সর্বশেষঃ
post

ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মাতালিপনার দৌরাত্ম্য

নাবিউল হাসান

২৩ জুলাই ২০২২

মনের কথাগুলো খুলে বলার পাশাপাশি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার পূর্ণাঙ্গ অধিকার আমাদের মৌলিক অধিকার। ব্যক্তির মতপ্রকাশ, ধর্ম পালন, লেখালেখি, বিয়ে-শাদি, সংস্কৃতি চর্চা, খাওয়া দাওয়া, আনন্দ বিনোদন, বিচরণ ও বসবাস সবকিছুই দেশের আইনের খেলাপ না করে নিজের পছন্দমতো করবে এটাই ব্যক্তিস্বাধীনতা। স্বাধীনতা ছাড়া কোনো কাজই মানুষের মনে আনন্দ দিতে পারে না। স্বাভাবিকভাবে মনে করা হয় ‘স্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছা তাই করার অধিকার।’ কারণ স্বাধীনতা পেয়েই প্রজাপতি রঙিন ফুলে ফুলে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায়। পাখিরা ভোরের লগ্নকে গানের কলতানে মাতিয়ে তোলে। মৌমাছি আপন মনে মধু সংগ্রহ করে। কল্লোলে মুখরিত হয়ে বয়ে যায় নির্ঝরিণী। সারি সারি উড়ে চলে সাদা বক। খেলা করে কালো পানকৌড়ি আর বালিহাঁসের দল। ছন্দ তোলে মেঘের কণা; বইতে থাকে ঝিরিঝিরি। এমন নির্মল স্বাধীনতা তার পবিত্র আভায় উদ্ভাসিত হলে পৃথিবীর মাটি হয় ধন্য। প্রকৃতির এ সুন্দর ব্যবস্থাপনায় কোনো অসভ্য শক্তি হস্তক্ষেপ করলেই নষ্ট হয় সুন্দরের গুঞ্জন। এই অবুঝ সৃষ্টিরাজির নিজস্ব কোনো কুচক্রী মগজ নেই বলে নিজেরা কখনও সুন্দরের কোনো ক্ষতি সাধন করে না। কিন্তু মানুষ হলো এমন জাতি, যার এক অংশ ভালো করতে চাইলে আরেক অংশ বেঁকে বসে অশুভ মগজ মাথায় নিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ প্রয়োজনীয় মৌলিক, সহমৌলিক সামাজিক সুবিধা ভোগ করার কথা ও বৈধ পন্থায় আরম্বড়পূর্ণ জীবন যাপন করা তার শখ হতে পারে। কেননা মৌলিক অধিকারের সংজ্ঞার দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় ‘যা সমাজের লোক হিসেবে জীবন যাপনের জন্য একজন মানুষের একান্তই প্রয়োজন। যা থেকে তাঁকে বঞ্চিত করে রাখা কিছুতেই উচিত নয়। এ অধিকারগুলো যথাযথরূপে সংরক্ষিত না হলে মানুষের মানবিক মর্যাদা বিপন্ন হতে বাধ্য।’ ‘রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এ অধিকারগুলো দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথমত; সাম্য ও সমতা। দ্বিতীয়ত; আযাদি বা স্বাধীনতা। সাম্য ও সমতা কয়েক ভাগে বিভক্ত- আইনের দৃষ্টিতে সাম্য, বিচারের দৃষ্টিতে সাম্য। আযাদিও এমনিভাবে কয়েকভাবে বিভক্ত- ব্যক্তিস্বাধীনতা, মালিকানা অর্জন ও রক্ষণের স্বাধীনতা, বাসস্থান অর্জন ও গ্রহণের স্বাধীনতা, আকিদা-বিশ্বাস ও ইবাদত-উপাসনার স্বাধীনতা।’ (আব্দুল করিম জায়দান) কিন্তু আইনের প্রয়োগ এখন উল্টো গতিতে চলতে দেখা যায়। মৌলিক অধিকার রক্ষাকারী প্রতিনিধিরা স্রােতের অনুকূলে ভেসে বেড়াচ্ছে মাতালের মতো। ‘মুক্তমনা’ নামধারীরা ব্যক্তিস্বাধীনতার স্লোগান তুলে ধর্ম ও ধার্মিকদের অপমান করতে থাকে মুক্তমনে। সেখানে প্রহরা দেয় প্রশাসন। আর ধার্মিকরা তার প্রতিবাদ করলেই হয় উগ্রবাদী, চরমপন্থী ইত্যাদি ইত্যাদি...।

যুগে যুগে জালেমরা বিভিন্ন ভূ-খণ্ডে বিভিন্নরূপে নিজেদের আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছে। ওরা মাঝে মাঝে ধর্মকে নিজের মতো ব্যবহার করেছে আবার কখনো কখনো ধর্মকে উৎখাত করে নিজেদের অসার যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে ক্ষমতার ভিতকে টিকিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশের মানুষ যখন নাস্তিকদের ধর্মের অসারতা নিয়ে সোচ্চার তখন স্বৈরাচারের প্রেত্মাতারা তলে তলে নাস্তিকদের প্রমোট করে উপরে উপরে ধার্মিকদেরকে আলগা পিরিতি দেখায়। ইসলামের সহজ সরল অনুসারীদের পেছনে তারা লেলিয়ে দেয় নাস্তিকতাবাদে বিশ্বাসী আমলাতন্ত্রকে। ইসলাম নিয়ে ওরা এমন সব উদ্ভট ফাউল আর বাচ্চাসুলভ প্রশ্ন করে যার প্রতি-উত্তর দিতে গেলে বাধে বিপত্তি। আর এই সুযোগে আলেমদের কালারিং করে এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে ফাঁসানো হয়। নাস্তিকরা বাংলাদেশের সকল সেক্টরে এতো বেশি শক্তিশালী যে একজন সাধারণ মানুষ তা কল্পনাও করতে পারবে না। বিভিন্ন সময় ওরা সুযোগ বুঝে কুরআন সুন্নাহর তথ্যকে বিকৃত করে, ভুল রেফারেন্স দিয়ে ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায় আবার দাবি করে তারা নাকি যুক্তিবাদী। যুক্তি দিয়ে সব সময় যেসব কিছু ব্যাখ্যা করা কোনো কোনো সময় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এটা সাধারণ মানুষ যেহেতু বুঝে না তাই ওরা এই সুযোগকে কাজে লাগাতে চায়। 

আমাদের জানা উচিত নাস্তিকতা একটি বিশ্বাসের নাম। নাস্তিকরা তাদের বানোয়াট একটি মতবাদে বিশ্বাস করে বলেই তারা অন্যকে নাস্তিকতার ধর্মে দাওয়াত দেয়। যদিও তাদের নিজেদের মতবাদে নিজেদেরই বিশ্বাস তেমন একটা নাই। ওদের নাস্তিক্যধর্মের গোপন তথ্য সাধারণ মানুষদের কখনোই দেখাতে চায় না। কেননা নাস্তিক্যধর্মের নির্দিষ্ট কোনো নৈতিকতা নেই, নেই আদর্শ। যে যার মতো করে নিজের জীবনের নৈতিকতা নির্ধারণ করে চলে। কিছু সস্তা নাস্তিক যারা নিজেদেরকে নারীবাদী, মানবতাবাদী, মুক্তমনা, ব্যক্তিস্বাধীনতা বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী বলে হইহল্লা করে অথচ এদের পূর্বসূরিদের চরিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ! অবাধ যৌনতার জন্য নারী-পুরুষ সাপ্লাই করায় বিশ্বাসী নাস্তিকরাই আবার অভিযোগ করে ইসলামে কেন একজন বাঁদীকে উনার মুনিবের সাথে সহবাস করা জায়েজ করলো? ইসলামে কেন পুরুষকে ৪টি বিয়ের কথা বলেছে? নবীজি সা. কেন একাধিক স্ত্রী রেখেছিলেন....? ইত্যাদি ইত্যাদি। 

ড. রাফান আহমেদ তার ‘অবিশ্বাসী কাঠগড়ায়’ ১৬৮ পৃষ্ঠায় ‘Times of India, 8 sept. 2017’ সূত্রে উল্লেখ করেন, নাস্তিক নেতা মাও সেতুং-এর অনুপ্রেরণা ছিল জোসেফ স্টালিন, যে চীনের সরকারকে আইন করে নাস্তিকতা চাপিয়ে দিয়েছিল। সেখানে প্রায় ৯০ মিলিয়ন পার্টি মেম্বারকে বলা হয়েছিল হয় ধর্ম ছাড়ো অথবা শাস্তির সম্মুখীন হও এবং অবশ্যই তাদের মার্ক্সবাদী নাস্তিক হতে হবে, না হলে রক্ষা নেই। মুক্তমনা বিজ্ঞানমনস্ক নাস্তিক মাও সেতুং, জোসেফ স্টালিনরা ইতিহাসে যে রক্তের হোলি খেলেছেন  তা আজ অবধি বিদ্যমান। বর্তমান সময়ে চীনের নাস্তিকরা মুসলিমদের হত্যা, বন্দি আর অসহায় মা বোনদের ধর্ষণ করছে আর ছোট শিশুদেরকে মেরে অত্যাচার নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে। 

বেইলর ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞান ও নৃতত্ত্ববিদ্যার সহকারী অধ্যাপক পল ফ্রয়েস‘Journal for the scientific study of religion. vol 43. issue 1. page 35 (2004)-এ লিখেন সোভিয়েত ইউনিয়নের নাস্তিকেরা ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে যুদ্ধ চালিয়েছে। সমাজতান্ত্রিক এই দলটি ধ্বংস করেছে অগণিত চার্চ, মসজিদ ও মন্দির, হত্যা করেছে অসংখ্য ধর্মগুরুকে। স্কুলেও মিডিয়ার মাধ্যমে ধর্মবিরোধী পোপাগান্ডার বন্যা বইয়ে দিয়েছে এবং বৈজ্ঞানিক নাস্তিকতার নামে বিশ্বাস ব্যবস্থার প্রচলন করেছে, যা পূর্ণ ছিল নানা নাস্তিকীয় আচার, ধর্মত্যাগকারী ও দুনিয়াবি মুক্তির প্রতিজ্ঞার দ্বারা।

সেই নাস্তিকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির ধারক-বাহকরাও ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে অদ্যাবধি। ক্লোজআপ ওয়ানের কাছে আসার গল্প দেশমাতৃকা ও সাধারণ অবুঝ তরুণ- তরুণীকে করছে বিপথগামী। নাটক, উপন্যাস, চলচ্চিত্র আর পাঠ্যবইয়ের পাতায় পাতায় আজ অশ্লীলতা ও ভুল মেসেজের ছড়াছড়ি। হুমায়ূন আহমেদের ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ চলচ্চিত্রে ভিলেন টাইপের লোকগুলোকে প্রদর্শন করা হয়- নামাজি এবং আর নিষ্ঠুর হিসেবে। অন্যদিকে বেনামাজি লোকগুলো সৎ ও দয়ালু। এরকম অসংখ্য অসঙ্গতি আমাদের ধর্মীয় চেতনায় আঘাত দিয়ে যায়। অথচ এসব নিয়ে বিচারক মহলের কোনো মাথাব্যথা নেই। বরং মসজিদের ইমাম কী খুতবা দেয় সেখানে থাকে কড়া নজর। থাকে ডিবি পুলিশ আর সাংবাদিক। ইমামদের ব্যক্তিস্বাধীনতার সংজ্ঞা বুঝি আলাদা? 

এই দেশে ময়লার ডাস্টবিন, ম্যানহোল, বন জঙ্গল, কচুরিপানার মজাপুকুর, ক্ষেত খামার কিংবা রেললাইনের পাশে সবুজ ঘাসের ওপর মানুষের মরদেহ পড়ে থাকে। পড়ে থাকে হতভাগ্য বাবার শিশুকন্যার ধর্ষিত লাশ। স্বজনহারাদের গগনবিদারী আর্তনাদ এদেশে মিলিয়ে যায় আকাশে বাতাসে। গুম, খুন, জখম কিংবা বন্দুকযুদ্ধের মতো ঘটনাগুলো দেখেও নির্বাক হয়ে যেতে হয় আমাদেরকে। সময় ও পরিস্থিতির ভয়ে আমরা কথা বলতে পারি না। ক্ষমতাসীনদের কাছে যেন সাধারণরা খেলার পুতুল। আলী নামক এক হতভাগার শিশুকন্যাকে ধর্ষণ করে হত্যার পর মাত্র এক হাজার টাকার বিনিময়ে মামলা তুলে নেয়ার আহ্বান যখন জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে আসে তখন ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যার ঘটনাটা এই দেশেরই। (প্রথম আলো; ০১/০৫/২০১৭ইং, প্রথম পাতা ৪ নং কলাম) এভাবে প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে মানবাধিকার। বিচারের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নিরপরাধ জনগোষ্ঠী। পার পেয়ে যাচ্ছে জানোয়ারগুলো। পত্রিকার পাতা উল্টালে এখনকার নিয়মিত খবরের তালিকায় আসছে মাতালিপনার দুরন্ত অত্যাচার। কত অসভ্য হলে এ জাতি ব্লেড দিয়ে কেটে যৌনাঙ্গের প্রবেশপথ বড় করেই রাতভর ধর্ষণ করে পূজা নামের পাঁচ বছরের শিশুকে। (চ্যানেল নিউজটুয়েন্টিফোর; ২৮/১০/২০১৬) শত শত কলঙ্কের কান্না আঁচলে মুছে মা-বোনদের দিন পার করতে হয়। কত আর্তচিৎকার চার দেয়ালের বাইরে আসতে পারে না। শত মায়ের আর্তনাদ সরাসরি আকাশের মালিকের কাছে পাঠানো হয় নীরবে নিভৃতে।

আমাদের মান কতটা তলানিতে গেলে গুজবের গণপিটুনিতে হত্যা আর সম্ভ্রম হারানো বোনদের তালিকা বাড়তেই থাকবে? এই নির্মমতা দেখেও সুশীলেরা মুখ খুলে না। চেতনাধারীরা হয়ে যায় অন্ধ। মানবতাবাদী মুক্তমনারা হয় বোবা। সমাজ ধ্বংস হয়; নারী লাঞ্ছিত হয়; শিশু ধর্ষিত হয়; তথাকথিত সুশীল চেতনাধারী মানবতাবাদীদের যেন কিছুই যায় আসে না! ফেসবুক পাড়ার লোকজন দুইদিন প্রোফাইল বা স্টোরিতে কালো ছবি ঝুলিয়েই শেষ। এসব প্রতিকার করতে না পারলে আমরাও মহান বিচারপতির আদালতে আসামি হয়ে দাঁড়াবো সে কথা কয়জনই বা চিন্তা করে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এখন স্বাভাবিক শব্দটির থেকেও বেশি অস্বাভাবিক হয়ে গেছে। তবে কি আমরা এখন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভুলেই গেছি? 

ব্যক্তিস্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন শুধু নয়, ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা বলে রাষ্ট্রের হর্তাকর্তারা এখানে মাতালদের মদের লাইসেন্স সুবিধা দিচ্ছে। ওরাই আবার ফন্দি ফিকির দেখিয়ে পবিত্র কুরআনের তাফসির মাহফিলে ১৪৪ ধারা জারি করে। উগ্রবাদী দমনের নামে উগ্রবাদকেই উসকে দেয়া এই কর্তারা যখন নিজেদের অপরাধকে অপরাধ মনে করে না তখন আমরা যাবো কোথায়? হয়রানির আপডেট ভার্সনে জাতি আজ কতটা নিথর হয়ে গেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। বলা নেই কওয়া নেই ধর্মের ওপর আঘাত, নায়েবে রাসূলদের হয়রানি ও গ্রেফতার পানি পান্তার মতো এখন। আলোচকদের স্টেজেই যখন হুমকি ধমকি এবং লাঞ্ছিত করা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন দেশটা যে ইসকনের করদরাজ্যে পরিণত হতে বাকি নেই তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

জনৈক আলেমের বাসায় তল্লাশির জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি টিম অভিযানে নামে। প্রশস্ত রিডিংরুমের আট-দশটি আলমিরার বই ছুড়ে মারতে থাকে মেঝের উপর। কুরআন হাদিসসহ অসংখ্য ইসলামী সাহিত্যগুলোর সাথে যখন বেয়াদবের মতো আচরণ করছিল তারা, প্রতিবাদ করে তিনি বলেছিলেন; “আপনারা এমন বেয়াদবি করছেন কেন? জিহাদী বই বলতে কী বুঝাতে চান আপনারা? ৫০টি জিহাদী বইয়ের নাম বলেন তো দেখি? সেগুলোর সরকারি তালিকা দেখান, কোন দৃষ্টিকোণ থেকে সেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ? এবং কবে কখন কোথায় সেগুলোকে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল? ধর্ম পালন করার অধিকার এদেশের মানুষের মৌলিক অধিকার। শিক্ষা এবং জ্ঞান লাভের অধিকারও আমাদের মৌলিক অধিকার। এখানে আমি ধর্ম নিয়ে রিসার্চ করি, ধর্মীয় কিতাবাদি ছাড়াও সব ধরনের বই আমার এখানে দেখতে পাচ্ছেন। নেলসন ম্যান্ডেলা, এ পি জে আব্দুল কালাম আজাদ, মহাত্মা গান্ধী, তসলিমা নাসরিন, আহমেদ শরীফ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, হুমায়ূন আহমেদ, হুমায়ুন আজাদ, প্রবীর ঘোষ, আরজ আলী মাতাব্বরসহ অন্যান্য সব ধরনের লেখকের বই আমি কিনি, পড়ি এবং এখানে সংগ্রহ করি। একবারের জন্যও তো বললেন না ‘আপনি একজন হুজুর মানুষ কেন অনৈসলামিক বই পড়েন?’ পারলে এমন একটা লিস্ট তৈরি করেন তো যেখানে উল্লেখ করা থাকবে এইযে এইগুলো হলো জিহাদী বই! এইগুলো পড়া যাবে না। আর ধর্ম, ইসলাম, কুরআন ও হাদিস ভালোভাবে বুঝার জন্য কোন বইগুলো রাখা বৈধ তার একটা পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেন। দরকার হলে জিহাদী বই সব সরিয়ে ফেলবো আর সরকারি তালিকার ইসলামী সাহিত্য দিয়ে ঘর ভরে ফেলবো।” 

কিন্তু কে শুনে কার কথা, জোর যার মুল্লুক তার। এখানে আইনের লোকদের বেআইনি ব্যক্তিস্বাধীনতা ঠিকই দেওয়া হয়, বঞ্চিত হয় শুধু হকপন্থীরা। ফিরআউনের লাশ থেকে শুরু করে চিকিৎসা বিজ্ঞান ও মহাবিশ্বের হাজার হাজার তথ্যের সঠিক ও সুষ্ঠু সমাধান মিলিয়ে দিয়ে বারবার প্রমাণিত হয়েছে সত্যের একমাত্র পথ নির্দেশিকা শুধুই ‘আল কুরআন’। অথচ ব্যক্তিস্বাধীনতা আজ লুটেরা আর ধর্ষকদের হাতে বন্দি বলে হাজারও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে নিয়মিত।

১০ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখের বিবিসি বাংলা ও অন্যান্য মিডিয়ার রিপোর্টে বলা হয় মার্কিন অর্থ দফতরের ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল অফিস (ওএফএসি) বিভিন্ন দেশের মোট ১০টি প্রতিষ্ঠান ও ১৫ জন ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে- যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নিপীড়নের সাথে সংশ্লিষ্ট। যেখানে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি গ্রুপের নাম এসেছে। এটি দেশের জন্য অনেক কলঙ্কের। এর আগে সুইডিশ রেডিওতে এই বাহিনীটি কি পদ্ধতিতে মানুষ খুন গুম করে, তার কিছু নমুনা উদ্ধার করে। রেডিও সংস্থাটি এমন একটি গোপন রেকর্ডিং হাতে পেয়েছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই গ্রুপটির অব্যাহত গুম ও খুনের বিষয়গুলো প্রকাশ্যে উঠে এসেছে। অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই কথোপকথনে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নৃশংস পন্থাগুলোর বর্ণনা “যদি তাকে পাও, গুলি করে আগে মেরে ফেলো। এরপর লাশের পাশে একটা বন্দুক রেখে দিও” বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটাই হয় কমান্ড, বলছিলেন গ্রুপটির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। (যুগান্তর অনলাইন; ০৫/০৪/২০১৭)

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বক্তব্য; গত ২৭ এপ্রিল ২০১৪ তারিখ নারায়ণগঞ্জ থেকে শহরের কাউন্সিলর ও আইনজীবীসহ মোট সাতজন নিখোঁজ হয়েছিলেন। এই গ্রুপের পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার কয়েকদিন পর তাদের মৃতদেহ পাওয়া যায়। ছয় বছর আগের ওই ঘটনায় জড়িত একজন বড় কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের সাজা হলেও দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ এবং গুমের ঘটনা কমছে না। এই যখন আমাদের বিচারব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলার দশা তখন সাধারণ মানুষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে কোথায়?

এভাবে নিরীহ লোকদের যদি নিরাপত্তাহীন জীবন যাপন করতে হয় আর ব্যক্তিস্বাধীনতা ভোগ করে মানুষ নামধারী ‘পাগলা কুত্তারা’ তাহলে সমাজের শেষ অবস্থা কোন দিকে গড়াবে কে জানে? প্রত্যেক দেশে অথবা রাষ্ট্রেই অপরাধীদের সাজার জন্য নানা রকম আইন আছে, আইনের বিভিন্ন প্রয়োগও আছে। কিন্তু সব কিছুই ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে বারবার। আজ ‘মুক্তমনা’ হোক আর ‘মানবাধিকার’ সংস্থায়ই হোক কারো সচেতনতার ধার ধারে না মাতালেরা। আর শত শত আইন প্রয়োগ করেও কেউ পারবে না পৃথিবীকে শান্তির ছায়াতলে আনতে। কারণ এগুলো মানুষের তৈরি মতবাদের চেতনা থেকেই উৎসারিত হয়েছে। মানুষের তৈরি মতবাদ কখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না। মানুষ যতই বিদ্রোহ-আন্দোলন করুক না কেন শান্তি আর সুখের একমাত্র ‘প্রেসক্রিপশন’ মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর তায়ালার ঐশীগ্রন্থ। বিশ্বাসী চেতনা থেকে কেউ যদি একমাত্র রবকে ভয় করে, তাঁর শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য চেষ্টা করে তবে সেই ব্যক্তি নিষ্পাপ ও নিরপরাধী হতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাবে। এভাবে প্রশাসন, বিচারালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই যদি এই রবকে ভয় করে অপরাধ থেকে বিরত থাকে তবেই হয়তো সামাজিক শান্তি ও মৌলিক অধিকারগুলো যথাযথ ভোগ করতে পারবে প্রত্যেকেই। 

লেখক : সহকারী সম্পাদক, ছাত্র সংবাদ

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির