post

সত্য

আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন

২১ এপ্রিল ২০২৩

আমরা এমন এক অস্থির সময়ে আছি যে আমরা আসল ও নকল চিনতে পারি না, সত্য মিথ্যা ধরতে পারি না। কোনটা মেকি কোনটা খাঁটি তা বুঝতে পারি না, একদমই পারি না। আমরা তা চেনার চেষ্টাও কি করি? করলেও কতটুকু? আমরা আদতে খুব একটা চেনার, বুঝার চেষ্টাও করি না, আমাদের সময় নেই। আমরা এসবে জড়াতে চাই না, আমাদের মনোযোগ নেই। কিভাবে থাকবে? আসল-নকল চেনার জন্য প্রয়োজন অন্তর্দৃষ্টি। তা কি আমাদের আছে? থাকলেও ক’জনেরই বা আছে! এটা অর্জনের জন্য যে মেধা ও মননের প্রয়োজন আমাদের নেই এমনটি নয়। আছে, কিন্তু আমরা আমাদের মেধা ও চিন্তাশক্তি ব্যয় করি পার্থিব বস্তু অর্জনের জন্য। ব্যক্তিগত সাময়িক লাভের জন্য, সত্যকে বিজিত করার জন্য নয়। সমস্যা এখানেই। 

একটি মিথ্যাকে সত্য করতে অনেকগুলো মিথ্যা বলতে হয়। আর সেটা কনটিনিউ করতে সারাজীবন গ্লানি ভোগ করতে হয়। একটি মিথ্যে সাজানো জীবনকে তছনছ করে দিতে পারে আবার একটি সত্যও। কখন পারে? বিন্দু বিন্দু শিশির জমে যেমন মহাসমুদ্র হতে পারে। ছোট ছোট মিথ্যে জমতে জমতে মিথ্যের পাহাড় হয়ে যায় যখন, তখন কোনো মানুষের পক্ষেই তার ভার সইবার কথা না। আর তখনই সত্যকে ভীষণ ভারী মনে হয়। এ জন্যই সত্য উন্মোচিত হলে মিথ্যে দিয়ে সাজানো জীবন সত্যের একটু আঘাতেই নড়বড়ে হয়ে যায়। সুতরাং মিথ্যে দিয়ে জীবন নয়, সত্যই জীবনের ভিত হওয়া প্রয়োজন এবং তা আমৃত্যু আজীবন। 

আমরা কিভাবে আসলকে চিনবো যেখানে নিজেরাই মেকি, কৃত্রিম আর মুখোশধারী! আমাদের চিন্তা বিশুদ্ধ নয়। আমাদের মুখের কথা সত্য নয়। কর্মে প্রকৃত নই। আমরা যে খাদ্য খাচ্ছি তা নির্ভেজাল নয়। আমরা যে অক্সিজেন নিচ্ছি তাও দূষিত। আমাদের চারপাশ জুড়ে আছে মেকি।

সত্যকে যদি হাসি ধরা হয় তাহলে মিথ্যাটা হলো কান্না। সত্যকে আলো ধরা হলে মিথ্যা হবে অন্ধকার। হাসি কান্না আলো অন্ধকারের জীবনে আমরা। যতদিন বাঁচি ততদিন এই আলো আঁধারের মধ্যে আমাদের সময় কাটাতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে সত্য মানে জাগ্রত হওয়া, প্রতিবাদী হওয়া তাই যেখানে সত্য পৌঁছে সেখানেই মিথ্যা পরাজিত হয়। ‘জা-য়াল হাক্কু, অযাহাকাল বাতেল’ সত্য সমাগত মিথ্যা বিতাড়িত। একটা কথা মনে রাখা দরকার,  মিথ্যাকে সহ্য করার মতো কাপুরুষতা আর হতে পারে না। পৃথিবীটাকে সকলের জন্য সুন্দর ও বাসযোগ্য করতে আমরা সত্যের সেবা করতে হবে।

মিথ্যা ঋণের পরিমাপ, আর সত্য সঞ্চয়। মিথ্যা বোঝাস্বরূপ, সত্য উপসম। মিথ্যা নিজের কাছে নিজে পরাজিত, মিথ্যা মরীচিকা জং ধরা টিনের মতো। মরীচিকায় সব শেষ করে দেয়, অস্তিত্ববিলীন করে দেয়। মিথ্যা ডিমের উপর হাতি নাচানোর মতো সার্কাস মাত্র। যারা ঋণ নিয়ে সুদ নিয়ে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তাদের উদাহরণ এমন। তারা অন্যের টাকায় নিজে সুসজ্জিত থাকে। যখন ঋণ পরিশোধের বেলায় আসে তখন তারা ঠনঠন। নিজের বসতভিটা বিক্রি করেও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যায়। চোরের মতো সাহেব মার্কা লোকটাই আসামি হয়ে যায়। কি প্রয়োজন এমন মিথ্যার জীবন উপভোগ করার? তাই সত্য মানে স্বকীয়তা রক্ষা করা। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সত্য- শিক্ষা প্রবন্ধে বলেছেন, ‘বিজাতীয় অনুকরণে আমরা ক্রমেই আমাদের জাতীয় বিশেষত্ব হারাইয়া ফেলিতেছি নিজের শক্তি ও জাতীয় সত্যকে নেহাত খর্ব করা হয়।’ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও আমরা আত্মশক্তিতে অবিশ্বাসী। আমরা স্বাধীনতায়ও সন্তুষ্ট নই, আমরা আত্মশক্তিকে জলাঞ্জলি দিয়ে অন্যে অনুকরণে অন্যের পা লেপনে মত্ত। অথচ কতগুলো দেশ যুগযুগ ধরে যুদ্ধে ঘরহারা হচ্ছে, সন্তানহারা, মাতাপিতাহারা শুধু এক টুকরো স্বাধীনতার জন্য। সেই স্বাধীনতা পেয়েও আমরা উচ্চ স্তরের চোখ রাখতে পারছি না। নিজেকে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে পারছি না। 

আমাদের সত্যকে উন্নত করতে জ্ঞানীদের কদর করতে হবে। জ্ঞানী জন্মালে আমাদের সত্য উন্মুক্ত হবে। সত্যের মূল্যায়ন হবে। আমাদের নতুন নতুন আবিষ্কারে মনোযোগ দিতে হবে। যার নবসৃষ্টির মাথা আছে তাকে রাস্তা থেকে ক্ষেত খামার থেকে তুলে এনে চেয়ারে বসাতে হবে। তবেই নতুনত্ব আসবে। সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। কথায় নয় কাজে নেতাগণ কর্তাগণ জনগণের সেবক হতে হবে। সত্য ভুলে মিথ্যাকে সম্মান করছি- যা টকের ভয়ে পালিয়ে গিয়ে তেঁতুল তলে বসার মতো।

আমি আশ্চর্য হচ্ছি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। শিক্ষার কারিকুলামে পরীক্ষা কমিয়ে আনা হয়েছে। ইসলাম ধর্মকে বাদ দিয়ে ভিন্ন ধর্ম শেখানো হচ্ছে। তাতে কি সত্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে নাকি মিথ্যার দিকে ঝুঁকে পড়ছি? এতে বিতর্ক হবে কিন্তু শিক্ষার উন্নতি হবে না। শিক্ষায় উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে কি এমন কিছু দেখতে পাই? যখন পদ্মা সেতু হয়ে গেলো তখন ভাবলাম আমাদের সরকার মালয়েশিয়ার মতো করে দেশকে উন্নত করার চেষ্টায় এগিয়ে যাচ্ছে, মনে মনে খুশি হলাম। কিন্তু পরক্ষণেই দেখলাম বন্যায় ভারতের ব্যাপারে কোনো কথা বলছে না। শিক্ষার কারিকুলাম থেকে ইসলামকে কমিয়ে দিচ্ছে। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন কি এভাবেই করতে হবে? নিচের ক্লাসগুলোতে শিশু কিশোররা ইসলাম ধর্ম শিখলে বরং উচ্ছৃঙ্খলতা থেকে দূরে থাকবে শান্তি বজায় থাকবে। আমাদের নীতিনির্ধারকগণ কি সত্যিই ইসলাম ধর্মকে সাম্প্রদায়িক উসকানির ধর্ম মনে করেন? নাকি অদৃশ্য কারণে মিথ্যার পথটি মেনে নিচ্ছেন।

সত্য মানেই শান্তি আর মিথ্যা মানেই প্রতারণা, ভালোবাসা আর পরকীয়া দুটোই ভালোবাসা। দুটোই সত্য, দুটোরই মূলমন্ত্র মনের মিল। ভালোবাসা মানেই মনের মিল মনের মিল না থাকলে সেই ভালোবাসা মিথ্যা। সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য এখানেই। আমরা জোর করে দুটি মন একত্র করে দেই আর বলি তারা সুখী, আহারে সত্য আর মিথ্যার জীবন। সারাজীবন এক ছাদের নিচে বাস করে বটে দুজনের মন থাকে দুই দিকে। অশান্তিতে থেকেও মিথ্যা বলে শান্তির অভিনয় করে চলে যার নাম সংসার। আমাদের দেশটাও একটা সংসার। দূর থেকে সবাইকে বুঝাচ্ছি আমরা কত এগিয়ে যাচ্ছি অথচ আমাদের শিক্ষায় পিছিয়ে থেকে ভবিষ্যৎ অন্ধকার করছি।

এই যে আমি লিখছি বা অন্য কেউ লিখছে ব্যক্তি ভেবে কখনো কখনো লিখাগুলো কেউ কেউ প্রচার প্রসারে গুরুত্ব দেন না। আমাদের লিখাতে শিক্ষণীয় বা গুরুত্বপূর্ণ কিছু আছে কি না সেটাই দেখা দরকার। না এ দেশে দেখা হবে কে কোন পদে থেকে কি লিখেছেন সেটা। এদেশে এটা মারাত্মক ভুল যে- পদের কর্তা হলেই তা গ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু পদে যেতে হলে যে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়! এইতো সেদিন ফেসবুকের সুবাদে জানতে পারলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে নিয়মনীতি মানা হয়নি। অথচ এই শিক্ষকগণ যা লিখেন তা আমরা গুরুগম্ভীর হয়ে পড়ি ও আমলে নেই, তাহলে কাকে দোষ দেবো? আমরা যাদেরকে বড় বড় লেখক হিসেবে এখন দেখছি তার অধিকাংশই বড় বড় পদের চাকরিজীবী।

আমরা ইউরোপের মতো নাস্তিক্যবাদী উলঙ্গপনার দেশ চাই না। আমরা শালীনতা চাই, পারিবারিক সুদৃঢ় বন্ধনের মধ্য দিয়ে উন্নত হতে চাই। আমাদের দেশে বিয়ের আগে সন্তান নিয়ে পাঁচ বছর পর বিয়ে হোক এই অপসংস্কৃতির শিক্ষা নব্বই ভাগ লোক চায় না। এসব বিষয় আল্লাহ জানেন তাই তিনি আগেই বলে রেখেছেন- এবং তার বান্দাদের পরীক্ষা করতে বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করেছেন  ‘পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে সত্য অস্বীকারকারীদের কাউকে কাউকে পার্থিব জীবনের জৌলুস বাড়ানোর জন্য যে বিলাস-উপকরণ দিয়েছি, তার দিকে কখনো তাকিও না। তোমার প্রতিপালকের দেওয়া হালাল জীবনোপকরণই স্থায়ী ও বরকতময়।” (সূরা তাহা : ১৩১)

সত্য আর মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য হলো জীবন ও মৃত্যু।

‘ওজায়াত ছাখরাতুল মাউতি বিল হাক্ক’ সেটা শুধু জ্ঞানীরাই বুঝতে পারে। মৃত্যু আর পরকাল যারা বিশ্বাস করে না তারাই এমন ভাবতে পারে। চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছেন ‘আল্লাহই সত্য, আর তাঁর পরিবর্তে তারা যাকে ডাকে, তা অসত্য এবং আল্লাহই সবার উচ্চে, মহান।’ (সূরা হজ : ৬২)।

মানব সৃষ্টির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে অনায়াসেই দৃষ্টিগোচর হবে যে, সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্ব নিয়েই মানুষ প্রথম হতেই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। অতঃপর জন্ম-মৃত্যুর ন্যায় প্রতিটি মানুষের মধ্যে সত্য ও মিথ্যার জন্ম-মৃত্যু ঘটছে আবহমানকাল ধরে। জন্ম-মৃত্যু মহাক্ষমতার মালিক আল্লাহ তায়ালার সৃষ্ট প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত সত্য। মিথ্যা কখনও এই মহাসত্যের অবমাননা করতে পারবে না। তবে সন্দেহের ধূম্রজাল এঁকে আচ্ছন্ন করে রাখার ব্যাপক কৌশল অবলম্বন করতে পারে মাত্র।

বড় সত্য হলো আল্লাহ যখন কাউকে দিয়ে তাঁর খাঁটি বান্দার ইবাদত গ্রহণ করবেন মনে করেন তখন তাকে তিনি নির্জনে নিয়ে যান এবং তার আকুতি মিনতি ভরা ডাক শোনেন। ডাকার সুযোগ করে দেন। তার বড় প্রমাণ হলো হজ। প্রত্যেক মানুষের জন্য বলা হয়েছে তার অধীনস্থরা কতটুকু আল্লাহর হুকুম আহকাম মেনে চলেছে তার জবাব কর্তা থেকে নেয়া হবে। সেইভাবেই সবার মহাসত্য মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়া প্রয়োজন।

লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির