সর্বশেষঃ
post

সাক্ষরতা, শিক্ষা এবং বাংলাদেশ

এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান

২১ আগস্ট ২০২২

আমরা জানি, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার সঙ্গে শিক্ষা কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত, সেই জাতি তত বেশি সভ্য ও উন্নত। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালেই এর সঠিক জবাব ও প্রমাণ আমরা পেয়ে যাব। শিক্ষিত ও সাক্ষরতা এক জিনিস নয়। একজন মানুষ যখন প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়, তখন আমরা তাকে শিক্ষিত বলতে পারি। কিন্তু সাক্ষর মানে হলো কেবল অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন। যিনি  কেবল বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত হন,  দৈনন্দিন কার‌্যাবলি সাড়ার জন্য বাজারের তালিকা করা, রাস্তার সাইনবোর্ড ও বাসার ঠিকানা পড়া, চিঠিপত্র পড়া,  মোবাইল নম্বর চেনা,  টেলিফোন ও  মোবাইল করতে পারা, নম্বর  সেভ করতে পারা, সর্বোপরি নিজের নাম লিখতে পারা এবং স্বাক্ষর কিংবা দস্তখত করতে পারা এমন জ্ঞানসম্পন্নদের সমাজে সাক্ষর বলা হয়ে থাকে। 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাক্ষরতার সংজ্ঞায় তফাত থাকলেও ১৯৬৭ সালে ইউনেসকো সর্বজনীন একটি সংজ্ঞা দেয়, যেখানে পড়তে, লিখতে, বলতে পারার সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন হিসাব-নিকাশ করতে পারাকে সাক্ষরতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন ব্যক্তিকে সাক্ষর হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য অন্তত তিনটি শর্ত মানতে হয়-ব্যক্তি নিজ ভাষায় সহজ ও ছোট বাক্য পড়তে পারবে, সহজ ও ছোট বাক্য লিখতে পারবে এবং দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ হিসাব-নিকাশ করতে পারবে। এই প্রতিটি কাজই হবে ব্যক্তির প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাক্ষরতার ক্ষেত্রে সাধারণত নিজের ভাষার অক্ষরজ্ঞান জানাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। 

বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিসরে ‘সাক্ষরতা’ শব্দের প্রথম উল্লেখ করা হয় ১৯০১ সালে লোক গণনার অফিসিয়াল ডকুমেন্টে। শুরুতে স্ব স্ব অক্ষরের সঙ্গে অর্থাৎ নিজের নাম লিখতে যে কয়টি বর্ণমালা প্রয়োজন হতো তা জানলেই তাকে স্বাক্ষর বলা হতো।

১৯৪০ সালের দিকে পড়ালেখার দক্ষতাকে সাক্ষরতা বলে অভিহিত করা হতো। পরে ষাটের দশকে দক্ষতার সঙ্গে সঙ্গে সহজ হিসাব-নিকাশের যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষই সাক্ষর মানুষ হিসেবে পরিগণিত হতো। আশির দশকে লেখাপড়া ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি সচেতনতা ও দৃশ্যমান বস্তুসামগ্রী পঠনের ক্ষমতা সাক্ষরতার দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃত হয়। বর্তমানে এ সাক্ষরতার সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা, ক্ষমতায়নের দক্ষতা, জীবননির্বাহী দক্ষতা, প্রতিরক্ষায় দক্ষতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতাও সংযোজিত হয়েছে।

১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে পৃথিবীর সব দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূর করতে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৬৫ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো কর্তৃক এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। ১৯৬৬ সাল থেকে ইউনেস্কো ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। তবে বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে ১৯৭২ সাল থেকে।

দিবসটি পালনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ব্যক্তি, সম্প্রদায় ও সমাজে সাক্ষরতার গুরুত্ব তুলে ধরা। দিবসটি পালনের মাধ্যমে সারা বিশ্বের মানুষকে তারা বলতে চায় সাক্ষরতা একটি মানবীয় অধিকার এবং সর্বস্তরের শিক্ষার ভিত্তি। সাক্ষরতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবীয় অধিকার হিসেবে বিশ্বে গৃহীত হয়ে আসছে। এটি ব্যক্তিগত ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক ও মানবীয় উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবেও গ্রহণযোগ্য। এমনকি শিক্ষা লাভের পুরো বিষয়টি নির্ভর করে সাক্ষরতার ওপর। সাক্ষরতা  মৌলিক শিক্ষার ভিত্তি হিসেবেও কাজ করে। দারিদ্র্য হ্রাস, শিশুমৃত্যু রোধ, সুষম উন্নয়ন এবং শান্তি সমৃদ্ধি বিকশিতকরণের ক্ষেত্রেও সাক্ষরতা প্রয়োজনীয় হাতিয়ার হিসেবে গণ্য হয়।

২০১৬ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পৃথিবীতে ৭৭৫ মিলিয়ন মানুষ সাক্ষরতার মৌলিক ধারণা থেকে দূরে রয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন নয়। এই ২০ শতাংশের মধ্যে আবার প্রায় ৬৬ শতাংশ হচ্ছে নারী। প্রায় ৭৫ মিলিয়ন শিশু এখনও হয় বিদ্যালয়ে যায়নি কিংবা বিদ্যালয়  থেকে ঝরে পড়েছে। ২০০৬ সালে ইউনেস্কোর  গ্লোবাল মনিটরিং রিপোর্ট অনুযায়ী পশ্চিম আফ্রিকায় সাক্ষরতার হার সবচেয়ে কম। বিশ্বে যেসব  দেশ সবচেয়ে কম সাক্ষরতাসম্পন্ন তার মধ্যে রয়েছে বার্কিনা ফাসো (১২.৮ শতাংশ), নাউজার ১৪.৪ শতাংশ এবং মালি ১৯ শতাংশ। ২০১৫ সালে এই হার কিছুটা বেড়েছে সাব সহারান আফ্রিকায় ৬৪ শতাংশ। ২০০৭ সালে জাতিসংঘ সাক্ষরতা দশক  ঘোষণা করা হয়েছিল। ২০০৮ সালে এর সঙ্গে স্বাস্থ্য শিক্ষা যুক্ত করে ‘সাক্ষরতা এবং স্বাস্থ্য’ হিসেবে তা পালিত হয়েছিল। ২০১১-১২ সালে এ দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সাক্ষরতা ও শান্তি’।

‘সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক অনুসারে পৃথিবীর ৭৭.৫  কোটি পূর্ণবয়স্ক নিরক্ষরের প্রায় ৭৫% ১০টি রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে (ক্রমহ্রাসমানভাবে এই রাষ্ট্রসমূহ হল : ভারত, চীন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া, মিসর, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, এবং গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র)। পৃথিবীময় পূর্ণবয়স্ক নিরক্ষরের সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ মহিলা। সর্বনিম্ন সাক্ষরতা হার তিনটি অঞ্চলে ঘনীভূত  দেখা যায় : দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং আফ্রিকার সাব-সাহারান এলাকা। পৃথিবীময় ১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব সামগ্রিক জনসংখ্যায় সাক্ষরতা হার হল ৮৪.১%। পৃথিবীময় পুরুষ সাক্ষরতা হার ৮৮.৬% এবং মহিলা সাক্ষরতা হার ৭৯.৭%।’ (উইকিপিডিয়া)

সাক্ষরতার পরিবর্তিত সংজ্ঞা অনুযায়ী আমাদের অবস্থান পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের তুলনায় অনেক পেছনে। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে জাপান, জার্মানি, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড উত্তর কোরিয়াসহ কয়েকটি  দেশের শিক্ষার হার ১০০%। ৯৫-৯৯% শিক্ষার হার রয়েছে প্রায় ৭৮টি দেশে। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের শিক্ষার হার ৯৮ শতাংশ। অবশ্য ফিলিস্তিনের গাজা ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হামাসের তথ্যমতে তাদের দেশের শিক্ষার হার ১০০ ভাগ। যা আরব বিশ্বের আর কোনো দেশে নেই। 

১৯১৮ সালে আমাদের দেশে নৈশবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এরপর ১৯৩৪ সালে খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ ও নবাব আবদুল লতিফ প্রমুখের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র। ১৯৬০ সালের ভি-এইড কার্যক্রমের আওতায় সফলভাবে পরিচালিত হয় বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ব্যুরো অব নন-ফরমাল এডুকেশন’। ১৯৯১ সালে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে বই সরবরাহ করা হচ্চে আর মেয়েদের শিক্ষা বৃত্তি তো আছেই। আমাদের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে ছয় থেকে দশ বছরের ছেলেমেয়েদের জন্য বিনামূল্যে মৌলিক শিক্ষা প্রদানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো সাক্ষরতা বৃদ্ধির ইতিবাচক পদক্ষেপ।

আমরা জানি সাক্ষরতার সঙ্গে একটি দেশের উন্নতি, অনুন্নতি অনেকাংশে নির্ভর করে। এমনকি একটি দেশের উন্নয়ন পরিমাপের অন্যতম সামাজিক সূচক সাক্ষরতার হার। যে দেশের সাক্ষরতার হার যত বেশি সে দেশ তত উন্নত। সাক্ষরতা মানুষকে কর্মক্ষম ও মানবসম্পদে পরিণত করে। সাক্ষরতার মাধ্যমে জ্ঞানার্জনের দ্বার উন্মুক্ত হয়, যা জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দেয়। তাই সাক্ষরতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবীয় অধিকার হিসেবে বিশ্বে গৃহীত হয়ে আসছে। এটি ব্যক্তিগত ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক ও মানবীয় উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার। দারিদ্র্য হ্রাস, শিশু মৃত্যু রোধ, সুষম উন্নয়ন এবং শান্তি ও সমৃদ্ধি বিকশিতকরণের  ক্ষেত্রেই শুধু সাক্ষরতা অনন্য ভূমিকা পালন করে না, এটি একজন ব্যক্তির অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক মনোবল বৃদ্ধিতেও সহায়তা করে। একজন নিরক্ষর বা সাক্ষরতা জ্ঞানশূন্য ব্যক্তিকে সমাজের ‘বোঝা’ বলে বিবেচনা করা হয়। কেননা বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য ন্যূনতম শিক্ষা অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি। একটি উৎপাদনশীল, উন্নয়নমুখী, কর্মদক্ষ-সচেতনমুখী-আলোকিত ও সুশৃঙ্খল জাতি গঠনে সাক্ষরতার দক্ষতা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল সমাজ নির্মাণের মূল ভিত্তিই হলো সাক্ষরতার দক্ষতা অর্জন করা। তা ছাড়া উন্নয়ন কার্যক্রমকে টেকসই করার জন্য সাক্ষরতার বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য। 

আমাদের দেশে সাক্ষরতার হার ১৯৯১ সালে যখন ৩৫.৩ শতাংশ ছিল তখন ‘সমন্বিত উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বিস্তার কার্যক্রম (ইনফেপ)’ নামে একটি বড়ো প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এরপর ২০১০ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ৫৯.৮২ শতাংশ। 

বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা অনুপাতে মোট সাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। যার মধ্যে ঢাকা বিভাগ সর্বোচ্চ ৭৮ দশমিক ৯ শতাংশ হার নিয়ে এগিয়ে। অন্যদিকে সর্বনিম্ন সাক্ষরতার হার ময়মনসিংহ বিভাগে ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ।

২৭ জুলাই ২০২২ ইং রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের আওতায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাধ্যমে বাস্তবায়িত প্রথম ডিজিটাল জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ এর প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, দেশের মোট জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬ জন। যেখানে ৮ কোটি ১৭ লাখ পুরুষ ও ৮ কোটি ৩৩ লাখ নারী আর ১২ হাজার ৬২৯ জন তৃতীয় লিঙ্গ।

প্রতিবেদনে সাক্ষরতার হারের হিসাবে বলা হয়, দেশের নারী-পুরুষ মিলে মোট সাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। যার মধ্যে অঞ্চলভেদে গ্রামাঞ্চলে ৭১ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং শহর এলাকায় ৮১ দশমিক ২৮ শতাংশ।

অন্যদিকে নারী-পুরুষ লিঙ্গভিত্তিক বিবেচনায় পুরুষের সাক্ষরতার হার ৭৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ, নারী শিক্ষার হার ৭২ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গের সাক্ষরতার হার ৫৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০১১ সালে নারী-পুরুষ মিলে সাক্ষরতার হার ছিল ৫১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

বিভাগ বিবেচনায় বলা হয়, ঢাকা বিভাগে মোট সাক্ষরতার হার ৭৮ দশমিক ৯ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষ ৮০ দশমিক ৮ শতাংশ, নারী ৭৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং হিজড়া ৫৬ দশমিক ৯ শতাংশ। বরিশাল বিভাগে মোট সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষ ৭৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ ও নারী ৭৬ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ৬৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। চট্টগ্রাম বিভাগে মোট সাক্ষরতার হার ৭৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষ ৭৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ, নারী ৭৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ, তৃতীয় লিঙ্গ ৫০ দশমিক ৮৪ শতাংশ। খুলনা বিভাগে মোট সাক্ষরতার হার ৭৫ দশমিক ২ শতাংশ। পুরুষ ৭৭ দশমিক ১৬ শতাংশ, নারী ৭২ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গ ৫৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ময়মনসিংহ বিভাগে মোট সাক্ষরতার হার ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ। পুরুষ ৬৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ, নারী ৬৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গ ৪৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। রাজশাহী বিভাগে মোট সাক্ষরতার হার ৭১ দশমিক ৯১ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষ ৭৩ দশমিক ৯০ শতাংশ, নারী ৬৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গ ৫৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। রংপুর বিভাগে মোট সাক্ষরতার হার ৭০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষ ৭৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ, নারী ৬৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গ ৫৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। সিলেট বিভাগে মোট সাক্ষরতার হার ৭১ দশমিক ৯২ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষ ৭৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ, নারী ৭০ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গ ৪৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ। সাক্ষরতার হারের দিক দিয়ে এই যে ক্রমোন্নতি তা কিন্তু আশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এসডিজির একজন স্বাক্ষরকারী সদস্য হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে এ দেশে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ তৈরি করার' লক্ষ্য পূরণ করতে। তার জন্য সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। দেশের প্রচলিত আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার সম্পূরক ও পরিপূরক হিসেবে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাধারা রাষ্ট্রের সহায়ক শক্তি হিসেবে ব্যাপক মাত্রায় এ দেশে কাজ করে যাচ্ছে। তারপরও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাধারা এ  দেশে বহুমাত্রীয় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সে জন্য রাষ্ট্রের সরকারি, বেসরকারি, আন্তর্জাতিক, স্থানীয় ও ব্যক্তি পর্যায়ের সামগ্রিক সম্মিলিত প্রচেষ্টা আরও ত্বরান্বিত করার তাড়না বহুগুণে বাড়িয়ে  দেওয়ার সময় এসেছে একবিংশ শতাব্দীর গোড়াতেই। না হলে আমরা পিছিয়ে পড়ব রাষ্ট্র হিসেবে।

আমাদের দেশে সাক্ষরতার হার বাড়াতে সরকারি- বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ চোখে পড়ে। জাতিকে সাক্ষর করে গড়ে তুলতে যে সকল প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তার মধ্যে : ১. সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২. রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩. ইবতেদায়ি মাদরাসা ৪. কিন্ডারগার্টেন ৫.  স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসমূহ কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন স্কুল ৬. মিশনারি স্কুল ৭. মক্তব ৮. সরকারি উদ্যোগে প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় ৯. বেসরকারি সংস্থাসমূহ কর্তৃক পরিচালিত প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় ১০. পথশিশুদের জন্য ভ্রাম্যমাণ স্কুল ১১. নৈশ বিদ্যালয় ১২. বয়স্ক শিক্ষা  কেন্দ্র ১৩. কওমি মাদরাসার প্রাথমিক স্তর ১৪. কিন্ডারগার্টেন মাদরাসা ১৫. ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ইত্যাদি। এর বাইরে আরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে যারা প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার কাজ করে থাকে। আমাদের দেশে শিক্ষার বিভিন্ন ধারা আবহমান ধরে চলে আসছে। সময়ের স্রােতে এ ধারা অসংখ্য শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত হয়েছে। এক সময়ে মক্তবভিত্তিক শিক্ষাই ছিল মূল প্রাথমিক শিক্ষা। 

বিনামূল্যের বই, উপবৃত্তি, স্কুল ফিডিংসহ সরকারের নানা পদক্ষেপের সুফল মিলছে এখন। বিশেষ করে বছরের প্রথম দিনই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে যাওয়ায় শিক্ষার প্রতি সবার আগ্রহ বেড়েছে। বিশেষ করে বেড়েছে মেয়েদের আগ্রহ। এ কারণে কমেছে বাল্যবিয়ে। কমছে ঝরে পড়াও। এখন প্রয়োজন শিক্ষার গুণগতমানের উন্নয়ন।

একটি গণতান্ত্রিক দেশের মানুষের মধ্যে নিম্নতম অক্ষর জ্ঞানটুকু না থাকলে দেশের গণতন্ত্র নিঃসন্দেহে অর্থহীন। নিজের নামটুকু স্বাক্ষর করার অক্ষমতার দরুন বুড়ো আঙুলের ছাপ দিয়ে পরিচিতি প্রকাশের লজ্জা কেমন সেই নিরক্ষর মানুষটির নয়, এ লজ্জা সমগ্র সমাজের। বাংলাদেশের শতভাগ সাক্ষরতার হার বাড়াতে বা নিরক্ষরতা দূর করতে আমাদের কিছু নিয়মকানুনের মধ্য দিয়ে চলতে হবে। এজন্য সকল শিশু বা নাগরিকদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রত্যেক শিশুকে স্কুলে পাঠাতে হবে। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সরকারি ও বেসরকারিভাবে সাহায্য দিতে হবে। বয়স্কদের জন্য বয়স্ক শিক্ষা ব্যাবস্থা চালু করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশের এই সাক্ষরতার হার বাড়িয়ে তুলতে সকলকে অধিক সচেতন হতে হবে। দেশের জনগণকে বোঝাতে হবে শিক্ষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য। মানব সম্পদ উন্নয়নে অব্যাহত শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণ কর্মকাণ্ড পরিচালনার বিকল্প নেই। এখন পর্যন্ত সামাজিক কর্মকাণ্ডের লক্ষ্যদল হচ্ছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুধু শিক্ষিত মানুষ। বাংলাদেশের মানুষকে সাক্ষর করে তুলে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত না করা পর্যন্ত এদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর শতভাগ সাক্ষরতার দেশ গড়া তখনই সম্ভব, যখন সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে নিরক্ষরতা দূরীকরণে প্রচেষ্টা চালানো হবে। আমাদের প্রত্যাশা-সকলের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ শতভাগ সাক্ষরতার পথে এগিয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির