সর্বশেষঃ
post

মসজিদ : মুসলিম উম্মাহর নিউক্লিয়াস

মোহাম্মদ জাবেদুল হক তৈয়ব

০৯ জুলাই ২০২২

মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের সূতিকাগার মসজিদ। এখানে কোনো ভেদাভেদ নেই। মসজিদে সালাত আদায়কালে সবাই শ্রেণিবিভেদ ভুলে গিয়ে এক কাতারে দাঁড়িয়ে সাম্য, মৈত্রী ও সৌহার্দ্য গড়ে তোলে। এটা মনে রাখা জরুরি অন্য ধর্মের উপাসনালয়ের মতো মসজিদ নিছক কোনো উপাসনালয় বা ইবাদতগৃহ নয়; বরং এটা মুসলিম উম্মাহর ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। রাসূল সা.-এর সময়কালে তিনি মসজিদে নববীতে বসেই সালাত আদায়ের পাশাপাশি এই মসজিদকে প্রধান বিচারালয়, সংসদ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বিভিন্ন দেশ থেকে রাষ্ট্রদূতরা এলে নবীজি সা. মসজিদে বসেই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালাতেন, রাষ্ট্র বা ব্যক্তির সমস্যা নিয়ে কথা বলতেন। এই মসজিদে নববীতেই বিচারকার্য সম্পন্ন হতো, যুদ্ধের ফয়সালা করা হতো, বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হতো। এসব কাজ শুধু রাসূল সা.-এর যুগেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এই কাজের ধারাবাহিকতা খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও অব্যাহত ছিল। তাই এক কথায় বলা চলে এই মসজিদ মুসলিম উম্মাহর নিউক্লিয়াস।

কিন্তু বর্তমানে আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন মসজিদে নোটিশ বোর্ডে বা দেয়ালে লিখে রাখা হয়- ‘মসজিদে দুনিয়াবি কথা বলা হারাম’। তাহলে এখন ভাবার বিষয় রাসূল সা. বা খলিফারা কি হারাম কাজ করেছিল? নাউযুবিল্লাহ। জুমার খুতবা চলাকালীন আর সালাত আদায়কালে রাসূল সা. কথা বলতে নিষেধ করেছেন। আর এ ব্যতিক্রম ছাড়া দুনিয়াবি কথা না বলার কোনো ভিত্তি নেই।

এ প্রসঙ্গে ইমাম নববী (রহ.) বলেন- মসজিদের মধ্যে দুনিয়াবি বিষয় ও বৈধ কথাবার্তা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলা যায় যদিও তাতে হাসি আসুক না কেন। (আল মাজমু শরহু মুহাজ্জাব: ২/১৭৭)।

জাবির রা. বর্ণনা করেন- রাসূলুল্লাহ সা. যে স্থানে ফজরের সালাত আদায় করতেন, সেখানে সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে থাকতেন। তার সামনে সাহাবিরা জাগতিক কথা বলতেন, জাহিলি যুগের আলোচনা করতেন, কবিতা আবৃত্তি করতেন এবং হাসতেন। আর এসব শুনে রাসুল সা. শুধু মুচকি হাসতেন। (মুসলিম-২৩২২)

মুসলিম উম্মাহর পারিবারিক ও সামাজিক যত সমস্যা সেগুলোর সমাধান মসজিদে বসেই করা উচিত। রাসূল সা.-এর যুগে মানুষ যেমন সমস্যা নিয়ে মসজিদে এসে সমাধান নিয়ে বাড়ি ফিরতেন তেমনি আমাদের মসজিদগুলোকে Problem solving center হিসেবে গড়ে তোলা উচিত।

মসজিদমুখী প্রজন্ম গড়ে তুলুন

আপনি যদি একটি অপরাধমুক্ত, অশ্লীলতামুক্ত প্রজন্ম দেখতে চান, তাহলে শিশু ও তরুণদের মসজিদমুখী করুন। যে প্রজন্মকে মসজিদমুখী করার অভ্যাস করা যাবে, স্বাভাবিকভাবে সে প্রজন্ম কল্যাণকামী হবে। শিশু তরুণদের যদি মসজিদ চেনাতে না পারেন, স্বভাবতই তারা ধ্বংসাত্মক জায়গা চিনে নিবে। আর এই কারণে সৃষ্টি হচ্ছে কিশোর গ্যাং।

আমাদের অনেকে মসজিদে বাচ্চারা এলে তাদের সাথে খারাপ আচরণ করে। তাদের সাথে ধমকের সুরে কথা বলে। বাচ্চারা দুষ্টুমি করবেই এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই কারণে আপনি বা আমরা বাচ্চাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে পারি না। রাসূল সা. আমাদের কী শিখিয়েছেন? তিনি যখন সিজদাতে যেতেন ইমাম হাসান ও হোসেন রা. তার কাঁধে চড়ে বসতেন। তারা যতক্ষণ কাঁধ থেকে নামতেন না রাসূল সা. ততক্ষণ সিজদা থেকে উঠতেন না। তারপরও নাতিদের ধমক দেননি। খুতবাহ চলাকালীন নাতিরা মসজিদে এলে তিনি খুতবাহ বন্ধ করে ওদের কোলে নিতেন। আর বর্তমান লোকজন তাদের ধমক দিয়ে বের করে দেন। এরকমও হয়েছে যে, মসজিদে বাচ্চা কান্নাকাটি করার কারণে তার অভিভাবককে ধমকানো হয়েছে। কোথা থেকে আমাদের এতো সাহস আসে? যেখানে রাসূল সা. বাচ্চাদের কান্না শুনলে সালাত সংক্ষিপ্ত করে ফেলতেন। তবে এক্ষেত্রে অভিভাবকরা একটু সচেতন হয়ে সময় নিয়ে মসজিদের আদব সম্পর্কে বাচ্চাদের বুঝালে একসময় তার বুঝ আসবে। কিন্তু আপনি যদি ধমক দেন তাহলে সে হয়তো ভয় পেয়ে মসজিদে আসা বন্ধ করে দেবে। তখন কে নেবে এই দায়ভার?

যে সমাজের মসজিদে শিশু-কিশোরদের পদচারণায় মুখর থাকে, সে সমাজে মুসল্লির অভাব হয় না। সে সমাজে খোদাদ্রোহিতা স্থান পায় না। সে সমাজ হবে আলোকিত সমাজ।

আলোকিত সমাজ বিনির্মাণে মসজিদ যেমন হওয়া উচিত

মসজিদ ইসলামী সমাজব্যবস্থার নিউক্লিয়াস। ইসলামী সমাজ আবর্তিত হবে মসজিদকেন্দ্রিক। তাই মসজিদকে গড়ে তুলতে হবে শুধু ইবাদতখানা নয়; বরং আদর্শ মানুষ তৈরির কারখানা হিসেবে।

মসজিদের আয়তন বৃহৎ পরিসরে হওয়া উচিত। বড় এরিয়া নিয়ে মসজিদ নির্মাণ করতে হবে। যেন মসজিদকে কেন্দ্র করে একটি সমাজের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা, বিনোদন ও গবেষণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা সম্ভব হয়।

পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকা।

মনোরম ওয়াশ এরিয়া/ অজুখানা থাকা।

মসজিদের বাইরে ফুলের বাগান থাকা। পরিবেশবান্ধব মসজিদ হওয়া।

চাহিদামতো এয়ারকন্ডিশন, সিসি ক্যামেরা, উন্নত কার্পেট, ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম, জুতা রাখার নিরাপদ বাক্স, সুতরা, রেহাল, টিস্যুর বক্স, টাওয়াল, পারফিউমের বোতল ইত্যাদির ব্যবস্থা করা।

মসজিদ ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে সিকিউরিটি গার্ড নিশ্চিত করা।

মসজিদ ম্যানেজমেন্ট অফিস তৈরি করা, যেখান থেকে মসজিদের সকল কাজ অপারেট করা হবে।

যোগ্য ইমাম নিয়োগ দেওয়া। ইমাম নিয়োগ দেওয়ার সময় খেয়াল রাখা উচিত উনার যেন ঐক্য বজায় রাখার ক্ষমতা থাকে, নিজেকে সমসাময়িক বিষয়ের উপর আপডেট রাখেন কিনা, বাংলার পাশাপাশি যেন অন্তত আরো একটি ভাষায় দক্ষতা থাকে, সাবলীল উপস্থাপনার সক্ষমতা থাকে, সকলের কাছে যেন আস্থাবান হতে পারেন, তাকে দেখে যেন সমাজের অন্যান্যরা অনুসরণ করতে পারে, নেতৃত্বের গুণাবলি থাকে এবং জাহেলিয়াতের প্রভাব থেকে সমাজের মুক্তির জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে ভালো গবেষণা করতে পারেন।

মসজিদে একটি আদর্শ পাঠাগার থাকা।

শিশুদের, তরুণদের ও বয়স্কদের কুরআন, হাদিস ও দ্বীনি শিক্ষা দেওয়ার জন্য শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করা।

মসজিদের তত্ত্বাবধানে একটি সমৃদ্ধ গবেষণাগার থাকা। 

মসজিদ এলাকায় শিশুচত্বর বা Kids zone থাকা। যেখানে মসজিদে আসা বাচ্চারা তাদের উপযুক্ত পরিবেশ পেতে পারে। তারা এখানে তাদের বিনোদনের পরিবেশ পেলে বারবার মসজিদে আসতে চাইবে।

মহিলাদের সালাত আদায়ের পরিবেশ থাকা।

মসজিদ এরিয়ায় কমিউনিটি সেন্টার থাকা। সমাজের বিবাহ, আকিকা ও দাওয়াতের আয়োজন এখানেই হবে। তাহলে বিয়েতে যেসব অনৈসলামিক কাজ হয় তা থেকে সমাজ রক্ষা পাবে।

মসজিদের বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ, মীমাংসা, শালিস ও বৈঠক করার জন্য কনফারেন্স রুম থাকা।

সুদের কালো থাবা থেকে রক্ষার জন্য মসজিদের তত্ত্বাবধানে কর্জে হাসানা ফান্ড গঠন করা। অন্তত এক লক্ষ টাকার। ১০০ জন মানুষ ১০০০ টাকা করে দিলে এক লক্ষ টাকার ফান্ড গঠন কোনো ব্যাপার না।

একটি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করা।

মসজিদে আসা মুসল্লি ও পথচারীদের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করা।

রমাদানে একসাথে ইফতারের আয়োজন করা।

দাওয়াহ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা।

মসজিদে ধারাবাহিক তাফসির প্রোগ্রাম করা।

যুবকদের জন্য বিশেষ প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করা।

জাকাত, কুরবানির গোশত, জরুরি ত্রাণতহবিল, মেডিক্যাল ক্যাম্প, বিবাহ প্রকল্প, শীতবস্ত্র, ঈদবস্ত্র বিতরণের ব্যবস্থা করা।

মসজিদকেন্দ্রিক যে চেতনা, তা থেকে সুকৌশলে আমাদের দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা হারিয়েছি আমাদের সোনালি অতীত, যশ, খ্যাতি। এমনকি স্বাচ্ছন্দ্যে বাঁচার অধিকারও। তাই আমাদের আবার ফিরে আসতে হবে মসজিদকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থায়। কারণ এখানেই আছে রহমত, বরকত ও ঐক্যের যাবতীয় উপাদান। মসজিদ হোক মুসলিম উম্মাহর নিউক্লিয়াস বা সেন্টার পয়েন্ট। আমিন।

লেখক : শিক্ষার্থী, হাজীগঞ্জ দারুল উলুম আহমদিয়া 

কামিল মাদরাসা, চাঁদপুর

আপনার মন্তব্য লিখুন

মোহাম্মদ জাবেদুল হক তৈয়ব

- 1 month ago

ছাত্রসংবাদ পরিবারকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার লেখাটি প্রকাশ করার জন্য।

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির