শতাব্দীর দুই বাতিঘর রেনেসাঁর কবি ও গোড়ানের সচিব -আহসান হাবীব ইমরোজ

[১ম পর্ব]

৮ই জুন, অপরাহ্ণ জ্যৈষ্ঠের পঁচিশ তারিখ। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, বাটিচালান দিয়েও সূর্যমামাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ঘুম-ঘুম পরিবেশ। হঠাৎ ইসমাইল আহসান চঞ্চলের ফোন; আর চঞ্চলের ফোন মানেইতো হুলুস্থুল। চঞ্চল, এক্কেবারে খাপেখাপ নাম রেখেছেন তার নানী।
সিরাজগঞ্জের এক দুরন্ত কিশোর চেগা মিয়া বাবা-মাকে হারিয়ে আসামের ভাসানচরে গিয়ে বাঙালিদের পক্ষে আন্দোলন করে অনেক পপুলার হলেন। শেষমেশ ডেরা বাঁধলেন কাগমারী, টাঙ্গাইলে। সারা বিশ্বের মানুষ তাঁকে চেনে আফ্রো-এশিয়ার মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী নামে। এরই তিন ক্রোশ দক্ষিণে ঝুনকাইয়ের চরে ইসমাইলদের বাড়ি। সে যখন এক নিঃশ্বাসে বললো, চলুন শাহ আব্দুল হান্নান চাচার কবর জিয়ারত করে আসি। কথা না বাড়িয়ে এক লহমাতেই রাজি হয়ে গেলাম।
আমাদের শৈশবকালের প্রায় ১০০ বছর আগে সাভারের সন্নিকটে জন্মেছিলেন দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার। তার ঝুলি, থলে জাতীয় বিখ্যাত চারটি রূপকথার বই আছে। বিশেষ করে ঠাকুরমার ঝুলি এক কথায় মাস্টারপিস। বাংলা শিশুসাহিত্যের একটি জনপ্রিয় রূপকথার সঙ্কলন।
এই রূপকথার গল্পগুলো সংগৃহীত হয়েছিলো তৎকালীন বৃহত্তর মোমেনশাহীর গ্রামাঞ্চল থেকে। ঠাকুরমার ঝুলির ৮৪টি চিত্র অঙ্কন করেছেন গ্রন্থকার নিজেই। ১৯০৬ সালে প্রকাশিত বইটির ভূমিকা লিখেছিলেন স্বয়ং রবিঠাকুর। এরপর শত শত সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। সত্তর বছর পরে আমরা যখন শিশু বুনো ফড়িং ছিলাম ঠাকুরমার ঝুলির জাল থেকে তখনও রক্ষা পাইনি। সেই সব বইয়ে কিছু ধরাবাঁধা শব্দ বা শব্দবন্ধ ছিলো যেমন, তেপান্তর, সাত সমুদ্র তেরো নদী।
একুশ শতকে জন্মানো শিশু-কিশোররা কি সেই সব শব্দের মর্ম বুঝবে? তবে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটানোর উপায় একটা আছে বৈকি। সেটি হলো টঙ্গী বা ঢাকার উত্তরা থেকে গাড়িতে পুরান ঢাকা, যাত্রাবাড়ী কিংবা শাহজাহানপুরে যাওয়া। যদি বাইকে যাওয়া যায় তবে পুরোদস্তুর পঙ্খিরাজের ফিলিংস পাওয়া সম্ভব। সাথে তেপান্তর, সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দেয়ার মর্ম বুঝা যাবে, হাতে-কলমে। আর কে না জানে এ শতকে হাতে-কলমে শিক্ষার গুরুত্ব কত বেশি। গুগল, মাইক্রোসফট থেকে পচা সাবান আর ঠেঙ্গামারা মহিলা সমিতি সবার ইন্টারভিউয়ের টেবিলে একই প্রশ্ন।
যাহোক সে রকম তেপান্তর, সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে উত্তরা থেকে দেড় ঘণ্টায় শাহাজাহানপুর এসে পৌঁছলাম। তখন মাগরিবের আজান হচ্ছে, সুরেলা আজান হলেই আমার মন চলে যায় কায়কোবাদের বিখ্যাত আজান কবিতায়।
মাগরিবের শেষে শাহজাহানপুর কবরস্থানে চাচার কবরের পাশে দাঁড়ালাম। চাচার প্রতি শ্রদ্ধায় আপ্লুত কেয়ারটেকার বললেন, আজই চাচার এক সহোদর বোন মারা গেছেন, পাশেই কবর দেয়া হয়েছে। প্রাণ খুলে দোয়া করলাম পরম শান্তির আধার রবের দরবারে, চাচার জন্য, তার বোনের জন্য, কবরস্থানের সবার প্রতি এমনকি সমগ্র মানবতার জন্য।
এরপর ফররুখ আহমদের খোঁজে হাঁটাপথে বে-নজীরের বাগানবাড়ী এলাম। কবি বে-নজীরের বাসায় কড়া নাড়লাম, ছেলে মারা গেছেন আগেই। দুই নাতিই বাইরে আছে জানালো তরুণ কেয়ারটেকার। সারি সারি অট্টালিকার অট্টহাসি সর্বপশ্চিমে একটি অন্ধকার গলিঘুপচির মতো রাস্তা। একজন বয়স্ক মানুষ বললেন, এটিই মসজিদের রাস্তা। টয়লেট ওজুখানার পাশেই এক টুকরো ঘের দেওয়া জমি এটিই কবি বে-নজীর আহমদের পারিবারিক কবরস্থান। এখানেই রেনেসাঁর কবি ফররুখের কবর। পরবর্তীকালে বে-নজীর আহমদের মৃত্যুর পর তাঁকেও পাশাপাশি দাফন করা হয়। তাঁদের পাশেই শুয়ে আছেন আরেক বিখ্যাত ব্যক্তি কবি বে-নজীর আহমদের একান্ত বন্ধু ফজলুল হক শেলবর্ষী। ফাতেহা ও দোয়া পড়লাম। বুদবুদ আকারে দীর্ঘশ্বাস মিলিয়ে গেল।
আহারে! জাতির জন্য যারা সর্বস্ব বিলিয়েছেন তাদের নামফলক, পরিচিতিটুকুও কোথাও নেই। এই মহামানবদের দরকার নেই, আমাদের তরুণ প্রজন্মকে জাগাতে দরকার ছিলো। হায়! কত হতভাগা এই জাতি!

এক. রেনেসাঁর কবি : ফররুখ আহমদ
ডাহুকের মতো মন উড়ে যায় ১৫০ বছর আগে কপোতাক্ষের তীরে, মাইকেল মধুসূদনের নীড়ে। মেঘনাদ বধ কাব্যের বিপুল জনপ্রিয়তার পর মাইকেল তার বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে লেখা চিঠিতে আক্ষেপ করে বলেছিলেন;
“বঙ্গ-ভারতে মুসলমানদের মধ্যে বড় কোনো কবি জন্ম নিলে কারবালা নিয়ে চমৎকার এক মহাকাব্য লিখতে পারতেন।” তার এই আক্ষেপ মোচনের দায় নিতে কেউ তখন সাহসী হয়নি। কিন্তু শত বছর পর মাইকেলের স্বপ্নকে ছাপিয়ে একজন সাতসাগরের মাঝির আবির্ভাব ঘটেছিল তিনি রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ।
মাইকেল রচিত মহাকাব্য ‘মেঘনাদ বধ’-এর পরে অন্যতম সফল মহাকাব্য ফররুখের ‘হাতেম তায়ী’। মুসলিম কবিদের মধ্যে কাব্যনাটক রচনারও পথিকৃৎ তিনি, ‘নৌফেল ও হাতেম’ এর উজ্জ্বলতম উদাহরণ। আর বাংলা সাহিত্যে মাইকেলের পরে তিনিই সফল সনেট রচনাকারী।
ফররুখ আহমদ ১৯১৮ সালের ১০ জুন মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানার মাঝআইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এ গ্রামের পাশেই ছোট্ট নদী মধুমতি। কবির জীবনে এ নদী ও জন্মস্থানের অনেক স্মৃতি বিজড়িত রয়েছে। কবির লেখা একটি বিখ্যাত কবিতার নাম ‘মধুমতি’।
কবি যেদিন ভূমিষ্ঠ হন, সেদিন ছিল রমযানের প্রথম দিন। তাই দাদী তার নাম রাখেন ‘রমযান’। বাবা পুলিশ অফিসার খান সাহেব সৈয়দ হাতেম আলী ছেলের নাম রাখেন সৈয়দ ফররুখ আহমদ। কবি পরে নিজের নাম থেকে বিনয়ের কারণে ‘সৈয়দ’ শব্দটি বাদ দেন। তিন ভাই ও এক বোনের ভিতর তিনি ছিলেন মেজো।
ফররুখের মাত্র দুই বছর বয়সে মাতা রওশন আখতার জাহান মারা যান। তিনি বড় হন জমিদারকন্যা, জ্ঞানী এবং দীর্ঘজীবী দাদীর আশ্রয়ে। দাদী এক বিদুষী মহিলা রেখে ফররুখকে আরবী, ফারসিসহ প্রয়োজনীয় গৃহশিক্ষা দেন। গ্রামের পাঠশালা শেষে পরবর্তীতে কলকাতায় তালতলা মডেল এম. ই স্কুলে এবং তারপর বিখ্যাত বালিগঞ্জ সরকারি হাইস্কুলে ভর্তি হন। সে সময় কবি গোলাম মোস্তফা ছিলেন এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। প্রাথমিক জীবনে তার কবিত্ব বিকাশে কবি গোলাম মোস্তফা ব্যাপক উৎসাহ প্রদান করেন।
১৯৩৭ সালে খুলনা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে এবং ১৯৩৯ সালে কলকাতার রিপন কলেজ হতে আইএ পাস করেন। স্কটিশচার্চ ও সিটি কলেজে প্রথমে দর্শন পরে ইংরেজিতে অনার্সে ভর্তি হন। কিন্তু পড়াশোনা আর শেষ করতে পারেননি।
এখানে তার শিক্ষক ছিলেন ত্রিশোত্তর যুগের প্রখ্যাত কবি বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, প্রমথনাথ বিশী প্রমুখ। প্রমথনাথ বিশী একদিন ক্লাসে পড়ানোর সময় ফররুখের নোটবই নিয়ে অনেকগুলো সনেট পড়ে বিস্মিত হন। অতঃপর শিক্ষক কমনরুমে এসে ফররুখের খাতা থেকে সনেট পাঠ করে শুনান এবং আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আজ আমি একজন তরুণ শেকসপিয়রকে আবিষ্কার করেছি।”
মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৩৬ সালে খুলনা জিলা স্কুল ম্যাগাজিনে তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়।
বিষ্টি নামে রিমঝিমিয়ে/রিমঝিমিয়ে রিমঝিমিয়ে,
টিনের চালে গাছের ডালে/বিষ্টি ঝরে হাওয়ার তালে।
১৯৩৭ সালে বুলবুল পত্রিকার ‘রাত্রি’ এবং মাসিক মোহাম্মদীতে ‘পাপ-জন্ম’ নামে প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়।
চল্লিশের দশকে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনে গণজাগরণমূলক কবিতা লিখে কবি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা কবিতায় আরবী, ফারসি শব্দের যে সার্থক প্রয়োগ শুরু করেন, মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ তা আরও বেগবান করেন। ইসলামী আদর্শ ও আরব-পারস্যের ঐতিহ্য তার কবিতায় প্রজ্বলিত হয়ে ওঠে। তিনি ছিলেন মুসলিম পুনর্জাগরণে বিশ্বাসী।
১৯৪৩ সালে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ নিয়ে ফররুখ আহমদ প্রায় ১৯টি কবিতা রচনা করেন। সেগুলো নিয়ে কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ‘আকাল’ নামে একটি সঙ্কলন প্রকাশ করেন। তাতে বিখ্যাত ‘লাশ’ কবিতাটিও স্থান পায়। দুর্ভিক্ষ নিয়ে অদ্যাবধি বাংলা সাহিত্যে ‘লাশ’ এর মতো কবিতা আর কেউ লিখতে পারেননি। এতে কবির ব্যথিত উচ্চারণ-
“যেখানে পথের পাশে মুখ গুঁজে প’ড়ে আছে জমিনের ’পর;
সন্ধ্যার জনতা জানি কোনোদিন রাখেনা সে মৃতের খবর।”

কবি ফররুখ আহমদের প্রধান কাব্যগ্রন্থগুলো হলো- ‘সাত সাগরের মাঝি’ (১৯৪৪), ‘সিরাজাম মুনিরা’ (১৯৫২), ‘নৌফেল ও হাতেম’ (১৯৬১), ‘মুহূর্তের কবিতা’ (১৯৬৩), ‘ধোলাই কাব্য’ (১৯৬৩), ‘হাতেম তায়ী’ (১৯৬৬)।
শিশুসাহিত্যেও তিনি অতুলনীয় ছিলেন। তার রচিত প্রধান শিশুতোষ গ্রন্থ হলো- ‘পাখির বাসা’ (১৯৬৫), ‘হরফের ছড়া’ (১৯৭০), ‘চাঁদের আসর’ (১৯৭০), ‘ছড়ার আসর’ (১৯৭০)।
১৯৫০ সালে ‘ইস্ট বেঙ্গল টেক্সট বুক কমিটি’ কবি ফররুখের রচিত ‘নয়া জামাত’ বইটির নানা অংশ পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণির জন্য পাঠ্যতালিকাভুক্ত করে। এবং তার লেখা সাত সাগরের মাঝি, ডাহুক, সিন্দাবাদ, শ্রাবণের বৃষ্টি প্রভৃতি অমর কবিতাও বিভিন্ন শ্রেণিতে পাঠ্যতালিকাভুক্ত হয়।
তার প্রথম প্রকাশিত ও শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি অমর হয়ে আছেন। এর প্রকাশক কবি বে-নজীর আহমদ। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন। মুসলিম ঐতিহ্যের পুনর্জীবন কামনা করে রোমান্টিকতার আবহে কবি জাতিকে জেগে ওঠার আহ্বান করেছেন। অন্যরা যখন জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প সাহিত্যে এগিয়ে যাচ্ছে কবি তখন পিছিয়ে পড়া তার নিজ জাতিকে জেগে ওঠার ডাক দেন। কবির আহবান-
“কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হল জানিনা তা
নারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা।
দুয়ারে তোমার সাত সাগরের জোয়ার এনেছে ফেনা
তবু জাগলে না? তবু তুমি জাগলে না?

সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন, ‘ফররুখের কাব্যপ্রক্রিয়ায় যেহেতু একটা বিশ্বাসের উন্মুখরতা ছিল, তাই তার পাঠকের সংখ্যা আমাদের মাঝে সর্বাধিক।
কবি ও সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ ফররুখকে নিয়ে বাংলা একাডেমি থেকে দুটি গবেষণাধর্মী বই ফররুখ আহমদ (১৯৮৮) এবং ফররুখ আহমদ জীবন ও সাহিত্য (১৯৯৩) প্রকাশ করেন। এছাড়া সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়ের রয়েছে ‘কবি ফররুখ আহমদ’ এর ওপর প্রথম পূর্ণাঙ্গ গবেষণা গ্রন্থ।
কবি জীবদ্দশায় অনেকগুলো পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬০), প্রেসিডেন্ট পদক ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’ (১৯৬৫), আদমজী পুরস্কার ও ইউনেস্কো পুরস্কার (১৯৬৬) পাকিস্তান সরকার কর্তৃক রাষ্ট্রীয় খেতাব ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ লাভ করেন। কিন্তু শেষোক্ত খেতাবটি কবি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। এবং বাংলাদেশ আমলে মরণোত্তর ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার (১৯৭৯), একুশে পদক (১৯৭৭) ও স্বাধীনতা পদক (১৯৮০)।
১৯৪৩ সালে আইজি প্রিজন অফিসে চাকরির মাধ্যমে তার কর্মজীবন শুরু। এরপর ১৯৪৪ সালে সিভিল সাপ্লাইয়ে এবং ১৯৪৬ সালে জলপাইগুড়িতে একটি ফার্মে চাকরি করেন। ১৯৪৫ সালে তিনি মাসিক ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মাসিক ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে ফররুখ আহমদ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। নতুন শিল্পী-সাহিত্যিকদের তিনি মেন্টরিং করতেন। অকৃত্রিম দরদ দিয়ে বলতেন, ‘যারা নতুন এসেছে তাদের প্রতিষ্ঠা করা আমাদের দায়িত্ব।’ কবি সিকান্দার আবু জাফরসহ অনেককে তিনি তাড়া দিতেন লিখতে এবং জয়নুল ও কামরুলের কাছ থেকে ছবি আদায় করতে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মোহাম্মদীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক থাকাকালে তার রচিত একটি কবিতা ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ কিছুটা রদবদল করে অন্যের নামে ছাপানোতে কবি প্রতিবাদস্বরূপ মোহাম্মদীর চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। এবং এ বিষয়কে কেন্দ্র করে ‘কবিতা চোরের প্রতি’ শিরোনামে নিম্নোক্ত সনেটটি রচনা করেন:
“বোমা মারিলেও পেটে কাব্যকণা হয় না বাহির
কবিতা চুরিতে তাই মনোযোগী বৃদ্ধ জ্ঞানপাপী,
অসৎ উপায়ে চাও নাম কিছু করিতে জাহির।”

১৯৪৭ ‘মোহাম্মদী’ হতে ইস্তফা দেয়ার পর কবি বেকার হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক বছর পর ১৯৪৮ সালে কলকাতা ছেড়ে স্থায়ীভাবে ঢাকায় এসে ওঠেন কবি বে-নজীর আহমদের বাসায়। এরপর আবু জাফর শামসুদ্দীনের ভাষায়, ‘মালিবাগের মশকাকীর্ণ অন্ধকার গলির কেরোসিনের হারিকেন আলোকিত চালাঘরের ছোট্ট একটি কামরায় প্রায়ই তার সাথে সাক্ষাৎ হতো।’ সর্বশেষ ৭/৫ ইস্কাটন গার্ডেন কলোনির সরকারি বাসভবনে মৃত্যুকাল অবধি অবস্থান করেছিলেন।
তিনি ঢাকা বেতারে স্টাফ আর্টিস্ট হিসাবে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। এখানে দীর্ঘকাল ‘কিশোর মজলিশ’ এবং ‘ছোটদের খেলাঘর’ অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। কিশোর মজলিশে একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেন। পরবর্তীকালে প্রায় সকলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লেখক হয়ে দেশজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন। উল্লেখযোগ্য হলেন ড. রফিকুল ইসলাম, ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান প্রমুখ।
বেতারে তাঁর সহকর্মীদের মধ্যে ছিলেন কবি শাহাদৎ হোসেন, কবি আজিজুর রহমান, কবি সৈয়দ আলী আহসান, কবি আবুল হোসেন, কবি সিকান্দার আবু জাফর, কবি শামসুর রাহমান প্রমুখ।
১৯৭০ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা থেকে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ পত্রিকা প্রকাশের সূচনায় তাকে পত্রিকার সম্পাদক হতে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সংগ্রামের প্রতি তীব্র সহানুভূতি সত্ত্বেও তিনি নিরপেক্ষভাবে কাব্য-কলার সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করার লক্ষ্যে সেই সম্মানজনক প্রস্তাবও ফিরিয়ে দেন।
কবি ফররুখ প্রথম যৌবনে ভারতবর্ষে বিখ্যাত কমরেড এম এন রায়ের ভাবশিষ্য ছিলেন। শুরুতে ঐতিহাসিক ‘লাহোর প্রস্তাব’ এর প্রেক্ষিতে কবির মতাদর্শগত পরিবর্তন ঘটে। অতঃপর বিশিষ্ট আলেম অধ্যাপক আব্দুল খালেকের অনুপ্রেরণাতেই তিনি বাম আদর্শ থেকে ইসলামী চেতনায় পুরাপুরি উদ্বুদ্ধ হন। কবি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ অধ্যাপক আব্দুল খালেককে উৎসর্গ করেন। সেই অধ্যাপক আব্দুল খালেক সাহেবই তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন ফুরফুরার পীর সাহেব আবুবকর সিদ্দিকী (রহ.) সাহেবের কাছে। যিনি তার জন্য দোয়া করেছিলেন, এবং সেই আমলে তাকে পাঁচটি টাকা দিয়েছিলেন। একটি ভালো কলম কিনতে এবং ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য লিখতে।
যে ঘটনা তাকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে। পরবর্তী ইতিহাস আমরা জানি ফররুখ হলেন, রেনেসাঁর কবি, জাগরণের কবি, ঐতিহ্যের কবি, জাতিসত্তার কবি। ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যে মহান উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হলেন। এবং এই মহান কবি সবাকে জাতির আগামী স্বপ্নের জাল বুনতে পথ দেখালেন।
কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন একজন ভাষাসৈনিক। ভাষা নিয়ে তার “মধুর চেয়েও মধুর যে ভাই আমার দেশের ভাষা” গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে পুলিশের গুলি ও সালাম, জব্বার, রফিক, শফিকের শাহাদতের প্রতিবাদে তিনি রেডিও পাকিস্তান থেকে তাৎক্ষণিক সব অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেন। কবির নেতৃত্বে রেডিওতে কর্মরত শিল্পী আলতাফ মাহমুদ, আব্দুল আহাদ, আব্দুল হালিম চৌধুরী প্রমুখ ধর্মঘটে যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে, ঢাকা বেতারেই প্রথম প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়।
পাকিস্তানের অপরিণামদর্শী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে তার লেখা ছিল কঠোর। তিনি ‘হায়াতদারাজ খান’ ছদ্মনামে রচনা করেন অসংখ্য ব্যঙ্গ কবিতা এবং ‘রাজ-রাজড়া’ নামে নাটক, যেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মঞ্চস্থ হয়। এতে প্রখ্যাত নাট্যকার মুনীর চৌধুরী অভিনয় করেন।
১৭৫৭ সালে পলাশীর ঘটনা, ১৮৫৭-৫৮ সালে ভারতের আজাদী আন্দোলন, ১৯২৩ সালে ওসমানিয়া খেলাফতের অবসান প্রভৃতি ঘটনাবলি ফররুখ আহমদকে প্রভাবিত করেছিল দারুণভাবে। তাই অধঃপতিত মুসলিম জাতির আশা ও ঐতিহ্যকে তুলেছিলেন কণ্ঠ ও ভাষায়।
“মোর জামাতের সকল স্বপ্ন ভেঙে ভেঙে হ’ল চুর,
মিশে গেল মরুবালুকায়-সাইমুমে,
ঝড়-মৌসুমে চলো আজি মোরা গড়ি সেই কোহিতুর
কারিগর, তুমি থেকো না অসাড় ঘুমে।” (কারিগর)
১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসে আপন খালাতো বোন সৈয়দা তৈয়বা খাতুন (লিলি)-এর সঙ্গে ফররুখ আহমদের বিয়ে হয়। ফররুখ আহমদ আট পুত্র ও তিন কন্যাসন্তানের জনক ছিলেন।
কবির স্ত্রীর মতে, কবির ইচ্ছে ছিল, ঢাকায় সুন্দর একটি বাড়ি করার। ব্যাংকঋণ নিয়ে হয়তো পারতেন। কিন্তু তাতে সুদ হবে যা ইসলামে হারাম। তিনি ধর্মের ব্যাপারে ছিলেন নিরাপোষ। ভোগ বিলাসিতা তিনি ঘৃণা করতেন। নিজের কবিতার মতোই ছিল কবির দৈনন্দিন জীবন।
“তোরা চাসনে কিছু কারো কাছে খোদার মদদ ছাড়া
তোরা পরের উপর ভরসা ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়া।”
কবির জীবনযাত্রার ব্যাপারে তার মেয়ে ইয়াসমিন বানু বলেন, “আব্বা জীবনে সাধারণত নামাজ কাযা করেননি। শরীর ভীষণ অসুস্থ থাকাবস্থায় ত্রিশটি রোজাই রেখেছেন। নবীজির সুন্নতকে ভালোবাসতেন বলে তালিযুক্ত কাপড় পরতেন।” নজরুল গবেষক শাহাবুদ্দীন আহমদ বলেছেন, এ সমাজের সেরা লোকদের দামি আসরেও তাঁকে চাকচিক্যহীন সাদামাটা পোশাকে বসে থাকতে দেখেছি- তেজের সঙ্গে। দেখেছি তাঁর পোশাক জ্বলজ্বল করত না, কিন্তু জ্বলজ্বল করতো তাঁর দুটি চোখ।
এত শত অবদানের পরও স্বাধীন দেশে তাঁর নাম ও কবিতার গায়ে প্রতিক্রিয়াশীলতার সিল আঁটা হয়েছিল পরিকল্পিতভাবে। কারণ হিসেবে বলা হতো; ১. তার পাকিস্তানের পক্ষে লেখা, ২. কবিতায় পর্যাপ্ত আরবি-ফারসির ব্যবহার, ৩. রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে চল্লিশজন স্বাক্ষরদাতার একজন হওয়া ইত্যাদি।
১৯৭১ এর ডিসেম্বর মাসে কবিকে বেতারের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় এবং তাঁর বেতন-ভাতা স্থগিত করা হয়। ফলে এহেন আর্থিক দুরবস্থায় কবির বিশাল পরিবারের জীবনধারণ দুর্বহ হয়ে ওঠে। কবি উপোস থেকে থেকে জীর্ণশীর্ণ এবং রোগ-পাণ্ডুর হয়ে যান।
এ সময় কবির বড় ছেলে সৈয়দ আব্দুল্লাহিল মাহমুদ তৃতীয় বর্ষ এমবিবিএস-এর ছাত্র ছিলেন। তাকেও অর্থাভাবে পড়াশোনা ছেড়ে কেরানিগিরির সামান্য একটি চাকরি খুঁজতে হয়েছে। তাকে মানসিকভাবে শেষ করে দিতে সরকারি বাসা ত্যাগের জন্য বারবার এত্তেলা এসেছে। ঠিক এমতাবস্থায় ১৯৭৩ সালে কবির বড় মেয়ে সৈয়দা সামারুখ বানু অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেন।
সর্বত্র যখন ভয়ঙ্কর নীরবতা ঠিক এ সময়ে এগিয়ে এলেন আরেক কিংবদন্তি আহমদ ছফা। ‘ফররুখ আহমদের কী অপরাধ’ (গণকণ্ঠ, ১৬ জুন, ১৯৭৩) শীর্ষক এক প্রতিবাদ লিখলেন। যাঁরা সত্যিই নিরপেক্ষভাবে ফররুখকে দেখতে চান, তাঁদের জন্য আহমদ ছফার এ লেখাটি পড়া অবশ্য কর্তব্য।
আহমদ ছফা তীব্র ক্ষোভের সাথেই বলেছেন; খবর পেয়েছি বিনা চিকিৎসায় কবি ফররুখের মেয়ে মারা গেছে। এই প্রতিভাধর কবি যাঁর দানে আমাদের সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে পয়সার অভাবে তাঁর মেয়েকে ডাক্তার দেখাতে পারেননি, ওষুধ কিনতে পারেননি। কবি এখন বেকার। তাঁর মৃত মেয়ের জামাই, যিনি এখন কবির সঙ্গে থাকছেন, তাঁরও চাকরি নেই। মেয়ে তো মারাই গেছে। যারা বেঁচে আছেন, কি অভাবে, কোন অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে দিনগুলো অতিবাহিত করছেন, সে খবর আমরা কেউ রাখিনি।
হয়ত একদিন সংবাদ পাবো কবি মারা গেছেন, অথবা আত্মহত্যা করেছেন। খবরটা শোনার পর আমাদের কবিতাপ্রেমিক মানুষের কি প্রতিক্রিয়া হবে? ফররুখ আহমদের মৃত্যু সংবাদে আমরা কি খুশি হবো, নাকি ব্যথিত হবো?
আজকের সমগ্র বাংলা-সাহিত্যে ফররুখের মতো একজনও শক্তিশালী ¯্র্রষ্টা নেই। এমন একজনকে অনাহারে রেখে তিলে তিলে মরতে বাধ্য করেছি আমরা। ভবিষ্যৎ বংশধর আমাদের ক্ষমা করবে না।
কবি ফররুখ আহমদের মরার সমস্ত ব্যবস্থা আমরাই পাকাপোক্ত করে ফেলেছি। আমরা তাঁর চাকরি কেড়ে নিয়েছি, তাঁর জামাই এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের সৎভাবে পরিশ্রম করে বাঁচবার রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছি। রাস্তা-ঘাটে কবির বেরোবার পথ বন্ধ করে দিয়েছি। প্রয়োজনীয় সবগুলো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আমরা ত্রুটি রাখিনি।
জানি পাকিস্তান এবং ইসলাম নিয়ে আজকের বাংলাদেশে লেখেননি এমন কোনো কবি-সাহিত্যিক নেই বললেই চলে। শুধু কবি সুফিয়া কামালের পাকিস্তান এবং জিন্নাহর ওপর নানা সময়ে লেখা কবিতাগুলো জড়ো করে প্রকাশ করলে ‘সঞ্চয়িতা’র মতো একখানা গ্রন্থ দাঁড়াবে। অথচ ভাগ্যের কি পরিহাস কবি সুফিয়া কামাল বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হয়ে মস্কো-ভারত সফর করে বেড়াচ্ছেন, আর ফররুখ আহমদ রুদ্ধদ্বার কক্ষে বসে অপমানের লাঞ্ছনায় মৃত্যুর দিন গুনছেন। কিন্তু শাস্তি ভোগ করছেন একা ফররুখ এ কেমন ধারা বিচার?
আমরা বাংলাদেশের আরো একজন খ্যাতনামা কবির কথা জানি (কবি শামসুর রাহমান)। যিনি পাকিস্তানি দখলদার সৈন্যদের তত্ত্বাবধানে সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা দৈনিকটির (দৈনিক পাকিস্তান) সম্পাদকীয় রচনা করেছিলেন।
এসময় রেডিওর পরিচালক ছিলেন, সাবেক স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরী তিনি বলতেন, ফররুখ ছিলো আদর্শবাদী পুরুষ। তখন সরকারি খরচে ফররুখকে হজ্জে গমন এবং পরে তিন মাস মুসলিম দেশসমূহ ভ্রমণের আহবান জানানো হলো এবং আমি তাঁকে এ খবর জানিয়ে মিষ্টি দাবি করলাম। কিছুক্ষণ নির্বিকার থেকে কবি বললো, আইয়ুব সরকারের খরচে হজে যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই তার নেই।
আর কেউ কি আছে, এসব লোভনীয় সরকারি অফার প্রত্যাহার করেছেন? আসলে সেই ছিলো সত্যিকার দেশপ্রেমিক বাকিরা রংবদলকারী গিরগিটি। এরা স্বাধীনতার পূর্বে পিণ্ডি-সিন্ধি করতেন স্বাধীনতার পরে খোলস পাল্টে হিল্লি-দিল্লি শুরু করলেন।
আসলে কবি ফররুখের ছিল একটিমাত্র অপরাধ, যা বাঙালি সেক্যুলারদের কাছে একেবারেই সহ্য হয়নি, সেটা হলো তার ধর্মের পথে অটল থাকা।
আহমদ ছফার শ্লেষাত্মক ভাষায় লেখা কলাম চারিদিকে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় তুললে কবিকে সরকার চাকরিতে পুনর্বহাল ও বকেয়া পাওনা পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু অভিমানী কবি চাকরিতে আর ফিরে যাননি এবং তাঁর পাওনা এক পয়সাও আর বুঝে পাননি।
এসময় কবিকে আর্থিক সাহায্য প্রদানের উদ্দেশ্যে জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফকে আহবায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু কবি অর্থ সাহায্য গ্রহণে তাঁর অনিচ্ছার কথা ব্যক্ত করায় কমিটি ভেঙে দেয়া হয়।
তখন রমজান মাস, শারীরিক অসুস্থতার ভিতরেও টাকার অভাবে না খেয়েই রোজা রাখতেন তিনি। ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর কবি ফররুখ আহমদ ইন্তেকাল করেন সেটি ছিলো পবিত্র ২৭ রমজানের সন্ধ্যাবেলা।
বর্তমান বাংলা সাহিত্যে কবি ফররুখ আহমদ এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। তিনি বেঁচে থাকবেন তার অমর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে।
তিনি তার কবিতায় সমাজের অবহেলিত মানুষের কথা লিখে গেলেও তার জীবনে তাকে বহু দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে হয়েছে। মূলত ইসলামী আদর্শ লালন করার কারণেই তাকে এত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।
এই ফুলের মতো মানুষটা যখন মারা যায় তখনও তার মৃতদেহের দাফন নিয়েও হয়েছে কুৎসিত রাজনীতি। প্রখ্যাত সচিব ও সাংবাদিক আসাফউদ্দৌলাসহ অনেকেই চেষ্টা করলেন। কিন্তু সরকারিভাবে কোনো জায়গা দেওয়া হয়নি। একজন ইসলামিস্ট জীবিতাবস্থায় সেক্যুলারদের কাছে যেমন বিভীষিকার মতো ভয়ানক দেখায়, তেমনি একজন ইসলামিস্টের ডেডবডিকেও তারা ঠিক সেরূপই ভয় পায়। পরবর্তীতেও আমরা এইসব দৃশ্যপট দেখেছি। এই সবকিছুই ঘৃণ্যতম ইতিহাসের দলিল হয়ে থাকবে। অবশেষে কবি বে-নজীর আহমদ তার শাহজাহানপুরের পারিবারিক গোরস্থানে কবিকে দাফন করার ব্যবস্থা করেন।
২০১৮তে কবির জন্মশতবার্ষিকীতে প্রথম আলো লিখতে বাধ্য হয় “প্রায়ই এ কথা মনে হয়, ফররুখপাঠে আমাদের কোথায় যেন একটু ঘাপলা থেকে যাচ্ছে। তাঁকে আমরা আক্ষরিক অর্থে পড়ছি। ইতিহাসের পটে রেখে ফররুখের পাঠ দেওয়া দরকার। ফররুখকে অস্বীকার করলে তো এই জনগোষ্ঠীর একসময়ের আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার বাসনাকে অস্বীকার করা হয়।”
এ বিষয়টি হাসান হাফিজুর রহমান ঠিকই বুঝেছিলেন। আধুনিক কবি ও কবিতা (১৯৯৩) বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘ফররুখ আমাদের কাব্য সাহিত্যে আধুনিক উত্তরণে প্রকৃত সাহায্যটা করেছেন তাঁর কাব্যভাষা এবং আঙ্গিকের প্রয়োগে।’ ফররুখকে বাদ দেওয়া মানে আমাদের জাতিসত্তার এবং কবিতার একটি অনিবার্য সংগ্রামী ইতিহাসকে কেটে ফেলে দেওয়া। এই প্রবণতা বোধ করি পৃথিবীর কোনো জাতির ইতিহাসেই পাওয়া যাবে না। (কুদরত-ই-হুদা, প্রথম আলো, ৮ জুন ’১৮, শিল্পসাহিত্য)
কবির মৃত্যুর ৪৪ বছর পর প্রথম আলোর মতো প্রভাবশালী পত্রিকাটি ফররুখপাঠে আমাদের একটু ঘাপলার কথা বললেও মনে হয় সেটি আদপেই অনেক বড় ঘাপলা ছিলো। যে জন্য তাকে নির্মম মৃত্যুর দিকে ঠেলা দেয়া হয়েছে।
এমনকি আজো ফররুখ পাঠ্যপুস্তকে নেই, রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত বাংলাপিডিয়া যাকে বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বলা হয়। এ জ্ঞানকোষে প্রায় ১৪৫০ জন পণ্ডিতের সৃজনশীল কাজের সমন্বয় ঘটেছে। তবু এতে ফররুখের একটি দায়সারা বিবরণ দেয়া হয়েছে। তার স্ত্রী-পরিবার এমনকি তার ১১ সন্তানের কে কোথায় সে বিবরণটুকু পর্যন্ত নেই।
তিনি অপরিচিত কেউ নন, তার কনিষ্ঠ ভাই ছিলেন একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, তবু তাদের বাড়ির উপর দিয়ে রেললাইনের পরিকল্পনা হয়েছিল। জনতার উত্তাল আন্দোলনে এখন সেখানে উড়াল সেতু হবে। যদিও বাড়িটি টিকে গেল কিন্তু সেতো থাকবে সেতুর নিচে, বস্তির মতো।
‘সাত সাগরের মাঝি’ ফররুখের শ্রেষ্ঠ কবিতা গ্রন্থ। প্রকাশের এত বছর পরও এটি সমানভাবে জাগ্রত ও প্রাণবন্ত। এর অন্যতম জনপ্রিয় ও বিখ্যাত কবিতা হলো ‘পাঞ্জেরী’। মুসলিম জাতির পিছিয়ে পড়ার, অন্ধকার থেকে পরিত্রাণের কত দেরি তা জানতে কবি উৎসুক। রেনেসোঁর কবি ফররুখ চিরঞ্জীব থাকবেন বাংলার মুসলিম নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের হৃদয়ের মসনদে।
মাঝে মাঝে ঘোরের মধ্যে দেখি কবি জান্নাতের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছেন। আর তার ডাগর ঈগলচক্ষু দিয়ে তাকিয়ে নিজে সাত সাগরের মাঝি হয়ে দরাজকণ্ঠে আমাদেরকে জাগরণী গান শোনাচ্ছেন-
রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী?
এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?
সেতারা, হেলাল এখনো উঠেনি জেগে?
তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;
অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি।
(পাঞ্জেরী, সাত সাগরের মাঝি)
[আগামী সংখ্যায় সমাপ্য]

লেখক : ক্যারিয়ার স্পেশালিস্ট ও মোটিভেশনাল স্পিকার

SHARE

Leave a Reply