post

২৮ অক্টোবর থেকে বাংলাদেশ আর মানবিকতার জায়গায় ফিরে আসেনি

ডা. শফিকুর রহমান

০৮ অক্টোবর ২০২২

বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলন ও রাজনীতিতে এক অনন্য নাম ডা. শফিকুর রহমান। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় আমীরের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি পেশাগতভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সততা, যোগ্যতা, মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। মাজলুম মানুষের দুর্যোগ-দুর্ভোগে সবসময় পাশে থাকার সাথে সাথে দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। পেশাগত জীবনে তিনি একজন চিকিৎসক ও সমাজসেবক। তিনি ১৯৫৮ সালের ৩১ অক্টোবর মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মো. আবরু মিয়া ও মাতা খাতিবুন নেছার ৪ সন্তানের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ১৯৭৪ সালে স্থানীয় বরামচল উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাসের পর ১৯৭৬ সালে সিলেটের এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৮৩ সালে সিলেট মেডিক্যাল কলেজ (বর্তমান এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ) থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রাবস্থায় জাসদ ছাত্রলীগের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন এবং ১৯৭৩ সালে ছাত্রলীগে যোগদান করেন। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠিত হলে ঐ বছরই তিনি শিবিরে যোগদান করেন। সিলেট মেডিক্যালে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি উক্ত মেডিক্যালের ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও পরবর্তীতে সিলেট শাখার সভাপতি হন। ১৯৮৪ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করে তিনি সিলেটের আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ সালে কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০১১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর প্রথমে ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল পরবর্তীতে ২০১৬ সালে সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৬ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত হয়ে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর জামায়াতে ইসলামীর রুকনগণের (সদস্য) প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে আমীর নির্বাচিত হন এবং ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর ২০২০-২২ কার্যকালের জন্য তিনি আমীরে জামায়াত হিসেবে শপথ নেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অবস্থা জানতে চেয়ে মাসিক ছাত্রসংবাদ তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। ছাত্রসংবাদ পাঠকদের উদ্দেশে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হলো। 

ছাত্রসংবাদ : আসসালামু আলাইকুম  ওয়া রাহমাতুল্লাহ- মুহতারাম আমীরে জামায়াত, আপনি কেমন আছেন?

আমীরে জামায়াত :  ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ- মহান আল্লাহর শুকরিয়া, তিনি ভালো রেখেছেন। 

ছাত্রসংবাদ : আন্তর্জাতিক বাজারে দিনদিন তেলের মূল্য কমছে আর বাংলাদেশে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি করার পর কমানোর কোনো আলামত নেই বরং গ্যাসসহ জ্বালানি দ্রব্যের দাম বাড়ছেই, সরকারের এই বিষয়গুলো কিভাবে দেখছেন?

আমীরে জামায়াত : যেহেতু সরকার জনগণের দ্বারা নির্বাচিত নয়, তাই জনগণের প্রতি সরকারের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতাহীন সরকার দেশের মানুষের স্বার্থে নয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে সরকারের স্বার্থে। সরকার যখন জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেয় তখন তেল রফতানিকারক দেশগুলোতে মূল্য অব্যাহতভাবে হ্রাস পাচ্ছিল। নিঃসন্দেহে সরকারের এই ঘোষণা ছিল দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং জনগণের দুর্ভোগ ও দুর্দশা বৃদ্ধির কারণ। এটি ছিল কার্যত জনগণের বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব যুদ্ধ, যার প্রভাবে জনজীবনের সর্বক্ষেত্রে অস্বাভাবিক হারে ব্যয় বৃদ্ধি পায়। লিটারপ্রতি ৪৫ টাকা মূল্যবৃদ্ধি করে জনগণের অব্যাহত প্রতিবাদ ও তোপের মুখে লিটারপ্রতি মাত্র ৫ টাকা মূল্য কমানোর পরবর্তী ঘোষণা ছিল জনগণের প্রতি নির্মম রসিকতা। আরো অস্বস্তিকর বিষয় হচ্ছে, দেশে সব জ্বালানির দাম বাড়লেও সরবরাহ ঠিকভাবে না হওয়ায় ভোগান্তি কোনোভাবেই কমছে না। যেমন গত কয়েকদিনে রাজধানীতে গ্যাসের সাপ্লাই ঠিকভাবে না পেয়ে ক্ষোভের কথা ব্যক্ত করেছেন অনেকেই। এভাবে রাজনৈতিক লুটেরাবাহিনী জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করেই যাচ্ছে আর এই নির্মমতার খেসারত দিচ্ছে এ দেশের নিরীহ জনগণ। 

ছাত্রসংবাদ : বাংলাদেশে এবার স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা হয়েছে, তার আগে করোনা মহামারী অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, এই অবস্থায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি জনগণের জীবনযাত্রায় কতটা চাপ তৈরি করছে?

আমীরে জামায়াত : নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি দ্রব্যের মূল্যই লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বৈধ উপায়ে উপার্জনকারীরা আজকে পড়েছেন মহা সঙ্কটে। অনেকে তিলে তিলে জমানো অর্থ খরচ করে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। আবার স্বল্প আয়ের মানুষেরা কোনোভাবেই পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না। সামগ্রিক সমাজজীবনে দ্রব্যমূল্যের এই ছোবল এক ভয়াবহ যন্ত্রণা হয়ে দেখা দিয়েছে, যার কুফল হয়তো মানুষকে দীর্ঘদিন ভোগাবে। 

ছাত্রসংবাদ : ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ পথ হারিয়েছিল। তখন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত রাজনৈতিক ময়দান নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?

আমীরে জামায়াত : ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠার তাণ্ডবে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির ও তৎকালীন চারদলীয় জোটের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী শহীদ এবং আহত হয়েছিলেন। সেদিনটি ছিল বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধের উপর চরম আঘাত। যাকে পশুত্ব বললেও কম বলা হবে। আমরা বলেছি বাংলাদেশ যে ঐদিন পথ হারিয়েছে আর মানবিকতার জায়গায় ফিরে আসেনি। একই ধারাবাহিকতায় বর্তমান বিরোধী দলসমূহের অসংখ্য নেতাকর্মী খুন, গুম এবং হামলা, মামলার শিকার হচ্ছে। বিরোধী দলসমূহের নেতাকর্মীদের গুমের সাথে আজকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মানবিকতা গুম হয়ে গেছে। ইতোমধ্যেই এ বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন, দেশীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনসমূহ তাদের বক্তব্য স্পষ্ট করেছে। কার্যত ২৮ অক্টোবরের হাত ধরেই বর্তমান জালিম স্বৈরশাসক জাতির ঘাড়ে চেপে বসে আছে। এই অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্ত করাই এখন বড়ো চ্যালেঞ্জ।

ছাত্রসংবাদ : বাংলাদেশে রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে ও জনগণের অধিকার ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পদক্ষেপ জানতে চাই।

আমীরে জামায়াত : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নৈতিকতানির্ভর ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি সার্বজনীন কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য তার প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। এ পথে জামায়াতে ইলসামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরকে সীমাহীন ত্যাগের নজরানা পেশ করতে হয়েছে, যা এদেশে অন্য কোনো দল বা সংগঠনকে দিতে হয়নি। ১১ জন শীর্ষ দায়িত্বশীলসহ অসংখ্য ভাই-বোনকে অন্যায়ভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তাঁদের সকলকে সর্বোচ্চ মর্যাদার শহীদ হিসেবে কবুল করুন। অসংখ্য সহকর্মীকে পঙ্গু করা হয়েছে। হাজার হাজার মিথ্যা মামলার জালে লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর উপর জুলুম করা হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই, রাষ্ট্রের সর্বশক্তি নিয়োগ করে জনগণের মুক্তির এই কাফেলাকে শেষ করে দেওয়া। আল্লাহ তায়ালার হাজারো শুকরিয়া তাদের সকল প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে এবং আগামীতেও ব্যর্থ হবে ইনশা-আল্লাহ! কুরআন সুন্নাহর ভিত্তিতে ন্যায় এবং ইনসাফপূর্ণ সার্বজনীন কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে তোলার পথে স্বৈরশাসন প্রধান বাধা। মহান আল্লাহ তায়ালার একান্ত সাহায্য এবং  জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থন নিয়ে আপামর কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-জনতাকে সঙ্গী করে দেশ গড়ার কর্মসূচি জামায়াত অব্যাহত রেখেছে। 

ছাত্রসংবাদ : আগামী দিনে একটি ইনসাফপূর্ণ ইসলামী সমাজ বিনির্মাণে নিজেদের প্রস্তুত করতে ছাত্রসমাজের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

আমীরে জামায়াত : দেশের সবচেয়ে বড়ো ক্রাইসিস হচ্ছে সততা ও নৈতিকতার ক্রাইসিস। বিরানব্বই ভাগ মুসলমানের দেশে আপামর ছাত্রসমাজের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা তারা যেন নৈতিকতা, সততা ও সচ্চরিত্রের এই ঘাটতি পূরণে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেন। পাশাপাশি মেধার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটানোর মধ্য দিয়ে নিজেদেরকে যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

আল্লাহ আমাদের সহায় হউন- আমিন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির