বক্তৃতা ও বিবৃতি প্রদানে রাসূল সা.-এর নীতি -মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন

রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর ২৩ বছরের নবুওয়াতি জীবনে বহু মূল্যবান বক্তৃতা দিয়েছেন। ইসলামের পথে দাওয়াত হতে শুরু করে মৃত্যুশয্যা পর্যন্ত তাঁর বক্তৃতার পরিধি বিস্তৃত ছিল। রাসূলুল্লাহ সা.-এর নেতৃত্বে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে তিনি যোদ্ধাদের সম্মুখে বক্তব্য প্রদান করেন। অধিকাংশ বক্তৃতা মসজিদকেন্দ্রিক হলেও মাঠে-ময়দানে প্রদত্ত বক্তৃতার সংখ্যাও কম নয়। মসজিদ যেহেতু সেই সময় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, তাই সঙ্গত কারণে বৈদেশিক দূতদের আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ, ইসলাম গ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গ ও যুদ্ধে গমনকারী সেনানায়কদের এবং নিয়োগপ্রাপ্ত স্বীয় রাষ্ট্রদূতদের সম্মুখে মসজিদে দিকনির্দেশনামূলক বক্তৃতা দিতেন। মিম্বার ও অনুচ্চ স্থানে দাঁড়িয়ে অথবা উট ও ঘোড়ার উপর বসে জনগণের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা প্রদান করতেন। পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুসারে তাঁর বক্তৃতা কখনও দীর্ঘ বা কখনও স্বল্পস্থায়ী হতো। আল্লাহ তায়ালা ও তদীয় রাসূল সা.- এর উপর ঈমানে পার্থিব জীবনের সার্বিক কল্যাণ ও পারলৌকিক জীবনের মুক্তি নিহিত। এক কথায় ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনের এমন কোনো বিষয় নাই যেই সম্পর্কে তিনি দিকনির্দেশনামূলক বক্তৃতা প্রদান করেন নাই।

ওয়াজ, বক্তৃতা, আলোচনা ও ভাষণকে আরবি ভাষায় খুতবা বলা হয়। পারিভাষিক অর্থে জনগণের সম্মুখে দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক ধর্মীয় ও নৈতিক দিকনির্দেশনামূলক যেই ভাষণ প্রদান করা হয় তাই খুতবা। খুতবা প্রদানকারী খতিব (বক্তা) নামে পরিচিত। খুতবা এর ইংরেজি পরিভাষা হচ্ছে Sermon discourse (আল-মুনজিদ ফিল-লুগাহ, পৃ. ৩৭১; Standerd Twentieth Century Dictionary, p-288)

খতিব (বক্তা) হিসেবে কেমন ছিলেন রাসূল সা.
রাসূলুল্লাহ সা. আরবের এমন এক ঐতিহাসিক স্থানে আবির্ভূত হন যার অধিবাসী প্রকৃতিগতভাবে সব দক্ষতা ও কর্মশক্তি তাদের নিজস্ব ভাষা আরবির চর্চা ও উৎকর্ষ সাধনে ব্যয় করেছে। আরব জনগোষ্ঠীর উপর এই ভাষার প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক। আরবি ভাষা তার কাব্যিক শৈলীর কাছে ঋণী এবং ইতঃপূর্বে আরবি ছাড়া অন্য কোনো ভাষা এত ব্যাপকভাবে অনুশীলিত হয় নাই। প্রাক-ইসলামী যুগে ভাষণদক্ষ ব্যক্তি আরবে অত্যন্ত সম্মানিত ও মর্যাদাসম্পন্ন হতেন। আরবগণ প্রকৃতিগতভাবে বাকপটু, সরলভাষী এবং বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন। ভাষণ দক্ষতা ছিল যেন তাদের জন্মগত বৈশিষ্ট্য।
আল্লামা জাহিজ তাই যথার্থই বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সা. এমন এক জাতির কাছে প্রেরিত হন যাদের সুনামের বিশিষ্টতা হল বাকপটুতা ও বাগ্মিতা। নিঃসন্দেহে আরবগণ বাকপটুতা, উপস্থাপনা, শব্দালঙ্কার ও বাগ্মিতার জন্য গৌরববোধ করতেন। দৈবাৎ সমাজে যদি কোনো ব্যক্তি এইগুলি হতে বঞ্চিত হতেন তিনি সম্মানিত ও মর্যাদাবান হতেন না। (আল-বায়ান ওয়াত-তাবঈন, ২/২৪ পৃ.)
রাসূলুল্লাহ সা. আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশুদ্ধভাষী ছিলেন। কেননা তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশোদ্ভূত এবং প্রতিপালিত হয়েছিলেন বানু সা’দ গোত্রে। ফাসাহাত ও বালাগাত এই দুই বংশ ছিল সমগ্র আরবের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। তাদের ভাষা সকলের জন্য নমুনা স্বরূপ ছিল। কুরাইশদের ভাষাকেই আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট বিশুদ্ধ বর্ণনা রূপে অভিহিত করেছেন। আল্লাহ বলেন-
নিশ্চয় আল-কুরআন জগৎসমূহের প্রতিপালক হতে অবতীর্ণ। জিবরাঈল এটা নিয়ে অবতরণ করেছে, তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পার। অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়। (সূরা শুয়ারা : ১৯২-১৯৫)
আরবের ভাষাবিদ ও কবি-সাহিত্যিকগণ রাসূলুল্লাহ সা.-এর ভাষার বিশুদ্ধতা ও সাহিত্য অলঙ্করণের ভূয়সী প্রশংসা করেছে এবং আল-কুরআনের পর তারই ভাষাকে আরবি সাহিত্যেও বিশুদ্ধতম ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। (ইহসানুন-নাসর, আল-খিতবাতুল-আরাবিয়্যাহ, ৪৮ পৃ.)
মহানবী সা.-এর ভাষাশৈলী ফাসাহাত ও বালাগাত এবং অনবদ্য বর্ণনা-রীতি ছিল আল্লাহ তায়ালার বিশেষ দান। তাই তা ওয়াহয়ির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল। (তারিখুল-আদাবিল-আরাবি, ১৮ পৃ.)
তিনি সাবলীল ভাষায় অতি সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয়ের মনোজ্ঞ করে তুলতেন। প্রয়োজন হলে তিনি বক্তব্য বিশদ বর্ণনা করতেন, অন্যথায় সুস্পষ্টভাবে অল্প কথায় বক্তব্য প্রকাশ করতেন। তার বক্তব্য কখনও অপ্রচলিত দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহৃত হতো না এবং তিনি অমার্জিত শব্দও প্রয়োগ করতেন না। কথা বললে মনে হতো যেন জ্ঞানের প্র¯্রবণ উৎসারিত হচ্ছে। তার বাকধারা আল্লাহ তায়ালার সাহায্যধন্য ছিল। তার অনন্য সাধারণ অমর বাণী হতে প্রতীয়মান হয়, তিনি আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রিয় ও সমাদৃত ছিলেন। এতে যেমন ছিল ভাবগাম্ভীর্য, তেমনি ছিল মাধুর্য। শব্দ কম হতো, অথচ মর্ম সহজ ও সর্বজনবোধগম্য। তাঁর কথা এত স্পষ্ট ও সাধারণের পক্ষে বোধগম্য হতো যে, তা পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন হতো না। তথাপি যদি কেউ পুনরাবৃত্তির আবেদন জানাত, তবে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করতেন না। তাঁর কথায় কখনও ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হতো না। তাঁর বক্তব্য হতো যুক্তিপূর্ণ ও প্রমাণসিদ্ধ। যুক্তিতর্কে কেউ কখনও তাঁকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয় নাই। তাঁর দীর্ঘ ভাষণের বাক্য সারগর্ভ ও সংক্ষিপ্ত হতো। তিনি সত্য ও সঠিক তথ্যপূর্ণ কথাই বলতেন। শব্দের মারপ্যাঁচ এবং অপরের ছিদ্রান্বেষণ হতে সর্বদাই বিরত থাকতেন। তিনি অত্যন্ত শ্লথভাবে কিংবা দ্রুতভাবে তাড়াহুড়া করে কথা বলতেন না। তিনি অহেতুক কথা দীর্ঘ করতেন না এবং কখনও সুস্পষ্ট ভাষায় ভাব প্রকাশে অসমর্থ হতেন না। পূর্ণ সামঞ্জস্য রক্ষা করে জনগণের জন্য কল্যাণকর ও মহোত্তম আদর্শ ও লক্ষ্য সংবলিত বক্তব্য উপস্থাপনায় তার অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী বাগ্মী পরিলক্ষিত হয় না। তার বাণীসমূহ ছিল প্রেরণাদায়ক ও প্রভাব বিস্তারকারী। বর্ণনাধারা ছিল সহজ, মনোজ্ঞ; ভাষণ বিশুদ্ধ শব্দ সংবলিত এবং উদ্দেশ্য মহান। রাসূলুল্লাহ সা.-এর যুগের কবি-সাহিত্যিক ও বাগ্মীগণ প্রায়শই বলতেন, তিনি যদি অন্য কোনও গুণে বিভূষিত নাও হতেন, তবুও তাৎক্ষণিক তার ভাষণের উচ্চতম মানের ভাষা সৌকর্য, ফাসাহাত ও বালাগাতের মুজিযাই তার শ্রেষ্ঠত্বের জন্য যথেষ্ট ছিল। (ইবনে কুতায়বা, উয়ুনুল-আখবার, ১/৪২৪ পৃ.)
সাঈদ ইবনুল মুসায়্যাব রা.-এর নিকট জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, সাহিত্যালংকারে সমৃদ্ধ সর্বশ্রেষ্ঠ শুদ্ধভাষী কে? তিনি উত্তরে বলেছিলেন- রাসূলুল্লাহ সা.। (আল-বায়ান ওয়াত তাবঈন, ১/৩১৪ পৃ.)

রাসূল সা. কিভাবে বক্তৃতা শুরু করতেন
রাসূল সা. হামদ ও সানা, ইসতিগফার (অনুশোচনা) ও আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল (নির্ভরতা) জ্ঞাপক বাক্য দ্বারাই সর্বদা বক্তব্যের সূচনা করতেন। শুধুমাত্র দুই ঈদের খুতবায়ই তিনি তাকবির (আল্লাহ আকবর) দ্বারা আরম্ভ করতেন। অধিকাংশ বক্তৃতায় তিনি আল্লাহ-ভীতির উপদেশ দিতেন। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের ভাষণে জিহাদের জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন। যেই সকল ভাষণে তাওহিদের শিক্ষা থাকত কিংবা জাহান্নাম হতে সতর্ক করা যার উদ্দেশ্য হতো, সেসব বক্তৃতা অত্যন্ত তেজোদীপ্ত হতো। (আবদুল কারীম, আল-ইনসানুল-কামিল, পৃ. ১৩১)

বক্তৃতার সময় রাসূল সা.-এর শারীরিক অবস্থা
রাসূল সা. যখন বক্তৃতা দিতেন তখন তার চক্ষু রক্তিম হয়ে যেত, শব্দ গুরুগম্ভীর ও বলিষ্ঠ হতো। মুখমণ্ডলে মাহাত্ম্য ফুটে উঠত, আবেগের প্রবলতায় হাতের আঙুলসমূহ উত্তোলিত হতে থাকত এবং মনে হতো, যেন তিনি ইসলামী সেনাদলকে জিহাদের জন্য হাতের ইশারায় উদ্বুদ্ধ করছেন। পবিত্র দেহ আন্দোলিত হতো, হাত সঞ্চলনের সময় গ্রন্থি মটকানোর শব্দ শুনা যেত, বক্তৃতার মাঝে মাঝে নিজের হাত কখনও মুষ্টিবদ্ধ করতেন আবার কখনও তা খুলে ফেলতেন। (ইবনুল কায়্যিম, জাদুল-মাআদ, ১/৪৮ পৃ.)
আবদুল্লাহ ইবন উমার রা. রাসূলুল্লাহ সা.-এর একটি ভাষণে বাগ্মীসুলভ উদ্দীপনার চিত্রাঙ্কন করতে গিয়ে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.কে মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছি যে, মহা প্রতাপশালী সৃষ্টিকর্তা আসমান-জমিনকে মুষ্টিবদ্ধ করবেন- এই কথা বলে তিনি স্বীয় হাত মুষ্টিবদ্ধ করতেন এবং কখনও খুলে দিতেন। আমি দেখলাম, তিনি একবার ডানদিকে ঝুঁকছেন, আর একবার বামদিকে ঝুঁকছেন। এমনকি তার মিম্বরও এই কারণে আন্দোলিত হচ্ছিল। এই অবস্থা দেখে আমার আশঙ্কা হচ্ছিল যে, মিম্বরটি যেন উল্টে না যায়। (আল্লামা শিবলী নোমানী, সিরাতুন নবী, ২/২৩৩পৃ.)

রাসূল সা. মানুষের বোধগম্য ভাষায় বক্তৃতা দিতেন
কথা বলার ক্ষেত্রে মানুষের বোধগম্য ভাষায় কথা বলা উচিত। দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলা সমীচীন নয়। কারণ এতে মানুষ কথা বুঝতে না পেরে কষ্ট পায়। আলী রা. বলেন, ‘মানুষের নিকট সেই ধরনের কথা বল, যা তারা বুঝতে পারে। তোমরা কি পছন্দ কর যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি মিথ্যা আরোপ করা হোক? (বুখারি-১২৭)
রাসূলুল্লাহ সা.-এর ভাষণরীতি ছিল সহজ, জটিল শব্দালংকার বর্জিত ও কষ্টকল্পিত উপমাবিহীন। রাসূলুল্লাহ সা.-এর ভাষণে দীর্ঘ ভূমিকা থাকতো না। বাক্যগুলি সংক্ষিপ্ত অথচ দ্ব্যর্থহীন। তিনি ঐতিহাসিক ঘটনা এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুনিষ্ঠ বা বিষয়ের প্রতি শ্রোতাদের মনোযোগ এমনভাবে আকর্ষণ করতেন, যাতে এইসব তাদের মনে চিরসজীব থাকে। কারণ সর্বোৎকৃষ্ট বাক্যরীতি তাই যা সংক্ষিপ্ত ও যুক্তিপূর্ণ।
মূল বিষয়ের প্রতি শ্রোতাদের কৌতূহল উদ্রেকে তার পদ্ধতি ছিল প্রত্যক্ষ। রাসূলুল্ললাহ সা.-এর ভাষা ছিল সরল ও সাবলীল, দ্ব্যর্থহীন ও কৃত্রিমতা বিবর্জিত, যা শ্রেষ্ঠ ভাষণের আরবিয় নমুনা।

বক্তৃতা উত্তম বিষয়ে হওয়া উচিত
মানুষের উচ্চারিত প্রত্যেকটি কথা আল্লাহর দরবারে সংরক্ষিত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন- মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্য তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে। (সূরা কাফ : ১৮)। তাই সদা উত্তম কথা বলা এবং কারো সাথে কথাবার্তা উত্তম বিষয়ে হওয়া উচিত। আবু হুরাইরাহ্ রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ বিচারের দিনে বিশ্বাস রাখে সে যেন প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। যে লোক আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন অবশ্যই মেহমানের সম্মান করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের উপর ঈমান রাখে, সে যেন অবশ্যই ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে। (বুখারি-৬০১৮/১৯, মুসলিম-৪৭)।
তিনি আরো বলেন- তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচ এক টুকরো খেজুর দান করেও যদি হয়। আর তাও যদি না পার, তবে একটি মিষ্টি কথার বিনিময়ে হলেও (কেননা তাও দান সদকা সমতুল্য)। (বুখারি-৬০২৩)। কেননা মানুষ কথার কারণে পরকালে পাকড়াও হবে। রাসূল সা. বলেন, ‘মানুষ তো তার অসংযত কথাবার্তার কারণেই অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে’। (তিরমিজি-২৬১৬; ইবনু মাজাহ-৩৯৭৩)

রাসূল সা. এমন বক্তৃতা দিতেন যাতে মানুষের অন্তর বিগলিত হতো
রাসূল সা.-এর বক্তৃতা শুনে মানুষের অন্তরগুলো বিগলিত হতো, চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতো। আব্দুর রাহমান ইবনু আমর আস-সুলামি ও হুজর ইবনু হুজর রা. বলেন, একদা আমরা আল-ইরবাদ ইবনু সারিয়াহ রা.-এর নিকট আসলাম। যাদের সম্পর্কে এ আয়াত নাজিল হয়েছে তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত ‘‘তাদেরও কোনো অপরাধ নেই যারা তোমার নিকট বাহনের জন্য এলে তুমি বলেছিলে: আমি তোমাদের জন্য কোনো বাহনের ব্যবস্থা করতে পারছি না।’’ (সূরা তওবাহ : ৯২)।

আমরা সালাম দিয়ে বললাম, আমরা আপনাকে দেখতে, আপনার অসুস্থতার খবর নিতে এবং আপনার কাছ থেকে কিছু অর্জন করতে এসেছি। আল-ইরবাদ রা. বললেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সা. আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে সালাত আদায় করলেন, অতঃপর আমাদের দিকে ফিরে আমাদের উদ্দেশ্যে জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন, তাতে চোখগুলো অশ্রুসিক্ত হলো এবং অন্তরগুলো বিগলিত হলো।
তখন এক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ যেন কারো বিদায়ী ভাষণ! অতএব আপনি আমাদেরকে কী নির্দেশ দেন? তিনি বলেন: আমি তোমাদেরকে আল্লাহভীতির, শ্রবণ ও আনুগত্যের উপদেশ দিচ্ছি, যদিও সে (আমীর) একজন হাবশি গোলাম হয়। কারণ তোমাদের মধ্যে যারা আমার পরে জীবিত থাকবে তারা অচিরেই প্রচুর মতবিরোধ দেখবে। তখন তোমরা অবশ্যই আমার সুন্নাত এবং আমার হিদায়াতপ্রাপ্ত খলিফাগণের সুন্নাত অনুসরণ করবে, তা দাঁত দিয়ে কামড়ে আঁকড়ে থাকবে। সাবধান! (ধর্মে) প্রতিটি নব আবিষ্কার সম্পর্কে! কারণ প্রতিটি নব আবিষ্কার হলো বিদআত এবং প্রতিটি বিদআত হলো ভ্রষ্টতা। (আবু দাউদ-৪৬০৭)
রাসূল সা. বক্তৃতায় গুরুত্বপূর্ণ কথাকে তিনবার বলতেন
বক্তৃতায় সাধারণত তিনি সহজ-সরল বাক্য ব্যবহার করতেন। যদি তিনি কখনও কোনো বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করতে চাইতেন তখন প্রশ্ন ও উত্তর দুই-ই তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন। আনাস রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী সা. যখন কোনো কথা বলতেন তখন তা বুঝে নেয়ার জন্য তিনবার বলতেন। আর যখন তিনি কোনো গোত্রের নিকট এসে সালাম দিতেন, তাদের প্রতি তিনবার সালাম দিতেন। (বুখারি-৯৪)

রাসূল সা. সুমধুর কণ্ঠে বক্তৃতা দিতেন
বক্তৃতায় শ্রুতিমধুর কণ্ঠের গুরুত্ব যথেষ্ট। আম্বিয়া-ই কেরাম (আ)-এর মধ্যে হযরত দাউদ (আ)-কে ফাসলুল-খিতাব (মীমাংসাকারী বচন) বলা হয়েছে। তাকে সুমধুর কণ্ঠস্বর আল্লাহ তায়ালা দান করেছিলেন। তাঁর সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “আর আমি তাঁর রাজত্বকে সুদৃঢ় করেছিলাম এবং তাঁকে দিয়েছিলাম হিকমাত ও কথাবার্তায় উত্তম সিদ্ধান্তদানের যোগ্যতা।” (সূরা সোয়াদ : ২০)
রাসূলুল্লাহ সা.-এর কণ্ঠস্বর যেমন ছিল মধুর, তেমন উদাত্ত। হযরত কাতাদা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা.কে সুন্দর দেহাবয়বের সাথে সুন্দর কণ্ঠস্বরও দান করা হয়েছিল। (ইবন সাদ, আত-তাবাকাত, ১/৩৭৬)।
তাঁর কণ্ঠস্বর এত দূরে পৌঁছাত, যতদূরে আর কারও পৌঁছাত না। তিনি মিনাতে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, লোকেরা তা অনেক দূর-দূরান্ত হতে শুনতে পেয়েছিল। হজরত উম্মু হানি রা. হতে বর্ণিত আছে যে, অর্ধ-রজনীকালে যখন রাসূলুল্লাহ সা. কাবাগৃহে আল-কুরআন তিলাওয়াত করতেন, তখন আমরা আমাদের গৃহের ছাদ হতে তার আওয়াজ শুনতে পেতাম। (ইবনু মাজাহ, সুনান, বাবে-মা জাআ ফিল-কিরাআহ ফি সালাতিল-লাইল, ১/৪২৯)

বক্তৃতায় রূঢ়তা ও কর্কশতা পরিহার করা
বক্তৃতা দেওয়ার সময় ন¤্রতা অবলম্বন করা জরুরি। রূঢ়তা ও কর্কশতা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। আল্লাহ স্বীয় রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘অতএব আল্লাহর অনুগ্রহ এই যে, তুমি তাদের প্রতি কোমল চিত্ত; আর তুমি যদি কর্কশভাষী, কঠোর হৃদয় হতে, তবে নিশ্চয়ই তারা তোমার সংস্পর্শ থেকে সরে পড়ত, অতএব তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর ও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং কার্য সম্পর্কে তাদের সাথে পরামর্শ কর; অতঃপর যখন তুমি কোনো দৃঢ় সঙ্কল্প করলে আল্লাহর প্রতি ভরসা কর এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ নির্ভরশীলগণকে ভালোবাসেন।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৫৯)।
বিরোধীদের সাথেও আল্লাহ ন¤্রভাষায় কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি মূসা ও হারূন (আ)-কে উদ্দেশ করে বলেন, “তোমরা দুজন ফেরাউনের নিকটে যাও। নিশ্চয়ই সে উদ্ধত হয়েছে। অতঃপর তার সাথে নরমভাবে কথা বল। হয়ত সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।” (সূরা ত্ব-হা: ৪৩-৪৪)।

একাই বক্তৃতা দেয়ার মানসিকতা পরিহার করা
অনেকে আছেন কেবল নিজেই অধিক কথা বলতে বেশি পছন্দ করেন। অন্যকে কথা বলার সুযোগ কম দেন। এরূপ মানসিকতা পরিহার করা আবশ্যক। বরং অন্যের কথা শুনতে হবে ও তাদেরকে বলার সুযোগ দিতে হবে। আর কোনো মজলিসে কথা বলার ক্ষেত্রে বয়োজ্যেষ্ঠকে প্রাধান্য দিতে হবে। হাদিসে এসেছে, সাহল ইবনু আবু হাসমাহ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু সাহল ও মুহায়্যিছাহ ইবনু মাসউদ বিন যায়েদ রা. খায়বারের দিকে গেলেন। তখন খায়বারের ইহুদিদের সঙ্গে সন্ধি ছিল। পরে তাঁরা উভয়ে আলাদা হয়ে গেলেন। অতঃপর মুহায়্যিছাহ আব্দুল্লাহ বিন সাহলের নিকট আসেন এবং বলেন যে, তিনি মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। তখন মুহায়্যিছাহ তাঁকে দাফন করলেন। অতঃপর মদিনায় এলেন। আব্দুর রহমান ইবনু সাহল ও মাসউদের দুই পুত্র মুহায়্যিছাহ ও হুওয়ায়্যিছাহ নবী করিম সা.-এর নিকট গেলেন। আবদুর রহমান রা. কথা বলার জন্য এগিয়ে এলেন। তখন আল্লাহর রাসূল সা. বললেন, ‘বড়কে আগে বলতে দাও, বড়কে আগে বলতে দাও’। আর আব্দুর রহমান ইবনু সাহল রা. ছিলেন বয়সে সবচেয়ে ছোট। এতে তিনি চুপ রইলেন এবং মুহায়্যিছাহ ও হুওয়ায়্যিছাহ উভয়ে কথা বললেন। (বুখারি-৩১৭৩, মুসলিম-১৬৬৯)

ইবনু আব্বাস রা. বলেছেন, ওমর রা. যখন রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রবীণ সাহাবীদেরকে ডাকতেন, তখন সেই সাথে আমাকেও ডাকতেন। আর বলতেন, তারা যতক্ষণ কথা না বলেন, ততক্ষণ তুমি কথা বলো না। একদিন আমাকে ডেকে বললেন, লাইলাতুল কদর সম্পর্কে (অর্থাৎ তার ফজিলত ও মর্যাদা সম্পর্কে) রাসূলুল্লাহ সা. যা বলেছেন, তা তো তোমরা জেনেছ। অতএব তোমরা রমাদানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদর তালাশ কর। যে কোনো বেজোড় রাতে তোমরা তার সাক্ষাৎ পাবে’। (মুসনাদে আহমাদ-৮৫; ইবনে খুযায়মাহ-২১৭২-৭৩)

বক্তৃতার মধ্যে তর্ক-বিতর্ক ও বাচালতা পরিহার করা
কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কথা বলা বা বাচালতা অনুচিত। এগুলো মানুষ পছন্দ করে না। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যার চরিত্র ও আচরণ সর্বোত্তম সে-ই আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় এবং কিয়ামত দিবসেও সে আমার খুবই নিকটে থাকবে। আর তোমাদের যে ব্যক্তি আমার নিকট সবচেয়ে বেশি ঘৃণ্য সে ব্যক্তি কিয়ামত দিবসে আমার নিকট হতে অনেক দূরে থাকবে তারা হলো বাচাল, ধৃষ্ট-নির্লজ্জ এবং অহঙ্কারে মত্ত ব্যক্তিরা। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সা.! বাচাল ও ধৃষ্ট-দাম্ভিকদের তো আমরা জানি কিন্তু মুতাফাইহিকুন কারা? তিনি বললেন, অহঙ্কারীরা’। (তিরমিজি-২০১৮)
রাসূলুল্লাহ সা. আরো বলেন ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সেসব লোককে ঘৃণা করেন যারা বাকপটুত্ব প্রদর্শনের জন্য জিহবাকে দাঁতের সঙ্গে লাগিয়ে বিকট শব্দ করে, গরু তার জিহবা নেড়ে যেমন করে থাকে’। (আবু দাউদ-৫০০৫)
ভান করে বা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে কথা বলাও ঠিক নয়। সহজ-সরলভাবে কথা বলা মুমিনের জন্য জরুরি। সেই সাথে অহেতুক তর্ক-বিতর্ক এড়িয়ে চলা উচিত।

বক্তৃতায় অশ্লীলতা পরিহার করা
অশ্লীল কথা বলা বা কথাবার্তায় অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। এগুলি সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য। রাসূল সা. কখনো কোনো বক্তৃতায় অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করেন নি। তিনি সা. বলেছেন, মুমিন কখনো দোষারোপকারী ও নিন্দাকারী হতে পারে না, অভিসম্পাতকারী হতে পারে না, অশ্লীল কাজ করে না এবং কটুভাষীও হয় না’। (তিরমিজি-১৯৭৭)

বক্তৃতায় বাগ-বিতণ্ডা পরিহার করা
তর্ক-বিতর্ক, ঝগড়া বা বাগ-বিতণ্ডা কখনো ভালো ফল বয়ে আনে না। কাজেই অপ্রয়োজনে এসব থেকে দূরে থাকা একান্ত জরুরি। রাসূল সা. বলেন, ‘আমি সেই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের পার্শ্বদেশে এক গৃহের জামিন হচ্ছি, যে ব্যক্তি সত্যাশ্রয়ী হওয়া সত্ত্বেও তর্কবিতর্ক বর্জন করে। সেই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের মধ্যদেশে এক গৃহের জামিন হচ্ছি, যে ব্যক্তি উপহাসছলেও মিথ্যা বলে না। আর সেই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের ঊর্ধ্বদেশে এক গৃহের জামিন হচ্ছি, যে ব্যক্তি তার চরিত্রকে সুন্দর করে’। (আবু দাউদ-৪৮০০) অন্যত্র তিনি বলেন, “হিদায়াত লাভের পর কোনো কওমই গোমরাহ হয়নি, যারা ঝগড়ায় লিপ্ত হয়নি। অতঃপর তিনি পাঠ করেন ‘বরং তারা হল ঝগড়াকারী সম্প্রদায়।’ (সূরা যুখরুফ : ৫৮)।” (তিরমিজি-৩২৫৩; ইবনু মাজাহ-৪৮)

বক্তৃতায় কারো শোনা কথা যাচাই না করে বলা অনুচিত
রাসূল সা. যখন বক্তৃতা দিতেন তখন তিনি তথ্যবহুল কথা বলতেন কারো শোনা কথা যাচাই না করে বলতেন না। তাই কারো নিকট থেকে শোনা কথার সত্যাসত্য যাচাই না করে বলা উচিত নয়। কেননা এতে পাপী ও মিথ্যাবাদী হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। নবী করিম সা. বলেন ‘কোনো ব্যক্তির পাপী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে কোনো কথা শোনামাত্রই (যাচাই না করে) বলে বেড়ায়’। (আবু দাউদ-৪৯৯২) অন্যত্র তিনি বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তাই বলে বেড়ায়’। (মুসলিম-৫; মিশকাত-১৫৬)

বক্তৃতায় অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় কথা বর্জন করা
বক্তৃতায় অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক কথা পরিহার করতে হবে। কেননা এতে কোনো উপকারিতা নেই। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘মানুষের জন্য ইসলামের সৌন্দর্য হচ্ছে তার অনর্থক কথাবার্তা পরিহার করা’। (ইবনু মাজাহ-৩৯৭৬)
এছাড়া মানুষের ব্যক্ত করা কথাবার্তার কারণে তাকে শাস্তি পেতে হতে পারে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘মানুষ আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক কথা বলে এবং তাকে দূষণীয় মনে করে না। অথচ এই কথার দরুন সত্তর বছর ধরে সে জাহান্নামে পতিত হতে থাকবে’। (তিরমিজি-২৩১৪; ইবনু মাজাহ-৩৯৭০)
রাসূল সা. অসংখ্য বক্তৃতা দিয়েছেন কিন্তু কোনো বক্তৃতায় একটিও অনর্থক অপ্রয়োজনীয় শব্দ ব্যবহার করেননি।

রাসূল কোনো কিছুর উপর ভর দিয়ে বক্তৃতা দিতেন
রাসূলে করিম সা. যখন জিহাদের ময়দানে মুজাহিদদের সম্মুখে ভাষণ দিতেন, তখন ধনুকের উপর ভর করতেন। কখনও আবার কোনো কিছুতে ঠেস রাখতেন। (সিরাতুন নবী, ২/২৩৪)।
হিজরতের পর যখন তিনি মসজিদুন নববীতে বসে বিভিন্ন সময়ে মুসলিমদের সম্মুখে বক্তব্য রাখা শুরু করেন, তখন তিনি একটি খর্জুরকাণ্ডে ভর করতেন। মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে সাহাবা-ই কেরাম তার জন্য একটি মিম্বর নির্মাণ করে দেন, যাতে সকলে তাকে দেখতে পায়। (ইবন সাদ, আত-তাবাকাত, পৃ. ৯-১২)।
কখনও তিনি লাঠির উপর ভর দিয়েও বক্তৃতা দিতেন। আল-জাহিজ বর্ণনা করেন যে, এ লাঠিখানি খুলাফা-ই-রাশিদিনের নিকট হস্তান্তর হতে থাকে এবং তারা এই সুন্নত-ই-নববীর অনুসরণ করতে থাকেন। সর্বশেষ উমাইয়া খলিফা স্বীয় পরিণতি দেখে গোলামকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ সা.-এর চাদর এবং লাঠি যেন কোথাও দাফন করে দেয় কিন্তু সে তা ক্ষমতাসীন আব্বাসীয় খলিফার নিকট পৌঁছিয়ে দেয়।

রাসূল সা. মানহানিমূলক কোনো বক্তৃতা দিতেন না
‘ইফতিরা’ হলো কোনো ব্যক্তির উপর মিথ্যা দোষারোপ করা, ক্ষতি সাধনের কারো বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ করা অথবা কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে কল্পিত মিথ্যা কথা বলা। কুরআনের ব্যবহার রীতি অনুযায়ী ইফতিরা হলো মিথ্যা কথা বলার সমার্থক। যেমন আল্লাহ বলেন- “ইসলামের দিকে আহ্বান করা সত্ত্বেও, যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে তার অপেক্ষা অধিক জালিম আর কে? আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।” (সূরা সফ : ৭)
মানহানিকর বক্তব্য, মিথ্যা কথা ও মিথ্যা অভিযোগ হচ্ছে বাকস্বাধীনতার লংঘন যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সুতরাং মানহানিকর সকল কথা ও কর্ম হতে বিরত থাকা সকলের কর্তব্য।

রাসূল সা. অভিসম্পাত দিয়ে কোনো বক্তৃতা দিতেন না
অভিশাপ বা অভিসম্পাত (লান বা লানাহ/লানাত) হচ্ছে সাধারণত অসন্তোষের প্রকাশ এবং অভিশাপ হচ্ছে প্রচণ্ড ক্রোধজনিত অমঙ্গল কামনা। প্রায়ই অভিশাপের কথা উচ্চারণ ও কোনো ব্যক্তির উপর আল্লাহর রোষানলে পতিত হোক, এমন কথা বলে অভিসম্পাত করা হয়ে থাকে, যেমন, তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ পড়–ক। সে অভিশাপের রোষানলে জ¦লে-পুড়ে মরুক। রাসূল সা. কখনো অভিসম্পাত দিয়ে কোনো বক্তৃতা দিতেন না। ইসলামের ইতিহাসে অভিসম্পাতের একটি ঘটনা জানা যায়। মক্কার কাফিররা খুবাইব রা.-কে আটক করে এবং মৃত্যুদণ্ড দেয়। শাহাদাত লাভের ঠিক আগে তিনি যে কথাগুলো উচ্চারণ করেছিলেন তা হলো :
“হে আল্লাহ! তুমি এদের সংখ্যা গণনা করে রাখ, তাদেরকে বিক্ষপ্তিভাবে হত্যা কর এবং এদের একজনকেও বাকি (জীবিত) রেখ না।”

রাসূল সা. ধারাবাহিকতা রক্ষা করে বক্তৃতা দিতেন
আল্লাহর রাসূল সা. কখনও তাড়াহুড়া ও এলোমেলোভাবে খুতবা দিতেন না, ধারাবাহিকতা বজায় রেখে স্বল্প বিরতি সহকারে বক্তব্য পেশ করতেন, যাতে শ্রোতাদের হৃদয়ঙ্গম করতে সুবিধা হয়। ইতিহাসবিদ ইবন সাদ এর মতে, তিনি কণ্ঠস্বরকে প্রলম্বিত করতেন। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম আবৃত্তি করার সময় তিনি বিসমিল্লাহকে দীর্ঘায়িত, আর রহমানকে দীর্ঘায়িত ও আর রাহিমকে দীর্ঘায়িত করতেন। খুতবা দেয়ার সময় রাসূলুল্লাহ সা.-এর চক্ষুদয় কখনও রক্তিম বর্ণ ধারণ করত এবং কণ্ঠস্বর উচ্চ হতো ক্রমান্বয়ে, ঠিক যেন সকাল বা সন্ধ্যায় আক্রমণে উদ্যত এমন শত্রুসৈন্যদের বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিতেছেন শ্রোতাদেরকে (আত-তাবাকাত আল-কুবরা, ১/৪৪০-২)।

ইসলামের ইতিহাসে রাসূলুল্লাহ সা. বক্তা হিসেবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তার উপস্থাপনা আকর্ষণীয় ও জোরালো। তাঁর বাক্যগুচ্ছ গভীর অনুভূতিপ্রবণ ও আবেগময়। শব্দচয়ন ও বাক্যনির্মাণে তার অনুপম নমনীয়তার ছোঁয়াচে স্পষ্ট এবং প্রকাশভঙ্গির ধরন উল্লেখযোগ্য। তার চিন্তা ও ভাষা দ্-ুই লৌকিকতা বর্জিত। অনুভূতির সততা ও প্রকাশের সারল্য তাঁর ভাষণ প্রাণবন্ত ও তেজোময়। রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতিটি বক্তব্য ছিল যৌক্তিক, বুদ্ধিদীপ্ত ও সমাধানমূলক। তাঁর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভাষণ দক্ষতা শ্রোতাদের চেতনাকে শাণিত করত। ভাষণ দক্ষতা আল্লাহর অন্যতম দান, যার মাধ্যমে মানুষ সমৃদ্ধতর হয়েছে। এই দক্ষতার উন্মেষের মাধ্যমে শুধু আধুনিক যুগে নয় বরং প্রাচীন কালেও গ্রিস ও রোমসহ অন্যান্য দেশে বাগ্মীগণ জনমতকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং তাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব লাভে সমর্থ হয়েছেন। আবহমানকাল ধরে আরব জনগণের সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য ও জীবনধারায় তাদের মাতৃভাষার প্রভাব-প্রতিপত্তি অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর তুলনায় অত্যধিক। তাদের জীবন ও ভাষা যেন একই সূত্রে গ্রথিত। ঐতিহাসিক পি.কে. হিট্টির মতে, The Arabians created or developed no great art of their own. Their artistic nature found expression through one medium only speech. By virtue of its peculiar structure Arabic lent itself admirably to a terse, trenchant, epigrammatic manner of speech.

লেখক : প্রভাষক, সিটি মডেল কলেজ, ঢাকা

SHARE

Leave a Reply