সর্বশেষঃ
post

আইন পেশা

মো. গোলাম কিবরিয়া

২২ মে ২০২২

আইন একটি গতিশীল বিষয়। পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকেই আইনের পাঠ ছিল। আদম (আ)কে আল্লাহ বলেছিলেন ঐ গাছের কাছে যাবে না অর্থাৎ একটি লিগাল বাইন্ডিংস দিয়েছিলেন যা না মানার ফলে আল্লাহ সাময়িক পানিশমেন্ট বা সংশোধনের জন্য বা আল্লাহর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আদম (আ) এবং হাওয়া (আ)কে দুনিয়ার দুই জায়গায় প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে তাঁদের ক্ষমা করেন এবং নবুওয়াতের সিলসিলা চালু হয়। নবী ও রাসূলদেরকে আল্লাহ কিতাবের মাধ্যমে পরিচালনা পদ্ধতি বা জীবন ধারণের জন্য নির্দিষ্ট জুরিসপ্রুডেন্স দিয়েছিলেন যার মাধ্যমে তাঁরা মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়ে দিয়েছিলেন। সেই পদ্ধতিটিও আসলে একটি আইন। তাঁদের বংশধর হিসেবে আমরা দুনিয়ার জীবন পরিচালনা করছি কোনো না কোনো আইন অনুসারে। একে কেউ বলি ন্যাচারাল জাস্টিস। আবার কেউ কুরআনের আইন বলি এরকম বিভিন্ন রকম আইনে পৃথিবীর রাষ্ট্রসমূহ পরিচালিত হচ্ছে।

আমরা বুঝতে পারলাম আইন পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকেই ছিল এবং পৃথিবী ধ্বংস বা কিয়ামতের সময় পর্যন্ত কোনো না কোনো আইনে এটি চলমান থাকবে। কিয়ামতের পরও নির্দিষ্ট আইন তো আছেই। উইকিপিডিয়া অনুযায়ী পৃথিবীতে এখন রাষ্ট্র হচ্ছে ২০৬টি। এদের মধ্যে ১৯৩টি জাতিসংঘের সদস্য দেশ এবং ২টি পর্যবেক্ষক দেশ। বাকি ১১টি দেশ জাতিসংঘের সদস্য নয়। যেমন প্যালেস্টাইন এবং ইসরাইলের মধ্যে সার্বভৌমত্ব নিয়ে ঝামেলা রয়েছে এবং উভয়ে উভয়ের দ্বারা স্বীকৃত নয়। এদের মধ্যে প্যালেস্টাইন শুধুমাত্র পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র এবং ইসরাইল জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র। এত কথা বলার পেছনে কারণ হলো, এই যে স্বীকৃত, সদস্য, পর্যবেক্ষক ইত্যাদি সকল কর্মকাণ্ডই আইন দ্বারা সৃষ্ট এবং স্বীকৃত। অর্থাৎ আইন ছাড়া পৃথিবী অচল। আবার বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন ধরনের আইন দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। কোনো দেশ ইসলামী আইনে, কোনো দেশ কনভেনশনাল ল’ তে আবার কোনো দেশ সেনা শাসনে। অন্য কোনো আইন বা নিজস্ব আইন যাই বলি প্রতিটি দেশেই আইন আছেই। আবার ছোট পরিসরে ধরি, যে কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা বা সংগঠন কোনো না কোনো আইনের অধীনে পরিচালিত হয়। একনায়কতন্ত্র যদিও কোনো আইন নয় তথাপি তারাও কোনো কোনো রুলস তৈরি করে নিজের স্বার্থে বা নিজের ইচ্ছেমত। সর্বোপরি একটি কথা বলা যায় আমরা আইনের বাধ্যবাধকতার মধ্যেই সব সময় আছি সেটা জানি বা না জানি। 

আইন পেশা যেমন

আজকের বিষয়টা মূলত আইন পেশা হিসেবে কেমন? আইনকে পেশা হিসেবে আমি নিব কেন? বা এই পেশার ভবিষ্যৎ কী? অনেকেই এই পেশা সম্পর্কে খারাপ বলে, সে ক্ষেত্রে আমি কি করতে পারি? 

উপরের কথাগুলোতেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে আইন ছাড়া সব কিছুই অচল তাই এর গুরুত্বও অপরিসীম। আমাদের দেশের পারসপেক্টিভে আইন জানা ও প্র্যাকটিস করা মোটামুটি সহজ। যদিও আইন পেশাকে এলিট, রয়াল পেশা ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। আসলেই আইন এই রকম একটি সম্মানজনক পেশা, বুদ্ধিমান পেশা কিন্তু এর ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবাই সেই মানের লোক না হওয়ায় এই পেশার বদনাম ছড়িয়ে পড়েছে। একজন আইনজীবী হচ্ছে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ার। সমাজের গঠন, পরিচালনা পদ্ধতিসহ সার্বিক দিকনির্দেশনা আইনজীবীদের দ্বারাই আসা উচিত। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। যদিও একটু খেয়াল করলে সবাই দেখেবেন যে, বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের রাজনীতিতে আইনজ্ঞ বা আইন পেশার লোকজন ওপর মহলে দায়িত্ব পালন করেছে। বললে ভালো হবে যে বড় বড় পদবিধারীরা প্রায় সবাই ছিলেন আইনের ছাত্র। সেদিক থেকে দেখলে আইনজীবীদের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের নজির বেশ সতেজ।

কিভাবে আইন পেশায় যাব 

এবার আসি আইন পেশায় কিভাবে যাওয়া যায়। বাংলাদেশে ল’ ডিপার্টমেন্ট প্রায় সব পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে। এইচএসসি পাস করে ¯œাতক ডিগ্রি হিসেবে চার বছরের জন্য এই কোর্সে ভর্তি হতে হবে। আবার যারা গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেছে তারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন দুই বছরের কোর্স করেও ল’ ডিগ্রি নিতে পারবেন। তবে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার আলোকে এই কোর্স অচিরেই হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। যেমন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইতোমধ্যেই তাদের দুই বছরের কোর্স বন্ধ করে দিয়েছে। যারা আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বড় হচ্ছে তাদের অবশ্যই এই বিষয়গুলো জানতে হবে। অজানা তথ্যের উপর ভিত্তি করে উন্নত ক্যারিয়ার করা যায় না। তাড়াহুড়া বা অন্যের প্ররোচনায় বা না জানার কারণে এমন জায়গায় ভর্তি হয় যে চার বছর পরে ল’ ডিগ্রি নিয়ে যখন বার কাউন্সিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে যায় দেখে যে বার কাউন্সিলের হয় অনুমতি নাই বা কোনো রেসট্রিকশন আছে। তখন না পারে সার্টিফিকেট ফেলে দিতে, না পারে তা কোনো কাজে লাগাতে। জীবনে চলে আসে এক হতাশা যা থেকে মুক্তি পাওয়া অনেক কষ্টের। জীবনের কত স্বপ্ন নিয়ে আইন পেশা শুরুর আগেই ধ্বংস হয়ে যায় অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ তরুণীর। তাই এই বিষয়গুলো লক্ষ রেখে ইউনিভার্সিটি বাছাই করে প্রয়োজনে বড়দের সাথে পরামর্শ করে ভর্তি হতে হবে। 

ল’ শেষ করার পর করণীয় 

সাধারণভাবে প্রায় সব পেশায় গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেই চাকরি বা কোনো কিছুতে এড হতে পারে। কিন্তু আইন পেশা এক্ষেত্রে ভিন্ন। এখানে ল’ ডিগ্রি বা গ্র্যাজুয়েশনের পরই মূলত পরীক্ষা শুরু হয়। কারণ হাজার হাজার স্টুডেন্ট ল’ শেষ করে কিন্তু সবাই আইনজীবী হতে পারে না। আইনজীবী হওয়ার বর্তমান অবস্থা যদি কেউ আগেই বুঝতে না পারে বা আগে থেকেই সেই প্রিপারেশন না নিতে পারে তাহলে তার জন্য এই অবস্থা পার হওয়া বেশ কঠিন। যাই হোক, হতাশ করার জন্য বলছি না বাস্তবতার কারণে এই কথাগুলো বলছি। এবার আসি বার কাউন্সিলের বিষয়ে। বার কাউন্সিল আইনজীবী হওয়ার জন্য পরীক্ষার আয়োজন করে। বছরে একটি করার কথা থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই বছরও লেগে যায়। যার কারণে পরীক্ষার্থীদের সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পায় তেমনি এর প্রতিযোগিতাও বেশি হয়। স্টুডেন্টদের বাড়তি যত্ন ছাড়া পাস করাও কষ্টকর হয়। এখন দেখা যায় ল’ ডিগ্রি নিতে যতনা বেশি পড়া লাগে তার চেয়ে ঢের বেশি সময় ও শ্রম দিতে হয় বার কাউন্সিল পরীক্ষায় পাস করতে। 

প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে তা হলো ল’ ডিগ্রি হওয়ার সাথে সাথেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে দ্রুত বারে ইন্টিমেশন জমা দিতে হবে। একজন সিনিয়র ল’ইয়ার যার প্র্যাকটিসের বয়স (নিম্ন আদালতে) দশ বছর হয়েছে এই রকম একজন সিনিয়রের সাথে জুনিয়রের অ্যাফিডেভিট করে কাগজপত্র জমা দিতে হবে। মনে রাখতে হবে ইন্টিমেশন জমা দেয়ার ন্যূনতম ছয় মাসের জুনিয়রশিপ না হলে বারের পরীক্ষা দেয়া যাবে না। কাগজপত্র জমা দেয়ার ধারাবাহিকতায় পাঁচটি ক্রিমিনাল এবং পাঁচটি সিভিল মামলার লিস্ট জমা দিতে হয় এবং এই মামলাগুলোর কেস ডায়েরি করে ভাইবার সময় সাথে করে নিয়ে যেতে হয়। অনেকেই কেস লিস্ট হারিয়ে ফেলে বা গুরুত্ব দেয় না। পরবর্তীতে ভাইবার সময় পুনরায় সংগ্রহ করার ঝামেলায় পড়তে হয়।

বার কাউন্সিলের পরীক্ষার ধরন

এনরোলমেন্টের জন্য তিন ভাগে পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। ১০০ মার্কের নৈর্ব্যত্তিক, ১০০ মার্কের রিটেন এবং ভাইভা। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী নৈর্ব্যত্তিক পাস করলে পরপর দুইবার রিটেন পরীক্ষা দেয়া যায় এবং রিটেন পাস করলে পরপর তিনবার ভাইভা দেয়ার সুযোগ পায়।

পরীক্ষার সিলেবাস

ল’ ডিগ্রি করার সময় অনেক সাবজেক্ট পড়তে হলেও বার পরীক্ষায় সাতটি বিষয় সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ এই সাতটি বিষয় ভালোভাবে পড়লে বার কাউন্সিল পরীক্ষা বা এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় পাস করা যাবে। সাতটি সবজেক্ট হলো :

১. ফৌজদারি কার্যবিধি বা সিআরপিসি বা কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর।

২. দেওয়ানি বা সিপিসি বা সিভিল প্রসিডিউর।

৩. দণ্ডবিধি বা পেনাল কোড।

৪. সাক্ষ্য আইন বা এভিডেন্স অ্যাক্ট।

৫. তামাদি আইন বা লিমিটেশন অ্যাক্ট।

৬. সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন বা স্পেসিফিক রিলিফ অ্যাক্ট।

৭. বাংলাদেশ লিগ্যাল প্রাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল আদেশ, ১৯৭২।

উপরোক্ত সাবজেক্টগুলো থেকে বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট পরীক্ষা হয়ে থাকে। তবে ভাইভায় প্র্যাকটিসের যেকোনো জায়গা থেকে প্রশ্ন করতে পারে।

আইন একটি এলিট পেশা 

পরীক্ষায় পাস করার পাশাপাশি একজন আইনের স্টুডেন্টকে বিভিন্ন আইন জানা থাকতে হবে। মানুষের প্রায় সকল কিছুই বিভিন্নভাবে আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। হোক সেটা সিভিল ম্যাটার বা ক্রিমিনাল ম্যাটার। নিয়মিত প্র্যাকটিস, ধারাবাহিক অধ্যয়ন এবং কঠোর পরিশ্রমই পারে এই পেশায় সাফল্য আনতে। 

কিভাবে প্র্যাকটিস করা যায়?

অনেকের কাছেই আইনের প্র্যাকটিস সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার নয়। আইনের প্র্যাকটিস বিভিন্নভাবে করা যায়। সরাসরি কোর্টে প্র্যাকটিস করা যায়। এক্ষেত্রে কেউ সিভিল সাইট, কেউ বা ক্রিমিনাল সাইট বা উভয় বিষয়ও একসাথে প্র্যাকটিস করা যায়। আবার অনেকে করপোরেট কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এক্ষেত্রেও অনেক ব্রাইট ক্যারিয়ার করার সুযোগ আছে।

সর্বশেষ বলব যারা আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন লালন করেন বা আইনজীবী হওয়ার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন বা ইতোমধ্যে তার প্রক্রিয়াও শুরু করেছেন তাদের অবশ্যই ধৈর্যশীল, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী, প্রচণ্ড পরিশ্রমী, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকারী হতে হবে। আইনজীবী হইলাম আর কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামাইলাম এইটা ওয়াকালতি না। বুঝে শুনে এই পেশায় আসা উচিত। জুনিয়রশিপ করতে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়। আয় রোজগার কম থাকায় অনেকে আবার পেশা চেঞ্জ করে। এই জন্য প্রচণ্ড ধৈর্যশীল না হলে এখানে টিকে থাকা কষ্ট। সাথে আছে নৈতিকতার বাস্তবতা। এই পেশা সম্পর্কে অনেকেই নেতিবাচক কথা বলে। আসলে সৎ থাকতে চাইলে অবশ্যই এই পেশায় সম্ভব। চাই সঙ্কল্প ও দৃঢ় মনোবল। আর ঈমানের দাবি পূরণ করার চেষ্টা। অনেক কিছু হাতছানি দেবে কিন্তু নৈতিকতার প্রশ্নে আপসহীন হতে হবে। এক সময় না এক সময় সফলতা ধরা দেবেই। 

ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, সমাজ পরিবর্তনের জন্য, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভূমিকা রাখার জন্য, মানুষের উপকারের নিয়ত থাকলে, আর বিনামূল্যে মানুষের সহযোগিতার মাধ্যমে মানুষের দোয়া নিতে চাইলে এই পেশার বিকল্প নাই। আপনি হয়তো জানেন না আপনার ছোট একটা পরামর্শে একজন মানুষের কত বড় উপকার হয়েছে। তার গোপন সাওয়াবের অনেক বড় সুযোগ এই পেশায় রয়েছে। কে কি করল, পেশাকে কে অবহেলা করল বা এর দ্বারা সুযোগ বুঝে অনেক কিছু করে ফেলল এইটা আমার বিষয় নয়। আমাকে ভালো থাকতে হবে। আমাকে আমার পেশার মূল্য দিতে হবে। আমাকে পেশার মাধ্যমে মানুষের উপকার করার পাশাপাশি হালাল রুজি কামাই করতে হবে। সমাজের যে কোন প্রয়োজনে একজন ইঞ্জিনিয়ারের ভূমিকা নিতে হবে। তবেই এই পেশার অন্তর্নিহিত আনন্দ পাওয়া যাবে। মহান পেশায় ভালো মানুষেরা আসুক এই কামনা করি। 

লেখক : অ্যাডভোকেট, ঢাকা জজ কোর্ট

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির