post

মিছে মায়ার এই দুনিয়া

শহীদ হাফেজ আব্দুল্লাহ আল সালমান

১৩ এপ্রিল ২০২৩

জন্ম যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য মৃত্যু। পৃথিবীর প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এটা চিরন্তন সত্য। একইসঙ্গে মৃত্যুপরবর্তী জীবনে আল্লাহর কাছে মানুষ ও জিন জাতিকে দুনিয়ার কাজকর্মের হিসাব দিতে হবে। সেদিন মহান প্রভু ছাড়া কোন সাহায্যকারী থাকবে না। কিন্তু আল্লাহর সাহায্য কারা পাবেন? অবশ্যই যার আমল ভালো। যিনি ইহকালকে পরীক্ষাক্ষেত্র বানিয়ে পরীক্ষার্থীর আসনে বসেছিলেন। আর ভালো পরীক্ষা দেয়ার তাগিদে নিজেকে প্রতিনিয়ত ঝালাই করেছেন। ফল হিসেবে পরকালে পাবেন ডান হাতে আমল। আর যিনি পরকালকে ভুলে ক্ষণিকের দুনিয়াবি জীবনের খেলতামাশায় মত্ত ছিলেন। পরকালের জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করেছেন। আল্লাহ ও তার রাসূল সা.কে ভুলে অন্যকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন। ফল হিসেবে পরকালে পাবেন বাম হাতে আমল। অপরাধীরা সেদিন ৯ ধরনের আফসোস, আক্ষেপ, অনুশোচনা ও আকাক্সক্ষা প্রকাশ করবে। আফসোস করবে পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে গিয়ে নেক আমল করার জন্য। কিন্তু সেদিন তা কোনো কাজে আসবে না। কারণ, জন্ম-মৃত্যু যেমন সত্য, তেমনি সত্য-মৃত্যুর পর মানুষ আর দুনিয়ায় ফিরে আসতে পারবে না।

পরকালীন জীবনে মানুষ যে আফেসোস, আক্ষেপ ও আকাক্সক্ষা প্রকাশ করবে, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারীমেই তা তুলে ধরেছেন। যাতে মানুষ এসব বিষয়ে সতর্ক হতে পারে। পরকালের সেই আফসোস ইহকালেই ঘুচিয়ে নিতে পারে। নিজের জীবনকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে নিতে পারে। দুনিয়াকে আখেরাতের শস্যক্ষেত বানিয়ে উত্তম আমলের ফসল বুনতে পারে। আর পরকালে সেই ফসল তুলতে পারে। অর্থাৎ পরকালের অনন্তকালীন জীবনে সফলতা লাভ করতে পারে। কুরআনে বর্ণিত মানুষের মৃত্যুপরবর্তী ৯ ধরনের আফসোস, আক্ষেপ তুলে ধরা হলো-


মাটি হওয়ার আকাক্সক্ষা

মৃত্যুর পর নিজেদের আমলনামা তথা কৃতকর্ম দেখে অবাধ্যতাকারীরা ভয় পেয়ে যাবে। নিজেদের বাঁ হাতেই আমলনামা দেখতে পাবে। শাস্তির বিবরণ দেখতে পাবে। তখন তাদের এমন পরিণতি হবে। “সেদিন মানুষ তার কৃতকর্ম প্রত্যক্ষ করবে এবং অবিশ্বাসীরা বলবে, হায় আফসোস! যদি আমি মাটি হয়ে যেতাম।” (সূরা নাবা : ৪০)।

দুনিয়ায় শিংবিশিষ্ট ছাগল কোন শিংবিহীন ছাগলকে মেরে থাকলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তারও প্রতিশোধ আদায় করে দেবেন। এরপর সব জন্তু-জানোয়ারদের আদেশ করা হবে: মাটি হয়ে যাও। তখন সব মাটি হয়ে যাবে। এই দৃশ্য দেখে কাফেররা আকাক্সক্ষা করবে হায়! আমিও যদি মাটি হয়ে যেতাম। এরূপ হলে আমরা হিসাব-নিকাশ ও জাহান্নামের আজাব থেকে বেঁচে যেতাম।


হিসাবের পরিবর্তে মৃত থাকার আকাক্সক্ষা

কিয়ামতের দিন অপরাধী অবিশ্বাসী লোকেরা বাম হাতে আমলনামা পেয়ে আফসোস করবে। আকাক্সক্ষা করবে আমলনামা না পাওয়ার, হিসাব না পাওয়ার। তারা প্রত্যাশা করবে, মৃত্যুই যেন তাদের শেষ ঠিকানা হয়। কিন্তু তখন তার সেই আকাক্সক্ষার কোনো মূল্য নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন- যার আমলনামা বাম হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে: হায় আমায় যদি আমার আমলনামা না দেওয়া হতো। আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব! হায়, আমার মৃত্যুই যদি শেষ হতো।’ (সূরা হাক্বকাহ : ২৫-২৭)। তারপরই দুনিয়ার জিন্দেগির ব্যাপারে আফসোস করবে, হা-হুতাশ করতে থাকবে। আর জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা বলতে থাকবে- ‘আমার ধন-সম্পদ আমার কোনো উপকারে এলো না। আমার ক্ষমতাও বরবাদ হয়ে গেল।’ (সূরা হাক্বকাহ : ২৮-২৯)। তখন আল্লাহ ফেরেশতাদের বলবেন- ‘এদের ধর, গলায় বেড়ি পরিয়ে দাও। অতঃপর নিক্ষেপ কর জাহান্নামে। অতঃপর তাকে সত্তর গজ দীর্ঘ এক শিকলে বেঁধে ফেলো। নিশ্চয় সে মহান আল্লাহতে বিশ্বাসী ছিল না। আর মিসকিনকে খাবার দিতে উৎসাহিত করত না। অতএব, আজকের দিন এখানে তার কোনো সুহৃদ নেই। আর কোনো খাদ্য নেই, ক্ষত-নিঃসৃত পুঁজ ব্যতীত। গোনাহগার ব্যতীত কেউ এটা খাবে না।’ (সূরা হাক্বকাহ : ৩০-৩৭)


নেক কাজ না করার আক্ষেপ

দুনিয়াকে যারা নিজেদের জান্নাত বানিয়ে নিয়েছে। মজামাস্তি করে সময় অতিবাহিত করেছে। দুনিয়াতে যারা পরকালকে অস্বীকার করতো। পুনরুত্থানের বিষয়টি বিশ্বাস করতো না, তারা পরকালের জন্য নেক আমল করতে না পারার জন্য মনে প্রাণে আক্ষেপ করবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘সেদিন জাহান্নামকে আনা হবে, সেদিন মানুষ উপলব্ধি করবে, কিন্তু এই উপলব্ধি তার কী কাজে আসবে? সে (আক্ষেপ করে) বলবে- ‘হায়, এ জীবনের জন্য আমি যদি কিছু আগে পাঠাতাম!’ (সূরা ফাজর : ২৩-২৪)। কিন্তু সেই আক্ষেপ কোন কাজে আসবে না। মানুষকে পুনরায় দুনিয়ায় ভালো কাজ করার জন্য ফেরত পাঠানো হবে না। 


রাসূলের পরিবর্তে অন্যদের বন্ধু বানানোয় আফসোস

দুনিয়াতে যেসব মানুষ রাসূল সা. ও তার আদর্শকে অনুসরণ করে না। রাসূলপ্রেমী মানুষদের বন্ধু না বানিয়ে অসৎ, সুদখোর, ঘুষখোর, খুনি, কাফের, সীমালঙ্ঘনকারীদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করে। কিয়ামতের দিন তারা এমন বন্ধুর জন্য নিজেকে ধিক্কার দিবে, দুর্ভাগা অ্যাখ্যা দিবে। “হায়, আমার দুর্ভাগ্য! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম।” (সূরা ফুরকান : ২৮)। একজন সীমালঙ্ঘনকারী ব্যক্তিকে যদি অন্য আরেকজন তার কাজে কর্মে সহায়তা করে বা তাকে প্রশ্রয় দেয়, তাহলে উভয়ই তার পাপের বোঝা বহন করবে। এজন্য বন্ধু বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও সতর্ক হওয়া দরকার। সৎকর্মশীল ব্যক্তিকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। 


রাসূলের আনুগত্য করতে না পারার আফসোস

হজরত মুহাম্মদ সা. ও তার দ্বীনকে ভুলে যারা দুনিয়ার বানানো মত ও দর্শনকে গ্রহণ করেছিল। যারা রাসূলের দ্বীন প্রচারকারীদের বর্জন করে বড় বড় নেতাদের পথ অবলম্বন করেছিল, তারা সেদিন আফসোস করবে। “যেদিন অগ্নিতে ওদের মুখমণ্ডল উল্টেপাল্টে দগ্ধ করা হবে সেদিন ওরা বলবে, ‘হায়! আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম ও রাসূলকে মান্য করতাম!’ তারা আরো বলবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নেতা ও বড় বড় লোকদের আনুগত্য করেছিলাম, সুতরাং ওরা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। হে আমাদের পালনকর্তা! আপনি তাদের দ্বিগুণ শাস্তি দিন এবং তাদের মহা অভিসম্পাত করুন।” (সূরা আহযাব : ৬৬-৬৮)

সেদিন তারা বুঝতে পারবে- পয়গম্বর ও দ্বীনের প্রতি আহবানকারীদেরকে বর্জন করে তারা নিজেদের নেতা, বুযুর্গ ও বড়দের কথা মত চলেছিল। তারা আমাদেরকে তোমার পয়গম্বর থেকে দূরে রেখে পথভ্রষ্ট করেছিল। সেদিন এসব অবিশ্বাসীরা আল্লাহর কাছে তাদের নেতা তথা পথভ্রষ্টকারীদের ব্যাপারে অভিযোগ করবে আর তাদের দ্বিগুণ শাস্তির আবেদন করবে। 


রাসূলকে অনুসরণের আকাক্সক্ষা

যারা রাসূল সা. প্রদর্শিত পথে না চলে অন্য কারো বানানো পথে চলবে, তারাই হাশরের মাঠে আফসোস করতে থাকবে এবং নিজের আঙুল কামড়াতে থাকবে। আর বলবে, হায়! আমরা দুনিয়াতে কেন বিশ্বনবীকে অনুসরণ করিনি! “সীমালংঘনকারী সেদিন নিজ হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবে, ‘হায়! আমি যদি রাসূলের সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম।” (সূরা ফুরকান : ২৭)


সফলতা লাভের আকাক্সক্ষা

দুনিয়াতে মুমিনরা বিপদাপদে পড়লেই অবিশ্বাসীরা (বর্তমানে সুবিধাভোগীরা) বলে বেড়ায় যে, আল্লাহ আমাদের প্রতি দয়া করেছেন, আমরা বিপদে পড়িনি। আমরা তাদের সঙ্গে ছিলাম না। অথচ তারা সঠিক পথের অনুসারী ছিল না। আবার যখন সঠিক পথের অনুসারীরা কোন সফলতা লাভ করে, তখন সুবিধাভোগীরা আফসোস করে। সফলতার অংশীদার হওয়ার আকাক্সক্ষা করে। 

‘আর তোমাদের মধ্যে এমন লোকও আছে যে পিছনে থাকবেই। অতঃপর তোমাদের কোন বিপদ হলে সে বলবে, ‘আল্লাহ আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যে, আমি তাদের সঙ্গে ছিলাম না।’ আর যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ হয়, তাহলে সে বলবে, ‘হায়! যদি আমি তাদের সাথে থাকতাম, তাহলে আমিও বিরাট সাফল্য লাভ করতাম।’ (সূরা নিসা : ৭২-৭৩)

উপরোক্ত আয়াতের তাৎপর্য দুই রকম হতে পারে। দুনিয়ায় সঠিক পথের অনুসারীদের সঙ্গে কিছু সুবিধাভোগী রয়েছে। যারা বিপদের সময় সটকে পড়ে। আবার কোন সফলতা দেখতে পেলে বলে- আমি/আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই আছি। চাটুকারিতার মাধ্যমে দুনিয়াতে তারা সফলতার ভাগীদার হলেও হতে পারে। কিন্তু পরকালে এই চাটুকারিতার কোনো সুযোগ থাকবে না। সঠিক পথের অনুসারীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার কারণে এসব সুবিধাভোগীরা পরকালীন সফলতা থেকে বঞ্চিত হবে এবং আফসোস করবে। 


শিরক করায় আফসোস

আল্লাহ তায়ালা মানুষের বহু গুনাহকে তার রহিম নামের কুদরতে ক্ষমা করে দিবেন, কিন্তু শিরকের গুনাহ কবিরা গুনাহ। এটি কখনো ক্ষমা করবেন না। যারা দুনিয়াতে আল্লাহর সঙ্গে অন্যকে শরিক করতো, তারা পরকালে দুনিয়ায় শিরক করার বিষয়টি স্মরণ করে আফসোস করবে। ‘সে বলতে লাগল, ‘হায়! আমি যদি কাউকেও আমার প্রতিপালকের শরিক না করতাম।’ (সূরা কাহফ : ৪২)। আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার স্থাপন করা, তার যাবতীয় নিয়ামত দ্বারা প্রতিপালিত ও উপকৃত হয়ে তাঁর বিধি-বিধানকে অস্বীকার করা ও তাঁর অবাধ্যতা করা কোনোভাবেই কোন মানুষের জন্য উচিত নয়। তবে সেদিনের আক্ষেপ ও অনুতাপ কোন ফল দেবে না। 


পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাক্সক্ষা

পরকালে অবিশ্বাসীদের জাহান্নামের কিনারায় দাঁড় করানো হলে তারা বারবার তাদেরকে দুনিয়ায় পাঠানোর আবেদন করতে থাকবে। যাতে তারা দুনিয়াতে এসে ভালো কাজ করে পরকালে সফলতা লাভ করতে পারে। ‘যখন তাদেরকে দোযখের পাশে দাঁড় করানো হবে এবং তারা বলবে, ‘হায়! যদি আমাদের (পৃথিবীতে) প্রত্যাবর্তন ঘটত, তাহলে আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শনকে মিথ্যা বলতাম না এবং আমরা বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।’ (সূরা আনআম : ২৭) 


ইসলামের তিনটি মূলনীতি রয়েছে- (১) একত্ববাদ (২) রিসালাত ও (৩) আখেরাতে বিশ্বাস। অবশিষ্ট সমস্ত বিশ্বাস এ তিনটিরই অধীন। এ তিন মূলনীতি মানুষকে স্বীয় স্বরূপ ও জীবনের লক্ষ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এগুলোর মধ্যে আখেরাত ও আখেরাতের প্রতিদান ও শাস্তির বিশ্বাস কার্যত এমন একটি বিশ্বাস, যা মানুষের প্রত্যেক কাজের গতি একটি বিশেষ দিকে ঘুরিয়ে দেয়। এ কারণেই কুরআনুল কারীমের সব বিষয়বস্তু এ তিনটির মধ্যেই চক্রাকারে আবর্তিত হয়। এ মূলনীতিগুলোকে অস্বীকারকারীরা পরকালের কঠিন সময়ে আফসোস ও আকাক্সক্ষা এবং নিজেদের কর্মে অনুশোচনা করতে থাকবে। অবশ্য সেদিন এসব আকাক্সক্ষা, আফসোস ও অনুশোচনার কোনোটিই কাজে লাগবে না।

মানুষ ও জিন জাতিকে আল্লাহ তায়ালা তার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য যুগে যুগে পাঠিয়েছেন নবী ও রাসূল। সর্বশেষ নবী ও রাসূল হজরত মুহাম্মদ সা.কে ওহির মাধ্যমে পবিত্র আল-কুরআনকে মানবতার মুক্তির পথনির্দেশিকা বানিয়েছেন। আরও এই কুরআনেই আল্লাহ কিয়ামতের সুস্পষ্ট বর্ণনা তুলে ধরেছেন। কাফের অস্বীকারকারীরা সেদিন কোন কোন বিষয়ে আফসোস করবে, অনুশোচনায় দগ্ধ হবে, আকাক্সক্ষার ফুলঝুরি ফোটাবে- তারও স্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন। তারপরেও যদি মানুষ হিদায়াতপ্রাপ্ত না হয়, ইসলামের পথে ফিরে না আসে, তাহলে তার জন্য আফসোস!

লেখক : বিআইসিএস-এর ১৮৭ নং শহীদ

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির