হজ জীবন বিপ্লবের মহামিলন -ইয়াসিন মাহমুদ

হজ ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের অন্যতম একটি স্তম্ভ। একটি মৌলিক ফরজ ইবাদত। বিশ্ব মুসলিম ঐক্যের প্রতীক ও মহামিলনের কেন্দ্রবিন্দু হলো পবিত্র কাবা শরিফ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পবিত্র এই তীর্থস্থান তাওয়াফে হাজির হয় আল্লাহর প্রিয় বান্দারা। মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম (আ) মহান আল্লাহ কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে মানবজাতিকে হজ পালনের আহবান জানিয়েছিলেন। সেই থেকে আজ অবধি মুসলিম মিল্লাত তা পালন করে আসছে। হজ অন্যান্য ইবাদতের চেয়ে একটু ভিন্ন। এখানে আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতার বিষয় জড়িত। দৈনন্দিন জীবনের সাথে সম্পৃক্ত না থাকায় এ ব্যাপারে আমাদের জানাশোনার আগ্রহও কম। এবং এ বিষয়ে আমাদের সমাজের মানুষের মধ্যে ব্যাপক অনাগ্রহ দেখা যায়। হজ কেবলমাত্র ধনীদের ওপর হজ ফরজ। সেটা ঠিক আছে। তবে এ ব্যাপারে একজন মুসলিম হিসেবে আমার জ্ঞানার্জন কি জরুরি নয়? দরিদ্র মানুষের প্রতি হজ ফরজ নয় সে ক্ষেত্রে তিনি মাফ পাচ্ছেন। কিন্তু যার প্রতি হজ ফরজ তিনি কি মাফ পাবেন? মোটেও নয়। উল্লেখ্য, এ বিষয়ে আমাদের সমাজে সামর্থ্যবানদের ভেতরে যথেষ্ট গাফিলতি পরিলক্ষিত। অন্যান্য ইবাদতের চেয়ে হজ একটু ব্যতিক্রম। প্রথমত, টাকার বিষয়ে মায়া ছাড়তে হয়। দ্বিতীয়ত, সময় ব্যয় করতে হয়; দেশের বাইরে দীর্ঘসময় অতিক্রান্ত করতে হয়। সামর্থ্যবান অনেক ব্যক্তির মুখে এমন উক্তি আমরা শুনে থাকি- এ বছর না আগামী বছর যাবো। এ বছর একটু সমস্যা। আগামীতে দেখা যাক কী করেন আল্লাহ। অথচ ব্যক্তির আগ্রহ জিরো টলারেন্স। যাই যাই করে আর যাওয়া হয় না। আবার অনেকের ভেতরে ধারণা- হজ হলো, শেষ জীবনের ইবাদত। বয়োবৃদ্ধ ও বার্ধক্যে উপনীত পরিণত বয়সীদের। হজ পালন করে আসলে সবাই হাজী সাহেব হাজী সাহেব বলে সম্মান দিবেন। কদর করবেন। সমাজের সকলে তখন তাকে ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করবেন। এমন ধারণা বদ্ধমূল রয়েছে মানুষের জীবনাচরণে।
হজের বিধান সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন- তোমরা আল্লাহর (সন্তুষ্টির) উদ্দেশ্যে হজ ও ওমরাহ পূর্ণ কর। (সূরা আল বাকারা : ১৯৬) মহান আল্লাহ আরো বলেন- “এবং মানুষের নিকট হজের ঘোষণা করে দাও, তারা তোমার নিকট আসবে পদব্রজে ও সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উষ্ট্রসমূহের পিঠে, এরা দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।” (সূরা আল হজ : ২৭)
মূলত হজ পালনের মাধ্যমে বান্দার সাথে আল্লাহর মোলাকাত হয়ে থাকে। বান্দার মনের ভেতর তৈরি হয় আল্লাহপ্রেম। আত্মার শুদ্ধিতা বাড়ে। প্রশান্তির ছোঁয়ায় ভরপুর হয় হৃদয়ের অপূর্ণতা। সে সম্পর্কে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন- নিশ্চয়ই মানবজাতির প্রথম ইবাদতঘর প্রতিষ্ঠিত হয় মক্কায়, তা আশীর্বাদধন্য ও বিশে^ আলোর দিশারি। এখানে আছে মাকামে ইবরাহিমের মতো সুস্পষ্ট নিদর্শন। যে সেখানে প্রবেশ করবে, পাবে অন্তরের প্রশান্তি। যার এই কাবাঘরে আসার সামর্থ্য রয়েছে, তার জন্য হজ করা কর্তব্য। কেউ যদি এ নির্দেশ পালন না করে তবে তার জানা থাকা দরকার যে, আল্লাহ দুনিয়ার কোনো কিছুরই মুখাপেক্ষী নন। (সূরা আলে ইমরান : ৯৬-৯৭)
প্রতিটি কর্মের জন্য কতগুলো নিয়ম নির্ধারিত থাকে। সেই নিয়মমাফিক কর্ম সম্পাদন করতে হয়। পবিত্র হজব্রত পালনের ক্ষেত্রে তদ্রƒপ কিছু নিয়মনীতি- বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যেগুলো পালনের আবশ্যিকতা রয়েছে। হজ সম্পাদনের সময়কালীন করণীয় দিক সম্পর্কে মহান প্রভুর নির্দেশনা-
হজের মাসসমূহ সবারই জানা। যারাই এ মাসে হজের নিয়ত করবে, তারা হজের সময় (এক) যৌনাচার, (দুই) অন্যায়, (তিন) দুর্ব্যবহার, (চার) ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকবে। আর তোমরা যে সৎকর্ম করো, আল্লাহ তা জানেন। আর যাত্রাকালে সাথে পাথেয় নিয়ে যাবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ-সচেতনতাই উত্তম পাথেয়। অতএব হে বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ! সবসময়ই তোমরা আল্লাহ-সচেতন থেকো। (সূরা বাকারা : ১৯৭)
হজ পালনের গুরুত্ব বুঝানোর তাগিদে মহানবী (সা.) তাঁর প্রিয় উম্মতদের উদ্দেশে বলেছেন- হজরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর (সন্তুষ্টির) নিমিত্তে হজ আদায় করে এবং হজের কার‌্যাবলি আদায়কালে কোনরূপ অশ্লীলতা ও গুনাহর কাজে লিপ্ত না হয়, সে যেন নবজাত শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করলো। (বুখারি ও মুসলিম)
অন্য এক হাদিসে এসেছে- হজরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি হজ আদায়ের ইচ্ছা করে সে যেন তাড়াতাড়ি তা আদায় করে। (আবু দাউদ)
ইবনে মাজাহর এক বর্ণনায় রাসূল (সা.) বলেছেন- হজ ও ওমরা আদায়কারীগণ আল্লাহর মেহমান। তারা যে দোয়া করে আল্লাহ তায়ালা তা কবুল করেন, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন।
হজ একজন মুমিন-মুসলমানের জন্য কল্যাণবার্তা নিয়ে হাজির হয়। আমাদেরকে মুক্তির মোহনায় ভিড়াতে চায়। এখন আমাদের কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করছে আমাদের সফলতা- ব্যর্থতা। নিজেরা যদি নিজেদের পায়ে কুড়াল মারি সে ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর কিবা করার আছে!
আল্লাহ মানুষকে সম্পদ দান করেন। কিন্তু বান্দা কি এই সম্পদের মালিক? অথচ আল্লাহর সম্পদে নিজেকে মালিক বনে নিয়ে গিয়ে নিজের ইহকাল ও পরকাল দু’টি হারাই। নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার পরপরই একজন মানুষের ওপর হজ ফরজ হয়। কিন্তু আমরা অনেকেই বিষয়টি নিয়ে কখনো ভাবিনি। খুবই দুঃখজনক। অথচ এই অবহেলা ও সীমালঙ্ঘনের জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন আজাব। এ ব্যাপারে মহানবী (সা.)-এর দিকনির্দেশনা জেনে নিই। মহানবী (সা.) বলেছেন- অনিবার্য প্রয়োজন অথবা অত্যাচারী শাসক কিংবা কঠিন রোগ যদি কাউকে হজ পালনে বিরত না রাখে, আর সে হজ পালন না করে মারা যায়, তবে তার যেন ইয়াহুদি-নাসারার মতোই মৃত্যু ঘটে। (দারিমি)
আমাদের জীবন প্রভাতের প্রথম শপথে আমরা বলেছি- আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। মহানবী (সা.) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। সেই বিপ্লবী শপথ থেকেই আমরা মুসলমান। আমরা মুমিন। এই শাশ^ত আহবান আমরা জীবনের নানাবিধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রকাশ করি। হজ পালনকালীন সময়েও আমরা আল্লাহর এই একত্ববাদ ও শ্রেষ্ঠত্বকে প্রকাশ করে বলে থাকি-“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা-শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা, ওয়ান্নি’মাতা, লাকা ওয়াল মুলক, লা-শারিকা লাক।”
“আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির। তোমার কোন শরিক নেই- আমি হাজির, নিশ্চয় সকল প্রশংসা তোমার, সকল নিয়ামত তোমারই আর সকল সা¤্রাজ্যও তোমার। তোমার কোন শরিক নেই।
উল্লেখ্য, হজ সম্পাদনকালীন সময়ে প্রত্যেক হাজীকে মিনায় কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হয়। কেন এই কঙ্কর নিক্ষেপ করতে তা আমাদের সবারই জানা। হজরত ইব্রাহিম (আ) যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে তাঁর প্রাণপ্রিয় সন্তান শিশুপুত্র হজরত ইসমাইল (আ)কে কুরবানি করতে চললেন। শয়তান ভাবল, যদি হজরত ইব্রাহিম (আ) পরীক্ষায় সফল হয়ে যান তাহলে আল্লাহর আরো নিকটতম বান্দা হিসেবে পরিগণিত হবেন। তাই হজরত ইব্রাহিম (আ)-এর কুরবানির মহৎ উদ্দেশ্যকে ধূলিসাৎ করার নিয়তে পিতা-পুত্রকে কুমন্ত্রণা দিতে থাকে। হজরত ইব্রাহিম (আ) শয়তানের এই পরিকল্পনা রুখে দিতে কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। হজরত ইব্রাহিম (আ)-এর স্মৃতিজড়িত এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম হৃদয়ে ঈমানের চেতনাকে জাগরুক করার জন্য মিনায় কঙ্কর নিক্ষেপ হজের বিধানের অন্তর্ভুক্ত করেন মহান আল্লাহ তায়ালা।
প্রতি বছর অসংখ্য হাজীগণ হজব্রত পালন করছেন। সবাই হজের সকল আরকান-আহকাম পালনের মাধ্যমে হজ সম্পাদন করে থাকেন। কিন্তু হজ পরবর্তীকালীন সময়ে জীবনের কোন পরিবর্তন লক্ষ করা যায় না। হজের আগে ও পরের কার্যক্রমের ভেতরে কোন পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না। মিনায় শয়তানের বিরুদ্ধে কঙ্কর নিক্ষেপ করে ইসলামের পক্ষে পতাকাবাহী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিলেও পরবর্তী সময়ে সেই চেতনায় মরিচা পড়তে থাকে। হজ পালনকালীন সময়ে তালবিয়ায় আল্লাহর একত্ববাদ এবং মহানবী (সা.)কে নেতা হিসেবে মানলেও প্রাত্যহিক জীবনের কার্যক্রমে রাসূল (সা.)কে নেতা মানতে নারাজ। ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দান হাত উঁচিয়ে মুসলিম মিল্লাতের প্রতিনিধিত্ব করার সেই অনুভূতিও ফিকে হয়ে যায়। তাহলে হজ কেবলমাত্র হাজী সাহেব লকব ছাড়া এই জীবনে এবং পরকালের জন্য আমার কিবা কাজে আসছে! অনুভূতির দুয়ারে আজ শক্ত কড়া নাড়তে হবে। তালবিয়ার বিপ্লবী আহবান জীবন বিপ্লবের ইতিহাস হোক।
লেখক : কবি ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply