উম্মাহর ঐক্য বিনষ্ট করা কুফুরি পরিণতি জাহান্নাম -প্রফেসর তোহুর আহমদ হিলালী

আল্লাহতায়ালার লক্ষ-কোটি সৃষ্টির মধ্যে মানুষই হলো সেরা। সেই মানুষের মধ্যে বর্ণ-ভাষা-চেহারা-আকার-আকৃতিতে রয়েছে ভিন্নতা। আবার আচার-আচরণ, পছন্দ-অপছন্দ ও মেজাজেও রয়েছে ভিন্নতা। বিশ্বাস ও কর্মেও সব মানুষ এক নয়। এসব ভিন্নতা দিয়ে আল্লাহতায়ালা সাজিয়েছেন এ মানবসমাজকে। আল্লাহ চাইলে সব মানুষকে এক করে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এই ভিন্নতার মধ্যেই রয়েছে সৌন্দর্য। এত সব পার্থক্য থাকার পর আল্লাহতায়ালার কাছে তারাই উত্তম যারা নীতিবান অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় করে চলে। ইসলামের দৃষ্টিতে ঈমান ও আমলের দিক থেকে মানুষকে দু’টি ভাগে ভাগ করা যায়। এক. মুসলিম দুই. অমুসলিম। ইসলাম ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য চিরন্তন। এ পার্থক্য আদর্শিক, আচার-আচরণ বা লেনদেনে নয়। ইসলামের বিরুদ্ধে সকল কুফুরিশক্তি একাট্টা। তার মোকাবেলায় ইসলামের পক্ষের সকল শক্তিকে আল্লাহতায়ালা ঐক্যবদ্ধ জীবনযাপনের জন্য তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘মুমিনরা পরস্পর ভাই’। কখনও বলেছেন-‘তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধারণ করো, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না’। আবার বলেছেন, ‘মুহাম্মদ সা.-এর সাথীরা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পর রহমদিল’। নিজেদের ঐক্য নষ্ট করে যারা পরস্পর দলাদলি করে তাদেরকে কাফির আখ্যায়িত করে সূরা আল ইমরানের নিম্নোক্ত আয়াতে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
‘তোমরা যেন তাদের মত হয়ে যেয়ো না, যারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেছে এবং সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্য হিদায়াত পাওয়ার পরও মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে। যারা এ নীতি অবলম্বন করেছে তারা সেদিন কঠিন শাস্তি পাবে। সেদিন কিছু লোকের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠবে এবং কিছু লোকের মুখ কালো হয়ে যাবে। যাদের চেহারা কালো হয়ে যাবে তাদেরকে বলা হবে, ঈমানের নিয়ামত লাভ করার পরও তোমরা কুফুরি নীতি অবলম্বন করলে? ঠিক আছে, তাহলে এখন এই নিয়ামত অস্বীকৃতির বিনিময়ে আজাবের স্বাদ গ্রহণ করো। আর যাদের চেহারা উজ্জ্বল হবে, তারা আল্লাহর রহমতের আশ্রয় লাভ করবে এবং চিরকাল তারা এই অবস্থায় থাকবে। এগুলো আল্লাহর বাণী, তোমাকে যথাযথভাবে শুনিয়ে যাচ্ছি। কারণ দুনিয়াবাসীদের প্রতি জুলুম করার কোন এরাদা আল্লাহর নেই।’ (সূরা আল ইমরান : ১০৫-১০৮)
আল্লাহতায়ালা আরো বলেন-
‘এবং তোমাদের এ জাতি একই জাতি এবং আমিই তোমাদের প্রতিপালক; অতএব আমাকে ভয় কর। কিন্তু তারা নিজেদের মধ্যে তাদের দ্বীনকে বহুধা বিভক্ত করেছে, প্রত্যেক দলই তাদের নিকট যা আছে তা নিয়ে আনন্দিত।’ (সূরা মু’মিনুন : ৫২-৫৩)
‘যারা দ্বীন সম্বন্ধে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে তাদের কোন দায়িত্ব তোমার নয়; তাদের বিষয় আল্লাহর ইখতিয়ারভুক্ত। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে অবহিত করবেন।’ (সূরা আন’আম : ১৫৯)he1

আল্লাহর রাসূল সা:-এর কঠোর হুঁশিয়ারি
আবদুল্লাহ ইবনু আমর রা: বলেন, রাসূল সা: বলেন-‘ইসরায়েল সন্তানগণ ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আর আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। এদের মধ্যে সকলেই জাহান্নামি, একটি মাত্র দল বাদে। সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন : হে আল্লাহর রাসূল সা:, এ মুক্তিপ্রাপ্ত দলটি কারা? তিনি বলেন, আমি এবং আমার সহাবীগণ এখন যার ওপর আছি। (তিরমিজি)
ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস বা আকিদা এক ও অভিন্ন। অর্থাৎ আল্লাহ, রাসূল, কিতাব, আখিরাত, ফেরেশতা ও তকদিরের প্রতি বিশ্বাস এনেই একজন ব্যক্তিকে মু’মিন হতে হয়। বিশ্বাসের সাথে সাথে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল সা: যেসব বিষয় অত্যাবশ্যকীয় (ফরজ) করেছেন সেসব পালনের মাধ্যমে সে হয় মুসলিম (অনুগত)। উম্মাহর মধ্যে এ নিয়ে কোনো মতপার্থক্য নেই। কুরআন মজিদে নানাভাবে তার বর্ণনাও রয়েছে। যেমন বলা হয়েছে, ‘কেউ যদি তওবা করে এবং নামাজ কায়েম করে ও জাকাত আদায় করে তাহলে সে তোমার ভাই।’ রাসূল সা: এক বেদুইন যুবককে বিশ্বাসের সাথে নামাজ, রোজার স্বীকৃতির (যোগ্যতার ভিত্তিতে) মাধ্যমে বলে দিলেন যে, সে যদি তার কথায় আন্তরিক হয় তাহলে সে জান্নাতি। কুরআন ও হাদিসের আলোচনায় বোঝা যায় কিয়ামতের দিন একজন ব্যক্তিকে তার ঈমান ও ফরজ-ওয়াজিব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। সুন্নাত-মুস্তাহাব পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। আল্লাহ বলেছেন-‘তোমরা বড় বড় গোনাহ থেকে বিরত থাক, তাহলে ছোট  গোনাহসমূহ আল্লাহ এমনিতেই মাফ করে দেবেন।’ বড়  গোনাহর অর্থই হলো ফরজ লঙ্ঘন। নামাজ-রোজা-হজ-জাকাত আদায় না করা, সুদ-ঘুষ, জিনা-ব্যভিচার, ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও আমানতে খেয়ানত, ওজনে কম-বেশি, ধোঁকা-প্রতারণা সবই ফরজ লঙ্ঘন ও পরিণতি জাহান্নাম। এসব অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্টদেরকে কাফির বলে তেড়ে আসতে কাউকে দেখা যায় না বা এ ব্যাপারে কোন ফতোয়াও অত দৃষ্টিগোচর হয় না (অবশ্য কবিরা গোনাহ করলেই কেউ কাফির হয়ে যায় না, বরং কেউ যদি অস্বীকার করে তবেই কাফির হয়)। কিন্তু আমিন জোরে না আস্তে, হাত বুকের ওপর না নিচে, ইফতার সঙ্গে সঙ্গে না একটু পরে-এসব নিয়ে ফেসবুকেসহ নানা জায়গায় দেখা যায় অনেক বিতর্ক এবং একে অপরকে প্রচন্ডভাবে আক্রমণ করে। রাসূল সা:-এর সুন্নাত মনে করে যে কেউ হুবুহু অনুসরণ করলে অনেক সওয়াবের অংশীদার হবেন, কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এসব নিয়ে কাউকে গালি দিলে, কটাক্ষ করলে এবং দলাদলি করলে কুফুরিতে লিপ্ত হবে, সেটাও মনে রাখতে হবে। রাসূল সা: যেটা করেননি সেটাকে ইবাদত মনে করে করা বিদয়াত, পরিহার করে সুন্নাত-মুস্তাহাবের অনুসরণে ভিন্নতায় কোনো দোষ নেই। এ আল্লাহরই হেকমত। এসব ভিন্নতা সত্ত্বেও উম্মাহর মধ্যে একটি ঐক্য গড়ে উঠবে-এটাই আল্লাহতায়ালার অভিপ্রায়। মুসলিম উম্মাহ সর্বসম্মতভাবে যাদেরকে কাফির আখ্যায়িত করেছে (যেমন-কাদিয়ানি) তাদের বাদে আহলে হাদিসসহ চার মাজহাব এবং যারাই ইসলামের মৌলবিশ্বাস ও ফরজ-ওয়াজিব মেনে চলে বা চলতে প্রস্তুত সবাই সত্যাশ্রয়ী ও হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত। দলাদলি না করে সবার প্রতি শ্রদ্ধাপোষণ ঈমানেরই পরিচায়ক।
বর্তমান মুসলিমবিশ্বে শিয়া-সুন্নি বিরোধ উম্মাহর জন্য বড় বেদনাদায়ক। এই ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্ব মুসলিম উম্মাহকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ বিরোধ মিটিয়ে ফেলার জন্য ইসলামী স্কলারদের এগিয়ে আসার দরকার।
ফিকহি বিষয়ে উম্মাহর মত-পার্থক্য শ্রদ্ধার সাথে মেনে নিয়ে নিজের বিবেক-বুদ্ধি ও ইলমের ভিত্তিতে যেকোনো মত অনুসরণ করলে কোন সমস্যা নেই। কারণ মৌল বিশ্বাস ও ফরজ-ওয়াজিব পালনের ক্ষেত্রে মতের কোন ভিন্নতা নেই। ঈমানের পরেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো নামাজ। ইমামের আনুগত্যের একটা সীমা আমরা নামাজ থেকে পাই। নামাজে ইমাম সাহেব ফরজ লঙ্ঘন করলে নামাজ পুনরায় আদায় করতে হয়; ওয়াজিব ছুটে গেলে সহু সেজদা দিয়ে সংশোধন করে নেয়া হয়। কিন্তু এর পরে সুন্নাত-মুস্তাহাবের ভুলকে উপেক্ষা করা হয়েছে। যেসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে উম্মাহর মধ্যে মতপার্থক্য ও দলাদলি নামাজে তা সযতেœ এড়িয়ে চলা হয়েছে। আল্লাহর রাসূল সা: তাঁর উম্মাতকে নামাজের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়কে এড়িয়ে চলার জন্য এত বড় তালিম দেয়ার পরও মত-পার্থক্য করে উম্মাহর শক্তি নষ্ট করা থেকে আমরা বিরত হচ্ছি না। এটা আমাদের জন্য বড় দুর্ভাগ্য। ইসলামের দুশমনরা আমাদের অনৈক্যের সুযোগ নিয়ে আজ ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা বাধিয়ে দিয়ে মজা লুটছে, অথচ আমাদের চৈতন্য হচ্ছে না। অনৈক্যের কারণে আজ দুনিয়াতে আমরা ভোগ করছি সীমাহীন জিল্লতি-আখিরাতে রয়েছে আরো ভয়াবহ পরিণতি। ইসলামের দুশমনদের মোকাবেলায় কালেমাবিশ্বাসী (ইসলামের পক্ষে) সকল মুসলিমের ঐক্য আজ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে-আল্লাহতায়ালা আমাদের মধ্যে এ উপলব্ধি দান করুন। আমিন।
লেখক : উপাধ্যক্ষ (অব:),
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

SHARE

Leave a Reply