উসওয়াতুন হাসানার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি -ড. মুহাম্মাদ আব্দুল মান্নান

﴿يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جاءَتْكُمْ جُنُودٌ فَأَرْسَلْنا عَلَيْهِمْ رِيحاً وَجُنُوداً لَمْ تَرَوْها وَكانَ اللَّهُ بِما تَعْمَلُونَ بَصِيراً (৯) إِذْ جاؤُكُمْ مِنْ فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَإِذْ زاغَتِ الْأَبْصارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَناجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللَّهِ الظُّنُونَا (১০) هُنالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْزالاً شَدِيداً (১১) وَإِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ إِلَّا غُرُورًا (১২) وَإِذْ قالَتْ طائِفَةٌ مِنْهُمْ يا أَهْلَ يَثْرِبَ لا مُقامَ لَكُمْ فَارْجِعُوا وَيَسْتَأْذِنُ فَرِيقٌ مِنْهُمُ النَّبِيَّ يَقُولُونَ إِنَّ بُيُوتَنا عَوْرَةٌ وَما هِيَ بِعَوْرَةٍ إِنْ يُرِيدُونَ إِلاَّ فِراراً (১৩) وَلَوْ دُخِلَتْ عَلَيْهِمْ مِنْ أَقْطَارِهَا ثُمَّ سُئِلُوا الْفِتْنَةَ لَآتَوْهَا وَمَا تَلَبَّثُوا بِهَا إِلَّا يَسِيرًا (১৪) وَلَقَدْ كَانُوا عَاهَدُوا اللَّهَ مِنْ قَبْلُ لَا يُوَلُّونَ الْأَدْبَارَ وَكَانَ عَهْدُ اللَّهِ مَسْئُولًا (১৫) قُلْ لَنْ يَنْفَعَكُمُ الْفِرارُ إِنْ فَرَرْتُمْ مِنَ الْمَوْتِ أَوِ الْقَتْلِ وَإِذاً لا تُمَتَّعُونَ إِلاَّ قَلِيلاً (১৬) قُلْ مَنْ ذَا الَّذِي يَعْصِمُكُمْ مِنَ اللَّهِ إِنْ أَرادَ بِكُمْ سُوءاً أَوْ أَرادَ بِكُمْ رَحْمَةً وَلا يَجِدُونَ لَهُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلِيًّا وَلا نَصِيراً (১৭) قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الْمُعَوِّقِينَ مِنْكُمْ وَالْقائِلِينَ لِإِخْوانِهِمْ هَلُمَّ إِلَيْنا وَلا يَأْتُونَ الْبَأْسَ إِلاَّ قَلِيلاً (১৮) أَشِحَّةً عَلَيْكُمْ فَإِذَا جَاءَ الْخَوْفُ رَأَيْتَهُمْ يَنْظُرُونَ إِلَيْكَ تَدُورُ أَعْيُنُهُمْ كَالَّذِي يُغْشَى عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَإِذَا ذَهَبَ الْخَوْفُ سَلَقُوكُمْ بِأَلْسِنَةٍ حِدَادٍ أَشِحَّةً عَلَى الْخَيْرِ أُولَئِكَ لَمْ يُؤْمِنُوا فَأَحْبَطَ اللَّهُ أَعْمَالَهُمْ وَكَانَ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرًا (১৯ يَحْسَبُونَ الْأَحْزابَ لَمْ يَذْهَبُوا وَإِنْ يَأْتِ الْأَحْزابُ يَوَدُّوا لَوْ أَنَّهُمْ بادُونَ فِي الْأَعْرابِ يَسْئَلُونَ عَنْ أَنْبائِكُمْ وَلَوْ كانُوا فِيكُمْ ما قاتَلُوا إِلاَّ قَلِيلاً (২০) لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا(২১)﴾
অর্থ: ৯. হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল, অতঃপর আমরা তাদের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলাম ঘূর্ণিবায়ু এবং এমন বাহিনী যা তোমরা দেখনি। আর তোমরা যা কর আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। ১০. যখন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল তোমাদের উপরের দিক ও নিচের দিক হতে, তখন তোমাদের চোখ বিস্ফারিত হয়েছিল এবং তোমাদের প্রাণ হয়ে পড়েছিল কণ্ঠাগত, আর তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানাবিধ ধারণা পোষণ করছিলে। ১১. এখানে মুমিনগণ পরীক্ষিত হয়েছিল এবং তারা ভীষণভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল। ১২. আর স্মরণ কর, যখন মুনাফিকরা ও যাদের অন্তরে ছিল ব্যাধি, তারা বলছিল, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। ১৩. আর যখন তাদের একদল বলেছিল, হে ইয়াসরিববাসী! (এখানে রাসূলের কাছে প্রতিরোধ করার) তোমাদের কোন স্থান নেই। সুতরাং তোমরা (ঘরে) ফিরে যাও। এবং তাদের মধ্যে একদল নবীর কাছে অব্যাহতি প্রার্থনা করে বলছিল, আমাদের বাড়িঘর অরক্ষিত; অথচ সেগুলো অরক্ষিত ছিল না, আসলে পালিয়ে যাওয়াই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। ১৪. আর যদি বিভিন্ন দিক থেকে শত্রুদের প্রবেশ ঘটত, তারপর তাদেরকে শিরক করার জন্য প্ররোচিত করা হতো, তবে অবশ্যই তারা সেটা করে বসত; তারা সেটা করতে সামান্যই বিলম্ব করত। ১৫. অবশ্যই তারা পূর্বে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে না। আর আল্লাহর সাথে করা অঙ্গীকার সম্বন্ধে অবশ্যই জিজ্ঞেস করা হবে। ১৬. যদি তোমরা মৃত্যু অথবা হত্যার ভয়ে পালিয়ে যাও, হে রাসূল আপনি বলুন, তবে পালিয়ে বেড়িয়ে তোমাদের কোনো লাভ হবে না, তবে সে ক্ষেত্রে তোমাদেরকে সামান্যই ভোগ করতে দেয়া হবে। ১৭. বলুন, কে তোমাদেরকে আল্লাহ থেকে বাধা দান করবে, যদি তিনি তোমাদের অমঙ্গল ইচ্ছে করেন অথবা অনুগ্রহ করতে ইচ্ছে করেন? আর তারা আল্লাহ ছাড়া নিজেদের কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না। ১৮. আল্লাহ অবশ্যই জানেন, তোমাদের মধ্যে কারা বাধাদানকারী ও কারা তাদের ভাইদেরকে বলে, আমাদের দিকে চলে এসো। তারা অল্পই যুদ্ধে যোগদান করে। ১৯. তোমাদের ব্যাপারে কৃপণতাবশত। অতঃপর যখন ভীতি আসে, তখন আপনি দেখবেন, মৃত্যুভয়ে মূর্ছাতুর ব্যক্তির মতো চোখ উল্টিয়ে তারা আপনার দিকে তাকায়। কিন্তু যখন ভয় চলে যায় তখন তারা ধনের লালসায় তোমাদেরকে তীক্ষè ভাষায় বিদ্ধ করে। তারা ঈমান আনেনি ফলে আল্লাহ তাদের কাজকর্ম নিষ্ফল করেছেন এবং এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ। ২০. তারা মনে করে সম্মিলিত বাহিনী চলে যায়নি। যদি সম্মিলিত বাহিনী আবার এসে পড়ে, তখন তারা কামনা করবে যে, ভালো হতো যদি ওরা যাযাবর মরুবাসীদের সাথে থেকে তোমাদের সংবাদ নিত! আর যদি তারা তোমাদের সাথে অবস্থান করত তবে তারা খুব অল্পই যুদ্ধ করত। ২১. অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ, তার জন্য যে আশা রাখে আল্লাহ ও শেষ দিনের এবং আল্লাহকে বেশি স্মরণ করে। (সূরা আহজাব, ২য় রুকু; আয়াত : ৯-২১)
নামকরণ : এ সূরার নাম ২০ নম্বর আয়াতের يَحْسَبُونَ ا ْأَحْزابَ বাক্যটি থেকে গৃহীত হয়েছে। ২১ নম্বর আয়াতে ﴿وَلَمَّا رَأَى الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزَابَ﴾ একই শব্দ এসেছে। ইসলামের ইতিহাসে একে আহজাবের যুদ্ধ বলা হয়। কারণ আহজাব শব্দটি আরবি ‘হিজবুন’ থেকে এসেছে, এর অর্থ সম্মিলিত বাহিনী। যেহেতু মক্কা ও মদীনার আশপাশের সকল দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাই একে আহজাবের যুদ্ধ বলা হয়। একে খন্দকের যুদ্ধও বলা হয়। কেননা বিশিষ্ট সাহাবা সালমান ফারসি রা.-এর পরামর্শে মদীনার আশপাশে গর্ত বা পরিখা খনন করা হয় সেহেতু একে খন্দকের যুদ্ধ বলা হয়।

আলোচ্য বিষয় ও নাজিল হওয়ার সময়কাল
এ সূরাটিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলোচনা করা হয়েছে। এক. ইবনে ইসহাকের মতে, আহজাব যুদ্ধ এটি পঞ্চম হিজরির শাওয়াল মাসে সংঘটিত হয়। ইবনে ওয়াহ্হাবের সূত্রে মালেক রহ. বলেন, চতুর্থ হিজরিতে খন্দক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। দুই. বনি কুরাইযার যুদ্ধ। পঞ্চম হিজরির যিলকাদ মাসে এটি সংঘটিত হয়। তিন. হযরত যয়নবের রা. সাথে নবী সা.-এর বিয়ে। এটি অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম হিজরির যিলকাদ মাসে।

ঐতিহাসিক পটভূমি : তৃতীয় হিজরির শাওয়াল মাসে অনুষ্ঠিত উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের সাময়িক বিপর্যয়কে পুঁজি করে আরবের মুশরিক, ইহুদি ও মুনাফিকদের স্পর্ধা এবং দুঃসাহস অনেকগুণ বেড়ে যায়। যেমন:
এক: উহুদ যুদ্ধের দুই মাসের মাথায় নজদের বনি আসাদ গোত্র মদীনার ওপর আক্রমণের প্রস্তুতি চালাচ্ছিল। তাদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য রাসূল আবু সালামার নেতৃত্বে ১৫০ জনের বাহিনী প্রেরণ করেন। তাদের প্রস্তুতির পূর্বেই মুসলমানরা অতর্কিত আক্রমণ করলে তারা পলায়ন করতে বাধ্য হয়।
দুই: চতুর্থ হিজরির সফর মাসে আদাল ও কারাহ গোত্রের লোকেরা তাদের এলাকায় দ্বীন শিক্ষার জন্য রাসূল -এর নিকট লোক চায়। ইবনে ইসহাকের মতে, নবী মুরশিদ বিন আবি মুরশিদ গানাভী রা.-এর নেতৃত্বে ৬ জন তাদের সাথে প্রেরণ করেন। ইমাম বুখারীর বলেছেন, ১০ জন সাহাবাকে আসেম বিন সাবেত রা.-এর নেতৃত্বে তাদের সাথে প্রেরণ করেন। কিন্তু সাহাবাগণ রাজি (জেদ্দা ও রাবেগের মাঝখানে) নামক স্থানে পৌঁছালে তারা ‘হোযাইল’ গোত্রের শাখা বানু ‘নিহইয়ানকে’ নিরস্ত্র সাহাবাদের ওপর লেলিয়ে দেয়। শত্রুদের একশত তীরন্দাজ বাহিনী তাদের ৪ জনকে হত্যা করে এবং দুইজনকে (হযরত খুবাইব ইবনে আদি এবং যায়েদ ইবনে দাসিন্নাহ রা.) মক্কার কুরাইশদের নিকট বিক্রি করে দেয়। উকবাহ বিন হারিস বদর যুদ্ধে পিতৃ হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য খুবাইব রা.কে শূলে চড়িয়ে তান‘ঈম নামক স্থানে হত্যা করে। শাহাদাতের পূর্বে দু’রাকাত নামাজ পড়া সর্বপ্রথম তিনি চালু করেন। সাফওয়ান ইবনে উমাইয়্যাহ পিতৃ হত্যার প্রতিশোধের জন্য যায়েদ বিন দাসেন্নাহ রা.কে ক্রয় করে।
তিন: চতুর্থ হিজরির সফর মাসেই বানু আমের গোত্রের আবু বারায়া আমের বিন মালেক তাদের নিকট দাওয়াতি কাজ ও দ্বীন শিক্ষার জন্য রাসূল এর নিকট একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণের আবেদন করে। রাজির ঘটনার কারণে রাসূল নিরাপত্তার প্রশ্ন তুললে সে নিজের পক্ষ থেকে নিশ্চয়তা প্রদান করে। তখন তিনি মুনযির বিন আমির রা. (উপাধি মুতাক লিল মাউত বা মৃত্যুর জন্য স্বাধীনকৃত) এর নেতৃত্বে ৪০ জন (ইবনে ইসহাকের মতে) এবং (বুখারির মতে) ৭০ জন আনসারি যুবক সাহাবাকে প্রেরণ করেন। তাঁরা নজদের দিকে রওয়ানা হন। কিন্তু তাঁদের সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়। বনু সুলাইমের উসাইয়া, রাইল ও যাকওয়ান গোত্রত্রয় ‘বিরে মাউনাহ’ নামক স্থানে অকস্মাৎ ঘেরাও করে সবাইকে হত্যা করে ফেলে। কেউ কেউ বলেন, ৬৯ জন শাহাদাত বরণ করেন, একজন কা’ব বিন যায়েদ রা. বেঁচে যান, তাঁকে শহীদদের মধ্য থেকে উঠিয়ে আনা হয়। এ ঘটনায় রাসূল এক মাস যাবৎ কুনুতে নাজেলা পড়েন।

চার: হামরাউল আসাদের ঘটনা: উহুদ যুদ্ধের ২ দিন পরে যখন মুসলমানদের বিপুল সংখ্যক আহত এবং নিকটাত্মীয়দের শাহাদাতের কারণে শোক চলছিল ঠিক এমনি মুহূর্তে রাসূল সেনাবাহিনীকে ডেকে বলেন, আমাদের কাফেরদের পশ্চাদ্ধাবন করা উচিত। কারণ মাঝপথ থেকে ফিরে এসে তারা আমাদের ওপর আক্রমণ চালাতে পারে। রাসূল ৬৩০ জন সাহাবাকে নিয়ে মক্কার পথে হামরাউল আসাদ নামক স্থানে পৌঁছে তিন দিন অবস্থান করেন। এ সময় আবু সুফিয়ান মদীনা থেকে ৩৬ মাইল দূরে ‘দওরুর রওহা’ নামক স্থানে ২৯৭৮ জন সহযোগীকে নিয়ে অবস্থান করছিল। তারা যথার্থই তাদের ভুল বুঝতে পেরে পুনরায় মদীনা আক্রমণ করতে চাচ্ছিল। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর পিছু ধাওয়া করার কথা শুনে তাদের সব সাহস উবে যায়।
পাঁচ: মদীনায় বনি আসাদের প্রস্তুতি: রাসূল গোয়েন্দা মারফত জানতে পারেন যে, বনি আসাদ মদীনার ওপর নৈশ আক্রমণের প্রস্তুতি চালাচ্ছে। তাদের আক্রমণের আগেই তিনি আবু সালামার (উম্মুল মুমিনুন উম্মে সালামার প্রথম স্বামী) নেতৃত্বে ১৫০ জনের একটি বাহিনী দিয়ে তাদের ওপর হঠাৎ আক্রমণ করালে অচেতন অবস্থায় তারা সবকিছু ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। ফলে তাদের সমস্ত সহায় সম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হয়।
ছয়: বানু নাজির যুদ্ধ : চতুর্থ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে বানু নাজির স্বয়ং নবী কে শহীদ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে। তাদের গোপন ষড়যন্ত্র যেদিন ফাঁস হয়ে যায় সেদিনই রাসূল তাদেরকে নোটিশ দিয়ে দেন, দশ দিনের মধ্যে মদীনা ত্যাগ না করলে তোমাদের যাকেই এখানে পাওয়া যাবে তাকেই হত্যা করা হবে। অন্যদিকে আবদুল্লাহ বিন উবাই তাদেরকে অভয় দিয়ে বলে যে, অবিচল থাকো এবং মদীনা ত্যাগ করতে অস্বীকার করো, আমি দুই হাজার লোক দিয়ে তোমাদের সহযোগিতা করবো। বনি কুরাইযা এবং বনি গাতফানও তোমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। বনি নাজির সাহস পেয়ে মদীনা ত্যাগ না করলে রাসূল সাহাবাদেরকে নিয়ে তাদেরকে ঘেরাও করলে কেউ তাদেরকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেনি। শেষ পর্যন্ত তারা এ শর্তে অস্ত্র সংবরণ করে যে, প্রত্যেক তিন ব্যক্তি একটি উটের পিঠে যে পরিমাণ সম্পদ সম্ভব হয় বহন করে নিয়ে যাবে। ফলে তাদের বিপুল সম্পদ মুসলমানদের করতলগত হয়। অন্যদিকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী গোত্রের লোকেরা খায়বর, কুবা এবং সিরিয়ায় বিক্ষিপ্তভাবে বসতি স্থাপন করে।
সাত: বনি গাতফানদের বিরুদ্ধে অভিযান: চতুর্থ হিজরির জমাদিউল আউয়াল মাসে বনি গাতফানের ২টি শাখা বনি সালাবাহ ও বনি মাহারিব মদীনা আক্রমণের প্রস্তুতি চালায়। রাসূল ৪০০ সেনার একটি বাহিনী নিয়ে বের হয়ে পড়েন এবং ‘যাতুর রিকা’ নামক স্থানে যেয়ে তিনি তাদেরকে ধরে ফেলেন। এ অতর্কিত হামলায় তারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং কোনো যুদ্ধ ছাড়াই নিজেদের বাড়িঘর, সহায় সম্পদ ফেলে পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
আট: আবু সুফিয়ানের চ্যালেঞ্জের জবাব: উহুদ থেকে ফিরে যাওয়ার সময় আবু সুফিয়ান চ্যালেঞ্জ দিয়েছিল যে, আগামী বছর বদরের ময়দানে আবার তোমাদের ও আমাদের মুকাবিলা হবে। রাসূল একজন সাহাবার মাধ্যমে জবাব দেন, ঠিক আছে, আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এ কথা স্থিরকৃত হলো। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাসূল ১৫০০ জন সৈন্য নিয়ে বদরের প্রান্তরে উপস্থিত হন। আর আবু সুফিয়ান ২০০০ সৈন্য নিয়ে ‘মারুয-যাহরানে’ এসে আর সামনে অগ্রসর হওয়ার সাহস পায়নি। রাসূল ৮ দিন পর্যন্ত বদরে তাদের জন্য অপেক্ষা করেন। পরে আবু সুফিয়ান ফিরে গেলে রাসূল সাহাবাদের নিয়ে ফিরে আসেন।
নয়: দুমাতুল জান্দাল অভিযান : আরব ও সিরিয়া সীমান্তে দুমাতুল জান্দাল (বর্তমানে আল-জরফ) ছিল ইরাক, মিসর এবং সিরিয়ার মধ্যে আরবদের বাণিজ্য কাফেলা যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এ জায়গায় লোকেরা কাফেলাগুলোকে অধিকাংশ সময় লুণ্ঠন চালিয়ে বিপদগ্রস্ত করতো। নবী পঞ্চম হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে এক হাজার সৈন্য নিয়ে তাদেরকে শায়েস্তা করার জন্য নিজেই সেখানে যান। ফলে তারা ভয়ে পালিয়ে যায়।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এখন আর একটা দুইটা শক্তির পক্ষে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। তাই তারা সম্মিলিত আক্রমণের অপেক্ষায় ছিল।

আহজাবের যুদ্ধ
১. সম্মিলিত বাহিনী গঠন: মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রকে সমূলে উৎপাটিত করার জন্য আরবের বহুসংখ্যক গোত্রের সম্মিলিত আক্রমণ। এর মূল উদ্যোক্তা ছিল মদীনা থেকে বিতাড়িত হয়ে খায়বরে বসবাসকারী বনি নাজিরের ইয়াহুদি নেতারা। এদের মধ্যে বনি কিনানার কিনানাহ ইবনে রবী ইবনে আবিল হুকাইক, সালাম ইবনে আবিল হুকাইক, সালাম ইবনে মুশকিম, বনি নাজিরের হুয়াই ইবনে আখতাব, হুজা ইবনে কায়েস এবং বনি ওয়ায়েলের আবু আম্মার তারা সবাই ইয়াহুদি এবং সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে সম্মিলিত বাহিনীতে লোকদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। তারা কুরাইশদের নিকট গেলে তারা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে, বানু গাতফানের নিকট গেলে তারা তাদের নেতা উয়ায়না ইবনে হিসনের নেতৃত্বে, বানু র্মুরা তাদের নেতা হারেস ইবনে আওফের নেতৃত্বে এবং বানু আশজা তাদের নেতা মাসুদ ইবনে রখিলার নেতৃত্বে দশ-বারো হাজার সুসজ্জিত সৈন্যবাহিনী নিয়ে মদীনার ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য আসতে থাকে।
২. রাসূল -এর রণকৌশল: রাসূল -এর নিকট কাফেরদের সম্মিলিত বাহিনীর আক্রমণের খবর থাকায় নেতৃত্বস্থানীয় সাহাবাদের নিয়ে তিনি পরামর্শসভা আহবান করলেন। এ সভায় উপস্থিত সালমান ফারসি রা. পরামর্শ দিলেন শত্রুর আক্রমণ প্রতিহতের জন্য পরিখা খননের। সকলে এ প্রস্তাব সমর্থন করায় কাফিরদের বিশাল বাহিনী মদীনা আগমনের আগেই ৬ দিনের মধ্যে রাসূল মদীনার উত্তর-পশ্চিম দিকে পরিখা খনন করে ফেলেন। সালমান ফারসি রা.-এর ওপর খুশি হয়ে সকলে বলতে থাকেন:
وقال المهاجرون يومئذ: سلمان منا. وقال الأنصار: سلمان منا! فقال رسول الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: (سلمان منا أهل البيت)
অর্থাৎ: “মুহাজিররা বলেন, সালমান আমাদের, আনসাররা বলেন, সালমান আমাদের! অতঃপর রাসূল বলেন, সালমান আমার আহলে বায়িতের অন্তর্ভুক্ত।”
পরিখা খননের সময় সাহাবা কেরাম রা. রাসূল -এর নিকট বাইয়্যাত গ্রহণ করেন এবং তাদের অনুভূতি ছিল এরূপ-
“বারা ইবনে আযেব থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, খন্দক যুদ্ধের সময় রাসূল খন্দকের মাটি বহন করছিলেন। এমনকি তাঁর পবিত্র পেট মাটি লেগে ঢেকে গিয়েছিল। তিনি সে সময় বলছিলেন, আল্লাহর শপথ! তিনি আমাদেরকে হেদায়েত না করলে আমরা হেদায়েতপ্রাপ্ত হতাম না, আর দান-খয়রাতও করতাম না এবং নামাযও পড়তাম না। তাই হে আল্লাহ! আমাদের ওপর শান্তি নাযিল করো। শত্রুর সাথে মুকাবিলার সময় দৃঢ়পদ রাখো। নিশ্চয় শত্রুরা বিনা কারণে আমাদের ওপর চড়াও হয়েছে। যখন তারা ফিতনা ফাসাদ সৃষ্টির সংকল্প করেছে তখনই আমরা তা প্রত্যাখ্যান করে ব্যর্থ করে দিয়েছি। শেষের কথাগুলো বলার সময় নবী উচ্চস্বরে বলেন, আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি।” (বাবু হাফরিল খানদাক, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস সিয়ার, সহীহ বুখারি, হাদিস নং- ২৮৩৭)
পরিখা খননের সময় মুনাফিকরা অংশ না নিয়ে নিজেদেরকে লুকিয়ে রেখেছিল।

৩. খন্দক খননের সময়ের অলৌকিক ঘটনা: –
অর্থ: ঈসা ইবন ইউনুস র. রাসূলুল্লাহ ….এর একজন সাহাবা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন পরিখা খননের আদেশ দিলেন, তখন তাদের সামনে একটি কিনারে কঠিন প্রস্তরখ- পড়লো, যা খননকাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছিল। রাসূলুল্লাহ উঠে একটি ভারী কুঠার নিলেন, তাঁর চাদর পরিখার কিনারে রাখলেন এবং বললেন: সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়ে আপনার রবের বাণী সম্পূর্ণ এবং তার বাণী পরিবর্তন করার কেউ নেই, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ (৬:১১৫)। তাতে ঐ প্রস্তরখ-ের এক-তৃতীয়াংশ খসে পড়লো। সালমান ফারসি রা. সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি দেখলেন, রাসূলুল্লাহ -এর কুঠারাঘাতের সাথে সাথে এক ঝলক বিদ্যুৎ চমকে গেল। এরপর তিনি দ্বিতীয়বার আঘাত করলেন এবং বললেন: সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়ে আপনার রবের বাণী সম্পূর্ণ এবং তার বাণী পরিবর্তন করার কেউ নেই, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ (৬:১১৫)। তাতে ঐ প্রস্তরখ-ের আরো এক-তৃতীয়াংশ খসে পড়লো এবং সাথে এক ঝলক বিদ্যুৎ চমকে গেল। সালমান ফরসি তা দেখতে পেলেন। তারপর তিনি তৃতীয়বার আঘাত করলেন এবং বললেন : সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়ে আপনার রবের বাণী সম্পূর্ণ এবং তার বাণী পরিবর্তন করার কেউ নেই, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ (৬:১১৫)। তাতে ঐ প্রস্তরখ-ের অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ খসে পড়লো। রাসূলুল্লাহ বের হয়ে আসলেন এবং চাদরখানা নিয়ে বসে পড়লেন। সালমান রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যখনই পাথরে আঘাত করলেন, আমি দেখলাম তা থেকে বিদ্যুৎ ঝলক বের হয়েছে। রাসূল বললেন, হে সালমান! তুমি তা দেখেছো? তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেই সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন। তিনি বললেন, আমি যখন প্রথমবার আঘাত করলাম, তখন কিসরার শহরসমূহ এবং তার চারপাশের এলাকাসমূহ এবং আরো বহু শহর আমার সামনে উদ্ভাসিত হলো। আমি তা স্বচক্ষে দেখেছি। উপস্থিত সাহাবাগণ বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহ তা’য়ালার নিকট দোয়া করুন, তিনি যেন আমাদেরকে এ সকল শহরের বিজয় দান করেন এবং তাদের আবাসকে আমাদের গনিমত করে দেন, আর আমাদের হাতে তাদের দেশ বিধ্বস্ত করেন। রাসূলুল্লাহ এ জন্য দোয়া করলেন। তিনি বললেন, এরপর আমি দ্বিতীয়বার আঘাত করলাম, তাতে রোম স¤্রাটের এলাকাসমূহ এবং এর পার্শ্বস্থ এলাকাসমূহ আমাকে দেখানো হলো। আমি তা স্বচক্ষে দেখলাম। তারা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর নিকট দোয়া করুন, তিনি যেন আমাদেরকে এ সকল শহরের বিজয় দান করেন, আর তাদের ঘরবাড়ি আমরা গনিমতরূপে প্রাপ্ত হই এবং তাদের বসতি এলাকাসমূহ আমাদের হাতে বিধ্বস্ত হয়। রাসূলুল্লাহ এ জন্য দোয়া করলেন। তিনি বললেন, এরপর আমি তৃতীয়বার আঘাত করলাম, আমাকে হাবশার শহরসমূহ এবং এর পার্শ্বস্থ জনবসতিসমূহ দেখানো হলো। আমি তা স্বচক্ষে দেখলাম। এ সময় রাসূলুল্লাহ বললেন, তোমরা হাবশিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো না যতক্ষণ না তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। আর তোমরা তুর্কিদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করো না যতক্ষণ না তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
৪. সৈন্য বিন্যস্তকরণ : মদীনার উত্তর-পশ্চিম দিকে পরিখা খনন করে পরিখার পিছনে সৈন্যদের রেখে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি নেন। মদীনার দক্ষিণে বাগান ও গাছপালার পরিমাণ এত বেশি (এখনও আছে) ছিল যে, সেদিক থেকে আক্রমণ চালানো কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। পূর্বদিকে ছিল লাভার পর্বতমালা। মদীনার পিছনে ছিল মুসলমানদের মিত্র বানু কুরাইযা। আসলে মদীনার বাইরে পরিখার মুখোমুখি হতে হবে এটা কাফিররা ভাবতেই পারেনি। কারণ আরববাসীরা এরকম প্রতিরক্ষার সাথে পরিচিত ছিল না। কাজেই শীতকালে দীর্ঘস্থায়ী প্রস্তুতি না নিয়ে আসায় তারা কিছুটা বিপাকে পড়ে।
৫. বনি কুরাইযার বিশ্বাসঘাতকতা : বনি কুরাইযার সাথে মৈত্রী চুক্তি থাকায় মুসলমানরা তাদের পরিবার ও ছেলে-মেয়েদেরকে বনি কুরাইযার সন্নিহিত এলাকায় পাঠিয়ে দেয় এবং সেদিকে কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা করেনি। কাফেররা মুসলমানদের এ দুর্বল দিকটি আঁচ করে তাদের পক্ষ থেকে বনি নজিরের ইহুদি সর্দার হুয়াই ইবনে আখতাবকে বনি কুরাইযার কাছে পাঠায়। বনি কুরাইযাকে চুক্তি ভঙ্গ করে দ্রুত যুদ্ধে অংশ নিতে বললে তাদের নেতা কা‘ব বিন আসাদ প্রথম দিকে অস্বীকার করে পরিষ্কার বলে দেয়, “তুমি আমাকে মুহাম্মাদ সা.-এর বিরুদ্ধে চুক্তি ভঙ্গের জন্য আহবান জানাচ্ছো অথচ আমরা তাঁর সাথে চুক্তিবদ্ধ এবং আজ পর্যন্ত তাঁকে চুক্তি বাস্তবায়নকারী ও সত্যবাদী ছাড়া আর কোন কিছুই আমি দেখিনি। কাজেই আমি এ চুক্তি ভঙ্গ করতে পারি না।”
হুয়াই ইবনে আখতাব তখন তাকে বলে, “দেখো, আমি এখন সারা আরবের সম্মিলিত শক্তিকে এ ব্যক্তির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছি। একে খতম করে দেবার এটি একটি অপূর্ব সুযোগ। এ সুযোগ হাত ছাড়া করলে এরপর আর কোন সুযোগ পাবে না।” ফলে বানু কুরাইযা চুক্তি ভঙ্গ করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।
৬. বানু কুরাইযার বিশ্বাসঘাতকতার প্রভাব : রাসূল যথাসময়েই তাদের বিশ্বাসঘাতকতার খবর পেয়ে যান। সাথে সাথেই তিনি আনসারদের সরদারদেরকে (সা‘দ উবনে উবাদাহ, সা‘দ ইবনে মু‘আয, আবদুল্লাহ ইবনে রওয়াহা ও খাওয়াত ইবনে যুবাইর) ঘটনা তদন্ত এবং তাদেরকে বুঝাবার জন্য পাঠান। যাবার সময় তিনি তাদেরকে নির্দেশ দেন, যদি বনি কুরাইযা চুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে তাহলে ফিরে এসে সমগ্র সেনাদলকে সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিবে। কিন্তু তারা যদি চুক্তি ভঙ্গ করতে বদ্ধপরিকর হয়, তাহলে শুধুমাত্র আমাকে ইঙ্গিতে এ খবরটি দিবে, যাতে এ খবর শুনে সাধারণ মুসলমানরা হিম্মতহারা হয়ে না পড়ে। সরদারগণ সেখানে পৌঁছে দেখেন বানু কুরাইযা তাদের নোংরা চক্রান্ত বাস্তবায়নে পুরোপুরি প্রস্তুত। তারা প্রকাশ্যে তাদের জানিয়ে দেয় “আমাদের ও মুহাম্মাদের মধ্যে কোন অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি নেই।” এ জবাব শুনে তাঁরা মুসলিম সেনাদলের মধ্যে ফিরে আসেন এবং ইঙ্গিতে বলেন, ‘আদল’ ও ‘কারাহ’।
এ খবরটি দ্রুত মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ায় অনেকের মধ্যে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়। কারণ বানু কুরাইজার দিকে তাদের সন্তান ও পরিবারের লোকেরা ছিল এবং এ অংশে মুসলমানদের কোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না। মুনাফিকরা বলতে শুরু করে “আমাদের সাথে অঙ্গীকার করা হয়েছিল পারস্য ও রোমান সা¤্রাজ্য জয় করা হবে কিন্তু এখন অবস্থা এমন যে আমরা প্রস্রাব পায়খানা করার জন্যও বের হতে পারছি না।”
কেউ কেউ এ কথা বলে খন্দক যুদ্ধের ময়দান থেকে ছুটি চাইতে থাকে যে, এখন তো আমাদের গৃহও বিপদাপন্ন, সেখানে গিয়ে সেগুলো রক্ষা করতে হবে। কেউ এমন ধরনের গোপন প্রচারণাও শুরু করে দেয় যে, আক্রমণকারীদের সাথে আপস রফা করে নাও এবং মুহাম্মাদ কে তাদের হাতে তুলে দাও। একমাত্র সাচ্চা ও আন্তরিকতা সম্পন্ন ঈমানদাররাই এ কঠিন সময়ে আত্মোৎসর্গের সংকল্পের ওপর অটল থাকে।
৭. নাজুক পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাসূল -এর উদ্যোগ : এহেন নাজুক পরিস্থিতিতে নবী বানু গাতফানের সাথে সন্ধির কথাবার্তা চালাতে থাকেন এবং তাদেরকে মদীনায় উৎপাদিত ফলের এক-তৃতীয়াংশ নিয়ে ফিরে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। সেই সাথে আনসার সরদার সা’দ ইবনে উবাদাহ এবং সা’দ ইবনে মুয়াজ রা.-এর সাথে চুক্তির এ শর্তাবলী নিয়ে আলোচনা করেন। তখন তাঁরা বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল ! আমরা এমনটি করব এটি কি আপনার ইচ্ছা? অথবা এটা কি আল্লাহর হুকুম? না নিছক আপনি আমাদেরকে বাঁচানোর জন্য এটি করছেন?” জবাবে, রাসূল বলেন, “আমি কেবল তোমাদের বাঁচাবার জন্য এটি করছি। কারণ আমি দেখছি সমগ্র আরব একজোট হয়ে তোমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আমি তাদের একদলকে অন্যদলের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত করে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে চাই।” একথায় উভয় সরদার এক কণ্ঠে বলেন, “যদি আপনি আমাদের জন্য কিছু করতে এগিয়ে গিয়ে থাকেন তাহলে তা খতম করে দিন। যখন আমরা মুশরিক ছিলাম তখন এ গোত্রগুলো আমাদের নিকট থেকে কর হিসাবে একটি শস্যদানাও আদায় করতে পারেনি, আর আজ তো আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনার অধিকারী। এ অবস্থায় তারা কি আমাদের কাছ থেকে কর উসুল করবে? এখন তরবারি ছাড়া তাদের সাথে আমাদের আর কোন বিকল্প ফায়সালা নেই।” এ কথা বলে তাঁরা চুক্তিপত্রের খসড়াটি ছিঁড়ে ফেলে দেন যেটি তখনও স্বাক্ষর হয়নি।
৮ শত্রুদের মধ্যে ফাটল সৃষ্টির কৌশল : এ কঠিন সময়ে গাতফান গোত্রের ‘আশজা’ শাখার না‘ঈম ইবনে মাসঊদ রা. ইসলাম গ্রহণ করে এসে রাসূল কে বলেন, এখনো কেউ আমার ইসলাম গ্রহণের খবর জানে না। আপনি আমাকে দিয়ে যে কোন কাজ করাতে চান আমি তা করতে প্রস্তুত। রাসূল বলেন তুমি যেয়ে শত্রুদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করো, কেননা যুদ্ধটা হলো ধোঁকা।
এ কথায় নাঈম ইবনে মাসউদ প্রথমে বনি কুরাইযাতে যান। তাদের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত মেলামেশা বেশি থাকায় কল্যাণকামী হিসাবে বলেন, কুরাইশ ও গাতফান তো অবরোধে বিরক্ত হয়ে এক সময় ফিরে যেতেও পারে। এতে তাদের কোনো ক্ষতি হবে না। তোমাদের তো মুসলমানদের এখানে বসবাস করতে হবে। তারা চলে গেলে তোমাদের কী অবস্থা হবে? আমার মতে তোমরা ততক্ষণ যুদ্ধে অংশ নিয়ো না যতক্ষণ বাহির থেকে আগত গোত্রগুলোর মধ্য থেকে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ লোককে তোমাদের কাছে যিম্মি হিসাবে না রাখে। এ কথা বনু কুরাইযার মনে ধরলে তারা সংযুক্ত ফ্রন্টের কাছে যিম্মি চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।
এরপর নাঈম ইবনে মাসউদ কুরাইশ ও গাতফান সরদারদের কাছে যেয়ে বলেন, বনু কুরাইযা কিছুটা শিথিল হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তারা যদি তোমাদের নিকট যিম্মি হিসাবে কোন লোক চায় তাহলে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই এবং তাদেরকে মুহাম্মদ -এর নিকট সোপর্দ করে আপস রফা করে নিতে পারে। কাজেই তাদের সাথে সতর্কতার সাথেই কাজ করা উচিত। ফলে সম্মিলিত জোটের নেতারা বনু কুরাইযার ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে পড়ে।
তারা বনু কুরাইযার নিকট বলে পাঠায়, দীর্ঘ অবরোধ আমাদের নিকট বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে, তাই এখন আমরা একটা চূড়ান্ত যুদ্ধ চাই। আগামীকাল তোমরা মুসলমানদের পিছন দিক দিয়ে আক্রমণ করবে আর আমরা সামনের দিক থেকে আক্রমণ করবো। জবাবে বনু কুরাইযা বলে পাঠায়, আপনারা যতক্ষণ যিম্মি স্বরূপ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে আমাদের হাওলা না করে দেন, ততক্ষণ আমরা যুদ্ধের মাধ্যমে বিপদের সম্মুখীন হতে পারি না। এ জবাব শুনে সম্মিলিত জোটের নেতারা নাঈমের কথা সঠিক ছিল বলে বিশ্বাস করে। তারা যিম্মি দিতে অস্বীকার করে। ফলে বনু কুরাইযা বিশ্বাস করে যে, নাঈম আমাদের সঠিক পরামর্শ দিয়েছিল। এ যুদ্ধ কৌশল সফল হওয়ায় শত্রু শিবিরে ফাটল সৃষ্টি হয়।
৯. আহজাব যুদ্ধের চূড়ান্তরূপ : এখন অবরোধকাল ২৫ দিন থেকেও দীর্ঘ হতে চলছিল। শীতের মওসুম চলছিল। এত বড় সেনাদলের জন্য পানি, আহার্যদ্রব্য ও পশুখাদ্য সংগ্রহ করা কঠিন থেকে কঠিনতম হয়ে পড়ছিল, অন্যদিকে বিভেদ সৃষ্টি হওয়ার কারণে অবরোধকারীদের উৎসাহেও ভাটা পড়েছিল। এ ব্যাপারে সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে এসেছে- ইব্রাহিম তাইমি রা. থেকে বর্ণিত তিনি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমরা এক সময় হুযাইফা রা. এর নিকট ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি আকাক্সক্ষা প্রকাশ করে বললো, যদি রাসূল -এর সময় পেতাম (লোকটি তাবেয়ি ছিল), তাহলে তাঁর সঙ্গী হয়ে লড়াই করতাম, সর্বশক্তি নিয়োগ করে জিহাদে অংশ নিতাম! তার আকাক্সক্ষার কথা শুনে হুযাইফা রা. বললেন, আচ্ছা তুমি এভাবে নিজেকে নিয়োজিত করতে? (শুনো! জিহাদ জিনিসটা খুব একটা সহজ কাজ নয়) আমি নিজেকে এমন অবস্থায়ও পেয়েছি যে, আহজাব যুদ্ধের একরাত্রে আমরা রাসূল -এর সাথে ছিলাম। রাত্রটি ছিলো প্রচ- শীতের এবং প্রবল বাতাসের। আমরা এ দু‘টির সম্মুখীন হলাম। এ সময় রাসূল আমাদের বললেন, (আবু সুফিয়ান বাহিনী) কাফির সৈন্যদের খবর সংগ্রহ করে দিতে পারো, এমন কোনো লোক আছ কি? বিনিময়ে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকে আমার সাথী করে দিবেন। আমরা সবাই নীরব থাকলাম। আমাদের কেউ তাঁর এ আহবানে সাড়া দিলো না। তিনি আবারও বললেন, কাফিরদের খবর আমাকে সংগ্রহ করে দিতে পারো, (গুপ্তচরের মত কাজ করতে পারে) এমন কেউ আছো কি? মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাকে কিয়ামতের দিন আমার সাথী করবেন। এবারও আমরা সবাই নীরব রইলাম, আমাদের কেউই তাঁর আহবানে সাড়া দিলো না। তিনি তৃতীয়বার আহবান করলেন, কাফির কুরাইশদের খবর আমাকে সংগ্রহ করে দিতে পারো এমন কেউ আছো কি? এবারও আমরা নীরব রইলাম, আমাদের কেউ তাঁর আহবানে সাড়া দিলো না।
অতঃপর তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, ওহে হুযাইফা! ওঠো, তুমিই আমাকে কাফিরদের অবস্থা সংগ্রহ করে অবহিত করো। হুযাইফা রা. বলেন, যখন তিনি আমাকে নাম ধরে ডাকলেন, তখন আমি গত্যন্তর না দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে উঠে দাঁড়ালাম। তিনি আমাকে বললেন, যাও, কাফিরদের খবরাখবর সংগ্রহ করে আমাকে অবহিত করো। দেখো! আমার ব্যাপারে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করো না। পরে যখন আমি তাঁর নিকট থেকে বের হলাম মনে হচ্ছিলো আমি যেন গরম তাপের ভেতরে চলে যাচ্ছি (অর্থাৎ শীত-বাতাস কিছুই আমার অনুভূত হলো না)। অবশেষে আমি তাদের নিকট এসে দেখলাম, আবু সুফিয়ান আগুনের দিকে পৃষ্ঠ রেখে তাপ নিচ্ছে। তখন আমি তীর বের করে ধনুকের মধ্যে রাখলাম। একবার ইচ্ছা করলাম তাকে তীর নিক্ষেপ করেই ছাড়ি। ঠিক এমন সময় রাসূল -এর নির্দেশ, “তাদেরকে উত্ত্যক্ত করো না” স্মরণ হওয়ায় তা আর করলাম না। তবে যদি নিক্ষেপ করতাম তাহলে তখনই তাকে কাবু করতে পারতাম। অতঃপর আমি তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ফিরে এলাম। এ সময়ও আমি যেন গরম তাপ অনুভব করতে লাগলাম। পরে রাসূল -এর নিকট এসে তাদের খবরাদি জানালাম। এতক্ষণে আমি আরোপিত দায়িত্ব সম্পাদন করে স্থির হলাম। তখন রাসূল তাঁর অতিরিক্ত আলখেল্লাটি পরিয়ে দিলেন, যেটা পরিধান করে তিনি নামায পড়তেন। আমি সেটা গায়ে জড়িয়ে ভোর পর্যন্ত এমনভাবে ঘুমালাম যে, ভোরে তিনি আমাকে সম্বোধন করে বললেন, ‘ওহে ঘুম-পাগল, এবার ওঠো।’ (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস সিয়ার)
এখন অবরোধকাল ২৫ দিন থেকেও দীর্ঘ হতে চলছিল। এত বড় সেনাদলের জন্য পানি, আহার্যদ্রব্য ও পশুখাদ্য সংগ্রহ করা কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছিল। অন্য দিকে বিভেদ সৃষ্টি হওয়ার কারণে অবরোধকারীদের উৎসাহেও ভাটা পড়েছিল। এ অবস্থায় একরাতে হঠাৎ ভয়াবহ ধূলিঝড় শুরু হয়। এ ঝড়ের মধ্যে ছিল শৈত্য, বজ্রপাত, বিজলি চমক এবং অন্ধকার ছিলো এত গভীর যে নিজের হাত পর্যন্ত দেখা যচ্ছিলো না। প্রবল ঝড়ে শত্রুদের তাঁবুগুলো তছনছ হয়ে যায়। তাদের মধ্যে ভীষণ হৈ-হাঙ্গামা সৃষ্টি হয়। আল্লাহর কুদরাতের এ জবরদস্ত আঘাত তারা সহ্য করতে পারেনি। রাতের অন্ধকারেই প্রত্যেকেই নিজ নিজ গৃহের পথ ধরে। সকালে মুসলমানরা জেগে উঠে একজন শত্রুকেও দেখতে পায়নি। নবী ময়দান শত্রুশূন্য দেখে সঙ্গে সঙ্গেই বলেন, “এরপর কুরাইশরা আর কখনও তোমাদের ওপর আক্রমণ চালাবে না, এখন তোমরা তাদের ওপর আক্রমণ চালাবে।”

বনি কুরাইযার যুদ্ধ: খন্দক থেকে গৃহে ফিরে আসার পর জোহরের সময় জিব্রাইল (আ) এসে হুকুম শুনালেন, এখনি তরবারি নামিয়ে ফেলবেন না। বনি কুরাইযার ব্যাপারটি এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। এ মুহূর্তেই তাদের সমুচিত শিক্ষা দেওয়া দরকার। এ হুকুম পাওয়ার সাথে সাথেই রাসূল ঘোষণা করে দিলেন “যে ব্যক্তিই শ্রবণ ও আনুগত্যের ওপর অবিচল আছো সে আসরের নামায ততক্ষণ পর্যন্ত পড়ো না যতক্ষণ না বনু কুরাইযার আবাসস্থলে পৌঁছে যাও।” পথিমধ্যে সাহাবাদের একটি দল এ ঘোষণার সাথে সাথেই রাসূল আলী রা.-এর নেতৃত্বে একটি অগ্রবর্তী সেনাদল বানু কুরাইযার দিকে পাঠিয়ে দিলেন। তাঁরা যখন সেখানে পৌঁছালেন তখন ইহুদিরা নিজেদের গৃহের ছাদে উঠে নবী এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রচ- গালি বর্ষণ করলো। আলী রা.-এর ক্ষুদ্র সেনাদল দেখে তারা মনে করেছিল এরা এসেছে নিছক ভয় দেখানোর জন্য। কিন্তু রাসূল -এর নেতৃত্বে মুসলমানদের বিশাল বাহিনী যখন তাদেরকে ঘেরাও করে ফেলল তখন তাদের হুঁশ হলো। দু‘তিন সপ্তাহের বেশি তারা অবরোধের কঠোরতা বরদাশত করতে পারল না।
বনি কুরাইযার বিচার: বনি কুরাইযা এ শর্তে রাসূল -এর কাছে আত্মসমর্পণ করলো যে, আওস গোত্রের সরদার সা‘দ ইবনে মু‘আয রা. তাদের জন্য যে ফায়সালা করবেন উভয় পক্ষ তা মেনে নিবেন। উল্লেখ্য তারা মনে করেছিল জাহেলিয়াতের যুগ থেকে বনি কুরাইযা এবং আওস গোত্রের মধ্যে যে মিত্রতার সম্পর্ক চলে আসছিলো, তিনি সেদিকে নজর রাখবেন এবং কমপক্ষে বনু কাইনুকা ও বনু নাযিরের ন্যায় নিরাপদে মদীনা থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ দেবেন। আওস গোত্রের লোকেরাও সা’দ রা.-এর কাছে নিজেদের মিত্রদের সাথে সদয় আচরণ করার দাবি করেছিল।
কিন্তু সা’দ রা. মাত্র কিছুদিন আগেই দেখেছিলেন, দু’টি ইহুদি গোত্র মদীনা থেকে নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ নিয়ে কিভাবে আশপাশের সমস্ত গোত্রকে উত্তেজিত করে দশ-বারো হাজার সৈন্য নিয়ে মদীনা আক্রমণ করতে এসেছিল। সর্বশেষ এ ইহুদি গোত্রটি সবচেয়ে বিপদের সময় চুক্তিভঙ্গ করে মুসলমানদের পুরোপুরি ধ্বংস করার যে ষড়যন্ত্র করেছিল তাও সাদ রা.-এর নিকট স্পষ্ট ছিল। তাই তিনি ফায়সালা দিলেন, “বনি কুরাইযার সমস্ত ইহুদিদেরকে হত্যা করা হোক, নারী ও শিশুদেরকে গোলামে পরিণত করা হোক এবং তাদের সমুদয় ধন সম্পত্তি মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হোক।” সা’দ রা.-এর বিচার সম্পর্কে রাসূল বলেন,
: (لقد حكمت فيهم بحكم الله تعالى من فوق سبع أرقعة)
“সাত আসমানের ওপর আল্লাহ তা’য়ালা একই বিচার নির্ধারণ করেছেন।” (কুরতুবি)
সা’দ ইবনে মু‘য়াজ রা.-এর মৃত্যুতে আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠেছিল। রাসূল বলেন,
(اهتز لموته عرش الرحمن)
ইমাম মালেক র. ইয়াহইয়াহ ইবনে সাঈদ রা. থেকে বর্ণনা করেন,
لقد نزل لموت سعد بن معاذ سبعون ألف ملك، ما نزلوا إلى الأرض قبلها
“সা’দ ইবনে মুয়া‘জ রা.-এর মৃত্যুতে আসমান থেকে সত্তর হাজার ফেরেশতা জমিনে নেমে আসে, যা ইতঃপূর্বে কারোর মৃত্যুতে আসেনি।”
বনি কুরাইযার বিচার বাস্তবায়ন : এ ফায়সালা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। এ সময় সেখান থেকে ১৫০০ তলোয়ার, ৩০০ বর্ম, ২০০০ বর্শা ১৫০০ ঢাল উদ্ধার করা হয়, যা তারা আহযাব যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য রেখে দিয়েছিল। (তাফহিম) রাসূল বিচারের রায় বাস্তবায়নের জন্য ঘোষণা করেন,
وأمر رسول الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بقتل كل من أنبت منهم وترك من لم ينبت.
“রাসূল নির্দেশ করেন, যাদের নাভীর নিচে চুল গজিয়েছে (প্রাপ্তবয়স্ক) তাদেরকে হত্যা করতে হবে। আর যাদের চুল গজায়নি (অপ্রাপ্ত বয়স্ক) তাদেরকে হত্যা করা যাবে না।” এ কারণে আতিয়া কুরাইযী হত্যা থেকে বেঁচে ইসলাম গ্রহণ করেন। সর্বমোট ৬০০ থেকে ৭০০ পুরুষকে হত্যা করা হয়। (বিদায়া নেহায়া) বনু আসাদ গোত্রের নেতা হুয়াই ইবনে আখতাবকেও হত্যা করা হয়।
আবু লুবাবাহ ইবনুল মুনযির রা.-এর তওবা: বানু কুরাইযার বিচারের পূর্বে আবু লুবাবাহ রা. তাদের নিকট গেলে তাদের পুরুষ-মহিলারা এসে তাদের পরিণতির কথা জিজ্ঞাসা করে, তিনি তখন হাত দিয়ে গলার দিকে ইঙ্গিত করেন, যার অর্থ হত্যা। আবু লুবাবাহ রা. পরে নিজের ভুল বুঝতে পারলে নিজেকে মদীনার মসজিদের সাথে বেঁধে রাখেন এবং তওবা কবুল হয়ে রাসূল খুলে না দেয়া পর্যন্ত বাড়িতে ফিরে না যাওয়ার অঙ্গীকার করেন। প্রতি ওয়াক্তে তার স্ত্রী বাঁধন খুলতে চাইলে তিনি অস্বীকার করতেন। ইবনে উয়ায়না বলেন, তার ব্যাপারে নি¤েœর আয়াত নাযিল হয়।
قال ابن عيينة وغيره: فيه نزلت:” يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَماناتِكُمْ”
“হে ঈমানদারগণ! জেনে-বুঝে আল্লাহ ও তার রাসূলের খেয়ানত করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানতেরও খেয়ানত করো না”।
পরে তার তওবা কবুলের ব্যাপারে সূরা তওবার নি¤েœাক্ত আয়াত নাযিল হয়।
﴿” وَآخَرُونَ اعْتَرَفُوا بِذُنُوبِهِمْ﴾
“আর অপর কিছু লোক নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে, তারা এক সৎকাজের সাথে অন্য অসৎকাজ মিশিয়ে ফেলেছে; আল্লাহ হয়তো তাদেরকে ক্ষমা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।”
বানু কুরাইযার গনিমাত বণ্টন: যুদ্ধ শেষে রাসূল সাহাবীদের মাঝে গনিমত বণ্টন করেন। অধিকাংশ মুফাস্সিরিনদের মতে, বনি কুরাইযার গনিমাত বণ্টনের পূর্বে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের জন্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ দেওয়ার বিধান নাযিল হয়। আল্লাহ বলেন,
﴿” وَاعْلَمُوا أَنَّما غَنِمْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ” ﴾
“আর জেনে রাখ, যুদ্ধে যা তোমরা গনিমত হিসেবে লাভ করেছে, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর, রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতিমদের, মিসকিনদের এবং সফরকারীদের।”
অনেকে বলেন, বনি কুরাইযার গনিমাত বণ্টনের সময় রাসূল সা. সর্বপ্রথম অশ্বারোহীদের জন্য তিন ভাগ এবং পদাতিকদের জন্য একভাগ দেওয়ার রীতি চালু করেন। এ যুদ্ধে গনিমাত হিসাবে রাইহানা বিনতে আমর ইবনে যানাফাহ/খানাফাহকে আমৃত্যু রাসূল এর ভাগে দেওয়া হয়। পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। সময়টা ছিল পঞ্চম হিজরির জিল-কা‘দা মাসের শেষ এবং জিল-হজ্জ মাসের প্রথম দিকে।

আহজাব ও বানু কুরাইযা যুদ্ধের ফলাফল
ইমাম মালেক রহ. বলেন, আহযাবের যুদ্ধে মুসলমানদের ৪-৫ জন শাহাদাত বরণ করেন। কিন্তু ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন, আমার মতে এ সংখ্যা ৬ জন।
১. সা‘দ বিন মুয়াজ বিন আমর রা. বনি আব্দিল আশহাল
২. আনাস ইবনে আউস ইবনে আতিক রা. বনি আশাহাল
৩. আব্দুল্লাহ ইবনে সাহল রা. বনি আশাহাল
৪. তুফাইল ইবনে নুমান রা. বনি সালামাহ
৫. সালাবাহ ইবনে গানামাহ রা. বনি সালামাহ
৬. কা‘ব ইবনে যায়েদ রা. বনি নাজ্জারের দীনার শাখা।
সকলেই তীরবিদ্ধ হয়ে শাহাদাতবরণ করেন, কিন্তু তীর কে বা কারা কোন দিক থেকে নিক্ষেপ করেছিল তা জানা যায় না।

আহজাবের যুদ্ধে কাফেরদের তিনজন নিহত হয়। তারা হলো-
১. উসমান ইবনে মুনাব্বাহ ইবনে সাব্বাক ইবনে আব্দে দার মতান্তরে উসমান ইবনে উমাইয়্যা ইবনে মুনাব্বাহ ইবনে উবায়েদ ইবনে সাব্বাক
২. নওফেল ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে মুগিরা আল-মাখযুমী
৩. আমর ইবনে আব্দে ওয়াদ্দ।

বানু কুরাইযাতে মুসলমানদের মধ্যে শাহাদাতবরণ করেন-
১. খাল্লাদ ইবনে সুয়াইদ রা. বানু খাজরাজ
২. আবু সিনান ইবনে মহসিন আল- আসাদী রা. যিনি উকাশা ইবনে মহসীন রা.-এর ভাই।
রাসূল তাদের দু’জনকেই বনি কুরাইযার কবরস্থানে দাফন করেন, যেখানে আজও মুসলমানদের বসবাস রয়েছে।
এসব ফলাফল বিচারে বলা যায়, শত প্রতিকূল অবস্থায় আল্লাই মুমিনদের জন্য যথেষ্ট।
বানু কুরাইযাতে সালাতাইন, ছুটে যাওয়া নামায এবং কাজা নামাজের বিধান পাওয়া যায়
এক্ষেত্রে দু’টি হাদিস প্রণিধানযোগ্য।
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, খন্দক যুদ্ধের দিন উমার রা. কাফিরদের গালি দিতে দিতে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল ! সূর্য ডুবে গেল অথচ আমি আসরের নামায পড়ার সুযোগ পেলাম না। রাসূল বলেন, আল্লাহর শপথ! আমিও তা পড়ার সুযোগ পাইনি। উমার রা. বলেন, আমরা ‘বুতহান’ নামক উপত্যকায় গিয়ে অবতরণ করলাম। রাসূল ওযু করলেন, আমরাও ওযু করলাম। সূর্য ডুবে যাওয়ার পর রাসূল আসরের নামায পড়লেন, অতঃপর মাগরিবের নামায পড়লেন। (তিরমিযি, কিতাবুস সালাত)
আবু উবাইদা ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবদুল্লাহ রা. বলেন, খন্দকের যুদ্ধের দিন মুশরিকরা রাসূল কে (যুদ্ধে ব্যতিব্যস্ত রেখে) চার ওয়াক্ত নামাজ থেকে বিরত রাখে। পরিশেষে আল্লাহর ইচ্ছায় যখন কিছু রাত অতিবাহিত হল তখন তিনি বিলাল রা. কে আযান দিতে নির্দেশ দিলেন। তিনি আযান দিলেন এবং ইকামত বললেন। রাসূল জোহরের নামায পড়ালেন। অতঃপর বিলাল ইকামত দিলে তিনি আসরের নামায পড়ালেন। অতঃপর বিলাল ইকামত দিলে তিনি মাগরিবের নামায পড়ালেন। অতঃপর বিলাল ইকামত দিলে তিনি এশার নামায পড়ালেন।
(তিরমিযি, কিতাবুস সালাত)
উপরিউক্ত হাদিসগুলো থেকে একথা প্রমাণিত হয় যে, একই ওয়াক্তের মধ্যে কাযা নামাজ আদায় করলে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। কিন্তু যে, ওয়াক্তে নামাজ আদায় করা হবে সেই ওয়াক্তের সময় কম থাকলে কিভাবে নামাজ আদায় করতে হবে এ নিয়ে তিনটি মতামত সুস্পষ্ট হয়।
এক: বর্তমান ওয়াক্ত চলে গেলেও কাযা নামাজ দিয়ে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে পড়া। এ মতের পক্ষে ইমাম মালেক, লাইস ও জুহরী।
দুই: বর্তমান ওয়াক্ত দিয়ে শুরু করতে হবে। এ মতের পক্ষে হাসান বসরী, ইমাম শাফেয়ী, ইবনে ওয়াহ্হাব ও ফকীহ মুহাদ্দিসগণ।
তিন: নামাজ আদায়কারী ইচ্ছানুসারে যে কোন মতে আদায় করতে পারবে।

আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা:
﴿يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جاءَتْكُمْ جُنُودٌ فَأَرْسَلْنا عَلَيْهِمْ رِيحاً وَجُنُوداً لَمْ تَرَوْها وَكانَ اللَّهُ بِما تَعْمَلُونَ بَصِيراً (৯﴾
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল, অতঃপর আমরা তাদের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলাম ঘূর্ণিবায়ু এবং এমন বাহিনী যা তোমরা দেখনি। আর তোমরা যা কর আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।”
আল্লাহ তা’য়ালা ঈমানদারদেরকে আহজাব যুদ্ধে যে সাহায্য করেছিলেন, তার স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, যখন তোমাদের ওপর সৈন্যবাহিনী এসেছিল তখন আমি তাদেরকে (শত্রুদের) পরাভূত করার জন্য প্রচ- ধূলিঝড় ও সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলাম যা তোমরা দেখতে পাওনি। মুজাহিদ রহ. বলেন, খন্দক যুদ্ধের দিন প্রত্যুষে যে প্রচ- ধূলিঝড় আল্লাহ প্রেরণ করেন, তাতে শত্রুদের রান্নার ডেগ ও তাঁবুসমূহ মুহূর্তের মধ্যে ছিন্নভিন্ন হয়ে উড়ে যায়। সৈন্যবাহিনী বলতে ফেরেশতাদেরকে বুঝানো হয়েছে, যাদেরকে ঈমানদাররা দেখতে পায়নি আর সেদিন তাদের যুদ্ধ করার প্রয়োজনও হয়নি।
ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত রাসূল বলেন, (আহজাব যুদ্ধের দিন) আমাকে ধূলিঝড় দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে আর তাদেরকে ধ্বংস করা হয়েছে ফলে তারা ময়দান থেকে পিছন দিকে পালিয়ে গিয়েছে। (মুসনাদে ইবনে আব্বাস রা., ইসহাক ইবনে রাওয়াবিয়্যা)
অনেকে বলেন, এই ধূলিঝড় ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে মুহাম্মদ সা.কে দেওয়া মুজিযা। কেননা মুসলমান এবং কাফেরদের দূরত্ব ছিল শুধুই খন্দক। কাফেরদের সবকিছু ধ্বংস হলেও মুসলমানেরা সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিলেন। আল্লাহ তাদের অন্তরের ভিতরে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। শত্রুদের ভয়ে মুসলমানদের অবস্থা কেমন হয়েছিল আল্লাহ তা’য়ালা তা দেখছিলেন।
﴿إِذْ جاؤُكُمْ مِنْ فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَإِذْ زاغَتِ الْأَبْصارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَناجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللَّهِ الظُّنُونَا (১০﴾
“যখন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল তোমাদের উপরের দিক ও নিচের দিক হতে, তখন তোমাদের চোখ বিস্ফারিত হয়েছিল এবং তোমাদের প্রাণ হয়ে পড়েছিল কণ্ঠাগত, আর তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানাবিধ ধারণা করছিলে।”
শত্রুরা বিভিন্ন দিক থেকে আক্রমণ করেছিল। যেমন ওপর দিক তথা পূর্ব দিক থেকে এসেছিল আওফ ইবনে মালেকের নেতৃত্বে বনি নযর, উয়ায়না ইবনে হিসনের নেতৃত্বে নজদবাসী এবং তুলাইহা ইবনে খুওয়াইলিদ আল-আসাদির নেতৃত্বে বনি আসাদ আক্রমণ করে। নিচের দিক দিক তথা পশ্চিম দিক থেকে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মক্কাবাসী এবং হুয়াই ইবনে আখতাবের নেতৃত্বে বনি কুরাইযা আক্রমণে এসেছিল।
কাফেরদের চারদিকের আক্রমণে পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়েছিল যে, মুসলমানদের প্রাণ বের হয়ে যেত, যদি কণ্ঠনালী না থাকত। আর মুনাফিকরা আল্লাহর সাহায্যের ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ করতে লাগল এবং বলতে লাগল কোথায় মুহাম্মাদের রোম পারস্য বিজয়? এখন নিজেদের পরিবার রক্ষারও কোন সুযোগ তাদের হাতে নেই।
﴿هُنالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْزالاً شَدِيداً (১১﴾
“এখানে মুমিনগণ পরীক্ষিত হয়েছিল এবং তারা ভীষণভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল।”
আহজাব যুদ্ধে মুসলমানদেরকে ক্ষুধা, হত্যা, ভয়, বন্দী এবং সম্মিলিত বাহিনী দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। পরীক্ষার মাত্রা কতটা ভয়াবহ ছিল তা উপরোল্লিখিত হুযাইফা আল-ইয়ামান রা. থেকে বর্ণিত হাদিস থেকেই প্রমাণ করা যায়।
﴿وَإِذْ يَقُولُ الْمُنافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ ما وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ إِلاَّ غُرُوراً (১২﴾
“আর স্মরণ কর, যখন মুনাফিকরা ও যাদের অন্তরে ছিল ব্যাধি, তারা বলছিল, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়।”
এমন পরিস্থিতিতে মুনাফিকরা এবং যাদের অন্তরে সন্দেহ ছিল তারা আল্লাহর ওয়াদা কিসরা ও কাইসারের ধন ভা-ার করতলগত হওয়াকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল। বিশেষ করে তু’আমাহ ইবনে উবাইরিক, মু’তাব ইবনে কুশাইর এবং এবং ৭০ জনের মত একদল মানুষ এরকম বলাবলি করছিল। ওপরে খন্দক খনন সম্পর্কিত পাথরের ঘটনার ব্যাপারে তাদের সন্দেহের জবাবে এ আয়াত নাযিল হয়।
﴿وَإِذْ قالَتْ طائِفَةٌ مِنْهُمْ يا أَهْلَ يَثْرِبَ لا مُقامَ لَكُمْ فَارْجِعُوا وَيَسْتَأْذِنُ فَرِيقٌ مِنْهُمُ النَّبِيَّ يَقُولُونَ إِنَّ بُيُوتَنا عَوْرَةٌ وَما هِيَ بِعَوْرَةٍ إِنْ يُرِيدُونَ إِلاَّ فِراراً (১৩﴾
“আর যখন তাদের একদল বলেছিল, হে ইয়াসরিববাসী! (এখানে রাসূলের কাছে প্রতিরোধ করার) তোমাদের কোন স্থান নেই। সুতরাং তোমরা (ঘরে) ফিরে যাও। এবং তাদের মধ্যে একদল নবীর কাছে অব্যাহতি প্রার্থনা করে বলছিল, আমাদের বাড়িঘর অরক্ষিত; অথচ সেগুলো অরক্ষিত ছিল না, আসলে পালিয়ে যাওয়াই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।”
‘তয়েফাহ’ বলা হয় একের অধিক লোকসমষ্টিকে। এখানে মূলত মুনাফিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। আর ইয়াসরিব মদীনার পূর্ব নাম। সুহাইলি বলেন, আমালিকা সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তি ইয়াসরিব ইবনে উমাইল ইবনে মাহলাইল ইবনে আওজ ইবনে আমালিক ইবনে লাওজ ইবনে ইরাম ইবনে সাম ইবনে নুহ (আ)-এর নামানুসারে এ শহরের নাম ইয়াসরিব রাখা হয়েছিল। (ইয়াকুতি, মু’জামুল বুলদান) কেউ কেউ এর নাম ‘যুহফাহও’ রেখেছেন। পরবর্তীতে রাসূল -এর হিজরতের পর থেকে এ শহরের নাম ‘মাদিনাতুন্নবী’ রাখা হয়েছে।
এ বাক্যটি দু’টি অর্থে বলা হয়েছে। এক: এর বাহ্যিক অর্থ হচ্ছে, খন্দকের সামনে কাফেরদের মুকাবিলায় অবস্থান করার কোন অবকাশ নেই, শহরের দিকে চলো। দুই: এর গূঢ় অর্থ হচ্ছে, ইসলামের ওপর অবিচল থাকার কোন অবকাশ নেই। এখন নিজেদের পৈতৃক ধর্মে ফিরে যাওয়া উচিত। ফলে সমগ্র আরবজাতির শত্রুতার মুখে আমরা যেভাবে নিজেদেরকে সঁপে দিয়েছি তা থেকে রক্ষা পেয়ে যাবো। মুনাফিকরা নিজমুখে এসব কথা এজন্য বলতো যে, তাদের ফাঁদে যে পা দেবে তাকে নিজেদের গূঢ় উদ্দেশ্য বুঝিয়ে দেবে এবং তাদের কথা শুনে সতর্ক হয়ে যাবে। আসলে যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়নের নির্দেশ দেওয়াই মুনাফিকদের মূল উদ্দেশ্য ছিল।
ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ইহুদিরা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুল ও তার সাথীদেরকে বলেছিল, কিসের কারণে তোমরা আবু সুফিয়ান ও তার বাহিনীর হাতে নিজেদেরকে হত্যার জন্য সমর্পণ করছো? আমরা আমাদের কওমের সাথে নিরাপদে আছি আর তোমরা মদীনায় ফিরে যেয়ে তোমাদের কওমের সাথে নিরাপদে থাকো।
আর একদল লোক মদীনায় ফিরে যাওয়ার জন্য রাসূল -এর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করেছিল। মুফাস্সিরিনরা বলেন, তারা হলো, বনু হারিসাহ ও বনু সালমাহ। ইয়াজিদ ইবনে রুমান ও সুদদী বলেন, আওস ইবনে কাউজি এবং আবু উরাবাতা ইবনে আওস এবং তার গোত্র বনু হারিসাহ। দহ্হাক বলেন, অনুমতি ছাড়া ৮০ জন ফিরে যায়। বনু কুরাইযা বিশ্বাসঘাতকতার সাথে সাথে মুসলিম সেনাদল থেকে কেটে পড়ার জন্য মুনাফিকরা চমৎকার একটা বাহানা পেয়ে গেল। তারা এই বলে রাসূল -এর নিকট ছুটি চাইতে লাগল যে, এখন তো আমাদের ঘরই বিপদের মুখে পড়ে গিয়েছে, কাজেই ঘরে ফিরে গিয়ে আমাদের পরিবার ও সন্তানদের হিফাজত করার সুযোগ দেয়া উচিত। অথচ সে সময় সমগ্র মদীনাবাসীর হিফাজতের দায়িত্ব ছিল রাসূল -এর ওপর।
﴿وَلَوْ دُخِلَتْ عَلَيْهِمْ مِنْ أَقْطَارِهَا ثُمَّ سُئِلُوا الْفِتْنَةَ لَآتَوْهَا وَمَا تَلَبَّثُوا بِهَا إِلَّا يَسِيرًا (১৪ ﴾
“আর যদি বিভিন্ন দিক থেকে শত্রুদের প্রবেশ ঘটত, তারপর তাদেরকে শিরক করার জন্য প্ররোচিত করা হতো, তবে অবশ্যই তারা সেটা করে বসত, তারা সেটা করতে সামান্যই বিলম্ব করত।”
এ আয়াতের দু’টি অর্থ রয়েছে। এক: দহ্হাক বলেন, যদি নগরে (মদীনায়) প্রবেশ করে কাফেররা বিজয়ীর বেশে এ মুনাফিকদের এই বলে আহবান জানাতো, এসো আমাদের সাথে মিলে মুসলমানদেরকে হত্যা করো, তাহলে তারা তা পালনে কোন দ্বিধা করত না। দুই: হাসান বলেন, যদি তারা তাদেরকে পুনরায় শিরকে ফিরে আসতে বলতো তাহলে তারা দ্রুত ফিরে আসতে দ্বিধাবোধ করত না।
﴿وَلَقَدْ كانُوا عاهَدُوا اللَّهَ مِنْ قَبْلُ لا يُوَلُّونَ الْأَدْبارَ وَكانَ عَهْدُ اللَّهِ مَسْؤُلاً (১৫﴾
“যদি তোমরা মৃত্যু অথবা হত্যার ভয়ে পালিয়ে যাও, হে রাসূল আপনি বলুন, তবে পালিয়ে বেড়িয়ে তোমাদের কোন লাভ হবে না, তবে সে ক্ষেত্রে তোমাদেরকে সামান্যই ভোগ করতে দেয়া হবে।”
ওহুদ যুদ্ধের সময় তারা যে দুর্বলতা দেখিয়েছিল, তারপর লজ্জা ও অনুতাপ প্রকাশ করে তারা আল্লাহর কাছে অঙ্গীকার করেছিল যে, এবার যদি পরীক্ষার কোন সুযোগ আসে তাহলে তারা নিজেদের এ ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করবে। কিন্তু আল্লাহকে নিছক কথা দিয়ে প্রতারণা করা যেতে পারে না। যে ব্যক্তিই তাঁর সাথে কোন অঙ্গীকার করে তার সামনে তিনি পরীক্ষার কোন না কোন সুযোগ এনে দেন। তাই ওহুদ যুদ্ধের মাত্র দু’বছর পরেই তিনি তার চাইতেও বেশি বড় বিপদ নিয়ে এলেন এবং এভাবে তারা তাঁর সাথে কেমন ও কতটুকু সাচ্চা অঙ্গীকার করেছিল তা যাচাই করে নিলেন। মুকাতিল বলেন, তারা হলেন আকাবার ২য় শপথের অঙ্গীকারকারী ৭০ জন। কিয়ামতের দিন অবশ্যই প্রত্যেককেই তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হতে হবে।
﴿قُلْ لَنْ يَنْفَعَكُمُ الْفِرارُ إِنْ فَرَرْتُمْ مِنَ الْمَوْتِ أَوِ الْقَتْلِ وَإِذاً لا تُمَتَّعُونَ إِلاَّ قَلِيلاً﴾
“যদি তোমরা মৃত্যু অথবা হত্যার ভয়ে পালিয়ে যাও, হে রাসূল আপনি বলুন, তবে পালিয়ে বেড়িয়ে তোমাদের কোন লাভ হবে না, তবে সে ক্ষেত্রে তোমাদেরকে সামান্যই ভোগ করতে দেয়া হবে।”
এভাবে পলায়নের ফলে তোমাদের আয়ু বেড়ে যাবে না। বরং প্রত্যেকের আজল নির্ধারিত। সময়ের এক সেকেন্ড আগে ও পরে কাউকে মুত্যুবরণ করতে হবে না। আর পলায়নের মাধ্যমে তোমরা কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারবে না। অন্যদিকে সারা জাহানের ধন সম্পদ হস্তগত করতে পারবে না। পালিয়ে বাঁচলে তোমরা বড়জোর কয়েক বছর বাঁচবে এবং তোমাদের জন্য যতটুকু নির্ধারিত আছে ততটুকু আরাম-আয়েশ ভোগ করতে পারবে।
﴿قُلْ مَنْ ذَا الَّذِي يَعْصِمُكُمْ مِنَ اللَّهِ إِنْ أَرادَ بِكُمْ سُوءاً أَوْ أَرادَ بِكُمْ رَحْمَةً وَلا يَجِدُونَ لَهُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلِيًّا وَلا نَصِيراً (১৭) ﴾
“বলুন, ‘কে তোমাদেরকে আল্লাহ থেকে বাধা দান করবে, যদি তিনি তোমাদের অমঙ্গল ইচ্ছে করেন অথবা অনুগ্রহ করতে ইচ্ছে করেন? আর তারা আল্লাহ ছাড়া নিজেদের কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না।”

তাওহিদবাদীদের বিশ্বাসের বাস্তবরূপ আলোচ্য আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ যদি কোন মানুষের অনিষ্ট চান তাহলে পৃথিবীর এমন কোন শক্তি আাছে যে, তাকে রক্ষা করতে পারে? আর আল্লাহ যদি কারোর কল্যাণ, সাহায্য ও নিরাপত্তা দিতে চান তাহলে কে আছে তা থেকে বান্দাহকে বঞ্চিত করতে পারে? কাজেই বান্দার সকল ব্যাপারে আল্লাহর চেয়ে কোন নিকট সাহায্যকারী নেই।
﴿قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الْمُعَوِّقِينَ مِنْكُمْ وَالْقائِلِينَ لِإِخْوانِهِمْ هَلُمَّ إِلَيْنا وَلا يَأْتُونَ الْبَأْسَ إِلاَّ قَلِيلاً (১৮) ﴾
“আল্লাহ অবশ্যই জানেন, তোমাদের মধ্যে কারা বাধাদানকারী ও কারা তাদের ভাইদেরকে বলে, আমাদের দিকে চলে এসো। তারা অল্পই যুদ্ধে যোগদান করে।”
অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় ৩টি বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। এক: এ আহবানটি ছিল মুনাফিকদের মুসলমানদের উদ্দেশ্য করে। তারা মুসলমানদের বলেছিল তোমরা কেন মুহাম্মাদের পিছনে ঘুরছ? সে তোমাদের মাথা খেয়ে ফেলবে নিজে ধ্বংস হবে এবং তোমাদেরকেও ধ্বংস করবে, কাজেই আমাদের পথে ফিরে আসো এবং নিরাপদে শান্তিতে থাকো। দুই: বনু কুরাইজার ইহুদিরা তাদের মুনাফিক ভাইদেরকে বলেছিল, মুহাম্মাদকে ছেড়ে আমাদের দিকে চলে এসো নচেৎ আবু সুফিয়ান জয়লাভ করলে তোমাদের অস্তিত্ব থাকবে না। তিন: ইবনে যায়েদ বলেন, রাসূল এর একজন সাহাবা যখন আহজাব যুদ্ধের তীর ও তরবারির কঠিন অবস্থায় আবদ্ধ ছিলেন তখন তাঁর মাতা-পিতার পক্ষ থেকে তার ভাই এসে বলল, তুমি আর তোমার সঙ্গীরা অবরুদ্ধ হয়ে আছ, বাঁচতে চাইলে আমাদের নিকট আস। তিনি তখন তাঁর ভাইকে বললেন, তুমি মিথ্যা কথা বলছ, আল্লাহ অবশ্যই এ খবর প্রকাশ করে দিবেন। এই বলে তিনি রাসূল এর নিকট যেয়ে ঘটনা বললে আল্লাহ নি¤েœর আয়াত নাযিল করেন।
﴿” قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الْمُعَوِّقِينَ مِنْكُمْ وَالْقائِلِينَ لِإِخْوانِهِمْ هَلُمَّ إِلَيْنا” أَشِحَّةً عَلَيْكُمْ فَإِذا جاءَ الْخَوْفُ رَأَيْتَهُمْ يَنْظُرُونَ إِلَيْكَ تَدُورُ أَعْيُنُهُمْ كَالَّذِي يُغْشى عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَإِذا ذَهَبَ الْخَوْفُ سَلَقُوكُمْ بِأَلْسِنَةٍ حِدادٍ أَشِحَّةً عَلَى الْخَيْرِ أُولئِكَ لَمْ يُؤْمِنُوا فَأَحْبَطَ اللَّهُ أَعْمالَهُمْ وَكانَ ذلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيراً (১৯) ﴾
“আল্লাহ অবশ্যই জানেন, তোমাদের মধ্যে কারা বাধাদানকারী ও কারা তাদের ভাইদেরকে বলে, আমাদের দিকে চলে এসো। তারা অল্পই যুদ্ধে যোগদান করে। তোমাদের ব্যাপারে কৃপণতাবশত। অতঃপর যখন ভীতি আসে, তখন আপনি দেখবেন, মৃত্যুভয়ে মূর্ছাতুর ব্যক্তির মত চোখ উল্টিয়ে তারা আপনার দিকে তাকায়। কিন্তু যখন ভয় চলে যায় তখন তারা ধনের লালসায় তোমাদেরকে তীক্ষè ভাষায় বিদ্ধ করে। তারা ঈমান আনেনি ফলে আল্লাহ তাদের কাজকর্ম নিষ্ফল করেছেন এবং এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।”
সাচ্চা মুমিনরা যে পথে তাদের সবকিছু উৎসর্গ করে দিচ্ছে মুনাফিকরা সে পথে শ্রম, সময়, চিন্তা ও সহায়-সম্পদ স্বেচ্ছায় ও সানন্দে ব্যয় করতে প্রস্তুত নয়। প্রাণপাত করা ও বিপদ মাথা পেতে নেয়া তো দূরের কথা থাক, কোন স্বাভাবিক কাজেও মুসলমানদেরকে তারা নির্দ্বিধায় সহযোগিতা করতে চায় না।
তাদের ভয় দুই ধরনের যথা: এক: সুদ্দি বলেন, শত্রুদের আক্রমণে নিজেদের নিহত হওয়ার ভয়। দুই: দ্বিতীয় ভয় হলো রাসূল এর ব্যাপারে যদি তিনি শত্রুদের উপর জয় লাভ করেন।
তীক্ষè ভাষায় তারা তোমাদের বিদ্ধ করতে থাকে এর দুটি অর্থ। এক: যুদ্ধের ময়দান থেকে জয় লাভ করে মুমিনরা যখন ফিরে আসবে তখন তারা বড়ই হৃদ্যতা সহকারে ও সাড়ম্বরে তোমাদের স্বাগত জানায়, এবং বড় বড় বুলি আওড়িয়ে এই বলে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করে যে, আমরাও পাকা মুমিন এবং এ সফলতায় আমাদেরও অংশ রয়েছে কাজেই আমরাও গনিমাতের মালের হকদার। দুই: বিজয় অর্জিত হলে তাদের কণ্ঠ বড়ই তীক্ষè এবং ধারাল হয়ে যায় এবং তারা অগ্রবর্তী হয়ে দাবি করতে থাকে, আমাদের ভাগ দাও, আমরাও কাজ করেছি, সবকিছু তোমরা লুটেপুটে নিয়ে যেয়ো না।
﴿أُولئِكَ لَمْ يُؤْمِنُوا فَأَحْبَطَ اللَّهُ أَعْمالَهُمْ وَكانَ ذلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيراً﴾
“তারা ঈমান আনেনি ফলে আল্লাহ তাদের কাজকর্ম নিষ্ফল করেছেন এবং এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।”
আর এ সকল কপট লোকদের ব্যাপারে আল্লাহর সিদ্ধান্ত হলো, তারা কখনই অন্তর থেকে ঈমান আনে নাই। আর তাদের সকল ভালো কাজকে আল্লাহ বাতিল করে দিবেন। আর এটা করা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ। কারণ আল্লাহর দরবারে কাজের বাহ্যিক চেহারার ভিত্তিতে ফয়সালা হয় না বরং বাহ্যিক চেহারার গভীরতম প্রদেশে বিশ্বাস ও আন্তরিকতা আছে কি না তার ভিত্তিতে ফয়সালা করা হয়। এখানে এ বিষয়টি গভীরভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, যেসব লোক আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কে স্বীকৃতি দিয়েছিল, নামায পড়ছিল, রোযা রাখছিল, যাকাতও দিচ্ছিল, এবং মুসলমানদের সাথে অন্যান্য সৎকাজে শামিল হচ্ছিল, তাদের সম্পর্কে পরিষ্কার ফায়সালা শুনিয়ে দেওয়া হলো যে, তারা আদতে ঈমানই আনেনি। আর এ ফয়সালা কেবলমাত্র এরই ভিত্তিতে করা হলো যে, কুফর ও ইসলামের দ্বন্দ্বে যখন কঠিন পরীক্ষার সময় এলো তখন তারা দোমনা হবার প্রমাণ দিলো, দ্বীনের স্বার্থের উপর নিজের স্বার্থের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করলো এবং ইসলামের হিফাজতের জন্য নিজের প্রাণ, ধন-সম্পদ ও শ্রম নিয়োজিত করতে অস্বীকৃতি জানালো। অতএব যেখানে আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি বিশ্বস্ততা নেই সেখানে ঈমানের স্বীকৃতি, ইবাদত এবং অন্যান্য সৎকাজের কোন মূল্য নেই।
﴿يَحْسَبُونَ الْأَحْزابَ لَمْ يَذْهَبُوا وَإِنْ يَأْتِ الْأَحْزابُ يَوَدُّوا لَوْ أَنَّهُمْ بادُونَ فِي الْأَعْرابِ يَسْئَلُونَ عَنْ أَنْبائِكُمْ وَلَوْ كانُوا فِيكُمْ ما قاتَلُوا إِلاَّ قَلِيلاً (২০) ﴾
“তারা মনে করে সম্মিলিত বাহিনী চলে যায়নি। যদি সম্মিলিত বাহিনী আবার এসে পড়ে, তখন তারা কামনা করবে যে, ভালো হতো যদি ওরা যাযাবর মরুবাসীদের সাথে থেকে তোমাদের সংবাদ নিত! আর যদি তারা তোমাদের সাথে অবস্থান করত তবে তারা খুব অল্পই যুদ্ধ করত।”
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ মুনাফিক ও দুর্বল ঈমানদারদের অন্তরের পরিকল্পনা প্রকাশ করে দিয়েছেন। তারা মনে করে নিয়েছিল সম্মিলিত বাহিনী না যেয়ে যদি তাদের ওপর আক্রমণ করে তাহলে আরবের বেদুঈনদের মধ্যে গিয়ে তারা এই খবর রাখবে যে, মুসলমানরা ধ্বংস হলো, না আবু সুফিয়ানের সম্মিলিত বাহিনী জয়লাভ করলো? তাহলে কমপক্ষে তারা নিজেদেরকে মৃত্যু এবং আসন্ন বিপদ থেকে নিরাপদ রাখতে পারবে। আর যদি তারা মুসলিম বাহিনীর সাথে থাকতোও তাহলে তারা কোনভাবেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতো না। করলেও লোকদেখানোর জন্য নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করতো। কাজেই এতসব কঠিন ও প্রতিকূল পরিবেশে এবং সকল সহজ পরিবেশেও তোমাদের জন্য রাসূল আদর্শ, যা পরবর্তী আয়াতে সুস্পষ্টভাবে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন।
﴿لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا ﴾
“নিশ্চয় তোমাদের জন্য রাসূলের মধ্যে আছে ‘উসওয়াতুন হাসানাহ’ এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে আল্লাহ ও শেষ দিনের আকাক্সক্ষী এবং বেশি বেশি করে আল্লাহকে স্মরণ করে।”
‘উসওয়াতুন’ আরবি শব্দ এর অর্থ اَلقٌدوَةٌ (আল-কুদওয়াতু) দৃষ্টান্ত, ( المثالআল-মিছালু) উপমা, ما يتعزى به (মা উতায়ায্যাহ বিহি) যে কারণে মানুষ সম্মানিত হয়।
উরপঃরড়হধৎু ড়ভ ওংষধস গ্রন্থে বলা হয়েছে-
‘অহ বীধসঢ়ষব’ অৎ-জধমযরন ংধুং, রঃ রং ঃযব পড়হফরঃরড়হ রহ যিরপয ধ সধহ রং রহ ৎবংঢ়বপঃ ড়ভ ধহড়ঃযবৎ’ং রসরঃধঃরহম যরস.
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ কে মহৎ চরিত্রের অধিকারী বা অনুসরণীয় মডেল দ্বারা কী বুঝানো হয়েছে এ নিয়ে মুফাস্িসরিনদের বক্তব্য হলো:
১. আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, মহৎ চরিত্রের অর্থ- মহৎ দীন।
২. আলী রা. বলেন, মহৎ চরিত্র বলে কুরআনের শিষ্টাচার বুঝানো হয়েছে।
৩. সা‘আদ ইবনে হিশাম ইবনে আমির রা. বলেন, আমি আয়েশা রা. কে রাসূল এর চরিত্র সম্পর্কে অবহিত করতে বললে তিনি বলেন, তোমরা কি কুরআন পড়নি? আমি বললাম হ্যাঁ, তিনি বলেন, ‘নবী এর চরিত্র ছিল আল কুরআন। অন্য বর্ণনায় আছে যে, তিনি বলেন, ‘তাঁর চরিত্রই ছিল আল-কুরআন।’
৪. তাফসীরে ইবনে কাসীরে বলা হয়েছে, তিনি নিজের সৃষ্টিগত স্বভাব-চরিত্র পরিবর্তন করে কুরআনের চরিত্র ও স্বভাবকে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। সুতরাং কুরআন যা করতে বলেছে তিনি তা করেছেন আর যা করতে নিষেধ করেছে তা থেকে বিরত থেকেছেন।
৫. আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল কে পাপ ও পুণ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি তখন বলেন, ‘পুণ্য হলো উত্তম চরিত্র।’
৬. শাইখ মুহাম্মাদ উসাইমিন রহ. বলেন, ‘উত্তম চরিত্র হলো আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের সাথে উত্তম আচরণ করা।’

শিক্ষা
– মুসলমানরা কখনও কখনও আগে আক্রমণ করতে পারবে, নাজদের ঘটনা তার বড় প্রমাণ।
– শাহাদাতের পূর্বে নফল নামাজ আদায় করা।
– রাসূল গায়েব জানেন না।
– যালেমের যুল্মের প্রতিশোধের জন্য কুনুতে নাজেলাহ পড়া।
– সকল অবস্থায় পরামর্শ করা। কেননা রাসূল ওহি নাযিল অবস্থায়ও সাহাবাদের সাথে পরামর্শ করেছেন।
– যে কোন কঠিন কাজ সম্পাদন এবং পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য শপথ নেওয়া।
– যুদ্ধের ক্ষেত্রে কৌশল নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা যুদ্ধটা হলো একটা ধোঁকা।
– মিত্র শক্তি যে কোন সময় চুক্তি ভঙ্গ করতে পারে এ বিষয়টি মাথায় রেখে কৌশল নির্ধারণ করা।
– পরিস্থিতি কঠিন ও ভয়াবহ হলে দুর্বল ইমানদারদের ঈমান বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যায়।
– কঠিন পরিস্থিতিতে মুনাফিকদের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যায়।
– গুপ্তচরবৃত্তি ইসলামে জায়েজ।
– জাহেলিয়াতের সম্পর্ক ইসলামের যুগে অব্যাহত থাকতে পারে না।
– বালেগ হওয়ার আলামত নাভীর নিচে চুল গজানো।
– গনিমাতের সম্পদ বণ্টনের জন্য ইসলামে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।
– সকল অবস্থায় রাসূল আমাদের জন্য আদর্শ মানব।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply