post

রাজনৈতিক উত্থান

মো. তারেক হাসান

২৫ এপ্রিল ২০২৪

বিশ্বরাজনীতির দোলাচল বিষয়ে ওহাইও ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক রাজনৈতিক পটপরিক্রমা, পরিবর্তন, ও সন্দেহাতীত ক্ষমতার পালাবদল এবং একটি রাষ্ট্রের আপরাইজিং নিয়ে বলতে গিয়ে উদাহরণ হিসেবে একবার একটি উপদেশবাণী দিয়ে বলেছিলেন: ‘যখন আপনি বর্তমানের সঙ্কটের কথা লিখবেন তখন ইতিহাসের ক্ষতগুলোর কথা কখনোই ভুলে যাবেন না।’ ইতিহাসের ক্ষত বারবার ফিরে আসে ক্ষমতার পালাবদলের মধ্য দিয়ে। তার বক্তব্যে অনেকটাই থমকে গিয়েছিল পুরো বিশ্ব। তিনি বিশ্বকে বিশ্বাস করাতে বাধ্য করলেন যে বিশ্ব একটি নতুন বিপজ্জনক পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে যেখানে একমাত্র পরাশক্তি যেমন তার আধিপত্য হারায় সময়ের পরিক্রমায় আবার ঠিক একই সময়ে অতীতের সাম্রাজ্যগুলো বড় বড় অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রতিশোধ নিতে চায় যা মানচিত্র ও ক্ষমতার বণ্টন পরিবর্তন করবে। তিনি বিশ্বাস করেন যে অভ্যুত্থানসমূহ বিভিন্ন আদর্শিক অবস্থানে রূপ নেবে, যেমন সামরিক বা আদর্শিক আক্রমণ, ড্রোন, রকেট ও সাইবার আক্রমণ এবং মিলিশিয়াদের পৃষ্ঠপোষকতা। সাম্রাজ্যের প্রতি অন্যায় ও অবিচারের ক্ষত যে ফিরে আসে যারা বিশ্বাস করে ঠিক তারাই ইতিহাসের দ্বারা নিজেদের রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনের স্বপ্ন দেখে। এই সাম্রাজ্যগুলো কি সুপ্ত আগ্নেয়গিরিগুলোকে আশ্রয় দেয় না যেগুলো তাদের ক্রোধ প্রকাশ করার জন্য সঠিক মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করে থাকে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বেশ কয়েকজন আরব কমিউনিস্ট নেতা সে সময় বলেছিলেন যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে যতই দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করা হোক না কেন একসময় ঠিকই সে তার প্রতিশোধ গ্রহণে তৎপর হয়ে ওঠে। সুদানি, ইরাকি ও লেবাননের কমিউনিস্ট পার্টির নিজ নিজ সেক্রেটারি-জেনারেল মোহাম্মদ ইব্রাহিম, আযীয মোহাম্মদ ও জর্জ হাউই বলেছেন‌, সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পরে রাশিয়া পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে কখনোই নিচে পড়ে থাকবে না এবং পরাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হবে না। এটি পুনরায় সংগঠিত হবে, উঠে দাঁড়াবে এবং প্রতিশোধ নেবে। বর্তমান পরিস্থিতির কথা চিন্তা করলে রাশিয়ার বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা ও আগ্রাসন ঠিক সে কথাই মনে করিয়ে দেয়। অতীতে কসোভোকে গ্রাস করা আর বর্তমানে ইউক্রেন নিয়ে চলমান খিলা পুনরায় যে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠনের প্রচেষ্টার অংশ না তা কিভাবে নিশ্চিত হতে পারেন?

কতিপয় পর্যবেক্ষক বলেছেন যে রাশিয়ার সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান, যারা সোভিয়েত পতন এবং ভয়ানক পশ্চিমা বিজয়ে ভেতরে ভেতরে দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছিল, তারা গোপন প্রতিশোধের পরিকল্পনাও করেছিল এবং এটি বাস্তবায়নের জন্য একজন জুনিয়র কেজিবি অফিসারকে দায়িত্ব দিয়েছিল। অতি স্বাভাবিকভাবেই আপনি এটা কল্পনা করতে পারবেন না ঠিকই। তবে ঘটনার সত্যতা অনেকাংশে সে সময়কার রেডিও, টেলিভিশন থেকে পাওয়া খবর আর বিভিন্ন নিরাপত্তাকর্মীদের বক্তব্য থেকে কিছুটা আঁচ করা যায়। কারণ অতিরঞ্জিত পরিস্থিতিতে কোনো রাষ্ট্রই তার স্বাভাবিক পেশাভিত্তিক আচরণের অংশীদার হয়ে ওঠে না। কিন্তু বর্তমানে একজন ব্যক্তির এটা ভাবার অবশ্য অধিকার আছে যে একসময়ের আহত সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন একজন শক্তিশালী জারের অধীনে বসবাস করছে; যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পূর্বের ক্ষত বিক্ষত ইতিহাসের শিক্ষা লালন করে পরবর্তীকালে রাশিয়াকে সর্বশ্রেষ্ঠ ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের তকমা দিতে এক বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন।

২০২৪ সালের ২২ মার্চ মস্কোতে যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে তা একপাশে রাখুন। এ ভয়ানক গণহত্যা ভøাদিমির পুতিনের অবশ্যম্ভাবী চিন্তার রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে না। বাইডেন, ট্রাম্প, ম্যাক্রন ও স্কোল্টজের মতো ব্যক্তিরা কেবল স্বপ্নই দেখতে পারেন এমন এক বিশাল বিজয়ে। পুতিন সবেমাত্র রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন আর এই সন্ত্রাসী হামলা একটি দেশের অভ্যন্তরীণ পটপরিক্রমাকে পাল্টে দিতে পারেন না। জনগণের আশা আকাক্সক্ষার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে পুতিনের অবশ্য কোনো চিন্তা নেই। পুতিন মনে করেন, রাষ্ট্রের অতীত ইতিহাসকে ধারণ করতে হলে বর্তমানের অনেক ঘটনাকে পাশ কাটিয়ে চলতে হয়। শ্রেষ্ঠত্ব সবসময় রাষ্ট্রের মধ্যকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যে লুক্কায়িত থাকে না; বরং রাষ্ট্রের পলিসি রাষ্ট্রকে শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের মন মানসিকতার ওপরেও নির্ভর করে। আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই অবগত এবং এক্ষেত্রে পশ্চিমারাও যে অভিযোগটি প্রদান করেছেন যে রাশিয়ার নির্বাচনটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে তিনি গুরুতর প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নিয়ে ফলাফলকে তার পক্ষে নিতে পারেন এবং অনেকের কাছে অবাস্তব হিসেবে পরিগণিত হলেও আমার কাছে বহুলাংশে বিশ্বাসপরায়ণ হিসেবে ধরা দিয়েছে যে পুতিন রাশিয়ান চেতনার গভীরতার সাথে সংযোগ স্থাপনে সফল হয়েছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দেখা যায় মস্কোর প্রবীণরা জোসেফ স্ট্যালিনের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের জন্য আকুল আবেদন জানিয়েছেন। ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিতে বাধ্য করে যে রাশিয়ানরা শক্তিশালী শাসককে ভালোবাসে, এমনকি যদি এর অর্থ নির্মম হত্যা ও প্রলোভনে জর্জরিত রাষ্ট্রনায়কের মস্তক অবনত করার প্রয়োজনও পড়ে।

ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক পলিসি সম্পর্কে যারা ধারণা রাখেন এবং যে ব্যক্তি পুতিন সম্পর্কে অবগত এবং তাকে ভালোভাবেই খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন তাদের মধ্য থেকে ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক ফোরামের ড. কিরমান তেশক্রুভেচ বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে পুতিন ইউক্রেনে পরাজয় সহ্য করতে পারবেন না। এমনকি যদি এর অর্থ পারমাণবিক আগুনের কিনারায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। রাষ্ট্রকে শক্তিশালী ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্ঠিত করতে হলে বিজয়ী চিন্তার লালন করা এবং সে অনুযায়ী কর্মপন্থা নির্ধারণ করা জরুরি। তিনি সঠিক কিনা বেঠিক সে প্রশ্ন অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই বিতর্কের জন্ম দিতে পারে তবে  পুতিন জানেন যে ইউক্রেনে পরাজয় রাশিয়াকে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো পতনের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আর এজন্য ইউক্রেনে বিজয় রাশিয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কয়েকটি বিষয় খুবই জরুরি হিসেবে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে আর তা হলো সোভিয়েত ইউনিয়নকে একপেশে করার অন্যতম কারণ ছিল পুঁজিবাদের বিরোধী একটি সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হোক তা কখনোই পুঁজিবাদের পক্ষাবলম্বনকারী দেশগুলো চায়নি। অনেকাংশে বিশ্ব রাজনীতিতে নেতৃত্ব প্রদানকারী দেশ হিসেবে সে সময়কার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কাছের শত্রু হিসেবেও সোভিয়েত ইউনিয়নকে ধরা হয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নকে অনেকাংশেই কাবু করার একটা পরিকল্পনা সে সময়কার ঘটনাবলি থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায়। ভøাদিমির পুতিন অবশ্য সেই ক্ষত এখন পর্যন্ত লালন পালন করে যাচ্ছেন।

ইতিহাসের এমন অহরহ ঘটনাবলি পরবর্তীকালে শুধু একটি রাষ্ট্রের ক্ষতবিক্ষত রাষ্ট্র ব্যবস্থার চিত্রকেই সামনে নিয়ে আসে না; বরং এ রাষ্ট্রটি কেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির মোড়লদের ক্রুধান্বিত বলয়ের অংশ হিসেবে দাঁড়ালো তা অবশ্যই পর্যালোচনার দাবি রাখে। তৎকালীন ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের এক বন্ধু সে সময়কার এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছিল যে রাজনীতির ঘোড়া রাজনীতির মধ্যবর্তী অবস্থানে অবস্থান করে পারিপার্শ্বিক কুটিলতাকে বিশেষভাবে আকর্ষিত করে। এক্ষেত্রে তার কথাকে অগ্রাহ্য করার বিশেষ কোনো কারণ থাকতে পারে বলে আমার মনে হয় না। তিনি বলেন যে কুয়েতকে অযথাই শত্রুর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এবং একটি রাষ্ট্রকে কিছু নিয়মতান্ত্রিক অভিযোগের তীর প্রক্ষেপণ করে তার প্রতি শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব প্রকাশ করে আক্রমণ করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। ইরাকের প্রেসিডেন্ট পরবর্তীকালে কুয়েত থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করার ব্যর্থতাও ইতিহাসের সামনে এবং বাগদাদে তার রাষ্ট্রের সামনে তার চারিত্রিক কুটিলতার পরিচয় দেয়। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে ইউক্রেনের আগ্রাসন কুয়েতের আগ্রাসনের চেয়ে আলাদা। তবে যুগে যুগে রাষ্ট্রনায়করা কিছু ভুলের অবতারণা করে নিজেদের শক্তিশালী প্রদর্শন করার চেয়ে উচ্চাভিলাষী চিন্তা চেতনার বহিঃপ্রকাশ করেন। নিজ রাষ্ট্রকে নিরাপত্তার বেষ্টনীতে আবদ্ধ করা এবং শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের লড়াইয়ে এগিয়ে রেখে স্বপ্নবিলাসী চিন্তা তা তার প্রতি শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের চক্ষুশূলের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে ‘ঐতিহাসিক নেতা’ কখনো কখনো নিজের ইমেজে বন্দী হন শুধুমাত্র অভিলাষী মনোবাসনা পোষণ করার জন্য। পশ্চিমারা পুতিনের অভ্যুত্থানকে কখনোই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেনি এবং তারা বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পুতিনের আপরাইজিংকে একটি অবশ্যম্ভাবী কালোরেখার সাথে তুলনা করে। পুতিনের উত্থান যেমন রাশিয়াকে পুনরায় সোভিয়েত ইউনিয়ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মনোবাসনাকে গ্রহণ করে ঠিক সেইভাবে ইরানের ইতিহাসও এমন একটি আলোচনার জন্ম দেয়। ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পরে ইরানের অভ্যুত্থানের সাথে কয়েকটি বিষয় খুবই যৌক্তিকভাবে জড়িয়ে পড়ে। ইরানে বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পরে ইরানের অভ্যুত্থান চারটি মানচিত্রের বৈশিষ্ট্য এবং তাদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে। এটি তেহরানকে মন্ত্রী নিয়োগ, সরকার গঠন ও রকেট ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন প্রদান করার মধ্য দিয়ে ইরানি মিলিশিয়া বাহিনীকে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের অধিকার দিয়েছে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা খুবই জরুরি আর সেটা হলো বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হুতি মিলিশিয়াদের অতর্কিত করা হামলার মোকাবেলা করছে যার ফলে এটি চীন এবং রাশিয়াকে তাদের জাহাজগুলোকে লোহিত সাগরে নিরাপদে যাত্রা করার অনুমতি প্রদান করে। কেননা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কখনোই চায় না বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরেকটি সুপার পাওয়ারের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করুক।

কয়েক দশক আগে, ইরানের রেজা শাহ পাহলভী তার দেশের সীমানাকে এমন একটি মানদণ্ড হিসাবে দেখেছিলেন যা তার সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার গ্রহণ করার মাধ্যমে ইরানকে সংস্কারবাদী এক রাষ্ট্রে পরিণত করার মধ্য দিয়ে বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের দমন করার নীতি হিসেবে গ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে তার শক্তিশালী মনোভাবের কোনো কমতি ছিল না। ইরানের রাষ্ট্রক্ষমতায় খোমেনির উত্থান ইরানকে সম্পূর্ণভাবে একটি শক্তিশালী স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পরও পারমাণবিক অস্ত্রধর রাষ্ট্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করার চিন্তা লালন করেন। খোমেনির বিপ্লব শুধু রেজা শাহ পাহলভীকে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে অটোমান সাম্রাজ্যকে নিয়ে পশ্চিমাশক্তি যে কলঙ্কজনক এক অধ্যায়ের সূচনা করেছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে একটি শক্তিশালী ইসলামী প্রজাতন্ত্র কায়েম করা এবং বিশ্বের নেতৃত্ব প্রদানকারী স্থানে অধিষ্ঠিত করাও অন্যতম লক্ষ্য ছিল। রেজা শাহ পরবর্তী খোমেনির ইরান এখন জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক বলিষ্ঠতা, পারমাণবিক অস্ত্রধর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেই চলেছে।

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জার্মানির ইতিহাস এক বেদনাবিধুর এবং কলঙ্কজনক ইতিহাসের জন্ম দিলেও অটোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম কাণ্ডারি আজকের তুরস্ক ইতিহাসের ক্ষত থেকে খুব বেশি দূরে নয়। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেব এরদোগানও তুরস্কের বর্তমান সীমানাকে একটি আঁটসাঁট পোশাক হিসেবে দেখেন যা অটোমান সাম্রাজ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতির চেতনাকে ধারণ করে এবং শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রদান করার মধ্য দিয়ে পুনরায় অটোমান সাম্রাজ্যের স্বপ্ন দেখা এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রদানের মধ্য দিয়ে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার যে মনোবাসনা সেটাও ইতিহাসের চরম শিক্ষা এবং ক্ষত থেকেই জন্ম। রাশিয়া‌র বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন যেমন রাশিয়াকে তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে একত্রীকরণের মধ্য দিয়ে এবং এক শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদী চিন্তা লালন-পালন করেন ঠিক তেমনি রিসেপ তাইয়্যেব এরদোগানও তুর্কি ভাষাভাষীদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করছেন। আরব বসন্তের মাধ্যমে তিনি এই অঞ্চলের প্রধান দেশগুলোর বৈশিষ্ট্যগুলোকেও পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছিলেন। তুরস্ক, ইরান ও রাশিয়া তাদের রাষ্ট্রের সাথে অনিয়ম ও অত্যাচারের অংশ হিসেবে বিরোধীপক্ষের সাথে যে যুদ্ধ এবং তার রাষ্ট্রকে ক্ষতিসাধনের দৃশ্যকে সাম্রাজ্যের সামগ্রিক একত্রীকরণ নীতিগুলোকে নিয়ে গর্ব করে। এরই অংশ হিসেবে তুরস্ক ইরাকের অভ্যন্তরে একটি ‘নিরাপত্তা বেল্ট’ এবং সিরিয়ার অভ্যন্তরে একটি ‘শক্তিশালী পথ’ প্রশস্ত করেছে। আর অন্যদিকে রাশিয়া ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে নিজস্ব বেল্ট প্রতিষ্ঠার জন্য অনবরত সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে এবং এক্ষেত্রে একটা কথা বলা বাহুল্য যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনকে শুধুমাত্র একটি রাষ্ট্র বর্ধনের নিয়মতান্ত্রিক নীতি হিসেবেই গ্রহণ করেনি বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া অর্থনৈতিক অবরোধকে অগ্রাহ্য করে ক্ষমতার সফল ব্যবহারকে লেজিটিমেট করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

বর্তমান পরাশক্তি চীনও ভুগছে অতীত ইতিহাসের ক্ষত নামক এক কাঁটাতারের বেড়ায়।‌ জাপানের সাথে চীনের দ্বন্দ্ব এবং পরবর্তীতে রাশিয়ার সাথে সমাজতন্ত্রবাদী চিন্তাভাবনা নিয়ে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ক্ষমতার ভারসাম্যহীন নীতিতে পতিত চীনও তার অর্থনৈতিক বলিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে ক্ষত শোকানোর চেষ্টায় লিপ্ত। হংকং নিয়ে চীনের সাম্রাজ্যবাদী চিন্তার বিস্তার এবং তাইওয়ানকে অধিগ্রহণের মধ্য দিয়ে নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন এবং বিশ্বব্যাপী চূড়ান্ত ক্ষমতায় একীভূত হওয়ার যে মনোবাসনা তারই একটি শক্তিশালী উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে এবং বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে ঋণ অস্ত্র প্রদানের মধ্য দিয়ে নিজের বলয়ের মধ্যে আলাদা একটি জায়গা তৈরি করার কূটনৈতিক পরিকল্পনা হাতে নিয়ে এগিয়ে চলছে চীন। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি খুবই স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সামনে এমন একটি চিত্রের অবতারণা করে যে তাইওয়ানকে চিরতরে গ্রাস না করা পর্যন্ত চীনকে শি জিংপিংয়ের সুপ্ত সাম্রাজ্যবাদী চিন্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না এবং এর প্রায়োগিক শিক্ষা ও ধৈর্য দিনে দিনে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। তবে বলা বাহুল্য যে রাশিয়ার মতো শি জিনপিং এখন পর্যন্ত কঠোরভাবে তার সাম্রাজ্যবাদী চিন্তা চেতনাকে লালন করেনি; আর এ কারণেই কসোভো এবং ইউক্রেনের মতো রাষ্ট্রের প্রতি খুব শক্তিশালীভাবে দখলদারিত্ব নীতি প্রয়োগ করেনি। শি জিনপিং বরং পুতিনের বিপরীতে সীমান্ত পরিস্থিতি ঠিক করার কাজেই ব্যস্ত।

বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যই হলো পারস্পরিক রাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান সাম্রাজ্যের বিশৃঙ্খলা দমনের নামে নিজের ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করা এবং তার বিপরীতে বাণিজ্যিক এবং সামরিক সহযোগিতা প্রদানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা সুসংহতকরণের পলিসি গ্রহণ করা। পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহ এখন যতটা বিশ্বকে পরিচালনা করতে উদ্যত বরং তার চেয়েও নিজ রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে সচল এবং সামরিকভাবে শক্তিশালীকরণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মোড়ল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার অভিপ্রায়ে কাজ করে চলে। অতীতের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অপঘাতে ভেঙে চুরমার রাষ্ট্রগুলো এখন জেগে উঠেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সেবার বাইরে এবং জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের কান্না গাজা বা ইউক্রেনের ক্ষত মেটাতে পারে না। সম্প্রতি মস্কোতে সন্ত্রাসী হামলা এবং লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনায় তা বিপজ্জনক হলেও ভøাদিমির পুতিনের জন্য পরবর্তী টার্মের জন্য ক্ষমতা সুসংহতকরণের পথে বাধা হিসেবে কাজ যে করবে না সেটা খুব স্বাভাবিকভাবেই বলা চলে। নাভালনির মৃত্যুর পর রাশিয়া ভøাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে আবার ঠিক সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো পুনরায় শক্তি অর্জনের পথে এগিয়ে যাবে বলেই রাশিয়ার সাধারণ জনগণ মনে করেন। বিরোধীপক্ষের সদস্যদের প্রতি নির্যাতন, হামলা এবং মামলার কার্যক্রম চালালেও বস্তুতপক্ষে রাশিয়ার বৃহৎ একটি সংখ্যক জনগণ এখনো মনে করেন কেবল ভøাদিমির পুতিনই পারেন রাশিয়াকে তার অতীত ইতিহাসের জায়গায় পুনরায় প্রতিস্থাপন করতে। নাভালনির মৃত্যুর পর গোয়েন্দা সংস্থার দ্বারা স্বীকারোক্তিমূলক কারসাজির অভিযোগ আনলেও পুরো সত্য অনেকেই কী হতে পারে আশঙ্কা করলেও সেটা পুতিনের কারণেই তা অনেকাংশে যে চেপে গেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ইউক্রেনীয় থ্রেড সম্পর্কিত তত্ত্ব সত্য হলে নাভালনির মৃত্যুটি একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবেই চিহ্নিত ছিল। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুতিন নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আরো একবার ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যাপক সংঘর্ষের পথ প্রশস্ত হতে পারে। কেননা ইউক্রেনই এখন পুতিনের সাম্রাজ্যবাদী চিন্তা লালন করার অন্যতম প্রশস্ততম একটি পথ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো রাশিয়াকে পুনর্গঠিত করার একমাত্র উপায়, আর তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভালোভাবেই জানে।

এখন প্রশ্ন একটাই পশ্চিমারা কি রুশ অভু্যুত্থানের এ বিজয় সহ্য করতে পারবে? ইউরোপ কি এত বড় তেতো সত্য বদহজম করার জন্য প্রস্তুত? পশ্চিমারা যদি ইউক্রেন যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার এবং নতুন সাম্রাজ্য ও তার জারকে ছাঁটাই করার সিদ্ধান্ত নেয় তবে রাশিয়া ও ক্রেমলিনের প্রভুর কী হবে? অতীতের ক্ষত ইতিহাসকে সামনে রেখে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রভূমিতে আবির্ভূত হওয়ার মধ্য দিয়ে তারা কি তাদের প্রতিশোধের জ্বালা নিবারণ করতে পারবে? বিশ্ব তথা আমাদেরকে এখন সে সত্য অবলোকন করার জন্য হলেও অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির