৭ নভেম্বর : আধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আরেকটি বিজয় । প্রফেসর ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ

৭ নভেম্বর : আধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আরেকটি বিজয় । প্রফেসর ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদবাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এদেশের ইতিহাসে ১৯০৬-এর মুসলিম লীগ গঠন, ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাবের আলোকে একাধিক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত, ১৯৪৭-এর দেশভাগ এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মতোই তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিক। এটি শুধু মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা নয়, এটি এদেশে সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অভ্যুদয়ের সূচনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট-এর মর্মান্তিক ঘটনা পরবর্তী সেনা অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থানে দেশে যখন চরম নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, তখন সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দেশ ও জাতিকে অনাকাক্সিক্ষত সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিয়েছিল। অভূতপূর্ব সেই বিপ্লব-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সাময়িক বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন স্বাধীনতার ঘোষক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ঢাকার রাজপথে সেদিন সৈনিকদের সাথে একাকার হয়ে সাধারণ মানুষ বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তুলেন আধিপত্যবাদী অপশক্তি ও তাদের দেশীয় চরদের বিরুদ্ধে।
পরবর্তীকালে দিনটিকে মানুষ উৎসবের ন্যায় পালন করে ও ভারতীয় আধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বিজয় হিসেবে মূল্যায়ন করতে শুরু করে। যদিও রাজনৈতিক কারণে একটি বিশেষ মহল এটিকে বাদ দিতে চায় এদেশের ইতিহাস থেকে। কেউবা এটিকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করতে তৎপর। কিন্তু ইতিহাস তার স্বাভাবিক নিয়মেই একটা পর্যায়ে সবকিছুর নিরপেক্ষ ও যথাযথ মূল্যায়ন করে থাকে। এক্ষেত্রেও তাই ঘটে চলেছে, মূলত দুশো বছরের ঔপনিবেশিক শোষণামলে এদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে ইংরেজ এবং তাদের দেশীয় সেবাদাস ব্রাহ্মণ্যবাদী অপশক্তি দুইয়ের সাথেই লড়াই করতে হয়েছে। ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ছিলো এ ধারাবাহিক লড়াই এর চূড়ান্ত রূপ। এদিন না এলে আবারো এ জনপদের সার্বভৌত্ব হারানোর সমূহ সম্ভাবনা ছিলো। ৭ নভেম্বরের ফলে আমাদের হাজার বছরের লড়াকু চেতনা নতুন এবং স্বাধীনভাবে বিকশিত হবার সুযোগ পেয়েছে। আমাদের জাতীয় পরিচয় সুনির্ধারিত হয়েছে। বাংলাদেশের, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সর্বক্ষেত্রে ৭ নভেম্বর এক বৈপ্লবিক চেতনার সঞ্চার করেছে। বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান নির্ধারণ করেছে নভেম্বর বিপ্লব। এই স্বাতন্ত্র্যতা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় পরিমণ্ডলেই লক্ষণীয়। সমগ্র জাতিকে এক যুগান্তকারী পথনির্দেশনা দিয়েছে এ বিপ্লব।
১৯৭৫ সালের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর ক্ষমতা লাভ ছিল একটি অনন্য ধরনের বিপ্লব। কারো একক কৃতিত্বে এ বিপ্লব সাধিত হয়নি। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ও সর্বস্তরের জনতার সার্বিক সমর্থনের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর অতি জনপ্রিয় অফিসার জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। এই বিপ্লবের রূপ ছিল বিশ্বের অন্যান্য দেশে সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত। সাধারণত সেনা ক্যুর মাধ্যমে একনায়কতন্ত্র কায়েম হয় অথচ ৭ নভেম্বর সেনা ক্যুর মাধ্যমে জনগণের শাসন তথা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগোম হয়। ষড়যন্ত্র এই বিপ্লবের মূল উপাদান ছিল না। এই বিপ্লবের মূল চরিত্র ছিল জিয়াউর রহমানের প্রতি সেনাবাহিনী এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন। জাসদ দাবি করে জিয়াউর রহমানকে তারাই ক্ষমতায় বসায় এবং জিয়াউর রহমান তাদের সাথে শর্ত ভঙ্গ করে। তাদের এই দাবি তাদের তথাকথিত সশস্ত্র বিপ্লবের তত্ত্বের অসারতা প্রমাণ করে। কারণ কোনো সশস্ত্র বিপ্লবী মহল ক্ষমতা গ্রহণ করে অন্য কাউকে ক্ষমতা দিয়ে দেয় এমন ঘটনা ইতিহাসে নেই।
৭ নভেম্বরের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জাতি বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে মুক্তিলাভ করে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের বৃহত্তর পরিমণ্ডলে প্রবেশ করে, যা এক নতুন রাষ্ট্রীয় চেতনার জন্ম দেয়। ৭ নভেম্বরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকে চলে আসা সামরিক বাহিনী ও জনতার মধ্যকার দূরত্ব অনেকাংশে কমে আসে। এ দুইয়ের মধ্যে এমন এক সংহতি এনে দেয়, যা দেশ গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
৭ নভেম্বর : আধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আরেকটি বিজয় । প্রফেসর ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ১৯৭১ সালে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেয়া বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর একটি অদূরদর্শী, অদক্ষ ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের কবলে পড়ে। ফলে দেশ ও জনগণ চরম বিভীষিকায় পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যায়। আইন শৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি জনগণের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ফলে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়ে। একদলীয় বাকশাল কায়েমের মাধ্যমে জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়েছিল। প্রচারমাধ্যম, বিচার বিভাগ সবকিছুর স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়েছিল। আধিপত্যবাদী খপ্পরে পড়ে বিদেশী শক্তির ক্রীড়নকে পরিণত হয় দেশের শাসক গোষ্ঠী। শাসকচক্রের ব্যর্থতার পর ব্যর্থতায় দেশ বহির্বিশ্বে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে আখ্যায়িত হয়েছিল। উপরন্তু মহল বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের চেতনা ও ঈমান আিকদা বিরোধী কর্মকাণ্ড শুরু করে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ইসলামী নিশানা মুছা শুরু হয় এমনকি প্রতিষ্ঠানের ইসলামী নামকরণ পর্যন্ত বাদ দেয়া হতে থাকে। এমনি এক পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক মর্মন্তুদ ও শোকাবহ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন সাধিত হয়। বাকশালী বিভীষিকায় জনগণ এতটাই অতিষ্ঠ ছিল যে জনগণ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট অনিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতার পরিবর্তনকেও সমর্থন করেছিল। আওয়ামী লীগেরই একটি অংশ এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হয়। এ ঘটনার পর থেকে দেশ এক অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হতে থাকে ।
জাতীয় জীবনের সেই যুগ সন্ধিক্ষণে অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যখন জাতীয় নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যখন বিপন্ন অবস্থায় উপনীত হয় ঠিক এমনি মুহূর্তে ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবসের মাধ্যমে এদেশের আকাশের কালো মেঘটি কেটে যায়। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ সঠিকভাবেই নির্ধারিত হয়ে যায়। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই তার স্বাধীন অস্তিত্বের বিরুদ্ধে আধিপত্যবাদী রুশ-ভারত অক্ষশক্তি এবং তাদের এদেশীয় তাঁবেদার গোষ্ঠী যে ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর এদেশের দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতা ঐক্য গড়ে তার উচিত জবাব দিয়েছিল। এর ফলে এদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি জনগণের আকাক্সক্ষার আলোকে পুনঃনির্ধারিত হয়। সমাজতন্ত্রের নামে এদেশে যে দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা হয় তার মূলোচ্ছেদ করে গঠনমুলক বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক ভিত্তি রচিত হয় নভেম্বর বিপ্লবের পরে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের নামে ধর্মহীন ও ধর্মবিদ্বেষী অবস্থার অবসান ঘটিয়ে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার চেতনার আলোকে ‘আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ কেন্দ্রিক কল্যাণ রাষ্ট্রগঠনের দিকে দেশ ধাবিত হয়। ফলে মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশ নতুন ভাবমূর্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়। ৭ নভেম্বরের পরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি রুশ-ভারত বলয় মুক্ত হয়ে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে উপনীত হয়। আঞ্চলিক পর্যায়েও বাংলাদেশ মর্যাদার আসনে পৌঁছে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় দক্ষিণ এশিয় সহযোগিতা সংস্থা তথা সার্ক গঠনে বাংলাদেশই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
আজ ৪৪ বছর পরও ৭ নভেম্বর আমাদের প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। এ মহান বিপ্লবের চেতনা আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার রক্ষাকবচ, আমাদের প্রেরণার উৎস। এ বিপ্লব হয়েছিল দেশ বাঁচাতে, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সমুন্নত করতে সর্বোপরি দেশের জনগণকে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে। এর মধ্য দিয়ে আমাদের জাতীয় পরিচয় সুনির্ধারিত হয়েছে। আজ আবারও আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী এ দেশ-জাতির বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বুনে চলেছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আগ্রাসনের পাশাপাশি এখন যুক্ত হয়েছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। এর মোকাবেলায় নতুন প্রজন্মকে সাত নভেম্বরের চেতনায় গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় বেঈমানদের মোকাবেলায় নতুন করে শপথ নিতে হবে।

লেখক : প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদস্য-সচিব, শত নাগরিক, রাজশাহী

SHARE

Leave a Reply