরাজগঞ্জ

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির