সর্বশেষঃ
post

ব্যক্তিত্ব গঠনে সুন্নাহর নির্দেশনা

আলী আহমাদ মাবরুর

২৩ আগস্ট ২০২২

১ম পর্ব 

ইসলামী শরিয়াতের দুই প্রধান উৎস তথা কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় নেয়ামত। কুরআনে প্রদত্ত মৌলিক নীতিমালাগুলো রাসূল সা. সর্বোত্তম উপায়ে তার জীবনে বাস্তবায়ন করে গেছেন। রাসূল সা.-এর কথা, কাজ আর কর্ম নিয়েই হাদিস। তাই রাসূল সা.-এর সুন্নাহ তথা হাদিস থেকে আমরা বারবার নিজেদের মনের সংশোধন, কলবের বিশুদ্ধতা এবং চরিত্রগঠনের তাগিদ পাই। মানুষ মাত্রই ব্যক্তিত্ববান। প্রতিটি মানুষেরই তার মতো করে ব্যক্তিত্ব রয়েছে। পৃথিবীতে যেহেতু আর কোনো নবী-রাসূল আসবেন না, তাই শেষ নবীর উম্মত হিসেবে মুসলিমদেরকেই ইসলামের প্রচার ও প্রসারের দায়িত্ব পালন করতে হবে। এই বড় দায়িত্ব পালনে সফলতা লাভ করতে হলে মুসলিম মানস ও ব্যক্তিত্ব মানসম্মত হওয়া একান্তভাবে প্রয়োজন। প্রকৃত মুসলিমের ব্যক্তিত্বকে অবশ্যই ইসলামের মূল শিক্ষা ও চেতনার আলোকে তৈরি করে নিতে হবে।

আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন যারা ইসলামঘনিষ্ঠ জীবনযাপনের চেষ্টা করেন, দাঈ হিসেবে ভূমিকা রাখেন, অথচ ইসলাম নির্দেশিত ব্যক্তিত্বের গুণাবলির অনেকটুকুই তার মাঝে অনুপস্থিত। আমিসহ আরো অনেকেরই বাহ্যত যেমন ব্যক্তিত্বের ঘাটতি অনুধাবন করা যাচ্ছে তেমনি অন্তর্নিহিত সঙ্কটও বড় করেই সামনে আসছে। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে সম্ভাব্য সঙ্কট থেকে হেফাজত করুন। মুসলিম হিসেবে জীবন চলার পথে সকল ক্ষেত্রে সফল হতে গেলে আমাদের চলাফেরা, কথাবার্তা, আচার আচরণ, মানসিকতা সর্বোপরি আমাদের ব্যক্তিত্বকে নবীজির সা. দেখানো সুন্নাহর আদলে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। কেননা, রাসূল সা. বলেছেন, “প্রতিটি কাজের একটি উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকে। আর সেই উদ্দীপনার মধ্যেই আবার ক্লান্তি, অবসন্নতা ও বিরতিও চলে আসে। তাই যার কাজটি সুন্নাত পর্যন্ত গিয়ে বিশ্রাম পায় সেই সঠিক পথপ্রাপ্ত হয়। আর যার বিরতি অন্য কিছুতে হয় সে নিশ্চিতভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত।" (ইবনে হিব্বান, ১১/১৮১, আত তারগিব ওয়াত তাহরিব : ৫৬)

যেহেতু ছাত্র ও যুবক বয়সে একজন মানুষের উৎসাহ উদ্দীপনা চূড়ান্ত মাত্রায় থাকে, তাই এ সময়ে তাকে সঠিক পথের দিশা দেওয়া; বিশেষ করে ব্যক্তিত্ব গঠনে দিকনির্দেশনা দেওয়া জরুরি। উস্তাদ আহমাদ জাকি সাফওয়াত তার বিখ্যাত গ্রন্থ জামারাহ খুতাবিল আরবের (২/২৭৫) বলেছেন, “মুত্তাকি যুবকদের চোখ থাকে স্বচ্ছ, তাদের পদচারণা হয় মন্দ কাজের একদম বিপরীতে। তারা কুরবানি করতে পিছপা হয় না। তারা ইবাদতে নিজেদেরকে মগ্ন করে রাখে। শান্তির ঘুম তাদেরকে আল্লাহর ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে নেয় না। তারা এমন মৃত্যু আকাক্সক্ষা করে যা তাদের বাঁচিয়ে রাখবে। তারা যখন রাত জেগে নামাজ পড়ে, কোমর ঝুঁকিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করে, আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়ে তা অবলোকন করেন। কুরআন তিলাওয়াতের সময় যখন কারো সামনে জান্নাত সংক্রান্ত আয়াত পড়ে, তখন তারা কান্নায় ভেঙে পড়ে। জান্নাতের জন্য তারা অতি আগ্রহী হয়ে যায়। আবার যখন তাদের পাঠে জাহান্নাম সংক্রান্ত কোনো আয়াত আসে, তখন ভয়ে তারা কুঁকড়ে যায়। তাদের আড়ষ্টতা দেখে মনে হয়, জাহান্নামের আগুন বোধ হয় এক্ষুনি তাদের গিলে ফেলবে। তারা নিজেদের হাঁটু আর কপালকে মাটির সাথে মিলিয়ে দেয়। দীর্ঘ নামাজ আর লম্বা কিয়াম আর নিয়মিত রোজা পালনের কারণে তাদের শরীর যেন বিবর্ণ হয়ে যায়। এই যুবকেরাই আল্লাহর সাথে করা চুক্তি পালন করে এবং আল্লাহর কাছে দেওয়া ওয়াদা পালনে নিষ্ঠার পরিচয় দেয়।” প্রত্যাশিত এই মানে পৌঁছতে হলে চাই প্রত্যাশিত ব্যক্তিত্ব। আর ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠনে সুন্নাহ থেকেও বিস্তারিত নির্দেশনা পাওয়া যায়। 

বিশুদ্ধতা এবং নিয়তে একনিষ্ঠতা

ভালোভাবে ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য সর্বাগ্রে চাই খুলুসিয়াত এবং একনিষ্ঠতা। নিয়তে কোনো ধরনের শঠতা থাকা চলবেন না। হযরত উমর বিন খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেছেন, “প্রতিটি আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল বা সকল কাজের ফলাফল নিয়ত অনুযায়ী পাবে। প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যা সে নিয়ত করে। সতরাং যার হিজরত বা দেশ ত্যাগ আল্লাহ ও তার রাসূলের সন্তুষ্টির জন্য হবে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্যই পরিগণিত হবে, আর যার হিজরত দুনিয়া লাভের বা কোনো নারীকে বিবাহের উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরত সেই উদ্দেশ্যেই বিবেচিত হবে। (বুখারি-১, ৫৪, ২৫২৯, ৩৮৯৮, ৫০৭০, ৬৬৮৯, ৬৯৫৩) 

তাই যেকোনো কাজের মূল ভিত্তিই হলো বিশুদ্ধ নিয়ত। নিয়তের বিশুদ্ধতার ওপর ভর করেই মানুষের কলব সত্য পথে টিকে থাকে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিও দ্বীনের ওপর জারি থাকতে পারে। ব্যক্তি দ্বীনের সঠিক পথে টিকে থাকতে পারলে তার কার্যক্রমও সঠিকভাবে পরিচালিত হয়। তাই নিয়তকে বিশুদ্ধ রাখা প্রতিটি মুসলিমদের দায়িত্ব। নিয়তে গণ্ডগোল থাকলে মানুষ কাজে ফাঁকি মারে। কাজের ভেতর ভিন্ন কোনো স্বার্থ চলে আসে। কাজের মানও খারাপ হয়। যার নিয়তে সমস্যা থাকে, তার ব্যক্তিত্বেও এর প্রভাব পড়ে। ফলে, অপরাপর মানুষও তাকে পছন্দ করে না, বরং এড়িয়ে চলে। সাময়িকভাবে নিয়তে জালিয়াতি করে কেউ যদি সাময়িকভাবে ফায়দা পেয়েও যায়, খুব শীঘ্রই তার প্রকৃত চেহারা সকলের সামনে উন্মোচিত হয়ে যায়। এ কারণেই এক সময়ের বহু প্রশংসিত ব্যক্তিকেও আমরা কালের বিবর্তনে অহরহ ধিকৃত হতে দেখি। 

স্বতন্ত্রতা

ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেছেন, “আমাকে কিয়ামতের আগে একটি তরবারিসহ সতর্কবার্তা হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে যাতে মানুষ শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে এবং আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক না করে। আমার রিজিক আমার বর্শার মাথায়ই নিহিত। তার জন্য অবমাননা ও লাঞ্ছনা যে আমার আদেশ অমান্য করে এবং যে কেউ এ ধরনের অমান্যকারীদের অনুকরণ করবে তারও একই পরিণতি হবে।” (আহমাদ: ৪৮৬৯) 

একজন মুসলিমের ব্যক্তিত্ব অবশ্যই অন্য সবার থেকে আলাদা হবে। এই ভিন্নধর্মী বৈশিষ্ট্য তার আচারাদি এবং বাহ্যিক অবয়বের মধ্য দিয়েও প্রকাশিত হবে। এই স্বতন্ত্রতা তার আপাত চেহারায়, বৈশিষ্ট্যে, আকিদায়, ইবাদতে, দুনিবাবি কার্যক্রমসহ সর্বত্রই প্রতিফলিত হবে। মুসলিম তার ভিন্নধর্মী ও ব্যতিক্রম বৈশিষ্ট্যাবলির কারণেই ইসলামকে সমুন্নত রাখতে পারে। সব ধরনের ভেজাল ও বিভ্রান্তি থেকেও নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে। একজন মুসলিম যদি তার জীবন যাপনে, সংস্কৃতিতে, জ্ঞানে অন্য সবার মতো হয়ে যায়, তাহলে তার নিজের জীবনে যেমন ইসলাম ক্রমাগতভাবে দুর্বল হতে থাকে তেমনি একজন মুসলিম হিসেবেও সে সমাজে ইতিবাচক কোনো ভূমিকা আর রাখতে পারে না।

ইনসাফ করা-ভারসাম্য বজায় রাখা

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেছেন, “নিজের বন্ধুর সাথে ভালোবাসার আধিক্য প্রদর্শন করবে না। হয়তো সে একদিন তোমার শত্রু হয়ে যাবে। তোমার শত্রুর সাথেও শত্রুতার চরম সীমা প্রদর্শন করবে না। হয়তো সে একদিন তোমার বন্ধু হয়ে যাবে।” (তিরমিজি-১৯৯৭)

একজন মুসলিমকে তার ভালোবাসা, ঘৃণা বা অন্যান্য আবেগ প্রকাশে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। দেওয়া ও নেওয়ার সময়েও তিনি মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবেন। মধ্যমপন্থা দ্বীন ও শরিয়াতের একটি বড় বৈশিষ্ট্য। তাই একজন ব্যক্তিত্ববান মুসলিম কখনোই সীমা লঙ্ঘন করতে পারেন না। বাড়াবাড়ি করার অবকাশ তার নেই। আবার যতটুকু তাতে করতেই হবে, তাতেও তিনি কখনো ঘাটতি রাখেন না। একজন মুসলিম তার নিজের প্রজ্ঞা বা প্রবৃত্তি বা নিজের খেয়ালখুশি মতো ভারসাম্য করে না। এক্ষেত্রেও তিনি ইনসাফ করেন কারণ আল্লাহ তায়ালা এমনটাই নির্দেশনা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, “আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমণ্ডলীর জন্য এবং রাসূল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্য।” (সূরা বাকারা : ১৪৩)

জীবন যাপনে ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ কোনো কাজ নয়। অনেকেই একাধিকবার ইনসাফ ও ভারসাম্য করার ঘোষণা দিয়েও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। কারণ তারা আল্লাহর নির্দেশনার আলোকে নয়, বরং বাস্তবতার নিরিখে ভারসাম্য করার চেষ্টা করেছেন। যদি আমাদেরকে সত্যিকারার্থে ভারসাম্য করতে হয়, তাহলে এক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশনাকেই সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা

আলী ইবনে জিয়াদ (রহ) থেকে বর্ণিত। একবার এক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা.কে প্রশ্ন করলেন, ‘ইসলামে কোন বিশ্বাসী বান্দা সর্বোত্তম? তিনি উত্তরে বললেন, “যার জিহবা ও হাত থেকে অপর মুসলিমরা নিরাপদে থাকে।’ লোকটি প্রশ্ন করলো, ‘সর্বোত্তম জিহাদ কোনটি?’ আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. উত্তরে বললেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা।’ লোকটি আবার প্রশ্ন করলো, ‘কোন হিজরতটি উত্তম?’ আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. বললেন, ‘আল্লাহর পথে থাকার জন্য প্রবৃত্তির প্ররোচনা ও অনিষ্টতা থেকে দূরে থাকা।’ লোকটি প্রশ্ন করলো, ‘হে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর, এগুলো কী আপনার কথা নাকি রাসূল সা. থেকে আপনি শুনেছেন? আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. বললেন, স্বয়ং রাসূল সা. আমাদেরকে এমনটাই শিখিয়েছেন। (তা’জিম কাদরিস সালাত-৬৩৯) 

নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই করাই একজন মানুষের ঈমান বৃদ্ধির সর্বোত্তম উপায়। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার সুযোগ পায়। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, “যারা আমার পথে সংগ্রাম ও সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সাথে আছেন।” (সূরা আনকাবুত : ৬৯)

নফস ও প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম একজন মুমিনের মর্যাদা ও মান বৃদ্ধি করে। এতে তার কলব পরিশুদ্ধ হয়। মুসলিম হিসেবে তার মান প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছে যায়।

ভদ্রতা

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেন, আল্লাহ হলেন রাফিক (ন¤্র), তিনি নম্রতা পছন্দ করেন। যারা ন¤্রতার সাথে দ্বীনের দাওয়াত দেয় তাদেরকে তিনি যে পরিমাণ সওয়াব দান করেন, কঠোরতা প্রদর্শনকারীকে ততটা দান করেন না। (ইবনে মাজাহ-৩৬৮৮)। 

ভদ্রতা ও মার্জিত আচরণের মধ্য দিয়ে মানুষের মন ও অন্তরগুলো একত্রিত হয়। ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং সমাজে ইতিবাচকতার প্রসার হয়। ভদ্রতার বিপরীতে আছে দুর্ব্যবহার ও নেতিবাচক অনুভূতি। এর ফলে সমাজে অনাস্থা ও অবিশ্বাসের বিচরণ হয়। মানুষজন একে অপরের সাথে প্রবঞ্চনায় লিপ্ত হয়। 

বারবার সত্যের কাছে ফিরে আসা

ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেছেন, “এমন কোনো মুমিন বান্দা নেই, যে একাধিকবার একই পাপ করে না। অথবা এমনও হতে পারে তিনি একটি পাপ বারবার করছেন, যতক্ষণ না তার পার্থিব আয়ু শেষ হয়। মূলত ঈমানদার বান্দাদেরকে আল্লাহ সৃষ্টিই করেছেন বারবার পরীক্ষা করার জন্য। কিন্তু এই বান্দাদের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা পাপ করার কারণে অনুতপ্ত হয় এবং বেশি বেশি তাওবাহ করে। তারপর আবার তা ভুলে গিয়ে পাপ করে বসে। আর যখন তাকে সতর্ক করা হয়, উপদেশ দেওয়া হয় তখন সে তা গ্রহণ করে।” (আল মু’জামুল কাবির-১১,৮১০)

সত্যের কাছে ফিরে আসা একটি মহৎ গুণ। আর নানা ওজরে মিথ্যা চালিয়ে যাওয়া নিন্দনীয়। সত্যের কাছে ফিরে আসলে একজন মানুষের মান ও মর্যাদা উন্নত হয়। আল্লাহর কাছে এবং মানুষের কাছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির গুরুত্ব বেড়ে যায়। শয়তান যেহেতু ভুল করার পর অনুতপ্ত হয়নি বরং অহঙ্কার করে তার অনিষ্টকর কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছে তাই সে সবসময়ই মানুষকে প্ররোচিত করে, যাতে মানুষ অনুতপ্ত না হয়। সুপথে ফিরে না আসে। শয়তান মানুষের কানে সুপথে প্রত্যাবর্তনকে একটি দুর্বলতা ও দোষ হিসেবেই প্রচার করে। অথচ ফিরে আসা ও অনুতপ্ত হওয়ার মাঝে বান্দার নিরহঙ্কারিতা প্রকাশ পায়। উন্নত ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

দায়িত্ববান হওয়া

উমর রা. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, জেনে রেখো! তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল; আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব ইমাম, যিনি জনগণের দায়িত্বশীল তিনি তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। পুরুষ গৃহকর্তা তার পরিবারের দায়িত্বশীল; সে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। নারী তার স্বামীর পরিবার, সন্তান-সন্ততির উপর দায়িত্বশীল, সে এসব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। কোনো ব্যক্তির দাস নিজ মালিকের সম্পদের দায়িত্বশীল; সে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব জেনে রাখো, প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্বাধীন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। (বুখারি-৩০০৫)

এই উম্মতের প্রতিটি সদস্যকেই তার নিজস্ব অবস্থান ও মান সম্পর্কে ভালোভাবে জানা দরকার। অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কেও অবহিত হওয়া প্রয়োজন। কোনো মুসলিমের নিজের দায়িত্ব ও কর্মপরিধিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আবার নিজের নির্ধারিত সীমানা অতিক্রম করে অপরের কাজে নাক গলানোও কাম্য নয়। যদি আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্বগুলো সততা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করতে পারতাম, তাহলে সবার জন্যই তা কল্যাণকর হতো। পৃথিবীর সর্বত্রই নিরাপত্তা ও নিরাপদ পরিবেশ সুনিশ্চিত হতো। একজন ইসলামী ব্যক্তিত্বের জন্য তাই দায়িত্ববান হওয়াটা খুবই জরুরি।

একজন মুসলিম অপর মুসলিমকে সুযোগ দেবে

হযরত সাদ ইবনে উবাদাহ রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেছেন, “অজুহাত মেনে নিতে আল্লাহ খুবই পছন্দ করেন। এ কারণেই তিনি সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারী প্রেরণ করেন।” (বুখারি-৫১২) এ কারণে একজন মুসলিমের উচিত তার দ্বীনি ভাইয়ের জন্য সুযোগ করে দেয়া, তাকে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নানা ধরনের অজুহাত তৈরি করা। অর্থাৎ কারো অমঙ্গল করার জন্য নয়, বরং কল্যাণ করার জন্য অজুহাত খোঁজা উচিত। আবার দ্বীনি ভাইরা কোনো ভুল করলে যদি নিজের পক্ষে অজুহাত দেয়, তাহলে তা গ্রহণ করে নেয়ারও মানসিকতা থাকা উচিত। এতে আমাদের মধ্যে সুপ্ত থাকা ইগো ও অহঙ্কার দূরীভূত হয়। সম্পর্কের গভীরতা বাড়ে। 

আল্লাহ তায়ালা স্বয়ংসম্পূর্ণ, নিখুঁত এবং কারো প্রতি মুখাপেক্ষী নন। অথচ আল্লাহ তায়ালা কত অবলীলায় মানুষের খোঁড়া যুক্তি, অজুহাত বা ওজরগুলো মেনে নেন। বিপরীতে, ‘আল্লাহর সামান্য একটি সৃষ্টি আমরা। নিজেদের মাঝেই ত্রুটি আর দুর্বলতার শেষ নেই। তাহলে আমরা কেন অপরকে ছাড় দিতে এতটা কার্পণ্য করি? প্রকৃত ঈমানদার বান্দারা অপর ভাইকে সুযোগ দেবে। আর মুনাফিকেরা কোনো সুযোগ দেয় না। তারা যেকোনো মূল্যে অপরের ক্ষতিসাধন করতে চায়। তাই প্রকৃত ঈমানদার বান্দাকে অপরাপর মানুষের প্রতি দরদি হতে হবে। তাদের কল্যাণ সাধনে অজুহাত দিতে হবে। অপরের ওজরগুলো মেনে নেওয়ার মতো ইতিবাচক মানসিকতাও লালন করতে হবে।

একজন মুসলিম হিংসার চাষাবাদ করতে পারবে না

ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেন, “দুটি প্রেক্ষিত ছাড়া হিংসা করার সুযোগ নেই। প্রথমত সেই ব্যক্তিকে ঈর্ষা করা যাবে যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন আর তিনি নেক উদ্দেশ্যে সেই অর্থ ব্যয় করেন। দ্বিতীয়ত সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ জ্ঞান দিয়েছেন, তিনি তা আমল করেন এবং অপরকেও সেই শিক্ষাই প্রদান করেন।” (বুখারি-৭৪)

যদি কোনো মানুষের মনে অপরের বিষয়ে হিংসা বা পরশ্রীকাতরতা থাকে তাহলে নিজের মনে থাকা অহঙ্কারকে প্রশ্রয় দিতে গিয়ে তিনি অপর মানুষের ক্ষতি সাধনেও পিছপা হবেন না। প্রতিটি মুসলিমেরই হিংসা ও পরশ্রীকাতরতার ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। সর্বোচ্চ চেষ্টা করা দরকার যাতে সে কখনোই হিংসার শিকারে পরিণত না হয়। কেউ যদি অপরের কাছে থাকা বিষয়টি নিজের জন্য কামনা করে কিন্তু বিনিময়ে অপরের লোকসান কামনা না করে, তাহলে এতটুকু হিংসাকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একজন প্রকৃত মুসলিম ব্যক্তিত্বের উচিত আল্লাহর কাছে প্রতিনিয়ত তার দ্বীনি ভাইদের জন্য দোয়া করা যাতে আল্লাহ তাকে হেফাজত করেন। হিংসা ও পরশ্রীকাতরতা থেকে দূরে রাখেন। আল্লাহর কাছে নিজের কল্যাণের জন্য দোয়া করা দরকার। তবে তা যেন কারো ক্ষতি করে না হয়।

আসমানি নির্দেশনা অনুসরণ করা

একবার হযরত আবু দারদা রা. এর মা তার ছেলে আবু দারদাকে বললেন, “অন্য মানুষেরা বাসায় মেহমান আসলে যা দিতে চায়, তুমিও কি তাই দিতে চাও না? আবু দারদা রা. উত্তরে বললেন, “আমি রাসূল সা. কে বলতে শুনেছি, তোমাদের সামনে একটি সুউচ্চ পর্বতমালা আছে। যাদের পিঠে ওজন কম শুধুমাত্র তারাই সেই পাহাড়টিতে আরোহণ করতে পারবে। যাদের পিঠে ভারী ওজনের কিছু রয়েছে তারা সেখানে উঠতেই পারবে না।” (আল হাকিম-৪/৫৭৪)

চিন্তা করা প্রয়োজন। বর্ণিত বিষয়টি খুব জরুরি কিছু নয়, বরং সামান্য মেহমানদারির বিষয়। অথচ সাহাবাগণ এক্ষেত্রেও কত সূক্ষ্মভাবে রাসূলের সা. নির্দেশনা মেনে চলার চেষ্টা করতেন। আমাদেরও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একইভাবে আসমানি নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন। এই পৃথিবীটি একজন মুসলিমের কাছে পরকালে যাওয়ার সিঁড়ি ছাড়া অন্য কিছু নয়। তাই এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে একজন মুসলিমের শুধুমাত্র তার অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা পূরণ নিয়েই ব্যস্ত থাকা প্রয়োজন। 

কোনো মুসলিমই পার্থিব চাহিদা পূরণকেই কেউ জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে নিতে পারে না। পার্থিব বিষয়াদিকেই নিজের জন্য কল্যাণকর বলে ভাবতে পারে না। যারা জীবনের সোনালি মুহূর্তগুলো এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর স্বাদ আস্বাদনে ব্যয় করে তাদের মতো দুর্ভাগা কেউ নয়। এই যৌবন থাকবে না। অথচ বহু যুবক যুবতী জীবনের শ্রেষ্ঠতম এই সময়টিকে অনর্থক কাজে অতিবাহিত করে। মূলত এগুলো সবই শয়তানের ফাঁদ বা চক্রান্ত। সত্যিকারের মুসলিম ব্যক্তিত্বের শয়তান সৃষ্ট এ ধরনের ফাঁদে না পড়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত।

লেখক : সাংবাদিক, অনুবাদক ও কলামিস্ট

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির