যে বক্তব্য ছাত্রসমাজের জন্য এখনো আলোকবর্তিকা

প্রিয় ছাত্রভাইয়েরা
আসসালামু আলাইকুম।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ, বড় ছাত্রসংগঠন এবং বলতে গেলে একক ইসলামী ছাত্রসংগঠন। আজকে মুসলিম উম্মাহর প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের বিশেষ প্রেক্ষাপটে এই ধরনের ছাত্রসমাবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ। ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতৃবৃন্দ এই সমাবেশের বিষয়বস্তু হিসেবে ঘোষণা করেছে, ‘ইসলাম ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নস্যাতের অপচেষ্টার প্রতিবাদ’। মূলত আজকে শুধু বাংলাদেশে নয় গোটা বিশ্বব্যাপী ইসলামের বিরুদ্ধে, মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে চক্রান্ত ষড়যন্ত্র চলছে। মুসলিম বিশে^র একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্ভাবনাময় দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও এই চক্রান্ত ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলাদেশবিরোধী চক্রান্ত ষড়যন্ত্রর মধ্যে এদেশের শিক্ষাঙ্গনকে উত্তপ্ত করে তোলা, ক্যাম্পাস ভায়োলেশনের মাধ্যমে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করার একটি বিশেষ ব্লুপ্রিন্ট নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা অগ্রসর হচ্ছে।
জাতীয় নেতৃবৃন্দ, প্রিয় ছাত্রভাইয়েরা
এ অবস্থাকে সামনে রেখে আমি ইসলাম সম্পর্কে, মুসলিম উম্মাহর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে, বাংলাদেশের বিরাজমান পরিস্থিতি সম্পর্কে দু-একটি কথা বলে ছাত্রসমাজ বিশেষ করে ইসলামী ছাত্রশিবিরের করণীয় সম্পর্কে কিছু কথা বলার চেষ্টা করব।
ইসলাম সম্পর্কে বড় রকমের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে আমি যেতে চাই না। ইসলাম কোনো শ্রেণীবিশেষ, গোষ্ঠীবিশেষের ধর্ম নয়। ইসলাম জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের শান্তি, কল্যাণ, ন্যায়, ইনসাফ এবং নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেয়ার জন্য এসেছে। ইসলামের আহবান বিশ^জনীন, সার্বজনীন। এই ইসলামকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে চিহ্নিত করার মহলবিশেষের চক্রান্ত ষড়যন্ত্র এবং প্রচার প্রপাগান্ডা অযৌক্তিক, অবান্তর এবং ভিত্তিহীন। ইসলাম নিছক একটি নীতিকথার আদর্শ নয়। ইসলাম মানুষের ব্যবহারিক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত, বাস্তবসম্মত আদর্শ। মানবপ্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ আদর্শ। ইসলামের মূলভিত্তি কুরআন ও সুন্নাহ। কুরআন সুন্নাহর মূলনীতির ওপরে ভিত্তি করে মানুষের সমাজ যত সামনে যাবে, মানুষের সমাজে যত নিত্যনতুন সমস্যার জন্ম হবে সব সমস্যার সমাধান দেয়ার জন্য ইসলামী বিশেষজ্ঞদের জন্য ইসতেহাদের দরজা খোলা রাখার ফলে ইসলাম সর্বযুগে সর্বকালে চির আধুনিক, প্রগতিশীল আদর্শ হিসেবে টিকে থাকতে সক্ষম। এই ইসলামকে মৌলবাদী নামে আখ্যায়িত করার কোনো সুযোগ নেই। যারা এর পরও ইসলামকে মৌলবাদী নামে আখ্যায়িত করে তারা হয় জ্ঞানপাপী না হয় গন্ডমূর্খ। ইসলাম শেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা:-এর নেতৃত্বে মদিনায় কায়েম হয়েছে মদিনাবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের ভিত্তিতে। অতএব ইসলাম বলপ্রয়োগে বিশ^াসী নয়। ইসলাম কায়েমের প্রশ্নে সশস্ত্র বিপ্লবের ধারণা ইসলাম অনুমোদন করে না, ইসলামের বিশেষজ্ঞরা অনুমোদন করে না। ইসলামের সাথে যারা জঙ্গিবাদের শব্দ জুড়ে দেয়, তারা মূলত ইসলামের বদনাম করতে চায়। ইসলামকে কুৎসিতভাবে তুলে ধরতে চায়। ইসলামের জনপ্রিয়তা নষ্ট করতে চায়। ইসলামের ব্যাপারে বিশ^জনমতকে বিভ্রান্ত করতে চায়।

প্রিয় ভাইয়েরা
ইসলাম সর্বযুগে সর্বকালে যুক্তির ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে উপস্থাপিত হয়েছে। আজকের দিনে ছাত্রসমাজসহ সর্বত্র ইসলামকে বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে, যুক্তির ভিত্তিতে উপস্থাপন করে, ইসলামের সাথে যে সমস্ত অপবাদ যোগ করা হয়েছে এগুলোকে ভ্রান্ত প্রমাণ করার জন্য ছাত্রসমাজকে ইসলামের সঠিক জ্ঞানের হাতিয়ারে সজ্জিত হতে হবে। গোটা ছাত্রসমাজকে ইসলামের জ্ঞানে আলোকিত করার দায়িত্ব নিতে হবে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে। আজকের এই ‘জাতীয় ছাত্রসমাবেশ ও এর অঙ্গীকার’ এ এটাই তোমাদের কাছে আমার প্রথম আহবান।
প্রিয় ছাত্রবন্ধুরা
আজকে গোটা বিশে^ মুসলমানের সংখ্যা দেড় শ’ কোটিরও বেশি। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের সংখ্যা তাও ৬০-এর ওপরে। কিন্তু আফসোস, ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আজ মুসলিম বিশে^র তথা মুসলিম উম্মাহর চলছে সবচেয়ে বড় সঙ্কটকাল। মুসলিমবিশ^ আজ অসহায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের জনগণও আজ সত্যিকার অর্থে স্বাধীন বলে দাবি করতে পারছে না। তাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতির ওপরে বাইরের খবরদারি চলছে এবং ছুতোনাতায় এ পর্যন্ত তিনটি মুসলিম দেশ পরাশক্তির সামরিক আগ্রাসনের শিকারে পরিণত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মুসলিমবিশ^কে প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়েছেন। এই সম্পদকে স্বাধীনভাবে মুসলিমবিশ^ কাজে লাগাতেও আজ সক্ষম নয়। এই অবস্থাকে সামনে রেখে আমরা একদিকে লক্ষ্য করছি আফগানিস্তান ইতোমধ্যেই আগ্রাসী শক্তির শিকারে পরিণত হয়েছে। ইরাক আগ্রাসী শক্তির শিকারে পরিণত হয়েছে। এখন দৃষ্টি ইরানের দিকে। আবার কোন কোন মহল প্রচারণা চালাচ্ছে বাংলাদেশ সম্পর্কে। বাংলাদেশ নাকি হবে পরবর্তী আফগানিস্তান। ইসলামী ছাত্রশিবিরের এই সমাবেশে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের কথাও এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের দেশের বিরুদ্ধে যেইসব ষড়যন্ত্র চলছে তার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো একটি মহল বাংলাদেশকে আফগানিস্তানের ভাগ্যবরণের দিকে নিয়ে যাওয়ার চক্রান্ত ষড়যন্ত্র করছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশের একজন বুদ্ধিজীবী একটি বই লিখেছেন। নাম দিয়েছেন ‘বাংলাদেশ দ্য নেক্সট আফগানিস্তান’। এই বইয়ের তথ্য-উপাত্ত জোগান দিয়েছে বাংলাদেশের কিছু বুদ্ধিজীবী এবং কিছু মিডিয়া।

প্রিয় ভাইয়েরা
এই অবস্থাকে সামনে রেখে আমি যে কথাটি বলতে চাই মুসলিম উম্মাহর এই দুর্দশার জন্য সঙ্গত কারণেই দায়ী করব চিহ্নিত ইসলামবিরোধী শক্তিগুলোকে। কিন্তু অন্যদেরকে দায়ী করার পাশাপাশি আমাদের নিজেদের দায়িত্ব কর্তব্যের কথা ভুলে গেলে চলবে না। যাদের অবস্থান ইসলামের বিরুদ্ধে, যাদের অবস্থান মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে তারা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে এটাই তাদের কাজ। তাদের কাজ তারা করছে, তারা করবে। শুধু চেয়ে চেয়ে নীরবে এগুলো দেখলে আর এর বিরুদ্ধে দু-একটি সমালোচনামূলক বক্তৃতা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না। মুসলিম উম্মাহর এই দুর্দশার প্রধান কারণ ইসলামের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা। ইসলামের সাথে সঠিক সম্পর্ক যদি আমাদের থাকতো তাহলে আজকে মুসলিম উম্মাহর এই দুর্দশা দুর্দিন হতো না। দ্বিতীয় কারণ মুসলিম উম্মাহর জন্য যে ধরনের নেতৃত্ব প্রয়োজন রাজনীতির ময়দানে, শিক্ষা সংস্কৃতির অঙ্গনে, ব্যবসা বাণিজ্যের ময়দানে, আর্থসামাজিক কর্মকান্ডে এবং রাষ্ট্রপ্রশাসনে মুসলিমবিশে^র সর্বত্রই এই নেতৃত্বের অভাব। এই নেতৃত্বের সঙ্কট মুসলিম উম্মাহর প্রধান সঙ্কট। আজকে মুসলিম উম্মাহকে এই সঙ্কট থেকে যদি মুক্তি দিতে হয়, নিষ্কৃতি দিতে হয় তাহলে যুগপৎভাবে ইসলামের সঠিক শিক্ষা আমাদের ধারণ করতে হবে। ইসলামের সঠিক পরিচয় নিজেদের জানতে হবে। মানুষের কাছে, দুনিয়াবাসীর কাছে তুলে ধরতে হবে। তারচেয়েও বেশি অপরিহার্য হলো নেতৃত্বের সঙ্কট দূর করার বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। এই জন্য নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। মুসলিম উম্মাহর জন্য যেই নেতৃত্ব অপরিহার্য প্রচলিত ধারায় শুধু দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সেই প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব নয়। আবার শুধু আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও সেই প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব নয়। সেই সাথে আমি এটাও বলতে চাই, শুধু প্রচলিত ধারণায় সৎ, মুত্তাকি, পরহেজগার হলেও এই প্রয়োজন পূরণ করা যাবে না। আবার শুধুমাত্র জাগতিক দক্ষতা যোগ্যতা অর্জন করেও এ প্রয়োজন পূরণ করা যাবে না। এই অভাব পূরণ করতে হলে একই সাথে দ্বীনি শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার সংমিশ্রণ থাকতে হবে। একই সাথে সততা দক্ষতা ও যোগ্যতার সংমিশ্রণ থাকতে হবে। আমি শুধু ছাত্রশিবিরকে বলতে চাই না। গোটা বিশে^র মুসলিম উম্মাহর নতুন প্রজন্মের কাছে সাধারণভাবে বাংলাদেশের সকল কিশোর, যুবক, ছাত্রসমাজের কাছে আবেদন রাখতে চাই। মুসলিম বিশে^র বিরুদ্ধে যে চক্রান্ত চলছে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে চক্রান্ত চলছে এই চক্রান্ত সফল হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের নতুন প্রজন্ম, আজকের কিশোর, যুবক, ছাত্রসমাজ। অতএব এই সর্বনাশা বিপদ থেকে মুসলিম উম্মাহকে, বাংলাদেশকে রক্ষা করার জন্য নতুন প্রজন্মকে দলমত নির্বিশেষে সকল ছাত্রসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে তাদের নেতাকর্মীসহ গোটা ছাত্রসমাজের মধ্যে ইসলামী জ্ঞান চর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ইসলামী জ্ঞান চর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। একই সাথে তাদের অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার ডেভেলপ করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারে যোগদান করার মাধ্যমে আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি সমাজের ¯œায়ুকেন্দ্র যারা নিয়ন্ত্রণ করে তারা যদি ইসলামী আদর্শের অনুসারী না হয় তারা যদি ইসলামী চরিত্রের অনুসারী না হয় তাহলে শুধু রাজনৈতিকভাবে বিজয় লাভ করে ইসলাম কায়েম করা যাবে না।
এই অভাব পূরণ আর কেউ করতে পারবে না। আজকের তরুণ ছাত্রসমাজকে এই অভাব পূরণ করতে হবে। তরুণ ছাত্রসমাজের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ইসলামী ছাত্রশিবিরকেই এই দায়িত্বটা বেছে নিতে হবে। ছাত্রদের অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার ব্রাইট হতে হবে। তার সাথে তাদের ইসলামী জ্ঞানের হাতিয়ারে সজ্জিত হতে হবে এবং ইসলামী নীতি-নৈতিকতার উপরে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এটা ছাড়া শুধু স্লোগান দিয়ে, শুধু মিছিল মিটিং করে, পোস্টারে পোস্টারে দুনিয়া ছেয়ে দিয়ে, ওয়াল রাইটিং-এ দুনিয়া ছেয়ে দিয়ে ইসলামী বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা বাতুলতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
ইসলামী ছাত্রশিবির এদিক দিয়ে ভাগ্যবান। তরুণ বয়সে কিশোর বয়সে তারা ইসলাম সম্পর্কে জানার বুঝার সুযোগ পেয়েছে। এটা আল্লাহ তায়ালার একটি শ্রেষ্ঠ নেয়ামত ইসলামী ছাত্রশিবিরের জন্য। ইসলামী ছাত্রশিবিরের পতাকাতলে যেসব ছাত্র সমবেত হয়েছে তাদের জন্য। এই নেয়ামত থেকে যারা বঞ্চিত তাদের প্রতি ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সহানুভূতিশীল হতে হবে। তাদের প্রতি উদার হতে হবে। তারা যেই নেয়ামত থেকে বঞ্চিত সে জন্য তাদের জন্য দোয়া করতে হবে। এই নেয়ামত তারাও ভোগ করার সুযোগ পাক এজন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করে তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে যেতে হবে। ইসলামের দাওয়াত উপস্থাপন করতে হবে।
আম্বিয়ায়ে কেরাম আ: দাওয়াত দিতে গিয়ে বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছেন, সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন, অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন। সর্বযুগের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানুষ রাহমাতুল্লিল আলামিন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা:ও নির্যাতিত হয়েছেন, নিপীড়িত হয়েছেন এবং অপপ্রচার ও মিথ্যা প্রচারের শিকার হয়েছেন। এই শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে, রাহমাতুল্লিল আলামিনকে জাদুকর বলে গালি দেয়া হয়েছে, মিথ্যাবাদী বলে গালি দেয়া হয়েছে, পাগল বলে গালি দেয়া হয়েছে এবং ক্ষমতায় লোভী বলেও গালি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই গালির জবাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা: তাদের জন্য দোয়া করেছেন। আজকের দিনে সত্যিকার অর্থেই যদি আমরা ইসলামের পতাকাবাহী হই তাহলে অন্য কোন আদর্শ নয় আল্লাহর কুরআন দায়ীর জন্য যে নীতিমালা দিয়ে দিয়েছেন কঠোরভাবে সেই নীতিমালা আমাদের অনুসরণ করতে হবে। দায়ীদের মডেল মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা: বিপক্ষের লোকদের জুলুম, নির্যাতন, অপপ্রচারের মোকাবেলায় যেই সর্বোচ্চ ধৈর্যের, সহনশীলতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন আমাদেরকেও সেটা দেখাতে হবে।
রাজনীতিবিদদের প্রতি অনুরোধ থাকবে ছাত্রসমাজকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করার পরিবর্তে ছাত্ররা যাতে লেখাপড়া করতে পারে, ক্যাম্পাস যাতে ভায়োলেন্সমুক্ত থাকতে পারে এজন্য সকল রাজনৈতিক দলেরই আন্তরিক উদ্যোগ থাকা উচিত। সকল বুদ্ধিজীবী মহলের দলমত নির্বিশেষে সকলের এদিকে নজর রাখা উচিত। তোমরা দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের কথা বলেছো। এই দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের মধ্যে প্রধান ষড়যন্ত্র হলো আমাদের নতুন প্রজন্মকে ধ্বংস করা। ক্যাম্পাস ভায়োলেন্সের মাধ্যমে, তাদের হাতে মাদকদ্রব্য তুলে দিয়ে এবং অবৈধ অস্ত্র তুলে দিয়ে আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্র আমাদের নতুন প্রজন্মকে ধ্বংস করে আমাদের দেশকে স্থায়ীভাবে অন্যদের তাঁবেদার রাষ্ট্র বানিয়ে রাখতে চায়। এই ষড়যন্ত্র চক্রান্তের শিকার যাতে ছাত্রসমাজ না হয় এজন্য রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব আছে। সুশীলসমাজের দায়িত্ব আছে। বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব আছে। রাজনীতিবিদগণ, বুদ্ধিজীবীগণ এই দায়িত্ব পালনে যদি ব্যর্থ হন ছাত্রসমাজকেই নিজেদের রক্ষা করার দায়িত্ব নিজেদেরই পালন করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে এবং এই ক্ষেত্রে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে হবে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে।
আমি পরিশেষে বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দানে একটি ঐতিহাসিক আদর্শিক বাস্তবতার কথা বলে আমার বক্তব্য শেষ করতে চাই। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ঐতিহাসিক এবং আদর্শিক বাস্তবতার ভিত্তিতে চারদলীয় জোট গঠন হয়েছিল আওয়ামী শাসন আমলে। চারদলীয় জোটের মূলভিত্তি ‘ইসলামী মূল্যবোধ, গণতন্ত্র, আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের সংরক্ষণ’। এটা কোন দলীয় স্লোগান নয়। এটা জাতীয় স্লোগান। জাতীয় স্বার্থে যা অপরিহার্য। ইতিহাস সাক্ষী বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। যারা ইসলামী রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করেছিল তারা এক পর্যায়ে এসে একদলীয় বাকশালী শাসন গঠনের মাধ্যমে সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেছিল। ইতিহাসের একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজন হয়েছে, আল্লাহর প্রতি ঈমানের সংযোজন হয়েছে এবং ইসলামী রাজনীতি করার যেমন সুযোগ এসেছে তেমনি একদলীয় বাকশালী শাসনব্যবস্থার পাথর অপসারণ করে বহুদলীয় রাজনৈতিক ধারাও এখানে চালু হয়েছে। দেশের স্বার্থে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ যারা করতে চায় জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে তাদের প্রতিরোধ করতে হবে। বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র ধ্বংস করে এক দলীয় শাসন যারা জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চায় তাদেরকেও প্রতিহত করতে হবে। যারা বাংলাদেশের উন্নয়ন উৎপাদনের রাজনীতি বাধাগ্রস্ত করে বাংলাদেশকে পরনির্ভরশীল করে রাখতে চায়, ভিন দেশের তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায় জাতীয় স্বার্থে তাদেরও প্রতিহত করতে এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশে ছাত্ররা রাজনীতি করুক এটা আমরা চাই না। তারা তাদেরকে গড়ে তুলুক আগামীদিনের সমাজ পরিচালনা, প্রশাসন পরিচালনার যোগ্য করেÑ এটাই আমাদের কাম্য। কিন্তু এই দেশে ছাত্রসমাজের একটি ঐতিহ্য আছে। অভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে ছাত্রসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের সময়, ’৬৯-এর গণ-আন্দোলনের সময় সেই সাথে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়। একই ধারায় আজকে বাংলাদেশকে অকার্যকর ও ব্যর্থরাষ্ট্র প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে, বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পাঁয়তারা চলছে, বাংলাদেশকে ভিন দেশের তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। ভিনদেশীদেরকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে নাক গলানোর সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। আগামী প্রজন্মকে এই সকল চক্রান্ত ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ইসলামী ছাত্রশিবির নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করবে, জাতীয় রাজনীতিতে যে ইসলামী মূল্যবোধ এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে বিশ^াসীদের ঐক্য গড়ে উঠেছে এই ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ইসলামী ছাত্রশিবির ভূমিকা রাখবে এটাই আমরা কামনা করি।
আজকে এই ঐক্যে ফাটল ধরাবার যারা চেষ্টা করছে তারা সফল হলে ইসলামের ওপর আঘাত আসবে। ইসলামী প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত আসবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত আসবে। সর্বোপরি আঘাত আসবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের ওপরে। এই ব্যাপারে জনগণকে সজাগ সচেতন করার জন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ চিন্তাশীল সব মহল এগিয়ে আসুক এই কামনা বাসনা পেশ করে ছাত্রসমাজ তাদের ক্যারিয়ার গঠন প্রধান ইস্যু বানিয়ে কাজ করার পাশাপাশি জাতীয় দুর্যোগ মুহূর্তে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের জন্য প্রস্তুত থাকুক এই আহবান জানিয়ে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি।
আল্লাহ হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির জিন্দাবাদ।

[২৭ এপ্রিল ২০০৬ সালে পল্টন ময়দানে ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজিত জাতীয় ছাত্রসমাবেশে তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী প্রধান অতিথি হিসেবে ২৫ মিনিট ২৩ সেকেন্ডের এই বক্তব্য দেন। সে সময় তিনি বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় ঐক্যজোট সরকারের শিল্পমন্ত্রী ছিলেন। উল্লেখ্য, ২৯ জুন ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সরকারের সময়ে মাওলানা নিজামীকে পুলিশ গ্রেফতার করে এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে কথিত যুদ্ধাপরাধের মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগে ২০১৬ সালের ১১ মে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।]
শ্রুতিলিখনে : ফাহিম ফয়সাল

SHARE

Leave a Reply