post

রক্তপিচ্ছিল পথ মাড়িয়ে ৪৭ বছর

ছাত্রসংবাদ ডেস্ক

০৪ নভেম্বর ২০২৩

স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে ১৯৭৭ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। শত ঝঞ্ঝার পথ মাড়িয়ে ৪৭ বছরের দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে যাচ্ছে এই সংগঠন। সময়ের পরিক্রমায় ইসলামী ছাত্রশিবির আজ একটি আলোকিত ও বিকশিত সংগঠন। ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এখন ইসলামী ছাত্রশিবির দ্বীনের সুমহান আদর্শের দাওয়াত ছাত্রদের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।

আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইসলামী ছাত্রশিবির

স্বাধীনতার পরে ধর্মবিমুখ জাতি গঠনের কাজ জোরেশোরেই শুরু হয়। ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের মাধ্যমে শিক্ষার প্রতিটি স্তর থেকে ইসলামী আদর্শের পাঠ্যক্রম সরিয়ে ফেলা হয়। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে মূলত ধর্মহীন শিক্ষার প্রচলন শুরু হয়। একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার মতো শিক্ষাব্যবস্থার কোন স্তরেই তেমন কোন পাঠ্যক্রম রাখা হয়নি। অথচ ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থারমাধ্যমে নৈতিক মানবিক মূল্যবোধে জাতিগঠন অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সেই শূণ্যতা পূরণের লক্ষ্যে আল্লাহভীরু ও ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ গঠনের জন্য কুরআন, হাদিস এবং ইসলামী সাহিত্যের সমন্বয়ে একটি নিজস্ব ইসলামী কারিকুলাম প্রণয়ন করেছে। একজন আদর্শবান মানুষ গড়ার জন্য শিবিরের রয়েছে সমৃদ্ধ সাহিত্য ভান্ডার। অনলাইন লাইব্রেরির পাশাপাশি রয়েছে দেশের সকল থানা, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে অসংখ্য পাঠাগার। যা আলোকিত করছে অসংখ্য ছাত্র ও সাধারণ মানুষকে। 

পরিবেশ সংরক্ষণে শিবির

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির বৈশ্বিক উষ্ণতা রক্ষায় প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রাখতে যেমনি ভূমিকা পালন করছে তেমনি আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতার মধ্যদিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশকে ইতিবাচক ভঙ্গিতে সাজিয়ে জীবনবোধকে সুন্দরের পথে এগিয়ে নিতে সচেষ্ট। প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপন ও সবুজায়ন কর্মসূচির কোন বিকল্প নেই। তাইতো শিবির ২০২৩ সালে ‘একটি হলেও বৃক্ষ রোপণ করবো জনে জনে, সবুজ দেশের সুস্থ বাতাস লাগুক সবার প্রাণে’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ৫০ হাজার বৃক্ষ রোপণের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। ২০২৩ সালে সর্বমোট ১,৮৮,৪৪১টি বৃক্ষ রোপণ ও বিতরণ করে ইসলামী ছাত্রশিবির। এছাড়া বৃক্ষনিধন রোধে জনসচেতনতা তৈরি, স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন, বৃক্ষরোপণে উদ্বুদ্ধকরণের জন্য বর্ণাঢ্য র‌্যালি, ব্যানার, ফেস্টুন ও স্টিকার লাগানোর মাধ্যমে কর্মসূচি পালন করে ছাত্রশিবির। এতে পরিবেশ উন্নয়নে অবদান রাখার পাশাপাশি প্রত্যেক জনশক্তির মধ্যে পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা ও দেশপ্রেম জাগ্রত করা সহজ হচ্ছে। এটাও এক ধরনের সাদাকায়ে জারিয়াহ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান, হাত ধোয়া দিবস পালন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ক্যাম্পেইনসহ সমাজ-সংস্কৃতির বিশুদ্ধতায় অনবদ্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে ছাত্রশিবির।

দুর্যোগ মোকাবিলায় জনতার পাশে

১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯১, ১৯৯৮, ২০০০, ২০০১-এর প্রলয়ংকরী বন্যার পর শিবিরের ত্রাণবিতরণ কর্মসূচি সবাইকে অভিভূত করেছে। ২০০৭-এ সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত দক্ষিণাঞ্চলের জনপদে শিবির কেবল ত্রাণ প্রদানই করেনি; বরং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার করেছে আটকে পড়া দুর্গত মানুষদের। একইভাবে ২০০৯ সালে পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা ও খুলনা এলাকার আইলা আক্রান্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ায় শিবির। ২০১৭ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের বন্যায় দেশের রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, বগুড়া, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও নীলফামারী এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট ও সুনামগঞ্জ অতি ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে। শিবির এই দুর্যোগ মুহূর্তে বন্যাপীড়িতদের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে। ২০২২ সালের জুন মাসে বর্ষা মৌসুমের শুরুতে বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বভাগের অঞ্চলগুলোতে প্রবল বন্যার কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সিলেট, সুনামগঞ্জ, শেরপুর, লালমনিরহাট, নেত্রকোণা, টাঙ্গাইল, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রামসহ ১০টি জেলায় শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ এবং নগদ অর্থসহ প্রায় কোটি টাকার সহায়তা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল ইসলামী ছাত্রশিবির। 

জাতীয় সংকটে বীরোচিত ভূমিকা

রাজনৈতিক অঙ্গনের জাতীয় সংকটেও শিবির সাহসের সাথে ময়দানে ভূমিকা পালন করে আসছে। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম শরিক ছিল ইসলামী ছাত্রশিবির। সে আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, টি.এস.সি, শাহবাগ ও দোয়েল চত্বরকেন্দ্রিক যে বিশাল ছাত্রজমায়েত ও আন্দোলন গড়ে ওঠে তার অন্যতম সংগঠক ছিল ইসলামী ছাত্রশিবির। শিবিরের বহু নেতা-কর্মী স্বৈরশাসকের হাতে নিহত ও বন্দি হলেও শিবির মুহূর্তের জন্যও ঘাবড়ে যায়নি। শিবিরের বিশাল সমাবেশ ও মিছিল ছাত্রজনতার প্রাণে নতুন আশা ও প্রেরণা সঞ্চার করেছে। ১৯৯২ সালে শিবিরকে রাখতে হয়েছে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা-যা বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। গণআদালতের ধোঁয়া তুলে পরিচালিত তাণ্ডবের প্রতিবাদে শিবির ছিল ময়দানের লড়াকু শক্তি। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির এক মহাক্রান্তিকাল। ১৯৯৬-এর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা দলটি পর্যায়ক্রমে একদলীয় স্বৈরাচারে রূপ নিলে দেশের অন্যসব ছাত্রসংগঠনসহ শিবির গড়ে তোলে ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’, যার নিরলস প্রয়াসে দেশ ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসে। ১৯৯৯ সালে বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের ধর্মদ্রোহিতার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করে শিবির তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে। ২০০১ সালের নির্বাচনে শিবিরের ভূমিকা ছিল প্রচণ্ড প্রত্যয়দীপ্ত, পরিশ্রমী ও আত্মত্যাগী। বিষয়টি সর্বজনবিদিত ও প্রশংসিত হয়। ২০০৫-এ শিবির সার্ক শীর্ষ সম্মেলন নিয়ে গড়ে ওঠা অস্থিতিশীল ও দোদুল্যমান পরিস্থিতি এবং ৬৩ জেলায় চেইন বোমা হামলার ঘটনার পর দেশের সচেতন দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদদের নিয়ে আয়োজন করেছে গোলটেবিল বৈঠকের। এ আয়োজন ও আলোচনা দেশ ও জাতিকে নতুন আশায় উজ্জীবিত করেছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামকে তথাকথিত শান্তিচুক্তির নামে মূল ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করার অবিমৃষ্যকারিতার বিরুদ্ধে গণচেতনা সৃষ্টি, আত্মঘাতী ট্রানজিট ইস্যুতে প্রতিবাদী ভূমিকা পালন, বিতর্কিত কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের নামে ধর্মহীন সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের সরকারি উদ্যোগের বিরুদ্ধে আন্দোলনসহ প্রতিটি জাতীয় ইস্যুতে শিবিরের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। 

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর এ দেশের ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনকে নিশ্চিহ্ন করতে লগি-বৈঠার তাণ্ডব মোকাবিলায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। সেই দিন ওই সমাবেশে ঘটনাস্থলেই নিহত হন জামায়াত-শিবিরের ৫ জন নেতা-কর্মী। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে তথাকথিত আঁতাতের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আরোহণ করেই সেনাবাহিনীকে পঙ্গু করে দেওয়ার নীল নকশা করে আওয়ামী লীগ। ২০০৯ সালের ২৫শে ও ২৬শে ফেব্রুয়ারি ঘটে যায় বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহতম হত্যাকাণ্ড। সংঘটিত পিলখানা ট্র্যাজেডি ও বিডিআর হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। নিহত সেনা সদস্যদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দুআর আয়োজন করে। দোষীদের আটক ও শাস্তি বিধানের দাবিতে মানববন্ধন, নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা করে তাদের পাশে দাঁড়ায়।

২০০৮ সালে ক্ষমতালাভের পর থেকেই ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও সেইসঙ্গে খোদ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হত্যা, গুম, খুন, রাহাজানি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তিবাণিজ্য, চুরি-ডাকাতি, মাদকব্যবসা এবং সন্ত্রাসী তৎপরতা শুরু করে। ২০১৩ সালে দেশব্যাপী ছাত্রশিবির রাজবন্দি মুক্তি আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। অবৈধভাবে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে ২০১৪ সালে ৫ই জানুয়ারি নীলনকশার জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করে। সে নির্বাচনকে বিএনপি-জামায়াতসহ ১৮ দলীয় জোট প্রত্যাখ্যান করে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। শিবিরের বহু নেতা-কর্মী স্বৈরাচার হাসিনার হাতে গুম, নিহত ও বন্দি হলেও এ সংগঠন মুহূর্তের জন্যও বিচলিত হয়নি।

২০২০ সাল করোনা ভাইরাস সারা বিশ্বে মহামারিতে পরিণত হয়ে। বিশ্বের ১৮৩টি দেশে এ ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে এবং ইতালি, স্পেন, আমেরিকা, ইরানসহ বিশ্বের বেশ কিছু দেশে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বাংলাদেশ করোনায় উচ্চ ঝুঁকিতে ছিল। করোনা ভাইরাস সংক্রমন পরিস্থিতি উত্তরণে জনগণের পাশে দাঁড়াতে ‘ফ্রি করোনা কেয়ার’-এর মাধ্যমে সারা দেশে মোবাইলে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। ২০২০ সালের ৩১শে মার্চ হতে এ কার্যক্রম শুরু হয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। সেবা প্রদানকারী চিকিৎসকগণ সকাল ৭:০০টা থেকে রাত ১০:০০টা পর্যন্ত পালাক্রমে এসব সেবা প্রদান করেন। ২০২২ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে মদের লাইসেন্স দেওয়ার ঘৃণ্য সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ এবং অবিলম্বে এ সিদ্ধান্ত বাতিলের জোর দাবি জানিয়ে বিবৃতি প্রদান করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। পাশাপাশি সমগ্র দেশজুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে সারা দেশের সর্বস্তরের মানুষকে সোচ্চার করে তোলে।

২০২২ ও ২০২৩ সালে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হতে থাকে। তথাকথিত গণতন্ত্রের মানসকন্যা ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা তার ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য দেশব্যাপী চালিয়ে যান ব্যাপক মামলা, গ্রেফতার, হত্যা, বিচারের নামে সাজা প্রদান ইত্যাদি গর্হিত কাজ। এমন পরিস্থিতিতে ইসলামী ছাত্রশিবির ময়দানে ব্যাপক সরব ভূমিকা পালন করে। 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি

বিশ্ব ছাত্র ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম বৃহৎ সংগঠন হিসেবে ছাত্রশিবিরের ভূমিকা বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। মুসলিম বিশ্বের সংকট নিরসনে WAMY, IIFSO, AFMY-সহ আন্তর্জাতিক সংগঠনসমূহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে ছাত্রশিবির প্রেরিত প্রতিনিধি। তুরস্ক, ইরান, মালয়েশিয়া, জর্ডান, সৌদি আরব, সুদানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক সম্মেলনসমূহে ইসলামী ছাত্রশিবির দিকনির্দেশনামূলক ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠার তৃতীয় বছরে WAMY-এর সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৮২ সালে শিবির IIFSO-এর সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৯১ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি লন্ডনে YMO’র সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ১৯৯২ সালে কেন্দ্রীয় সভাপতি আ.জ.ম. ওবায়েদুল্লাহ সুদানের রাজধানী খার্তুমে IIFSO-এর আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। এ সম্মেলনে শিবিরের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় সভাপতি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের IIFSO-এর সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন। ১৯৯৩ সালে WAMY-এর আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কুয়ালালামপুরে। এ সম্মেলনেও শিবিরের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। ১৯৯৬ সালে তুরস্কের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের তদানীন্তন কেন্দ্রীয় সভাপতি যোগদান করে বিশ্ব ছাত্র যুব আন্দোলনকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৯৭ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি আন্তর্জাতিক যুব সম্মেলন ও ইস্তাম্বুলের বিজয়বার্ষিকী উপলক্ষ্যে তুরস্ক গমন করেন। সেখানে তিনি তুরস্কের বিভিন্ন শহরে অনেকগুলো কনফারেন্সে যোগদান করেন। এ সময় তিনি বাহরাইনও সফর করেন। ১৯৯৮ সালে শিবিরের তদানীন্তন কেন্দ্রীয় সভাপতি জনাব মতিউর রহমান আকন্দ জর্ডানে অনুষ্ঠিত WAMY-র আন্তর্জাতিক সম্মেলনে Youth and Contemporary Challenge-এর ওপর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন এবং WAMY-র Asia Pacific অঞ্চলের প্যানেল ডাইরেক্টরের অন্তর্ভুক্ত হন। ১৯৯৯ সালে তিনি সুদানের রাজধানী খাতুমে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ছাত্র যুব সম্মেলনে যোগ দেন। প্রায় ৮০টি দেশের প্রতিনিধিরা ওই সম্মেলনে যোগদান করেন। বিদায়ী শতাব্দীর শেষ ও নতুন শতাব্দীর আগমনের প্রাক্কালে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্র ও যুব আন্দোলনের ভূমিকা শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এশিয়া মহাদেশে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সভাপতি বক্তব্য রাখেন। তিনি তার বক্তব্যে সমগ্র বিশ্বের ছাত্র ও যুব সংগঠনসমূহকে একমঞ্চে সমবেত হয়ে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় বিকল্প অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও আকাশ-সংস্কৃতির মোকাবিলায় মুসলিম বিশ্বের বিত্তশালী দেশের ব্যক্তিদের নিয়ে ফান্ড তৈরি করে ব্রডকাস্টিং নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন। সম্মেলনে শিবির সভাপতির এ প্রস্তাব গৃহীত হয়। শিবির সভাপতির আবেগময়ী বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে সুদানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিবির সভাপতিকে হজরত মুসা (আ.)-এর স্মৃতির প্রতীক লাঠি উপহার দেন। ওই সম্মেলনে শিবিরের সভাপতি World Parliament-এর সদস্য হিসেবে মনোনীত হন। শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ তাহের ওয়ামীর এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ডিরেক্টর ও ইফসুর সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে মনোনীত হয়ে দীর্ঘদিন সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০০ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি জনাব এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ইসলামিক ফোরাম অব ইউরোপ ও ওয়ামী সম্মেলন উপলক্ষ্যে ইংল্যান্ডে যান। তিনি সেখানে ইংল্যান্ড ও ইতালির বিভিন্ন শহরে ইসলামিক ফোরাম অব ইউরোপের ভিন্ন ভিন্ন সম্মেলনে যোগদান করেন। তিনি জমিয়ত-ই-তালাবা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে পাকিস্তান সফর করেন। ২০০১ সালে এশিয়া মহাদেশের ছাত্র ও যুবকদের সংগঠন নিয়ে গঠিত হয় এশিয়ান ফেডারেশন অব মুসলিম ইউথ। ইসলামী ছাত্রশিবির AFMY-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাকালীন সম্মেলনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিনিধিত্ব করেন তৎকালীন বিদেশবিষয়ক সম্পাদক। AFMY-এর উদ্যোগে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত মাসব্যাপী ট্রেইনিং প্রোগ্রামে ছাত্রশিবিরের প্রতিনিধিত্ব করেন কেন্দ্রীয় বিদেশ বিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি। ২০০১ সালে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি জনাব মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম বুলবুল WAMY-এর উদ্যোগে World Youth Conference-এ যোগদানের উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়া গমন করেন। ২০০২ সালে তিনি WAMY-এর উদ্যোগে রিয়াদে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বার্ষিকী সম্মেলনে Muslim Youth and Globalization শীর্ষক কনফারেন্সে যোগদান করেন। উক্ত সম্মেলনে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি এশিয়ান ফেডারেশন অব মুসলিম ইয়ুথ-এর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মনোনীত হন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে ২০০৭, ২০০৮, ২০০৯ সালে শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতিগণ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এসব কনফারেন্সে শিবির নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ Islamic Scholars Leader-দের সাথে মতবিনিময় করেন। ২০০৮ সালে তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ রেজাউল করিম IIUM-এর দাওয়াতে মালয়েশিয়া সফর করেন। সেখানে তিনি কনফারেন্সে অংশগ্রহণ ছাড়াও আনোয়ার ইব্রাহীমসহ অনরস (আবিম) নেতৃবৃন্দ ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তার সফরসঙ্গী ছিলেন তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল। ২০০৯ সালের প্রথম দিকে কেন্দ্রীয় সভাপতি মুহাম্মদ রেজাউল করিম IYF (International Youth Forum)-এর আমন্ত্রণে তুরস্ক সফরে যান। সেখানে তিনি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর একটি তথ্যবহুল প্রবন্ধও উপস্থাপন করেন। একই বছর ১৯শে নভেম্বর তিনি হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব গমন করেন। সেখানে তিনি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের সাথে মতবিনিময় করেন। ২০১০ সাল পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কার্যক্রম কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে।

২০১৬ সালে শিবিরের প্রতিনিধি হিসেবে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাহিত্য সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম ও আন্তর্জাতিক সম্পাদক সালাহউদ্দিন আইউবী IYF (International Youth Forum)-এর আমন্ত্রণে তুরস্ক সফরে যান। সেখানে তারা কনফারেন্সে অংশগ্রহণ ছাড়াও IYF প্রেসিডেন্ট ইয়ালমিন বেলচিন, সাদাত পার্টি, একে পার্টিসহ বিভিন্ন দেশের দাওয়াহ সংগঠন এবং ছাত্রসংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ করেন।

২০১৯ সালে শিবিরের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি ড. মোবারক হোসাইন হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব গমন করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইসলামী ব্যক্তিত্বদের সাথে মতবিনিময় করেন। ২০১৯ সালের মার্চ মাসে শিবিরের প্রতিনিধি হিসেবে কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক IIFSO (International Islamic Federation of Student Organizations)-এর আমন্ত্রণে তুরস্ক সফরে যান। সেখানে তিনি কনফারেন্সে অংশগ্রহণ ছাড়াও আহমেদ তুতুঞ্জি, সাদাত পার্টি, একে পার্টিসহ বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ করেন। একই বছর এপ্রিল মাসে শিবিরের প্রতিনিধি হিসেবে কেন্দ্রীয় সাহিত্য সম্পাদক WAMY (World Assembly of Muslim Youth)-এর আমন্ত্রণে WAMY Quadrennial Conference-এ অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার প্রজাতান্ত্রিক দেশ জিবুতি সফরে যান। সেখানে তিনি কনফারেন্সে অংশগ্রহণ ছাড়াও ওয়ামির তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল ড. সালিহ আল ওয়াহিবিসহ বিশ্বের প্রায় ৩৭টি দেশের দাওয়াহ এবং ছাত্রসংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ করেন।

২০২২ সালে শিবিরের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি রাশেদুল ইসলাম হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব গমন করেন। সেখানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইসলামী ব্যক্তিত্বদের সাথে মতবিনিময় করেন এবং বেশ কিছু প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। ২০২২ সালের ছাত্রশিবিরের প্রতিনিধি হিসেবে কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক The Pioneers Of The Youth Of The Islamic World Forum-এর আমন্ত্রণে তুরস্ক সফরে যান। সেখানে তিনি একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশগ্রহণ ছাড়াও IIFSO প্রেসিডেন্ট আনাস ইয়ালমেন, IYF প্রেসিডেন্ট ইয়ালমিন বেলচিন, সাদাত পার্টি, একে পার্টিসহ বিশ্বের প্রায় ২৫টি দেশের দাওয়াহ সংগঠন এবং ছাত্রসংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ করেন।

শেষকথা

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আল্লাহর পথে পরীক্ষিত এক দুঃসাহসী কাফেলা। বিগত সাতল্লিশ বছরে ধাপে ধাপে সংগঠনকে এগিয়ে নিয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির। দেশের প্রতিটি গ্রাম, শহর নগরে শিবিরের সাংগঠনিক মজবুতি তৈরি হয়েছে। হাজারো জুলুম, নির্যাতন, হত্যা, সন্ত্রাস এবং নানাবিধ অপপ্রচারকে মোকাবিলা করে শিবির তার নৈতিক স্বচ্ছতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। সন্ত্রাস, মাদক এবং বিশ্বায়নের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মোকাবিলায় ইসলামী ছাত্রশিবিরই এখন সকল নাগরিকের ভরসার স্থল। স্বদেশপ্রেমের বাটখারায় শিবির আজ এক বিপ্লবী কাফেলা এবং এক অকুতোভয় তারুণ্যের নাম। ঐতিহ্য সংরক্ষণ, ইতিহাস সৃষ্টি আর গৌরবময় ভবিষ্যৎ রচনার বিরামহীন প্রয়াসই শিবিরের পাথেয়। অন্য সংগঠনের যেখানে প্রায় সময় প্রাপ্তিযোগ ঘটে, সেক্ষেত্রে শিবিরকর্মীদেরকে আর্থিক ও কায়িক কুরবানিতে শরিক হতে হয়। মহান আল্লাহ তায়ালা এই সংগঠনের সকল-ত্যাগ কুরবানি কবুল করুন এবং আমাদেরকে সকল বাধা মাড়িয়ে ইস্তিকামাতের সাথে পথচলার মধ্যদিয়ে মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছার তৌফিক দিন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির