মুসলমানদের মধ্যে বিরাজমান দল-উপদল -ড. মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম

(মার্চ সংখ্যার পর)
মুতাজিলা সম্প্রদায়
মুসলিম দর্শন গ্রিক দর্শন দ্বারা অনেকটা প্রভাবিত হয়েছে। আর গ্রিক দর্শনের প্রভাবে মুসলিম দর্শনে যেসব সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে তাদের মধ্যে মুতাজিলা সম্প্রদায় অন্যতম। মুতাজিলা ইসলামের প্রথম ধর্মতাত্ত্বিক-দার্শনিক সম্প্রদায়। তারা ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে দার্শনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করে ইসলামের বৌদ্ধিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালান। মুতাজিলা সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে প্রথম হিজরির শেষ ভাগে। এ সম্প্রদায় সমকালীন যুক্তিবাদী ভাবধারাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে। খারেজি ও মুরজিয়া সম্প্রদায়ের চেয়ে এই সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল পুরোপুরি বুদ্ধিবৃত্তিক বা প্রজ্ঞাভিত্তিক। তারা বিশ^াস করত যে, অহি বা প্রত্যাদেশনির্ভর সবকিছুর নিষ্পত্তি হতে হবে তাত্ত্বিক বুদ্ধির মাধ্যমে। আর তাই মুতাজিলা সম্প্রদায় ইসলামের প্রারম্ভিককালের সর্বাপেক্ষা যুক্তিবাদী সম্প্রদায় বলে সাধারণত বিবেচিত হয়ে থাকে। মুতাজিলা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ওয়াসিল বিন আতা। কাদেরিয়া চিন্তা নিয়ে খারেজিদের উগ্র ধর্মান্ধতা ও ধর্ম শিথিল মুরজিয়াদের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ মুতাজিলা সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। সৈয়দ আমীর আলী (১৮৪৯-১৯২৮) তার বিখ্যাত দি স্পিরিট অব ইসলাম গ্রন্থে মুতাজিলাদেরকে ‘আহলুল ইতিজাল’ বলে আখ্যায়িত করেন।

মুতাজিলাদের উৎপত্তি (Origin of the Mutazila)
মুতাজিলা শব্দটি শব্দটি ইতাজিলা শব্দ থেকে উদগত হয়েছে। এর অর্থ পরিত্যাজ্য করা, দল ত্যাগ করা, বিচ্ছিন্ন হওয়া। এ মতবাদে বিশ্বাসীরাই মুতাজিলা। সহজভাবে উল্লেখ করা যায়, যারা মাজিলাতুন বায়নাল মানজিলাতাইন এর নীতি অর্থাৎ বিশ^াস ও অবিশ^াসের মধ্যবর্তী এক তৃতীয় অবস্থা স্বীকার করে তারাই হলো মুতাজিলা। এ ধরনের মত সর্বপ্রথম প্রকাশ করেন মাবাদ আল জুহানি। স্বাধীন চিন্তা ও কর্মের সমর্থক কুরআনের আয়াতের ওপর ভিত্তি করে তিনি যুক্তিবাদের অবতারণা করেন। স্বাধীন ইচ্ছা মতবাদ সমর্থন ও প্রচারের দায়ে ৬৯৯ খ্রিষ্টাব্দে কাদেরিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা সাবাদ আল জুহানিকে উমাইয়াদের স্বার্থহানির আশঙ্কায় হাজ্জাজ বিন ইউসুফ হত্যা করেন। কিন্তু তাকে হত্যা করা সত্ত্বেও কাদেরিয়া মতবাদ স্তব্ধ হয়ে যায়নি, বরং একই বদরে অর্থাৎ ৬৯৯ খ্রিষ্টাব্দেই আবির্ভূত হন ও্যয়াসিল বিন আতা (জীবনকাল ৬৯৯-৭৮৯) ও আমর বিন ওবায়েদ নামক এমন দুই মুক্ত বুদ্ধির প্রতিনিধি, যাদের নাম মুতাজিলাবাদ উদ্ভদের সঙ্গে যুক্ত। এরা দু’জনই ছিলেন হাসান আল বসরীর শিষ্য। হাসান আল বসরীর নির্দেশেই তারা বসরার প্রধান মসজিদের নিয়মিত হাসান আল বসরীর শিষ্য। হাসান আল বসরীর নির্দেশেই তারা বসরার প্রধান মসজিদে নিয়মিত ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিতেন।

মুতাজিলা সম্প্রদায়ের উৎপত্তি সম্পর্কে একাধিক মত পাওয়া যায়Ñ
এক. মুতাজিলাদের উৎপত্তির সঙ্গে একটি বিশেষ ঘটনা জড়িত আছে। একদা জনৈক ব্যক্তি প্রকাশ্য মাহফিলে বসরীর নিকট জানতে চান কোন লোক যদি কবিরা গুনাহ করে তাহলে সে মুসলিম থাকবে কি না? উত্তরে হাসান আল বসরী বলেন, সে কাফির হয়ে যাবে। কিন্তু হাসান আল বসরির প্রতিভাবান শিষ্য ওয়াসিল বিন আতা এ মতটি গ্রহণ করলেন না। তিনি ঐ ব্যক্তিকে কাফির ও মুসলমানের মধ্যবর্তী স্থান দেন। হাসান আল বসরী তার ভক্ত ওয়াসিল বিন আতার মতগ্রহণ না করলে ওয়াসিল তার স্তরর দল ত্যাগ করেন এবং মসজিদের এক কোণে সরে গিয়ে নিজের মতবাদ প্রচার করতে থাকেন। এমন আচরণে হাসান আল বসরী বিরক্ত হয়ে মন্তব্য করেন ‘ইতাজিলা আন্ন’ অর্থাৎ সে আমাদের দল ত্যাগ করেছে। ধারণা করা হয় ‘ইতাজিলা আন্ন’ হতেই মুতাজিলা নামের উৎপত্তি। এ ঘটনার পর থেকে ওয়াসিল বিন আতাও তার অনুসারীরা মুতাজিলা নামে পরিচিতি লাভ করে।

দুই. নওবখতির মতে আলী (রা) এর রাষ্ট্রপ্রধান নির্ধারিত হওয়ার সময় কিছু বিশিষ্ট সাহাবী ইবন উমার, মুহাম্মদ ইবন মাসলামা, উসামা ইবন জায়েদ, সুহাইব ইবন সিনান আর রুমি, যায়িদ ইবন সাবিত প্রমুখ তাঁকে সমর্থন করা থেকে বিরত থাকেন। অনেকে আনুগত্য পোষণ করলেও আলী (রা)-এর পক্ষে যুদ্ধে যাননি। এ ছাড়া বসরাতে আল আহনাফ ইবন কায়স ৬০০ তামিমিসহ এবং সবেরা ইবন শায়মান একদল আজদিসহ আলী (রা) এর পক্ষাবলম্বন হতে বিরত থাকেন। শেষোক্তদের ভূমিকা বর্ণনা প্রসঙ্গে ইতায়ালা ক্রিয়াপদ ব্যবহৃত হয়েছে। এ হিসেবে বলা যায়, আলী (রা)-এর শাসনামল থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে মুতাজিলা শব্দটি বহুল প্রচলিত ছিল। রাজনৈতিক মুতাজিলা হতে ধর্মতাত্ত্বিক মুতাজিলা উদগত হয়েছে বলে আভাস পাওয়া যায়।

তিন. অধ্যাপক নাল্লিনোর মতে, ওয়াসিল বিন আতা তার গুরুর দল ত্যাগ করে বলেই তারা মুতাজিলা হয়নি। বরং তিনি খারেজি ও মুরজিয়া এ দুই সম্প্রদায়ের মত পরিহার করে একটি মধ্যপন্থা গ্রহণ করেছিলেন বলেই এ সম্প্রদায়কে মুতাজিলা বলা হয়। তার মতে এ নামের শুরু হয় পাপকর্মের প্রশ্ন ও পাপীর পরিণাম ভোগের সম্পর্ক বলা হয়। এ যুক্তিবাদী সম্প্রদায় মুসলিম দর্শনে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। এটি ইসলামের প্রথম ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিবাদী সম্প্রদায়।
মুতাজিলা সম্প্রদায়ের উৎপত্তির কারণ
মুতাজিলাবাদের উৎপত্তি হয় ইরাকে। এ মতবাদের উৎপত্তির পশ্চাতে একাধিক কারণ বিদ্যমান দিন। কারণগুলো হচ্ছে:
১. আদর্শিক কারণ : গোঁড়া খারেজিদের উগ্রধর্মীয় মতবাদ এবং অপরাধকে মুরজিয়াদের নৈতিক শিথিলতার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ মুতাজিলা মতবাদের জন্ম হয়।
২. বিদেশী দর্শনের প্রভাব : ইউরোপীয় লেখকগণ সাধারণত এ ধারণা পোষণ করেন কে মুতাজিলাবাদ হেলেনিক সভ্যতারই ফলশ্রুতি। তারা প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন যে, মুসলিম জাহানের কোন কোন অংশে সে সময় গ্রিক দর্শন বা চিন্তার বিস্তার লাভ করার পর মুতাজিলাবাদ জন্মলাভ করে। ভন ক্রেমার বলেন যে, মুতাজিলাবাদ খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ব দ্বারা প্রারম্ভেই প্রভাবিত হয়। তার মতে, উমাইয়া রাজ দরবারে খ্রিস্টানদের ঘন ঘন যাতায়াত মুসলিম ও খ্রিস্টানদের মধ্যে স্বাধীন ধর্মীয় আলোচনা এবং মুসলিম সংস্কৃতিবান সম্প্রদায়ের ওপর গ্রিক দর্শনের প্রভাব মুতাজিলা সম্প্রদায়ের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের অন্যতম কারণ ছিল। কিন্তু সম্প্রদায়ের উৎপত্তির ইতিহাস পরীক্ষা করে দেখলে এ মত গ্রহণ করা যায় না ঐতিহাসিক এম খুদাবক্স ভন ক্রেমারের মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তার মতে, মুনতাযিল মতবাদ খ্রিস্টান দর্শন ছাড়াই জন্মলাভ করে। যদিও পরবর্তী ক্রমবিকাশে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
৩. কাদেরিয়া সম্প্রদায়ের নবরূপ : মুতাজিলা সম্প্রদায় কাদেরিয়া সম্প্রদায়েরই নবরূপ এবং সে জন্য মুতাজিলাদের কাদেরিও বলা হয়। ইসলামে প্রথম ধর্মতত্ত্ব সম্বন্ধীয় সম্প্রদায় হলো জাবরিয়া এবং এর সাথে তাদের মতবাদের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এটি গ্রিক দর্শনের ফলশ্রুতি নয়। এই সম্প্রদায়ের প্রতিবাদ স্বরূপ কাদেরিয়া সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কাদেরিয়া সম্প্রদায় শেষ পর্যন্ত মুতাজিলা সম্প্রদায়ে উন্নীত হয়। এটি বলা যায় যে, মুতাজিলা সম্প্রদায় কোন বৈদেশিক প্রভাব ছাড়াই কুরআনের আয়াতের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এর ক্রমোন্নতির এক পর্যায়ে গ্রিক দর্শন দ্বারা কিছুটা প্রভাবিত হয়।
মুতাজিলাদের ক্রমবিকাশ
মুতাজিলা সম্প্রদায় ছিলো যুক্তিবাদী। তারাই মুসলিম সমাজে প্রথম স্বাধীন চিন্তাবিদ হিসেবে পরিগণিত। এ সম্প্রদায়ের অনুসারীদের বলা হয় মুতাজিলি। তাদের এ নাম অন্যদের প্রদত্ত। তারা নিজেদেরকে, আসহাবুল আদলি ওয়াত তাওহিদ বলে পরিচয় দিত। কারণ আল্লাহর দেয়া আদল ইনসাফ ও তাওহিদ সম্পর্কে তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে তারা শুধু নিজেদেরকেই আদল ও তাওহিদপন্থী বলে মনে করত। অন্যকথায় তারা মনে করত তাদের বক্তব্যই ইনসাফ ও তাওহিদের অনুকূল।
মুতাজিলাদের অগ্রগতির মূলে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, তাদের মধ্যে ওয়াসিল বিন আতা ও আমর বিন ওবায়েদ ছিলেন বিখ্যাত। কদর ও আদল-ইনসাফ বিষয়ক মত দ্বারাও তারা তাদের মতবাদে কিছু নতুন গুরুত্বপূর্ণ ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ যুক্ত করেন। তাতে এ সম্প্রদায়ের সম্মান ও শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং শেষ পর্যন্ত মুতাজিলারা রাজকীয় দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
উমাইয়া খলিফা ইয়াজিদ ইবনে ওয়ালিদ তার স্বল্পকালীন খিলাফতকালে শাসনকাল ৭৪৪ এপ্রিল ৭৪৪ সেপ্টেম্বর মুতাজিলাবাদ প্রকাশ্যে সমর্থন করেন এবং তার শাসনামলে এ মত অন্য সব মতের চেয়ে বেশি গুরুত্ব অর্জন করতে সম্পন্ন হয়। ৭৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৫ জানুয়ারি বড় জাব নদীর তীরে কুসাফ নামক স্থানে শেষ উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় মারওয়ান (শাসনকাল ৭৪৪-৭৫০) এর শোচনীয় পরাজয়ের পর উমাইয়া রাজতন্ত্রের পতন হয় এবং বিজয়ী আব্বাসীয়গণ ক্ষমতা দখল করে। উমাইয়াদের পতনের পর মুতাজিলারা আব্বাসীয়দের কাছ থেকে উদার সমর্থন লাভ করে। দ্বিতীয় আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর আল মনসুর (শাসনকাল ৭৫৪-৭৭৫) ছিলেন আমর বিন ওবায়েদের আবাল্য বন্ধু। তিনি আমর বিন ওবায়েদের ধর্মানুরাগ ও পান্ডিত্যের প্রশংসা করেন। শুধু তাই নয়, আমরের মৃত্যুতে তিনি একটি শোকগাথা রচনা করেছিলেন প্রশংসা করেন। শুধু তাই নয়, আমরের মৃত্যুতে তিনি একটি শোকগাথা রচনা করেছিলেন বলেও জানা যায়।
একজন পণ্ডিত ব্যক্তির মৃতুতে কোন শাসকের পক্ষে শোকগাথা রচনা মুসলমানদের ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম ইসলামের উদারতার যুগ।
মোটকথা ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীদের ক্ষমতা গ্রহণের পর উদার চিন্তার যুগ শুরু হয়। এখানে উল্লেখ্য যে মুতাজিলাদের ক্রমবিকাশে আমর বিন ওবায়েদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উমাইয়া শাসন উৎখাতে আব্বাসী আন্দোলনে মুতাজিলা সম্প্রদায়ের চিন্তা চেতনা নতুন যাত্রা যোগ করে।
আবু জাফর আল মনসুরের শাসনামলে মুতাজিলারা চিন্তার ক্ষেত্রে অনাবশ্যক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্তি এবং স্বাধীন চিন্তাভাবনার সুযোগ পায়। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে সুদৃঢ় করার পর আল মনসুর শিল্পকলা ও বিজ্ঞান চর্চায় মনোনিবেশ করেন। তিনি ফার্সি, সংস্কৃত, গ্রিক প্রভৃতি বিভিন্ন ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের আরবি অনুবাদের সৃষ্টি হয়। মুসলিম চিন্তাবিদগণ ইহুদি, খ্রিস্টান, প্রারম্ভিক বিভিন্ন জাতি, ধর্মীয় বিধিবিধান ও বাগযজ্ঞের দার্শনিক বিশ্লেষণ, এমনকি সমালোচনাও শুরু করেন। এসব স্বাধীন আলোচনাকে মনসুর উৎসাহিত করেন। নিষ্ঠাবান মুসলমানরা দীন ইসলামের সমর্থনে অমুসলিমদের সাথে বাকযুদ্ধে অবতীর্ণ হন; অমুসলিমদের যুক্তিকে তারা নিছক বিশ^াসের অস্ত্র দ্বারা খণ্ডন করতে ব্যর্থ হন।
এ সময়ে মুতাজিলারা এগিয়ে আসেন ইসলামকে যৌক্তিকভাবে সমর্থনের দাবি নিয়ে। দ্বান্দ্বিক বিচার বিশ্লেষণের সাহায্যে তারা অমুসলমানদের যুক্তিকে চূর্ণ করে দেন এবং এর ফলে সমুন্নত ও সুদৃঢ় হয় ইসলামের ভাবমর্যাদা ইমেজ। আব্বাসী শাসনামলের শুরুতে মুতাজিলাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল খলিফাদের প্রতি অনুগত থাকা। আব্বাসী আমলে মুতাজিলা মতবাদ প্রতিষ্ঠার আবু আল হুযায়েল মুহাম্মদ ইবনুল হুয়ায়েল আল আল্লাফ (মৃত্যু ৮৪০ খ্রিস্টাব্দ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আব আবু আল হুযায়েলের অন্যতম অনুসারী ইব্রাহিম ইবনুল সায়ার-মুতাজিলা মতবাদ বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন।
ইসলামী চিন্তাবিদদের অনেকে মুতাজিলা মত গ্রহণ করেননি; তারা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করে এবং মুতাজিলা ও ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে সর্বদা বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাত চলতে থাকে। ইসলামী চিন্তাবিদদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও মুতাজিলা সম্প্রদায় শাসকগোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতার উন্নতি লাভ করতে থাকে।
মুতাজিলারা গ্রিক দর্শন অধ্যয়ন করে তাদের যুক্তি তর্কের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেন। এইভাবে অভ্যন্তরীণ শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ও শাসকশ্রেণীর অনুগ্রহ লাভ করে মুতাজিলারা অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করল। সাধারণ মুসলমানরা যখন দেখল যে, মুতাজিলাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে যুক্তিতর্কের চর্চা ছাড়া গত্যন্তর নেই, তখন তারা দলে দলে মুতাজিলা মতবাদ অনুসরণ করতে বাধ্য হলো। এই সময়ে মুতাজিলা সম্প্রদায় আবু আল হুযায়েল ও ইব্রাহিম আল নাযযাম নামক দুইজন বিদ্বান ব্যক্তিরও সমর্থন লাভ করল। তারা মুতাজিলা সম্প্রদায়কে মুসলমানদের মধ্যে জনপ্রিয় করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।

মুতাজিলাদের উত্থানকাল
বনু উমাইয়াদের শাসনামলেই মুতাজিলি মতবাদের সূচনা হয়। তবে আব্বসীয় শাসনামলেই তাদের উথান সূচিত হয়। আব্বাসীয় শাসক আল মামুনের (শাসনকাল ৮১৩-৮৩৩) যুগেই মুতাজিলিদের বিশেষ উত্থান সূচিত হয়। আল মামুন ধর্ম সম্পর্কে উদার মত পোষণ করতেন। পরিবর্তনশীল জগতে গোঁড়ামি এবং প্রাচীনপন্থীদের মতবাদ সকল প্রকার উন্নতির পরিপন্থী মনে করে তিনি কল্যাণমূলক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তনে প্রয়াসী হয়েছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি যুক্তিবাদী মুতাজিলা সম্প্রদায়ের নীতি দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন।
আল মামুন সরকারিভাবে মুতাজিলাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং মুতাজিলি আলেমগণই সাধারণভাবে মামুনের প্রিয় ও ঘনিষ্ঠ ছিলেন। মুতাজিলিদের মতে, যা বিবেক ও বিচার দ্বারা প্রমাণ করা যায় না, তা কস্মিনকালেও গ্রহণযোগ্য নহে। এ সম্প্রদায়ের মতে ভালো-মন্দ বিচারে মানুষ স্বাধীন। আল্লাহর গুণাবলী তাঁর অস্তিত্ব হতে পৃথক নহে এবং কুরআন শরীফ সৃষ্ট, এ গ্রন্থ অনাদি নহে। খলিফা আল মামুন এ মতবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি খালকে কুরআনের আকিদার প্রকাশ্য ঘোষণা দেন এবং মুতাজিলি আলেমগণ কর্তৃক অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি সর্বসাধারণকে এ আকিদা গ্রহণ করতে বাধ্য করেন। তিনি প্রশাসকগণকে এই মর্মে জানিয়ে দেন যে, কোন ব্যক্তি খালকে কুরআনকে স্বীকার না করলে আগামীতে তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না।
দ্বীন ইসলামের কল্যাণের জন্য এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য খলিফা আল মামুন ৮২৭ সালে মুতাজিলা মতবাদকে রাষ্ট্রীয় মতবাদে পরিণত করেন। ফলে এ মতবাদ আব্বাসীয় খিলাফতের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। আল মামুন ৮২৭ সালে ঘোষণা করেন যে, আল কুরআন সৃষ্ট এ মতটাই একমাত্র সত্য এবং এটা স্বীকার করতে সকল মুসলমানই বাধ্য। আর এ আদেশ ছয় বছর ধরে রাষ্ট্রীয় আদেশ হিসেবে বলবত ছিল। এ আদেশের বিরোধিতার দরুন অনেক আলেমকে দ্বীন ও বিদ্বান ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় শাস্তির মুখোমুখি হন। খ্যাতনামা ফকিহ ও আলেমে দ্বীন/ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (৭৮০-৮৫৫) এই মতবাদের কুফল দর্শনে অত্যন্ত বিচলিত এবং শঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করতে অবতীর্ণ হর। আল মামুন খালকে কুরআনের মাসয়ালায় প্রচুর বাড়াবাড়ি করেন। মুতাজিলা মতবাদকে বিরোধিতা করার জন্য অনেক প্রখ্যাত পণ্ডিতকে শাস্তি দেয়া হয়। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলসহ আরও ২৬ জন বিরুদ্ধেবাদীকে ১৮৩৩ সালে কারারুদ্ধ করা হয়। এ সময় ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলকে বেত্রাঘাত করে মত পরিবর্তনের জন্য চাপ দেয়া হয়। কিন্তু অমানবিক নির্যাতনের পরও তিনি যখন তার মতের ওপর অটল রইলেন। তখন চূড়ান্ত বিচারের সম্মুখীন করার জন্য তাকে আল মামুনের দরবারে হাজির করার জন্য প্রেরণ করা হয়। কিন্তু ইমাম সাহেব দরবারে পৌঁছার আগেই আল মামুন মৃত্যুবরণ করেন। অতঃপর আল মুতাসিম (শাসনকাল ৮৩৩-৮৪২) এবং আল ওয়াসিনের (শাসনকাল ৮৪২-৮৪৭) তাঁকে দৈহিক নির্যাতন থেকে রেহাই দিয়ে কারাগারে এবং গৃহে বন্দী করে রাখা হয়। আল মামুনের পর আল মুতাসিম ও আল ওয়াসিক একই পদ্ধতি অব্যাহত রাখেন। আল ওয়াসিকের শাসনামলে ইমাম শাকেয়ির (৭৬৭-৮২০) ছাত্র ইউসুফ ইবনে ইয়াইয়া বৃতত্তয়ারীকে অত্যাচার ও নিপীড়নের শিকার হতে হয় এবং আহমদ ইবনে নাসর খাযায়ীকে শূলে ছড়িয়ে হত্যা করা হয়। এটি সুস্পষ্টকে আল মামুনের চেষ্টায় মুতাজিলা মতবাদ অত্যন্ত জনপ্রিয় মতবাদে পরিণত হয় এবং মুসলিম জাহানের চিন্তাবিদদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এটি মুসলিম স্পেনেও বিস্তার লাভ করে।

মুতাজিলা মতবাদের পতন Fall of Mutazila
খলিফা আল মামুনের পর তার দুই উত্তরাধিকারী খলিফা আল মুতাসিম ও খলিফা আল ওয়াসিক মুতাজিলা মতবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। কিন্তু খলিফা আল ওয়াসিকের মৃত্যুর পর আব্বাসীয় খলিফা আল মুতাওয়াক্কিল (শাসনকাল ৮১৭-৮৬১) বাগদাদের শাসন পথে অটল নিষ্ঠা লক্ষ করে অভিভূত হয়ে পড়েন। তিনি বিষয়টি তলিয়ে দেখে অনুভব করলেন যে, মুতাজিলা তার্কিকরা ইলমে দ্বীনের প্রতিনিধিত্বকারী নয়, রাসূল (সা.)-এর আমলের সমন্বয়ে গঠিত অটল ব্যক্তিত্বের অধিকারীগণ। এ উপলব্ধির ভিত্তিতেই আল মুতায়াক্কিল ইমাম সাহেবকে কারামুক্ত করেন। মুতাজিলাদের প্রতি পূর্বতন সরকারি নীতিও পরিবর্তিত হয়। এ সময় থেকেই মুতাজিলা মতবাদের পতন শুরু হয়। পরে দের শতাব্দীর মধ্যে তা বিলুপ্ত প্রায় হয়। কারণ আল মুতাওয়াক্কিল ও পরবর্তী খলিফাগণ মুতাজিলা মতবাদের প্রচার নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন।
মুতাজিলা মতবাদ ছিল শাস্ত্রীয় বিধান ও বাণীকে যুক্তির আলোকে ব্যাখ্যা করার একটি শক্তিশালী আন্দোলন। এ কথা অনস্বীকার্য যে, মুতাজিলা সম্প্রদায় একমাত্র যারা বিশ^াসের মাধ্যমে সমস্ত কিছুকে যুক্তি দিয়ে প্রমাণিত করার প্রয়াস গ্রহণ করেছেন। প্রথমে তারা বুদ্ধিকে অস্বীকার করলেও চূড়ান্ত বিচারে বুদ্ধিকে গ্রহণ করেছেন। তাই মুতাজিলাদের বুদ্ধিবাদের গুরুত্ব মুসলিম দর্শনে অনস্বীকার্য। মুতাজিলারা ছিলেন প্রধানত চিন্তাবিদ এবং সে কারণেই বিভিন্ন ধর্মীয় ও দার্শনিক প্রশ্নে তারা পোষণ করতেন নিজস্ব স্বতন্ত্র মত। (চলবে)
লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply