পৌর নির্বাচন পরাজিত গণতন্ত্র -সামছুল আরেফীন

দেশে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো পৌরসভা নির্বাচন। এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের বিপুল জয় হলেও হেরেছে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। ২০১৪ সাল যেভাবে শুরু হয়েছিল প্রহসনের নির্বাচন দিয়ে, এবার ২০১৫ সাল শেষ হলো একই মানের আরেকটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। উভয় নির্বাচনকালে একই দল ক্ষমতায় এবং অভিন্ন নির্বাচন কমিশন পরিচালনার দায়িত্বে। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, আগেরটা ছিল জাতীয় নির্বাচন, আর এবারেরটা স্থানীয় নির্বাচন।
বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ-গোলাগুলি, বোমাবাজি, কেন্দ্র দখল করে জালভোট প্রদানের মধ্য দিয়ে গত ৩০ ডিসেম্বর পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের ২৩৪টি পৌরসভায় নির্বাচনে সংঘর্ষে সাতকানিয়ায় যুবদলের এক কর্মী নিহত হয়েছেন। সেই সাথে সাংবাদিক ও পুলিশসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েক শ’ আহত হয়েছে। কিছুসংখ্যক কেন্দ্রে রাতেই নৌকা মার্কায় সিল মারা হয়েছে। যশোরের একটি কেন্দ্রে ভোট শেষ হওয়ার আগেই ভোট গণনা সম্পন্ন হয়ে গেছে। অনিয়মের কারণে নরসিংদীর মাধবদী পৌরসভার ভোট স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। এ নির্বাচনে বিএনপির পক্ষ থেকে ২শ’টি পৌরসভার দেড় সহ¯্রাধিক কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে পুনরায় ভোট গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। আর ১৭৬টি কেন্দ্রে থেকে আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থীদের সমর্থকরা সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) এজেন্টদের বের করে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে দলটি। ২৫টি পৌরসভার মেয়র প্রার্থীরা নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। তাদের মধ্যে শুধু যে বিএনপির প্রার্থী আছেন তা নয়, সরকারের শরিক জাতীয় পার্টি, এমনকি খোদ আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী এবং (অবিশ্বাস্য হলেও সত্য) আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল প্রার্থী পর্যন্ত আছেন।

৯টার আগেই ভোট শেষ
জামালপুরে পৌরসভা নির্বাচনে ব্যাপক ভোট জালিয়াতি হয়েছে। সকাল ৯টার মধ্যে সদর পৌরসভার ৪২ কেন্দ্রের ৩৯টিই দখল করে নেয় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থক ক্যাডাররা। সদরের বিএনপি ও জাপা সমর্থিত মেয়রপ্রার্থীও ভোট দিতে পারেননি। জেলার বাকি পৌরসভাতেও একই ধরনের চিত্র। ৬ পৌরসভার একটিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী। পুলিশের সহযোগিতায় জালভোটের মহোৎসব করেছে নৌকার সমর্থকরা। ধানের শীষের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে বাক্স ভর্তি করে জালিয়াতরা।
এসব ঘটনায় দফায় দফায় সরকারদলীয়দের সাথে বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। এ সময় পুলিশ নির্বিচারে গুলি, টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এতে আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক।
ঘড়ির কাঁটায় তখন ১০টা ৫ মিনিট। ৩০ নম্বর কলিমুল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ৬ নম্বর বুথের ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা গেল ভ্যানিটি ব্যাগ মার্কার এজেন্ট আসমা বেগম তুলি নিজেই এক শ’ ব্যালট পেপারের একটি বান্ডিল নিয়ে সিল মেরে বাক্সে ঢোকাচ্ছেন। এই চিত্রটি পুলিশসহ অন্য এজেন্টরা দেখলেও ভয়ে কিছু বলতে পারছেন না। শুধু বিড়বিড় করে গালমন্দ করছেন। প্রশ্ন করতেই পোলিং এজেন্ট লুৎফা বেগম এ প্রতিবেদককে বলেন, এ রকম ভোট আমার জীবনে দেখিনি।
পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ভোট দিতে তখন লাইনে ভোটাররা অপেক্ষা করলেও তারা বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এর আগেও তিনি একাধিকবার ভোট কারচুপি করে ব্যালট বাক্স ভর্তি করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। ৫নং বুথে তখন তখন খাতা-কলমে ৩০০ ভোটের মধ্যে ১০০ ভোট পড়ে। তখন বাক্সটি কানায় কানায় ভর্তি ছিল। ভোর থেকেই অবস্থান করা যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ধানের শীষের চিহ্নিত ভোটারদের লাইন থেকে টেনে-হিঁচড়ে ভোটকেন্দ্রের বাইরে বের করে দেয়। এ রকম অভিযোগ করেন খুপিবাড়ী পুলিশ লাইনের সম্রাট, দরিপাড়ার লিটন, হারুন ও জনিসহ অনেকেই।
এ সময় নৌকার সমর্থক এক যুবককে দেখা যায়, তিনি কেন্দ্রের বাইরে থেকে একগোছা সিল মারা ব্যালট এনে সরাসরি বাক্সে ঢোকালেন। তখন কেন্দ্রের ভেতর সাংবাদিক থাকায় পুলিশ তার গায়ে হাত বুলিয়ে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। যুবকটি তখন পুলিশকে ধাক্কা মেরে বলেন, সরেন, কাজ করতে দেন। পুলিশ নীরব দর্শক। নৌকার সমর্থক ব্যালট বাক্স ভর্তি করে বের হয়ে যান।
একই চিত্র সরকারি জাহেদা শরিফ মহিলা কলেজ ভোটকেন্দ্রে। ঘড়ির কাঁটায় তখন ৯টা ৩০ মিনিট। তখন পর্যন্ত নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও ৯টা ৪৫ মিনিটে চিত্র পাল্টে যায়। প্রিজাইডিং অফিসার রাশেদুল ইসলামের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে। এখানে তেমন কোনো সমস্যা নেই। হঠাৎ করে যুবলীগ-ছাত্রলীগসহ সরকার সমর্থক নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়ে ভোটকেন্দ্র দখল করে নেয়। বিএনপির সমর্থকরা বাধা দিতে গেলে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ-বিজিবি ৩০ রাউন্ড শটগানের ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এ রকম সিংহজানী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়, লাঙ্গলজোড়া উচ্চবিদ্যালয়, বানিয়াবাজার উচ্চবিদ্যালয়, ছনকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, নাসিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ৪২টি কেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৩৯টি কেন্দ্র সকাল ৯টার মধ্যে দখল করে ভোট ছিনতাই, জালিয়াতি সম্পন্ন করে নৌকার সমর্থকরা। ভোট দিতে পারেননি জামালপুর সদর পৌরসভার বিএনপির মনোনীত মেয়রপ্রার্থী অ্যাডভোকেট শাহ মো: ওয়ারেছ আলী মামুন।
নির্বাচনে কারচুপি ও দখলের অভিযোগ করে ভোট বর্জন করেন জাতীয় পার্টির মনোনীত মেয়রপ্রার্থী খন্দকার হাফিজুর রহমান বাদশা। বিএনপির মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট শাহ মো: ওয়ারেছ আলী মামুন জানান, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রশিদপুরের বাসা থেকে ভোট দিতে রশিদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেলে আওয়ামী লীগ সমর্থক নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। আত্মরক্ষার্থে তিনি ভোট না দিয়েই ফিরে যান। ৪২টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩৯টি কেন্দ্র আওয়ামী লীগ দখল করে নিয়েছে বলে তিনি জানান।

আগের রাতেই ভোট শুরু
ভোট শুরু নির্বাচনের আগের রাতে। আর ভোটারও খোদ পুলিশ নিজেরাই। এই হলো শান্তিপূর্ণ (!) পৌর নির্বাচনের নমুনা। ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৮টা থেকে ভোট শুরুর কথা থাকলেও আগের রাত থেকেই অনেক পৌরসভায় ভোট শুরু হয়। মাদারীপুরের কালকিনি, কুমিল্লার বরুড়া, ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর, চট্টগ্রামের চন্দনাইশ এবং যশোরের বেশ কয়েকটি পৌরসভার কেন্দ্রে সিল মারা ব্যালট পেপার পাওয়া গেছে। যশোরের অনেক কেন্দ্রে দুপুরের আগেই ব্যালট শেষ হয়ে যায়।
এ দিকে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক আগের রাতেই ব্যালটে নৌকা প্রতীকে সিল মেরে রাখার অভিযোগে বিভিন্ন এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৩৮ জন সদস্যকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। রাজধানীর অদূরে দাউদকান্দি ঈদগাহ কেন্দ্রের মতো অনেক পৌরসভায় দুপুরের মধ্যেই সব ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যাওয়ার মতোও অভিযোগ ওঠে। ফলে ভোটাররা ঝুঁকি নিয়ে কেন্দ্রে এলেও তারা ভোট দিতে পারেননি।
কুমিল্লার বরুড়ায় ভোটের আগের রাতেই সিল মারা ১২ শ’ ব্যালট জব্দ করা হয়। কেন্দ্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ এই ব্যালটগুলোতে সিল মেরে রাখে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কুমিল্লার বরুড়ার লতিফপুর শিলমুড়ি উত্তর ইউপি অফিস ভোটকেন্দ্র থেকে আগের রাতে অগ্রিম সিল মারা ১২ শ’ ব্যালট পেপার জব্দ করা হয়।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, আগের রাতে পুলিশ সদস্যরা নৌকা প্রতীকে এ জাল ভোট দেন। পরে সকালে রিটার্নিং কর্মকর্তা লুৎফুন নাহার নাজিম এসব ব্যালট পেপার বাতিল করে সাময়িকভাবে ওই কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করেন। সকাল ৮টার আগেই এ খবর প্রচারের পর ওই এলাকার ভোটারদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের টহল বাড়ানো হয়। যশোরের অনেক কেন্দ্রে দুপুরের আগেই ভোটগ্রহণ শেষ হয়ে যায়।
এ দিকে মাদারীপুরের কালকিনিতে আগের রাতে সিল মারা ১১ শ’ ব্যালট উদ্ধার করা হয়। নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট পেপার ও নির্বাচনী সামগ্রী পাহারায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ছাড়া অন্য কেউ সেখানে ছিল না। কাজেই পুলিশই ব্যালটে সিল মারা কাজটি অতি সূক্ষ্মতা আর চতুরতার সাথে সম্পন্ন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে ভোটের আগের রাতে সিল মারা ৩৫০টি ব্যালট পাওয়া গেছে। পরে অভিযোগের প্রেক্ষিতে সেগুলো বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রার্থীকে হয়রানি, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ারও অভিযোগ এসেছে অনেক পৌরসভা থেকে। ভোটের একদিন আগেই ব্যালটে আ’লীগের প্রার্থীদের পক্ষে ব্যালটে সিল মারারও অভিযোগ আসে।
নীলফামারীর বাজিতপুর পৌরসভার একটি ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগের লোকেরা ব্যালট পেপারে সিল মারার ঘটনায় ওই কেন্দ্র আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে কমপক্ষে পাঁচজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ফেনীর দাগনভূঁঞাতে ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে বাধা দেয় সরকারদলীয় লোকজন, ফলে সকাল থেকেই সেখানে ভোট দেয় বহিরাগতরা। চাঁদপুরের মতলবে বাইশপুর কেন্দ্রে সংঘর্ষ হয়েছে। নরসিংদীর মনোহরদীর ৯ কেন্দ্র থেকে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষের লোকজনকে বের করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মুন্সীগঞ্জের ইন্দ্রাকপুরে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন, তারাবোতে জালভোট দেয়ার অভিযোগে যুবলীগের নেতাকে আটক করা হয়েছে। বরগুনা কেন্দ্রের বাইরে বোমা বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
ধামরাই পৌরসভায় একটি কেন্দ্রে বিএনপির পার্থীর এক এজেন্টকে বের করে দেয়ার অভিযোগ করেছেন। সোনারগাঁওয়ে জালভোট দেয়ার অভিযোগে ২ জনকে আটক করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য।

এ নির্বাচনেও এমন চিত্র!
এবারের পৌর নির্বাচনে বিএনপিসহ প্রধান সব রাজনৈতিক দল অংশ নিলেও ফেনীর দাগনভূঁঞার চিত্র ছিল অন্য রকম। অনেক ভোটকেন্দ্র ছিল ভোটারশূন্য। খোদ দাগনভূঁঞায় আবদুল আউয়াল মিন্টুর বাড়ির সামনের ভোটকেন্দ্রে কোনো ভোটারের দেখা মেলেনি। সকাল থেকেই ওই ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি তেমন ছিলো না। এ ছাড়া ভোটারশূন্য আতাতুর্ক হাইস্কুল কেন্দ্রের মাঠে তিনটি কুকুরকে অলস সময় কাটাতে দেখা গেছে। দিনের অধিকাংশ সময় কেন্দ্রটি ছিল ভোটারশূন্য বলে দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত সংবাদে দেখা গেছে।

অবিশ্বাস্য ভোট অবিশ্বাস্য ফল
আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০১১ সালেও বিএনপি পৌর নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, যদিও সেই নির্বাচন কাগজে কলমে অদলীয় ছিল। সে নির্বাচনে ২৩৬টি পৌরসভার মধ্যে বিএনপির সমর্থকেরা ৯২টি আর আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা ৮৮টি পৌরসভায় জয়ী হয়েছিলেন। আর এখন তা উল্টে দাঁড়াল ১৭৮ বনাম ২২।
জামায়াতে ইসলামী নিকট অতীতে জনসমর্থন ও সাংগঠনিক শক্তির দিক দিয়ে দেশের তৃতীয় প্রধান দল হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু গত কয়েক বছরে হামলা-মামলা, গুম-গ্রেফতার, নিধন-নির্যাতন মিলে বেনজির দমনপীড়নে দলটি তার স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লাও পায়নি তারা। তারপর দু’টি মেয়র আসন জিতে নিয়েছে তারা। একটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহর, অন্যটি দিনাজপুরের বীরগঞ্জ। এ ছাড়া কাউন্সিলর ৫২টি ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর ১৭টিতে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
ভোট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৩১টি পৌরসভায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে। এর মধ্যে ১৪টিতে পেয়েছে ৯০ শতাংশের ওপরে। এগুলোসহ ২০৭টি পৌরসভায় আওয়ামী লীগ গড় ভোট পেয়েছে ৫৩.৫৪ শতাংশ। আর ২০৪টি পৌরসভায় বিএনপির প্রাপ্ত ভোটের হার ২৭.৬৭ শতাংশ। এ ছাড়া ২৮ পৌরসভায় বিএনপি ১০ শতাংশেরও কম ভোট পেয়েছে। নির্বাচন বিশ্লেষকেরা এই ফলকে অবিশ্বাস্য বলে মনে করছেন। এ বিষয়ে স্থানীয় নির্বাচন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, তথ্য-উপাত্তই বলে দিচ্ছে ভোটের দিন বাস্তবে কী ঘটেছিল। বিশেষ বিশেষ পৌরসভায় ক্ষমতাসীন দল যে ৯০ শতাংশের ওপরে ভোট পেয়েছে, তা বিশ্বাস করা কঠিন।
গণতন্ত্রই হারলো
দীর্ঘ সাত বছর পর দলীয় প্রতীকে মুখোমুখি হলো প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। বিএনপি বলেছিল গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে তারা পৌর নির্বাচনে এসেছে। আওয়ামী লীগ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা গণতন্ত্র রক্ষা করবে। কিন্তু পৌর নির্বাচনে গণতন্ত্র কতটুকু রক্ষা হলো এ প্রশ্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। নির্বাচনে জেতার জন্য আওয়ামী লীগের ন্যক্কারজনক কর্মকান্ডে হতাশ হয়েছেন গণতন্ত্রমনা দেশের মানুষ। বিশ্লেষকরা এ নির্বাচনকে চরম কারচুপি ও জালিয়াতি এবং কেউ কেউ ভোট ডাকাতির নির্বাচন বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে আওয়ামী লীগ ও ইসি এটাকে স্মরণকালের ভালো নির্বাচন বলে অভিহিত করলো।
গত সিটি নির্বাচনেও ব্যাপক কারচুপি করেছে ক্ষমতাসীন দল। যার ভূরি ভূরি প্রমাণ রয়েছে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। তখনও গণতন্ত্র হোঁচট খেয়েছিল। এরপর এবার আবার পৌর নির্বাচনেও আরেকবার হারলো গণতন্ত্র। পর্যবেক্ষকদের মতে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, সিটি নির্বাচন ও পৌর নির্বাচনে যেভাবে ভোট কারচুপি হলো তাতে গণতন্ত্র পা পিছলে পড়ে গেলো। আর এ থেকে উত্তরণের উপায় রাজনীতিবিদদেরই বের করতে হবে।
পৌর নির্বাচনে গণতন্ত্র পাস করেনি বলে মন্তব্য করেন লেখক ও অধ্যাপক ড. গলিমুল্লাহ খান। তিনি বলেন, একজনের ভোট আরেক জন দিয়ে দেয়। ভোট কারচুপি হয়। এটাকে বলে ইমপারসনিফিকেশন করা, যেটা গণতন্ত্রের মূল কাজ নয়। তিনি বলেন, আমাদের দেশে গণতন্ত্র পাস করেনি। আদর্শ নির্বাচন বলে বিশ্বে কোনো নির্বাচন নেই। তবে তুলনামূলক ভালো নির্বাচনই হচ্ছে আদর্শ নির্বাচন। তিনি যশোরে এক পৌরসভায় বিকেল ৩টার মধ্যে ভোট গণনা শেষ হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, এমন ঘটনা কোনো নির্বাচন হয়েছে বলে আমার মনে হয় না।
বিশিষ্ট সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ বলেছেন, ফলাফল কী হবে তা নির্বাচন অনুষ্ঠানের দু’দিন আগেই আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের দেয়া বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বুঝা গেছে। তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে সরকার বদল হয় না তবে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা বাড়ে। আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে জনগণের রায়কে লুণ্ঠন করেছে। নির্বাচনে সহিংস ঘটনার চিত্র সংখ্যায় কম হলেও গণতন্ত্রের প্রতি কুঠারাঘাত পড়েছে। আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে জিতলেও যে অনিয়ম করেছে তা জাতির গায়ে কলঙ্ক লেপে দিয়েছে। এ জন্য তাকে ভবিষ্যতে চরম মূল্য দিতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাসিম আখতার হুসাইনের মতে, কারচুপি-অনিয়মের কারণে ভোটাররা প্রতারিত হয়েছেন। তিনি বলেন, এ নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্র নিশ্চিত হবে না। অনেকের ভ্রান্ত ধারণা যে নির্বাচন নিয়মিত হচ্ছে, তার মানেই এখানে গণতন্ত্র আছে- তা ঠিক নয়। যেখানে ভোটাররা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন কিন্তু ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ভিন্ন দৃশ্য, আগে থেকেই ছাপদেয়া ব্যালট পেপার দিয়ে বাক্স ভরা হয়- এটা কি ভোটারদের সাথে প্রতারণা নয়?

সঙ্কট আরো গভীর হলো
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর দেশ যে রাজনৈতিক সঙ্কটে পড়েছিল, সে সঙ্কটটি ৩০ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনের পর আরও গভীর হয়েছে। রাজনৈতিক সঙ্কটটির সূত্রপাত হয় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের মধ্য দিয়ে। এ সংশোধনীতে মহাজোট সরকার প্রায় সব রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন, সুশীল ও নাগরিক সমাজের পরামর্শ উপেক্ষা করে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করে সে ব্যবস্থা বিচারপতি খায়রুল হকের একটি রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশের একাংশ ব্যবহার করে এককভাবে বাতিল করে দিয়ে দলীয় ব্যবস্থাধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে। অথচ মহাজোট সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার সংস্কার না করে, বিচারপতি হকের রায়ে আরও দু’বার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাধীন সংসদ নির্বাচনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সরকার ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার স্বার্থে এ ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়।
৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন এবং ২৮ এপ্রিলের সিটি নির্বাচনের পর ৩০ ডিসেম্বরের পৌর নির্বাচন দেশে গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত না নড়বড়ে করে দিয়েছে, তা সচেতন মানুষের কাছে স্পষ্ট। অনেকেই বলছেন, কার্যত একদলীয় সংসদের পর একদলীয় স্থানীয় সরকারের পথ সুগম করছে যে নির্বাচনী প্রক্রিয়া, তাকে কার্যত একদলীয় চরিত্রই দেয়া হয়েছে। বিশ্বের যেসব দেশের নামের সাথে ‘রিপাবলিক’ বা ‘প্রজাতন্ত্র’ আছে, তাদের বৈশিষ্ট্য সাধারণত গণতান্ত্রিক। বাংলাদেশ শুধু রিপাবলিক নয়, পিপলস রিপাবলিক বা গণপ্রজাতন্ত্র। অর্থাৎ এখানে জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। অথচ আজ জাতি যা কিছু দেখতে বাধ্য হচ্ছে নির্বাচন, সংসদ, স্থানীয় সরকার প্রভৃতি নামে; তা এর অনেকটাই বিপরীত।

SHARE

Leave a Reply