post

জীবনের জন্য প্রার্থনা

ইয়াসিন মাহমুদ

১০ এপ্রিল ২০২৪

বহুমাত্রিক চালচিত্রের সমষ্টিই জীবন। জীবনের সমীকরণ একেকজনের কাছে একেকরকম। জীবন যাপনের পাঠ-পড়াশোনা ও বুঝাপড়াও ভিন্ন। একেকজনের দৃষ্টিভঙ্গিও ভিন্নতর। সম্পূর্ণ আলাদা। জীবনের বিশ্লেষণে কারো কায়দা-কানুন কারো সাথে মিলবে না, এটাই স্বাভাবিক। কারণ, কারো দৃষ্টিভঙ্গি এক হওয়ার নয়। মানুষ হিসাবে সবার আলাদা মত ও পথ থাকতেই পারে। চিন্তার ভিন্নতা তো আরো আপেক্ষিক বিষয়। তবে আমরা যা চিন্তা করি, যা করি; সফলতা-ব্যর্থতা। সবশেষে এক সুবিশাল তোরণের দিকেই আমাদের প্রত্যাবর্তন। সবাইকে পুনরায় মিলিত হতে হবে একই শামিয়ানার নিচে। সবচেয়ে মুখ্য বিষয় হলো- আমি আমার সময়টা কতটা কাজে লাগাতে পারলাম। কতটা পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হলাম। কঠিন মুহূর্ত কিংবা অনুকূল পরিবেশ সবসময়ই নিজেকে কাজে লাগানো। নিজেকে আল্লাহর রাহে নিবেদিত করতে পারার সফলতার কাছে সকল কিছুই ব্যর্থ এবং পরাজিত। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহর ঘোষণা: আর তোমাদেরকে যা কিছু দেয়া হয়েছে, তা দুনিয়ার জীবনের ভোগ্যসামগ্রী মাত্র। আর আল্লাহর নিকট যা আছে, তা উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী। তাদের জন্য যারা ঈমান আনে এবং তাদের রবের ওপর তায়াক্কুল করে। (৪২:৩৬)

জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই প্রকৃতপক্ষে অতুলনীয় মূল্যবান। সময়ের বিচারে কেউ লুকিয়ে থাকতে পারে না। সম্ভবও নয়। আর সে কারণে জীবন ও সময়ের মূল্য সীমাহীন। এ সম্পর্কে হামজা ইউসুফ এর একটি উক্তি এখানে উল্লেখযোগ্য- আমাদের জীবনের সকল কর্মের একটি আধ্যাত্মিক তাৎপর্য আছে, একটি অর্থ আছে। জীবনের কর্ম হচ্ছে মহা সাক্ষাতের প্রস্তুতি। সে মহা সাক্ষাৎ হলো রবের সাক্ষাৎ, যা চূড়ান্ত ও অপরিহার্য।

দুই.

জীবন মানে বহতা নদী। থেমে থাকা যার সাথে যায় না। থেমে থাকলে সে তো নদী হতে পারে না। জীবন মানেও তাই। চলমান ও বহমান। ভালো ও খারাপ সময় দুটিই উপভোগ করতে হয়। আর বসে থাকা সে তো জীবন নয়। জীবনের নাম হলো চলতে শেখা। অবশ্য আমরা না চাইলেও মাঝে মাঝে আমাদের জীবনের গতি স্থবির হয়। গতি কমে যায়। মন্থর গতি। জীবনের এই মুহূর্তটাই আরাধনার সময়। প্রতিটি জীবনেরও আছে নিজস্ব ধরন ও অর্থ। জীবনের দর্শন পাঠ করতে হয় সময়ে সময়ে। জীবনের পরিকল্পনা ও চলার পাথেয় সম্পর্কে স্পষ্ট হওয়া খুব বেশি জরুরি। আর তা না হলে জীবন কঠিন হয়ে ওঠে। জীবনের জন্য প্রার্থনা-

বহতা নদীর মতো আমার এ জীবন

হে আমার রব তুমি করো গো গ্রহণ।

জীবনের গতি দাও জড়তা কেড়ে নাও

 শুধু যেন থেমে থাকি 

 এলে গো মরণ।

-আ জ ম ওবায়েদুল্লাহ

তিন.

মানুষ মানেই তার আবেগ, অনুভূতি এবং নিজস্ব সংস্কৃতি থাকবে। জীবনেরও মানে আছে। এ সম্পর্কে মায়া এঞ্জেলো  বলেন- ‘আমার জীবনের লক্ষ্য কেবল বেঁচে থাকা নয়, বিকশিত হওয়া। জীবন মানে কিছুটা আবেগ, কিছু সহানূভূতি, কিছু রসবোধ ও কিছু স্টাইল।’

মানুষ মানুষকে মনে রাখে। আবার এই মানুষ মানুষকে ভুলে যায়। ভুলে থাকে। ইতিহাস থেকে মুছে ফেলে। আবার কেউ কেউ আলোচনায়ও থাকে না।  বিষয়টি গভীর বিশ্লেষণের। ভাবনার বিষয়ও বটে। অথচ বিষয়টি নিয়ে আমাদের সমাজের কতজনইবা ভাবি, ভাবনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি?

ভালো খাচ্ছি, ভালো মাখছি, ভালো পরছি- এটাকে আমরা অনেকেই জীবন মনে করি। জীবনের সফলতায় গণনা করি।

জীবনের বিকাশ। বিকশিত জীবনের হিসাব আলাদা। যেটা নিয়ে পড়ে থাকতে হয়। ক্রমাগত চেষ্টা চালাতে হয়। ধীরে ধীরে কেবল এগিয়ে যেতে হয়। ভালো কাজ ছড়িয়ে দিতে হয়। ছড়িয়ে দিতে দিতে তা একদিন পৌঁছে যায় সবার দুয়ারে। বন্ধ দুয়ারও খুলে যায়। নতুন আমেজে আমদেদ ফিরে আসে নব উদ্দীপনার জোয়ারে। অবশ্য এমন সফলতার নিশ্চয়তা কমই থাকে। তবে সুযোগ থাকে অনেক। আর যারা এই সুযোগ লুফে নিতে সক্ষম তাদেরকেও আমরা সফল হিসাবে ধরতে পারি।

চার.

মানুষ মানেই দায়িত্ব। দায়িত্বশীল। জবাবদিহিতা। আর এ দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন হয় বিবেক ও বুদ্ধির। বিবেকবোধ সম্পন্নতা দিয়ে কেবল মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর সে কারণে মানুষই শ্রেষ্ঠ। আর এ দায়িত্ব পালন খুব সহজ তা নয়। এ কাজে নানা বাধা বিপত্তি আসে; ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ পথ অতিক্রম করতে হয়। কখনো কখনো পাথর সময় মাড়িয়ে এগিয়ে যেতে হয়।

জীবনের আলো। আলোময় জীবন। আহ! এমন সুসময় সবসময় থাকে না। নানান সমস্যায় জর্জরিত হয়ে জীবন যেমন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে তেমনি হৃদয়ও ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। দুঃখ-যাতনায় মুষড়ে পড়ে। আর এমন সময়ে মহান প্রভুর কাছে তাই করি প্রার্থনা-

হে খোদা মোর হৃদয় হতে 

দূর করে দাও সকল বেদনা

সকল ভাবনা

দূর করে দাও সব যন্ত্রণা

সকল যাতনা।

-কবি মতিউর রহমান মল্লিক

পাঁচ.

জীবনের পথে প্রান্তরে প্রতিটি মুহূর্তে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ হাজির হয়। ভড়কে যাবার মতো পরিস্থিতি উপনীত হয়। অগ্নিশিখার মতো নিভে যাওয়ার শেষ মুহূর্তে ঝলসে ওঠার সাদৃশ জীবনের নানা সময়ে এভাবে নতুন করে জ¦লে উঠতে হয়। প্রাণে তাঁর প্রাণের ছোঁয়ায় সজীব করে তুলতে হয় জীবনের গন্তব্য। বিপদে মুসিবতে একজন মুমিন তাই কেবলই গেয়ে ওঠে-

বিপদে মুসিবতে সহায়তা করো তুমি

দুঃখ বেদনায় সান্ত¡নাও তুমি

হারানোর ব্যথা যদি ঘিরে ধরে আমাকে

আল্লাহ...

তুমি তখন এসে গভীর ভালোবেসে

কমিয়ে দিও ব্যথার পাল্লা।

-আবুল আলা মাসুম

ছয়.

রাতের আঁধার যখনই গভীর হয়; সব পথজুড়ে নামে ঘন কালো অন্ধকার। খুব কাছ থেকে তখনি আকাশ হতে সম্ভাবনা আলোর রেখা জোছনা বিলিয়ে যায়। সত্যি জীবনও এমনই। সময়ের ঘূর্ণিপাকে একেক সময় একেক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। সারাজীবন যেমন সুখ সাথী হয় না আবার দুঃখের দিনও চিরদিন রয় না। তবে দুটি সময় জীবনের কোন না কোন সময় অতিক্রম করতে হয়। এভাবে পাড়ি দিতে দিতে একদিন জীবনেরই অবসান ঘটে। তবে এই যে পথচলার প্রতিটি সময় শক্তি ও সাহস পাই কেবল তারই। তারই রহমত কামনায়-

আমি তোমার মতো আপন করে

আর কারে পাই বলো

হাঁটতে গেলে ছায়া হয়ে বন্ধু হয়ে

সঙ্গে তুমি চলো।

-চৌধুরী গোলাম মাওলা।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির