post

নবীজির সিরাত ও আমাদের জীবন

মুফতি মুহাম্মদ তকী উসমানী

২২ আগস্ট ২০২৩

নবীজির আগমনের হেতু এবং সিরাত উদযাপনের বর্তমান চিত্র

রাসূলে আকরামের সা. এই দুনিয়ায় পদার্পণ মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ঘটনা। এর চেয়ে মহান, এর চেয়ে খুশির এবং এর চেয়ে পবিত্র কোনো ঘটনা এই জমিনে আর কখনো সংঘটিত হয়নি। কোনো মুসলমানেরই এ কথায় দ্বিমত করার অবকাশ নেই। তাঁর আগমনের মধ্য দিয়ে মানব সভ্যতা অর্জন করেছে জ্যোতির্ময় এক শিক্ষা। অর্জিত হয়েছে তাঁর পবিত্র ব্যক্তিত্বের বরকত। ইতিহাসের আর কোনো ঘটনা এত বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে না।

এ কারণে আমাদের সমাজে, বিশেষত উপমহাদেশে ১২ রবিউল আউয়াল কার্যত একটি আনন্দ উৎসব হিসেবে উদযাপিত হয়। রবিউল আউয়াল মাসের আগমন হলে সিরাতুন্নবী আর মিলাদুন্নবীর সীমাহীন আয়োজন শুরু হয়। এটি সত্য যে নবী করিম সা. এর পবিত্র স্মৃতি অনেক বড় আনন্দের। এর সমান আনন্দের আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমাদের সমাজে রাসূলুল্লাহর সা. পবিত্র স্মৃতিকে যেন রবিউল আউয়াল মাস; এমনকি শুধুমাত্র ১২ রবিউল আউয়ালের জন্য নির্দিষ্ট করে ফেলা হয়েছে। বলা হচ্ছে, রাসূল সা. জন্মগ্রহণ হেতু ১২ রবিউল আউয়াল তাঁর জন্মদিন উদযাপন করা হবে। এতে বয়ান করা হবে তাঁর সিরাত এবং জন্মকথা। কিন্তু যে পবিত্র সত্তার সিরাত নিয়ে এই কথা আমরা বলছি অথবা যে পবিত্র সত্তার জন্মের এই জশন আমরা উদযাপন করছি তাঁর শিক্ষা কি আমাদের মনে আছে? তিনি যে শিক্ষা দিয়েছেন তাতে কি এমন জন্মদিন উদযাপনের কোনো অবকাশ আছে?

ইসলামে যদি কারো জন্মদিন উদযাপনের ধারণা থাকত তাহলে আর কারো হোক না হোক নবীজির সা. জন্মদিন অবশ্যই উদযাপিত হতো। কিন্তু নবুয়তের পর দীর্ঘ ২৩ বছর তিনি জীবিত ছিলেন। প্রতি বছরই রবিউল আউয়াল মাস এসেছে, কিন্তু তিনি ১২ রবিউল আউয়াল উদযাপন করেননি। কিংবা তাঁর জন্মদিন কোন্ খাস তরিকায় উদযাপন করতে হবে এমন চিন্তা তাঁর কোনো সাহাবির মধ্যেও আসেনি।

এরপর দোজাহানের সরদার মুহাম্মদ সা. দুনিয়ার সফর থেকে বিদায় নিলেন। তিনি প্রায় সোয়া এক লাখ সাহাবি রেখে গেলেন এ দুনিয়ায়। তাঁরা নবীজির একটি নিঃশ্বাসের বিনিময়ে নিজেদের পুরো জীবন উৎসর্গ করে দিতে পারতেন। তিনি ছিলেন তাঁদের প্রাণাধিক প্রিয়। কিন্তু একজন সাহাবিও এমন পাওয়া যাবে না যিনি প্রকাশ্যে এ দিনটিতে সমাবেশ, জুলুস, প্রদীপ প্রজ্ব¡লনও পতাকা উত্তোলন কিংবা অন্য কোনো উপায়ে তা উদযাপন করেছেন। সাহাবিরা এমন করেননি কেন? করেননি কারণ ইসলামে এর অবকাশ নেই। এটি ¯্রফে কোনো আনুষ্ঠানিকতার দ্বীন নয়। অন্যান্য ধর্মে যেমন কিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করলেই ধর্ম পালন করা হয়ে যায়, ইসলাম তা নয়। ইসলাম আমলের দ্বীন। ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি মানুষ নিজের ইসলাহর চিন্তায় ডুবে থাকবে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অনুসরণ করবে রাসূল সা. এর সুন্নত।

 প্রকৃতপক্ষে নবীজির জন্মদিন উদযাপনের এ ধারণা আমাদের মধ্যে এসেছে ঈসায়ীদের কাছ থেকে। প্রতি বছর ২৫ ডিসেম্বর ক্রিসমাস নাম দিয়ে ঈসা আ. এর জন্মদিন উদযাপন করা হয়। কিন্তু ইতিহাসে চোখ বুলালে দেখা যাবে ঈসা আ. আসমানে আরোহণের অন্তত ৩০০ বছর পর্যন্ত তাঁর জন্মদিন উদযাপনের কোনো ধারণা পাওয়া যায় না। তাঁর হাওয়ারি বা সাহাবাদের মধ্যে কেউ এই দিন উদযাপন করেছেন, এমনটিও নয়। প্রায় তিনশ বছর পর কিছু লোক এ বিদআত শুরু করেছেন। সে সময়ে যারা সঠিক খ্রিস্টধর্মের ওপর ইস্তিকামাত ছিলেন তারা এতে আপত্তি তুলেছেন। তারা জানতে চেয়েছেন- তোমরা এমন সিলসিলা শুরু করছো কেন যা ঈসার শিক্ষা নয়? কিন্তু জবাব এসেছে, ‘এতে সমস্যা কোথায়? এটি তো এমন বাড়াবাড়ির কিছু নয়। আমরা সেদিন জমায়েত হবো এবং ঈসার স্মরণ করব। তাঁর শিক্ষা আলোচনা করব, মানুষকে আমল করতে উদ্বুদ্ধ করব। আমরা তো কোনো গুনাহর কাজ করে ফেলছি না!’

 প্রথম দিকে ২৫ ডিসেম্বর চার্চে শুধু সম্মেলনই হতো। একজন পাদ্রি হযরত ঈসার শিক্ষা ও সিরাত আলোচনা করতেন। ব্যস, সম্মেলন সমাপ্ত হতো। শুরুতে এ পদ্ধতি আসলে খুব নিষ্পাপই ছিল। কিন্তু সময় অতিবাহিত হতে হতে তারা ভাবলেন শুধু পাদ্রির বক্তব্য দিয়ে চলবে না। এ আয়োজন খুব নীরস প্রকৃতির। এজন্য তরুণ ও শৌখিন মেজাজের মানুষজন এতে শামিল হয় না। মানুষের আগ্রহ গড়ে তুলতে হলে অনুষ্ঠানটি আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। প্রথমে তারা এতে সঙ্গীত সংযোজনের চিন্তা করলেন। তার সাথে শুরু হলো কবিতা পাঠ। কিন্তু সঙ্গীতে তারা তৃপ্ত হতে পারেনি। তারা এতে নাচ-গানও যুক্ত করলেন। হাসি-তামাশার আরও উপাদান যুক্ত হলো। এক পর্যায়ে তা এমন অবস্থায় গেছে যে, তা ¯্রফে সাধারণ একটি উৎসবে পরিণত হয়েছে। নাচ-গান আছে, সঙ্গীত আছে, আর আছে জুয়া ও সমস্ত নেশাদ্রব্য। অর্থাৎ দুনিয়ার সমস্ত খারাবি এতে যুক্ত হয়েছে। অথচ ক্রিসমাস ঈসা আ. এর শিক্ষা আলোচনার জন্য শুরু হয়েছিল। সেখানে তার লেশমাত্র এখন অবশিষ্ট নেই। পশ্চিমা দুনিয়ায় যখন ক্রিসমাসের আগমন হয়, তখন শোরগোল শুরু হয়। শুধু শোরগোলই নয়, এই একটি দিনে এত বেশি মদ্যপান ও ধর্ষণসহ নানা অপকর্ম সংঘটিত হয় যা হয়তো সারা বছরেও হয় না। আর এর সবই আল্লাহর নবী ঈসার জন্মদিনের নামে হচ্ছে।

আল্লাহ তায়ালা মানুষের মন ও তার দুর্বলতা সম্পর্কে ভালোভাবে ওয়াকিবহাল। তিনি জানেন মানুষ কী থেকে কী করতে পারে। এজন্য তিনি কারো জন্মদিন উদযাপনের কোনো ধারণা দেননি। যেমনটা ক্রিসমাসের সাথে হয়েছে, তেমনি হয়েছে মিলাদুন্নবীর ক্ষেত্রেও। খ্রিস্টানদেরকে ঈসার (আ.) জন্মদিন উদযাপন করতে দেখে কোনো এক বাদশাহর মাথায় হয়তো খেয়াল এসেছে যে নবীজির জন্মদিন উদযাপন করতে হবে। ঈসায়ীরা উদযাপন করতে পারলে আমরা কেন পারব না? এভাবে হলো মিলাদের সূচনা করলেন। শুরুতে এমনই ছিল যে মিলাদ হলো, রাসূল সা.-এর সিরাতের আলোচনা হলো আর কিছু নাত গাওয়া হলো। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে?

এটি সত্য যে, ঈসা (আ.)-কে কেন্দ্র করে পৃথিবীতে যা যা ঘটেছে, চৌদ্দশ বছর পেরিয়ে গেলেও নবীজির ক্ষেত্রে তার সবটা হয়নি। এটিও নবীজিরই একটি মুজিজা। কিন্তু তাঁর জন্মদিন উপলক্ষ্যে কী হচ্ছে? চারপাশে প্রদীপ প্রজ্বলন আর পতাকা উত্তোলনের হিড়িক। কোথাও কোথাও রওজা মুবারক এবং কাবা শরিফের প্রতীকও স্থাপন করা হচ্ছে। উ™£ান্ত মানুষ তার আশপাশে তাওয়াফও করছে! ধীরে ধীরে সব ধরনের খারাবি এতে যুক্ত হয়ে চলেছে। আল্লাহর কসম, দেখে মনে হয় এটি যেন নবীজির পবিত্র সিরাতের উদযাপন নয়, বরং অমুসলিমদের কোনো সাধারণ উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। 

সবচেয়ে বড় কথা- এর সবটাই হচ্ছে দ্বীন ইসলামের নামে, রাসূলে সা.-এর নামে। উল্টো মনে করা হচ্ছে এটি প্রচুর সওয়াবের কাজ। মনে করা হচ্ছে, ১২ রবিউল আওয়াল প্রদীপ প্রজ্বলন করে এবং নিজ নিজ বাসা ও রাস্তা সাজিয়ে আমরা নবীজির প্রতি মুহাব্বতের হক আদায় করে ফেলছি। তাদের যদি জিজ্ঞাসা করা হয় আপনি দ্বীনের নির্দেশনা অনুসরণ করছেন না কেন? তখন জবাব আসে, ‘আমাদের এখানে তো মিলাদ হয়’, ‘আমাদের এখানে তো নবীজির জন্মদিনে প্রদীপ জ¦ালানো হয়’ কিংবা ‘এভাবে দ্বীনের  হক আদায় করা হয়।’ কিন্তু এটি তো কোনো ইসলামী তরিকা নয়। রাসূলের তরিকা নয়। সাহাবিরাও এমনটি করেননি। এতে যদি উপকার কিংবা বরকত থাকত, তাহলে আবু বকর সিদ্দিক, ফারুকে আজম, উসমান গনি আর আলী মুর্তজারা কি এটি পালন করতেন না? অবশ্যই করতেন।

 মুফতি মুহাম্মদ শফী সাহেব হিন্দি ভাষার একটি প্রবাদ উদাহরণস্বরূপ প্রায়ই শোনাতেন। এই প্রবাদটি অনেক বিখ্যাত। ‘বানিয়ে সে সিয়ানা সো বাওলা।’ অর্থাৎ যে ব্যক্তি নিজেকে ব্যবসায় খোদ ব্যবসায়ীর চেয়ে চালাক ও হুঁশিয়ার দাবি করে কিংবা দাবি করে যে সে ব্যবসায়ীর চেয়ে বেশি ব্যবসা জানে তাহলে সে পাগল ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। বাণিজ্যের দুনিয়ায় ব্যবসায়ীর চেয়ে শেয়ানা আর কেউ হতে পারে কি? এই প্রবাদ শোনানোর পর তিনি বলতেন, যে ব্যক্তি দাবি কওে সে সাহাবিদের চেয়ে নবীজির বড় আশেক, নবীজিকে সাহাবিদের চেয়ে বেশি ভালোবসে- তাহলে বাস্তবে সে পাগল, বেকুব আর আহাম্মক। কারণ সাহাবিদের চেয়ে বড় আশেকে রাসূল কেউ হতে পারে না।

সাহাবিদের মধ্যে জলসা-জুলুশ, প্রদীপ প্রজ্বলন কিংবা পতাকা সাজানোর কোনো তাড়না ছিল না। বরং নবীজির পবিত্র সিরাত তাঁরা রচনা করেছিলেন নিজেদের আমলি জিন্দেগিতে। ফলে তাঁদের প্রতিটি দিন ছিল সিরাতের দিন। প্রতিটি ক্ষণ ছিল সিরাতের ক্ষণ। তাঁদের প্রতিটি কাজ সিরাতের আলোকেই সংঘটিত হতো। নবীজির সিরাতের বাইরে কোনো কাজ তাঁদের দ্বারা হতো না। কেননা নিজের জন্মদিন উদযাপন আর প্রশংসা শোনা কিংবা নিজের শানে কাসিদা পড়ানোর জন্য নবী করিম সা. দুনিয়ায় পদার্পণ করেননি, এটি তাঁরা ভালো করেই অবগত ছিলেন। অন্যথা যদি হতো- তাহলে যে সময়ে মক্কার কাফেররা তাঁকে সরদার বানানোর জন্য এবং মাল ও দৌলত তাঁর পায়ে এনে ফেলে দেওয়ার জন্য কিংবা আরবের বাছাইকৃত সুন্দরী তাঁকে সোপর্দ করার প্রস্তাব দিয়েছিল, তিনি তা মেনে নিয়ে তাঁর শিক্ষা ও দ্বীনের  দাওয়াত ছেড়ে দিতেন। নেতৃত্বও পাওয়া যেত, সম্পদও পাওয়া যেত। দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ অর্জন করা সম্ভব হতো। কিন্তু সরকারে দো-আলম নবীজি সা. জবাব দিয়েছিলেন, ‘যদি তোমরা আমার এক হাতে সূর্য আর অন্য হাতে চাঁদ এনে দাও, তবুও আমি আমার শিক্ষা ও দাওয়াত থেকে সরে যাব না।’

রাসূল সা. কেন এসেছিলেন পৃথিবীতে? এর সঠিক জবাব মিলবে পবিত্র কুরআনে। সূরা আহযাবে তাঁর আগমনের কারণ ধ্বনিত হয়েছে এভাবে- আমি নবী করিম সা.-কে উত্তম আদর্শস্বরূপ তোমাদের কাছে প্রেরণ করেছি। যাতে তোমরা তাঁকে অনুসরণ করো। যারা আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান আনে এবং বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করে তাদের জন্য তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছে। (সূরা আহযাব : ২১)।

প্রশ্ন হচ্ছে, আদর্শের কী প্রয়োজন? আল্লাহ তাঁর কিতাব নাজিল করেছেন, আমরা তা পড়ে তার ওপর আমল করতে পারতাম। তা নয় কি? আসলে মানুষের ফিতরাত বা প্রবৃত্তি এমন নয়। একটি কিতাব তার ইসলাহর জন্য পর্যাপ্ত হতে পারে না। তাকে শিল্প, জ্ঞান আর দক্ষতা শেখানোর সক্ষমতা কোনো গ্রন্থের নেই। বরং মানুষকে শেখানোর জন্য বাস্তব আদর্শ বা নমুনার প্রয়োজন হয়। যতক্ষণ কোনো নমুনা সামনে থাকবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত স্রেফ কোনো কিতাব পড়ে শিল্প ও জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। আল্লাহ তায়ালা মানুষের ফিতরাত এভাবেই সাজিয়েছেন।

উদাহরণস্বরূপ চিকিৎসাবিজ্ঞানের কথা ধরা যেতে পারে। বাজারে তো চিকিৎসাবিজ্ঞানের বইয়ের অভাব নেই। এখন কোনো ব্যক্তি যদি ভাবেন তার ডাক্তারি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই, যেহেতু তিনি পড়তে জানেন, বোঝেন সবকিছু, উপরন্তু বেশ বুদ্ধিমানও; কাজেই স্রেফ বই পড়েই চিকিৎসা করতে পারবেন তাহলে পরিণতি কী হবে? তিনি চিকিৎসা শুরু করে দিলে কবরস্থান আবাদ করা ছাড়া আর কোন্ খেদমতটা তিনি আঞ্জাম দিতে পারবেন? চিকিৎসার প্রকৃত নিয়মটা কী? নিয়ম হচ্ছে, এমবিবিএস ডিগ্রি হাসিল করার পরও কোনো হাসপাতালে দক্ষ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থেকে হাতে-কলমে তাকে শিখতে হবে। এর আগে কাউকে সাধারণ প্র্যাকটিসের অনুমোদন দেওয়া হয় না। কারণ তিনি এতক্ষণ পর্যন্ত অনেক কিছু শুধু বইতে পড়েছেন, এর বাস্তব নমুনা তিনি প্রত্যক্ষ করেননি। বইয়ের বর্ণনাসহ রোগকে যখন রোগীর আকারে বাস্তব উদাহরণ হিসেবে দেখে তার চিকিৎসা করতে শিখবেন, তখনই কেবল সাধারণ প্র্যাকটিসের অনুমোদন দেওয়া হবে তাকে।

একইভাবে রান্নার উদাহরণও দেওয়া যেতে পারে। রান্না শেখার বইতেও বাজার সয়লাব। সমস্ত পদ্ধতি তাতে লিপিবদ্ধ। বিরিয়ানি, পোলাও, কাবাব কিংবা কোরমা কীভাবে তৈরি করা যায় তার সমস্ত বিবরণ রয়েছে এসব বইতে। এখন কোনোদিন রান্না করেনি এমন কোনো ব্যক্তি যদি বই সামনে রেখে কোরমা তৈরি করে ফেলে- আল্লাহ জানে আসলে সেটি কী ধরনের সুখাদ্য তৈরি হবে! সহজেই অনুমেয় যে, কেবল অভিজ্ঞ কেউ যদি তাকে শিখিয়ে দেয়, তবেই তার দ্বারা সঠিক পদ্ধতিতে কোরমা বানানো সম্ভব। অন্যথায় নয়।

ইতঃপূর্বে উল্লিখিত হয়েছে যে- আল্লাহ তায়ালা মানুষের ফিতরাত অন্যভাবে তৈরি করেছেন। কোনো বাস্তব আদর্শ সামনে না থাকলে সঠিক রাস্তা কিংবা সঠিক পদ্ধতি সে জানতে পারে না। তাকে দিয়ে জ্ঞান ও শিল্প সঠিক উপায়ে উৎপাদন সম্ভব হয় না। এজন্য আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য নবী-রাসূল দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। এ অসংখ্য নবী প্রেরণ এটিই বার্তা দেয় যে, তোমাদেরকে কিতাব দিয়েছি; কিন্তু যতক্ষণ এই কিতাবের ওপর আমল করার জন্য বাস্তব কোনো আদর্শ তোমাদের সামনে উপস্থাপন না করা হয় ততক্ষণ স্রেফ কিতাব তোমাদের পথ প্রদর্শনের জন্য পর্যাপ্ত হবে না। এ কারণেই কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, আমি নবী সা.-কে এজন্য পাঠিয়েছি যাতে তোমরা দেখতে পাও যে কুরআন তোমাদের জন্য শিক্ষা আর নবীজি এই শিক্ষার ওপর আমলের প্রত্যক্ষ নমুনা। পবিত্র কুরআন মাজিদে আরেক জায়গায় কী চমৎকার উল্লেখ করা হয়েছে- ‘তোমাদের কাছে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে একটি কিতাব এসেছে। তার সঙ্গে এসেছে একটি নূর।’ (সূরা মায়েদা : ১৫)।

ধরুন, একজনের কাছে একটি বই আছে। তাতে বহু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাও উল্লেখ করা আছে। কিন্তু লোকটির কাছে কোনো আলো মজুদ নেই। হোক তা সূর্য, বিদ্যুৎ অথবা চেরাগের আলো; এক ফোঁটাও নেই। এমতাবস্থায় এই গ্রন্থ থেকে ওই ব্যক্তির কোনো ফায়দা অর্জন করা কি আদৌ সম্ভব? সম্ভব নয়। এবার ধরুন, দিনের আলো রয়েছে, বিদ্যুতের আলোও রয়েছে, কিন্তু খোদ ব্যক্তিটির চোখের আলোই নেই। তাহলেও এই গ্রন্থের দ্বারা ওই ব্যক্তির কোনো ফায়দা হাসিল করা সম্ভব হবে না। এই আয়াতে আল্লাহ বুঝাচ্ছেন, আমি এভাবেই তোমাদের জন্য কুরআনের সাথে রাসূল মুহাম্মদের সা. নূর প্রেরণ করেছি। আলোর অনুপস্থিতিতে বইয়ের যেমন কোনো ফায়দা নেই, তেমনি যতক্ষণ না রাসূলের নূর তোমাদের সঙ্গে মজুদ থাকছে ততক্ষণ তোমরা কুরআন মাজিদ বুঝতে সক্ষম হবে না।

অবশ্য কিছু অযোগ্য ও অকৃতজ্ঞ লোক এ কথার অন্য অর্থ বের করেছেন। তারা বলেন, নবী করিম সা. মানুষ ছিলেন না; বরং নূর ছিলেন। সত্য বলতে, এই আয়াত দ্বারা এটি বোঝানো হচ্ছে না। বোঝানো হচ্ছে- নবী করিম সা. যে শিক্ষা দিচ্ছেন তা এমন নূর যা দ্বারা তোমরা আল্লাহর কালাম তথা এই পবিত্র কোরআনের সঠিক আমল করতে সক্ষম হবে। অন্যথায় সহিহ-শুদ্ধ আমলের ক্ষেত্রে তোমরা কাঠিন্যের শিকার হবে। আল্লাহ তায়ালা এজন্যই নবীজিকে পাঠিয়েছেন যেন তাঁর শিক্ষার আলো আল্লাহর কিতাবের বাস্তব ব্যাখ্যা প্রদান করে। তিনি তোমাদের তরবিয়ত দিবেন এবং তোমাদের সামনে বাস্তব আদর্শ পেশ করে দেখাবেন কীভাবে আল্লাহর কিতাবের ওপর আমল করা যায়। আল্লাহ তায়ালা বোঝাচ্ছেন যে, আমি নবীজির ব্যক্তিত্বকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিখুঁত আদর্শ হিসেবে তৈরি করেছি। আর এটি এমন এক আদর্শ যা মানুষ পেশ করতে অক্ষম। এই আদর্শ এজন্যই প্রেরণ করেছি যাতে তোমরা তাঁকে দেখো এবং তার অনুসরণ করো। তোমাদের কাজ এতটুকুই।

আপনি যদি একজন বাবা হয়ে থাকেন, তাহলে দেখুন ফাতিমার রা. বাবা কেমন ছিলেন। স্বামীর অবস্থান থেকে দেখুন আয়েশা ও খাদিজার রা. স্বামী কেমন ছিলেন। অথবা আপনি একজন শাসক। তাহলে দেখুন তো মদিনার শাসক নবী সা. কীভাবে শাসন করেছেন? এভাবে একজন শ্রমিকের অবস্থান থেকে দেখলেও আপনাকে মক্কার পাহাড়ের একজন মেষপালককে দেখতে হবে তিনি কর্মক্ষেত্রে কেমন ছিলেন। অথবা আপনি যদি একজন ব্যবসায়ী হন, তাহলে দেখুন নবীজি সা. কোন তরিকায় শামের ব্যবসা পরিচালনা করেছিলেন। তিনি ব্যবসাও করেছেন, কৃষিকাজও করেছেন। রাজনীতিও করেছেন, আবার অর্থনীতিও পরিচালনা করেছেন। জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র পাওয়া যাবে না যাতে নবীজির পবিত্র সত্তা আদর্শ হিসেবে উপস্থিত নেই। কাজেই আল্লাহ বলছেন, তোমরা সেই নমুনাটি দেখে তাঁর অনুসরণ করো। এই লক্ষ্যেই আমি নবী করিম সা.-কে প্রেরণ করেছি। এজন্য প্রেরণ করিনি যে তাঁর জন্মদিন উদযাপন করা হবে কিংবা জশন উদযাপন করেই মনে করা হবে তাঁর হক আদায় করা হয়ে গেছে! বরং এজন্য পাঠিয়েছি যেন তাঁর আনুগত্য করো। সাহাবা আজমাইন এমন আনুগত্যের প্রকৃষ্ট উদাহরণ রেখে গিয়েছেন।


সাহাবিদের সিরাত উদযাপনের নমুনা

সাহাবা কেরাম সার্বক্ষণিক রাসূল সা.-এর আনুগত্য করতে সচেষ্ট থাকতেন। তাঁরা এমনি এমনিই সাহাবি হয়ে যাননি! একবার নবীজি মসজিদে নববীতে খুতবা দিচ্ছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন মসজিদের এক কোণে কয়েকজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে। যেমনটা বক্তৃতা কিংবা জলসায় একদল মানুষকে এদিক-ওদিক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তারা মজলিশে বসেনও না, আবার সেখান থেকে চলেও যান না। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মজলিশের আদবের খেলাপ। অতএব শুনতে চাইলে মজলিশে এসে বসতে হবে, অন্যথায় নিজ রাস্তা উন্মুক্ত আছে। কেননা এমন পরিস্থিতিতে বক্তার মন যেমন খারাপ হয়, আর শ্রোতার মনও বিচলিত হয়ে পড়ে।

যা হোক, রাসূল সা. মসজিদের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘বসে যাও।’ তিনি যখন এই আদেশ দেন তখন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. মসজিদে নববীর দিকে আসছিলেন। ভেতরে তখনও প্রবেশ করেননি তিনি, বাইরের রাস্তায় ছিলেন। এমন সময় তাঁর কানে আসে রাসূলে পাকের দরাজ কণ্ঠ- ‘বসে যাও।’ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ সেখানেই বসে গেলেন। খুতবার পর যখন নবীজির সাথে মোলাকাত হলো তখন নবীজি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন-‘আমি তো তোমাকে রাস্তায় বসতে বলিনি। যারা মসজিদের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলো তাদেরকে বলেছি। তুমি কেন সেখানে বসলে?’ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বললেন, ‘যখন রাসূলের কথা আমার কানে আসে তিনি বলছেন ‘বসে যাও’, তখন এক কদম সামনে এগোনোর মতো এতটুকু শক্তিও কীভাবে থাকতে পারে!’

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ জানতেন না যে রাসূল সা. তাঁকে রাস্তায় বসতে নির্দেশ দিচ্ছেন না, অন্যদের বলেছেন -বিষয়টি এমন নয়। বরং তিনি জানতেন, কিন্তু ‘বসে যাও’, রাসূল সা.-এর এমন ইরশাদ কানে আসার পর এক কদম আগানোও সম্ভব নয়। সাহাবিদের আনুগত্যের দৃঢ়তা ছিল এমন। তাঁরা এমনি এমনিই তো আর সাহাবি হয়ে যাননি। নবীজির প্রতি ইশক ও মুহাব্বতের দাবিদার তো অনেক আছেন। কিন্তু সাহাবিদের মতো এমন প্রেম কেউ করে আসুক নবীজির সাথে!

ওহুদের যুদ্ধে আবু দুজানাহ রা. দেখলেন, রাসূল সা.-এর দিকে তীর নিক্ষেপ করা হচ্ছে। একটি-দু’টি তীর নয়, যেন তীরের বৃষ্টি নেমে এসেছে। আবু দুজানাহ চাচ্ছিলেন নবীজির সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে। বীরপুরুষরা নিজের পিঠে আঘাত পছন্দ করেন না, তারা বুক পেতে দেন দুশমনের সামনে। কিন্তু আবু দুজানাহ যদি রাসূল সা.-কে রক্ষার জন্য নিজের সিনা দিয়ে এই তীর রুখতে যান, তাহলে নবীজি সা. থাকেন পেছন দিকে। নবী করিম সা.-এর দিকে তিনি পিঠ মোড় করে থাকবেন, যুদ্ধের ময়দানেও আবু দুজানাহ এটি ভাবতে পারেননি। অতএব তিনি নবীজির দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। কাফেরদের সমস্ত তীর তিনি পিঠ পেতে দিয়ে প্রতিরোধ করেছেন। যাতে যুদ্ধের ময়দানেও রাসূল সা.-এর দিকে পিঠ করে দাঁড়ানোর মতো বেয়াদবি না হয়।

এক সময় উমর ফারুক রা. মসজিদে নববী থেকে বহু দূরে বাস করতেন। তিনি সেদিকে ঘর নিয়েছিলেন। দূরত্বের কারণে প্রতিদিন মসজিদে নববীতে হাজিরা দেওয়া তাঁর জন্য মুশকিল ছিল। এজন্য এক প্রতিবেশী সাহাবির সাথে তিনি একটি সমঝোতায় এসেছিলেন। একদিন তিনি মসজিদে নববীতে যাবেন, অন্যদিন ওই সাহাবি। তাঁদের কথা হয়েছিল যিনি যেদিন মসজিদে যাবেন, সেদিন নবীজি কী কী বক্তব্য রেখেছেন তা অপরকে জানাবেন। যাতে নবীজির মুখনিঃসৃত কোনো বাণী থেকে তাঁরা মাহরুম না হন। এভাবে সাহাবিগণ নবী করিম সা.-এর ছোট ছোট কথা আর সুন্নতের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।

হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় উসমান গনি রা. হুজুুরের দূত হয়ে মক্কার কুরাইশদের নিকট যান। সেখানে গিয়ে তিনি আপন চাচাতো ভাইয়ের বাসায় থেকে গিয়েছিলেন। সকালে তিনি যখন মক্কার নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাতের জন্য বের হচ্ছিলেন তখন তাঁর পাজামার ঝুল টাখনুর বেশ ওপরে ছিল। প্রায় হাঁটু থেকে টাখনুর অর্ধেক পর্যন্ত ঝুলে ছিল। রাসূল সা.-এর ফরমান- টাখনুর নিচে কাপড় পরা যাবে না। খোদ রাসূল সা. টাখনুর অনেক ওপরে পরতেন। এর নিচে পরতেন না। ফলে উসমানও এভাবে পরতেন। এটি লক্ষ্য করে উসমান রা. এর চাচাতো ভাই তাঁকে বলল, মক্কার বিধান হচ্ছে যে ব্যক্তির ঝুল বা পাজামা যত বড় সে তত বড় হিসেবে বিবেচিত হয়। নেতৃত্ব পর্যায়ের মানুষেরা নিজেদের পাজামা প্রায় ঝুলিয়েই রাখে। আপনি যদি এভাবে তাদের সামনে উপস্থিত হন তাহলে তাদের দৃষ্টিতে আপনার কোনো অবস্থান থাকবে না। আলোচনাও প্রাণবন্ত হবে না। উসমান রা. ভাইয়ের কথাবার্তা শুনে বললেন, আমি আমার পাজামা এর নিচে করতে পারব না। আমার নেতা নবীজির পোশাক এমনই। অর্থাৎ এই মানুষেরা আমাকে ভালো মনে করুক আর খারাপ, আমাকে সম্মান দিক অথবা বেইজ্জতি করুক, যা ইচ্ছা করুক তা আমি পরওয়া করি না। আমি তো নবীজির পোশাক দেখেছি। তাঁর যেমন পোশাক, আমার পোশাকও তেমনই থাকবে। আমি তা পরিবর্তন করতে পারব না।

পারস্য অভিযানের সময় তৎকালীন পারস্য স¤্রাটের আহ্বানে আলোচনার জন্য প্রখ্যাত সাহাবি হুজাইফা বিন ইয়ামান রা. পারস্য দরবারে যান। সৌজন্যের খাতিরে তাঁর সামনে খাবার উপস্থাপন করা হয়। তিনি খাওয়ার সময় এক লোকমা খাবার মাটিতে পড়ে যায়। এদিকে আল্লাহর রাসূলের শিক্ষা হচ্ছে খাবার নিচে পড়ে গেলে তা নষ্ট না করা। কারণ তা আল্লাহর দেওয়া রিজিক। আল্লাহ তাঁর দেওয়া রিজিকের কোন্ অংশে মানুষের জন্য বরকত দান করেছেন তা জানা সম্ভব নয়। এজন্য পড়ে যাওয়া খাবার অপচয় না করে তা উঠিয়ে প্রয়োজনে ময়লা সাফ করে তা খেয়ে নিতে হবে। খাবার পড়ে গেলে হুজাইফা বিন ইয়ামানের এ হাদিস স্মরণ হয়। তিনি খাবারটি তোলার জন্য হাত নিচে করতেই পাশে বসে থাকা এক সাহাবি তাঁকে কনুই দিয়ে আঘাত করে ইশারা করলেন- ‘কী করছো! এটি দুনিয়ার পরাশক্তি পারস্য দরবার। এ দরবারেও যদি তুমি মাটিতে পড়ে যাওয়া খাবার কুড়িয়ে খাও তাহলে তাদের সামনে তোমার কোনো অবস্থান থাকবে না। তারা ভাববে এরা তো আজিব ধরনের মানুষ। এটি এই খাবার কুড়িয়ে খাওয়ার সময় নয়।’

হুযাইফা রা. জবাবে বললেন আশ্চর্য কথা। ‘এই আহাম্মকদের জন্য কি আমি আমার রাসূলের সুন্নত ত্যাগ করব? তারা যা ইচ্ছা তা মনে করুক, সম্মানিত করুক, অপমানিত করুক অথবা উপহাস করুক! আমি আমার নবীজির সুন্নত ত্যাগ করতে পারব না।’ এভাবে তিনি যেন পারস্য অধিপতির জাত্যাভিমানই চূর্ণ করে দিলেন।

তাহলে তাঁরা কীভাবে নিজেদের সম্মান অর্জন করেছেন? আর আজকের মুসলমান? সাহাবাগণ নিজেদের সম্মান এমনভাবে বাড়িয়েছেন যে একদিকে সুন্নতের উপর আমল করে খাবার তুলে খেয়েছেন, অন্যদিকে পারস্যের গর্ব আর অহঙ্কারের দুর্গ ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। নবীজি সা. এ সম্পর্কে বলেছেন যে, ‘ কিসরা যখন ধ্বংস হবে, তারপর আর কোন কিসরা আসবে না। সত্যিই তখন পারস্যের অগ্নিপূজক শাসকদের শেষ সময় এসে পৌঁছেছিল। এখন দুনিয়া থেকে তাদের নাম-নিশানাও মুছে গিয়েছে।’

এর আগে কাদিসিয়ার যুদ্ধের সময় রাবি বিন আমির রা.-কে পারস্য অধিপতির সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রেরণ করা হয়। রাবি খুব সাদাসিধে পোশাক পরিহিত ছিলেন। দরবারের দারোয়ান এজন্য তাঁকে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। সে বলে, ‘তুমি এত বড় বাদশার দরবারে যাচ্ছ এমন পোশাক পরে?’ দারোয়ান তাঁকে একটি জুব্বা দেয় পরার জন্য। তখন রাবি বিন আমির রা. জবাবে বলেন, ‘পারস্য অধিপতির দরবারে যেতে যদি তার দেওয়া জুব্বা পরিধান করতে হয়, তাহলে তার দরবারে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই। যেতে হলে আমাদের পোশাকেই যাবো। এই পোশাকে যদি তিনি আমাদের সঙ্গে সাক্ষাতে অনাগ্রহী হন, তাহলে আমাদেরও এমন কোনো শখ নেই যে তার সঙ্গে দেখা করতে হবে। আমরা ফিরে যাচ্ছি।’

দারোয়ান এ খবর ভেতরে পাঠায়। কী আজব কিসিমের মানুষ এসেছে, বাদশাহর দেওয়া পোশাক পরিধান করতে প্রস্তুত নয়! এই সময় রাবি বিন আমির রা. তাঁর তরবারি বের করে ভাঙা অংশটি পরিষ্কার করছিলেন। দারোয়ান সেই তরবারিটি চাইলে তিনি তাকে দেখতে দেন। তা দেখে দারোয়ান বলে ওঠে, ‘এই তরবারি দিয়ে তুমি পারস্য বিজয় করবে?’ রাবি বিন আমির রা. জবাব দিয়েছিলেন এভাবে- ‘তুমি তো শুধু তরবারি দেখেছ, এই তরবারি চালানোর হাত এখনও দেখোনি।’ উপহাস করে সে দারোয়ান বলল, ‘আচ্ছা! সে হাতটাও দেখিয়ে দাও।’ সাহাবি তাকে বললেন, ‘এ হাত যদি তুমি দেখতেই চাও, তাহলে তোমাদের সবচেয়ে মজবুত ঢালটি নিয়ে আসতে হবে।’

ঢাল নিয়ে আসা হলো। পারসিকদের ধারণা ছিল যে এই ঢালটি কোনো তরবারি দ্বারাই ভাঙা সম্ভব না। রাবি বিন আমির রা. আহ্বান করলে এক ব্যক্তি ঢালটি নিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়ায়। তিনি তাঁর ভাঙা তরবারি দিয়ে একটি আঘাত করতেই ঢালটি দ্ইু টুকরো হয়ে গেল। পারসিকরা এই ঘটনা দেখে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তাদের মনোভাব যেন এমন- খোদা জানে এ কেমন সৃষ্টি চলে এসেছে দুনিয়ায়!

যাই হোক, কিছুক্ষণ পর মুসলমানদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। সৌজন্য শেষে আলোচনার জন্য দরবারে ডাকা হলো। দরবারের নিয়ম হচ্ছে বাদশা সিংহাসনে বসবেন, কিন্তু অন্যরা দাঁড়িয়ে থাকবেন। রাবি বিন আমির রা. এই নিয়মের বিরোধিতা করলেন। বললেন, ‘একজন বসে থাকবে আর বাকিরা দাঁড়িয়ে থাকবে এটি আমাদের শিষ্টাচার নয়। আমরা রাসূল সা.-এর অনুসারী। তিনি আমাদেরকে এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। এভাবে আলোচনা করতে আমরা প্রস্তুত নই। হয় আমাদের জন্য আসন নিয়ে আসুন অন্যথায় খোদ বাদশা আমাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আলোচনা করবেন।’ পারস্যের বাদশা এটিকে নিজের অপমান হিসাবে বিবেচনা করলেন। মাটির একটি টুকরো তাদের মাথায় রেখে তাদেরকে দরবার থেকে বের করতে নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ মানাও হলো। রাবি বিন আমির রা. দরবার ত্যাগ করার সময় বললেন, ‘হে পারস্য অধিপতি। মনে রাখুন, আপনি কিন্তু পারস্যের মাটি আমাদেরকে দিয়ে দিলেন।’

 পারস্যের মানুষরা ছিল কুসংস্কারাচ্ছন্ন। সাহাবি রাবির এই বক্তব্য তারা অশনি হিসাবে ভাবতে বাধ্য হয়। দরবার থেকে বের হতেই রাবির কাছ থেকে সেই মাটি ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য বাদশা একজনকে প্রেরণ করলেন। কিন্তু পারসিকরা আর তাঁকে কোথায় পায়! আল্লাহ তো ততক্ষণে ফয়সালা করে ফেলেছিলেন সেই ভাঙা তরবারি দিয়েই ইরানের জমিন মুসলমানদের অধিকারে আসবে। রাবি বিন আমির রা. সেই মাটি নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন।


সুন্নতের আলোকে নিজের জীবন ঢেলে সাজান

রাসূল সা. এর সুন্নতের অনুসরণ এবং তা পালনে তাঁর সাহাবিরা দুনিয়াব্যাপী দৃষ্টান্ত রেখেছেন। আর আজকের মুসলমানরা ভাবছে এই এই সুন্নতের ওপর যদি আমল করলে লোকে কী বলবে! এই সুন্নতের ওপর আমল করলে তো মানুষে বিদ্রƒপ করবে, অমুক দেশের মানুষ হাসবে! আর এর পরিণতিতে সারা দুনিয়ায় মুসলমানরা আজ অপদস্থ হচ্ছে। বর্তমানে সারা দুনিয়ার এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা মুসলমান। এত সংখ্যক মুসলমান তো এর আগে কখনোই ছিল না। আজ মুসলমানের হাতে যত সম্পদ তা অতীতের মুসলমানের হাতে ছিল না। কিন্তু নবীজি সা. বলেছিলেন, এমন এক জমানা আসবে তোমাদের সংখ্যা অনেক হবে কিন্তু তোমরা এমন হবে যেমনটা হয় স্রােতের শ্যাওলা; যার নিজের কোনো এখতিয়ার থাকে না। আজ আমাদের যে পরিস্থিতি, দুশমনকে সন্তুষ্ট করতে আমাদের সব কিছু আমরা পরিত্যাগ করেছি। এমনকি নিজের চেহারাও বদলে ফেলেছি। আপাদমস্তক তাদের অনুকরণ করে আমরা দেখিয়ে দিয়েছি যে আমরা তোমাদের গোলাম। এতদসত্ত্বেও তারা সন্তুষ্ট নয়, বরং প্রতিদিন আঘাত করছে। কখনো ইসরাইল আঘাত করে তো কখনো অন্য কোনো দেশ। মনে রাখবেন, একজন মুসলমান যখন সুন্নতে রাসূল সা. পরিত্যাগ করবে, তখন তার জন্য অপমান-অপদস্থ হওয়া ছাড়া অন্য কিছু বরাদ্দ নেই।

মরহুম কবি আসাদ মুলতানি খুব চমৎকার বলেছেন-

কিসি কা আস্তানা উঁচা হ্যায় ইতনা

কি সার ঝুঁক কার ভি উঁচা হি রাহে গা

হাসে জানে সে জাব তাক তুম ডারোগে

জামানা তুম পার হাসতে হি রাহে গা

তিনি বলছেন, কারো কারো আশ্রয় অনেক বিশাল হয়। সে যদি মাথা নতও করে, তবুও তা উঁচুই থাকে। কিন্তু যে উপহাসের ভয় পায়, সে কখনো বড় হতে পারে না। তার ওপর মানুষ হাসবেই।  অর্থাৎ, যতক্ষণ আপনি ভয় পাবেন যে অমুক হাসবে, অমুক উপহাস করবে ততদিন দুনিয়া আপনার ওপর হাসতেই থাকবে। বাস্তবেই দেখে নিন দুনিয়া মুসলমানদের ওপর হাসছে কি-না। কিন্তু আপনি নবী করিম সা.-এর আদর্শের প্রতি আত্মসমর্পণ করে তাঁর সুন্নতের অনুসরণ করে দেখুন- দুনিয়া আপনাকে কতটা সম্মান দেয়। প্রশ্ন উঠতে পারে যে, ‘আপনি বলছেন সুন্নত পরিত্যাগ করলে অসম্মান হবে। কিন্তু আমরা তো দেখছি, কাফির ও মুশরিকরা, আমেরিকা ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ সুন্নতের অনুসরণ না করেই উন্নতি করছে এবং তাদের সম্মানও আকাশচুম্বী। তারা এমন উন্নতি করছে কীভাবে?’

সত্যি বলতে বিষয়টা এমন নয়। আপনি ঈমানদার, আপনি মুহাম্মদ রাসূল সা.-এর কালেমা পাঠ করেছেন। ফলে আপনি যতক্ষণ না তাঁর অদর্শের ওপর আপনার জীবনকে সমর্পণ করবেন, ততক্ষণ দুনিয়া আপনাকে অপদস্থ করবে, আপনি সম্মান অর্জন করতে পারবেন না। কাফিরদের জন্য তো দুনিয়াই সবকিছু। তারা এই দুনিয়ায় উন্নতি করুক কিংবা সম্মান অর্জন করুক, যা মন চায় তারা করুক। আপনি তাদের অনুসরণ করবেন না। চৌদ্দশ বছরের ইতিহাস খুলে দেখুন, যতদিন মুসলমান নবীজির সুন্নতের ওপর আমল করেছে, ততদিন তারা সম্মানও অর্জন করেছে, ক্ষমতাও অর্জন করেছে। কিন্তু যখনই সুন্নত পরিত্যাগ করেছে তখন থেকেই দেখুন কী পরিস্থিতি হয়েছে।

যাই হোক। বক্তৃতা হবে, জলসা হবে; কিন্তু এই বক্তৃতার মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে কি কোনো পরিবর্তন আসছে? এজন্য একটি কাজ করুন, আপনি রাসূলে পাকের কোন কোন সুন্নত আমল করছেন আর কোন সুন্নতের আমল করছেন না তা নোট করুন। ভাবুন- এখনই শুরু করতে পারবেন এমন সুন্নত কোন কোনটি। শুরু করতে একটু সময় লাগবে এমন সুন্নতগুলোও চিহ্নিত করুন। যেগুলো দ্রুতই শুরু করতে পারবেন তা আজকেই শুরু করে ফেলুন।

ড. আব্দুল হাই সাহেব (রহ.) বলতেন, ‘গোসলখানায় প্রবেশ করার সময় বাম পা আগে রাখবে। আর তার আগে দুআ পড়বে, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল খুবুসি ওয়া খবাইস।’ একই সাথে এই নিয়তও করবে যে রাসূলে পাকের অনুসরণ করে এই কাজ করছি। এর মাধ্যমে এই কাজেও আল্লাহ তায়ালার প্রেম অর্জন করা সম্ভব।’ এজন্য আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজিদে ইরশাদ করেছেন, ‘তুমি যদি আমার আদেশ মেনে চলো তাহলে আল্লাহ তোমাকে বন্ধু বানিয়ে নিবেন।’ (সূরা আলে ইমরান : ৩১)। অতএব, যদি ছোট ছোট কাজও সুন্নতের আলোকে আদায় করেন, তাহলে আল্লাহর বন্ধুত্ব অর্জন হতে থাকবে। আর আপাদমস্তক অনুসরণ করলে পরিণত হতে পারবেন আল্লাহর একজন কামিল মাহবুবে। ড. আব্দুল হাই সাহেব বলতেন, ‘আমি দীর্ঘ দিন থেকে একটি অভ্যাসে গড়ে তুলেছি। সেটা হচ্ছে বাসায় আমার সামনে খাবার প্রস্তুত থাকলে এমনকি ক্ষুধা এবং খেতে ইচ্ছুক থাকলেও আমি একটু সময় নিই। সঙ্গে সঙ্গে খেয়ে ফেলি না। রাসূল সা.-এর সুন্নত হচ্ছে খাবার প্রস্তুত থাকলে তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে খেয়ে নিতেন, আমিও তাঁর অনুসরণে খাবার খাব- এই চিন্তাটা আগে আমার মধ্যে নিয়ে আসি।’ অতএব তিনি (আব্দুল হাই) এরপর যে খাবার খেলেন তা রাসূলের সা. অনুসরণে খেলেন। এতে আল্লাহ তায়ালার বন্ধুত্বও অর্জন হলো, স্বাস্থ্যও ঠিকঠাক থাকল।

তিনি বলতেন, ‘বাসায় প্রবেশের পর শিশুটিকে দেখে কোলে তুলে নিতে মন চায়। কিন্তু একটু থামি। সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিই না। এরপর শিশুদের প্রতি নবীজির স্নেহ, তাদেরকে কোলে তুলে নেওয়ার কথা স্মরণ করি। ভাবি, আমিও তাঁর অনুসরণ করে শিশুকে কোলে তুলে নেব।’

নবীজির অনুসরণ করে যখন শিশুকে কোলে তুলে নেবেন তখন এই আমলটিও আল্লাহর সঙ্গে বন্ধুত্বের মাধ্যমে পরিণত হবে। দুনিয়ার এমন কোনো কাজ নেই যাতে সুন্নতের অনুসরণের নিয়ত করতে পারবেন না। তাঁর সুন্নতের ওপর অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়েছে। খুলে দেখুন। এক একটি সুন্নত দেখুন আর নিজের জীবনে তা বাস্তবায়ন করুন। তাহলে দেখবেন, ইনশাআল্লাহ সেসব সুন্নত কীভাবে নূর হাসিল করবে আর আপনার দিন হবে সিরাতে নবীর সা. দিন, প্রতিটি ক্ষণ হবে সিরাতে নবীর সা. ক্ষণ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে এর ওপর আমল করার তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : আন্তর্জাতিক ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলিমে দ্বীন, পাকিস্তান

অনুবাদক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির