সর্বশেষঃ
post

উম্মু আম্মারা নুসাইবা বিনতু কা’ব ড. ইউসুফ আল কারযাভী ॥

অনুবাদ : সালমান খাঁ

২৯ জুলাই ২০২২

উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন, আমি শুনেছি আল্লাহর রাসূল সা. উম্মু আম্মারার ব্যাপারে বলেছেন- “উহুদ যুদ্ধের দিন আমি ডানে, বামে যেদিকেই তাকিয়েছি, সেদিকেই উম্মু আম্মারাকে যুদ্ধ করতে দেখেছি।” (আশ শাওকানি, দাররুস সাহাবা-৪৮১)

পরিবার

তাঁর আসল নাম নুসাইবা বিনতু কা’ব ইবনু আমর। তিনি ছিলেন একজন আনসারি সাহাবা। জন্মেছেন খাযরাজ গোত্রের বনু নাজ্জার শাখায়। তাঁর উপনাম ছিল উম্মু আম্মারা। তাঁর এক ভাই আব্দুল্লাহ ইবনু কা’ব, অংশগ্রহণ করেছেন বরকতময় বদর যুদ্ধে। আরেক ভাই আবু লাইলা আব্দুর রহমান ইবনু কা’ব, ছিলেন প্রচণ্ড আল্লাহভীরু এক মুহসিন ব্যক্তি। সর্বদা আল্লাহর ভয়ে কাঁদতেন। তিনি বিয়ে করেন ইয়াযিদ ইবনু আসিমকে। এই ঘর থেকে তাঁর গর্ভে জন্ম নেয় হাবিব ও আব্দুল্লাহ। তারা দুজনেই ছিলেন একনিষ্ঠ ঈমানদার ও আল্লাহর রাস্তার সংগ্রামী মুজাহিদ। তারপর তাঁর বিয়ে হয় গাযিয়্যা ইবনু আমর রা. এর সাথে। এই ঘরে জন্ম হয় তামিম ও খাওয়ালার।

ইসলাম গ্রহণ

আল্লাহ তায়ালা চাইলেন ইসলামের স্বতন্ত্র একটি ভূখণ্ড হবে, যেখানে ইসলাম নামক বৃক্ষটি বেড়ে উঠবে স্বাধীনভাবে। তিনি চাইলেন ইসলাম শিকড় গাড়বে এমন একটি ভূখণ্ডে, যেখানে প্রতিষ্ঠিত হবে তার রাষ্ট্র। এই ইলাহি ইচ্ছা বাস্তবায়নে মদিনার (তৎকালীন ইয়াসরিবের) একদল লোক ছুটে আসলেন মক্কায়। মওসুম তখন হজের। তারা এসেছেন মূলত হজ করতে। এ সময় তাদের সাক্ষাৎ হয় নবীজি সা. এর সাথে। তারা ইসলাম গ্রহণ করলেন নবীজির হাতে। তারপর ফিরে যান নিজ এলাকা মদিনায়। সেখানে তারা দাওয়াত দিতে থাকেন ইসলামের, যে মহান দ্বীনের পতাকাতলে শামিল হয়েছেন তারা। দ্রুতই ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে মদিনায়। প্রতি বছরই তাদের কিছু লোক মক্কায় আসতেন। নবীজির সাথে দেখা করতেন আকাবায়। নবীজি সা. তাদের উপদেশ দিতেন আর তারা বাইয়াত করতেন নবীজির হাতে। এমনিভাবে তৃতীয় বছর তারা আবার মক্কায় আসলেন (হজ করতে)। নবীজিকে তারা কথা দিলেন আইয়ামুত তাশরিকের কোনো একদিনে তারা হাজির হবেন তাঁর কাছে। এ সময় তারা ছিলেন ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন নারী; অর্থাৎ মোট ৭৫ জন। তারা নবীজির কাছে এসে বাইয়াত করলেন, নিজেদের স্ত্রী ও সন্তানদের যেভাবে রক্ষা করেন, সেভাবেই রক্ষা করবেন নবীজিকে। এই বাইয়াতে যে দুইজন নারী উপস্থিত ছিলেন তাদের একজন হচ্ছেন উম্মু আম্মারা, আরেকজন উম্মু মানি আসমা বিনতু আমর।

ওয়াকিদি বর্ণনা করেছেন, উম্মু আম্মারা বলেছেন- নবীজির হাত ধরে ছিলেন আব্বাস রা.। সব পুরুষ নবীজির হাতে হাত রেখে বাইয়াত করল। বাকি রইলাম কেবল আমি আর উম্মু মানি। আমার স্বামী গাযিয়্যাহ ইবনু আমর আমাদেরকে রাসূলুল্লাহর কাছে নিয়ে গেলেন। বললেন- “ইয়া রাসূলুল্লাহ, এই দুইজন মহিলাও আমাদের সাথে এসেছে। তারাও আপনার কাছে বাইয়াত করতে চায়।” নবীজি সা. বললেন- “যে শর্তের ওপর তোমাদের বাইয়াত গ্রহণ করেছি, একই শর্তের ওপর তাদেরও বাইয়াত গ্রহণ করছি। তবে, আমি মহিলাদের সাথে হাত মিলাই না।” 

এভাবেই ইসলাম গ্রহণ করেন উম্মু আম্মারা। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন একেবারে প্রথম সারির সাহাবিদের সাথে। স্বামী বা পরিবারের অনুকরণে কোনো কিছু না বুঝে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। বুঝে শুনেই তিনি কবুল করেছেন ইসলাম। তার ইসলাম ছিল কলব, আকল ও স্বাধীন বোধবুদ্ধির ইসলাম। তাই, ইসলাম কবুল করার পর তিনি নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন সেই দ্বীনের খাতিরে, যার ওপর ঈমান এনেছিলেন তিনি। আজীবন এই দ্বীনের কল্যাণেই কাজ করে গেছেন। লড়ে গেছেন এই দ্বীনের পথেই ঘর-বাড়ি, মসজিদ, ময়দান সবখানে।

উম্মু আম্মারা ছিলেন কঠিন হিম্মতের অধিকারী এক নারী। তিনি সবসময় চাইতেন, মুসলিম পুরুষের পাশাপাশি মুসলিম নারীরও স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি হোক। তিনি দেখলেন, কুরআন সবসময় পুরুষদের সম্বোধন করে কথা বলে আর এই সম্বোধনের আওতায় পরোক্ষভাবে শামিল থাকে নারীরা। তার মনে প্রশ্ন জাগে এটা নিয়ে। হাজির হন নবীজির কাছে। প্রশ্ন করেন- “ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি তো দেখছি সবকিছু পুরুষদের জন্যই। কোথাও কোনো ব্যাপারেই আমাদের নারীদের কোনো উল্লেখ করা হচ্ছে না।” 

স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর এই প্রশ্নের জবাব দিলেন। আসমানের আমিন জিবরাঈল আ. চলে আসলেন জমিনের আমিন মুহাম্মাদ সা. এর কাছে। নিয়ে আসলেন কুরআনি ওহি, যাতে উল্লেখ করা হচ্ছে নারীকে; পুরুষের আওতায় নয়, বরং তার পাশাপাশি। আল্লাহ তায়ালা বলছেন- “নিশ্চয়ই আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) পুরুষ ও আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) নারী, ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোজা পালনকারী পুরুষ ও রোজা পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী (সংযমী) পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী (সংযমী) নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী নারী, এদের জন্য আল্লাহ রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান।” (সূরা আহযাব : ৩৫)

জিহাদের ময়দানে

এক আরব কবি বলেছেন-

“মারামারি, যুদ্ধ-জিহাদ হচ্ছে আমাদের কাজ,

আর নারীদের কাজ হচ্ছে আঁচল টানা।”

অন্য এক কবি বলেছেন-

“আমাদের পুরুষদের সৃষ্টি করা হয়েছে বীরত্ব ও কষ্ট সহিষ্ণুতার তরে,

নারীরা সৃষ্টি হয়েছে কান্না ও মাতম করতে।”

উম্মু আম্মারা কবিদের ধারণা বাতিল করলেন, অসার প্রমাণ করলেন তাদের চিন্তা-চেতনা। বিজয়ে নারীর ভূমিকা হবে কেবল আঁচল ধরে বসে থাকা আর পরাজয়ে কেবল কান্না ও মাতম করা, এ কথা মানতে পারলেন না তিনি। তিনি চাইলেন, বিজয়ের সংগ্রাম ও লড়াইয়ে এবং পরাজয়ের লাঞ্ছনা ও কষ্টে নারীরাও শামিল হবে। 

এ কারণেই তিনি রাসূল সা. এর সাথে প্রায় সকল যুদ্ধেই শামিল হয়েছেন। সহযোগিতা করেছেন মুজাহিদদের, উৎসাহ জুগিয়েছেন যুদ্ধাদের, দৃঢ়পদে লড়াই করার সাহস দিয়েছেন দ্বিধান্বিতদের, সেবা-শুশ্রƒষা করেছেন আহতদের এবং পানি পান করিয়েছেন তৃষ্ণার্তদের। এছাড়াও, যখন প্রয়োজন দেখা দিয়েছে কিংবা যুদ্ধ কঠিন আকার ধারণ করেছে, তখন তিনি অস্ত্র হাতে লড়াইয়েও নেমে পড়েছেন। যুদ্ধের ময়দানে তিনি লড়াই করেছেন বীরদের মতো, অটল থেকেছেন পাহাড়ের মতো। উহুদ যুদ্ধে তিনি তাঁর স্বামী এবং দুই সন্তানসহ অংশগ্রহণ করেন। তিনি গিয়েছিলেন মূলত একটি মশক নিয়ে মুজাহিদদের পানি পান করাতে। তিনি দেখেছেন, যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে মুসলিমরা বিজয়ী হয়। কিন্তু, এরপরই তাদের এক দলের ওপর জেঁকে বসে মানবিক দুর্বলতা। তারা আকৃষ্ট হয় গনিমতের মালের প্রতি, কামনা করে দুনিয়া আর ছেড়ে দেয় ওই স্থান, যেখানে তাদের থাকতে বলেছিলেন আল্লাহর রাসূল সা.। ফলে, যুদ্ধের অবস্থা পাল্টে যায়। সুযোগ বুঝে খালিদ বিন ওয়ালিদ মুসলমানদের আক্রমণ করেন পিছন দিক থেকে। তার আক্রমণে মুসলমানদের সুসজ্জিত রণব্যূহ ভেঙে পড়ে, বিচ্ছিন্ন হয়ে ছোটাছুটি করতে শুরু করে মুজাহিদরা। কিন্তু, আকস্মিক এই কঠিন ও নাজুক পরিস্থিতিতেও উম্মু আম্মারা হতবিহ্বল হননি, পালিয়ে যেতে ছোটাছুটি করেননি এবং ভয় পেয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি বা কান্নাকাটিও করেননি। বরং তিনি অস্ত্র হাতে নিয়ে লড়াইয়ে যোগ দিয়েছেন, বীরত্বের নতুন এক উপমা সৃষ্টি করেছেন। তিনি কাপড়কে শরীরের সাথে পেঁচিয়ে নেন। প্রতিরোধব্যূহের মতো সামনে দাঁড়ান রাসূলুল্লাহর। মোকাবিলা করতে থাকেন রাসূলুল্লাহর দিকে ধেয়ে আসা তীর, তরবারির। রাসূল সা. এর দিকে ধেয়ে আসা আক্রমণগুলো তিনি এমনভাবে মোকাবেলা করছিলেন, যেন তিনি এক শক্তিশালী ঢাল; রাসূলকে রক্ষা করাই যার কাজ। উম্মু আম্মারার শরীরে তীর ও তরবারি আঘাতে সৃষ্টি হয় ১২টি জখম। 

হঠাৎ করে তিনি দেখলেন, ইবনু কামিয়া (আল্লাহর লানত তার ওপর) এগিয়ে আসছে। ইবনু কামিয়া ছিল ওই সকল কাফিরদের অন্যতম একজন, যারা রাসূলুল্লাহ সা. এর দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং তাঁর বিরোধিতায় সীমালঙ্ঘন করেছিল। ইবনু কামিয়া উম্মু আম্মারাকে আঘাত করেন। আঘাতটি লাগে তাঁর কাঁধে। গুরুতর আহত হন উম্মু আম্মারা। পাল্টা আঘাত করেন তিনি ইবনু কামিয়াকে। কিন্তু তার সারা দেহ বর্মাচ্ছাদিত থাকায় সে বেঁচে যায়। 

একবার উম্মু সাঈদ বিনতুর রাবি উম্মু আম্মারার কাছে আসেন। উম্মু সাঈদ বললেন- “উহুদ যুদ্ধের ঘটনা আমাকে একটু বলেন তো।” উম্মু আম্মারা বলতে লাগলেন- “প্রত্যুষেই আমি বেরিয়ে পড়ি যুদ্ধের উদ্দেশ্যে। আমার সাথে ছিল একটি মশক, তাতে ছিল পানি। আমি রাসূলুল্লাহ সা. এর কাছে পৌঁছে গেলাম। তিনি ছিলেন সাহাবিদের মাঝে। যুদ্ধের অবস্থা তখন ভালো, মুসলমানদের পক্ষে। কিন্তু আকস্মিক আক্রমণে মুসলমানরা যখন হঠাৎ বিছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন আমি দৌড়ে রাসূলুল্লাহর কাছে চলে আসি এবং অস্ত্র হাতে যুদ্ধ শুরু করি। তীর ও তরবারির সাহায্যে রক্ষা করতে থাকি তাঁকে। যুদ্ধ করতে করতে আমিও আঘাতপ্রাপ্ত হই।”

উম্মু আম্মারার এই সাহসিকতার কারণেই আল্লাহর রাসূল সা. তাঁর প্রশংসা করেছেন এবং তাঁর মর্যাদা বয়ান করেছেন। রাসূল সা. বলেন- “আজ (উহুদ যুদ্ধের দিন) নুসাইবা বিনতু কা’বের ভূমিকা অমুক অমুকের চেয়ে অনেক বেশি। (কেননা) আমি ডানে, বামে যেদিকেই তাকিয়েছি আজ, সেদিকেই উম্মু আম্মারাকে যুদ্ধ করতে দেখেছি।” 

রাসূল সা. নুসাইবা বিনতু কা’বের ছেলে আব্দুল্লাহকে উদ্দেশ করে বলেন- “আল্লাহ তায়ালা তোমাদের পরিবারের ওপর বরকত নাজিল করুক। তোমার মায়ের মর্যাদা অমুক অমুকের চেয়ে অনেক বেশি। তোমার বাবার মর্যাদা অমুক অমুকের চেয়ে অনেক বেশি। তোমার মর্যাদা অমুক অমুকের চেয়ে অনেক বেশি। আল্লাহ তায়ালা তোমাদের পরিবারের ওপর রহম করুক।”

উহুদ যুদ্ধের দিন উম্মু আম্মারা রা. রাসূলুল্লাহ সা.কে বলেছিলেন- “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, জান্নাতে যেন আমরা আপনার সাথী হতে পারি।” রাসূলুল্লাহ সা. তাদের জন্য দোয়া করলেন- “ইয়া আল্লাহ, আপনি তাদেরকে জান্নাতে আমার সাথী হিসেবে কবুল করেন।” নবীজির দোয়া শুনে উম্মু আম্মারা বলেন- “এখন আর আমি কোনো কিছুরই পরোয়া করি না, দুনিয়ার যত কঠিন বিপদই আসুক না কেন।” 

হুদাইবিয়ার সফর। মুসলমানদের কাছে খবর পৌঁছালো, উসমান রা.কে কুরাইশরা হত্যা করেছে। খবর শুনে নবীজি সাহাবিদের মাঝে দাঁড়িয়ে গেলেন। ঘোষণা করলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আমাকে আদেশ করেছেন তোমাদের বাইয়াত নিতে।’ ঘোষণা শুনে দলে দলে সাহাবিরা আসতে লাগলো বাইয়াত করতে। আশপাশে যা কিছু ছিল, সবকিছু মাড়িয়ে দ্রুতবেগে তারা পৌঁছাতে লাগলো নবীজির কাছে। বাইয়াতের পর তারা রণসাজে সজ্জিত হলো। হাতে তুলে নিলো তরবারি। কিন্তু, মুসলমানদের কাছে ওই দিন পর্যাপ্ত পরিমাণে তরবারি ছিল না। তাই, উম্মু আম্মারা রা. দাঁড়ালেন। তিনি একটি খুঁটি বা লাঠি হাতে তুলে নিলেন, যার ছায়ায় তিনি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। খুঁটি দিয়ে তৈরি করলেন একটি তরবারি। তারপর, এর মাঝ বরাবর বেঁধে নিলেন একটি ছুরি।

হুনাইন যুদ্ধে আকস্মিক আক্রমণের ফলে মুসলমানরা যখন কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে, তখন আমরা দেখতে পাই বীরত্বের এক অনুপম দৃশ্য। দুই আনসার নারীর বীরত্ব। তাদের একজন উম্মু সুলাইম বিনতু মিলহান রা.। যিনি যুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন গর্ভবতী অবস্থায়। তার পেটে ছিল অনাগত পুত্র আব্দুল্লাহ। আর, হাতে ছিল খঞ্জর। আরেকজন হচ্ছেন উম্মু আম্মারা রা.। যুদ্ধের ময়দানে মুসলমানদের হতবিহ্বল অবস্থা, ছোটাছুটি ও পশ্চাৎপসরণ দেখে তিনি তাঁর কওম আনসারদের লক্ষ্য করে চিৎকার করতে থাকেন- “হে আনসাররা, এটা কোন ধরনের আচরণ? কোন ধরনের রীতিনীতি? তোমরা পালাচ্ছো কেন?” তারপর তিনি নিজেই যুদ্ধ শুরু করে দেন। ঝাঁপিয়ে পড়েন এক হাওয়াযিন ব্যক্তির ওপর। মুহুর্মুহু আক্রমণে তাকে করে ফেলেন ধরাশায়ী। মেরে ফেলেন তাঁকে। ছিনিয়ে নেন তার তরবারি।

ইয়ামামায় 

উম্মু আম্মারা রা. নবীজির জীবদ্দশায় সংঘটিত হওয়া প্রায় সবকটি যুদ্ধেই শামিল হয়েছেন। লড়াই করেছেন স্বামী ও সন্তানদের পাশে থেকে। তারপর, নবীজি সা. ইনতিকাল করলেন। মিলিত হলেন তাঁর পরম বন্ধু (রফিকে আ’লা) আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সাথে। নবীজির জীবদ্দশায় উম্মু আম্মারা যতগুলো জিহাদে শামিল হয়েছেন, সেগুলোই মাবুদের সামনে দাঁড়াতে তাঁর পুঁজি হিসেবে যথেষ্ট হতো। কিন্তু জিহাদ যত কঠিনই হোক না কেন, যত কষ্টকরই হোক না কেন; এর আলাদা একটি স্বাদ আছে, মিষ্টতা আছে। এই স্বাদ ও মিষ্টতা কেবল তারাই অনুভব করতে পারে, যারা শামিল হয়েছে জিহাদে এবং পান করেছে এর অমিয় সুধা। জিহাদের সময় যারা অলসতা প্রদর্শন করে কিংবা গাফিলতির কারণে ঘরে বসে থাকে, তারা কখনোই এই স্বাদ ও মিষ্টতা অনুভব করতে পারবে না।

উম্মু আম্মারা রা. জিহাদের এই স্বাদ ও মিষ্টতা অনুভব করেছিলেন। তাই তো, আবু বকর সিদ্দিক রা. এর জমানায় যখন মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক আসলো, তিনি তাতে শামিল না হয়ে থাকতে পারলেন না। অংশগ্রহণ করলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-এর নেতৃত্বে ইয়ামামার যুদ্ধে। এ যুদ্ধ ছিলো বড়ই ভয়াবহ এক যুদ্ধ। একদিকে মুসলমানরা, অপরদিকে ভণ্ড নবী মুসাইলামাতুল কাজ্জাব ও তার পথভ্রষ্ট গোঁড়া অনুসারীরা। উম্মু আম্মারা শপথ করলেন, মুসাইলামাতুল কাজ্জাবকে খতম না করে তিনি মারা যাবেন না। কেনই-বা তিনি এমন শপথ করবেন না? এই মুসাইলামাই তো তাঁর ছেলে হাবিবকে হত্যা করেছে, নবীজি সা. যাকে পাঠিয়েছিলেন দূত হিসেবে। মুসাইলামা হাবিবকে জিজ্ঞাসা করেছিল- “তুমি কি সাক্ষ্য দাও, মুহাম্মাদ সা. আল্লাহর রাসূল?” হাবিব দৃঢ়কণ্ঠে জবাব দেন- “হ্যাঁ। অবশ্যই এই সাক্ষ্য দেই।” মুসাইলামা তারপর জিজ্ঞাসা করে- “তুমি কি সাক্ষ্য দাও, আমি (মুসাইলামা) আল্লাহর রাসূল?” হাবিব জবাব দেন- “আমি তোমার কথা শুনতে পাচ্ছি না। তোমার কোনো কথাই আমার কানে ঢুকছে না।” মুসাইলামা পুনরায় একই প্রশ্ন করে। একই জবাব দেন হাবিব। এতে ক্ষেপে যায় কাজ্জাব মুসাইলামা। হত্যা করে হাবিবকে। কেটে টুকরো টুকরো করে তার দেহ। অথচ হাবিব ছিলেন দূত, বার্তাবাহক। তৎকালীন সুপ্রতিষ্ঠিত আইন বলছে, দূত বা বার্তাবাহককে কোনোভাবেই বন্দি করা যাবে না; হত্যা তো করা যাবেই না। তাই স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধের ময়দানে উম্মু আম্মারা ধারণ করেন এক কঠিন রূপ। কেননা, তাঁকে পীড়িত করছিল সন্তানহারা এক মায়ের অনুভূতি, শক্তি জোগাচ্ছিল এক ঈমানদার নারীর আল্লাহবিশ্বাস। তাঁর পাশেই যুদ্ধ করছিল তাঁর আরেক ছেলে আব্দুল্লাহ। যার হৃদয়ে জ¦লছিল ঈমানি নূর। তার তীর-ধনুককে শাণ দিচ্ছিল ভাই হত্যার প্রতিশোধ আগুন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছা বাস্তবায়িত হলো। আব্দুল্লাহর তরবারি আর ওহশির বর্শা আঘাত হানলো মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের ওপর। ওহশি মুসাইলামাকে লক্ষ্য করে ছুড়ে বর্শা; বর্শা ছুড়াই যে তার প্রধান দক্ষতা। আব্দুল্লাহ হানে তরবারির আঘাত। আব্দুল্লাহ তো যুদ্ধের কোলে বেড়ে ওঠা জিহাদপুত্র। তাদের সমন্বিত আঘাতে লুটিয়ে পড়ে মুসাইলামা। মারা যায় এই নরাধম আর তার অনিষ্টতা থেকে শান্তি পায় দুনিয়া।

ইয়ামামার যুদ্ধেও সাহসের সাথে লড়াই করেন উম্মু আম্মারা রা.। যুদ্ধে কাটা পড়ে তাঁর এক হাত। পূর্ববর্তী আঘাতের সাথে শরীরে যুক্ত হয় আরও দশের অধিক নতুন আঘাত। তাঁর শরীরে রয়ে যাওয়া এই আঘাতগুলো ঘোষণা করতে থাকে উম্মু আম্মারার মর্যাদা; আরও ব্যাপক অর্থে বলতে গেলে সকল মুসলিম নারীদের মর্যাদা। এই মর্যাদা তো দুনিয়ার। আর, কিয়ামতের দিন এই আঘাতগুলো সাক্ষী হবে ইলাহি দরবারি, কথা বলবে উম্মু আম্মারার পক্ষে। কিয়ামতের দিন তিনি যখন উঠবেন, আর আঘাতগুলো থেকে রক্ত ঝরতে থাকবে। রক্তের রং হবে সাধারণ রক্তের মতোই; তবে তাতে সুগন্ধ হবে মিসকের। 

লেখক : আন্তর্জাতিক ইসলামিক স্কলার

অনুবাদক : শিক্ষার্থী, ঢাবি

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির