সবচেয়ে বড় জ্ঞান আলহামদুলিল্লাহ-এর অনুধ্যান -আহসান হাবীব ইমরোজ

কীট শব্দটা লোমহর্ষক! শুনলেই আজকালকার ছেলেমেয়েদের হার্টবিট বেড়ে যায়। দাঁত কিড়মিড় করে তাকায়। বিশেষ করে আরশোলা…। আমি নিজেই এমনসব বীর কিশোরদের দেখেছি, যারা হাইজাম্পে ব্রোঞ্জপদক পাওয়াতো দূরের কথা কদাপি নামও লেখায়নি, সেই তারাই আরশোলা দেখে কিভাবে লাফিয়ে ডাইনিংটেবিলে উঠে যায়। কিন্তু গ্রন্থকীট (বই-পাগলা আরকি) শব্দযুগল শুনলে প্রগাঢ় শ্রদ্ধায় মন ভরে যায়। মনোজগতে ভেসে উঠে এক একজন জ্ঞান-সাগরের অনুপম রূপ। এইতো কয়েকদিন আগেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের (যদিওবা বাংলা গদ্যেই তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান) জন্মের দুইশত বছর চলে গেলো।

আমরা কি জানি, এই আধুনিক ইতিহাসে পাঠকদের পড়ার জন্য কী পরিমাণ বই প্রকাশিত হয়ে সঞ্চিত রয়েছে? আধুনিক টেন্ড হচ্ছে কোন কিছু জানার জন্য গো-গোল মামার (অপরিচিত জনদের মামা ডাকা এটাও একটি আধুনিক টেন্ড; কিন্তু কারণ কী? আপন করে নেয়া; নাকি ত্বরা-প্রবণতা) হেলপ নেয়া যাক। আরে ফলাফলতো ভয়াবহ!! According to Google’s advanced algorithms, the answer is nearly 130 million books, or 129,864,880. তার মানে প্রায় ১৩ কোটি।

আপনি যদি ১০০ বছরও বাঁচেন আর প্রতিদিন একটি করে বই পড়ে শেষ করেন; তবে পরিমাণ হবে মাত্র ৩৬,৫০০টি যা মোট বইয়ের ৩,৫৫৪ ভাগের একভাগ মাত্র। কিন্তু এটাতো ‘যদি’র ভেল্কিতে আটকা (যদি ১০০ বছর বাঁচি, যদি ০ থেকে ১০০ বছর পর্যন্ত পড়ার সামর্থ্য থাকে, যদি প্রতিদিন একটি বই পড়া হয়; তবেই)। কিন্তু বাস্তবে কি সম্ভব? কয়েকজন এই যদির বেড়া টপকানোর চেষ্টা করেছিলেন। আমেরিকার অন্যতম জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট প্রতিদিন প্রায় তিনটি করে বই পড়ে সমগ্র জীবনে প্রায় ৩০,০০০ বই পড়েছিলেন।

হালজামানার বিলগেটস প্রতি বছর ৫০টি আর তাকে টপকে দ্বিতীয় ধনী হলেন এলেন মাস্ক প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা পড়ায় কাটান। কিন্তু সমগ্র জীবনে ৩৬,৫০০টির ধারে কাছে কেউ নন। তাহলে ১৩ কোটির কী হবে?
মাইকেল এইচ হার্ট প্রণীত, দ্য হান্ড্রেড বইটির প্রথম ছয়জনের ভিতর পাঁচজনই ধর্মপ্রণেতা। যেমন, মুহাম্মদ সা., ঈসা আ., গৌতম বুদ্ধ, কনফুসিয়াস এবং সেন্ট পল। এবং তাদের প্রচারিত ধর্মগ্রন্থগুলোও পৃথিবীর সর্বাধিক প্রচারিত ও পঠিত গ্রন্থ। বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর তাবৎ জ্ঞান লুকায়িত আছে ধর্মগ্রন্থাবলিতে। আর সকল সত্য ধর্মগ্রন্থের সারনির্যাস সঞ্চিত আছে আল কুরআনে। আর ১১৪টি সূরা সংবলিত এই মহাগ্রন্থ আল কুরআন।
কুরআনের সর্বাগ্রে সূরা আল ফাতিহা; যার অপর নাম উম্মুল কুরআন বা কুরআনের জননী। অর্থাৎ সমগ্র কুরআনের শিক্ষার সংক্ষিপ্তসার আছে এর ভিতর। আর তাইতো এটি পাঠ সকল মুমিনের জন্য বাধ্যতামূলক। ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাতে মুয়াক্বাদাহ নামাজে সব মিলে কমপক্ষে ৩০ থেকে ৩২ বার প্রতিদিন এটি পড়তে হয়। তার মানে গড়ে প্রতি ৪৫-৪৮ মিনিট পরপর।

এ সূরার আরেক নাম আলকাঞ্জ বা ধনভাণ্ডার। আশশিফা বা মহৌষধ। আমরা কী পরিমাণ নির্বোধ যে হাতের কাছে ধনভাণ্ডার রেখে আজ গরিব দ্য গ্রেট। আর আশশিফার বরকত রেখে রোগে-শোকে মুহ্যমান! হয়ে আছি। তর্ক হতেই পারে, কই সারা দিনমানই তো পড়ছি কোন ফল পাচ্ছি না। আরে ভায়া, আসুন না একটু পর্যালোচনা করি; কেমন ভাবে পড়ছি!
আসুন একটু গভীরভাবে চিন্তা ও বিশ্লেষণ করি এর প্রথম আয়াত। কেন এই রাব্বুল আলামিনের প্রশংসা করবো?

এক. মহান আল্লাহপাকের সর্বাগ্রে প্রশংসা কারণ তিনি এই বিপুল বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, যার ফলে আমরা অস্তিত্বমান।
যার পরিধি এখন পর্যন্ত পৃথিবীর তাবৎ বিজ্ঞানীরা মিলেও কল্পনা করতে পারেননি; কেবল মাত্র যা সর্বাধিক শক্তিশালী দূরবীক্ষণ দিয়ে দেখা যাচ্ছে তার ব্যাস হচ্ছে ৯৩ শত কোটি আলোকবর্ষ বা ৯৩ বিলিয়ন লাইটইয়ার্স। আর আলোকবর্ষ মানেতো আমরা জানি, সেকেন্ডে ১,৮৬,০০০ মাইল গতিতে আলো বছরে কত দূরত্বে যায়। আমরা কি এই দানবীয় সংখ্যাটা কল্পনা করতে পারি? ৫,৮৬,৫৭০,০০০০০০০। মানে ৫ লক্ষ ৮৬ হাজার কোটি মাইল।
৯৩ শত কোটি আলোকবর্ষ মানে ৫৪৫,৫১০০০০০,০০০০০০০ মাইল মাত্র।
সহজ বাংলায়, পৃথিবী থেকে সূর্যমামার যে দূরত্ব (৯,৩০,০০০০০ মাইল) তার থেকে মাত্র ৬০ কোটি গুণ বেশি। আর অনাবিষ্কৃত মহাবিশ্ব এর থেকে কত হাজার বা কোটি গুণ কে জানে?
আর এ সবই আপনি, আমি মানুষের জন্য। তবুও কি আমাদের অন্তর কৃতজ্ঞতায় বিগলিত হবে না?

দুই. এই মহাবিশ্বে গ্যালাক্সির সংখ্যা কতো? ধারণা করা হয়, দশ হাজার থেকে বিশ হাজার কোটি প্রায়। প্রতিটি গ্যালাক্সিতে তারার সংখ্যাও প্রায় অনুরূপ করে। তাহলে এই মহাবিশ্বে তারার সংখ্যা কত? ২ এর পরে ২২ শূন্য দিলে যা হয়। ২০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০।
সহজ হিসাব হলো পৃথিবীর ৭৮০ কোটি মানুষের ভিতর ভাগ করে দিলে প্রত্যেকে পাবে ২৫ হাজার কোটি করে তারা। যেমন, আমাদের গ্যালাক্সির নাম মিল্কিওয়ে; তাতে তারার পরিমাণ প্রায় দশ থেকে বিশ হাজার কোটি। কিন্তু তাতে প্ল্যানেটারি বা সোলার সিস্টেম আছে মাত্র ২৫০০টি। অর্থাৎ প্রতি ৮ কোটি তারার একটিতে এই সৌরজগতের সিস্টেম আছে। আর সোলার সিস্টেম আছে বলেই আমরা জীবিত।
তার মানে আমি আপনি সেই ৮ কোটির ভিতর বাছাই করা একজন। সারাজীবন সেজদায় থাকলেও কি এর হক আদায় হবে?

তিন. নাসার গবেষণায় বলা হয়েছে, সমগ্র মহাজগতে প্রায় ১০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ টি গ্রহ আছে।
কিন্তু মানুষ্য বসতির পরিবেশ আছে ২০ থেকে মাত্র ৫০টি গ্রহে। তার মানে আমাদের বাছাই করা হয়েছে ২০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ এর ভিতর থেকে একটি। মহান প্রভুর এই সুমহান বাছাইয়ের জন্য কী আমরা কৃতজ্ঞ হবো না?

চার. বিপুলা এই পৃথিবীতে উদ্ভিত, প্রাণী, কীটপতঙ্গ মিলে প্রায় ৮৭ লক্ষ প্রজাতি আছে। তার ভিতর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আশরাফুল মাখলুকাত বা মানুষ হিসেবে আমাকে, আপনাকে তৈরি করা হয়েছে। তবুও কি আমাদের হৃদয় কৃতজ্ঞতায় বিগলিত হবে না?

পাঁচ. মানব সন্তানের পিতার একটি শুক্রকীট (আবার সেই কীট!) মায়ের ডিম্বাণুর সাথে সফলভাবে মিলিত হলে মা গর্ভবতী হন। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ১০ কোটি শুক্রাণুর ভিতর একটি সফল হয়। বাকিরা মারা যায়। আপনি, আমি সেই সফলদের একজন। কিভাবে মহানপ্রভুর এই প্রশংসা আদায় করবেন?

ছয়. এই পৃথিবীতে বর্তমানে ৭৮০ কোটি মানুষ; যার ভিতর ৬.১৫% মানুষ শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী হয়তোবা আল্লাহ আপনাকে আমাকে এই সমস্যা থেকে মুক্ত রেখেছেন। আর যাদের এই সমস্যা আছে তাদেরকেও এটি মোকাবেলার অন্যবিধ শক্তি দিয়েছেন। তবুও কি আপনি কৃতজ্ঞ হবেন না?

সাত. এই পৃথিবীতে বর্তমানে ৭৮০ কোটি মানুষ; এর ভিতর ১৮০ কোটি মুসলিম; সেই ‘কুনতুম খাইরা উম্মাত’ হিসেবে আমাদের জন্ম দিয়েছেন। সবচেয়ে দামি নেয়ামত, ঈমানের কী মূল্য দিবেন আপনি?

আট. ১৮০ কোটি মুসলিমের কতজন দ্বীন বুঝে? কতজন নামাজ পড়ে? ১০% বা ২০%। আল্লাহপাক আমাদেরকে এর ভিতর বাছাই করেছেন। এই সত্যিকার বুঝ বা হিদায়াতের কী মূল্য দিবেন?

এই কি শেষ?
এরপর আছে অন্ন, বস্ত্র বাসস্থান এই পৃথিবীর সুন্দর সামগ্রিক পরিবেশ। পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তান, ভাই-বোন ও স্বজনদের কলিজাভরা ভালোবাসাকে দিয়েছেন?
ভাবুনতো একটি চাল কিংবা একফোঁটা পানি কি তৈরি করতে পারবে পৃথিবীর সকল বৈজ্ঞানিক মিলে? অনেকে লাফ দিয়ে উঠবেন, কী বলেন হাজার টন পানিও তৈরি সম্ভব! আমি বলছি ভায়া মাত্র একটা ছোট্ট শর্ত, তা হলো কোন অক্সিজেন বা হাইড্রোজেনের সাহায্য নিতে পারবেন না, কেননা সেগুলোও তো পরম প্রভুর তৈরি। একেবারে শূন্য থেকে। দেখা যাক, কত্তো মুরোদ মানুষের!

এই হিসাব শেষ হবে কি কোনদিন?
আমার ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র জ্ঞানের অভিজ্ঞতা বলে সূরা ফাতিহার মূল শিক্ষার সম্ভার আছে এর প্রথম আয়াতের ভিতরই, আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আ’লামিন অর্থাৎ সমস্ত প্রশংসা এই মহাবিশ্বের প্রতিপালকের। আর এই আলহামদুলিল্লাহ বা ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ’র এটিই হলো দুনিয়ার সমগ্র জ্ঞানের সারনির্যাস।
একটি গ্রন্থ আল কুরআন পড়ে যদি কেউ পরম প্রভুর এই প্রশংসার মর্ম বুঝতে পারে সে সফল; ‘উলাইকা হুমুল মুফলিহুন’। আর যদি ১৩ কোটি বই পড়েও কেউ না বুঝে সে হবে একবিংশ শতাব্দীর আবু জেহেলের ক্ষুদ্র চেলা।
সমগ্র আলোচনায় কোনো ভুল হলে গাফুরুর রাহিমের কাছে ক্ষমা চাই। আর আসুন সমগ্র আলোচনার সঠিক যা বিশ্লেষণ ও আবেগ তা উজাড় করে হৃদয়ের গহিন থেকে বলি, আলহামদুলিল্লাহ। সুম্মা আলহামদুুলিল্লাহ।

লেখক : গবেষক, মোটিভেশনাল স্পিকার,
ক্যারিয়ার স্পেশালিস্ট

SHARE

Leave a Reply