post

ইসলামী রাজনীতির প্রাণপুরুষ অধ্যাপক গোলাম আযম রা হি মা হু ল্লা হ

আরিফুল ইসলাম সোহেল

৩০ আগস্ট ২০২৩

(গত সংখ্যার পর)

স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার অবৈধভাবে দেশের বৃহত্তম ইসলামী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে বেআইনি ঘোষণা করে। ১৯৬৪ সালের ৬ জানুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় অফিস থেকে তৎকালীন আমীরে জামায়াত মাওলানা মওদূদী রাহিমাহুল্লাহর সাথে অধ্যাপক গোলাম আযমও গ্রেফতার হন। লাহোর কারাগারে মাওলানার একান্ত সান্নিধ্যে থেকে নিজেকে ইসলামী আন্দোলনের যোগ্য সিপাহসালার হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ পান তিনি। কারাগারে অবস্থানকালে তিনি ইসলাম, কুরআন, হাদিস, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা, ইসলামী আন্দোলন, দেশের রাজনীতি, আন্দোলনের ভবিষ্যৎ, চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিসহ জামায়াতের সাংগঠনিক বিষয়াদি সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করে মাওলানা মওদূদী রহিমাহুল্লাহর নিকট থেকে জেনে নিতেন। লাহোর কারাগারে অবস্থান কালে অধ্যাপক গোলাম আযম ছিলেন নিয়মিত মুয়াজ্জিন, আর কারা অন্তরালে ইমাম হলেন বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের পুরোধা যুগশ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী রহিমাহুল্লাহ। অতঃপর সময়ের পরিক্রমায় ৬ জানুয়ারি হতে ৫ মার্চ পর্যন্ত পূর্ণ ২ মাস লাহোর জেলে থাকার পর ১৯৬৪ সালের ৬ মার্চ থেকে নিয়ে আগস্টের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বিনা বিচারে দীর্ঘ ৮ মাস কারাভোগের পর হাইকোর্টে রিট আবেদন করে মুক্তি পান।

এখানেই শেষ নয়; এর পরের ইতিহাস আরো নির্মম ও হৃদয়বিদারক। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আদেশ ১৯৭২ (অস্থায়ী বিধানাবলী) অনুযায়ী দেশের সকল নাগরিকের ন্যায় অধ্যাপক গোলাম আযমও জন্মসূত্রে একজন আনুগত্যশীল বৈধ বাংলাদেশের নাগরিক। এর পরেও ১৯৭৩ সালের ২৮ এপ্রিল এক সরকারি আদেশে ৩৮ জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাথে তাকেও বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার অনুপযোগী ঘোষণা করা হয়। আল্লাহর দেয়া অধিকার নাগরিকত্ব হরণ করার মধ্য দিয়ে চলতে থাকে বিরোধী রাজনৈতিক মহলের পক্ষ থেকে তাঁর উপর নানা অপপ্রচার। মূলত বাংলাদেশে শুধু নয়, উপমহাদেশের রাজনীতিতে অবিসংবাদিত নেতা অধ্যাপক গোলাম অযমের ‘নাগরিকত্ব সম্পর্কিত’ মামলাটি ছিল ব্যতিক্রমী ও বহুল আলোচিত একটি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা। এই মামলায় ১৯৯৩ সালের ২৩ মার্চ পবিত্র রমজান মাসে তাঁরই সমর্থনপুষ্ট বিএনপি সরকার তথাকথিত ’৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অবৈধ গণআদালত বসানোসহ তাদের আন্দোলনের মুখে সরকার নতি স্বীকার করে। 

ফলে নাগরিকত্বের প্রশ্নে গভীর রাতে ইসলামী আন্দোলনের অবিসংবাদিত বর্ষীয়ান মজলুম জননেতা অধ্যাপক গোলাম আযমের মগবাজারস্থ নিজ বাসভবনে পুলিশ প্রবেশ করে এবং বর্ষীয়ান এই নেতাকে তাঁর নিজ বাসভবনে নজরবন্দি ও অবরূদ্ধ করে রাখে।

শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা ও পরিবেশের মধ্যে “কেন বাংলাদেশ হতে বহিষ্কার করা হবে না” সরকারের পক্ষ থেকে এ মর্মে নোটিশে কারণ দর্শাতে বলা হয়। আইনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল অধ্যাপক গোলাম আযম সরকারের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যেই দেশের একজন পূর্ণ আনুগত্যশীল নাগরিক হিসেবে নোটিশের জবাব দিয়ে দেন। এই জবাবে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, “তিনি বাংলাদেশের মাটিতেই জন্মগ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব কখনো তিনি পরিত্যাগ করেননি। তাই তাকে নাগরিকত্ব হরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার অথবা তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশ্নই ওঠে না।” তিনি আরো জানান- “যেহেতু আমি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক (বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করিনি) সেহেতু বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর বা দলীয় প্রধান হওয়ার অধিকার আমার আছে।” এহেন অবস্থায়, ১৯৯৩ সালের ২৪ মার্চ দিবাগত রাতে নজরবন্দি থাকা অবস্থায় রাত ১২টায়, বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ; বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাবিদ, বর্ষীয়ান মজলুম জননেতা অধ্যাপক গোলাম আযমকে পবিত্র রমজান মাসে নাগরিকত্বের প্রশ্নে তৎকালীন বিএনপি সরকার গ্রেফতার করে কারাগারে আটক করে। 

গ্রেফতারের মুহূর্তে প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণ

গ্রেফতার করার পর পুলিশ অধ্যাপক গোলাম আযমকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যেতে চাইলে ইসলামী আন্দোলনের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও ছাত্র-জনতা রাস্তায় শুয়ে পড়েন। কোনো অবস্থায়ই পুলিশের গাড়ি সামনে এগোতে পারছিল না। অবস্থা বেগতিক মর্মে কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার, ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে গ্রেফতারকৃত অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবকে অনুরোধ জানান, “স্যার! আপনার আনুগত্যশীল কর্মীদের পথ ছেড়ে দিতে বলুন। একমাত্র আপনার নির্দেশই পারে এই পরিবেশ থেকে আমাদের কর্তব্য পালন করার সুযোগ করে দিতে।” 

শান্ত-সৌম স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে গণমানুষের প্রিয় নেতা অধ্যাপক গোলাম আযম কর্মীদের ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়ে গ্রেফতারকৃত অবস্থায় এক ঐতিহাসিক ভাষণ দান করেন। ভাষণে তিনি বলেন-‘আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, ওয়াস্সলাতু ওয়াস্সালামু আ’লা সাইয়্যিদিল মুরসালিন, ওয়াআলা আলিহি ওয়াআস্হাবিহি আজমায়িন’।

“সংগ্রামী ভাইয়েরা ও দেশবাসী,

আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

মনে রাখবেন এই যে, আমার সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে; ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বের এটাই পাওনা, এটাই নিয়ম এবং এ পথেই নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়। আল্লাহর নবীগণকে যে জুলুম করা হয়েছে, সে তুলনায় এটাতো কিছুই না। ময়দানে আপনাদের কী করতে হবে; সে ব্যাপারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, কর্মপরিষদ এবং মজলিসে শূরা যে ফয়সালা দেবে, সে অনুযায়ী কাজ করবেন। আপনারা মনে রাখবেন, ভাবপ্রবণ হয়ে জোসের চোটে যদি হুঁশ হারিয়ে ফেলেন, তাহলে কোনো কল্যাণ হবে না। অন্যরা যত জুলুম আর অত্যাচারই করুক না কেন, আপনারা প্রতিশোধ নেবেন না, এটা আমাদের রাসূল সা.-এর তরিকা নয়।

কেউ সন্ত্রাস করতে চাইলে আমরা সন্ত্রাস করব না এবং সন্ত্রাস না করেই তাদেরকে পরাজিত করবো। সন্ত্রাসের মোকাবিলা সন্ত্রাস দিয়ে হবে না। সন্ত্রাসের মোকাবিলা ধৈর্য দিয়েই করতে হবে। আমি মনে করি, আল্লাহর কোরআন ও রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী- এই দুই পাথেয় আল্লাহর রাসূল সা. আমাদের জন্য রেখে গেছেন। এই পথের উপরে নির্ভর করে আমরা চলছি। জামায়াতে ইসলামী এর ভিত্তিতেই ফয়সালা করছে। আমার দেশের জনগণকে আগেও বলেছি, জনগণ যদি চায় যে, তাদের সমস্যার সমাধান হোক, তাহলে আমি সাফ বলছি- যারা এ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন, এখনো আছেন, আবার ক্ষমতায় যাবার স্বপ্ন দেখেন, তাদের কাছে এমন কোনো আদর্শ নেই, এমন কোনো কর্মসূচি নেই, মানুষ তৈরির এমন কোনো পদ্ধতি নেই; যার দ্বারা এ দেশের জনগণের সমস্যার সমাধান করতে পারে। এর জন্য রাসূল সা.-এর পদ্ধতিতেই জামায়াতে ইসলামী কাজ করছে।

এ পদ্ধতিতেই এদেশের জনগণের সমস্যার সমাধান হবে বলে আমি বিশ্বাস করি- ইতিহাস এ কথার সাক্ষী, কোরআন একথার সাক্ষী, রাসূল সা.-এর জীবন এ কথার সাক্ষী। সমস্যা সমাধানের জন্য দুটো জিনিস দরকার- একটি হচ্ছে আদর্শ আর অন্যটি হচ্ছে আদর্শবান লোক। আমি শেষ কথা বলছি এই যে, এই দেশের জমিনে ইসলামের শিকড় অত্যন্ত মজবুত। এ দেশের জনগণকে ইসলাম এসে মুক্তি দিয়েছিল। ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রীয় গুটিকতক নেতৃত্বের অধীনে বৈশ্য এবং শূদ্র হিসেবে এ দেশের কোটি কোটি লোক যখন গোলাম হয়েছিল তখন ইসলামের সাম্য-নীতি তাদের মুক্তি দিয়েছিল।

ইসলামের শিকড় এ দেশে এত মজবুত যে, একে উৎখাত করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। এই দেশের স্বাধীনতা ইসলামের দ্বারাই কায়েম হয়েছে; আবার বহালও থাকবে। যারা ইসলামের জন্য জীবন দেবে তারাই জীবন দেবে এ দেশের জন্য। এই দেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি আমাদের জন্য পবিত্র আমানত। আমরা ইসলাম কায়েম করতে চাই এই জমিনেই। যদি জমিন/দেশই পরাধীন হয়ে যায়; তবে ইসলাম কায়েম করবো কোথায়? তাই, ইসলাম কায়েম করার জন্য, এ দেশের জমিনকে স্বাধীন রাখার জন্য আমরা সকলেই বদ্ধপরিকর। বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাস চলছে, আর আমাকে কেন্দ্র করে যে চরম সন্ত্রাস হলো এবং যে সন্ত্রাসকে লালন করে আপনারা গদিতে বসে থাকবেন, সে আশা করবেন না। জামায়াতে ইসলামী বড় আশা করে আপনাদের ক্ষমতায় বসিয়েছিল; কিন্তু আপনারা সেই সহযোগিতার যথার্থ মূল্যায়ন করেননি। সরকার গঠনের জন্য বর্তমান প্রাইম মিনিস্টার যখন জামায়াতে ইসলামীর কাছে সহযোগিতা চাইলেন; তখন কার কাছে এসেছিলেন? বাংলাদেশীর কাছে না পাকিস্তানির কাছে? এই দেশীর কাছে না বিদেশীর কাছে? প্রেসিডেন্ট সাহেব ভোটের জন্য এসেছিলেন এদেশীর কাছে না বিদেশীর কাছে? আপনারা আমাকে বিদেশী যতই বলুন, এদেশেই আমার জন্ম, আল্লাহ্ নিজেই এদেশকে আমার জন্মভূমি হিসেবে বাছাই করে দিয়েছেন। এ বাছাই বদলাবার সাধ্য কারো নেই। আপনারা ধৈর্য ধরবেন। জামায়াতের সিদ্ধান্ত মেনে চলবেন।” বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে উপস্থিত নেতাকর্মীদের চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরছিল। তিনি প্রিয় নেতা কর্মীদের বললেন- “আল্লাহর কাছে গভীর রাতে চোখের পানি ফেলুন! আল্লাহ তায়ালার কাছে এক ফোঁটা পানির অনেক দাম।” এ কথা বলে দীপ্ত পদভারে নিরুদ্বিগ্ন বদনে তিনি হাসতে হাসতে গ্রেফতার হয়ে পুলিশের গাড়িতে গিয়ে উঠলেন। হাত তুলে বিদায়ী সালাম দিয়ে বললেন, “এবার আমি বিদায় সালাম দেই- আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। ফি-আমানিল্লাহ।”

নাগরিকত্ব মামলার ঐতিহাসিক রায় 

বিদেশী নাগরিক হিসেবে গণ্য করে দেশে অবৈধ অবস্থানকারী হিসেবে গ্রেফতারের বিরুদ্ধে ২৯ মার্চ ১৯৯৩ সালে তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহিল-মোমেন-আযমী তাঁর পিতা অধ্যাপক গোলাম আযমের পক্ষে আটকাদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। পরপর দুটি ডিভিশন বেঞ্চের দু’জন বিচারপতি মামলার শুনানি গ্রহণে বিব্রত বোধ করলে প্রধান বিচারপতি রিট আবেদনটি বিচারপতি ইসমাইল উদ্দিন সরকার ও বিচারপতি বদরুল ইসলাম চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে প্রেরণ করেন। ৩০ মার্চ ’৯৩ এই ডিভিশন বেঞ্চ রিটটি শুনানির জন্য গ্রহণ করে সরকারের প্রতি রুলনিশি জারি করেন। রুলে অধ্যাপক গোলাম আযমের আটকাদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তার কারণ সরকারের প্রতি তিন সপ্তাহের মধ্যে দর্শানোর আদেশ জারি করা হয়। মাননীয় আদালত এ আবেদনটি শুনানির জন্য গ্রহণ করে সরকারের উপর রুল জারি করেন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আদেশ চ্যালেঞ্জ করে আরো একটি আবেদন ২২ এপ্রিল একই আদালতে পেশ করা হয়। ডিভিশন বেঞ্চ প্রথমে নাগরিকত্ব সম্পর্কিত আবেদনের শুনানির সিদ্ধান্ত নেন। ২৭ এপ্রিল এই রিট মামলায় চূড়ান্ত রায় হয়। এই রায়ের পর আটকাদেশ সংক্রান্ত এই রিটটির বিচারপতি মোঃ আব্দুল জলিল ও বিচারপতি মোঃ রুহুল আমীন সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ গঠন করে ২১ জুন রিটের শুনানির দিন ধার্য করা হয়। ধার্য তারিখে শুনানির পক্ষ-বিপক্ষ যুক্তি তর্কের পর বিচারপতি ইসমাইল উদ্দিন সরকার তার রায়ে রিট আবেদনটি খারিজ করে বলেন, “অধ্যাপক গোলাম আযম বাংলাদেশের নাগরিক নন।” অপর দিকে বিচারপতি বদরুল ইসলাম চৌধুরীর রিট আবেদনটি গ্রহণ করে বলেন, “অধ্যাপক গোলাম আযম জন্মগতভাবে বাংলাদেশের নাগরিক।”

ডিভিশন বেঞ্চে এই বিভক্তি রায়ের পর হাইকোর্টের সিনিয়র বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরীকে নিয়ে একটি একক বেঞ্চে এই মামলার শুনানি শুরু হয়। ১৯৯৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি হতে এই শুনানি শুরু হয় এবং দীর্ঘ ১৭টি দিবস একটানা শুনানি চলে। শুনানি শেষে বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরী ১৯৯৩ সালের ২১ এপ্রিল এই মর্মে এক ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন, “অধ্যাপক গোলাম আযম জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক এবং ১৯৭৩ সালের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত সরকারি নোটিশটি অবৈধ।” এ দিকে অধ্যাপক গোলাম আযমকে বিদেশী আইনের অধীন প্রদত্ত আটকাদেশকে চ্যালেঞ্জ করে দায়েরকৃত রিট পিটিশনটির শুনানিও অনুষ্ঠিত হয়। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের মাননীয় বিচারপতি মোহাম্মাদ আব্দুল জলিল ও রুহুল আমীনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে দীর্ঘদিন শুনানির পর ১৯৯৩ সালের ২২ জুন, আদালত সরকারের ২৪ মার্চ ১৯৯৩ এর আটকাদেশ বেআইনি ঘোষণা করে অধ্যাপক গোলাম আযমকে মুক্তি দানের নির্দেশ প্রদান করেন। দীর্ঘ ১৬ মাস অন্যায় এবং অবৈধভাবে কারাভোগের পর ১৯৯৩ সালের ১৫ জুলাই, সন্ধ্যা ৭টার দিকে জনতার অবিসংবাদিত বর্ষীয়ান মজলুম জননেতা অধ্যাপক গোলাম আযম কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।

দেশের সন্তান তার জন্মগত আল্লাহ প্রদত্ত অধিকার তথাকথিত শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির মুখে চুনকালি দিয়ে নাগরিকত্ব নিয়ে বিজয়ী বেশে জনতার মাঝে ফিরে আসেন। অযুত জনতার গগনবিদারী স্লোগান ও পুষ্পবৃষ্টির মাঝে অধ্যাপক গোলাম আযম জেল থেকে বেরিয়ে পা রাখেন স্বাধীন দেশের মুক্ত জমিনে; দেশের ধন্য সন্তান ও নাগরিক বেশে। 

নির্বাসিত জীবনযাপন

অধ্যাপক গোলাম আযম শুধু কারা অন্তরালেই বন্দী জীবন যাপন করেননি। শুধুমাত্র ইসলামী আন্দোলন করার অপরাধে স্ত্রী-পুত্র ও পরিবার ছেড়ে জন্মভূমির বাইরে ভিনদেশে দীর্ঘদিন নির্বাসিত জীবনযাপন করতে হয়েছে তাকে। নির্বাসিত জীবনযাপনেও ঈমানের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। তার জন্ম, শৈশব, কৈশোর, শিক্ষা ও কর্মময় জীবনসহ রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্ম সবই বাংলাদেশে। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর জামায়াতের কেন্দ্রীয় আমেলার (নির্বাহী পরিষদ) বৈঠকে যোগদানের জন্য লাহোরে যান। লাহোরের কর্মসূচি ও সফর শেষ করে ৩ ডিসেম্বর তিনি বিমানযোগে ঢাকা অভিমুখে রওনা করেন। ঐ দিন পাকিস্তান বাংলাদেশের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তাকে বহনকারী বিমান ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারেনি। ফলে তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও যুদ্ধ চলাকালীন পরিস্থিতির মধ্যে তিনি লন্ডনে ফিরে যেতে এবং অবস্থান করতে বাধ্য হন। এ পরিস্থিতিতে সরকার তার নাগরিকত্ব হরণ করে। ১৯৭২ সাল থেকে নিয়ে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৭ বছরকাল সরকার কর্তৃক নাগরিকত্ব হরণের কারণে লন্ডনে নির্বাসিত মানবেতর জীবনযাপন করেন। ১৯৭৮ সালে লন্ডন হতে নিজ দেশে ফিরে এসে পরিবার-পরিজনসহ স্থায়ীভাবে ঢাকাতে নিজ বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। স্বাধীন দেশের একজন আনুগত্যশীল নাগরিক হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তাঁর পাকিস্তানি পাসপোর্ট জমা দেন এবং বাংলাদেশের আনুগত্যের হলফনামাও পেশ করেন। তবুও ফিরে পাননি আল্লাহ প্রদত্ত তাঁর জন্মগত অধিকার- নাগরিকত্ব, যা ছিল একজন দেশপ্রেমিক, সচেতন সুনাগরিকের ওপর স্বাধীন দেশের সরকার কর্তৃক মৌলিক মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ও নির্মম জুলুম। দেশ ও ইসলামের জন্য তাঁর ত্যাগ-কুরবানি, জেল-জুলুম, নাগরিকত্ব হরণসহ নির্বাসিত জীবনযাপনের জন্য মানুষের কাছে তিনি মজলুম এক জননেতা।

রাজনৈতিক অধিকার হরণ

জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা ও দেশের রাজনৈতিক অধিকার প্রত্যেকটি নাগরিকের সহজাত প্রবৃত্তি। এ ভালোবাসা সামান্যতম ঘাটতি ছিল না অধ্যাপক গোলাম আযমের হৃদয়ে। দেশকে তিনি তাঁর সমস্ত সত্তা উজাড় করে দিয়ে ভালোবাসতেন। তাঁর সে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ পাওয়া যায় তারই লেখা- ‘আমার দেশ বাংলাদেশ’ ও ‘পলাশী থেকে বাংলাদেশ’ নামক বইগুলো থেকে। তাঁর জীবনের সকল বক্তৃতা ও লেখায় সুস্পষ্ট হয়ে উঠে এসেছে- দেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসার গভীরতা। যেমন, তাঁর লেখা ও বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, “এদেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি আমাদের জন্য পবিত্র আমানত। যদি দেশই পরাধীন হয়ে যায়, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড না থাকে; তবে ইসলাম কায়েম করব কোথায়?” তবুও সরকার ও কায়েমি স্বার্থবাদী ইসলামবিরোধী শক্তি তাঁর উপরে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে দেশ ও স্বাধীনতাবিরোধী বলে জাতির সামনে হেয়প্রতিপন্ন করার গভীর ষড়যন্ত্র করেছে। বিরোধীরা বরাবরই চেয়েছে তাঁর নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক অধিকার হরণ করতে। ১৯৬২ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় ও প্রাদেশিক আইন সভায় নির্বাচনের পর সে সময়কার সরকারও তাঁর উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। স্বাধীন দেশে সকল সরকার বরাবরই তার চলার পথে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এসেছে। পাসপোর্ট দিয়ে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে চাইলেও সরকার তাঁকে বাধা দেয়। বরাবরই চলেছে তাঁর উপর সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি। তবুও তিনি সব সময় নিজেকে আল্লাহর পথে একজন নিবেদিতপ্রাণ মনে করে ঈমানী পরীক্ষা হিসেবে সব নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক অধিকার হরণসহ নাগরিকত্বের পথে বাধা ও জেল-জুলুম নীরবে মেনে নিয়েছিলেন শুধুমাত্র আল্লাহর দ্বীন ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। (চলবে) 

লেখক : প্রাবন্ধিক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির