শীতকাল : ইবাদত ও আমলের মৌসুম -মুহাদ্দিস ডক্টর এনামুল হক

বাংলাদেশকে ষড়ঋতুর দেশ বলা হয়। আবহমান বাংলা বছরজুড়ে ছয় ঋতু ভাস্বর। প্রাকৃতিক সৃজন ও ঋতুর পরিবর্তন আল্লাহ তায়ালার অপার কুদরতের মহিমা। প্রতিটি মৌসুমই নান্দনিক বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্যে ও প্রাকৃতিক আবহে। প্রতিটি ঋতু আল্লাহর নিদর্শন নিয়ে আমাদের কাছে উপস্থিত হয়। আল্লাহ তায়ালা তার হুকুম-আহকাম এবং বিধানাবলিও মৌসুম এবং ঋতু উপযোগী করে দিয়েছেন। তার কোনো বিধি-বিধানই বান্দার জন্য কষ্টসাধ্য নয়। কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের সহজ করেন। তিনি কঠিন ও দুঃসহ করতে চান না।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)

বৈচিত্র্যময় ঋতুর পালাবদল : গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত ঋতু চক্রাকারে ফিরে আসে। হেমন্তকাল পেরিয়ে শুরু হয় শীতকাল। ঋতুর পালাবদলে হাজির হওয়া শীতকাল মুমিনের জন্য অনন্য আশীর্বাদ। শীতের আবরণে আচ্ছাদিত হয় প্রকৃতি। আল্লাহ তায়ালা মানুষের কল্যাণেই প্রকৃতির এ পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকেন। যাতে রয়েছে আল্লাহ তায়ালার কুদরতের নির্দশন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তাছাড়া রাত ও দিনের পার্থক্য ও ভিন্নতার মধ্যে, আল্লাহ আসমান থেকে যে রিজিক নাজিল করেন এবং তার সাহায্যে মৃত জমিনকে যে জীবিত করে তোলেন তার মধ্যে এবং বায়ুপ্রবাহের আবর্তনের মধ্যে অনেক নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য যারা বুদ্ধি-বিবেচনাকে কাজে লাগায়।’ (সূরা জাসিয়া : ৫) অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘(এ সত্যটি চিহ্নিত করার জন্য যদি কোন নিদর্শন বা আলামতের প্রয়োজন হয় তাহলে) যারা বুদ্ধি-বিবেক ব্যবহার করে তাদের জন্য আসমান ও পৃথিবীর ঘটনাকৃতিতে, রাত-দিনের অনবরত আবর্তনে, মানুষের প্রয়োজনীয় ও উপকারী সামগ্রী নিয়ে সাগর দরিয়ার চলমান জলযানসমূহে, বৃষ্টিধারার মধ্যে, যা আল্লাহ বর্ষণ করেন ওপর থেকে তারপর তার মাধ্যমে মৃত ভূমিকে জীবন দান করেন এবং নিজের এই ব্যবস্থাপনার বদৌলতে পৃথিবীতে সব রকমের প্রাণী ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেন, আর বায়ুপ্রবাহে এবং আসমান ও পৃথিবীর মাঝখানে নিয়ন্ত্রিত মেঘমালায় অসংখ্যা নিদর্শন রয়েছে।’ (সূরা বাকারা : ১৬৪)।

আল্লাহ তায়ালা বান্দার উপকারেই দুনিয়ার সব উপকরণ সৃষ্টি করেছেন। চন্দ্র-সূর্য, আলো-বাতাস এমনকি রাত, দিন, ঋতু এবং কালের সৃষ্টিও বান্দার কল্যাণে করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তিনিই রাত-দিনের পরিবর্তন ঘটান। নিশ্চয়ই এতে দৃষ্টিসম্পন্নদের জন্য এর মধ্যে রয়েছে একটি শিক্ষা।’ (সূরা নূর : ৪৪) আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই রাত ও দিনকে পরস্পরের স্থলাভিষিক্ত করেছেন এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে শিক্ষা গ্রহণ করতে অথবা কৃতজ্ঞ হতে চায়।’ (সূরা ফুরকান : ৬২)।

শাকসবজির অপার নিয়ামত : অনেকের কাছে শীতকাল প্রিয় ঋতু। শীতকাল আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য এক অপার ও অনন্য নিয়ামত। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরের সূর্যোদয়ের মনোরম দৃশ্য আমাদের মন-প্রাণ জুড়িয়ে দেয়। মিষ্টি সূর্যরশ্মিতে ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো মুক্তাদানার মতো ঝলমল করে। গাছের পাতা থেকে শিশির ঝরে পড়ার টুপটাপ শব্দ আর পাখিদের কিচিরমিচির আন্দোলিত করে আমাদের মন ও মননকে। কি অপরূপ শীতের সকাল! শিশিরে ভেজা বিশাল পুষ্পিত সর্ষে খেত, সবুজ রং ধরা গম খেত, টমেটো, কাঁচা মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি খেত ফসলের মাঠকে সাজিয়ে তোলে। শীতের এ ঋতুতে মহান আল্লাহর অনন্য নিয়ামত নতুন শাকসবজি আর ফলমূলে ভরে যায় গ্রামের মাঠ। মেঠোপথ ধরে চলতে গিয়ে চোখ জুড়িয়ে যায় সবুজের সেই সমারোহ দেখে। বিস্তীর্ণ জমিতে ছড়িয়ে থাকে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, মুলা, শালগম, গাজর, শিম ইত্যাদি হরেক রকমের সবজি। শাকের মধ্যে থাকে লালশাক, পালংশাক, ঢেঁকিশাক, মুলাশাক ইত্যাদি। আর এ সব কিছুই আল্লাহ তায়ালার অশেষ দান। এত সুন্দর করে শীতের প্রকৃতিকে সুন্দরভাবে সাজিয়েছেন আমাদের রব আল্লাহ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘এদের জন্য নিষ্প্রাণ ভূমি একটি নিদর্শন। আমি তাকে জীবন দান করেছি এবং তা থেকে শস্য উৎপন্ন করেছি, যা এরা খায়। আমি তার মধ্যে খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান সৃষ্টি করেছি এবং তার মধ্যে থেকে ঝর্ণাধারা উৎসারিত করেছি, যাতে এরা তার ফল ভক্ষণ করে। এসব কিছু এদের নিজেদের হাতের সৃষ্ট নয়। তারপরও কি এরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না? পাক-পবিত্র সে সত্তা যিনি সব রকমের জোড়া সৃষ্টি করেছেন, তা ভূমিজাত উদ্ভিদের মধ্য থেকে হোক অথবা স্বয়ং এদের নিজেদের প্রজাতির অর্থাৎ মানবজাতি মধ্য থেকে হোক কিংবা এমন জিনিসের মধ্য থেকে হোক যাদেরকে এরা জানেও না।’ (সূরা ইয়াসিন : ৩৩-৩৬)

শীতকাল ইবাদতের মৌসুম : সালফ ও খালফসহ ইসলামিক স্কলারদের মতে শীতকাল ইবাদতের সুবর্ণ সময়। মুয়ায ইবন জাবাল রা.-এর অন্তিমকালে বেশি বেশি কান্না করছিলেন। মৃত্যুর সময় তাঁকে তাঁর কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি মৃত্যুর ভয়ে কাঁদছি না; বরং (সাওমের কারণে) গ্রীষ্মের দুপুরের তৃষ্ণা, শীতের রাতের নফল সালাত এবং ইলমের আসরগুলোতে হাজির হয়ে ‘আলিমদের সোহবত হারানোর জন্য আমি কাঁদছি।’

হাদিসে আরো বর্ণিত হয়েছে, ‘আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, মহানবী সা. বলেন, ‘শীতকাল হচ্ছে মুমিনের বসন্তকাল। শীতের দিন ছোট হওয়ায় সাওম রাখা যায় এবং রাত দীর্ঘ হওয়ায় নফল সালাত আদায় করা যায়।’ (মুসনাদু আহমাদ-১১৭১৬; শুয়াবুল ঈমান-৩৯৪০)।
আল্লামা ইবন রজব আল হাম্বলি (রহ) বলেন, ‘শীতকাল মুমিনের জন্য বসন্ত ঋতু বলার কারণ হলো একজন মুমিন এ মৌসুমে ইবাদতের জন্য সুযোগ কাজে লাগায় এবং সে ইবাদাতের ময়দানে ঘুরে বেড়ায়। যেভাবে বসন্ত মৌসুমে পশুরা মাঠে ময়দানে ঘুরে খাবার সংগ্রহ করে শরীরটা মোটা তাজা করে।’ তাবিয়ি উবাইদ ইবন উমর আল লাইসি (রহ) শীত মৌসুম এলে বলতেন, ‘হে কুরআনের ধারক বাহকেরা! তোমাদের কুরআন পড়ার জন্য রাত্রি লম্বা হয়েছে সুতরাং কুরআন পড়। তোমাদের সিয়ামের জন্য দিন ছোট হয়ে আসছে সুতরাং সিয়াম পালন কর।’

অন্য হাদিসে এভাবে এসেছে, ফারুকে আযম উমর ইবন খাত্তাব রা. বলেছেন, ‘শীতকাল হলো ইবাদতকারীদের জন্য গনিমতস্বরূপ।’ (কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফওয়াল-৩৮২৮৭)। শীত তো এমন গনিমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ), যা কোনো রক্তপাত কিংবা চেষ্টা ও কষ্ট ছাড়াই অর্জিত হয়। সকলেই কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই এ গনিমত স্বতঃস্ফূর্তভাবে লাভ করে এবং কোনো প্রচেষ্টা বা পরিশ্রম ব্যতিরেকে তা ভোগ করে। শীতকাল নফল সাওম রাখার জন্য সুবর্ণকাল। কাজা সাওম বাকি থাকলে তা আদায় করার জন্যও শীতের দিন অতি উপযোগী। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রা. বলতেন, ‘হে শীতকাল! তোমাকে স্বাগত! শীতকালে বরকত নাজিল হয়; শীতকালে রাত দীর্ঘ হওয়ায় নামাজ আদায় করা যায় এবং দিন ছোট হওয়ায় সাওম রাখা যায়।’ (কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফওয়াল-৩৫২১৩)

তীব্র শীত জাহান্নামের নিঃশ^াস : সহিহ হাদিসে এসেছে, ‘আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, জাহান্নাম অভিযোগ করে আল্লাহর কাছে বলল, হে আমার প্রভু! আমার এক অংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলছে। সুতরাং আমাকে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণের অনুমতি দিন। তাই আল্লাহ তায়ালা তাকে দু’বার শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুমতি দান করলেন। একবার শীত মৌসুমে আরেকবার গ্রীষ্ম মৌসুমে। তোমরা শীতকালে যে ঠাণ্ডা অনুভব করে থাকো তা জাহান্নামের শ্বাস-প্রশ্বাসের কারণ। আবার যে গরমে বা প্রচণ্ড উত্তাপ অনুভব করে থাকো তাও জাহান্নামের শ্বাস-প্রশ্বাসের কারণে।’ (বুখারি-৫১২, ৩০৮৭; মুসলিম-১৪৩২)

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত আছে, ‘নবী করিম সা. বলেছেন, যদি কোনো তীব্র ঠাণ্ডার দিন আল্লাহর কোনো বান্দা বলে, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু (আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই), আজকের দিনটি কতই না শীতল! হে আল্লাহ! জাহান্নামের জামহারি থেকে আমাকে মুক্তি দিন।” তখন আল্লাহ জাহান্নামকে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমার এক বান্দা আমার কাছে তোমার জামহারি থেকে আশ্রয় চেয়েছে। আমি তোমাকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি তাকে আশ্রয় দিলাম।’ সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, জামহারি কী? মহানবী সা. বললেন, ‘জামহারি এমন একটি ঘর যাতে অবিশ্বাসী, অকৃতজ্ঞদের নিক্ষেপ করা হবে এবং এর ভেতরে তীব্র ঠাণ্ডার কারণে তারা বিবর্ণ হয়ে যাবে।’’ (আমালুল ইয়াওম ওয়াল লাইল-৩০৬)

ঐতিহ্যময় পিঠা-পায়েস : শীতকাল মানেই নানা রকমের পিঠার আয়োজন। ভাপা পিঠা, চিতাই পিঠা, রস পিঠাসহ হরেক রকম পিঠার ঐতিহ্যময় ও অনন্য মৌসুম। শীতের পিঠাগুলোর অনন্য উপাদান খেজুরের গুড়। গুড় তৈরির রস পাওয়া যায় শীতকালেই। খেজুর রসের পায়েস এক মজাদার খাবার। অত্যন্ত সুস্বাদু ও মানবদেহের জন্য উপকারী খেজুর গাছের মিষ্টি রসের সুব্যবস্থা করেছেন মহান আল্লাহ।

অপার নিয়ামতের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় : আল্লাহ তায়ালার এসব অবারিত নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য অপরিহার্য। মানুষের জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের উপকরণাদি একমাত্র মহান আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামত। আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহ ছাড়া মানুষের বা কোনো প্রাণীর এক মুহূর্তও বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মানুষ আল্লাহর অগণিত নিয়ামত ভোগ করা সত্ত্বে¡ও এ নিয়ামতের যথার্থ শোকর আদায় করে না। আর আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের অর্থ হচ্ছে তাঁর আদেশ-নিষেধ, বিধি-বিধান যথাযথভাবে মেনে চলা। শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ নিয়ামত বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ বলেন, ‘যদি নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকো তাহলে আমি তোমাদের আরো বেশি দেবো আর যদি নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ হও তাহলে আমার শাস্তি বড়ই কঠিন।’ (সূরা ইবরাহীম : ৭)

রাতে নফল সালাত আদায় করা : কিয়ামুল্লাইল ও তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করা। শীতকালে রাত অনেক লম্বা হয়। পরিপূর্ণ ঘুমানোর পরেও শেষ রাতে তাহাজ্জুদ আদায় করা যায়। মহান আল্লাহ ঈমানদারদের গুণাবলি সম্পর্কে বলেন, ‘তাদের পিঠ থাকে বিছানা থেকে আলাদা, নিজেদের রবকে ডাকে আশঙ্কা ও আকাক্সক্ষা সহকারে এবং যা কিছু রিজিক আমি তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।’ (সূরা সাজদাহ : ১৬)।

নেককার পুণ্যাত্মা ব্যক্তিরা শীতের রাতগুলোয় সালাত ও জিকির-আযকার এবং ইসতিগফারে রত হন। শীতকাল আগমন করলে উবাঈদ বিন উমাঈর রা. বলতেন, ‘হে কুরআনের ধারক! তোমাদের রাতগুলো তিলাওয়াতের জন্য প্রলম্বিত করা হয়েছে, অতএব তা পড়তে থাকো। আর সাওম রাখার জন্য তোমাদের দিনগুলো সংক্ষেপিত করা হয়েছে, তাই বেশি বেশি সাওম রাখো।’ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রাতের বেলা সামান্য অংশই এরা ঘুমিয়ে কাটায়, আর রাতের শেষ প্রহরে এরা ক্ষমা (ইসতিগফার) চাওয়ায় রত থাকে।’ (সূরা যারিয়াত : ১৭-১৮)।

তাবেয়ী হাসান বসরী (রহ) বলেন, ‘একজন মুমিনের জন্য শীতকাল ইবাদত করার চমৎকার মৌসুম। শীতকালে রাত লম্বা হয়। এতে সে (সহজেই) তাহাজ্জুদ আদায় করতে পারে। দিন ছোট হয়। ফলে (সহজেই) সাওম রাখতে পারে। এজন্যই (পূর্ববর্তীদের মধ্যে) যাঁরা ইবাদত-বন্দেগিতে কঠোর পরিশ্রম করতেন তাঁরা যদি (কোনো কারণে) এ সময়ের রাতগুলোতে তাহাজ্জুদ না পড়তে পারতেন এবং দিনের বেলা সাওম না রাখতে পারতেন তাহলে এর জন্য তাঁরা কাঁদতেন।’
আমরা ফজরের সালাতের জন্য যে সময় ঘুম হতে জেগে উঠি, তার এক ঘণ্টা বা আযানের আধা ঘণ্টা আগে জেগে কমপক্ষে ২, ৪, ৬ বা ৮ রাকাআত তাহাজ্জুদের সালাত আদায়ের চেষ্টা করতে পারি। শীতকালই তাহাজ্জুদের সালাতে অভ্যস্ত হবার উপযুক্ত সময়কাল।

বেশি বেশি সাওম পালন করা : শীতকালে দিন থাকে খুবই ছোট এবং ঠাণ্ডা। ফলে দীর্ঘ সময় না খেয়ে যেমন থাকতে হয় না, তেমনি তৃষ্ণার্ত হওয়ারও ভয় নেই। তাই সহজে সিয়াম পালন করা যায়। এ সময়ে কাজা সাওম আদায় করা ও বেশি বেশি নফল সাওম রাখা যায়। ঈমানদারের জন্য শীতকাল বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। হাদিসে এসেছে, শীতকাল মুমিনের জন্য ইবাদতের বসন্তকাল। হাদিসে এসেছে, ‘আমির ইবন মাসউদ আল জুমুহি রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, ‘শীতল গনিমত হচ্ছে শীতকালে সাওম পালন করা।’ (তিরমিজি-৭৯৭; মুসনাদু আহমাদ-১৮৯৫৯)
বেশি বেশি নফল সাওম রাখারও এটি সুবর্ণ সময়। মহানবী সা. ইরশাদ করেছেন, আবু সা’ঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি নবী সা.কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহ্র রাস্তায় এক দিনও সিয়াম পালন করে, আল্লাহ্ তার মুখমণ্ডলকে দোযখের আগুন হতে সত্তর বছরের রাস্তা পরিমাণ দূরে সরিয়ে নেন।’ (বুখারি-২৬৮৫; মুসলিম-২৭৬৭)
শীতের এ মওসুমে বেশি বেশি যেসব সাওম রাখা যেতে পারে, ক. আইয়্যামে বিজ তথা আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের সাওম. খ. প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবারের সাওম, এ ২ দিন সাওম রাখা প্রিয়নবী সা.-এর নিয়মিত আমল ছিল।

কুরআনে সুরা ও দোয়া মুখস্থ করা এবং সহিহ তিলাওয়াতের অপূর্ব সুযোগ : খতিব বাগদাদী (রহ) বলেন, ‘শীতকালের রাত অনেক লম্বা হয়। আর রাত যেকোনো কিছু মুখস্থ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়। তাই তোমরা শীত এলে বেশি বেশি ইলম অন্বেষণে সময় ব্যয় করো।’ শীতকাল এলে উবাইদ ইবন উমায়ের (রহ) বলতেন, ‘হে কুরআনের পাখিরা! রাতকে লম্বা করা হয়েছে তোমাদের তিলাওয়াতের জন্য। সুতরাং বেশি বেশি তিলাওয়াত করো। আর দিনকে ছোট করা হয়েছে সাওম রাখার জন্য। তাই তোমরা সাওম পালন করো।’ হেতু শীতকালের রাতে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত, ছোট ছোট সূরা ও গুরুত্বপূর্ণ আয়াত এবং মাসনুন দোআসমূহ মুখস্থ করার জন্য সচেষ্ট হওয়া দরকার। পাশাপাশি কুরআনুল করিমের সহিহ তিলাওয়াতের চেষ্টা করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ আমল।

শীতার্ত অসহায় মানুষের সহযোগিতা করা : শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশে বছর ঘুরে আসে শীত-শৈত্যপ্রবাহ। পৌষ-মাঘ দুই মাস শীতকাল। হাড়-কাঁপানো শীতে নাকাল দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষ। শীতার্তসহ বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের আদর্শ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা আল্লাহর মহব্বতে উজ্জীবিত হয়ে দরিদ্র, ইয়াতিম ও বন্দিদের খাবার দান করে।’ (সূরা দাহর : ০৮)।
চারপাশে দেখা যায়, লাখো মানুষ একটু উষ্ণতার জন্য জবুথবু হয়ে খড়কুটা জ্বালিয়ে একটু তাপ পেতে চায়। মানবিক ও ইসলামিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে ওই সব মানুষের পাশে সাধ্যমতো দাঁড়ানো উচিত। রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, ‘আবু সাঈদ আল খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে ঈমানদার ব্যক্তি কোন ক্ষুধার্ত ঈমানদার ব্যক্তিকে খাদ্য দান করে, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন। যে মুমিন ব্যক্তি কোন তৃষ্ণার্ত মুমিন ব্যক্তিকে পানি পান করাবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তাকে সিলমোহর করা খাঁটি ‘রাহিকুল মাখতুম’ পান করাবেন। যে মুমিন ব্যক্তি কোন বস্ত্রহীন মুমিন ব্যক্তিকে পোশাক দান করে, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতে সবুজ পোশাক পরাবেন।’ (তিরমিজি-২৪৪৯; শুয়াবুল ঈমান-৩৩৭০)
শীতবস্ত্র নেই, প্রচণ্ড শীতে পথে-ঘাটে অসংখ্য মানুষ কষ্ট পায়। যতটুকু সামর্থ্য আছে, তা দিয়েই অসহায় শীতার্তদের সাহায্য করা উত্তম আমল। এতে আল্লাহ খুশি হন। আল্লাহর দয়া-অনুগ্রহ পেতে হলে মানুষের প্রতি দয়া করতে হবে। হাদিসে এসেছে, ‘মহানবী সা. বলেছেন, যে মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তার প্রতি দয়া-অনুগ্রহ করেন না।’ (বুখারি-৫৬৬৭, ৬৯৪১; মুসলিম-৬১৭২)

শীতে অজু ও গোসল করা : অজু ও গোসলের ব্যাপারে সচেতন হওয়া। শীতকালে মানুষের শরীর শুষ্ক থাকে। আর অজু-গোসল ঠিকমতো আদায় না হলে সালাত শুদ্ধ হবে না। তাই এ বিষয়ে বিশেষভাবে যত্নবান হতে হবে; এমনকি শীতের মৌসুমে গরম পানি দিয়ে অজু করলেও সওয়াবে কমতি হবে না। উমর রা. তাঁর ছেলের উদ্দেশে বলেন, ‘শীতের দিনে ভালোভাবে অজু করা বড় গুরুত্বপূর্ণ ও সওয়াবের কাজ।’ অজুর গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী সা. ইরশাদ করেছেন, ‘আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন কিছু শিখিয়ে দেব না, যার কারণে আল্লাহ পাপ মোচন করবেন এবং জান্নাতে তোমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন? সাহাবারা বললেন, জি হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! মহানবী সা. বললেন, ওই কাজগুলো হলো মন না চাইলেও ভালোভাবে অজু করা, বেশি পদক্ষেপে মসজিদে যাওয়া এবং এক সালাতের পর অন্য সালাতের জন্য অপেক্ষা করা।’ (মুসলিম-৬১০; তিরমিজি-৫১)
শীতে তাড়াহুড়া করে অজু করতে গিয়ে সচেতনতা ও সতর্কতা আবশ্যক। অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যথাযথভাবে ধৌত না করলে অজু-গোসল ঠিকমতো আদায় হয় না। আবার ভয়াবহ আযাবের ঘোষণাও এসেছে। সহিহ হাদিসে এসেছে, ‘আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা. বলেন, তোমরা উত্তমরূপে পরিপূর্ণভাবে অজু করো, কেননা ভালোভাবে না ধৌত করার কারণে সেদিন ঠিকানা হবে জাহান্নাম।’ (বুখারি-১৬৩; মুসলিম-৫৯৬)
শীতে অজু ও গোসলে কষ্ট হওয়ায় তাতে প্রতিদানও বেশি। হাদিসে এসেছে, ‘আয়িশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, কষ্ট ও ক্লান্ত বেশি হলে সে আমলে প্রতিদানও বেশি।’ (মুসলিম-২৯৮৬; মুসনাদু আহমাদ-২৪১৫৯)

গরম পানি দিয়ে অজু-গোসল : তীব্র শীতে কষ্ট হলে গরম পানি দিয়ে অজু-গোসল করাতে কোনো শরয়ী বাধা নেই। অজুর পর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মুছে ফেলাতেও সমস্যা নেই। শীতের তীব্রতা যদি কারও সহ্যের বাইরে চলে যায়, পানি গরম করে ব্যবহার করার সুযোগ না থাকে এবং ঠাণ্ডা পানি ব্যবহারে শারীরিকভাবে ক্ষতি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে, তাহলে তিনি অজুর পরিবর্তে তায়াম্মুম করতে পারেন। (বাইহাকি-২২৬)।

শীতকালে গাছের পাতার মত পাপ ঝরে পড়ার দৃষ্টান্ত : শীতকালে গাছের পাতা ঝরে পড়ে। শীতের শেষ দিকে গাছপালার সব পত্র-পল্লব শূন্য হয়ে যায়। গুরুত্ব সহকারে সালাত আদায় করলে সালাত আদায়কারীর পাপগুলোও এভাবে ঝরে যায়। হাদিসে এসেছে, ‘আবু জার গিফারি রা থেকে বর্ণিত, নবী সা. শীতকালের কোনো একদিন বের হলেন, যখন গাছের পত্র-পল্লব ঝরে পড়ছিল। তিনি গাছের দুটি ডাল ধরলেন, ফলে পাতাগুলো আরো বেশি ঝরতে লাগল। তিনি বললেন, ‘হে আবু জার, আমি বললাম, আমি উপস্থিত, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, ‘কোনো মুসলমান বান্দা যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করে, তখন তার পাপগুলো এই গাছের পাতার মতো ঝরে পড়ে।’ (মুসনাদু আহমাদ-২১৫৫৬)
উমর রা. নিজ শাসনামলে গভর্নরদের উদ্দেশে শীতের আগমনলগ্নে লিখতেন, ‘শীত কিন্তু এসে গেল, এ তোমাদের দেহের শত্রু। অতএব এর প্রতিরোধে পশম, মোজা, হাতমোজা ইত্যাদির প্রস্তুতি নাও। আর পশম দিয়ে গায়ের চামড়ায় এবং শরীরের পোশাকে শীতের আক্রমণ ঠেকাও। কারণ শীত খুব দ্রুত প্রবেশ করে কিন্তু বিদায় নিতে বিলম্ব ঘটায়।’
আল্লাহ আমাদের উষ্ণতার পরশ সৃষ্টির নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘তিনি পশু সৃষ্টি করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য পোশাক, খাদ্য এবং অন্যান্য নানাবিধ উপকারিতাও।’ (সূরা নাহল : ৫)
অধুনা যুবসমাজ থেকে শুরু করে উল্লেখযোগ্য স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা খামোখা রাত জাগে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ সাইটসহ অপরাধ জগতের ফাহেশা বিষয় উপভোগ করে। বাজে দৃশ্য এবং ভিডিও দেখে রজনী কাটিয়ে দেয়। যতক্ষণ মোবাইলে চার্জ ততক্ষণ অনলাইনে অ্যাক্টিভ থাকা। অবৈধ বিষয়াদি দেখা, শোনা বা পড়া এখন নেশায় পরিণত হয়েছে। লক্ষ্য রাখতে হবে, শীতে লেপ-কম্বলের ভেতরে অবৈধ-অশ্লীল কিছু দেখলে কেউ না দেখলে তা মহান আল্লাহ অবশ্যই দেখেন। শীতকালকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে ইবাদতের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে। জাহান্নামের তীব্র ও অসহ্য শীতের কথা স্মরণ আলস্য ত্যাগ করে এ রাতগুলোয় ইবাদতে মশগুল হতে হবে। সারা বছর না পারলেও শীতের দীর্ঘ রাতের কিছু অংশ জেগে তাহাজ্জুদ পড়ার অভ্যাস গড়তে হবে। এভাবে শীতকালকে ইবাদতে কাটাই এবং সেক্ষেত্রে যেন অলসতা না করি। ফারুকে আযম উমর ইবন খাত্তাব রা. আপন ছেলেকে অনেকগুলো উপদেশ দেন, তার মধ্যে তিনি বলেন, ‘আর শীতের দিনে সুচারুরূপে অজু করাও (বড় গুরুত্বপূর্ণ ও পুণ্যের কাজ)।’

শীতের তীব্রতায় তায়াম্মুম করার বিধান : শীতের তীব্রতায় গোসল বা অজুর পরিবর্তে তায়াম্মুম করার বিধান সম্পর্কে ইসলামিক স্কলারসদের মতামত হলো; শাইখ মুহাম্মদ সালিহ আল মুনাজ্জিদ (রহ.): যে ব্যক্তির উপর গোসল ফরজ হয়েছে সে ব্যক্তি সালাত আদায় করতে চাইলে তার উপর ফরজ হচ্ছে পানি দিয়ে গোসল করে নেয়া। দলিল হচ্ছে আল্লাহ্র বাণী: “আর তোমরা জুনুবি (অপবিত্র) হলে গোসল করে পবিত্রতা অর্জন করবে।” (সূরা মায়িদা : ৬) তাই কেউ যদি পানি ব্যবহারে অক্ষম হয় পানি না থাকার কারণে কিংবা পানি থাকলেও এর ব্যবহারে রোগের ক্ষতি হতে পারে কিংবা তীব্র ঠাণ্ডার কারণে (তার কাছে পানি গরম করার মত কিছু না থাকলে); তাহলে সে ব্যক্তি পানি দিয়ে গোসল করার পরিবর্তে মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করতে পারেন। এর দলিল হচ্ছে আল্লাহ্র বাণী: ‘আর যদি তোমরা অসুস্থ হও বা সফরে থাক বা তোমাদের কেউ মলমূত্র ত্যাগ করে আসে বা তোমরা স্ত্রী সহবাস করে থাক এবং পানি না পাও তবে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করবে।’ (সূরা মায়িদা : ৬) এ আয়াতে দলিল রয়েছে যে, অসুস্থ ব্যক্তি পানি ব্যবহার করার ফলে যদি তার মৃত্যু ঘটা, কিংবা রোগ বেড়ে যাওয়া কিংবা আরোগ্য লাভ বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা থাকে সেক্ষেত্রে তিনি তায়াম্মুম করবেন। আল্লাহ্ তায়ালা তায়াম্মুমের পদ্ধতি বর্ণনা এবং এ বিধান প্রদান করার গূঢ় রহস্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: ‘তা দ্বারা মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ করবে। আল্লাহ তোমাদের ওপর কোন কাঠিন্য রাখতে চান না; বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের প্রতি তাঁর নিয়ামত সম্পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।’ (সূরা মায়িদা : ৬)
হাদিসে এসেছে, ‘আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: ‘যাতুস সালাসিল’ এর অভিযানে এক ঠাণ্ডার রাতে আমার স্বপ্নদোষ হয়ে গেল। আমি আশঙ্কা করলাম, আমি যদি গোসল করি তাহলে ধ্বংস হয়ে যাব। তাই আমি তায়াম্মুম করলাম। এরপর আমার সাথীদেরকে নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলাম। আমার সাথীরা বিষয়টি নবী সা.-এর কাছে উল্লেখ করলে তিনি বললেন: হে আমর! তুমি কি জুনুবি (গোসল ফরজ হওয়া) অবস্থায় তোমার সাথীদের নিয়ে নামাজ পড়েছ? তখন আমি তাঁকে জানালাম কি কারণে আমি গোসল করিনি এবং আমি আরও বললাম: আমি শুনেছি আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু।’ (সূরা নিসা : ২৯) তখন রাসূলুল্লাহ সা. হেসে দিলেন, কোন কিছু বললেন না।’ (আবু দাউদ-৩৩৪; মুসনাদু আহমাদ-১৭৮১২)
হাফিয ইবন হাজার আসকালানী (রহ) বলেন, ‘এ হাদিসে দলিল রয়েছে যে, পানি ব্যবহার করলে যে ব্যক্তি মারা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে; সেটা ঠাণ্ডার কারণে হোক কিংবা অন্য কোন কারণে হোক তার জন্য তায়াম্মুম করা জায়েয। তায়াম্মুমকারীর জন্য অজুকারীদের ইমাম হওয়াও জায়েয।’ (ফাতহুল বারী শারহুল বুখারি, প্রথম খণ্ড, পৃ: ৪৫৪)
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায (রহ) বলেন, যদি কারো পক্ষে গরম পানি সংগ্রহ করা সম্ভব হয় কিংবা আপনি গরম করতে পারেন কিংবা প্রতিবেশী বা অন্য কারো থেকে কিনে নিতে পারেন তাহলে সেটা করা তার ওপর আবশ্যকীয়। কেননা আল্লাহ বলেন: ‘তোমরা সাধ্যানুযায়ী আল্লাহকে ভয় কর।’ (সূরা তাগাবুন : ১৬) হেতু কর্তব্য হচ্ছে পানি কেনা বা গরম করা কিংবা অন্য যেভাবে শরিয়তের বিধান মোতাবেক অজু করা যায় সেটা করা। যদি তাতে অপারগ হন এবং ঠাণ্ডা অতি তীব্র হয়, পানি ব্যবহারে বিপদ ঘটার আশঙ্কা থাকে, পানি গরম করা বা আশপাশে কারো থেকে গরম পানি কেনার কোন উপায় না থাকে সে ক্ষেত্রে তার ওজর গ্রহণযোগ্য এবং তায়াম্মুম করাই তার জন্য যথেষ্ট। যে ব্যক্তি পানি ব্যবহারে অক্ষম সে ব্যক্তির হুকুম যে ব্যক্তি পানি পায়নি তার হুকুমের অনুরূপ। (মাজমুউল ফাতাওয়া বিন বায, ১০ম খণ্ড, পৃ: ১৯৯-২০০)

শীতকালে অজুর সময় মোজার ওপর মাসেহ করার বিধান : শীতের মৌসুমে অধিকাংশ সময় মোজা পরিধান অবস্থায় থাকার প্রয়োজন হয়। অজুর সময় ধৌত করার পরিবর্তে মাসেহ করা বান্দার জন্য আল্লাহর এক বিশেষ উপহার। তাই চামড়ার বা কাপড়ের মোজার ওপরে মাসেহ করা যাবে। এটি নবীর সা. অসংখ্য সহিহ ও মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা এটি সাব্যস্ত হয়েছে। ‘মুগীরা ইবন শোবা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. টয়লেট করতে বের হলেন, তখন আমি পানির পাত্র নিয়ে তাঁর অনুসরণ করলাম। তিনি হাজত সম্পন্ন করলে আমি পানি ঢেলে দেই। অতঃপর তিনি অজু করলেন এবং মোজার উপর মাসেহ করলেন।’ (বুখারি-১৮০, ২০০, ৩৫৬, মুসলিম-৬৪৯, ৬৫১) সাহাবীগণ অনেকেই কাপড়ের তৈরি মোজা পরিধান করতেন আর তার ওপর মাসেহ করতেন। চামড়ার মোজা কিংবা কাপড়ের মোজার ওপর মাসেহ করার সময়কাল শুরু হয় প্রথমবার অজু ভাঙার পর প্রথমবার মাসেহ করা থেকে। প্রথমবার মোজা পরিধানের সময় থেকে নয়।

চামড়া ও সুতার তৈরি কাপড়ের মোজার ওপর মাসেহ করার জন্য শর্ত চারটি:
প্রথম শর্ত : পবিত্র অবস্থায় মোজাদ্বয় পরিধান করা। দলিল হচ্ছে, ‘মুগিরা বিন শু’বা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদা রাসূল সা. এর সাথে সফরে ছিলেন, এক পর্যায়ে আমি তাঁর মোজা খুলতে উদ্যত হলে নবী সা. বললেন মোজাদ্বয়কে রেখে দাও; কারণ আমি সে দুটো পবিত্র অবস্থায় পরিধান করেছি।’ বুখারি-২০৩, ৫৪৬৩; মুসলিম-৬৫৪)
দ্বিতীয় শর্ত : মোজাদ্বয় সেটা চামড়ার হোক কিংবা কাপড়ের হোক পবিত্র হতে হবে। নাপাক মোজার ওপর মাসেহ করা জায়েয নেই। দলিল; ‘আবু সাঈদ খুদরী রা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর সাহাবীদেরকে নিয়ে জুতা পায়ে দিয়ে সালাত আদায় করছিলেন। সালাত আদায়কালে তিনি জুতাজোড়া খুলে বাম দিকে রাখলেন। তাঁর দেখাদেখি সাহাবায়ে কিরামও জুতা খুলে ফেললেন। সালাত সম্পন্ন হবার পর তিনি বললেন, তোমরা কেন জুতা খুলে ফেললে? তারা বললেন, আমরা আপনাকে খুলতে দেখে আমরাও খুলেছি। তখন তিনি বললেন, জিবরাঈল (আ) আমাকে অবহিত করেন যে, আমার জুতাদ্বয়ে নাপাকি আছে।’ (আবু দাউদ-৬৫০; মুসনাদু আহমাদ-১১৮৭৭) এর থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, নাপাক জিনিস নিয়ে সালাত আদায় করা নাজায়েয। আর নাপাক জিনিস মাসেহ করতে গেলে যেটা দিয়ে মাসেহ করা হবে সেটাতে নাপাকি লেগে সেটাও নাপাক হয়ে যাবে। তাই সেটা নাপাক জিনিসকে পবিত্র করবে না।

তৃতীয় শর্ত : মোজাদ্বয় মাসেহ করা যায় ছোট অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জন করার ক্ষেত্রে। জানাবাত বা যে কারণে গোসল ফরজ হয় সে অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে মাসেহ করা যায় না। দলিল; ‘সাফওয়ান বিন আস্সালের রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন আমরা যখন সফরে থাকি তখন আমরা যেন তিন দিন তিনরাত জানাবাত ব্যতীত আমাদের মোজা না খুলি। অর্থাৎ পায়খানা, পেশাব বা ঘুমের কারণে যেন মোজা না খুলি।’ (তিরমিজি-৯৬; মুসনাদ আহমাদ-১৮০৯১, ১৮০৯৫) এ হাদিসের দলিল থেকে জানা গেল ছোট অপবিত্রতার ক্ষেত্রে মাসেহ চলে; বড় অপবিত্রতার ক্ষেত্রে নয়।

চতুর্থ শর্ত : শরিয়ত নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে মাসেহ করতে হবে। সে সময়সীমা মুকিমের জন্য একদিন একরাত। আর মুসাফিরের জন্য তিনদিন তিনরাত। আলি বিন আবু তালিব রা.-এর হাদিস তিনি বলেন, ‘মহানবী সা. মুকিমের জন্য একদিন একরাত ও মুসাফিরের জন্য তিনদিন তিনরাত নির্ধারণ করেছেন; অর্থাৎ মোজার ওপর মাসেহ করার সময়কাল’। (মুসলিম-৬৬১; মুসনাদু আহমাদ-১২৪৫)
এ সময়কাল শুরু হবে অজু ভঙ্গ হওয়ার পর প্রথমবার মাসেহ করা থেকে এবং শেষ হবে মুকিমের ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টা পর। আর মুসাফিরের ক্ষেত্রে ৭২ ঘণ্টা পর। যদি আমরা ধরে নেই যে, এক লোক মঙ্গলবার ফজরের সময় অজু করে ঐ দিন এশার নামাজ আদায় করা পর্যন্ত এ অজুর উপর ছিল। রাতে ঘুমিয়েছে। বুধবার ভোরে ফজরের নামাযের জন্য উঠে ঠিক ভোর ৫টায় মোজার ওপর মাসেহ করেছে। এক্ষেত্রে তার মোজা মাসেহ করার সময়কাল শুরু হবে বুধবার ভোর পাঁচটা এবং শেষ হবে বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা। যদি ধরা হয় যে, বৃহস্পতিবার ভোর ৫টার আগে সে ব্যক্তি মোজার ওপর মাসেহ করেছে তাহলে সে ব্যক্তি যতক্ষণ পর্যন্ত পবিত্রতার উপর থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত এ অজু দিয়ে ফজরের সালাত ও অন্যান্য সালাত আদায় তার জন্য জায়েয। কেননা আলিমদের অগ্রগণ্য মতানুযায়ী, মাসেহ করার সময় পূর্ণ হয়ে গেলেও তার অজু ভাঙবে না।

মাসেহ করার পদ্ধতি : তায়াম্মুম হলো নিয়ত করে মাটি অথবা মাটি-প্রকৃতির জিনিসে (যথা বালু, পাথর, চুনা ইত্যাদি) হাত স্পর্শ করে একবার পুরো চেহারা (মুখমণ্ডল) মাসেহ করা, দ্বিতীয়বার হাত স্পর্শ করে উভয় হাতের কনুই পর্যন্ত ভালোভাবে মাসেহ করা। রদ্দুল মুহতার, প্রথম খণ্ড, পৃ: ২২৮,২২৯; ‘আল-মুলাখ্খাস আল-ফিকহি লি শাইখ ফাউযান, প্রথম খণ্ড, পৃ: ৪৩।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে শীতকালে বেশি বেশি ইবাদত ও নেক আমলের তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : প্রধান মুহাদ্দিস, বিজুল দারুল হুদা কামিল মাদরাসা, বিরামপুর, দিনাজপুর

SHARE

Leave a Reply