post

বাঙালি মুসলমানের সামাজিক কালচার

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

১০ মে ২০২৪

রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ইতিহাসের চেয়ে সামাজিক ইতিহাসের পরিধি অনেক বিশাল, অনেক ব্যাপক। তাই যেকোনো অঞ্চল বা দেশের সামাজিক ইতিহাস পুনর্গঠন অতীব কঠিন কাজ। মূলত একটি দেশের প্রকৃত সামাজিক ইতিহাস হচ্ছে অতীতের দৈনন্দিন জীবনে এর সকল মানুষের চিন্তা ও কর্মকাণ্ড।  সমাজে ব্যক্তির চিন্তা ও কর্মকাণ্ড রূপ লাভ করে পরিবারে। ক্রমশ তা ছড়িয়ে পড়ে জাতিগোষ্ঠীতে, শ্রেণিতে, গ্রামে বা শহরে তথা সমগ্র দেশে। সর্বস্তরে ওই ব্যক্তির চিন্তা ও কর্মকাণ্ড অবধারিতভাবে প্রভাবিত হয় সমাজ ও রাষ্ট্রের নানাবিধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে ধর্ম, বর্ণ, বিশ্বাস, জাত, শ্রেণি, আচার-প্রথা, শিক্ষা, সংগঠন-সমিতি, সংস্কার-কুসংস্কার, সংস্কার আন্দোলন, সাহিত্য-সংগীত, আনন্দ-উৎসব, স্থাপত্য-শিল্পকলা, লোকগাঁথা, নারী-পুরুষ সম্পর্ক, আন্তঃশ্রেণি সম্পর্ক, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, খেলাধুলা প্রভৃতি সামাজিক ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত। মানুষ যাতে সমাজে সুশৃঙ্খলভাবে বসবাস করতে পারে, সেজন্য প্রণীত হয় নানা রকম আইন-অনুশাসন, রীতিনীতি এবং গড়ে ওঠে বিশ্বাসের ভিত্তিতে স্বাতন্ত্রিক আচার-প্রথা। সামাজিক স্থিতিশীলতা ও পরিবর্তনের ধারায় এ সকল প্রতিষ্ঠান ও রীতিনীতির ভূমিকা মূল্যায়ন করাও সামাজিক ইতিহাস চর্চার অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু এ কাজ নিখুঁতভাবে পরিচালনা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কেননা পরিবার, গোষ্ঠী, জীবনচিন্তা, কর্মকাণ্ড, সম্পর্ক, প্রতিষ্ঠানসমূহ, ভোগবিলাস, আনন্দ-উৎসব, সংস্কার পদ্ধতি, বহির্জগতের সাথে সম্পর্ক প্রভৃতি বিষয়ে অঞ্চল ভেদে ভিন্নতর দীর্ঘ ইতিহাস থাকে। অঞ্চল ও রাষ্ট্র তো বটেই, একই অঞ্চলের একটি গ্রামের বিশ্বাস ও অবকাঠামোগত পার্থক্য থাকার কারণে এ-পাড়া ও-পাড়ার মধ্যে সামাজিক ইতিহাসের ক্ষেত্রে ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। ফলে কোনো দেশের সামাজিক ইতিহাসের নিখুঁত চিত্র উপস্থাপন করা প্রায় অসম্ভব।

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও সর্বজনীন জীবনবিধান। কেউ ইসলাম গ্রহণ না করে নিজ ধর্মের প্রতি আস্থাবান ও অনুগত থেকেও শুধু এর সামাজিক বিধানসমূহ মেনে যেকোনো অমুসলিম কল্যাণ লাভ করতে পারে। বিশ্বের মুসলিম প্রভাবিত সমাজে এ উক্তির সত্যতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। রান্নাবান্না, শরীর চর্চা, পর্দা প্রথা, কাব্য রচনা, চাষাবাদ, ব্যাবসা-বাণিজ্য, স্থাপত্য রীতিনীতি, মুদ্রাঙ্কন ও মান নির্ণয় থেকে শুরু করে প্রাসাদ শিষ্টাচার পর্যন্ত মুসলিম ঐতিহ্যের প্রভাব লক্ষণীয়। পক্ষান্তরে বাংলায় উদার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ইসলামি জ্ঞানের অজ্ঞতার কারণে অমুসলিমদের অনেক বিষয়ই মুসলমানদের জীবন-সংস্কৃতির সাথে যুক্ত হয়েছে।

অমুসলিম সমাজে মুসলিম সংস্কৃতি

দীর্ঘ সময়ের জন্য স্বাধীন ভূখণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকলেও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের সভ্যতার আলো থেকে সেখানকার জনসাধারণ অনেক দূরে অবস্থান করত। তারা মাথার চুল ও হাতের নখের যত্ন নিত না। তারা লম্বা চুল ও নখ রাখত। পক্ষান্তরে চুল কাটা, নখ কাটাসহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হবার ১০টি নীতিমালাকে ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত হিসেবে মুসলমানগণ পালন করে থাকে। মিসওয়াক করা তথা দাঁতের যত্ন নেওয়াসহ মুসলমানদের এ সকল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সংস্কৃতি বাংলার হিন্দু-বৌদ্ধরা ব্যাপকভাবে অতীব আগ্রহসহকারে গ্রহণ করে। এখানে চুল কাটা, পরিপাটি করে আঁচড়ানো প্রভৃতি মুসলিম সংস্কৃতির ফল। অবশ্য মুসলমানগণ দাড়ি রাখলেও অমুসলিমরা চুলের যত্ন নেওয়া শিখতে গিয়ে দাড়ি-গোঁফও মুণ্ডন শুরু করে।

‘মুসলমানের হাড়ি, হিন্দুর বাড়ি এবং পশ্চিমাদের গাড়ি’ তিন জাতির জন্য তিনটি বৈশিষ্ট্য রম্যভাবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। মুসলমানগণ শুধু হালাল-হারামকে বাছাই করেই খানাপিনা করে না; বরং সুনিপুণ রান্নার মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্যকে সুস্বাদু ও বৈচিত্র্যময় করতেও তারা পারদর্শী। বিশেষ করে সুলতানি ও মোগল শাসকগণ রান্নার নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। পক্ষান্তরে স্থানীয় জনগণের মধ্যে হালাল-হারামের ক্ষেত্রে যেমন তাদের কোনো বাধা-নিষেধ ছিল না, তেমনি রান্নারও একাধিক নিত্যনতুন কোনো পদ্ধতি তারা জানত না। শাকসবজি, মাছ-মাংসও তারা কোনো রকমে সিদ্ধ করে ভক্ষণ করত। আরব মুসলমানদের প্রভাবে বাংলায় সুস্বাদু করে মাংস রান্না করতে শেখে। মুসলিম প্রভাবে পোলাও, কোরমা, বিরিয়ানি রন্ধন প্রণালী এবং বিভিন্ন মসলার ব্যবহারের মাধ্যমে তরকারিকে সুস্বাদু করার প্রক্রিয়া রপ্ত করে। মসলার বিভিন্নমুখী ব্যবহারের কারণে তারা শুটকি মাছকে ভর্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের রান্নার আওতায় এনে সুস্বাদু ও উপাদেয় খাবার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পাহাড়ি ও উপজাতি বিভিন্ন গোত্রের লোকজন বিভিন্ন জন্তু-জানোয়ারের পচন থেকে ‘নাফফি’ তৈরি করে তা মসলা প্রয়োগের মাধ্যমে মজা করে ভক্ষণ করে। মুসলমানগণ শুটকি মাছের ভর্তা ও তরকারি খেলেও নাফফিকে হারাম বলে পরিহার করে থাকে।

বাঙলার জড়বাদী সমাজে নারীরা ছিল চিত্তবিনোদন ও ভোগের সামগ্রী মাত্র। ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু সমাজেও এ ধারা অব্যাহত ছিল; এমনকি স্বামীর মৃত্যুর পর জলন্ত চিতায় স্বামীর সাথে জীবন্ত স্ত্রীকে দাহ করা (সতীদাহ প্রথা) ছিল ভারতবের্ষর সনাতন ধর্মীয় নিয়ম। সপ্তম শতাব্দীর দিকে এ প্রথা খুব ব্যাপক ছিল। পুরুষরা মনে করত, নারীদের কোনো নিজস্ব মতামত ও ব্যক্তিত্ব বলে কিছু থাকবে না। শুধু পুরুষদের মনোরঞ্জন করাই তাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য। স্বামী যতই নির্যাতন করুক না কেন, তবুও যে মহিলার মন-মুখের কথা এবং দেহ স্বামীর অধীনে থাকবে, সেই মহিলা এ পৃথিবীতে পুরস্কৃত হবে এবং পরজগতে তার স্বামীর সাথে থাকার সুযোগ পাবে। নারী জাতি পুরুষদের বশ্যতা স্বীকার করে থাকা যেমন বাধ্যতামূলক, তেমনি তাদেরকে কোনো উত্তরাধিকার স্বত্ত্বও দেওয়া হতো না। কিন্তু সামাজিক ক্ষেত্রে বর্ণবৈষম্য থাকলেও অবৈধভাবে নারী সম্ভোগের ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণগণ এ বৈষম্য মনে রাখত না। নিম্নবর্ণ বা নিম্নশ্রেণির সুন্দরী মহিলাগণ ব্রাহ্মণদের ভোগের বস্তু হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এভাবে অমুসলিম তথা হিন্দু সমাজে নারীকে দাসীতে পরিণত করা হয়েছিল।

ইসলামের দৃষ্টিতে পুরুষ-নারীর চরিত্র ও সতীত্বের পূর্ণ হিফাজতই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পবিত্র কুরআনে যৌনাঙ্গের হেফাজতকারীকেই সফলকাম বলা হয়েছে। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন- “আজ তোমাদের জন্য সমস্ত পবিত্র জিনিস হালাল করা হলো,আর ঈমানদার সতী নারী ও তোমাদের পূর্বেকার আহলে কিতাবধারী সতী নারীদেরকে তোমাদের জন্য হালাল করা হলো। তবে শর্ত হচ্ছে, তোমরা তাদেরকে মোহর প্রদানের বিনিময়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করবে এবং প্রকাশ্যে অথবা গোপনে চুরি করে অবৈধ প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে না।” পবিত্র হাদিস শরিফে সাহল ইবনে সা’দ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) বলেছেন- যে ব্যক্তি আমাকে তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী জিনিসের (জিহ্বা) এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী জিনিসের (যৌনাঙ্গ) নিশ্চয়তা দিতে পারে, আমি তার জন্য জান্নাতের জামিন হতে পারি। (বুখারি ও মুসলিম)

অন্যত্র আবু হুরায়রা (রা.) রাসূল (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, আদমসন্তানের জন্য ব্যভিচারের একটি অংশ নির্দিষ্ট করা আছে। এটা নিঃসন্দেহে সে পাবেই, অর্থাৎ এ ধরনের পাপ হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। দু’চোখের যিনা হচ্ছে পরস্ত্রীর প্রতি দৃষ্টিপাত করা। দু’কানের যিনা হলো যৌন উত্তেজক কথাবার্তা শ্রবণ করা। মুখের যিনা হলো, যৌন বিষয় অশ্লীলভাবে আলোচনা করা। হাতের যিনা- অন্য নারীকে স্পর্শ করা এবং পায়ের যিনা হচ্ছে, ওই সকল  উদ্দেশ্যে যাতায়াত করা। অন্তরের যিনা হচ্ছে ওই কাজের প্রতি কুপ্রবৃত্তিকে জাগ্রত ও তার আকাঙ্খা তৈরি করা। আর যৌনাঙ্গ এমন অবস্থায় যিনাকে সত্যায়িত বা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। (বুখারি ও মুসলিম)

অন্য হাদিসে বলা হয়েছে- “তোমাদের মধ্যে তারাই উত্তম, যাদের চরিত্র উত্তম। সুতরাং আরবীয় মুসলামানগণ অবাধ ও অনিয়মতান্ত্রিক অবৈধ যৌনতাকে প্রশ্রয় দিতেন না বলেই ছয় মাসের জন্য বাণিজ্য করতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এলাকায় এসেও বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হতেন। এ সময় তারা বিধবা পর্দানশীন, সচ্চরিত্রা মহিলাদেরকে প্রাধান্য দিতেন এবং তাদেরকে ইসলামে দীক্ষা দিয়ে তাদের সাথে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হতেন। মুসলমান কর্তৃক বিবাহিত মহিলাগণ সুন্দর পোষাক পরে পর্দা করতেন। তাদের এ সুন্দর পোষাকে পবিত্র অবয়বকে যেমন অন্য নারীদের পর্দা প্রথায় উৎসাহিত করত, তেমনি সতীত্ব রক্ষার প্রেরণাও খুঁজে পেত। পর্দা প্রথার মাধ্যমে সতীত্ব রক্ষা সহজ হতো বলে অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মহিলারাও পর্দা প্রথার প্রতি ঝুঁকে পড়ে। বিশেষ করে পর্দানশীল বিধবা মহিলাদেরকে আরব বণিকগণ বিয়ে করায় এখানকার নির্যাতিত ভাগ্যাহত মহিলারা নিজেদেরকে পর্দায় ঢেকে সতীত্বকে বজায় রাখার চেষ্টা করতেন। ক্রমশ নির্যাতিত মহিলাগণ ব্যাপকহারে ইসলামে দীক্ষা নিয়ে মুসলিম বণিকদের স্ত্রীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হতেন এবং তাদের সুন্দর পর্দানশীন পোশাক অন্যান্য মহিলাদেরকেও আকর্ষণ করত। মূলত আরাকান-চট্টগ্রামসহ বাংলায় যে পর্দা প্রথার প্রচলন শুরু হয়, তা খাঁটি আরবীয় মুসলমানদের সংশ্রবের ফল।

মুসলিম সমাজে ধর্মীয় চিন্তা-চেতনা থেকে পর্দা প্রথার প্রচলন পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়িত হওয়া শুরু হলেও অমুসলিম সমাজে নারীদের জন্য পর্দা বা আবরু প্রথা সমাজে আভিজাত্য ও সামাজিক শালীনতা বলে মনে করা হতো। প্রশাসনের সাথে সংশ্লিষ্ট শাহ-সামন্ত অভিজাত এবং উচ্চ ও মধ্যবিত্ত ঘরের নারীরা পর্দা করত। দরিদ্র ঘরের মেয়েদেরকে ঘরের বাইরে, ক্ষেতে খামারে, হাটে-ঘাটে জীবিকা অর্জনের জন্যে কিংবা স্বামী-সন্তানের সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করতে হতো। তাই তারা পর্দার সুযোগ না পেলেও অন্তত শালীন পোষাক পরিধান করে নিজেদের লজ্জা ও আবরু ঢাকত; এমনকি কাপড় দিয়ে মাথা ঢেকে রাখাকেও তারা শালীনতা হিসেবে মনে করত। কবি নসরুল্লাহ খোন্দকার বলেন-

“বিনি বাসে শির যেবা রাখে অনুচিত / মগধ বিরান সেই জানিও কুৎসিত।” (নসরুল্লাহ খোন্দকার বিরচিত শরীয়তনামা)

মুসলমানদের প্রভাবে অন্য ধর্মাবলম্বী নারীদের মধ্যে সতীত্ববোধ নতুন রূপ লাভ করে। তারা এ ধারণা করতে সক্ষম হয় যে, সতীত্বই নারীর অলংকার। নারী তার সতীত্বকে ধরে রাখতে না পারলে তার আর কোনো মূল্যই থাকত না। কবি আলাওলের ভাষায়-

“স্বামীর পিরীতে ভাবে নিজ প্রাণ দিব

এ জন্মে না পাই যদি জন্মান্তরে পাব।

এক ছাড়ি দোসর ভাঙিলে নহে সতী

সংসার কলঙ্ক পরকালে অধগতি।”

তবে স্বামী পরিত্যক্তা বিধবা হলে তার পুনর্বিবাহকে তারা সমর্থন করত না; এমনকি এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ‘পরকালে অধগতি’ হিসেবে মনে করা হতো। অথচ মুসলিম সমাজে নারীদেরকে একাধিকবার বিয়ে ও তালাকের অনুমতি দিয়েছে। অবশ্য পরবর্তী সময়ে ক্রমশ বৌদ্ধ সমাজেও এ রীতি চালু হয়েছিল।

লজ্জা নিবারণ ও সৌন্দর্য সংস্কৃতির বিকাশে পোষাক পরিধান করা হয়ে থাকে। ইসলাম অত্যন্ত সহজ ও বাস্তবমুখী জীবনবিধান। এই মূলনীতি অনুযায়ী সমগ্র মানবজাতির জন্যে যে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, সেখানে মুসলমানদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত হুকুম মেনে স্বাচ্ছন্দ্য, সৌন্দর্য, সহজ চলাচল, কার্যপোযোগিতা, আবহাওয়া-জলবায়ু, পরিবেশ ও সমাজিক প্রভাব ইত্যাদির নিরিখে পোষাক পরার অবকাশ ইসলামে দেওয়া হয়েছে। পোষাকের প্রশ্নে ইসলাম ‘লিবাসুত তাকওয়া’ বা আল্লাহ ভীতিযুক্ত পোষাকই একমাত্র বিবেচনার বিষয় করেছে। এ সম্পর্কে আল্লাহর বাণী- “হে আদমসন্তান! তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকা ও বেশভূষার জন্য আমি পোষাক দিয়েছি এবং তাকওয়ার পোষাক, এটাই সর্বোৎকৃষ্ট। এটা আল্লাহর নিদর্শন সমূহের অন্যতম, যাতে তারা স্মরণ করে বা উপদেশ গ্রহণ করে।” ইসলামে নির্দিষ্ট ছকে কোনো পোষাক নির্ধারণ না করা হলেও তাকওয়ার পোষাক বলতে ওই ধরনের পোষাক বুঝায়, যা পরিধান করলে প্রস্রাব-পায়খানা, ইবাদত কার্যক্রম প্রভৃতি কার‌্যাবলি সমাধা করতে সমস্যা হয় না। পবিত্রতা অর্জন ও বাহ্যত দেখতেও সৌন্দর্যমণ্ডিত হবে, এমন পোষাকই তাকওয়ার পোষাক। এজন্য মুসলমান পুরুষগণ দেশীয় আবহাওয়ার ভিত্তিতে পোষাক পরিধান করে থাকেন। তবে আলিমগণ সাধারণত পায়জামা পাঞ্জাবি, টুপি, পাগড়ি প্রভৃতি ব্যবহার করতেন। মহিলাদের পোষাকের ব্যাপারে মুসলমানগণ বেশি যত্নবান। হাত, পায়ের পাতা ও মুখমণ্ডল ছাড়া সাধারণত অঙ্গের অন্য কোনো স্থান যেন পরপুরুষে না দেখে, সে সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মুসলিম শাসিত সমাজেও মুসলিম মহিলারা কামিজ ও পাজামা জাতীয় পোষাক পরতেন। সে অনুকরণে হিন্দু-বৌদ্ধ মহিলারাও এ ধরনের পোষাক ব্যবহার শুরু করে। 

শুধু ব্যবহারিক পোষাকই নয়; বরং বিবাহের দিনসহ বিশেষ বিশেষ দিনেও বৌদ্ধরা মুসলিম পোষাক পরত। বৌদ্ধ পুরুষেরা বিয়ে উপলক্ষ্যে ইসলামি পোষাক নামে খ্যাত ইজের, আচকান ও মাথায় পাগড়ি পরিধান করে বরসজ্জা করত; এমনকি বিয়ের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা তথা ইজাব কবুল পদ্ধতি, কন্যা সমর্পণ প্রভৃতি ও অতিথি আপ্যায়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তথা অলিমা দেবার ক্ষেত্রে মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ করা যেত।

হিন্দু সমাজে বর্ণবৈষম্য ছিল ব্যাপক। সুচিবাইয়ের নামে অনেক নিম্ন পেশা ও গোত্রের নিম্ন শ্রেণিকে মানুষই মনে করা হতো না। ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতির আদলে এসব অঞ্চলেও বর্ণবৈষম্য ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। ক্রমশ  হিন্দুদের প্রভাবে বৌদ্ধদের মধ্যেও বর্ণবৈষম্য শুরু হয়। কিন্তু ইসলামের প্রসার ও প্রভাব শুরু হলে দলে দলে নিম্ন শ্রেণির হিন্দু ও বৌদ্ধরা ইসলামে দীক্ষা নিতে থাকে। মুসলিম সমাজে শ্রেণিবিভেদ ও বর্ণবৈষম্য তেমন ছিল না বললেই চলে। তারা একই পাত্রে আহার করত। একসাথে উঠাবসা করত। এ প্রভাব বৌদ্ধদের মধ্যেও পড়তে শুরু করে। বিশেষত মধ্যযুগে বৌদ্ধদের মধ্যে মুসলমানদের মতো স্পর্শদোষ বা এঁটোর বাছবিচার এবং বর্ণবৈষম্য অনেকাংশে দূরিভূত হয়। মুসলমানদের মতো তারাও একসাথে পাঁচ-ছয়জন নিম্ন পেশার লোকসহ খেতে বসত; এমনকি হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধ একই বৈঠকে খাওয়া ও পান করাতেও কোনো সমস্যা মনে করত না। বিশেষত মুসলমানগণ সফলতার সাথে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার সময় তারা হিন্দু মন্ত্রী ও সম্ভ্রান্ত জনগণের কাছে এতটাই প্রিয় হয়েছিলেন যে, তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বিয়ে কিংবা সামাজিক অন্য যেকোনো আনন্দঘন অনুষ্ঠানে মুসলিম-অমুসলিম একত্রে উপস্থিত থাকতেন এবং তাদের উদার আচরণ বিশেষত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। কিন্তু ব্রিটিশ আমল থেকেই মুলত মুসলিম-অমুসলিম ব্যবধান ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। বিশেষত হিন্দুদের সুচিবাই সংস্কৃতি ও সামাজিক বৈষম্য তৈরিতে তারা ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।

মুসলিম সমাজে অমুসলিম সংস্কৃতি

বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলমানগণ প্রাথমিক পর্যায়ে তাওহিদের দিক থেকে মজবুত থাকলেও পরিবেশগত কারণে ইসলামের পুরোপুরি অনুসরণ করতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক সহযোগিতা পেলেও তৎকালীন মুসলিম সমাজে অনেক রীতিনীতিই প্রচলিত ছিল, যা মূলত তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ থেকে মুসলমানদেরকে খানিকটা দূরে সরে নিয়ে গিয়েছিল। অথচ সে রীতিপদ্ধতি ও আচার আচরণসমূহ হিন্দু কিংবা বৌদ্ধ সমাজের প্রভাব থেকে এলেও তার অধিকাংশই মুসলমানগণ ইসলামের রীতিনীতি হিসেবেই পালন করত। সামাজিক সহাবস্থানে যুগযুগ ধরে বসবাসের মধ্য দিয়ে কখন যে এ সকল অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড পূণ্যময় হিসেবে মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছে, তা অনেকেই অনুধাবন করতে পারেনি। ‘বিদআত’ নামে পরিচিত এসব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতি-প্রথা মধ্যযুগের সাহিত্যের মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয়েছে।

মুসলিম সমাজে বিবাহ, জন্ম-মৃত্যু প্রভৃতি অনুষ্ঠান শরিয়ত মোতাবেক সম্পন্ন হয়ে থাকে। তবে শরিয়তে নিষেধাজ্ঞা নেই; বরং সওয়াব হওয়া কিংবা নিছক আনন্দ করার জন্য মুসলমানগণ কিছু রীতি-প্রথা মান্য করে এসছে। বিয়ে-শাদিতে শরিয়তের বিধান মোতাবেক বর-কনে দেখা, মোহরানা নির্ধারণ, মাওলানা কর্তৃক বিবাহ পড়ানো, অলিমার মাধ্যমে মুখমিষ্টি কিংবা খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন সবকিছুই শরিয়ত মোতাবেক হলেও অঞ্চলভিত্তিক কিছু সামাজিক রীতি-প্রথা চলে এসেছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং মুসলিম বিয়েতে ‘মঙ্গল ঘট’ বসানো হতো। উল্লেখ্য, শুভ কাজের মঙ্গল কামনায় বাড়ির প্রবেশ পথের দু’পার্শ্বে দুটি কলাগাছ পুতে তার গোড়ায় দুটি পানিভর্তি কলসি স্থাপন করে মুখে দুটি আমের পাতা রেখে তার উপর দুটি ডাব বা নারিকেল দিয়ে রাখাকে মঙ্গলঘট বলে। মঙ্গলঘটে ব্যবহৃত উপাদানগুলো একেকটি শুভ ধারণার প্রতীক, যেমন কলাগাছ ও আম পাতা দীর্ঘায়ুর প্রতীক, পানি জীবনের প্রতীক, ডাব বা নারিকেল প্রজনন শক্তির প্রতীক। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে সংস্কারবাদী আন্দোলন ও ইসলাম সম্পর্কে জনসাধারণের ধারণা স্বচ্ছ হবার কারণে এ ধরনের আনুষ্ঠানিকতা তথা প্রকৃতি পূজা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। এ ছাড়াও গায়ে হলুদ ও বিয়ে অনুষ্ঠানে আনন্দ ফুর্তির জন্য বিভিন্ন গান-বাজনারও আয়োজন হতো। এ ধরনের একটি অনুষ্ঠান ছিল ‘মারোয়া’। 

উল্লেখ্য, বিয়ে বাড়ি উঠোনে আট হাত দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের একটি স্থানের চারকোনায় চারটি কাঁচা বাঁশের খুঁটি পুতে তার ফাঁকে চারটি কলাগাছ পোতা হতো। অতঃপর খুঁটি ও কলাগাছের চারদিকে সাত রঙের সুতো প্যাঁচিয়ে বেঁধে দেওয়া হতো। এর উপরদিকে একখানি চাঁদোয়া টাঙিয়ে একটি ঘরের কামরার মতো বানানো হতো। উক্ত কামরার এক কোণায় আমের পাতা শোভিত পানিভর্তি মঙ্গল কলস ও বরণকুলা স্থাপন করা হতো। অতঃপর সেখানে নবদম্পতির বসার জন্য শীতলপাটির বিছানা পেতে দেওয়া হতো, এটাকেই মারোয়া বলে। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে এ প্রথা শুরু হয়।  বিয়ের দিন নববধূকে বরণ করে নেওয়ার পর বর-বধু উভয়কেই মারোয়ার মধ্যে বসানো হতো এবং বিয়ে বাড়িতে আগত বরের বন্ধুবান্ধব ও মহিলারা মারোয়ার মধ্যে সমবেত হয়ে হইহুল্লোড় করে আনন্দ উপভোগ করত। কিছু কিছু মেয়ে মারোয়ার চারদিকে ঘুরে ঘুরে বিয়ের গীত গাইত, যাকে জুলুয়া বলা হতো। কবি নসরুল্লাহ খোন্দকার এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ইবলিশের কাজ বলে অভিহিত করে বলেন-

“আর পত্র ধার বহু কাঁচা বাঁশ আনি

মারওয়া নির্মান্ত ইবলিশের বাসাখানি।

মারওয়ার বাত্রা নাহি শাস্ত্র মাঝার

মুসলমান কর্ম নহে কাফের সবার।”

(নসরুল্লাহ খোন্দকার বিরচিত শরীয়তনামা)

তবে এ ধরনের আনুষ্ঠানিকতা সব মুসলিম পরিবারেই ছিল না। কেননা আলিমগণ এটাকে শুধু বিদআতই নয়; বরং মারোয়াকে ইবলিশের বাসা এবং এ কাজকে কাফিরের কাজ বলে উল্লেখ করতেন। তাই ধর্মভীরু পরিবারের বিয়েতে এ রকম আনুষ্ঠানিকতা না হবারই কথা। এ ছাড়াও কোনো কোনো বিয়ের বাড়িতে পাশা খেলা, রঙ ও ফট খেলা প্রভৃতির প্রচলন ছিল। কবি নসরুল্লাহ খোন্দকার এগুলোর তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদ করেছেন।

সন্তান জন্মকে কেন্দ্র করেও কিছু লৌকিক আচারের প্রচলন হয়ে আসছে। সন্তানের জন্মের পর মাওলানা ডেকে কানে আযান দেওয়া, আকিকা দিয়ে নাম নির্ধারণ করা, খাতনা বা মুসলমানি দেওয়া প্রভূতি কর্মকাণ্ড ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক পরিচালিত হলেও কিছু লৌকিক আচার-অনুষ্ঠানও ছিল। এক্ষেত্রে ভূত-প্রেত থেকে বাঁচার জন্য শিশুর গলায় তাবিজ দেওয়া, জিন-পরির ভয়ে আতুর ঘরে কুপ বাতি, লৌহ শলাকা, জাল প্রভৃতি রাখা; এমনকি আতুরঘরকে অপবিত্র মনে করে সন্তান প্রসবের পর রান্না ঘরের মাটির হাড়ি পাতিল, সানকি, রান্না করা ভাত তরকারি, পিষে রাখা মরিচ-মশলা সবকিছু ফেলে দিত। মাথা কামানোর দিনে নাপিত ডেকে মা ও পরিবারের স্ত্রী লোকেরা নখ কেটে এবং পুরুষেরা চুল-দাড়ি কেটে গোসল করে পবিত্র হতো। ইংরেজ শাসনের সময় থেকে এই প্রথাগুলো ব্যাপকভাবে মুসলিম সমাজে প্রবেশ করে। তবে আধুনিক সমাজে এসবের অনেক বিষয়ই এখন কমে গেছে।

মুসলমানদের মৃত্যুর পর শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী গোসল দেওয়া, কাফন পরানো, নামাজ আদায় এবং কবর খুঁড়ে দাফন ও দুআর ব্যবস্থা থাকলেও কিছু লৌকিক আচারও পালন করা হতো। সাধারণত বৌদ্ধ-সংস্কৃতি থেকে এসেছে বলে অনুমান করা হয়। কোনো মুসলমান নারী-পুরুষ রোগাক্রান্ত হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় অনেকদিন যাবৎ কষ্ট পেলে সহসা তার মৃত্যুর জন্য ‘ঘাট এড়ি’ দেওয়া হতো। উল্লেখ্য, ঘাট এড়ি দেওয়া হলো, নদীর নৌকা ঘাটের ইজারাদারকে তার দাবি মতো পারিশ্রমিকের টাকা আদায় করে দিয়ে একদিন বা অর্ধদিনের জন্যে সে ঘাটের যাত্রীদের বিনা মাসুলে পারাপারের বন্দোবস্ত করে দেওয়া। জনগণের মধ্যে এ বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, এরূপ মুমূর্ষু ব্যক্তির নামে ‘ঘাট এড়ি’ দিলে ঘাটের কড়ি অথবা যেকোনো প্রকার অতীত ঋণ মুক্ত হয়ে সহসা তার মৃত্যু হয়। সেইসাথে মাওলানাদের ডেকে দুআ-দরুদ পড়ে রোগীর সারাজীবনের কৃত পাপ থেকে মুক্তির জন্য তওবা করানোর প্রথাও প্রচলিত। এ ছাড়া মুমূর্ষু রোগীকে শরবত পান করানো, মৃত্যুর পর লাশের চোখ ও মুখ বন্ধ করে দেওয়া এবং উত্তর শিরা করে হাত-পা সোজা করে শুয়ে রাখার নিয়ম এখনও প্রচলিত আছে। এ বিষয়গুলো শরিয়তের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, তবে কোনো মানুষ মারা যাবার চতুর্থ ও চল্লিশ দিনে দুআ অনুষ্ঠানের জন্য যে আনুষ্ঠানিকতা করা হয়, তা শরিয়াহভিত্তিক নয়।

অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলমানগণ তাওহিদ ও শিরকের সম্পর্কে সচেতন ও স্বচ্ছ জ্ঞানের অধিকারী থাকলেও ইংরেজ ও ব্রিটিশ শাসনামলে এসে নানাবিধ কুসংস্কারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বিশেষ করে ‘ফাতেহা’ দেবার নামে পিরপূজা এ সময় ব্যাপক আকার ধারণ করে। এ সময় হিন্দুর সত্যনারায়ন মুসলমানদের সত্যপির, হিন্দুর বনদেবী মুসলমানদের বনবিবি, হিন্দুর কালুরায় ও মুসলমানদের কালুগাজী, হিন্দুর দক্ষিণ রায় এবং মুসলমানদের বড় গাজী খাঁ, হিন্দুর ষষ্ঠী দেবী মুসলমানদের নিমুরিয়া পির প্রভৃতি নামে পিরপূজা শুরু হয়। এ ছাড়াও সাহেবানি, মা, নানি প্রভৃতি নামে পাথরের মূর্তি তৈরি করা হয়েছিল; যাতে মুসলমানগণ মানত আনত, ফাতেহা পড়ত, বাতি জ্বালাত, সোনার পানিতে মূর্তিকে গোসল করাত এবং ডিম ও পয়সা দান করে আত্মতৃপ্তি অনুভব করত। এসব পির ও মূর্তির নামে বিভিন্ন কিছু দান বা বলি দেওয়াকে ‘ফাতেহা’ বলা হতো। এরূপ ফাতেহা পাঠের সময় মুসলমান আলিমগণ ব্রাহ্মণদের মতো গলায় ‘তৃণ’ (পৈতা) বাঁধত। সন্তান জন্মিলে ‘নিমুরিয়া’ নামক কোনো এক কাল্পনিক পিরের নামে ফাতেহা পাঠের রীতিও প্রচলিত ছিল। এরূপ ফাতেহা দেওয়ার সময় ফাতেহার খাদ্যদ্রব্য ঘরের ভিতরে রান্না করা হতো এবং ঘরের বাইরে নিতে দেওয়া হতো না; এমনকি বাইরের কোনো ভিক্ষুককেও দেওয়া হতো না। এ নিমুরিয়া পিরের তাৎপর্য পরিষ্কার বোঝা যায় না, তাই অনুমান করা যায় যে, নিমুরিয়া একজন কাল্পনিক পির।

মুসলমানদের মধ্যে অমুসলিম সংস্কৃতি প্রবেশের কারণ

ইসলাম গতানুগতিক কোনো ধর্মের নাম নয়। ইসলাম একটি বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনবিধান হবার কারণে জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে একে ধারণ করতে হয়। হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণের পুত্র হলেই সে ব্রাহ্মণ হতে পারে, সে তার ধর্ম সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানুক আর না জানুক। এই ভিত্তিতে চৌধুরীর ঘরে জন্ম নিয়ে চৌধুরী, শুদ্রের ঘরে জন্ম নিয়ে শুদ্র হলেও মুসলমানের ঘরে জন্ম নিয়ে শুধু জন্মগত কারণে মুসলমান হওয়া যায় না। লেখাপড়া না করে শুধু ডাক্তার হতে চাইলে রোগীর জন্য যেমন বিপদ ঘটবে, তেমনি ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন না করে মুসলমান থাকতে চাইলেও দ্বীনের মধ্যে অসংখ্য বিদআতের অনুপ্রবেশ ঘটবে। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে বাংলায় ঠিক এমনটিই ঘটেছিল।

প্রথমত, পাক-ভারত ও বাংলায় ইসলামের যাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত সুফি-সাধকদের মাধ্যমে। স্থানীয় জনগণ যতটা শরিয়তি ইসলামের শিক্ষা-সৌন্দর্য ও কল্যাণকামীতায় মুগ্ধ হয়ে ইসলামে দীক্ষা নিয়েছিল, তার বেশি এগিয়ে এসেছিল তাদের কারামতি ও নৈতিক চরিত্রের মহৎ গুণের কারণে। ফলে শরিয়তি ইসলামের শিক্ষা ও সৌন্দর্যবোধ তাদের অন্তরে দৃঢ়মূল হতে পারেনি।

দ্বিতীয়ত, সমাজে মসজিদভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকলেও তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। মসজিদের দরস থেকে কুরআন-হাদিস ও ইসলামের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করা যেত মাত্র। একজন মুমিন হিসেবে সমাজে ঈমান নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য এ শিক্ষা যথেষ্ট হলেও ইসলামি জ্ঞানে বুৎপত্তি অর্জন করে সমাজে ইসলামি জ্ঞান বিতরণে যোগ্য উলামা তৈরি এবং নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা অর্জিত হতো না। গৃহশিক্ষক রেখে কিংবা দূরে কোনো শিক্ষকের বাড়িতে থেকে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থাকলেও তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং অনেক মুসলমানের সাধ ও সাধ্যের বাইরে। ফলে মুসলমানদের সংখ্যার তুলনায় কুরআন-হাদিসের উপর বুৎপত্তি অর্জনের মতো আলিম খুব কমই গড়ে উঠত। সময়ের ধারাবাহিকতায় আলিমের সংখ্যা কমতে কমতে পলাশি-পরবর্তী ইংরেজ ও ব্রিটিশ শাসনামলে এসে এখানে ইমাম আর মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করা ছাড়া বড়ো আলিম খুঁজে পাওয়া কষ্টকর ছিল।

তৃতীয়ত, সুদূর আরব দেশ থেকে ইসলামের যাত্রা শুরু হয়েছে এবং ইসলামের গ্রন্থাবলি ছিল আরবি ভাষায়। ফারসি ভাষায় কিছু কিতাবপত্র অনুবাদ হলেও সেগুলোও ছিল মুসলমানদের নিকট আরবি ভাষার মতো বিদেশি ভাষা হিসেবে দুর্বোধ্য। ইসলামের অনুসারী হবার কারণে আরবি ও ফারসি ভাষার চর্চা থাকলেও তা গবেষণা করার মতো দক্ষতা ছিল না। বাঙলা ভাষায় পবিত্র কুরআন-হাদিসের তাফসির যেমন রচিত হয়নি, তেমনি ইসলামের নীতি-আদর্শভিত্তিক তেমন কোনো বইও লিখিত ছিল না। সুতরাং স্থানীয় ভাষায় কুরআন-হাদিস ও ইসলামি বই পত্র রচিত না হবার কারণে আরবি ও ফারসি ভাষার অদক্ষ লোকজন ইসলামি জ্ঞানের গভীরে গিয়ে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও চেতনাকে ধারণ করতে পারেনি। ফলে ইসলামের সাথে কিছু লৌকিক আচারও যুক্ত হয়েছিল।

চতুর্থত, মুসলিম শাসকদের উৎসাহ অলিগণের প্রচেষ্টায় মুসলমানগণ ইসলামি জ্ঞানে বেশ পরিপক্ব ছিল। ষোড়শ শতাব্দী থেকে সৈয়দ সুলতান, আফজল আলী, শাহ ফরিদ খান, হাজী মুহম্মদ, শেখ পরান, শেখ চাঁদ, আলাওল, দৌলতকাজী, মরদন, মাগন ঠাকুর, আবদুল করিম খোন্দকার, নসরুল্লাহ খোন্দকারসহ বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিক বাংলা ভাষায় কাব্য রচনা শুরু করেন। হিন্দু কবি কর্তৃক রচিত বিভিন্ন দেব-দেবী নিয়ে ধর্মীয় বিধিবিধান সম্বলিত ধর্ম সাহিত্য রচিত হলেও মুসলমানগণ সে ধারা থেকে বেরিয়ে এসে প্রণয়োপখ্যান রচনা করেছিলেন। পাশাপাশি অমুসলিম সাহিত্যিকদের ধর্মীয় বিবরণের এনকাউন্টার হিসেবে অনেক সাহিত্যিকই মুসলিম মিথলজি ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের পুঁথি রচনা করেছিলেন। এসব পুঁথি সাহিত্যে আলি (রা.)-সহ অনেক সাহাবির বীরত্ব প্রকাশ করে মুসলমানদেরকে উজ্জীবিত করার প্রয়াস চালানো হয়েছিল। অত্যন্ত ভালো নিয়তে এসব সাহিত্য রচিত হলেও ইসলামি জ্ঞানের স্বচ্ছ ধারণার অভাবে একপর্যায়ে এসব পুঁথিই ধর্মীয় গ্রন্থে রূপ নেয়। ফলে হিন্দুর সত্য নারায়ন মুসলমাদের সত্যপির হিসেবে দেখা দেয়, হিন্দুর কালু রায় মুসলমানদের হলেন কালু গাজী। এসব ঘটনা ঠিক যেন মশাররফ হোসেনের ‘বিসাদ সিন্ধু’ কিংবা হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদী লেখকদের জবাবে রচিত সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজীর দুর্গেশ নন্দিনীর পরিবর্তে ‘রায় নন্দিনী’ প্রভৃতির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে কাল্পনিক পুঁথি সাহিত্যের ভিড়ে আলাওল, সৈয়দ সুলতান ও নসরুল্লাহ খোন্দকারের মতো কিছু ঐতিহ্যবাহী পরিবারের পণ্ডিত মুসলিম কবির তোহফা, নবি-বংশ, শরিয়তনামা প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের কারণে এ ধরনের বিদআতসমূহ মানব-সমাজে ধরা পড়েছিল এবং সংশোধনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল।

পঞ্চমত, বাংলা অঞ্চল সব সময় ভারতীয় প্রভাবে প্রভাবিত থাকার নজির পাওয়া যায়। ভারতের ধর্মীয় অস্থিরতা বিশেষত সম্রাট আকবরের ধর্মনীতি যে বাংলায় কিছুটা হলেও বিরূপ প্রভাব ফেলেনি, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। সম্রাট আকবর ও জাহাঙ্গীরের সময়ের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সম্রাট শাহজাহান এবং আওরঙ্গজেবের সময়ের বর্গীদের অশুভ তৎপরতা, সুবেদারদের স্বেচ্ছাচারিতা, অবশেষে ব্রিটিশ বেনিয়াদের দৌরাত্ম্য নাটক পলাশীর মাধ্যমে ভারত ও বাংলায় দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়। পলাশীর পরাজয়ের পরে মুসলমানদের পক্ষে ইসলামের সঠিক জ্ঞান অর্জন করার অনুকূল পরিবেশ ছিল না। ফলে প্রায় একশত বছরের মধ্যেই হিন্দু সমাজের প্রভাবে মুসলিম সমাজেও পিরপূজা, করব পূজা ও ইসলামের নামে বিভিন্ন কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী আনুষ্ঠানিকতা পালন করা শুরু হয়। মুসলিম কবি সাহিত্যিকগণ বুদ্ধিজীবী মহলে এসব অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডকে লেখনীর মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন এবং বাঙলার হাজী শরিয়তুল্লাহ ও তীতুমীরের মতো সংস্কারকগণ মুসলমানদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন থেকে নানাবিধ বিকৃতি ও অনৈসলামিক প্রথা রহিত করে সত্যিকারের ইসলামি মূল্যবোধে ফিরে আনার চেষ্টা করেন।

পরিশেষে বলা যায়, হাজার বছর ধরে বাংলার হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির মধ্যে মুসলিম নামক একটি সংস্কৃতি নিজস্ব বলয়ে তৈরি হয়েছিল। এ সংস্কৃতি শুধু স্বতন্ত্রবোধই টিকে রাখেনি; বরং বাংলার সমাজ ও সভ্যতার ইতিহাসে তাদেরকে পরিশীলিত করার গৌরবও অর্জন করেছে। দেশপ্রেম, আঞ্চলিকতা এবং স্বাভাবিক পরিবেশের গতিপ্রবাহের নিরিখে মুসলমানরাও অমুসলিম সংস্কৃতি গ্রহণ করে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান একটি ভ্রাতৃত্ববোধসম্পন্ন জাতিতে পরিণত করেছিল। সেইসাথে সকল ধর্মের উদারতা ও হৃদ্যতার মাধ্যমে সেখানে ভ্রাতৃত্ববোধসম্পন্ন একটি হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু সাংস্কৃতিক পরিশুদ্ধতা না থাকায় এ সমাজের ভিত ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। বর্তমান সময়ে সাংস্কৃতিক উৎকর্ষতার নামে নানা রকম অনৈসলামিক আচার-কৃষ্টির চর্চা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ইংরেজ আমলের চেয়ে এখনকার সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আরও সুপরিকল্পিত এবং বিজ্ঞানভিত্তিক। বিশ্বায়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতায় এই আগ্রাসন মারাত্মক আকারে প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রবেশ করছে এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে মহামারি সৃষ্টি করছে। এই মরীচিকাময় চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে মুসলিম সন্তানরাও অন্য বিশ্বাসের ধারক-বাহক হিসেবে পরিচয় দেওয়াকে উদারতা এবং প্রগতিশীলতার গৌরব বলে মনে করছে। এই মহামারি থেকে আমাদের সমাজ-সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে না পারলে অচিরেই ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক; প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির